#ইশরাত_জাহান_জেরিন
বিকেল চারটে। আকাশের মেঘলা ভাবটা এখনো কাটেনি, বরং গুমোট ভ্যাপসা গরমে জনজীবন ওষ্ঠাগত। শহরজুড়ে থমথমে উত্তেজনা। আজ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিন। মীর বাড়ির অন্দরমহল থেকে শুরু করে রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকান সবখানে এখন একটাই আলোচনা, আব্রাজ মীর কি পারবে তার সিংহাসন ধরে রাখতে? নাকি নতুন কোনো চমক অপেক্ষা করছে? নির্বাচন কেন্দ্রের মূল হলরুমে তখন রেজাল্ট গণনার কাজ চলছে। বাইরে আব্রাজের বিশাল কর্মী বাহিনী স্লোগান দিচ্ছে, কিন্তু ভেতরের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আব্রাজ যে কি না সবসময় আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফোটে, সে এখন একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছছে। তার সামনে রাখা এসিস্ট্যান্ট সামিরের আনা তিন নম্বর আইসক্রিমটা গলে জল হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আব্রাজের সেদিকে খেয়াল নেই। “ভাই লবন-চিনির শরবত খাবেন? আপনার প্রেশার কি ফল করছে?” সামির বিচলিত হয়ে প্রশ্ন করল।
আব্রাজ দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “প্রেশার না, আমার কপাল ফল করছে সামির! ওই আরযান ভাইয়ার জন্য আজ সব শেষ হতে বসেছে।”
আসলে ঘটনাটা ঘটেছিল আজ সকালেই। নির্বাচন মানেই টাকার খেলা। ভোট চুরির জন্য যে বিশেষ টিমটা হায়ার করা হয়েছিল, তাদের আজ সকালে বিশাল অঙ্কের একটা পেমেন্ট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আরযান গতকাল রাতেই আব্রাজের সমস্ত বিজনেস অ্যাকাউন্ট সিজ করে দিয়েছে। পকেটে ক্রেডিট কার্ড আছে, কিন্তু সেখানে এক পয়সাও লেনদেন হচ্ছে না। ক্যাশ যা ছিল, তা গতরাতেই শেষ। টাকা ফুল ক্লিয়ার না হলে ‘কাজ’ হবে না বিপক্ষ দল আর বুথ দখলকারীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
এদিকে রেজাল্ট কাউন্টিংয়ের প্রসেসে একের পর এক ধাক্কা আসছে। আব্রাজ নিজের মনেই বিড়বিড় করছে, “এক বিশ টাকার বউয়ের চক্করে পড়ে আজ আমার কোটি টাকার ক্যারিয়ারের বারোটা বাজল!”
হলরুমের এক কোণে ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে নৈশি। তার চোখেমুখে অদ্ভুত এক তৃপ্তি। পরনে সাধারণ সুতির শাড়ি, চুলে খোঁপা। সেও এই কেন্দ্রের প্রার্থী। নৈশি জানে, আব্রাজ এখন কতটা ছটফট করছে। সে ধীর পায়ে আব্রাজের দিকে এগিয়ে গেল। আব্রাজ তাকে দেখেই জ্বলে উঠল। “কি? নিজের জয় দেখতে এসেছো? নাকি আমার পতন?” আব্রাজ রুক্ষ গলায় বলল।
নৈশি মুচকি হেসে বলল, “বউকে এভাবে কেউ বলে? আমি তো ভাবলাম স্বামীর বিজয়ে মালা পরাতে আসব। কিন্তু এখানে তো দেখছি আপনি আইসক্রিম দিয়ে গোসল করছেন।”
“চুপ থাকো নৈশি! রাজনীতি আর ঘর এক করো না।” আব্রাজ ঘামতে ঘামতে বলল। সে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “একদিনের বউয়ের কত চোপা।”
নৈশি নিচু হয়ে আব্রাজের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “মীর আব্রাজ, রাজনীতিতে সততা লাগে না ঠিকই, কিন্তু ব্যাকআপ লাগে। আপনার তো নিজের পকেটই এখন ভাইয়ার দখলে। ভাবুন তো, আপনার ওই বিশ টাকার বউ যদি আজ এমপি হয়ে যায়, তবে আপনার কী হবে?”
আব্রাজ থমকে গেল। সত্যি তো! নৈশি যদি জিতে যায়, তবে তো তাকে বউয়ের আঁচলের নিচে থাকতে হবে। এটা মীর বাড়ির বড় ছেলের ইগোতে প্রচণ্ড আঘাত।
অন্যদিকে, কেন্দ্রের বাইরে গাড়ির ভেতরে বসে আছে সাঁঝ আর আব্রাজের মা। সাঁঝ বারবার ফোন চেক করছে। আরভিদ ভাইয়ের কোনো মেসেজ এলো কি না, সেটা নিয়ে তার যত ভয়। আর আব্রাজের মা কুলকুল করে ঘামছেন। তিনি এক ছেলেকে নিয়ে শান্ত হতে না হতেই আরেক ছেলে শত্রু নিয়ে ঘরে ঢুকেছে। তার ওপর আরযানের ওই কঠিন শাস্তি। সাঁঝ ফিসফিস করে বলল, “আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আব্রাজ ভাই আজ হারবে। আর আব্রাজ ভাই হারলে কি নৈশি আপু আমাদের বাড়িতেই থাকবে? ভাবো তো, আব্রাজ ভাই ভাত চাইলে নৈশি আপু হয়তো বলবে আগে বিল পাস করো, তারপর খাবার পাবে!”
মা কপালে হাত দিয়ে বসে রইলেন। “চুপ কর সাঁঝ! আরযানের শাসন আর আব্রাজের পাগলামি এই দুইয়ের মাঝে পড়ে আমাদের জীবনটা তেজপাতা হয়ে গেল।” ঠিক সেই মুহূর্তেই হলরুমের ভেতর থেকে একটা শোরগোল ভেসে এলো। রিটার্নিং অফিসার মাইক হাতে নিলেন। আব্রাজ সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার বুক দুরুদুরু করছে। সামির শেষ চেষ্টা হিসেবে একটা ঠান্ডা পানির বোতল এগিয়ে দিল। আবরাজ এক চুমুকে অর্ধেক শেষ করে ফেলল। অফিসার ঘোষণা করলেন, “নির্বাচন কেন্দ্রের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, মীর আব্রাজ এবং নৈশি ইসলামের মধ্যে ভোটের ব্যবধান এখন মাত্র দশ! এখনো তিনটি বুথের ফলাফল আসা বাকি।”
আব্রাজের কপালে ঘাম এবার ঝরঝর করে পড়তে শুরু করল। দশ ভোট! পকেটে টাকা থাকলে এই দশ ভোট কেন, দশ হাজার ভোট কেনা যেত। কিন্তু আরযানের সেই ‘ভালোবাসা কত টাকা কিলো’ থিওরি আজ আব্রাজকে সত্যি রাস্তায় নামিয়ে ছেড়েছে।
নৈশি তখনো শান্ত। সে ডায়েরিতে কী যেন লিখছে। আব্রাজ আড়চোখে সেদিকে তাকিয়ে ভাবল এই মেয়েটা কি আসলেও মানুষ? নাকি ডাইনি? কাল রাতে বাসর হওয়ার কথা ছিল, আর আজ সে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে।
–
হলরুমের ভেতরের থমথমে ভাবটা যেন কাটছেই না। শেষ তিন বুথের ফলাফল যখন কম্পিউটারে এন্ট্রি হচ্ছিল, তখন বিরোধী দল, বিশেষ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী আর জামায়াত শিবিরের নেতাদের মুখে এক চিলতে বিজয়ের হাসি। তাদের মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়ার জোগাড় হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত। আসলে, আব্রাজ আর নৈশির এই বিয়েটা তো আর এমনি এমনি হয়নি। এর পেছনে ছিল এই দুই দলের এক গভীর রাজনৈতিক চাল। তারা ভেবেছিল, দুই হেভিওয়েট প্রার্থীকে গোপনে বিয়ে দিয়ে একটা পারিবারিক আর রাজনৈতিক নাটক তৈরি করবে। এতে আব্রাজের মনোযোগ সরবে, মীর বাড়ির ভোটব্যাংক ভাঙবে, আর মাঝখান থেকে তারা ফায়দা লুটে ছক্কা মারবে। এত পরিকল্পনা করে, এত কষ্ট করে যে আব্রাজ আর নৈশির বিয়েটা তারা দিল এখন দেখা যাচ্ছে সেই গুটি তাদের নিজেদের দিকেই উল্টে গেছে! রিটার্নিং অফিসার চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে চূড়ান্ত শিটটা হাতে নিলেন। মাইকটা অন হতেই পুরো হলরুমে পিনপতন নীরবতা। সামির তখন চোখ বন্ধ করে মনে মনে সব পীর-আউলিয়ার নাম জপছে। আব্রাজ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখ নৈশির দিকে। আর নৈশি তখনো তার স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ধরে রেখেছে।
“সর্বশেষ প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী…” অফিসারের গম্ভীর কণ্ঠস্বর লাউডস্পিকারে প্রতিধ্বনিত হলো, “স্বতন্ত্র এবং জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীকে বিপুল ব্যবধানে পেছনে ফেলে, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর মাত্র সাত ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন মীর আব্রাজ রোদ!” মুহূর্তের মধ্যে হলরুমের বাইরে আব্রাজের কর্মী-সমর্থকদের গগনবিদারী স্লোগানে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল। জয় বাংলা, জয় মীর আব্রাজ ধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত।
ফলাফল শোনামাত্রই হলরুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা স্বতন্ত্র আর জামায়াত নেতাদের মাথায় যেন আক্ষরিক অর্থেই হাত উঠে গেল! তাদের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, তারা এইমাত্র কোনো জীবন্ত ভূত দেখেছে। তাদের সব পরিকল্পনা, সব ষড়যন্ত্র একদম পানিতে ভেসে গেল। এত নাটক করে দুই মেরুর দুই মানুষকে এক ছাদের নিচে এনেও আব্রাজ মীরকে হারানো গেল না! মাঝখান থেকে কোনো লাভই হলো না, উল্টো মীর বাড়ির ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত হলো।
এদিকে নৈশি সব হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার এতদিনের নিখুঁত হিসাব, তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের প্রথম বড় স্বপ্নটা এভাবে মাত্র সাত ভোটের জন্য ধুলোয় মিশে যাবে, সে ভাবতেও পারেনি। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল, যা সে তীব্র অভিমানে চেপে রাখার চেষ্টা করল।
আব্রাজ এতক্ষণ ঘামছিল, কিন্তু বিজয়ের ঘোষণা শুনতেই তার ভেতরের সেই চেনা, উদ্ধত এবং অহংকারী রূপটা মুহূর্তে ফিরে এলো। সে ধীর পায়ে নৈশির একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার পকেটে টাকা ফ্রিজ থাকতে পারে, কিন্তু তার রাজকীয় ইগো এখন এভারেস্টের চূড়ায়।
আব্রাজ পকেটে হাত দিয়ে যদিও পকেট খালি তবুও একটা বাঁকা হাসি হেসে নৈশির খুব কাছে ঝুঁকে এলো। ফিসফিস করে বলল, “কী যেন বলছিলে এমপি সাহেবা? বউয়ের আঁচলের নিচে থাকতে হবে আমাকে? মীর আব্রাজকে হারাতে হলে শুধু রাজনীতি জানলে হয় না নৈশি, মীর বংশের রক্ত থাকতে হয়।”
নৈশি কোনো কথা না বলে শুধু বড় বড় চোখে আব্রাজের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সমস্ত জেদ আর অহংকার যেন এই এক পরাজয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
“কাল রাতে বাসরটা হয়নি পলিটিশিয়ান বউ।” আব্রাজ নৈশির কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা কিন্তু কড়া গলায় বলল, “আজ রাতে ঘরে চলো। ভোট তো শেষ, এবার মীর আব্রাজের নিজস্ব আদালত শুরু হবে। মীর বাড়ির অবাধ্য ছেলেকে জব্দ করতে এসে নিজেই যে ফেঁসে গেছো, তার মজাটা আজ হাড়েমজ্জায় বুঝিয়ে দেব।”
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। গাড়ির ভেতরে বসে সাঁঝ আর আব্রাজের মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। সাঁঝ হাততালি দিয়ে বলল, “আব্রাজ ভাই জিতে গেছে! এবার নৈশি আপুর খবর আছে। মীর বাড়ির ছেলেদের সাথে পাঙ্গা নেওয়া যে কত বড় ক্রাইম, সেটা এবার ও বুঝবে।” কিন্তু সাঁঝের নিজের বুকের ভেতর তখনো ধকধক করছে। আব্রাজ ভাই তো জিতে নিজের মজা বুঝানোর মিশন শুরু করছে, কিন্তু তার নিজের কী হবে? আরভিদ ভাই যদি কাল সকালে আরযান ভাইকে তার আর স্বাধীনের ব্যাপারটা বলে দেয়?
–
চেম্বারের বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা একটু বেড়েছে। এসির হিমশীতল বাতাসের মধ্যে বসে মীর আবরিজ রাজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে জটিল ‘কেস স্টাডি’র সমাধান করে ফেলেছে। মাথায় নিউরনের ঝড় বইয়ে দিয়ে সে অবনীকে চিরদিনের মতো নিজের করে নেওয়ার এমন এক ফন্দি এঁটেছে, যা শুনলে দুনিয়ার কোনো মেডিকেল কাউন্সিল তার ডাক্তারি লাইসেন্স রাখবে না। কিন্তু রাজের এখন একটাই নীতি। প্রেমে আর মীর বাড়ির ছেলেদের ডিকশনারিতে কোনো নিয়ম খাটে না।
অবনীকে চেম্বারে বসিয়ে রেখে রাজ ধীর পায়ে বাইরে ওয়েটিং রুমে এলো। সেখানে চিন্তিত মুখে সোফায় বসে আছেন অবনীর বাবা। রাজকে আসতে দেখে তিনি তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়ালেন। “ডাক্তার সাহেব! আমার মেয়েটা এখন কেমন আছে? ও কি পুরোপুরি সুস্থ?” ভদ্রলোকের গলায় একজন অসহায় বাবার আকুতি।
রাজ মুখে অত্যন্ত গম্ভীর, পেশাদার এবং চিন্তাশীল একটা ভাব ফুটিয়ে তুলল। চশমাটা নাকের ওপর ঠিকঠাক করে একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “দেখুন আঙ্কেল, সামাজিকভাবে অবনী এখন সুস্থ। ওর প্যানিক অ্যাটাক কমেছে, ঘুমও হচ্ছে। কিন্তু… একটা বড় ‘কিন্তু’ থেকে গেছে।”
অবনীর বাবা চমকে উঠলেন, “কীসের কিন্তু বাবা?”
রাজ চারপাশটা একটু দেখে নিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “অবনীর এই পুরো মানসিক সমস্যার মূল শিকড়টা কোথায়? ওর আগের বিয়েটা, তাই তো? সেই বিয়ে নামক ট্রমাটা ওর অবচেতন মনে একটা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। এখন ও বাইরে ভালো দেখালেও, মনের ভেতরে পুরুষের প্রতি, বিয়ের প্রতি ওর একটা তীব্র ভয় আর অবিশ্বাস লুকিয়ে আছে। এই ট্রমা থেকে ও আদেও বের হতে পেরেছে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য ওকে আবার বিয়ে করতে হবে।”
“কী!” অবনীর বাবা আকাশ থেকে পড়লেন। চোখ দুটো চড়কগাছ করে বললেন, “তুমি এ কী বলছ ডাক্তার সাহেব? মেয়েটা সবে একটু সুস্থ হলো, আর এই অবস্থায় তাকে আবার বিয়ে দেব? কার সাথে দেব? যদি আবার কোনো অঘটন ঘটে?”
ভদ্রলোককে এভাবে ভড়কে যেতে দেখে রাজ মনে মনে হাসল, কিন্তু মুখে আরও গম্ভীর হয়ে বলল, “আরে আঙ্কেল! আপনি ভুল বুঝছেন। আমি কি সত্যি সত্যি বিয়ের কথা বলছি? এটা হচ্ছে সাইকোলজির একটা বিশেষ মেথড। যাকে বলে ‘রোড-ব্লক থেরাপি’। আমরা একটা ফেইক ম্যারেজ বা নকল বিয়ের আয়োজন করব। এটাও আসলে একটা থেরাপি সেশন।”
“নকল বিয়ে? সেটা আবার কেমন থেরাপি?” অবনীর বাবা এখনো পুরোপুরি কুয়াশা কাটিয়ে উঠতে পারছেন না।
রাজ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বুঝিয়ে বলতে লাগল, “হ্যাঁ, একদম নকল। একটা সাজানো বাসর ঘর থাকবে, একজন ভুয়ো কাজী থাকবে। আমরা দেখব, বিয়ের এই পুরো প্রসেসটার মুখোমুখি হলে অবনী কেমন রিয়্যাক্ট করে। ও যদি ভয় না পেয়ে স্বাভাবিক থাকে, তবে বুঝতে হবে ওর ট্রমা কেটে গেছে। আর যদি ও প্যানিক করে, তবে আমি তো ডাক্তার হিসেবে পাশেই আছি, সামলে নেব। আপনি শুধু আমার ওপর ভরসা রাখুন। আপনার মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য এই পরীক্ষাটা করা খুব জরুরি।”
অবনীর বাবা কিছুক্ষণ রাজের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। রাজের চোখে তখন একজন সৎ, দায়িত্ববান চিকিৎসকের আকুলতা। ভদ্রলোক একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললেন, “তুমি যখন বলছ বাবা, তখন নিশ্চয়ই ভালোর জন্যই বলছ। আমি রাজি। কিন্তু এই নকল বিয়ের পাত্র কোথায় পাবে?”
রাজ মনে মনে বলল, “পাত্র তো আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে, মীর বংশের সুযোগ্য সন্তান!” তবে মুখে বলল, “বাইরের কাউকে জড়ালে তো জানাজানি হয়ে যাবে আঙ্কেল। তাই থেরাপির স্বার্থে এই স্যাক্রিফাইসটা আমিই করব। আমিই নকল বরের পার্টটা প্লে করব। যাতে ও কোনো রকম রিস্কে না পড়ে।”
অবনীর বাবা রাজের হাত দুটো চেপে ধরলেন, “তোমার এই ঋণ আমি কীভাবে শোধ করব বাবা! তুমি আমার মেয়ের জন্য এত কিছু করছ!”
রাজ মনে মনে ভাবল, “ঋণ শোধের ব্যবস্থা তো আজ রাতেই করছি আঙ্কেল। একেবারে কাজী, দেনমোহর সব রিয়েল থাকবে!”
পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজ আর দেরি করল না। তার পরিচিত এক আসল কাজীকে আগে থেকেই ফোন করে চেম্বারের পেছনের দরজা দিয়ে ডেকে এনেছিল। কাবিননামার কাগজে দেনমোহরের ঘরটায় মোটা অঙ্কের টাকাও বসানো হয়ে গেছে। বাড়ির লোক, অবনী কিংবা অবনীর বাবা কেউ যাতে বিন্দুমাত্র টের না পায়, সেজন্য পুরো বিষয়টাকে ‘সাইকোলজিক্যাল ড্রামা’ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অবনী শুধু জানবে এটা তার চিকিৎসার শেষ ধাপ, একটা থেরাপি সেশন। অথচ সেশন শেষে সে যখন সই করবে, তখন সে আর ডক্টর রাজের পেশেন্ট থাকবে না, হয়ে যাবে মীর আবরিজ রাজের বৈধ স্ত্রী।
কাজী সাহেব যখন রেজিস্ট্রি খাতা নিয়ে রাজের পার্সোনাল চেম্বারে ঢুকলেন, তখন অবনী ভ্রু কুঁচকে তাকাল। রাজ অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, “অবনী, ভয় পেও না। এটা তোমার লাস্ট সেশন। একটা থেরাপি গেম। জাস্ট সাইন করে দাও, আর কবুল বলে দাও। সাক্ষীও রেডি, দেনমোহরও। তারপর তুমি চিরকালের মতো মুক্ত।”
অবনী বুঝতে পারল না এই ‘মুক্ত’ শব্দের আড়ালে রাজ তাকে কোন বাঁধনে বাঁধতে চলেছে। বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টির শব্দটা আরও মিষ্টি শোনাচ্ছে। মীর বাড়ির ছেলেদের রক্তে বুঝি এই পাগলামিটাই মিশে আছে… যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ, সেখানেই তারা আইন ভেঙে, নিয়ম মচকে ভালোবাসা ছিনিয়ে আনে।
চলবে?
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৩
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৬
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৩
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২০
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৯
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৫
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২৯
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৩
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২১
-
পরগাছা পর্ব ৮