#কালারব্লাইন্ড — ১১
#সোফিয়া_সাফা
পঞ্চম তলায় এসে আরিজ মাহতাবিরের ঘরটা খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধা হলো না আলতার। এই তলায় মাত্র দুটি ইউনিট—একটির দরজা লক করা, অন্যটির আধখোলা। আলতার বুক তখনো ভয়ে কাঁপছে; যেকোনো মুহূর্তে রঞ্জক পিছু ধাওয়া করে এখানে চলে আসতে পারে, এই আতঙ্ক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল তাকে।
ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়ার মতো মানসিক স্থিতি ছিল না তার। পরিস্থিতির তাগিদে তাই বিনা বাক্যেই সে শ্বশুরের ঘরে ঢুকে পড়ল।
ঘরের ভেতর তখন স্টাডি টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে মনোযোগ দিয়ে চোখ বোলাচ্ছিলেন আরিজ মাহতাবির। তার বিপরীত পাশের চেয়ারটায় বসা ছিল ফারিশ। হয়তো কোনো জরুরি ব্যবসায়িক বা পারিবারিক বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করছিল। হঠাৎ কারো আকস্মিক প্রবেশে দুজনেই চমকে তাকাল দরজার দিকে।
আলতা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও শাড়ির আঁচলটা মুখের ওপর থেকে সরতে দিল না। ফারিশ তার তটস্থতা দেখে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে চেয়ে রইল। আলতার সাথে এটাই তার দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। আশ্চর্যের বিষয়, প্রথম সাক্ষাতেও মেয়েটি তার দিকে তাকায়নি। আজও এক পলক তাকিয়েই তৎক্ষণাৎ মাথা নিচু করে ফেলেছে। মুখের ওপর আঁচল টেনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার অস্বস্তি ফারিশের চোখ এড়াল না।
একইভাবে কিশোরীর অস্বস্তি টের পেয়ে আরিজ মাহতাবির হাতের ফাইলটা বন্ধ করলেন। এরপর টেবিল ক্লকে একবার চোখ বুলিয়ে ফারিশের উদ্দেশ্যে বললেন, “বাকি কথা পরে হবে ফারিশ। তুমি এখন যাও।”
ফারিশ মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। আলতার থেকে চোখ সরিয়ে চাচার ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “তুমি আরএম ব্রোর সাথে ডিসকাস করে আমাকে ফাইনাল ডিসিশন জানিয়ো।”
আরিজ ইশারায় তার কথায় সায় জানালেন। ফারিশ আর দাঁড়িয়ে না থেকে আলতার পাশ ঘেঁষে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আলতা তৎক্ষণাৎ কিছু বলতে পারল না। গলা দিয়ে যেন কোনো শব্দই বেরোতে চাইছে না। কান্নার আক্ষেপে কণ্ঠনালী পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে আছে। মাথা নিচু করে সে অনবরত দুই হাত কচলাচ্ছে; অসহায়ত্ব আর দ্বিধা তাকে ঘিরে ধরেছে। কীভাবে মুখ খুলবে, কোন ভাষায় প্রকাশ করবে, সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না।
কিশোরীর এমন অবস্থা দেখে আরিজ মাহতাবির কিছুটা নরম গলায় ডেকে উঠলেন, “কিছু কি হয়েছে বউমা?”
শ্বশুরের এই সহজ প্রশ্নে আলতা বড় করে একটা শুকনো ঢোক গিলল। নিজেকেই প্রশ্ন করল, কী বলবে সে?
‘আপনার ছেলে আমার সাথে জোরাজুরি করেছে। আমি ভয় পেয়েছি। আপনি ওনাকে কিছু বলুন।’
এভাবে বলে দেবে?
পারবে না। আলতা এভাবে বলতে পারবে না। কারণ রঞ্জক ঠিক কী করতে চেয়েছিল, সেটাই তো সে জানে না। শুধু জানে, লোকটার কাছ থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছে তাকে।
ভয়ে আলতার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। আলতার এমন বিপর্যস্ত দশা দেখে আরিজ মাহতাবির যথেষ্ট চিন্তিত হয়ে নিজের চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে এলেন। টেবিলে রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে আলতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, “পানি খাও।”
কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাসটা ঠোঁটের কাছে নিয়েও এক ফোঁটাও পানি গিলতে পারল না আলতা।
আরিজ আবার প্রশ্ন করলেন, “কেউ কি তোমাকে কিছু বলেছে?”
প্রশ্নটা শেষ হতে না হতেই আলতার গাল বেয়ে উষ্ণ তরল গড়িয়ে পড়ল। আরিজ মাহতাবির আরও অস্থির হয়ে উঠলেন। মেয়েটাকে কীভাবে শান্ত করবেন, বুঝে উঠতে পারলেন না।
অসহায় সুরে তিনি বললেন, “দাঁড়াও, তোমার মাকে ডেকে আনছি। আমাকে সরাসরি বলতে না পারলে তাকেই সব খুলে বোলো, কেমন?”
আলতা শংকায় পড়ে গেল। মায়ের কাছে বলে কোনো লাভ হলে সে এতদূর ছুটে আসতো না। উল্টো তার মা এসব কথা শুনলে তার দিকেই তিরস্কারের আঙুল তুলবে। রাগী গলায় হয়তো বলে বসবে, ‘রঞ্জক তোর স্বামী হয়, কোন আক্কেলে তুই এভাবে ওর থেকে পালিয়ে এসেছিস? তোকে তো ও মেনেই নিতে পারছিল না, তাও যে তোর ঘরে গিয়েছে—এটাই তো অনেক।’
“মাকে ডাকতে হবে না। আমি আপনাকেই বলছি।” আলতার রুদ্ধ কণ্ঠ কেঁপে উঠলেও, তার এই আকস্মিক ঘোষণায় দরজার দিকে পা বাড়িয়েও থমকে গেলেন আরিজ মাহতাবির।
আলতার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “আচ্ছা, বলো তাহলে।”
কিশোরী দুহাতে শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে খামচে ধরে কাঁপা কাঁপা স্বরে ফিসফিসাল, “উ-উনি আমার ঘরে গিয়েছিলেন।”
আরিজ চমকে উঠলেন, “কে গিয়েছিল?”
আলতার শরীরে শিহরণ বয়ে গেল। আরিজ মাহতাবির যে ‘উনি’ বলতে এবার রঞ্জককে কল্পনাও করছেন না, সেটা বুঝতে পারল সে।
গলার স্বর নামিয়ে আলতা বলল, “আ-আপনার ছ-ছেলে।”
আরিজ মাহতাবিরের চোখ বড়বড় হয়ে গেল। বিস্ময়ে প্রতিক্রিয়া দেখাতেও ভুলে গেলেন তিনি। আলতা এবার আরও জড়ানো কণ্ঠে যোগ করল, “উনি পাগলের মতো আচরণ করছিলেন। তাই আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
আরিজ মাহতাবিরের মনে শংঙ্কা দানা বাঁধল। তিনি জানেন রঞ্জক কেমন বেপরোয়া; অন্যের সামনে নিজের গায়ের জোর প্রদর্শনে কতটা পটু সে। এমনকি নিজের কার্য হাসিলে গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধাবোধ করে না।
উদ্বিগ্ন গলায় তিনি প্রশ্ন করলেন, “কী করেছে ও? তোমার গায়ে হাত তোলেনি তো?”
আলতা থতমত খেয়ে গেল। সত্যি বলতে গেলে তো সে নিজেই হাত তুলে ফেলেছিল রঞ্জকের গালে। কিয়ৎক্ষণ দ্বিধায় ভুগে আলতা ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ল। আরিজ মাহতাবির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। কিন্তু পরক্ষণেই আলতা স্বীকার করে নিল, “আমিই ওনাকে থাপ্পড় মেরে দিয়েছি।”
আরিজ মাহতাবির হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি ঠিক শুনছেন তো? আলতা মাথা নিচু করে নৈশব্দ্যে চোখের পানি ঝরাচ্ছিল। আরিজ কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে মুখ খুললেন, “ও কি ডিভোর্স চাইতে গিয়েছিল?”
আলতার ভেতরটা হঠাৎ চেপে এলো। মাথা নেড়ে জানাল, “তেমন কিছু বলেননি।”
“তাহলে? কী এমন করেছে যার জন্য তুমি ওকে থাপ্পড় মারতে বাধ্য হয়েছো?”
আলতা অশ্রুসিক্ত নয়ন তুলে তাকাল শ্বশুরের দিকে। সে তো ভেবেছিল এটা শুনে আরিজ মাহতাবিরও রেগে যাবেন। কিন্তু তিনি এখনো আলতার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন। যা তার নিজের মা-ও করতেন না।
খানিকটা সাহস পেয়ে আলতা বলেই দিল, “উ-উনি আমাকে খুব অপমানজনক কথা বলেছেন। তাই আমি… আমি ইচ্ছা করে মারিনি ওনাকে। শুধু উনি যা বলছিলেন… আমি সহ্য করতে পারিনি।”
আরিজ ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি ভাবেননি রঞ্জক আলতার ঘরে চলে যাবে শুধুমাত্র তাকে অপমান করার জন্য। ক্রোধ ও বিরক্তি সংবরণ করে তিনি নরম গলায় বললেন, “আচ্ছা, তুমি এখন নিজের ঘরে ফিরে যাও বউমা। আমি বিষয়টা দেখছি।”
শ্বশুরের কথায় কিছুটা ভরসা পেয়ে আলতা কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। আরিজ ফোনটা তুলে নিয়ে রঞ্জককে কল দেওয়ার জন্য স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়াতে যাবেন, ঠিক তখনই আতঙ্কিত আলতা বলে উঠল, “উনি হয়তো বাইরেই কোথাও আছেন। আমি বের হলেই…”
কথাটা শেষ করতে পারল না আলতা। তার অসম্পূর্ণ কথার পৃষ্ঠে আরিজ মাহতাবির বললেন, “তুমি বের হলেই কী? আবার অপমান করবে?”
আলতা নিজের সংশয়টুকু মুখে প্রকাশ করতে পারল না। আরিজ মাহতাবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “রঞ্জক আসুক, তারপরই তুমি যেও।”
এদিকে তুষার আর রঞ্জক এখনো সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধু বিয়ে করে ফেলেছে—এই সত্যটা কিছুতেই হজম করতে পারছে না তুষার। সে কিছুটা ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “তুই কীভাবে এমনটা করতে পারলি?”
রঞ্জক গম্ভীর গলায় জবাব দিল, “সপ্তাহ খানেক আগে এএম আমাকে ফাঁদে ফেলে ওই মেয়েটার সাথে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।”
তুষার নাটকীয় ভঙ্গিতে বুকের বাঁ পাশ চেপে ধরে বলল, “এতোবড় কথাটা তুই আমার কাছে গোপন রাখলি?”
“বলার মতো হলে বলে দিতাম। সপ্তাহ খানেক আগে এএম আমাকে ফোন করে বললেন, ডেলভিয়ার পথ দিয়ে ফিরে আসার সময় উনি একটা ঝামেলায় পড়েছেন। আমি যেন ওনাকে সাহায্য করতে দ্রুত ওখানে পৌঁছাই। আমিও বোকার মতো অতশত না ভেবেই চলে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, উনি কোনো ঝামেলায় পড়েননি। মূলত ওখানকার একটা মেয়েকে ওনার ভীষণ পছন্দ হয়ে গেছে। উনি যেকোনো মূল্যে চেয়েছিলেন, আমি যেন মেয়েটাকে বিয়ে করি। বিনিময়ে আমাকে নমিনেশন পাইয়ে দেবেন বলে চুক্তি করেছিলেন।”
“ব্যস? তুই বিয়ে করে নিলি? একটা বার আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করলি না?”
রঞ্জক চোখ ছোট করে বলল, “তুই তো তোর কাজিনের বিয়ে খেতে গিয়েছিলি। জানিয়ে দিলেও তুই টাইম মতো পৌঁছাতে পারতি না। তাছাড়া ভেবেছিলাম, সবসময় তুই-ই তো সারপ্রাইজ দিস আমাকে, কেননা এবার তোকে সারপ্রাইজ দেওয়া যাক।”
“এসব নিয়ে কে সারপ্রাইজ দেয় ভাই? আমি লিট্রেলি তোর বউয়ের প্রেমে পড়ে যাচ্ছিলাম।”
“হুম, তাতো দেখতেই পাচ্ছিলাম।”
“কী দেখতে পেয়েছিস হ্যাঁ? আমি দুইদিন আগে ফিরেছি রঞ্জক। সারপ্রাইজটা ঠিক কবে দেওয়ার প্ল্যান করেছিলি, একেবারে বাপ হওয়ার পর?”
রঞ্জক বিস্ফারিত চোখে তুষারের দিকে তাকাল। তুষার পরোয়া না করে চোখ উল্টে বিরক্তির সুরে বলল, “এতো অবাক হচ্ছিস কেন? বিয়ে যেহেতু করে নিয়েছিস, বাপ হতে তো আর দেরি নেই।”
রঞ্জক দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় বলল, “আমি ওকে মেনে নিইনি তুষার। সো, স্টপ টকিং ননসেন্স।”
তুষার স্তম্ভিত হয়ে গেল, “হোয়াট? মেনে নিসনি মানে?”
“আমি ওকে ডিভোর্স দিয়ে দেবো।”
“কেন?”
“আমার বউ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো কন্ডিশনই ও ফুলফিল করতে পারেনি।”
তুষার মেয়েটার কথা ভেবে দেখল, রঞ্জক ভুল কিছু বলেনি। রঞ্জক একদিন তাকে নিজের আইডল টাইপ বলেছিল, ‘আমার বউকে হতে হবে আমার সমবয়সী, অন্তত আমার কান পর্যন্ত লম্বা, প্লাস উচ্চশিক্ষিত।’
তুষার বলল, “তোর ক্রাইটেরিয়ার ব্যাপারটা না হয় বুঝলাম কিন্তু তোর ওকে পছন্দ না-ই হলে বিয়েটা করলি কেন?”
রঞ্জক ক্লান্ত ভঙ্গিতে সিঁড়ির রেলিঙে পিঠ ঠেকিয়ে বলল, “আমি বিয়ের আগে ওকে দেখিনি।”
“ওহহো ইয়ার! কী যে বলছিস না। তুই বিয়ের আগে মেয়েটাকে দেখিসনি? এটা তো বিশ্বাসই করতে পারছি না। এতোবড় একটা লাইফটাইম ডিসিশন তুই কীভাবে চোখ বন্ধ করে নিলি?”
“আমি এএমকে একটু বেশিই বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম। ভেবেছিলাম আমার জন্য উনি সঠিক কাউকেই পছন্দ করবেন।”
তুষারের খুব খারাপ লাগল রঞ্জকের জন্য। সে বেশ বুঝতে পারছে, মুখে কোনোদিন স্বীকার না করলেও বাবার প্রতি রঞ্জকের একটা আলাদা বিশ্বাস ছিল।
“তোর বাবা তো দেখছি আস্ত একটা ভিলেন। কীভাবে পারলেন নিজের ছেলের সাথে এত বড় মাইন্ড গেম খেলতে! তিনি নিশ্চয়ই খুব ভালো করেই জানেন, কত বড় অন্যায় করেছেন তোর সাথে।”
রঞ্জক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই তুষার মলিন হাসলো। মুখে কিছু না বললেও মনে মনে আওড়াল, ‘কীভাবে তিনি নিজের কালারব্লাইন্ড ছেলের সাথে এমন কালারফুল মেয়েকে জুড়ে দিতে পারেন? কোনো দিক থেকেই যে তোর সাথে মেয়েটার জোড় মেলে না।’
“আমি জানি তুই কী ভাবছিস।” কথাটা শুনে তুষার হাসার চেষ্টা করল। বলল, “আমি যদি জানতাম মেয়েটা তোর বউ তাহলে ওভাবে ওর প্রশংসা করতাম না।”
“মাইন্ড নট, আমি তো ডিভোর্সই দিয়ে দেবো ওকে। তারপর তুই যত পারিস প্রশংসা করিস; বাট টিল দেন, আমি চাই না তুই…”
বাধা দিয়ে তুষার বলল, “ডিভোর্সের আগে হোক কিংবা পরে, এই তুষার আর মেয়েটাকে দেখে কোনোদিন মুগ্ধ হতে পারবে না। তুই সেই রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিস।”
রঞ্জক আর কথা বাড়াল না। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। তুষার এবার আর পিছু নিল না তার। ফিরে গেল রঞ্জকের ঘরে।
অন্যদিকে, রঞ্জককে ফোনে না পেয়ে আরিজ মাহতাবির অন্য কাউকে দিয়ে তাকে ডেকে পাঠাতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই রঞ্জক এসে হাজির হলো তার দরজায়। তাকে দেখেই আলতা আড়ষ্ট হয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল।
আরিজ মাহতাবির খানিকটা বিরক্তি ঝেড়ে বললেন, “তোমাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না কেন?”
রঞ্জক একনজর আলতাকে দেখে নিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে উত্তর দিল, “ফোনটা আমার ঘরে, আর আমি ঘরের বাইরে ছিলাম।”
ছেলের এমন ভাবলেশহীন উত্তর শুনে আরিজ আলতার উদ্দেশ্যে বললেন, “তুমি এবার নিজের ঘরে যাও বউমা।”
আলতা বুকভরে একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই রঞ্জকও তার পিছু ধেয়ে যেতে উদ্যত হলো।
আরিজ মাহতাবির তাকে পিছু ডাকলেন, “দাঁড়াও, কোথায় যাচ্ছো তুমি?”
রঞ্জক দরজার বাইরে থেমে গিয়ে নির্বিকার গলায় বলল, “দ্যাটস নান অব ইউর বিজনেস।”
“তুমি যদি আবারও দোতলায় যাওয়ার স্পর্ধা দেখাও, তাহলে কিন্তু আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।”
“তুমি ইতোমধ্যেই সবচেয়ে খারাপ।”
ছেলের কথায় আরিজ মাহতাবিরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে কঠোর গলায় বললেন, “এদিকে এসো, কথা আছে।”
রঞ্জক পকেটে হাত গুজে মন্থর গতিতে ফিরে এসে বাবার সামনে দাঁড়াল। আরিজ মাহতাবির সরাসরি প্রশ্ন করলেন, “বউমার ঘরে কেন গিয়েছিলে তুমি?”
রঞ্জক বাঁকা হাসল, “আমি ওর ঘরে গিয়েছিলাম, এটা যখন বলতে পেরেছে, নিশ্চয়ই কেন গিয়েছিলাম সেটাও তোমাকে বলেছে। সবটা জানার পরেও কেন জিজ্ঞেস করছো?”
ছেলের এমন ঔদ্ধত্য দেখে আরিজ মনে করিয়ে দিলেন, “সেদিন তো খুব ভাব দেখিয়ে বউমা তোমার ঘরে গিয়েছিল বলে তুমি ওকে বের করে দিয়ে ঘর পরিষ্কার করিয়েছিলে। আজ তোমার সেই অহংকার কোথায় গেল? শুনি।”
“অহংকার এখনো আগের জায়গাতেই আছে। আসল কাজটুকু সেরে ভালোমতো গোসল করে নেবো, চিন্তা কোরো না।”
এই ধরনের অসংযত কথা শুনে আরিজ মাহতাবিরের মেজাজ তুঙ্গে উঠে গেল, “তুমি যে এতো অসভ্য তা আমি আগে জানতাম না।”
রঞ্জক উদাসীন ভঙ্গিতে বলল, “জানতে দিইনি তোমাকে। ভেবেছিলাম সভ্য হয়ে থাকলে গুঞ্জনের মতো প্রিয় হয়ে উঠতে পারবো।”
আরিজ মাহতাবির প্রসঙ্গ পাল্টে ফেললেন, “তোমার ধারণা ছিল বউমার কাছে তোমাকে দেওয়ার মতো কিছুই নেই। তো সেই নিকৃষ্ট ধারণাটা নিয়ে তুমি তোমার গার্লফ্রেন্ডের কাছে না গিয়ে বউয়ের কাছে গেলে কেন?”
রঞ্জক ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে জবাব দিল, “সেই ধারণাটা সঙ্গে নিয়ে তো যাইনি, ঘরে রেখে তারপর গিয়েছিলাম।”
“রঞ্জক!”
“সামনেই তো দাঁড়িয়ে আছি তোমার। চেঁচানোর কোনো প্রয়োজন নেই।”
ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে আরিজ বললেন, “তুমি যদি বউকে স্বীকৃতি দিতে চাও সরাসরি বলো। আমি তোমাকে সুযোগ দিতেও পারি।”
রঞ্জক হাসতে লাগল, “স্বীকৃতি? আমি ওর সঙ্গে সারাজীবন কাটাবো? নো ওয়ে! আমি তো ডিভোর্স চাই।”
“যদি সত্যিই ডিভোর্স চাও, তাহলে বউমার ঘরে যাওয়া তো দূর, ওর দিকে তাকানোরও কোনো অধিকার নেই তোমার।”
“অধিকার তুমিই দিয়েছো আমায়। তাই যতদিন ডিভোর্স না হচ্ছে সেই অধিকারের পূর্ণ ব্যবহার করবো আমি।”
“ও আচ্ছা, দাঁড়াও তাহলে আমি এক্ষুণি ডিভোর্সের ব্যবস্থা করছি। তার আগে তোমার নমিনেশন ক্যান্সেল করাটাও জরুরি।”
রঞ্জক ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। আরিজ মাহতাবির ফোনে কারো নম্বর ডায়াল করতে যাবেন তার আগেই গলায় কিছুটা বিরক্তি মিশিয়ে রঞ্জক বলে উঠল, “আমি আর যাবো না ওই ঘরে।”
আরিজ মাহতাবির খুশি হলেন, “সেটাই তোমার জন্য ভালো হবে। আমার ধারণা ছিল তুমি খুব ভদ্র, সভ্য ও বুদ্ধিমান। সেইজন্যই আলতাকে তোমার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তুমি ওর যোগ্যই নও। তাই তোমাদের ডিভোর্স হয়ে গেলেই ভালো হবে।”
রঞ্জক তাচ্ছিল্যের হাসলো, “তাহলে নমিনেশন ক্যান্সেলের ভয় দেখিয়ে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে চাইছো কেন? ডিভোর্স হয়েই যেতে দাও।”
“বিয়েটা কোনো ছেলেখেলা নয়। আমি তোমাকে সময় দিচ্ছি। নিজেকে শুধরে নাও, ও তোমার বউ। তুমি চাইলেই ওকে ভালোবেসে কাছে টেনে নিতে পারবে। ফোর্স করার প্রয়োজন নেই।”
রঞ্জক নাক সিঁটকে কটাক্ষপূর্ণ কণ্ঠে বলল, “আমি ভালোবাসবো ওকে? নট পসিবল!”
“যদি তোমার সিদ্ধান্ত কখনো পালটায়, আমাকে জানিয়ো।”
“আশাও করো না।” বলেই রঞ্জক প্রস্থানের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো।
আরিজ বলে উঠলেন, “তোমার আর আলতার সম্পর্কটা এতোটাও জটিল করে ফেলো না যে তোমাকে সুযোগ দেওয়ার কোনো উপায় না থাকে।”
রঞ্জক ভ্রূ তুলে তাকাতেই আরিজ ব্যাখ্যা করলেন, “আলতা তোমাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। তুমি ওকে প্রতিনিয়ত যেভাবে অপমান করছো, কষ্ট দিচ্ছো তাতে সম্পর্কটা নেতিবাচক দিকে মোড় নিচ্ছে। এরপর কিন্তু ঘটা করে স্বীকৃতি দিয়েও লাভ হবে না।”
“ও আমাকে ঘৃণা করে কি না, তা জানি না। কিন্তু আমি ওকে প্রচণ্ড ঘৃণা করি। তাই এই সম্পর্ক যত তাড়াতাড়ি চুকেবুকে যাবে, তত তাড়াতাড়িই আমি মুক্তি পাবো।”
আরিজ কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “দেখো, তুমি যেটাকে মুক্তি মনে করছো, সেটা যেন শাস্তিতে পরিণত না হয়।”
রঞ্জক উপেক্ষা করল। দু-পা এগিয়ে যেতেই আরিজ শক্ত গলায় বলে উঠলেন, “কথা শেষ হওয়ার আগেই চলে যাচ্ছো কেন?”
রঞ্জক বিরক্ত হয়ে পিছু ফিরল, “আর কী বলার আছে?”
“আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বউমাকে পড়াশোনা করাবো। এই প্রসঙ্গে তোমার কি কিছু বলার আছে?”
কথাটা শোনার সাথে সাথে রঞ্জকের মাথার ভেতর ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ভেসে উঠল বিয়ের দিনের একটা স্মৃতি। আরিজ মাহতাবির বিয়ের কথা পাকা করার সময় রঞ্জক তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “মেয়েটা শিক্ষিত তো?”
আরিজ শুধু বলেছিলেন, “নিশ্চিন্ত থাকো। তোমার পাশে ওই মেয়েটাকে খুব মানাবে। দেখলে মনে হবে, দ্য টু অব ইউ ওয়ার মেড ফর ইচ আদার।”
রঞ্জক তখন সন্দিহান হয়ে বলেছিল, “রিয়েলি? তবুও তুমি একবার মিলিয়ে নাও। আমার ওয়াইফকে অবশ্যই গ্র্যাজুয়েটেড হতেই হবে। সেই সঙ্গে লম্বাও হতে হবে; বিকজ আই ডোন্ট লাইক শর্ট গার্লস। আমার সমবয়সী হলে পারফেক্ট, তবে বড়জোর চার-পাঁচ বছরের ছোট হলেও আমি ম্যানেজ করে নেব।”
সেই সময় আরিজ তার কথাগুলো খুব একটা মন দিয়ে শুনেছিলেন বলে মনে হয়নি রঞ্জকের। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তিনি মূলত না শোনার ভান করেছিলেন।
“তুমি কি ভাবছো, মেয়েটা পড়াশোনা শুরু করে দিলেই আমি মেনে নেবো ওকে?”
আরিজ মাহতাবিরের চোখেমুখে অনীহা ফুটে উঠল, “তুমি মেনে না নিলে ওকে অন্য কোথাও তো বিয়ে দিতে হবে, তাই না?”
রঞ্জক উপহাসের সুরে বলল, “হাহ! ওকে কে বিয়ে করবে?”
“করবে না বলছো?”
“হ্যাঁ, সেটাই বলছি।”
“আচ্ছা, দেখা যাক।”
রঞ্জক মুখ বাঁকিয়ে বলল, “যা খুশি করো। শুধু হাজব্যান্ড হিসেবে আমার নামটা কোথাও ব্যবহার কোরো না। আমি ওর হাজব্যান্ড হতে একদমই আগ্রহী নই।”
“তুমি কি তোমাদের বিয়েটা গোপন রাখতে চাইছো?”
রঞ্জক ভ্রূ কুঁচকে তাকাতেই আরিজ মাহতাবির হালকা হেসে বললেন, “বাইরের মানুষ জানবে ও অবিবাহিতা। তোমার এতে কোনো প্রবলেম নেই তো?”
কথাটা কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকল রঞ্জকের কাছে। সে অস্বস্তিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে রুক্ষ গলায় বলল, “আনম্যারিড বলার দরকার কী? সবাইকে বলুক ও ম্যারিড, জাস্ট আমার নামটা ব্যবহার না করলেই হলো।”
“সেটা পসিবল নয়।”
“কেন?”
“তুমি কি সবাইকে বলবে যে তোমার বিয়ে হয়ে গেছে?”
“অভিয়াসলি নো।”
“তাহলে আলতা কেন নিজের গলায় বিবাহিতার ট্যাগ ঝুলিয়ে ঘুরবে?”
রঞ্জক নিজের মাথার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে টপিক চেঞ্জ করল, “তো কোন কিন্ডারগার্ডেনে ভর্তি করাবে বলে ঠিক করেছো ওকে?”
আরিজ মাহতাবির শান্ত গলায় বললেন, “ও কোনো ছোট বাচ্চা নয়, রঞ্জক।”
“তুমি সিওর? আকারে-প্রকারে তো এইটুকুনি।” কথাটা বলতে বলতে রঞ্জক নিজের বুক বরাবর হাত দিয়ে উচ্চতার একটা মাপ নির্দেশ করল।
আরিজ মাহতাবির ছেলের ইঙ্গিতপূর্ণ কথায় মুখটাকে গম্ভীর করে বললেন, “তোমাদের বিয়ের তিনদিন আগেই ওর ষোলো বছর পূর্ণ হয়েছে।”
“ওয়াও ষোলোকলা পূর্ণ হয়েছে তাহলে! আমি তো ভেবেছিলাম ইরাদের বয়সী হবে। যাক পাঁচটা বছরের বড় আছে। আমেজিং!” কথাটা বলতে বলতেই রঞ্জকের ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপাত্মক হাসি ফুটে উঠল।
“জানোই তো ভ্যালেনিয়ার আইনে মেয়েদের ষোলো বছর হলেই বাবা-মায়ের সম্মতিতে বিয়ে দেওয়ার অনুমতি আছে। সেইজন্যই ওনারা আইনি ঝামেলা এড়াতে ওর ষোলো বছর হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন।”
রঞ্জক নিম্নস্বরে বিড়বিড় করে উঠল, “বা`লের আইন আমার!”
তার গলার স্বর নিচু হলেও আরিজ মাহতাবিরের কানে তা ঠিকই পৌঁছে গেল। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “আমার কথা শেষ এখন তুমি যেতে পারো।”
আরিজ মাহতাবির আলগোছে ঘুরে দাঁড়াতেই রঞ্জক বলে উঠল, “বললে না তো, কোথায় ভর্তি করাবে বলে ঠিক করেছো?”
আরিজ মাহতাবির উত্তর দিলেন না। কেবল তাকালেন তার দিকে। রঞ্জক নিজেই নিজের কথার খেই ধরে যোগ করল, “সেন্ট মেরিজের কথা ভেবে দেখতে পারো। কলেজটা ভালোই। গতবছরও তো পুরো ভ্যালেনিয়াতে থার্ড র্যাংক করেছিল।”
আরিজ মাহতাবির অবাক গলায় বললেন, “সেন্ট মেরিজ উইমেন্স কলেজ অ্যান্ড ইউনিভার্সিটির কথা বলছো?”
“আ-হ্যাঁ।”
“তুমি কি ইনডিরেক্টলি আলতাকে ওখানে ভর্তি করাতে চাইছো?”
রঞ্জক সঙ্গে সঙ্গে হাত নেড়ে ডিফেন্সিভ ভঙ্গিতে বলে উঠল, “আমি কোথায় চাইলাম? জাস্ট সাজেস্ট করলাম।”
“সাজেশনটা খারাপ নয়। কিন্তু ফার্স্ট র্যাংকিয়ের কলেজ রেখে ওখানে ভর্তি করানোর কোনো শক্তপোক্ত কারণ তো দেখছি না। তাছাড়াও আমি ফারিশের সঙ্গে এই প্রসঙ্গে টুকটাক কথা বলে ফেলেছি।”
“মানে? ওর সাথে কেন?”
“কেনো নয়? ও আর তাঁরা যেখানে পড়াশোনা করছে আলতাও যদি সেখানেই ভর্তি হয় তাহলে ওর যাতায়াতের বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। প্রথম প্রথম ফারিশ আর তাঁরার সাথেই যেতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা, পড়াশোনা ও রেজাল্টের দিক থেকে গ্রিনল্যান্ড সবসময় নম্বর ওয়ান র্যাংক ধরে রাখে।”
রঞ্জক থমকে গেল। আরিজ মাহতাবির ছেলের মুখভঙ্গি পরখ করে বললেন, “তুমি যেখানে সাজেস্ট করেছো, সেখানে ভর্তি করানোই যায়। কিন্তু তার জন্য তোমাকেই ওকে নিয়ে গিয়ে এডমিশন প্রসেস কমপ্লিট করে আসতে হবে। অবশ্যই গার্ডিয়ানের নামের জায়গায় নিজের নাম লিখতে হবে। সেই সঙ্গে ও প্রতিদিন কীভাবে যাবে-আসবে, সেটাও তোমাকেই দেখতে হবে…”
“আমি পারব না! তোমার যা ইচ্ছা তা-ই করো।”
কথাটা ছুড়ে দিয়েই রঞ্জক আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। হনহনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
চলবে…
Share On:
TAGS: কালারব্লাইন্ড, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪০
-
কালারব্লাইন্ড গল্পের লিংক
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭৫
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৭(ক+খ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৪