Golpo romantic golpo আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন

আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১৯


#আলতোছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন_(১৯)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
পরদিন….
বেলা এগারোটা বাজে। রাশেদরা খেয়েই বেরিয়ে গেছেন। মেহমানদের খাওয়া-দাওয়া আর বিদায় দেয়ার ব্যস্ততার দরুন,বাড়ির লোক অভুক্ত এখনো। এই সবে মাত্র হুটোপুটি করে সবাইকে খাবার বেড়ে দিলেন মায়েরা। আমজাদ-আফতাব আজ অফিসে যাননি। আজমলও ছুটিতে এসেছেন। কাল রবিবার,কাল থেকেই আবার কোর্টে যাতায়াত শুরু করবেন আনিস। শিকদার বাড়িতে এত দেরি করে নাস্তা কেউ করে না। কিন্তু, আজ রাশেদদের ব্যাপারটাতেই সব একটু হযবরল লেগে গেল। বিশাল,লম্বা খাবার টেবিল জুড়ে আপাতত সব বাড়ির লোক বসেছে। কেবল মাত্র পিউ নিচে এখনো আসেনি। অন্যসময় আগে আগে আসে,চেয়ার একটায় বসে আরেকটা ঝেরেঝুড়ে ঠিক করে রাখে। আজ কী হলো কে জানে!
মিনা খুব জোরে জোরে বারকয়েক ডাকলেও,ওর সাড়া পাওয়া গেল না। এর বদলে তন্দ্রাচ্ছন্ন শ্যামলা চেহারায় খুব বিরক্তি নিয়ে ধূসরকে নামতে দেখা গেল। তার ডার্বি শুয়ের শব্দে চোখ তুলে চাইতেই,ওখানেই যেন এক পল থামলেন সকলে।
আগষ্ট মাস,মাঝেমধ্যে বৃষ্টি ছুটলেও এমনিতে গরম ভীষণ! সেখানে আজ তো বৃষ্টিও নেই। অথচ
এই এমন সময়ে গায়ে একটা টার্টেলনেক সোয়েটার পরে আসছে সে। ঘাড় অবধি ঢাকা। আটোশাঁটো হওয়ায় শরীরের বলিষ্ঠতা স্পষ্ট। চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে, অজ্ঞাত কারণে কারো ওপর যেন বেজায় চটে আছে ছেলেটা। প্রত্যেকে গোলাকার চোখদুটো নেড়ে নড়ে দেখলেন ওকে। এরপর একে অন্যের মুখের দিকেও চাইলেন কয়েকবার। ধূসর কোনো কিছু পাত্তা না দিয়ে চুপচাপ চেয়ার টেনে বসল। উপুড় হয়ে থাকা প্লেট নিজেই সোজা করল। কিন্তু মিনিট দুয়েকেও যখন থালায় কিছু পড়ল না,শান্ত নজর তুলে চাইল। অমনি বিব্রত হয়ে পড়ল ধূসর। রুবায়দা ফ্যালফ্যাল করে চেয়েছিলেন। দৃষ্টি জুড়ে প্রশ্ন। ধূসর বাকিদের দেখল এরপর। সকলেই তাই। ও কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“ কী হয়েছে? সবাই এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”
আমজাদ এ যাত্রায় চোখ সরিয়ে দুপাশে মাথা নাড়লেন। হতাশ গলায় বিড়বিড় করলেন,
“ ছাগলের সাথে মিশে পাগল হয়ে যাচ্ছে!”
মিনা ত্রস্ত এসে ধূসরের কপালে হাত রাখলেন। ভারি উদ্বীগ্ন মুখে বললেন,
“ জ্বরও তো নেই।”
ধূসর বুঝতে না পেরে বলল,
“ জ্বর হবে কেন?”
রুবায়দা বললেন,
“ ধূসর, তুই এই গরমে এমন গলা ঢাকা সোয়েটার পড়েছিস কেন বাবা?”
বলতে বলতে হাই নেকের কাপড়টায় হাত দিতে গেলেন,তৎপর মায়ের কব্জি চেপে ধরে থামাল ধূসর।
থেমে থেমে বলল,
“ ঠান্ডা লাগছে,তাই পরেছি। ধরো না!”
“ ঠান্ডা লাগছে ভাইয়া? এসিটা কমাব তাহলে!”
“ না। তোর অফিস কখন থেকে?”
সাদিফ বুক ফুলিয়ে জানাল,
“ পরশু থেকে। আম সো এক্সাইটেড জানো!”
আফতাব এবার মুখ খুললেন,
“ সাদিফ,কী ভদ্র একটা ছেলে। আহা এমন ছেলে যদি সবার হতো!”
রুবায়দা-মিনা একে অন্যের দিকে দেখলেন ফের। আজমল বললেন,
“ সবার মানে,সাদিফ কি তোমার ছেলে না? তোমার সাথেই তো ওর স্বভাবে বেশি মিলে যায় ভাইজান। নিয়ে নাও ওটাকে।”
জবা খুব উচ্ছ্বল স্বরে বললেন,
“ ধূসর তো আমাদেরই ছেলে। ও তাহলে আমাদেরই থাকুক।”
আফতাব পানসে মুখে মাথা নাড়লেন। এক পল দেখলেন ছেলেকে। নাহ,যাকে তিনি খোঁচা মেরেছিলেন,তার গায়ে টায়ে লাগেনি। এর মাঝে সুমনা আনত হয়ে দাঁড়ালেন আমজাদের পাশে। আজ জায়েদের সাথে মিলে খাবার বাড়ছেন তিনিও। শুধালেন,
“ আর কিছু দেব ভাইজান?”
আমজাদ পাশ ফিরে চাইলেন। হঠাৎই বললেন,
“ সুমনা,তুমি বিয়ের আগে একটা চাকরি করতে না?”
ভদ্রমহিলা বিভ্রান্ত হন আচমকা প্রশ্নে। মাথা নাড়লেন তাও,
“ জি।”
“ ছেড়ে দিয়েছ?”
“ হ্যাঁ মানে.. “
“ ছাড়লে কেন, আর করবে না?”
সুমনা অবাক হয়ে বললেন,
“ করতে পারব?”
“ কেন পারবে না? কী রে আনিস,তুই কিছু বলিসনি?”
আনিস খানিক থতমত খেলেন। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবেননি। বললেন,
“ আমি তো ভাবলাম ও ওর ইচ্ছেতে ছেড়েছে।”
সুমনা নতজানু হয়ে জানালেন,
“ আসলে বাড়ির সবাই বলছিল,বিয়ের পরে চাকরি-বাকরি ভালো দেখাবে না। তাই আমি…”
মিনা কথা কেড়ে নিলেন,
“ ভালো দেখাবে না? কে বলে এসব! এইত জবা,ওউ তো চাকরি করতো। রাদিফের সময় ছেড়ে দিয়েছে। রুবা আমি নাহয় ঘরে থাকা মানুষ। কিন্তু তোরা আজকালকার ছেলেমেয়ে, তোরা আবার এসব ভাবিস কবে থেকে!”
আমজাদ বললেন,
“ তুমি ক্যারিয়ারে ফোকাস করতে চাইলে আমাদের সম্পূর্ণ সাপোর্ট পাবে, বোন। এসব নিয়ে এবাড়িতে কারো কোনো অসুবিধে নেই।”
আনন্দে সুমনার চোখে জল ছুটে এলো। হেসে হেসে মাথা কাত করে স্বামীর দিকে চাইলেন। আনিসের ওষ্ঠপুটে রাজ্যজয়ী হাসি। তার পরিবার যে এমন তা তিনি জানেন। এখন স্ত্রীও জানুক!
সাদিফ হাতঘড়ি দেখতে দেখতে খাচ্ছে। পাকাপোক্ত অফিস পরশু শুরু হলেও,রোজই তো গিয়ে মুখ দেখাতে হয়। অমন ব্যস্ত স্বরে বলল,
“ ছোটো মা, তরকারিটা একটু পাস করুন তো!”
সুমনা বললেন,
“ সাদিফ, আপাদের সবাইকে তুমি করে ডেকে আমাকে কেন আপনি আপনি করো তোমরা? তুমি,ধূসর দুজনেই তো!”
“ আপনিও তো আমাদের তুমি করে বলেন। আপনার আপা-রা তো তুমি ডাকে না।”
পুষ্প স্বায় মেলাল,
“ ঠিক তাই। তুমি আমাকে আর পিউকেও তুমি করে বলো ছোটো মা!”
আমজাদের যেন পিউয়ের কথা মনে পড়ল। ফের ঘাড় ঘুরিয়ে ওপর তলায় দেখলেন। মেয়েটা এখনো নামল না যে!
মিনা বললেন,
“ সবাই তো ছেলেমেয়ের মতোই। তুই করে বলবি।”
“ আসলেই বলব? ধূসরকে তুই বললে আপত্তি নেই?”
ধূসর ছোটোখাটো শব্দে জানাল,“ আপত্তি থাকবে কেন? বলবেন,যা ইচ্ছে।”
সুমনা হাসলেন। তার এত বছরের জীবনে এত ভালো লাগার ব্যাপার এক সাথে কোনোদিন ঘটেনি। এই সুখ কপালে কি আসলেই আছে? নাকি সব স্বপ্ন!
ঘোর কাটল মিনার উচ্চস্বরে। চ্যাঁচালেন,
“ পিউ তুই কি নামবি? না আমি খুন্তি নিয়ে আসব!”
পিউ মাকে ভীষণ ভয় পায়। এরপরপরই নামল মেয়েটা। আজ একদম চুল বেঁধে, সুন্দর একটা সাদা চুরিদার পরে হাত-মুখ ধুয়ে এসেছে। পিঁপড়ের গতিতে এসে বসেছে ফাঁকা কেদারায়। মাথা নত! মুখটা কালো ততোধিক। রুবায়দা লক্ষ্য করে বললেন,
“ কী হয়েছে, পিউ? রাতে ঘুমোসনি ঠিক করে,উঠতে দেরি হলো যে!”
পিউ আস্তে করে জানাল,
“ এমনি মেজো মা।”
মিনা বললেন,
“ মেয়েটাকে কেমন যেন লাগছে না রে,রুবা?”
মাথা নাড়লেন তিনি। মিনা ঘুরে গিয়ে মেয়ের পাশে দাঁড়ালেন। পিঠে হাত রাখতেই ব্যথায় মুচড়ে উঠল পিউ। মিনা চমকে বললেন,
“ ওমা,কী হলো?”
মেয়েটা আবার নতজানু হয়ে বসল। মিনমিন করে বলল,
“ এমনি,একটু গায়ে ব্যথা করছে,আম্মু।”
ধূসরের খাওয়া এ-যাত্রায় থামল। ফর্ক ঠোঁটের সামনে এসে এক সেকেন্ড থেমেও,তড়িৎ আবার মুখে পুরলো খাবার। আমজাদ বললেন,
“ গায়ে ব্যথা কেন? কোথাও পড়ে গিয়েছিলে?”
পিউ ঘাড় নাড়ল।
“ কোথায় পড়লি আবার?”
পিউ অকূল পাথারে পড়ে যাচ্ছে। কী বলবে মাকে? কাল এক দানবের তলায় ও চাপা পড়ে গেছিল,ওসব মুখেও আনতে পারবে না! মাথায় লেগেছে,কনুইয়ে লেগেছে। কী যে ব্যথা পেয়েছে কাল। মেয়েটা ঠোঁট উলটে পাউরুটিতে কামড় দিলো। এক পল আড়চোখে দেখল ধূসরকে। এতক্ষণে তাকাল আর,হোচট খেল অমনি। গায়ে কালো সোয়েটার পরে বসে আছে। ওমা,এই টাক পোরানো রোদের বেলায় উনি এরকম সোয়েটার পরেছেন কেন,
পাগল নাকি!


“ আরে বাবা,ও চলে গেছে, ইকবাল! এবার তো থামো।”
ইকবাল যেন ফুঁসে উঠল আরো।
“ তুমি ও কাকে বলছো মাই লাভ? ওই ঝাকড়া চুলওয়ালা এখন তোমার ও হয়ে গেল!”
“ আজব তো। শুভ আমার ব্যাচমেট,তাইই বললাম।”
“ তাই হোক আর যাই হোক,তুমি একমাত্র আমাকে ও বলবে। আর কাউকে না!”
হার মানল পুষ্প।
“ উফ,আচ্ছা বাবা।”
“ তোমার বাবা হবে হিটলার। আমাকে শুধু জান ডাকবে।”
“ ধুর!”
“ মাই লাভ,ছেলেটা চলে গেছে তো, সত্যি?”
“ হ্যাঁ। সেতো কাল রাতেই খেয়ে বেরিয়ে গেল। তুমি যাবার পরপরই।”
“ কিন্তু আমি যে শুনলাম কটা দিন থাকবে।”
“ চেয়েছিল। পরে ওর,না ওনার বন্ধুরা কোনো প্ল্যান করে ফোন করল,তাই চলে গেল।”
ইকবাল আনন্দ শ্বাস ফেলল,
“ যাক বাবা, বাঁচলাম।”
পুষ্প বলল,
“ সব সময় এমন করো, যেন আমি তোমার সাথে চিট করছি। বাসায় মেহমান এলে কেউ হেসে কথা বলে না নাকি?”
“ বলে। কিন্তু সবাই তো ইকবালের মাই লাভ নয়। তুমি যখন ওর হাত ধরে ঝাকাঝাকি করছিলে, আমার বুকটা কয়বার মোচড় দিয়েছে জানো?”
“ আচ্ছা। বুঝেছি। এবার রাখি?”
“ রাখি মানে,এই তো ফোন করলাম। মাত্র ২৪ মিনিট কথা হচ্ছে। এর মধ্যে কল কাটবে কেন?”
“ আব্বু আজ বাড়িতে আছে।”
“ তো? আমি কি ওনাকে ভয় পাই? ইকবাল পাঠান কারো বাপ তো দূর,নিজের বাপকেও ভয় পায় না…..”
কথায় দাঁড়ি পড়তেই কেউ একজন অফিস রুমের দরজা ঠেলল। মানুষটা ধূসর! তুরন্ত ফোনের লাইন কেটে দিলো ইকবাল। তাড়াহুড়োয় ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেল নিচে। তুলতে গিয়ে ইকবালের কপাল টেবিলের কোণায় ঠুকে গেল। ব্যথায় চোখ খিচে বিড়বিড় করল,
“ দোসরের বাচ্চা,বোনের সাথে মোটে প্রেমই করতে দেয় না। হতচ্ছাড়া একটা!”
এর মধ্যে ভেতরে এলো ধূসর। দরজা চাপাল। গায়ের সোয়েটার এক টানে খুলে ছুড়ে মারল দূরে। ভেতরে একটা পাতলা টিশার্ট ছিল আগেই। কিন্তু ঘামে ভিজে শেষ। শ্যামলা মুখটাও কাচের মতো চকচক করছে। কক্ষের এক সিটের সোফায় শরীর ছেড়ে বসল সে। সামনের টি টেবিলটা পা দিয়ে টেনে কাছে আনল। তার পর ওটাতে দুই পা তুলে বসে, পেছনে মাথা নামিয়ে চোখ বুজল সে। ইকবাল আশ্চর্য হয়ে এই দৃশ্য দেখছিল এতক্ষণ। এবার চিন্তা হলো। উঠে,ছুটে এসে পাশে বসে বলল,
“ কী হয়েএএএএএ…”
পুরোটা বলতে বলতেই চোখ গিয়ে পড়ল ধূসর ঘাড়ে। অমনি কথা আটকে গেল ওর। ঠিক জ লাইনের দুই ইঞ্চি নিচে একটা বড়োসড়ো নখের দাগ। বন্ধুর সাড়াশব্দ না পেয়ে পাশ ফিরল ধূসর। ইকবাল ড্যাবড্যাব করে চেয়ে ওই আঁচড় টাকে দেখছে। ও মূহুর্তে শাসাল,
“ উল্টোপাল্টা কিছু মাথায় আনবি না। পিউ কাল আমার ঘরে ঢুকেছিল। ওকে ধরতে গিয়ে এসব হয়েছে।”
আকাশ থেকে পড়ল ছেলেটা,
“ এটা পিউপিউয়ের নখের দাগ?”
“ হু।”
সহসা মিটিমিটি হাসল ইকবাল। ধূসর তর্জন ছুড়ল গভীর স্বরে,
“ ইকবাল! হাসবি না। তোর এই হাসি দেখলেই আমার মেজাজ খারাপ হয়।”
“ আমি কী করলাম?”
পরপর আরেকটু নড়েচড়ে এগিয়ে বসল ইকবাল। জিজ্ঞেস করল,
“ আচ্ছা, কীভাবে কী হলো? অমন অবলা মেয়েটা তোকে এভাবে খামচাল কেন ভাই! তুই কি কন্ট্রোললেস হয়ে…”
“ ইকবাল!”,
ধূসর নাক ফুলিয়ে বলল,
“ বললাম তো,ওকে ধরতে গিয়ে হয়েছে। পড়ে যাচ্ছিল…”
“ কোথায়?”
“ বিছানায়।”
ইকবাল চোখ মারবেল করে বলল,
“ বিছানায়? ইইইইইই!
এত্ত তাড়াতাড়িইইইইই তোরা বিছানায় চলে গেলি কীভাবে!”
ধূসর হুঙ্কার ছুড়ল মৃদূ স্বরে,
“ ইকবাল!”
“ আচ্ছা,পাশাপাশি পড়েছিস,নাকি….”
দুইহাত ওপর নিচ করে কত কী ইশারায় দেখাল ছেলেটা। ধূসর দাঁত খিচে বলল,
“ চড়িয়ে গাল লাল করে দেব। যা,ওঠ এখান থেকে।”
ইকবাল বাধ্যের ন্যায় উঠে দাঁড়াল। হেসে হেসে বলল,
“ আচ্ছা আচ্ছা পানি খা,রাগ করিস না।”
নিজেই গ্লাসে পানি ঢেলে এগিয়ে দিলো ও। ধূসর চুমুক দিতে যাবে অমনি কানে এলো ওর গুণগুণে গান,
“ ঘটনা এমনি ঘটে না।
ও বন্ধুরে…
এক হাতে তালি বাজে না।”
ধূসর চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ বেশি বেশি হচ্ছে না?”
“ আচ্ছা আচ্ছা, কম কম করার চেষ্টা করছি। এখন বল তো সব কি ঠিকঠাক আছে?”
“ থাকবে না কেন?”
“ মানে, পিউ কি বেঁচে আছে? আর খাট ঠিক আছে?এর মানে তুমি ঘাড়ের দাগ ঢাকতে সোয়েটার পরেছ বন্ধু?”
“ তো কী করব!
সবার সামনে বের করে হাঁটব?
ইকবাল নিচের ঠোঁট দাঁতে কামড়ে হাসল। ফোন তুলে বলল,
“ আচ্ছা, আমি কটা হাই নেক টিশার্ট অর্ডার করে দিচ্ছি। দাগ যেতে কটাদিন সময় লাগবে। ততদিন এগুলো পরে ঘুরিস।”
ধূসর পানি খেলো। গ্লাস রাখল সরিয়ে। তবে নিঃশ্বাস নেয়ার মাঝেই ইকবাল মাথা নাঁচিয়ে নাঁচিয়ে বলল,
“ বন্ধু…..
দেখে মনে হচ্ছে ধারালো ক্ষত। আসল বার সাবধানে।”
“ ইকবাল…! বলে এক গর্জন দিয়ে পায়ের জুতো খুলে ছুড়ে মারল ধূসর। ইকবাল সরে যাওয়ায় দেওয়ালের ওপাশে গিয়ে পড়ল ওটা। ছেলেটা বড়ো আফসোস করে বলল,
“ আহ, খামচি খেয়ে জুতোও ফেলে দিলি? র‍্যাবিসে ধরেছে নাকি! এখানে তো আর পিউ নেই যে কুড়িয়ে এনে পায়ে পরিয়ে দেবে।”
ধূসর নিজেই তেড়ে এলো এবার। ইকবাল বাঁচাতে বাচ্চাদের মতো ছুটল অমনি। বাইরে গিয়ে জোরে জোরে চ্যাঁচাল,
“ কে আছো বাঁচাও। ধূসর আমার ইয়ে নিয়ে নিলো……. মানে জান নিয়ে নিলো।”
ধূসর থামল চৌকাঠে। এত বিরক্তির মাঝেও ইকবালের কান্ডকারখানায় হেসে ফেলল একটু। পরপর কপালের শক্ত পাটায় অনেকগুলো ভাঁজ ভেসে উঠল। চটপট
ফোন বের করে স্ক্রিনে একবার দেখল নিজের ঘাড়টায়। চ সূচক শব্দ করল ধূসর।
এই দাগ এখন কবে মিটবে কে জানে!


আগষ্ট পেরিয়ে অক্টোবরের শেষ দিক তখন। পিউয়ের কলেজ শুরু হয়ে গিয়েছে। পুষ্পর এইচ এসসির টেস্ট পরীক্ষাও নভেম্বর থেকে আড়ম্ভ হওয়ার পথে। আগামী এপ্রিল মাস থেকে ওর এইচ এস-সি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। ক্লাসের হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় হলেও, দু বোনের মাঝে বয়সের তফাত মোটে আড়াই বছরের মতো। মানারাতে স্কুল+কলেজ হওয়ায় পিউকে আর অন্য কোথাও শিফট হতে হয়নি। ওখানেই পড়ছে এখনো। সেই একই গেইট,একই দেওয়াল আর একই বন্ধুরা। তানহাও আছে সেখানে। পরীক্ষার ফল হিসেবে অল্পের জন্যে মেয়েটা এপ্লাস ছুঁতে পারেনি।
সব কিছু আগের মতোই আছে এখনো। শুধু গল্পের শুরুতে ১৫ বছরের কিশোরী পিউ, এখন ১৬ পেরিয়ে ১৭ গণ্ডি ছোঁয়ার দিকে। সেই সাথে দিন যত যায়,ধূসরের প্রতি অনুভূতির অতলে আরো তলিয়ে যায় সে। পিউ যতটা ডুবছে তার প্রতি,ধূসরের প্রহেলিকা হওয়ার মাত্রা তত সীমা ছুঁচ্ছে যেন! কী করবে,কী বলবে,কী চাইছে কিছুই বোঝা যায় না। পিউ তাকে দেখে না নিজের দিকে একটু ঠিক করে তাকাতে। হাসেও না একটু! কথা বলে না,ও নিজে গিয়ে কথা না বললে। একটা মানুষ এত পাষণ্ড আর শক্ত কীভাবে হয়? পিউয়ের মোলায়েম হৃদয় বুঝেই পায় না ওসব। অথচ দিন কে দিন ইনবক্সে প্রেমের প্রস্তাব বাড়ছে ওর। ক্লাসেই তো কতগুলো ছেলে ওর পেছনে লাইন ধরে আছে। আর ইদানীং উৎপত্তি হয়েছে এক নতুন সমস্যার; সাদিফের বন্ধু বাঁধন। পিউ খেয়াল করেছে প্রায়শই তাকে কলেজের সামনে দেখা যায়। প্রথম প্রথম পিউ ওভাবে নেয়নি ব্যাপারটা। কিন্তু দুদিন আগে ওর কোচিং সেন্টারের ওখানেও দেখল তাকে। মাঝেমধ্যে সাদিফের সঙ্গে বাড়িতেও আসছে। একটা মেয়ে যতই হোক,কোনো ছেলের দৃষ্টি বুঝবে না?
কিন্তু পিউ এ কথা কাউকে বলেনি। পুষ্পকেও না। বাঁধন সরাসরি কিছু চার্জ করেনি ওকে। করুক,তারপর না-হয়!
আজ ২৮ তারিখ। নভেম্বর মানেই শীতের প্রবেশদ্বার। অথচ বাতাসে থেকে তপ্ত ভাব যায়নি। চারদিকে কাঠফাঁটা রোদ্দুর এখনো।
ধূসর আজ মিরপুরে এসেছে। সাথে আরিফ ছিল। নিউইয়র্কে ওর দুজন ক্লাসমেটের মধ্যে একজন বাংলাদেশী। গত সপ্তাহে দেশে এসেছে ছেলেটা। দেখা করতে চাইছিল খুব। ধূসর সকাল থেকে সেখানে থেকে এই মাত্র ওকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে গুলশানের দিকে রওনা করল। তবে অতিরিক্ত জ্যামের কারণে গাড়ি ঘুরিয়ে যেতে হবে। যখন ১৪-র দিকে ইউটার্ন নিলো,রাস্তার অবস্থা দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখ পড়ল চেনা এক মুখে। দুইপাশে পনিটেইল করা লম্বা চুল, পরনে কলেজ ইউনিফর্ম, ঘর্মাক্ত চেহারা,চোখেমুখে ভয়, পিঠব্যাগটা এক পাশের কাঁধে ঝুলছে। তার চেয়েও শতগুণ বেশি অস্থিরতা নিয়ে এদিক-সেদিক দেখছিল মেয়েটা। ধূসর কপাল কুঁচকে আরো স্পষ্ট চোখে চাইল। ভালো করে বোঝার চেষ্টা করল ওটা সেই কিনা যাকে ও ভাবছে।
নিশ্চিত হতেই চট করে গাড়িতে ব্রেক কষল অমনি । আরিফ বলল- কী হইল ভাই!”
ধূসর সীটবেল্ট খুলতে খুলতে বলল,
“ সামনে একটা পার্কিং আছে। গাড়িটা ওখানে নিয়ে যাও, আমি আসছি।”
আরিফ মাথা দোলায়। ধূসর খুব দ্রুত বেরিয়ে গেলে,ড্রাইভিং-এ বসল সে।
পিউ নাক টানছিল। ডাগর ডাগর চোখ জলে টলমল করছে। এই যেন উপচে পড়বে গালে।
এর মাঝেই পেছন হতে খুব গম্ভীর স্বর ভেসে এলো,
“ পিউ!”
চকিতে ফিরল মেয়েটা। তার চেয়েও চমকাল অপ্রত্যাশিত জায়গায় ওর কাঙ্খিত ধূসর ভাইকে দেখে। অমনি যেন চাপা কান্না বাঁধ ভেঙে দিলো। হুহু কান্নায় হড়বড় করে বলল,
“ ধূসর ভাই, আমি-আমি হারিয়ে গেছি। হারিয়ে গেছি আমি। ”
ওর কান্নায় আশপাশ থেকে লোকজন ফিরে ফিরে তাকাল। দু পা ফেলে এগিয়ে এসে দাঁড়াল ধূসর। একবার দেখল চারিপাশ। আশেপাশে কাপড়ের ভ্যান, খাবারের ভ্যান দিয়ে ভরতি। ঠিক মিরপুর আইডিয়াল কলেজের সামনে হওয়ায় লোকজন গিজগিজ করছে।
তারপর নজর সরিয়ে পিউয়ের দিকে ফিরল সে। অমনি মাথা নত করল মেয়েটা। আশেপাশে লোকজন উৎসুক হয়ে তাকাচ্ছে এখনো। অগত্যা ধূসর ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল কোথাও। প্রত্যাশার বাইরের এই স্পর্শে পিউ অবাক হলো একটু। চোখদুটোতে বিস্ময় নিয়ে দেখল নিজের হাত। ধূসরের পা থামতেই আবার চিবুক নুইয়ে নিলো সে। কানে এলো সেই নিম্নভার স্বর,
“ তোর কলেজ এখানে?”
পিউ ঘাবড়ে গেল। ধূসরের প্রশ্নই ত্যারা ত্যারা!
দুপাশে ঘাড় নাড়ল মেয়েটা। ফের গম্ভীর প্রশ্ন এলো,
“ তাহলে এখানে কী কাজ?”
পিউ ভেজা গলায় জানাল,
“ ম-মেট্রোরেল দেখতে এসেছিলাম।”
“ কার সাথে?”
“ বন্ধুদের সাথে!”
ধূসরের চোয়াল শক্ত হলো। তার চেয়েও পাথুরে স্বরে বলল,
“ বাড়িতে জানে?”
পিউ ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ল। মুখ তুলছেই না। ধূসর চোখ বুজে শ্বাস ফেলে বলল,
“ বাকিরা কোথায়?”
পিউ এবার ফুঁপিয়ে উঠল একটু। বলল,
“ জানি না। লেন ধরেই হাঁটছিলাম। ওরা বলল কী কী যেন কিনবে। সবাই তো একসাথে ছিলাম। তারপর দেখি ওরা দুজন নেই। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি কাউকে পাচ্ছিও না। আমি তো কিছু চিনিও না এখানে।”
অসহায় মুখে কেঁদে উঠল ষোড়শী। হেচকি তুলল,নাক ডলল হাত তুলে। ধূসর কিছুক্ষণ ক্লান্ত চোখে দেখল সেই কান্না। পাশ কাটিয়ে মাথায় পানির বোতল বোঝাই করা এক হকার যাচ্ছিলেন তখনই। থামাল সে৷ পানি কিনলো। ঠান্ডা পানির বোতলটা পিউয়ের দিকে এগিয়ে দিতেই কিছু তাজ্জব হয়ে চাইল মেয়েটা। কিন্তু মাথা নাড়ল দুদিকে। বোঝাল,খাবে না।
ধূসর তাগিদ দিলো স্থুল স্বরে,
“ ধর।”
গুটিয়ে রাখা হাতটা তুলে বাড়াল পিউ। বোতল ধরল। পরপরই চট করে চুমুক দিয়ে প্রায় অর্ধেকটা খেয়ে ফেলল ও। হেচকি তুলতে তুলতেই কাচুমাচু চোখে যখন ধূসরের দিকে চাইল আবার, মানুষটা ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ বয়স কত তোর? কলেজে পড়ছিস,সামান্য হারিয়ে যাওয়ায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলি!
ওদেরকে ফোন করা যেতো না?”
পিউ ঠোঁট টিপে দৃষ্টি পায়ের পাতায় ফেলল। মিনমিন করে বলল,
“ আমি সেজন্যে কাঁদছি না!”
ধূসর প্রশ্নবিদ্ধ চোখ মেলে চেয়ে রইল। পিউ দোনামনা করল বলতে। মুখ খুলতে চাইছিল না যেন। কিন্তু উপায়ও নেই। তাই বাধ্য হয়ে বলল,
“ আমার, আমার গলার চেইনটা চুরি হয়ে গেছে।”
ধূসর কপাল টানটান করে বলল
“ চেইন চুরি হয় কীভাবে?”
“ সেটাই বুঝতে পারছি না। গলায়ই পরেছিলাম। হাঁটছিলাম ওদের সাথে। হঠাৎ হাত দিয়ে দেখি গলা খালি। একজনকে সন্দেহ লাগছিল। ওর পিছু নিতে গিয়ে তানহাদের থেকে আলাদা হয়ে যাই। আজ ফোনটাও সাথে আনিনি,জানতেও পারছিলাম না ওরা কোথায়!”
পিউ আবার চোখ ডলে মুছল। অশ্রুজল আটকানোর কী আপ্রাণ চেষ্টা! ধূসর জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“ এতে কাঁদার কী আছে? আবার কিনে দেয়া যাবে।”
“ কিন্তু ওটা যে আর আসবে না!”
ভেজা কণ্ঠে বলে,পিউ ফুঁপিয়ে উঠল আবারো। ধূসর কিছু বিরক্ত হয়ে বলল,
“ ওটাতে কী এমন স্পেইশাল?”
মেয়েটা ঢোক গিলে নিজেকে সামলে জবাব দেয়,
“ ওটা মেজো চাচ্চুর দেয়া।”
ধূসরের কপাল ছড়িয়ে বসল। টানটান হলো তীক্ষ্ণ চোয়াল।
পিউ নিজেই বলল,
“ আমার জন্মদিনে চাচ্চু নিজের হাতে আমাকে চেইনটা পরিয়ে দিয়েছিলেন। আপনার বাবার দেয়া এত ভালোবাসার উপহারটা এইভাবে হারিয়ে গেল! আমি এখন কোথায় পাব ওটা?”
মৃগনয়ন মেয়েটার জলে ডুবে যাচ্ছে। কার্নিশ গড়িয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে গাল। নাকের ডগা লাল হয়ে ফেঁপে উঠছে একটু। তিরতির করছে সুদৃশ্য ঠোঁট। পর্বতের মতো অটল শরীর নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে সেই কান্না ধূসর চেয়ে চেয়ে দেখল। কিছু বলল না,সান্ত্বনাও দিলো না। হঠাৎ শুধু ফোন বের করে কল দিলো আরিফকে। বলল,
“ গাড়ি কলেজের সামনে নিয়ে এসো।”
“ আচ্ছা ভাই।”
নীল গাড়িটা পাশে এসে ভিড়তেই পেছনের দোর টেনে খুলল ধূসর। পিউকে বলল,
“ ওঠ।”
“ আমার চেইনটা তো…”
“ উঠতে বলেছি ওঠ।”
মেঘমন্দ্র আওয়াজ শুনে পিউয়ের মন আরো বিষণ্ণ হয়ে গেল। ধূসর ভাই এমন কেন? শুধু কি ধমকাতেই পারে! দেখছে ও কাঁদছে; মন খারাপ। দুটো ভালো কথা বলার বদলে কেমন খ্যাকখ্যাক করছে দেখো।
অগত্যা ঠোঁট -মুখ ফুলিয়ে উঠে বসল পিউ। ধূসর বসল ড্রাইভিং-এ। আরিফ পাশে ওর। ছেলেটা বার কয়েক ঘাড় ঘুরিয়ে পিউকে ফিরে ফিরে দেখল। আহা,বাচ্চা মেয়েটা কাঁদছে কেন?
তার এই ঘুরে তাকানো ধূসর হয়ত ভালো ভাবে নিলো না। খুব আস্তে তবে গুরুগম্ভীর স্বরে বলল,
“ আরিফ,রাস্তা এদিকে!”
সহসা মেরুদণ্ড সিটের সাথে শক্ত করে লাগিয়ে, সামনে ফিরে বসল আরিফ। আর তাকালোই না। এদিকে পিউয়ের চোখের জল বাধ মানছে না। মেজো চাচ্চু ওকে এর আগে কত কী কিনে দিয়েছেন! কিন্তু সেসময় পিউ শুধু তাকে চাচ্চুই মানতো। ধূসর ভাইয়ের বাবা তো মানেনি। এখনকার অনুভূতি অনেক আলাদা! কিন্তু লাভ কী হলো? ও যে সেটার মূল্যই দিতে পারল না। ও কেমন বউমা হবে তাহলে? ইস…
ততক্ষণে ধূসর হিঁসহিঁস করে গাড়ি টেনে নিয়ে থামাল বিশাল এক শপিংমলের উঁচু ভবনের সামনে। ব্রেক কষার তোড় নিয়ে পিউ প্রস্তুত ছিল না। শীর্ণ শরীর নিয়ে কাত হয়ে সিটে পড়ে গেল। আরিফ বলল,
“ আরে আরে,লেগেছে?”
পিউ খুব লজ্জা পেলো। ইউনিফর্মের কামিজ ঠিকঠাক করতে করতে মাথা নাড়ল দুদিকে। পরপর তাকাল বাইরে। জ্বলজ্বল করছে শপিংসেন্টারের বিলবোর্ডের লেখা। ও বিভ্রম নিয়ে চোখের পাতা ফেলল। ওদিক থেকে ধূসর নেমে গেছে। আরিফও নামল। দরজাটা খুলে দিলো পিউয়ের। পিউ নামল আস্তেধীরে। এক পল আরিফের মুখের দিকে চাইল। সে চোখের ইশারায় বোঝাল, ধূসরের পিছু নিতে।
ততক্ষণে লেভেল ওয়ানের এস্কেলেটরে পা রেখেছে মানুষটা। ওপরে উঠতে উঠতে এক পল ফিরে চেয়ে দেখল পিউ আসছে কিনা। আরিফ গাড়ির কাছে রইলেও,পিউ এস্কেলেটরের নিচের ধাপে এসে দাঁড়িয়েছে কেবল। আশপাশ দেখছে। চোখেমুখে কৌতূহল খুব। ও তাকাতেই আরো উদগ্রীব হয়ে শুধাল,
“ আমরা কোথায় এসেছি,ধূসর ভাই?”
ধূসর এক কথায় জানাল,
“ তোর চেইন কিনতে!”
চলবে..? See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply