#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা
[পর্ব ৮৬]
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
(
দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)
(
কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
“ইলহাম আপু প্রেগন্যান্ট হয়ে গেল।এখন আমিও প্রেগন্যান্ট হতে চাই। আসুন।”
তিতলির কথায় আকাশ থেকে জমিনে আছাড় খেয়ে পড়ল বলে মনে হলো ঈশানের। খুক খুক করে কেশে উঠলো ছেলেটা। তার কাশি থামছেই না। তিতলি ব্যস্ত হাতে সেন্টার টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাস নিয়ে এসে এগিয়ে দিলো। ঈশান পানিটুকু খেয়ে নিজেকে ধাতস্থ করল। তেরছা চোখে তাকায় মেয়েটার দিকে।
তিতলি ঠোঁট ফুলিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ঈশান গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
“তোমার মতো বেলাজা মেয়ে তো আমি জিন্দেগিতে দেখিনি।”
“তো দেখে নিন।”
পাল্টা জবাবে এমন কথা শুনে তব্দা খেলো ঈশান। চোখ পাকিয়ে তাকালো তিতলির দিকে।
“একটু তো লজ্জা করো।”
তিতলি কোনো ভনিতা ছাড়াই বলল,
“না লজ্জা নেই। অলরেডি আপনি আমার ইজ্জত নিয়ে নিছেন , আপনার সামনে কিসের লজ্জা।”
ঈশান বোকাদের মতো তাকিয়ে থাকে। মেয়ে মানুষ মানেই ভেজাল। শত্রুর সামনে দাঁড়িয়ে ঠাস ঠাস করে গু’লি করে দেওয়া সহজ কিন্তু মেয়েদের সাথে কথায় পারা অসম্ভব!
“শুনুন না ঈশান। চলুন আমরা প্রেগন্যান্ট হই।”
চকিতে ঘাড় ফেরায় ঈশান, তৎক্ষণাৎ নিজের কথা শুধরে নেয় তিতলি।
“থুড়ি, আমি বলতে চাচ্ছিলাম আমি প্রেগন্যান্ট হবো।”
ঈশান আচমকা বাঁকা হেসে কাছে এলো। তিতলির চুলগুলো খামচে ধরে বলল,
“বেবি নিতে হলে অনেক পরিশ্রমের প্রয়োজন রংপুরের মাইয়া!”
“আমি প্রস্তুত। ওইতো হাল চালাবেন তাইনা?”
ঈশান এই মেয়ের মুখের লাগাম নেই থেকে হতাশ হলো। তিতলি আরো কিছু বলতে যাবে তার পূর্বেই ঈশান বলে।
“একটা বাচ্চা পালা কত কষ্ট জানো?”
তিতলি আগের মতোই বলল,
“সব কষ্ট আমি সয়ে নেব। শুধু বাচ্চার পটির ব্যাপারটা আপনি দেখে নিয়েন ঠিক আছে?”
ঈশান চাটি বসালো মেয়েটার মাথায়। রাগে ফুঁসে ওঠে,ফুলে ওঠা ঠোঁট দুটো আঁকড়ে ধরে ঈশান। রাগটা ধপ করে নিভে গেল মেয়েটার। আদুরে স্পর্শে শিথিল হয়ে এলো তার হৃদয়। যেমন শীতলতা ছেয়ে গেছে সর্বাঙ্গে। মুঠো করে চেপে ধরে শার্টের একাংশ। ঈশান কিছুটা রাগ নিয়ে ওষ্ঠো দুটো আঁকড়ে ধরলেও একসময় স্পর্শগুলো যত্ন করেই করে। মান অভিমানের পালা শেষে একত্রে ভালোবাসার রঙে রঙিন হতে প্রস্তুত হয় দু’জনে।
ঘুমন্ত আফরিদের প্রশস্ত বক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে লেপ্টে আছে ন্যান্সি। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে নিশ্চিত হলো পুরুষটি সম্পূর্ণরূপে নিদ্রার অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে। তখনই নিঃশব্দে মুখটা সামান্য উঁচু করল সে।
অতি সন্তর্পণে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ঘুমন্ত মানুষটাকে। একজন পুরুষ এতটা সুন্দর হতে পারে এ ধারণা ন্যান্সির কখনোই ছিল না। ঘুমন্ত অবস্থাতেও মুখাবয়বে কী এক দুর্বোধ্য পুরুষালি দৃঢ়তা! চোখের পাতায় প্রশান্তির ছায়া, এলোমেলো চুল, আর ঠোঁটের কোণে ঘুমের নিস্তরঙ্গতা।
শুষ্ক ঢোক গিলল ন্যান্সি।কী অদ্ভুত!এই মানুষটাকেই সে এতটা ভালোবাসে?
ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে আঙুলের ডগা ছুঁইয়ে দিল আফরিদের গালে। উষ্ণ ত্বকের স্পর্শে তার ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি হাসি ফুটে উঠল।
পরক্ষণেই লক্ষ করল, আফরিদের বুক ওঠানামা করছে নিয়মিত ছন্দে। পুরুষটি সত্যিই ঘুমিয়ে আছে।নিশ্চিন্ত হলো ন্যান্সি।
অতি সাবধানে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল। কণ্ঠ এতটাই ক্ষীণ যে শব্দগুলো যেন নিঃশ্বাসের সঙ্গেই মিশে গেল।ন্যান্সি মৃদু হাসল।
“আফরিদ, শুনছেন? আমি কিন্তু আপনাকে ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। আপনার পরাণ আপনাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।”
এক মুহূর্ত থেমে আবার ফিসফিসিয়ে বলল,
“আপনি শুনছেন না বলেই বলে ফেললাম। জেগে থাকলে তো এসব বলার সাহসই হয় না আমার।”
আফসোস, তার গোপন স্বীকারোক্তির একটি শব্দও পৌঁছাল না আফরিদের কর্ণকুহরে। তবে ন্যান্সির চুলের একগুচ্ছ গোছা এসে নাকের ওপর পড়তেই ঘুমের মধ্যেই কপাল কুঞ্চিত করল আফরিদ। ন্যান্সি তা দেখে শব্দহীন হাসিতে কেঁপে উঠল।
কিন্তু সেই হাসি স্থায়ী হলো না।দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে এলো আফরিদের বুকের দিকে।
শার্টের নিচে স্পষ্ট হয়ে আছে ব্যান্ডেজের অস্তিত্ব। ন্যান্সির চোখের কোণে মুহূর্তেই জল জমে উঠল।
লোকটা ব্যথা লুকিয়ে রাখার জন্য শার্ট পরেই ঘুমিয়েছে।
তারপরও যেন কিছুই হয়নি! ন্যান্সি আঙুল বাড়িয়ে ব্যান্ডেজের ওপর স্পর্শ করতে গিয়েও থেমে গেল। স্পর্শটুকুতেও যদি তার ঘুম ভেঙে যায়?
চোখের জল মুছে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এত কষ্ট পেয়েও আমাকে কিছু বুঝতে দেননি…
অভিমানের সঙ্গে মিশে গেল ভালোবাসা।
“বড্ড জেদি আপনি।”
সকলের চোখে আফরিদ এহসান একজন সুপ্রতিষ্ঠিত বিজনেস টাইকুন। ক্ষমতা, প্রভাব আর বিত্তের দুনিয়ায় তার নাম উচ্চারিত হলে বহু মানুষের কণ্ঠ আপনাআপনি নিচু হয়ে আসে।
কিন্তু সেই পরিচয়ের আড়ালে আরও একটি অন্ধকার সত্তা রয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের নির্মম মাফিয়া কিং আফরিদ এহসান।
তার প্রকৃত পরিচয় জানে অতি অল্প কয়েকজন। দেশের ক্ষমতাবান কিছু মানুষ, যারা প্রকাশ্যের আলোর আড়ালে নিজেদের স্বার্থে এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলে।
অথচ সেই দুর্ধর্ষ মানুষটিই আজ সকাল সকাল নিজের কক্ষে বসে ল্যাপটপের পর্দায় আঙুল চালাচ্ছে।
মুখে যথারীতি গাম্ভীর্য। কিন্তু মনের সমস্ত ব্যস্ততা এখন একটিমাত্র মানুষকে ঘিরে,ন্যান্সি। আজ থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আফরিদ,আগামী নয়-দশ মাস নিজের অন্যান্য ব্যস্ততা যথাসম্ভব সীমিত রাখবে। সাম্রাজ্য, ব্যবসা, অন্ধকার জগতের হিসাব সবকিছুর মধ্যেই দূরত্ব টানবে।
এই সময়টা সে তার স্ত্রীকে দেবে। তার পরাণকে।
যে নারীটি তার আত্মার সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে, তাকে ছাড়া থাকার কথা কল্পনা করাও এখন আফরিদের কাছে অসম্ভব। আর এখন ন্যান্সি শুধু তার স্ত্রী নয়। তার সন্তানের মা। এই একটি সত্যই যেন আফরিদের সমস্ত সতর্কতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তার দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হবে, নিরাপত্তা আরও কঠোর হবে। ন্যান্সির শরীরে ফুলের টোকাটুকুও পড়তে দেবে না সে।
ল্যাপটপের পর্দায় চোখ রেখেই আফরিদের অধরে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
মনে মনে একটাই প্রতিজ্ঞা করল এই নয়-দশ মাসে পৃথিবীর কোনো বিপদ তার স্ত্রী কিংবা তার অনাগত সন্তানের কাছে পৌঁছাতে পারবে না।
ঈশান সবে বাইরে থেকে ফিরে এসে আফরিদের সম্মুখে এসে দাঁড়াল। ভঙ্গিতে যথারীতি কর্তব্যনিষ্ঠ দৃঢ়তা।
“বস, সিকিউরিটি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মঞ্জিলের চারপাশে অতিরিক্ত লোক মোতায়েন করা হয়েছে, সিসি ক্যামেরার সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। বাইরের কেউ তো দূরের কথা, সন্দেহজনক কোনো নড়াচড়াও এখন আমাদের নজর এড়াবে না।”
আফরিদ সোফায় হেলান দিয়ে বসে ছিল। এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে ঠোঁট ছুঁয়ে আছে। ঈশানের কথাগুলো শুনে ধীরস্থির কণ্ঠে শুধাল,
“আর ডক্টর?”
ঈশানের ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে উঠল।
“সেটাও অলরেডি হয়ে গেছে, বস। একটা রুমকে সম্পূর্ণ অপারেশন থিয়েটারে রূপান্তরের কাজ চলছে। আজকের মধ্যেই বাকি কাজ শেষ হয়ে যাবে।”
আফরিদের ভ্রু সামান্য উঠল। তার স্ত্রীকে নিয়ে বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নেওয়ার মানুষ সে নয়। ন্যান্সির গর্ভে তার উত্তরাধিকার বেড়ে উঠছে এই একটি সত্যই যেন তার সমস্ত সতর্কতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাড়ির একটি কক্ষকে আধুনিক হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে পরিণত করার নির্দেশ দিয়েছে সে। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যেই তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় নার্সিং স্টাফের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগামী নয় কিংবা দশ মাস যতদিন প্রয়োজন, তারা মঞ্জিলেই অবস্থান করবে।
ঈশান আর হাসি সামলাতে পারল না।আফরিদের দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে গিয়ে স্থির হলো।
“তুই হাসছিস কেন?”
প্রশ্নটা শুনেই ঈশানের মুখের হাসি উধাও।
“না, মানে… ম্যাম তো সবে…
কথা শেষ করার আগেই আফরিদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“সবে কী?”
ঈশান গলা পরিষ্কার করল।
“সবে প্রেগন্যান্ট হয়েছেন। আর আপনি এখন থেকেই এমন প্রস্তুতি নিচ্ছেন যে মনে হচ্ছে কালকেই…
আফরিদ এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে আরও আরাম করে বসল। দু’হাত সোফার পেছনে ছড়িয়ে দিয়ে ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে বলল,
“আমার স্পেশাল জিনিস নিয়ে বউ ঘুরবে। তার নিরাপত্তায় এতটুকু বাড়তি ব্যবস্থা করাই যায়।”
ঈশান কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“স্পেশাল জিনিস মানে?”
আফরিদ গাল ঠেলে মুচকি হাসল।
“যেটার জন্য কিছুদিন পর তোকেও ‘আব্বা’ ডাক শুনতে হবে, সেটাই।”
ঈশান সঙ্গে সঙ্গে
“খুক… খুক!”
কাশতে শুরু করল। আফরিদ নির্বিকার। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কথাটাই বলেছে।
এদিকে ডাইনিং হল ইতিমধ্যেই সকালের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠেছে। সার্ভেন্টরা একে একে টেবিলে নাশতা সাজিয়ে দিচ্ছে।
কল্পনাও নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। আগের মতো কারও সঙ্গে অকারণে বিরূপ আচরণ করছে না, মুখে টেনে রাখছে স্বাভাবিকতার আবরণ। অথচ তার অন্তর্লীন অস্থিরতা যেন চোখের আড়ালে থেকেও সম্পূর্ণ অদৃশ্য নয়।
সাব্বিরও ইদানীং অদ্ভুত আচরণ করছে। সুযোগ পেলেই কল্পনার কাছে এসে ন্যান্সিকে নিয়ে নানা ধরনের কথা বলে। কল্পনা সেসব কথাকে যথাসম্ভব গুরুত্বহীন করে পাশ কাটিয়ে যায়।
খাওয়ার মাঝেই মাইমুনা এহসান আফরিদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোমার স্ত্রীকে এবার বলো, কিছুদিন অন্তত ভালো মেয়ের মতো থাকতে।”
আফরিদ বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ল।মাইমুনা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“এখন আর সে একা নেই, আফরিদ। এটা যেন ভুলে না যায়। তার ভেতরে শুধু তার নিজের সন্তান নয়, এই বংশের উত্তরাধিকারী বেড়ে উঠছে।”
আফরিদের মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে এলো।
সে এবারও নীরবে সম্মতি জানাল।
সাব্বির আর এক মুহূর্তও সেখানে বসল না। দ্রুত খাওয়া শেষ করে চেয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই ঠিক তখনই সামনে এসে পড়ল ন্যান্সি।
ড্রয়িংরুমের দিকে যাচ্ছিল মেয়েটা।দুজনের দৃষ্টি মুখোমুখি হতেই মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সময়।
সাব্বিরের চোখে এমন এক তীব্র ক্ষোভ, যেন বহুদিনের জমাট কোনো অভিমান সেখানে আগু’ন হয়ে জ্বলছে।
ন্যান্সি নির্বাক। এই রোষের কারণ তার বোধগম্য নয়। হঠাৎ করেই কেন সাব্বির তার প্রতি এমন বিরূপ হয়ে উঠেছে তার কোনো উত্তরই ন্যান্সির জানা নেই।
সাব্বির একবারও কিছু বলল না।শুধু কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
ন্যান্সি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত।তারপর বুকের গভীর থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস।
কোথাও যেন অদৃশ্য কোনো ঝড় জমছে।আর সেই ঝড়ের আগাম বার্তা হয়তো এই মঞ্জিলের কেউই এখনো পড়তে পারছে না।
দৃষ্টি যখন ডাইনিংয়ের দিকে গিয়ে স্থির হলো, পায়ের পাতা থেকে শুরু করে সমগ্র তনুজুড়ে এক অদ্ভুত শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল ন্যান্সির।
কারণ, একজোড়া অবাধ্য নীল সমুদ্রের চোখ নিবিড়ভাবে নিবদ্ধ তার ওপর।
সেই দৃষ্টিতে কী ছিল অধিকার, মুগ্ধতা, নাকি নিঃশব্দ কোনো সতর্কবার্তা ন্যান্সি জানে না। শুধু জানে, এত ধারালো দৃষ্টির সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজেকে নির্লিপ্ত রাখা ভীষণ কঠিন।
উঁহু, কঠিন নয় দুরূহ।ন্যান্সি ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে একটি চেয়ার টেনে স্মাইলির পাশে বসল।
স্মাইলি তখনও মিটিমিটি হাসছে।ন্যান্সি ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“হাসছো কেন তুমি?”
কণ্ঠস্বর তার ক্ষীণ, কিন্তু বিরক্তি স্পষ্ট। স্মাইলির হাসি আরও প্রসারিত হলো।
“ভাবতেই কেমন জানি লাগছে! তোমার টাম্মির ভেতরে একটা বাবু আছে!”
ন্যান্সি চকিতে তার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাল।
“স্মাইলি!”
মেয়েটার হাসি এবার দ্বিগুণ হলো।ঠিক তখনই তিতলি এক থালা নানা রকম তাজা ফল নিয়ে ডাইনিংয়ে এসে উপস্থিত হলো।
“ইলহাম আপু, তোমার জন্য এগুলো এনেছি। এখন থেকে কিন্তু নিয়ম করে খেতে হবে।”
তিতলি প্লেটটা ন্যান্সির সামনে নামিয়ে রাখতেই মাইমুনা এহসানও কঠিন অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বললেন,
“হ্যাঁ। এখন থেকে তোমাকে নিজের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে। পুষ্টিকর খাবার খাবে, সময়মতো খাবে। কল্পনা, আমার অনুপস্থিতিতে তুমি একটু তদারক করবে। আজ আমাকে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যেতে হবে।”
কল্পনা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নত করল।
“ওকে, মম।”
ন্যান্সি এতক্ষণ নীরবে বসে থাকলেও হঠাৎ ঠান্ডা অথচ নির্মম স্বরে বলল,
“আমি এই বাচ্চা রাখব না।”
একটি বাক্য।মাত্র একটি বাক্যই যেন ডাইনিংয়ের সমস্ত স্বাভাবিকতা ছিন্নভিন্ন করে দিল।
আফরিদের মুখ এতক্ষণ পাথরের মতো নির্বিকার ছিল। কিন্তু ন্যান্সির কথাটি কর্ণগোচর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার চোখের নীল গভীরতা মুহূর্তে বদলে গেল।
চেয়ার ঘষটে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল প্রায় সবাই।মাইমুনা এহসান বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন,
“রাখবে না মানে? কী বলছো তুমি এসব?”
ন্যান্সি আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত।ধীরগতিতে উঠে দাঁড়াল সে। টেবিল থেকে পানির গ্লাস তুলে এক ঢোকে খানিকটা পানি পান করল। তারপর গ্লাসটি নামিয়ে আগের মতোই নির্বিকার স্বরে বলল,
“মানে, আমি এই বাচ্চা রাখব না।”
“ইলহাম!”
মাইমুনার কণ্ঠে এবার ক্রোধের বিস্ফোরণ।
“তুমি নিজের সীমা অতিক্রম করছ!”
স্মাইলি ও তিতলি পরস্পরের দিকে তাকাল। ন্যান্সির এমন নির্লিপ্ত মুখ দেখে দুজনের বুকের ভেতরেই অজানা আশঙ্কা জমাট বাঁধছে।
স্মাইলি সাহস সঞ্চয় করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“এসব কী বলছো তুমি, ইলহাম? এটা তো তোমাদের বেবি!”
ন্যান্সির ঠোঁটে ফুটে উঠল এক তিক্ত বিদ্রূপের হাসি।দৃষ্টি ধীরে ধীরে গিয়ে থামল আফরিদের ওপর।
সেই নীল চোখ দুটো এখন আর সমুদ্রের মতো শান্ত নেই।তবুও ন্যান্সি থামল না।
“ঠিক বলেছ। এটা আমাদের বেবি।”
একটু বিরতি।তারপর আরও কঠিন স্বরে বলল,
“তাই তো আমি ওকে রাখব না। অন্তত এই নরকে তো একদমই না।”
শব্দগুলো যেন বি’ষমাখা তীর হয়ে গিয়ে বিঁধল মাইমুনার অন্তরে।
তিনি আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না।
“তোমাকে আমি ছাড়ব না! একদম ছাড়ব না! বেয়াদব মেয়ে কোথাকার! হাউ ডেয়ার ইউ?”
কিন্তু মাইমুনার ক্রোধের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠল অন্য একজনের নীরবতা।আফরিদ।সে এতক্ষণ একটি শব্দও বলেনি।শুধু তাকিয়ে ছিল ন্যান্সির দিকে।সেই দৃষ্টির অর্থ পড়া কঠিন।হঠাৎই বজ্রগতিতে এগিয়ে এলো সে।
ন্যান্সি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার নরম কব্জি শক্ত মুঠোয় আবদ্ধ হয়ে গেল।
“আফরিদ,,,
কথা শেষ করার সুযোগও পেল না ন্যান্সি।এক টানে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল পুরুষটি।তারপর কোনো কথা না বলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
ন্যান্সি পেছনে টান পড়া হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল।
“ছাড়ুন! বলছি ছাড়ুন!”
কোনো প্রতিক্রিয়া নেই মানবের।
“ইশ্! ছাড়ুন বলছি!”
আফরিদের পদক্ষেপ থামল না।সে কি কখনো কারও কথা কানে তুলেছে?উঁহু।বিশেষত যখন সেই কথার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার স্ত্রী কিংবা তার অনাগত সন্তানের অস্তিত্ব,তখন তো নয়ই।
একেবারে কক্ষের অভ্যন্তরে পৌঁছেই আফরিদ ন্যান্সিকে হাত ছেড়ে দিল না বরং ক্ষোভের বশে এমনভাবে সরিয়ে দিল যে মেয়েটা কয়েক পা দূরে গিয়ে সামলে দাঁড়াল।
পরমুহূর্তেই দরজায় লক করে দিল আফরিদ।ঘুরে দাঁড়াতেই তার মুখোমুখি ন্যান্সি।
চোখ দুটো র’ক্তাভ। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। নিঃশ্বাস ভারী, অনিয়ন্ত্রিত। মনে হচ্ছে বুকের ভেতর সঞ্চিত সমস্ত ক্রোধ মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হয়ে উঠবে।
হিসহিসে কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“এত সাহস হলো কী করে তোর? আমার সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মুছে ফেলার কথা বলিস?”
ন্যান্সি স্থির দাঁড়িয়ে রইল।ভেতরে ভেতরে সে নিজেই ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, অথচ মুখে ফুটিয়ে তুলল তাচ্ছিল্যের এক ক্ষীণ হাসি।
ধীরে ধীরে আফরিদের সামনে এসে দাঁড়াল সে।তারপর কাঁপা আঙুলে আফরিদের স্যুটের এক পাশ সরিয়ে শার্টের বোতাম খুলে বুকের ব্যান্ডেজের দিকে ইঙ্গিত করল।
কণ্ঠে এবার জমে থাকা আতঙ্কের সঙ্গে মিশে গেল অসহায় যন্ত্রণা।
“এটা দেখেছেন?”
আফরিদের দৃষ্টি নিচে নামল।
“আপনার প্রাণের কোনো নিশ্চয়তা নেই। আজ আছেন, কাল নাও থাকতে পারেন। আপনার মতো মানুষের জীবনে কোনো নিশ্চয়তা নেই কখন কোন দিক থেকে মৃ’ত্যু এসে দাঁড়াবে, আপনি নিজেও জানেন না।”
ন্যান্সির চোখ ভিজে উঠল।
“তাহলে আমি মা হয়ে জেনেশুনে কেন আমার সন্তানকে এই পৃথিবীতে আনব? এতিম হওয়ার জন্য? নাকি একজন অপরাধীর সন্তান হয়ে জন্ম নেওয়াটাই তার প্রথম অপরাধ হবে?”
কণ্ঠ ক্রমশ ভেঙে যাচ্ছিল।
“এর চেয়ে… এর চেয়ে ওর পৃথিবীতে না আসাই কি ভালো নয়?”
ঠাস! আফরিদের মুষ্টি পাশের দেয়ালে গিয়ে আ’ঘাত করল।
শব্দটিতে ন্যান্সি শিউরে উঠল।আফরিদের হাতের ওপরের চামড়া সামান্য ফেটে র’ক্তের ক্ষীণ রেখা ফুটে উঠেছে। কিন্তু সে সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করল না।
তার সমস্ত অস্তিত্ব যেন এখন একটি মাত্র কথায় আটকে আছে, আমার সন্তান।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ন্যান্সির চোয়াল শক্ত হাতে ধরে নিজের দিকে তাক করল সে।
কণ্ঠ নিচু, অথচ ভয়ংকর ঠান্ডা।
“আমার ভয় নেই তোর?”
ন্যান্সি কোনো উত্তর দিল না।
“একটুও ভয় লাগে না?”
চোখে চোখ রেখে আফরিদ বলল,
“কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস, ভুলে গেছিস?”
ন্যান্সির চোখ বেয়ে এবার অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
“ভালোবাসি বলে মাথায় তুলে রেখেছি। তাই বলে আমার সহ্যের সীমাটাকে দুর্বলতা ভাবিস না।”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে আরও কঠিন স্বরে বলল,
“আমার সন্তানের জন্ম নিয়ে আমার সামনে আর একবারও এমন কথা বলবি না।”
ন্যান্সি চোখ বন্ধ করে ফেলল।তবু তার জেদ ভাঙল না।
কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“তাহলে… যদি সত্যিই আপনার সন্তানদের মুখ দেখতে চান…
আফরিদের চোখ সরু হয়ে এলো।
“সব ছেড়ে দিন।”
এক মুহূর্তের জন্য কক্ষের সমস্ত শব্দ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।ন্যান্সি চোখ মেলে তাকাল।
“আপনার এই অন্ধকার জীবন ছেড়ে দিন। অপরাধের দুনিয়া থেকে ফিরে আসুন। তাহলেই আপনার সন্তানরা আপনাকে একজন বাবা হিসেবে পাবে।”
কথাগুলো শেষ হতেই আফরিদের মুখের সমস্ত কোমলতার অবশেষটুকুও মিলিয়ে গেল। সে ন্যান্সিকে ছেড়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
পরক্ষণেই ঘরের টেবিলের ওপর থাকা কয়েকটি জিনিস ক্রোধের ঝটকায় মেঝেতে ছিটকে পড়ল। সাজানো ঘর মুহূর্তেই বিশৃঙ্খল হয়ে উঠল।
ন্যান্সি আতঙ্কে দু’হাত দিয়ে কান চেপে ধরল।অশ্রু আর ভয়ের ভারে তার সমগ্র শরীর কেঁপে উঠছে।আফরিদ কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর এমন এক স্বরে বলল, যেখানে ক্রোধের নিচে চাপা পড়ে ছিল গভীর আহত অহংকার,
“আমাকে বাধ্য করিস না নিজের সেই রূপটা দেখাতে, ইলহাম।”
ন্যান্সি ধীরে ধীরে হাত নামাল।আফরিদের চোখে তাকাতেই বুকটা কেঁপে উঠল।
“দ্বিতীয়বার যদি আমার সন্তানকে নিয়ে এমন একটা কথাও বলিস…
সে থামল।কণ্ঠ আরও নিচু হলো।
“তাহলে মনে রাখিস,আমি তোকে ভালোবাসি, এই কথাটাও ভুলে যেতে পারি।”
কোনো ভণিতা নেই,কোনো দীর্ঘ ব্যাখ্যাও নয়। শুধু নির্মম, স্পষ্ট কয়েকটি বাক্য। আফরিদ ঘুরে দাঁড়াল।
দরজা খুলে একবারও পেছনে না তাকিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ মিলিয়ে যেতেই ন্যান্সির সমস্ত শক্তি যেন এক মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে ফ্লোরে বসে পড়ল সে। দু’হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
কণ্ঠরুদ্ধ কান্নার ফাঁকে অস্ফুট স্বরে বলল,
“এক জীবনে আপনার মতো একজন পাপী মানুষকে ভালোবেসে আর কতটা কষ্ট পাব আমি, আফরিদ এহসান?”
অশ্রুতে ভিজে গেল তার দুই হাত।
“শারীরিকভাবে নয়, আপনি আমাকে মানসিকভাবে শেষ করে দিচ্ছেন।”
কথাগুলো নিঃশব্দ কক্ষে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো আর দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি প্রথমবারের মতো নিজের ক্রোধের চেয়েও গভীর কোনো যন্ত্রণার কাছে পরাজিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
চলবে………..।
(
এখন পর্যন্ত গল্পটা কেমন লাগছে একটু মন্তব্য করে জানান তো পাঠক মহল। আমি আজকে আপনাদের ভালো খারাপ দু’টো মন্তব্য পড়ব।)
আমার আইডি Farhana Nijum See less
Share On:
TAGS: অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা, ফারহানা নিঝুম
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৮৫
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪৮ {প্রথম অর্ধেক}
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫৪
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ২২
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৮২
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪১
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ২৩
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪৬
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৬৫ +৬৬