ভালোবাসি সুচরিতা— ১৯
রাতের সিক্ত সিলেটের আবহাওয়া ধীর। ফুরফুরে হাওয়া বইছে বেনামি ভাবে। চারপাশে বর্তমানে শীতের ঋতু নয়। তবে জোহরার মনে হলো ওর ভীষণ শীত করছে। এতই শীত যে গা অব্দি কাঁপছে। কী অদ্ভুত! এমনটাতো হওয়ার কথা নয়।
মেজবাহ্ শেখ ওর পেছনে দাঁড়ানো বলেই কি এভাবে গা কাঁপছে? এত শীত লাগছে? চারপাশটা বরফের সুইজারল্যান্ড হয়ে গিয়েছে?
ও যন্ত্রের মতো বসে আছে ঠাঁই। নড়চড় করার শক্তি নেই। জড়বস্তু হয়ে গিয়েছে যেন সেকেন্ডেই।
“কিছু মনে করবেন না, আপনার আঁচলটি কি একটু সামলাবেন? বিরক্ত করছে বড্ড।” আচমকাই মেজবাহ্’র ভরাট কণ্ঠ এসে লাগলো জোহরার কানে। বিশাল প্রশস্ত বারান্দাটি জুড়ে রয়েছে কেবল ওরাই দু’জন। তাহলে আঁচল সামলানোর কথাটি কি লোকটা ওকে বলল? ওর আঁচল বিরক্ত করছে?
দোলনায় বসে থাকা স্থির মেয়েটির দিকে মেজবাহ্ ভ্রু দু’টি কুঞ্চিত করে তাকিয়ে আছে। সে আসছে পর থেকেই খেয়াল করছে মেয়েটা নড়ছে না। কোনো টু শব্দ নেই। সচরাচর মেজবাহ্’র সান্নিধ্য পাওয়া এমন অল্প বয়সী মেয়েরা এতটা ঠান্ডা, নির্লিপ্ত হয়ে বসে থাকতে পারে না। এই মেয়েটিকেই সে প্রথম দেখল যে মেজবাহ্ শেখের কাছে বসে থেকেও একটিবার ফিরে অব্দি তাকায়নি। মেয়েটার শাড়ি বার বার এসে ওর গায়ে লাগছিলো বলেই ও আগ বাড়িয়ে আঁচলটা সরিয়ে নিতে বলেছে। তবুও মেয়েটার কোনো নড়চড় নেই। নাকি মেয়েটা শুনতে পায় না? হতেও তো পারে! নয়ত কোনো মানুষের উপস্থিতি অনুভব করার পরও কেউ এত নিশ্চুপ ভঙ্গিতে বসতে পারে না-কি?
পরিবেশটা আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। মেজবাহ্’র অস্বস্তি লাগছে বেশ। ও একটা কথা বলল অথচ বিপরীত থেকে কথাটিকে গা-ও করা হলো না এরচেয়ে বেশি অস্বস্তিজনক আর কী হতে পারে?
মেজবাহ্ গলা পরিষ্কার করার অজুহাতে আবারও দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে এবারও মেয়েটিকে সে নড়তে দেখল না। মেজবাহ্’র এবার কৌতূহলই বাড়লো। মেয়েটি কানে নিশ্চয় শোনে না। শুনলে কি আর এত চুপ করে বসে থাকতে পারতো?
জোহরার আঁচল আজ বড্ড উতলা হয়ে উঠেছে। হয়ত মনের মানুষটিকে চিনতে পেরেছে শাড়ির ভাঁজ গুলোও। তাই বেপরোয়ার মতো উড়ছে। এতটাই বেপরোয়া যে মেজবাহ্’র চোখে মুখে গিয়ে বারি খাচ্ছে। মেজবাহ্ যা-ও একটু শান্তির জন্য এখানে এসেছিলো কিন্তু এই আঁচলটি আর তাকে শান্তি দিচ্ছে কোথায়?
মুখের সামনে লাগামহীন উড়তে থাকা আঁচলটিকে এবার খপ করেই ধরল সে। জর্জেটের শাড়িটা উষ্ণ মুঠো পেতেই এতটা শান্ত হয়ে গেলো যেন সে কখনো উড়েইনি। উড়ার কথা অব্দি ভাবেনি।
মেজবাহ্ আঁচলটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকায়। এরপর তাকায় মেয়েটির উন্মুক্ত খোলা কোঁকড়া চুলগুলোর দিকে। মেয়েটার শরীর দিকে ভুরভুর করে পারফিউমের ঘ্রাণ এসে তার নাকি বারি খায়। সুগন্ধিটা এত সুন্দর যে মেজবাহ্ আরও একবার মেয়েটার কোঁকড়া চুলগুলোর দিকে তাকায়। ওর যেন কেমন করে উঠে বুকটা। বহু সাধনার টেলিফোনটি বেজে উঠলে যেমন করে ঠিক তেমন।
আঁচলটি ও আলগোছে এগিয়ে দেয়। এতটা ধীর, অচঞ্চল হাতে যেন পৃথিবী থমকে গিয়েছে কোনো এক সীমানায়। বলে, “আঁচলটি নিন, উড়ছে।”
জোহরার বুক ধুকপুক করছে এবার। এত তীব্রভাবে যে ওর মনে হচ্ছে আশেপাশের সকলেই হয়ত শুনতে পাচ্ছে। মানুষটাকে এক নজর দেখার লোভে ও দিশেহারা হয়ে উঠল। এত কাছে মানুষটা ওর অথচ ও একবার ফিরে দেখবে না? এই আফসোস তাহলে আর মিটবে? ও আফসোস রাখতে চায় না। অন্তত এত শখের মানুষটাকে এত কাছে পেয়েও না দেখার আফসোস ও রাখবে না।
মনের ভেতর দ্বন্দ্ব সামলে ও ফিরে তাকায়। ওর কাজল ভরা ভাসমান পদ্মের মতো দু’টো চোখ দিক ভড়কে পাঞ্জাবি থেকে একটু একটু করে উপরে গিয়ে নিবদ্ধ হয় মেজবাহ্’র ভারী পল্লব ভরা চোখগুলোতে। ওর এক পৃথিবী থমকে যায় সেই মুহূর্তেই। চারপাশের শীতল হাওয়া উষ্ণ হয়ে উঠে। এইতো সেই চোখ, এইতো সেই মুখ যা দেখে জোহরা বছর দুই ধরে আটকে গিয়েছে। এই চোখের নেশাতেই আটকে গিয়েছে সে। সারাজীবনের মতো।
…
“কী সিকান্দার সাহেব, আঁড়চোখে তাকাচ্ছেন অথচ কিছু বলছেন না আজ। কথা বলা ছেড়ে দিয়েছেন না-কি?”
শুক্লার দৃষ্টি তার সামনের দুই টেবিল পরে বসে থাকা সিকান্দার দিকে। ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে তাকিয়ে আছে। ওর কথায় সিকান্দার বোধহয় লজ্জা পেয়েছে। তড়িঘড়ি জুসের গ্লাসটা নামাতে গিয়ে খানিক জুস গিয়ে ওর ক্রিম রঙের শার্টের বুকের দিকটা ভরিয়ে ফেলেছে। শুক্লা ভাবেনি সিকান্দার তার কথায় আচমকা এতটা ভড়কে যাবে।
ও শীগ্রই উঠে গেলো ওর বসার জায়গাটি থেকে। ব্যাগ থেকে ওর মেয়েলি রুমালটি বের করে দ্রুত এগিয়ে গেলো সিকান্দারের দিকে। সিকান্দারের চেয়েও যেন ওর বেশি চিন্তা হলো দাগ ভরে যাওয়া নিয়ে। তাই অনাধিকার থাকা স্বত্তেও করে বসল একটি কাজ। সিকান্দার কিছু বুঝে উঠার আগেই ওর বুকের দিকটা মুছিয়ে দিলো সে। এত দ্রুত সবটা হলো যে সিকান্দার হাবাগোবার মতো তাকিয়েই রইল। ও যে মুখ ফুটে কিছু বলবে তাও বলতে পারল না। মুখ থেকে শব্দ বের হলো না এক ফোঁটাও। গলায় যেন চেপে বসেছে সমস্ত নীরবতা।
শুক্লা মুছতে মুছতেই বলে, “এভাবে চমকে গিয়েছিলেন কেন? শার্টটাই তো খারাপ হয়ে গেলো। কেমন বিচ্ছিরি দাগ পড়লো দেখুন।”
সিকান্দার দেখছে কি-না তা বোঝার জন্য সিকান্দারের চোখের দিকে তাকাতেই শুক্লার যেন সম্বিৎ ফিরে এলো। ও এক ঝটকায় যেন নেমে এলো এই ব্রহ্মাণ্ডে। সিকান্দারের এত কাছে নিজেকে অনুভব করতেই ও তটস্থ হয়ে উঠল। সিকান্দারের এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা তার গায়ে শিরশিরানি জাগালো। সিকান্দারের শ্বাস আছড়ে পড়ছে ওর মুখে। এতটা নিকটে, এত কাছে ও এর আগে কারোই যায়নি। অভিনয়ের খাতিরে কত অভিনেতার সাথেই ওর সক্ষ্যতা কিন্তু কখনো কারো এত কাছে কি গিয়েছে ও? মনে পড়ছে না কেন এই মুহূর্তে?
সিকান্দার ঘোরগ্রস্তের মতো রুমালটায় হাত রাখে। ওর চোখ তখনও শুক্লার চঞ্চল মণিগুলোর উপর নিবদ্ধ। বলে, “থাকুক, কিছু দাগ থাকা ভালো।”
…
খাবার টেবিলে ইমন ও নোমানের হৈহল্লা আকাশচুম্বী। যাবের শিকদারের সংবাদপত্র দেখার অভ্যেস। সেই এই হৈহল্লাতেও সংবাদপত্র দেখতে ভুলছে না। জুসের গ্লাসটায় মুখ ডুবিয়ে প্রেমা ক্রান্ত স্বরে বলল, “তোমরা চুপ করো তো ভাইয়া। আপা যে বারান্দায় গেলো আসছে না কেন?”
নোমান বিরিয়ানি খাচ্ছে হাত দিয়ে। তা-ও বড়ো বড়ো লোকমা করে। চামচ থাকার পরেও ইচ্ছে করে হাত দিয়ে খাইয়ে ও প্রেমাকে রাগিয়েছে। প্রেমার সাথে এজন্য তর্কও হয়েছে ওর। প্রেমা বলেছে এত বড়ো রেস্তোঁরায় হাত দিয়ে খেলে লোকে কী বলবে। আর নোমানের যত সমস্যা এই লোকে বলা শব্দটিতেই। ওর কাজ নিয়ে যদি লোকেদের বলার এতই সময় থাকে তবে ও সেই কাজ বারবার করবে।
নোমান আগের ঝগড়ার জের ধরে রেখেই বর্তমানে বাঁকা উত্তর দিলো, “তোর আপা মনে হয় ভেগে গিয়েছে। গিয়ে দেখ।”
নোমান কথাটি হাসতে হাসতে বললেও যাবের শিকদারের বুকে গিয়ে বিঁধল সেটি তীরের মতো। ঝড়ের বেগে সংবাদপত্রটি নামিয়ে ফেললেন তিনি। ভরাট গলায় ধমকও দিলেন এই প্রথম,
“কী? কী বললে তুমি? কথাবার্তা কীভাবে বলো?”
উনার হুট করে দেওয়া ধমক এতটাই জোরে ছিলো যে আশেপাশের টেবিলের কয়েকজনও ওদের দিকে তাকালো। বাঁকা চোখে। নোমান চুপ করে গেলো সাথে সাথে। ও যে মহা ভুল একটি কথা বলে বসেছে তা বুঝতে বাকি নেই। বুদ্ধিমান ছেলে কি-না!
ইমন বাবার বিষয়টি সামলানোর চেষ্টা করল, “আহা, বাবা, ও মজা করে বলেছে।”
“কেমন মজা এসব? কীসের মজা? বাপের বুক ক্ষত হয় যে মজায় সেই মজা করবে কেন?”
নোমান আরও মাথা নামিয়ে ফেলল। ওর অপরাধী লাগছে নিজেকে। মামার দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত ও তবুও কেন যে বলে ফেলল? নিজেকে ওর ছোটো লাগলো ভীষণ।
প্রেমা নোমানের নত মুখটির দিকে একবার দেখে উঠে দাঁড়াল। বাবাকে সামলে বলল,
“আমি নিয়ে আসছি আপাকে দাঁড়াও। আমি আনছি, আব্বু।”
বলেই ও হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো বারান্দার উদ্দেশ্যে।
…
শ্বাসরুদ্ধকর স্বপ্নের মতোই মেজবাহ্’র চোখ আটকে গিয়েছে সুচরিতার মুখের উপর। ওর এই মুখটি বড়ো চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু এই মেয়েকে ও কখনো তো দেখেনি। তবে?
মেজবাহ্’র গলা জড়িয়ে আসছে। ও প্রশ্ন করতে চাইল। তার আগেই দূর থেকে ভেসে এলো একটি কণ্ঠ। কণ্ঠটি “আপা, আপা..” করে এগিয়ে আসছে। মেজবাহ্’র যেন পৃথিবী ঘুরল সেই কণ্ঠটিতে। সেই পরিচিত স্বর। ওর অভ্যেসের সেই সুর। ওর কি মতিভ্রম হচ্ছে? নয়ত চারপাশের সব এত গুলিয়ে যাচ্ছে কেন?
চলবে…
-মম সাহা
Share On:
TAGS: ভালোবাসি সুচরিতা, মম সাহা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪০
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪৬
-
ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ১৪
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৩
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৬
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৮
-
ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ১১
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৭
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৩
-
ভালোবাসি সুচরিতা পর্ব ৮