Uncategorized

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭৩


#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা

[পর্ব ৭৩]

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

(দ্বিতীয় খন্ড)

স্পেনের বার্সেলোনা শহর তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি।

ভোরের আলো ঠিকরে পড়ছে কংক্রিটের দেয়াল ছুঁয়ে, কিন্তু শহরের এক কোণে নামহীন একটা এলাকায় নীরবতা, অস্বাভাবিক হয়ে আছে।

কালো রঙের ভ্যানগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।

কোনো সাইরেন নেই, কোনো আলো নেই শুধু নিঃশ্বাস আটকে রাখা গতি।

ভ্যানের ভেতরে বসে থাকা ফোর্সগুলো প্রশিক্ষিত নেকড়ের মতো শান্ত। কালো স্যুটে মোড়া শরীর, কাঁধে ঝোলানো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। প্রত্যেকের ঘাড়ে একই চিহ্ন ঈগল পাখির ট্যাটু। তারা আফরিদ এহসানের লোক তা বুঝতে বাকি নেই,তবে সাধারণ লোকজন চিনবে না। পুলিশ চিনবে মাস্টার মাইন্ডের টিম হিসেবে।

মিশন একটাই রাইসা কে মুক্ত করা।

******************

কোল্ড স্টোন।

শহরের বুকে গেঁথে থাকা এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

হাই-সিকিউরিটি ডিটেনশন ফ্যাসিলিটি, যেখানে আলো ঢুকলেও আশা ঢোকে না।

ভোরের আলোয় কোল্ড স্টোনের দেয়ালগুলো আরও ঠান্ডা, আরও নির্দয় মনে হচ্ছিল। ভেতরে, কোল্ড স্টোনের এক সেলে

রাইসা নড়েচড়ে উঠল। ঘাড় ফেরাতেই হঠাৎ থুতনিতে একটা নরম ধাক্কা। কিছু ঝাঁকড়া চুল তার ঠোঁট ছুঁয়ে গেল।

চোখ খুলে তাকিয়েই শ্বাসটা আটকে গেল তার।

ইন্সপেক্টর ইস্ক্রিয়াস। ঘুমন্ত মুখে ক্লান্তির ছাপ, কপালে হালকা ভাঁজ।তার প্রিয় পুরুষ। যার বাহুতে সে একসময় নিরাপত্তা খুঁজেছিল।

আজ সেই মানুষটিই তার সেলের ভেতর নিজের জীবনের সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্তের বন্দি। রাইসা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। ভালোবাসা আর অপরাধবোধ একসাথে বুকের ভেতর কাঁপছিল। সে ভালোবেসে ফেলেছে মনের অজান্তেই। যতই মুখে অস্বীকার করুক না কেন! মনে মনে ঠিকই সে ইস্ক্রিয়াসের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে।

ঘুমন্ত ইস্ক্রিয়াস জেগে উঠেছে, চোখাচোখি হয় দুজনের। নিষ্পলক চেয়ে রয় দুজনেই। নিরবতা ভেঙ্গে নিখাদ কন্ঠে শুধোয়।

“গোপন চক্রান্ত চলছে?”

রাইসা এহেন প্রশ্নে হাসলো খানিকটা, হেসে হেসেই প্রত্যুত্তরে বলল।

“গোপন চক্রান্ত করব কেন?‌ সবতো জেনেই গেছো ইন্সপেক্টর,এখন থেকে সামনাসামনি চক্রান্ত করব ভাবছি।”

ইস্ক্রিয়াস কিছু বলতে যাবে তার পূর্বেই।

দূরে একটা ভারী ধাতব শব্দ। ক্লিক। কোল্ড স্টোনের বাইরের গেট নিঃশব্দে খুলে গেল। কালো স্যুট পরা ফোর্সগুলো ছায়ার মতো ভেতরে ঢুকে পড়ল।

প্রথম গু’লিটা ছোঁড়া হলো সিসিটিভি কন্ট্রোল রুমে।

শব্দ দমিয়ে রাখা সাইলেন্সার তবুও মৃ’ত্যু তৎক্ষণাৎ।

এরপর একের পর এক পাহারার টাওয়ার নিস্তব্ধ।

রাইফেলের গর্জন চাপা, কিন্তু নির্ভুল। অ্যালার্ম বেজে ওঠার আগেই কোল্ড স্টোনের ভেতর নরক নেমে এলো। সেলের দরজার বাইরে ভারী বুটের শব্দ।

ইস্ক্রিয়াস হঠাৎ জেগে উঠল।

চোখে এক মুহূর্তে বাস্তবতা ফিরে এলো।

“রাইসা, নিচু হও!”

রাইসা সহসা মাথা নিচু করে নিলো। ফায়ারিং চলছে। বাইরে। ইস্ক্রিয়াস নিজের রিভলবার টা নিতে নিতে বলল।

“মনে হচ্ছে তোমাদের মাস্টার মাইন্ড ফোর্স পাঠিয়েছে!”

রাইসার মনে ভীতি কাজ করলো , কোথাও এই গু’লাগুলিতে ইন্সপেক্টরের কিছু হবে না তো?

“ইস্ক্রিয়াস…

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই দরজা ভেঙে গেল।

গু’লির শব্দ। দেয়ালে স্ফুলিঙ্গ। লোহা আর রক্তের গন্ধে ভরে ।

একজন ফোর্স ঢুকতেই ইস্ক্রিয়াস তার বন্দুক তুলে নিল। কিন্তু সে প্রস্তুত ছিল না

ব্যাং! গু’লিটা এসে লাগল তার কাঁধে।

ইস্ক্রিয়াস মেঝেতে পড়ে গেল, দাঁত চেপে আর্ত’নাদ চাপা দিল।

রাইসা চিৎকার করতে গিয়েও পারল না।

দুটি শক্ত হাত তাকে ধরে ফেলল।

“টার্গেট সিকিউরড।”

কালো মুখোশের আড়াল থেকে ঠান্ডা কণ্ঠস্বর।

ইস্ক্রিয়াস র’ক্তা’ক্ত চোখে তাকাল রাইসার দিকে।

চাওয়া আর না পাওয়ার মাঝখানে জমে থাকা হাজারটা কথা তার চোখে ভাসছিল।

রাইসা ছটফট করল।

“ইস্ক্রিয়াস! ইউ ব্লাডি কি করলে এটা? হোয়্যাট আর ইউ ডুইং?”

লোকগুলোর মধ্য থেকে একজন চাপা স্বরে বলল।

“প্লিজ ম্যাম!”

ইস্ক্রিয়াসের দমবন্ধ হয়ে আসছে, কষ্টটা ঠিক বুকে হচ্ছে। রাইসাকে কি নিয়ে যাবে ওরা? এই কিউটিপাই তার কাছে আর থাকবে না?

“প্লিজ প্লিজ।কিউটিপাই ডোন্ট গো!”

ইস্ক্রিয়াসের আ’র্তনাদ শুনে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না আটকে চলেছে রাইসা ,বুকের পাঁজরে খুব ব্যথা অনুভব করছে সে। কিন্তু তার কাছে মোটেও সময় নেই। ফায়ারিং চলছে , যেকোনো সময় তাদের ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

ফোর্স গুলো খুব চতুরতা সাথে বের করে আনলো রাইসা কে। ভ্যানের কাছে ইভান রয়েছে ,তার স্পেন ব্যাক করার কারণ হচ্ছে ইদ্রান আর আফরিদ এহসান। মিশন সাকসেসফুল বুঝতে পেরেই ক্ষীণ হাসলো।

🌿_______________🌿

“আমি যা বললাম, তা কি স্পষ্টভাবে বুঝা গেল?”

ন্যান্সির গম্ভীর, কর্তৃত্বময় কণ্ঠস্বর সমগ্র পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ল। তার কথাগুলো নিঃশব্দ শ্রোতার ন্যায় শুনে গেল হবু বর-কনে দু’জনেই। পরক্ষণেই তারা আড়চোখে একে অপরের মুখাবয়ব পর্যবেক্ষণ করতে লাগল, যেন চাহনির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনুভূতির ভাষা পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করছে।

তাদের সেই চোরা দৃষ্টিবিনিময় চোখ এড়াল না ন্যান্সির।

সে কপাল কুঞ্চিত করে বলল,

“এটা কী হচ্ছে? একে অপরের মুখের দিকে কী দেখছ? এবার সরি বলো।”

তিতলি সঙ্গে সঙ্গে মুখ গোমড়া করে ডানদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার ভঙ্গিমায় স্পষ্ট অভিমান। কোনো অবস্থাতেই সে আগে ক্ষমা চাইবে না। এই অসভ্য মানুষটা প্রতিনিয়ত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে বিবাদে জড়ায়; সুতরাং ক্ষমাপ্রার্থনার দায়িত্বও তারই।

অন্যদিকে ঈশানও দ্বিতীয়বারের মতো রুষ্ট নয়নে তাকাল রংপুরের কন্যাটির দিকে। সে জীবনে সহজে কারও কাছে ক্ষমা চাওয়ার মানুষ নয়। কিন্তু বিধির পরিহাসে, শুধুমাত্র ন্যান্সির অনুরোধের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই সে নিজের অহংকে সংযত করেছে। মেয়েটির প্রতি তার এক অদৃশ্য কৃতজ্ঞতা আছে, যা সে কখনো ভাষায় প্রকাশ করে না।

অবশেষে দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে তিতলির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল সে।

তারপর গম্ভীর, গমগমে কণ্ঠে উচ্চারণ করল,

“সরি।”

তিতলি ভীত-সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দৃঢ় চোয়ালরেখার দিকে। মুখশ্রী আজ অস্বাভাবিক রকমের মলিন। এক মুহূর্ত দ্বিধায় থেকে সেও মিনমিনে স্বরে বলল,

“সরি।”

মুহূর্তেই ন্যান্সির অধরে প্রশস্ত হাসি প্রস্ফুটিত হলো। এই দুই জেদি মানুষকে মিলিয়ে দিতে পেরে তার মনে এক অদ্ভুত তৃপ্তি জন্ম নিল। যেন দীর্ঘদিনের কোনো অসমাপ্ত দায়িত্ব আজ সম্পূর্ণ হয়েছে।

তার বুক চিরে বেরিয়ে এলো প্রশান্তির দীর্ঘ নিঃশ্বাস।

ঠিক সেই সময় হেলেদুলে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল স্মাইলি। তার পেছন পেছন ধীর পদক্ষেপে এসে উপস্থিত হলো ইদ্রানও। মুহূর্তেই ঘরের পরিবেশে আবার নতুন প্রাণের সঞ্চার ।

ইদ্রানকে দেখামাত্রই ন্যান্সির দৃষ্টিতে একফালি সংশয় নেমে এলো। তার মস্তিষ্কে তখনও ঘুরপাক খাচ্ছে সেই ঈগল-পাখির ট্যাটুর স্মৃতি। এক অদ্ভুত সন্দেহ বারবার তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

তবে কি এই মানুষটিই নীলাদ্রির হয়ে কাজ করত?

হয়তো আফরিদ এহসান নিজেও তা জানত না। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে আরেকটি প্রশ্নের উদয় হলো। না, এমনটা কীভাবে সম্ভব? এ তো তার বহুদিনের বন্ধু! বন্ধুর ছদ্মবেশে কেউ বছরের পর বছর শত্রুর হয়ে কাজ করবে, আর সে তা টেরই পাবে না?

হয়তো সেই কারণেই নীলাদ্রি আর ইদ্রানের মধ্যে এত সখ্য, এত অবলীলায় মিশে থাকার সম্পর্ক ছিল।

ভাবনার জাল ছিন্ন করে হতবিহ্বল কণ্ঠে বলে উঠল স্মাইলি,

“আমি সত্যিই বুঝি না, কিছুদিন পর যাদের বিয়ে, তারা এত ঝগড়া কীভাবে করতে পারে!”

সঙ্গে সঙ্গে তিতলি ঈশানকে পাশ কাটিয়ে এসে দাঁড়াল স্মাইলির পাশে। ঠোঁট ফুলিয়ে, ভোঁতা মুখে বলল,

“আমি কিন্তু ঝগড়া করি না। এই লোকটাই সবসময় আমার সঙ্গে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করে!”

কথাটা শেষ হতে না হতেই ঈশানের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। তিরিক্ষি মেজাজে সে বলে উঠল,

“তাহলে কী? হাতে হাত ধরে ঝগড়া করব নাকি? আশ্চর্য মেয়ে!”

এই দৃশ্য দেখে ন্যান্সি দু’হাত তুলে নিজের কান চেপে ধরল।হায় আল্লাহ!এ কাদের দিয়ে সে কিছুক্ষণ আগে মিল-মহব্বত করানোর চেষ্টা করল?একজন আ’গুন, আরেকজন ঘি!

মুহূর্তের মধ্যেই তার বুকচিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

“উফ্! অসহ্য দুটো মানুষ!”

🌿
🌿
🌿

দ্বিপ্রহর প্রায় সমাগত। এহসান মঞ্জিলের প্রতিটি সদস্য আর কিছুক্ষণের মধ্যেই লাঞ্চে একত্রিত হবে। সুসজ্জিত ডাইনিং টেবিলে ইতোমধ্যেই একে একে সমস্ত খাবার পরিবেশন সম্পন্ন হয়েছে।

দ্রুত শাওয়ার সেরে কক্ষের অভিমুখে ফিরল ন্যান্সি।

কিন্তু কক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতেই তার আঁখিযুগল বিস্ময়ে অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হয়ে উঠল।

আফরিদ এহসান এখনো নিদ্রামগ্ন!

মুহূর্তেই বিস্ময় ও উদ্বেগের রেখা ভেসে উঠল তার মুখাবয়বে। এমন তো কখনো হয় না। মানুষটি প্রতিদিন সূর্যোদয়ের বহু পূর্বেই জেগে ওঠে। তবে কি সে অসুস্থ? অথচ গতরাত অবধি তো সম্পূর্ণ স্বাভাবিকই ছিল!

সদ্য ধৌত ভেজা কেশরাশির ওপর প্যাঁচিয়ে বাঁধা সাদা তোয়ালে। পরিধানে শুভ্র জমিনের ওপর নীল জরির সূক্ষ্ম কারুকাজখচিত পোশাক, আর একপাশে অসাবধান ভঙ্গিতে নিক্ষিপ্ত একই নকশার ওড়না।

ন্যান্সি অত্যন্ত সাবধানী পদক্ষেপে এগিয়ে এসে বিছানার শিয়রে দাঁড়াল। অতঃপর সামান্য ঝুঁকে কপালে হাত রেখে শরীরের উষ্ণতা পরখ করল।

পরক্ষণেই তার হৃদয় ধক করে উঠল। না, তাপমাত্রা স্বাভাবিক নয়। আফরিদের সমগ্র দেহ যেন জ্বরে দগ্ধ হয়ে উঠেছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই কপালে শীতল স্পর্শ অনুভব করে ধীরে ধীরে চোখ মেলল আফরিদ।

ন্যান্সির কণ্ঠে তৎক্ষণাৎ উদ্বেগ নেমে এলো।

“কী হয়েছে আপনার? আপনার তো জ্বর এসেছে!”

আফরিদ ধীরগতিতে কম্বলের নিচ থেকে নিজের হাত বের করে তার শীতল করতলখানি মুঠোবন্দী করল। তারপর সেই ঠান্ডা হাতখানা আপন অধরের কাছে এনে অত্যন্ত স্নিগ্ধ ভঙ্গিতে চুম্বন আঁকল।

ন্যান্সি নির্বাক, নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

আফরিদ আধো-ঘুমজড়িত, কর্কশ কণ্ঠে মৃদুস্বরে বলল,

“এদিকে আয়,আমার বুকে। ঠিকমতো ঘুম হয়নি।”

ন্যান্সি নিম্নঠোঁট দাঁতের আড়ালে চেপে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। অকারণ এক বিষণ্নতা এসে ভর করল তার অন্তরে।

নিম্নস্বরে বলল,

“আপনি উঠবেন না, এহসান? সবাই দুপুরের খাবারের জন্য অপেক্ষা করছে।”

উত্তরে আফরিদ তার করতল টেনে এক ঝটকায় আরও কাছে নিয়ে এলো। তার গভীর নীল দৃষ্টিতে তখন অদ্ভুত এক ক্লান্তি আর অধিকার মিশে আছে।

চাপা ,অনিবার্য আদেশের সুরে সে বলল,

“সবকিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। দরজাটা বন্ধ করে আমার বুকে এসে শুয়ে পড়।”

ন্যান্সি দীর্ঘ, উষ্ণ এক নিঃশ্বাস বিসর্জন দিল। অতঃপর ধীরে ধীরে কেশরাশিতে জড়ানো তোয়ালেখানি খুলে ব্যালকনির তারে মেলে দিল। ভেজা চুলের ডগা থেকে তখনো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলের বিন্দু গড়িয়ে পড়ছে।

কিছুক্ষণ স্থির থেকে পুনরায় কক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল সে। নিঃশব্দ পদক্ষেপে দরজার নিকটে গিয়ে পরিচিত পাসওয়ার্ড চাপতেই যান্ত্রিক শব্দে দরজাটি সুরক্ষিতভাবে বন্ধ হয়ে গেল।

অতঃপর ধীর পায়ে ফিরে এলো আফরিদের নিকট।

আফরিদ ইতোমধ্যেই কম্ফোর্ট সরিয়ে নিজের পাশে খানিকটা স্থান ফাঁকা করে রেখেছে।

ন্যান্সি কিঞ্চিৎ সংকুচিত দৃষ্টিতে শূন্য স্থানটুকু পর্যবেক্ষণ করল। তারপর আলগোছে ওড়নাখানি খুলে শিয়রে রেখে শয্যার প্রান্তে বসল।

কিন্তু নিজেকে স্থির করার অবকাশটুকুও পেল না সে।

পরক্ষণেই প্রবল এক টানে আফরিদ তাকে নিজের প্রশস্ত বক্ষের ওপর টেনে আনল।

আচমকা ঘটনায় চমকে উঠল ন্যান্সি।

সমগ্র দেহে অদ্ভুত এক সংকোচের শিহরণ বয়ে গেল। করতলদ্বয় লজ্জায় স্নায়বিক হয়ে উঠল, হৃদস্পন্দনও যেন অকারণে দ্রুত হয়ে এলো।

কিন্তু এই মুহূর্তে তার লজ্জা কিংবা দ্বিধা দেখার মতো ধৈর্য আফরিদের নেই। সে নিঃশব্দে মুখ গুঁজে দিল ন্যান্সির বক্ষদেশে।

মেয়েটি তৎক্ষণাৎ অনুভব করলপুরুষটির শরীর যেন জ্বল’ন্ত অঙ্গা’রের ন্যায় উত্তপ্ত। সে বিস্ময়ে কেঁপে উঠল।

এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দেহের উষ্ণতা এতখানি বেড়ে গেল কীভাবে?

তাহলে জ্বরটা বেশ প্রবলভাবেই এসেছে।

উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল সে,

“সরুন, আপনার তো জ্বর এসেছে। আমি খাবার নিয়ে আসছি। কিছু খেয়ে তারপর ওষুধ খাবেন।”

এই বলে নিজেকে মুক্ত করে উঠতে চাইল ন্যান্সি।

কিন্তু ব্যর্থ হলো। সেই দুর্দমনীয় শক্তির সামনে তার সমস্ত চেষ্টা মুহূর্তেই নিষ্ফল হয়ে গেল।

আফরিদ এক হাতেই তার দু’টি করতল মাথার ওপর চেপে ধরল, যেন তাকে কোথাও যেতে দেবে না।

তারপর কর্কশ অথচ অদ্ভুত কোমলতায় ভেজা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,

“একটুও নড়বি না, ছ্যামড়ি। আমাকে একটু ভালোবাসতে দে।”

“আফরিদ,এসব পরে হবে। এখন উঠুন দয়া করে , আরে বাবা অসুস্থ হয়ে গেছেন তো মেডিসিন নিতে হবে।”

ক্ষীণ হাসলো আফরিদ ,ঘোর লাগা চাহনিতে ফিসফিসিয়ে আওড়ালো।

“তুই আমার মেডিসিন। ডিস্টার্ব করিস না বেইবি, মেডিসিন নিতে দে।”

ন্যান্সি শুকনো ঢোক গিললো , আফরিদ মুখ নামিয়ে গলদেশে ওষ্ঠো ছোঁয়ায়।‌ আবেশে আঁখি বুঁজে আসে রমণীর।

অবাধ্য পুরুষের অবাধ্য হাত জোড়া চুরিদার টেনে উপরে তুলতে ব্যস্ত। ন্যান্সি কাঁপছে , আফরিদের উন্মাদনা সে খুব কাছ থেকেই দেখছে। সর্বদা কাছে এলে প্রণয়ের প্রলাপ করে বিড়বিড় করে। নিজেকে বেপরোয়া ভাবে ছেড়ে দেয়।

কপাল কুঁচকে এলো ন্যান্সির ,গলদেশে দন্ত দ্বারা ক্ষত অনুভব করতেই ব্যথায় অস্ফুট স্বরে গোঙাতে লাগলো। আফরিদ থেমে যায় এক মূহুর্তের জন্য। মুখ উঠিয়ে চোখে চোখ রেখে শান্ত হয়ে তাকিয়ে আছে।

ন্যান্সির চোখের পাতা কেঁপে কেঁপে উঠছে , আফরিদ আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে উপরের ঠোঁট।

“এভাবে আওয়াজ করিস না মাইন্ড ডাইভার্ট হয় তো!”

ন্যান্সির অধরোষ্ঠ পদ্মপত্রের ন্যায় কম্পিত হচ্ছে। আফরিদ তন্দ্রাচ্ছন্ন নয়নে নিরীক্ষণ করে, সহসা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওষ্ঠের কুঞ্চনে, অবিরাম চুম্বনের দ্বারা তাকে অতিষ্ঠ ও আকুল করে তুলে। ক্রমশঃ গাঢ়তর হতে লাগল সেই অমৃতময় অধরমিলন, যেন অনন্ত গভীরতায় নিমগ্ন হচ্ছে।

ন্যান্সি ব্যাকুলভাবে হস্তদ্বয় মোচড়াতে থাকল। আফরিদ যখন মুক্তি দিল, তখন সে উভয় করপুটে তাঁর পৃষ্ঠদেশ দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন কে, উদ্দাম অনুভূতির বন্যা সামলাবার প্রাণপণ চেষ্টা করল।

হাঁপরের ন্যায় দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে সে ক্ষীণস্বরে জিজ্ঞাসা করল,

“জ্বর?”

আফরিদ উত্তর দিল,

“কোনো সমস্যা নাই। আমার পারফরম্যান্স তোমার ভালো লাগলেই যথেষ্ট।”

লজ্জায় লাজুকা পল্লবের ন্যায় সে নত হয়ে পড়ল। এই পুরুষের কোনো লাগাম নাই, প্রেমালাপের মাধুর্য কীভাবে ব্যক্ত করতে হয় তাও সে জানে না। এই মুহূর্তে স্নেহসিক্ত মধুর বাক্য উচ্চারণ করতে পারত, কিন্তু তার পরিবর্তে এমন অশ্লীল উক্তি করল।

আফরিদ কিন্তু থামল না। তাঁর দেহ ঘর্মাক্ত হয়ে একাকার। কিছুটা দূরে সরে গিয়ে তিনি প্যান্টের বেল্টে হস্তক্ষেপ করলেন। কিন্তু মাঝপথে থেমে গেল। বিছানা ছেড়ে । আলো নিভিয়ে দেওয়া মাত্র ন্যান্সির সমস্ত রোমকূপ যেন শিহরিয়া দাঁড়িয়ে গেল।

🌿

ন্যান্সি আফরিদের কোলে উভয় পদযুগল প্রসারিত করে বাহুদ্বয় দ্বারা তাঁর গ্রীবা জড়িয়ে আছে । তার অন্তরে ভীতির সঞ্চার হচ্ছে, আর আফরিদ সেই ভয়ের তীব্রতা ক্রমাগত বর্ধিত করে তুলছে।

“ছাড়ুন। নিচে সকলে আমাদের অপেক্ষা করছে।”

আফরিদ তার আরক্তিম গলদেশে তীক্ষ্ণ দংশন করল। ব্যথায় কাতরোক্তি করে উঠল ন্যান্সি।

” আগে আমি তারপর বাকি সব!”

“না।”

“ওকে!”

আঁতকে উঠে ন্যান্সি ভয়ার্ত নয়নে তাকিয়ে। কাচুমাচু স্বরে বলল,

“আফরিদ এহসান, তুমি এক অশ্লীল ও অসভ্য পুরুষ!”

ক্ষীণ হাস্যে উচ্ছ্বসিত হলো আফরিদ। জ্বরের ঘোরে সর্বস্ব বিস্মৃত হয়েছে তিনি এই মুহূর্তে। দিন হওয়া সত্তাও তাঁর স্মৃতিপটে নাই।

সবলে তার কণ্ঠনালীর নিম্নভাগে দংশন করল আফরিদ। ক্ষীণ বেদনা অনুভব করছে ন্যান্সি। দন্তাঘাতে ধরে সে ন্যান্সির বস্ত্র টেনে নামিয়ে ফেলল। ন্যান্সি তাঁকে বাধা দিতে অক্ষম। আফরিদ তাকে বিছানায় কোমলভাবে শায়িত করল । আফরিদের উন্মত্ততা প্রত্যক্ষ করিতেছে ন্যান্সি। কী-ই বা বলবে তাকে? এই পুরুষ তার স্বামী, তার উপর তাঁহার অধিকার অবশ্যম্ভাবী। ন্যান্সির অন্তরেও বাধা দিবার কোনো ইচ্ছা জাগছে না।

ঝুঁকিয়া আসল আফরিদ এহসান। তার অঙ্গুলি স্পর্শ করল ন্যান্সির কণ্ঠনালী। চুম্বনের পর চুম্বনে তাকে পরিপ্লুত করে তুলল। বাধ্য হয়ে গ্রীবা জড়িয়ে ধরল ন্যান্সি। থাক না, কিছু মধুর মুহূর্ত স্মৃতির অমূল্য রত্ন হয়ে থাকুক। এই পুরুষ তো কোনো পরপুরুষ নয়, সে তাহার স্বামী।

স্পর্শের গাঢ়তা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অধরযুগল পুনরায় তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করল আফরিদ। তাঁর অবাধ্য হস্তযুগল বিচরণ করতে লাগল ন্যান্সির সর্বাঙ্গে । আরও কিছুটা ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টায় তাকে ঠেলিয়ে সরিয়ে দিল ন্যান্সি। আকস্মিক ধাক্কায় প্রচণ্ড বিরক্তিতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে আফরিদ।

জ্বরের ঘোরে আচ্ছন্ন আফরিদ রাগে গর্জন করে উঠল। নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মরিয়া উঠেছেন তিনি। ন্যান্সি বুঝল অসহায় এই পুরুষটির মর্ম। কানে কানে মৃদু, মধুর গলায় ফিসফিস করিয়া বলিল,

“প্লিজ জানকি বাচ্চা, আমার সোনা বাচ্চা। ভালোবাসি, অত্যন্ত ভালোবাসি। জান, জান, জান।”

ন্যান্সির প্রলাপপ্রবণ বাক্যালাপ শ্রবণ করে নৈঃশব্দ্যের অধরে অপ্রতিরোধ্য হাসির রেখা উদ্ভাসিত হলো। অতঃপর আচমকাই কন্যাটিকে বিস্ময়ের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে সে মৃদুকণ্ঠে উচ্চারণ করল,

“আফরিদ?”

“হুঁ!”

ন্যান্সি নিমিষকাল তার মুখপানে চেয়ে থেকে ধীরস্বরে বলল,

“চলুন, এ বার আপনার সঙ্গে সংসার করি!”

সংসার শব্দটি কর্ণগোচর হতেই আফরিদের শিরদাঁড়া বেয়ে এক শীতল শিহরণ নিমেষে প্রবাহিত হলো। বিস্ফারিত নয়নে সে মুখ তুলে তাকাল। কন্যাটি অপলক দৃষ্টিতে তার প্রতিই চেয়ে আছে।

“আর ইউ সিরিয়াস?”

“আপনার ছেলে চাই, না মেয়ে?”

এতটুকু প্রশ্নেই যেন তার অন্তর্গত সমস্ত স্থিরতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। শুষ্ক কণ্ঠে এক ঢোক গিলে নিয়ে আচমকাই সে ন্যান্সির স্নিগ্ধ মুখশ্রীর ওপর ঝুঁকে পড়ল। উন্মুখ স্নেহে বারংবার চুম্বন এঁকে দিয়ে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠল,

“ওহ গড, আই ওয়ান্ট বোথ!”

“দেব কিন্তু তার আগে বলুন মেডিসিন নেবেন?”

আফরিদ কন্যার অধর পল্লবে অধর স্থির রেখে বলে ওঠে,

“নেব!”

“এখুনি!”

“ও.কে। কিন্তু তার আগে একটু আদর!”

“একটুর বেশি নয়?”

আফরিদ দৃঢ় কন্ঠে একদম,

“একটুও বেশি না!”

“পাক্কা?”আফরিদ এ যাত্রায় হেসে ওই সরু নাকের ডগায় কামড় বসিয়ে বলল,

“পাক্কা!”

আফরিদের শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে ন্যান্সি খিলখিল রিনিঝিনি হাসিতে ফেটে পড়ল। তার সেই হাসির ধ্বনি যেন নিস্তব্ধ পরিবেশজুড়ে একরাশ বসন্তের কুসুমের মতো ছড়িয়ে পড়ল।

চলবে………🌿

Share On:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 


0 Responses

Leave a Reply