Golpo romantic golpo ভালোবাসি সুচরিতা

ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ২০


ভালোবাসি সুচরিতা— ২০

  শ্রীমঙ্গলের টি বাংলোগুলো এত রাজকীয় যে একবার এখানে এসে পড়লে এখান থেকে যাওয়ার জন্য মন মানবে না। রাত হলেই বাংলোগুলোর আশেপাশে ঝুপ করে নেমে আসে কুয়াশা। শীত শীত আবহাওয়ায় জমে উঠে চা বাগানের মাঝে থাকা এই বাংলোগুলো। 

 জোহরা যেই ঘরটিতে উঠেছে সেই ঘরটির তো আলাদা রকমেরই সৌন্দর্যতা। বিরাট একটি রুম। ভারী কাঠের খাট, আলমারি, বসার কেদারা, একপাশে ইট দিয়ে বাঁধানো একটি চিমনি। শীতকালে অতিথিরা যেন আরামবোধ করেন তা-ই হয়ত এগুলো বানানো হয়েছে। এইসব বাংলোগুলোতে তো দেশভাগের আগে থাকতেন ব্রিটিশ সাহেবেরা। এখন যুগের পরিবর্তনে নামীদামী অতিথিরা এসে থাকেন। যাবের শিকদার বেশ সুপরিচিত আইনজীবী বলেই হয়ত এখানে থাকার ব্যবস্থা করে নিতে পেরেছেন। সাধারণ কেউ হলে সম্ভব হতো না। 

 জোহরা ওর হাত পায়ে সুগন্ধিযুক্ত কিছু একটা মাখছে মনোযোগ দিয়ে। আদতে ওর মনোযোগ হাতে পায়ে নাকি অন্য কোথাও তা কেউ মনের ভেতর না ঢুকলে বোঝা সম্ভব নয়। প্রেমা এই ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে বহুক্ষণ হবে। এবং ওর চোখ জোহরার দিকেই। আপা মনোযোগ দিয়ে মাখছে তো মাখছেই। সাধারণত আপার এতটা সময় লাগে না কিছুতেই। কিন্তু আজ যেন তার সবকিছুতেই গভীর ধ্যান। সারাদিনও এমন ছিলো না। এই সিলেটে আসার পর থেকে এমন হচ্ছে। 

 প্রেমার আর ধৈর্য হলো না এখানে দাঁড়িয়ে থাকার। বিরক্ত হয়েই ও ঢুকল। কাঠের একটি চেয়ার টেনে বসল বিছানার কাছে। ওদের বামপাশে থাকা জানালাটা খোলা। ফুরফুরে বাতাস এসে গায়ে লাগছে বেশ। গা শিরশির করছে ঠান্ডায়। প্রেমার তো গায়ে এতটাই কাঁটা দিয়ে উঠলো যে ওর গলায় ঝুলানো স্কার্ফটা ও পেঁচিয়ে নিলো শরীরে। অথচ আপার শাড়ি ভেদ করে পিঠে, পেটে বাতাস লাগছে কিন্তু সে নড়ছেও না। প্রেমা যে সামনে এসে বসেছে তা-ও হুঁশ নেই। 

প্রেমা বিরক্ত হলো। কপাল কুঁচকে মৃদু ধাক্কা দিলো জোহরার বাহুতে,

“এই আপা, কী হয়েছে তোমার? সেই কতক্ষণ যাবত এক ধ্যানে কী মাখছো? ছাল-বাকল উঠিয়ে ফেলবে না-কি শরীরের?”

  ধ্যানমগ্ন জোহরার শরীরে আচমকা ধাক্কাটা এতটাই অসহনশীল ছিলো যে ওর এক হাতে থাকা ক্রিমের কৌটোটা ছুটে পড়ল বিছানায়। বেদিশার মতো হতভম্ব হলো, “কে? কী? কী হয়েছে?”

 প্রেমার সন্দেহ ঘনীভূত হলো আরও। আপা যেন আজ নিজের মাঝেই নেই। হলো কী তার?

 “আমি প্রেমা, আপা। কী হয়েছে তোমার? কী ভাবো এত?”

 প্রেমাকে সামনে দেখে ভড়কে যাওয়া জোহরা স্থির হলো। বুকে থুতু দিয়ে থামালো বুকের কম্পন। নিজেকে বুঝিয়ে ধাতস্থ করে কিছু হয়নি এমন ভাব করে বলল,

 “তুই এত রাতে এখানে কী করিস? ভয়ই তো পাইয়ে দিয়েছিলি!”

“ভয়? আমি সেই কখন তোমার সামনে এসে বসেছি। তুমি এটাও খেয়াল করোনি, আপা?”

 “অনেকক্ষণ আগে এসেছিস? কোথায়! খেয়াল করিনিতো।” জোহরার চোখে-মুখে বিস্ময়। ওর যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না প্রেমা আগে থেকে এখানে বসে আছে।

 প্রেমা বিস্মিত জোহরার দিকে তাকিয়ে ছোটো শ্বাস ফেলে। অতঃপর আলগোছে উঠে গিয়ে ত্রস্ত হাতে আটকায় জানালাগুলো। ওর শীতে ধরে গিয়েছে এই ঠান্ডা বাতাসে। অথচ আপার কোনো খবরই নেই। 

 জানালা আটকাতে আটকাতে কি যেন ভাবে। এরপর আচমকাই প্রশ্ন করে,

 “তুমি রেঁস্তোরায় আমার ডাক পেয়ে বারান্দা থেকে ওভাবে ছুটে এসেছিলে কেন? এসেই তাড়া দিয়ে বেরিয়ে গেলে আমাকে নিয়ে। কী হয়েছিলো তোমার? আমাকে বারান্দাতেও যেতে দিলে না।”

 হঠাৎ রেঁস্তোরার কথা উঠতেই জোহরার বুকে কাঁপন জাগে। মনে পড়ে যায় বহু সাধনার প্রিয় পুরুষটির সেই চেহারাটির কথা। যে জোহরার দিকে তাকিয়ে ছিলো অবাক হয়ে। জোহরা ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে তখন প্রায় দিশেহারা। বোনের ডাক পেতেই টু শব্দ না করেই বোনকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলো। যদি মানুষটা বুঝে যেতো ও সুচরিতা তখন কেমন হতো? মানুষটা কী বলতো ওকে? অবাক হতো? তাকিয়ে থাকতো নিশ্চয় বোকার মতো। সুচরিতা দেখার জন্য মানুষটার যা আকাঙ্ক্ষা একবার দেখা পেলে সব থমকে যেতো না উনার?

 বোনকে থম মেরে থাকতে দেখে প্রেমার ক্রমশই সন্দেহ গাঢ় হয়। বোনের বারংবার এই ভাবনায় ডুবে যাওয়া সাধারণ লক্ষ্মণ তো নয় মোটেও। কিছুতো গড়বড় হচ্ছেই।

… 

  মেজবাহ্’র কাল সারারাত ঘুম হয়নি। ছটফট করেছে সারারাত। কতবার যে টেলিফোন কানে তুলেছে আর রেখেছে তার হিসেব নেই। ভেবেছে এই বুঝি অপরপাশ হতে মেয়েটা ফোন তুলে নিবে। এই বুঝি সেই গভীর কণ্ঠ নিয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে ফিসফিসিয়ে বলবে, এত রাতে টেলিফোন কেন? 

কিন্তু এর কিছুই হলো না। মেয়েটা ফোনও তুলল না, গভীর কণ্ঠে প্রশ্নও করল না আর মেজবাহ্’রও ঘুম হলো না। একটি মেয়ে তার এমন করে ঘুম কাঁড়বে সে কি জানতো? জানলে এই মায়ায় ভুলতো কি?

  মেজবাহ্’র নিদ্রাহীন চোখ দুটো লালচে হয়ে আছে। ও যাচ্ছে এখন বাড়ির ভেতরে। কিছুক্ষণ আগে সিকান্দার এসে বলে গেলো ওর জরুরী তলব পড়েছে। নয়তো আজকালতো ঐ বাড়িতে পা-ও রাখা হয় না। নিজের বাড়ি, নিজের ঘর আজ সব যেন পর। অচেনা। কতদিন বাড়িতে হাঁটে না ও! তাই কেবল অস্বস্তি লাগে বাড়িটায় পা দিলেই। মনে হয় অন্যের জায়গায় চলে এসেছে। 

 দোতালার ডাইনিং রুমটায় আজ উপস্থিত সকলে। চেয়ার পেতে বসে আছে খাবার নিয়ে। হয়ত মেজবাহ্ আসার অপেক্ষাতেই কেউ মুখে খাবার তুলেনি। 

মেজবাহ্ এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে। পেছনে দাঁড়ানো সিকান্দারও। 

ছেলেকে দেখতে পেয়ে রেণুকা বেগম এগিয়ে এলেন। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন আলগোছে, 

“মুখ এমন দেখাচ্ছে কেন? ঘুমোয়নি রাতে?”

 স্ত্রী’র কথায় কবির শেখ চিন্তিত চোখে তাকালেন ছেলের দিকে। মাথায় চিন্তা চেপে আছে উনার। ছেলেটা দল থেকে বিচ্যুত হয়েই কি ঘুমোতে পারছে না? উনারও তো ঘুম হয়নি। ছেলেটার ছোটো থেকেই রাজনীতির প্রতি নেশা। সেই রাজনীতি থেকে চ্যুত হওয়া ওর জন্য চাট্টিখানি কথা তো না।

মেজবাহ্ মায়ের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলো। হাতের তালুতে মায়াভরা চুমু খেয়ে মাকে আশ্বস্ত করে,

“ঘুমিয়েছি। হয়ত একটু বেশি ঘুম হয়েছে তাই এরকম লাগছে। চিন্তা করো না, আম্মা।” কথা শেষ করেই ও এগিয়ে এলো। ওর জন্য খালি রাখা চেয়ারটায় বসলো। আরেকটি চেয়ার টানতে টানতে ডাকল সিকান্দারকে,

 “এই ব্যাটা, এখানে আয়। দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”

  সিকান্দার তখনো দরজায় দাঁড়ানো। ভেতরে ঢোকার মতো অনাধিকার চর্চা সে করেনি। এই পারিবারিক আলাপে তার থাকাটাও যে বেমানান।

মেজবাহ্’র ডাকে ও ভেতরে এলো না। সেখানে দাঁড়িয়েই রইল, 

“ভাই, আমি বাহিরে গিয়ে কাজগুলো দেখি। আপনি খেয়ে আসেন।”

 “তোকে আসতে বলেছি, আসবি। এত কথা কীসের?”

 “আহা, না আসতে চাইলে জোর করছো কেন ওকে?” দোলন শেখ ওদের কথায় ফোঁড়ন কাটলেন। চায়ের কাপটা তুলে নিলেন আয়েশ করে। সিকান্দারের উপস্থিতি যে তিনি চাচ্ছেন না তা পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিলেন। 

 মেজবাহ্ কি আর সেই সবের ধার ধারা মানুষ? ও বরং চোখ রাঙালো। রুক্ষ ভাষায় বলল,

“আমি বলেছি মানে ও আসবে। ওর মন না চাইলেও ওকে আসতে হবে। সিকান্দার, এদিকে আয়। নাকি আমি উঠে যাব?” 

 দোলন শেখ আর হিমেলের বিশেষ পছন্দের নয় সিকান্দার। ওর এই কথা অবগত তাই ও আসতে চাচ্ছিল না। কিন্তু মেজবাহ্’র কথাও অমান্য করা ওর ধাতে নেই। অগত্যা ওর আসতেই এলো। বসলো মেজবাহ্’র পাশের চেয়ারটাতেই।

টুপু বেগম সিকান্দারের সামনে প্লেট দিলো। গরম গরম ভুনা খিচুড়ি দিলো সেই প্লেটে। হাস্যরত মুখ তার,

 “আসতে চাও না কেন তুমি, সিকান্দার? আমরা মেজবাহ্’র যেমন পরিবার তেমন তোমারও তো পরিবার তাই না? মাঝে মাঝে এসে আমাদের সাথে খাবার খাবে। পরিবারের সাথে খেলে মন ভরে। বুঝলে?”

 টুপুর কথা বরাবরই সুন্দর। ও মানুষের সাথে গুছিয়ে কথা বলে। সিকান্দারের তাই পছন্দ এই মহিলাটিকে। কেবল টুপু নয় বাকিরাও বেশ ভালো। 

  পরিবার কথাটি সিকান্দারের বুকে গিয়ে বিঁধল। পুরুষ মানুষ তো আর যেখানে-সেখানে কাঁদতে পারে না তাই ও বোঝাতে পারল না কেঁদে যে এই কথাটি ওর ঠিক কতটা ভালো লেগেছে।

 রেণুকা বেগমও টুপুর কথায় সম্মতি জানালেন। সিকান্দারের পাতে তুলে দিলেন সব রকমের পদ। আজ রিমঝিমকেও দেখা যাচ্ছে। বেশ চঞ্চল পায়েই কাজ করছে সে। মুখে হাসি বিদ্যমান। মেজবাহ্ ঘরে আসার সময় এই বিষয়টিও এক ফাঁকে খেয়াল করেছে। অন্যান্য সময় এত হাসি মেয়েটার মুখে দেখা যায়নি। 

 মেজবাহ্ খাবার মুখে তুলল। সে জানে এখানে তাকে কিছু বলার জন্যই ডাকা হয়েছে। যতক্ষণ ও খাবার মুখে না তুলছে ততক্ষণ কেউ বলবে না। 

 এবং হলোও তাই। খাবার মুখে নিতেই ওর দাদা মণির শেখ গলা পরিষ্কার করে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালালেন। কথা বলার মহল তৈরি করলেন। 

 “মেজবাহ্ আজ আমরা শ্রীমঙ্গল যাওয়া কথা ভাবছি। অনেকদিন বাড়ির সকলে কোথাও যায় না। ভাবলাম সেখানে যাই, ঘুরেও আসি মনও হালকা হবে। তুমি যদি রাজি থাকো তাহলে ফাইনাল করব।”

 মেজবাহ্’র খাবারেই দৃষ্টি। অত গা করল না। 

ওর দাদী আবার বিশেষ অপছন্দ করেন উনার স্বামীর কথায় কেউ প্রতিত্তোর না করলে। তাই তিনিই আগ বাড়িয়ে বললেন,

 “কী ভাইসাহেব, কিছুতো বললা না। হ, না কিছু কও! তোমার দাদাজান তো জিগাইলো কিছু তোমারে।”

 “আমি এখানে বলার কে? দাদাজান সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মানেই শিরোধার্য। আমাদের এখানে কিছু বলার নেই।” খাবারের পাতে হাত নাড়াতে নাড়াতেই বলর মেজবাহ্।

 “তুমিও যাবে আমাদের সাথে। পরিবারের সাথে কতদিন তুমি সময় কাটাও না বলোতো? যাবে না?” মণির শেখ বেশ ভালো করেই আজ মেজবাহ্’কে ধরেছেন। সচারাচর তিনি মেজবাহ্’কে কিছুই বলেন না। তার নাতি যেভাবেই চলুক তিনি সম্মতি দেন। 

মেজবাহ্’র যাওয়ার ইচ্ছে নেই। পরিবারের সাথে কোথাও যাওয়ার বিষয় সে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু দাদাজানের মুখের উপর নিষেধ করতেও কেমন যেন লাগছে তার। নিশ্চয় আব্বাই দাদাজানকে বলেছেন। আব্বা হয়ত ভাবছে ওর পদ হারিয়ে ও দিকভ্রান্ত। মন খারাপ। তাই মন ভালো করতে চাচ্ছেন। কিন্তু এমনতো কিছুই হয়নি তার। এ কথা বোঝায় কী করে?

 রুদ্র শান্তশিষ্ট বাচ্চা। বড়োদের কথার মাঝে ও কথা বলে না কখনোই। কিন্তু আজ বলল। ওর স্নেহতুর গলায় আহ্লাদ করল ভাইয়ের কাছে,

 “ভাইজান, তুমি চলো। তুমি গেলে অনেক আনন্দ হবে।”

আধো আধো কথা। মায়া মায়া চোখ করে তাকিয়ে আছে মেজবাহ্’র উত্তরের আশায়। মেজবাহ্ ওর এই অবুঝ ভাইটির দিকে তাকিয়ে হাসল। এমন মায়ার বায়না ও ফেরায় কী করে? কঠিন হতে পারে ও কিন্তু হৃদয়হীন তো নয়।

 “আচ্ছা, তৈরি হও। সিকান্দার, তুই আগে গিয়ে ওখানের দু’টো টি-বাংলো গোছাতে বল। আমরা যাচ্ছি সেখানে।”

 মেজবাহ্’র কথা থামতেই রুদ্র আনন্দে চিৎকার করে উঠল। রূপসা বেগম হাত বুলিয়ে দিলেন রুদ্রর মাথায়। এই বাচ্চাটা শোরগোলে ভরিয়ে রাখে ঘরটা নয়ত কেউ তো কারো সাথে দুদণ্ড কথাও বলে না। 

…

দুপুর পেরুতেই জোহরা, প্রেমা, টুইটুবানি বেরিয়েছে। জোহরার পরনে হলুদ শাড়ি। হলুদ শাড়ির আঁচল কোমড়ে গুঁজেই বের হলো সে চা বাগানটি দেখতে। চারপাশে বিস্তর সবুজ। চোখ মেললেই চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। পথগুলো কি সুন্দর! ছোটো ছোটো নুড়ি দিয়ে ঢাকা। সিনেমায় যেমন দেখে ঠিক তেমন। 

 জোহরার মগ্ন ধ্যান গিয়ে আটকালো দূরের ছুটন্ত গাড়িগুলোর দিকে। কতগুলো গাড়ি পর পর ঢুকছে চা বাগানে। জোহরা তাকিয়ে রইল সে দিকে। 

চলবে…

-মম সাহা

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply