প্রণয়ে_গুনগুন
পর্ব_৩৭
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
জাপানের নতুন শহরে ওসাকা ভার্সিটিতে গুনগুন যখন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত, প্রণয় ব্যস্ত তখন ঢাকায় তার বিজনেস নিয়ে। দুজনই দুজনকে ব্যস্ত রাখার প্রয়াস চালালেও কোথাও একটা শূন্যতা হাজার কাজের মাঝেও রয়ে যায়। গুনগুন জাপানে আসার পর থেকেই শুধু মাথায় ঘুরছে কবে সে প্রণয়কে নিয়ে আসতে পারবে। যদিও এরজন্য তাকে অনেকগুলো প্রসেসের মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং একটা লম্বা সময়ের ব্যাপারও এটা।
পৃথিবীটা গোল গুনগুন এটা টের পেল, ক্লাস শেষ করে একদিন বাসায় ফেরার পথে। বাড়ি থেকে তখন সে প্রায় দশ মিনিট দূরে। ফোনে প্রণয়ের ছবি দেখতে দেখতে হাঁটছিল। বুকটা ভীষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল এই সময়টায়। যখনই এরকম অনুভূতি হয়, গুনগুন তখনই প্রণয়ের ছবি দেখে। এতে কষ্ট সম্পূর্ণ না কমলেও কিছু সময়ের জন্য ভালো লাগে, স্বস্তি পায়।
ক্লাস শেষ করে যখন জাপানের সেই শান্ত, পরিপাটি রাস্তায় এলো, তখন বিকেলের আলোটা যেন শহরটাকে এক অদ্ভুত কোমল সৌন্দর্যে ঢেকে রেখেছে। চারদিকে সারি সারি চেরি ব্লসম গাছ, হালকা গোলাপি পাপড়ি বাতাসে উড়ে এসে তার চুলে আটকে যাচ্ছে। দূরে পাহাড়ের আভাস, আর কাছে ছোট্ট একটা নদী। জলের ওপর সূর্যের আলো চিকচিক করছে।
খুব ধীর পায়ে হাঁটার সময়ে অপরিচিত একটা পুরুষালী কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
“গুনগুন?”
ভ্রু কুঁচকে গুনগুন ডানপাশের রাস্তায় তাকাল।
চারপাশে তখন চেরি ফুল ঝরছে। সাথে হালকা বাতাস বইছে। সমুদ্রকে এখানে দেখে সে যারপরনাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সমুদ্র হাসিমুখে সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে কোনো বিস্ময় নেই। গুনগুন নিজেই অস্ফুট স্বরে বলল,
“আপনি!”
“হ্যাঁ, অবাক হয়েছেন?”
“অবাক হওয়াটাই কি স্বাভাবিক না?”
“তা অবশ্য ঠিক! বাসায় যাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ। কিন্তু আপনি এখানে?”
“আমি অনেক আগেই জাপানে এসেছি জবের জন্য। আপনার আসার কথাও জানতাম। আম্মু বলেছিল।”
“ওহ। কিন্তু আন্টি তো আমাকে আপনার কথা কিছু বলেনি।”
সমুদ্র ঠোঁট উলটে বলল,
“কী জানি! যাই হোক, আপনার হাতে সময় আছে? তাহলে কোনো কফিশপে বসতাম।”
গুনগুন নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে আছে। বিদেশ-বিভূয়ে পরিচিত কারো সাথে এরকম আকস্মিক দেখা হওয়ায় কি মুখের ওপর না করা যায়?
“সময় হবে?” গুনগুনকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে ফের জিজ্ঞেস করল সমুদ্র।
গুনগুন আর না ভেবে বলল,
“হবে।”
“ঠিক আছে।”
দুজনে মিলে খুব দূরে গেল না। পাশেই একটা কফিশপে গেল। দুদিন আগেও সিয়া আর হাসিবের সাথে এই কফিশপে এসেছিল সে। স্থান পরিচিত বলে অস্বস্তি হলো না গুনগুনের। কফি অর্ডার দিয়ে সমুদ্র জিজ্ঞেস করল,
“কতদিন হলো এসেছেন?”
“একমাস এখনো হয়নি।”
“ওহ আচ্ছা। কোথায় থাকছেন?”
“এখনো মামার বাসায় আছি।”
“সবকিছু তো ঠিকঠাক?”
“সবকিছু বলতে?”
“ভার্সিটি, থাকার জায়গা, সম্পর্ক…”
“হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ্। ভেবেছিলাম এক বছরের মধ্যেই যত দ্রুত সম্ভব প্রণয়কে নিয়ে আসার চেষ্টা করব। কিন্তু ও এখন আবার জেদ ধরেছে, দেড়, দুই বছরের মতো লাগবে ওর আসতে।”
“কেন?”
“দেশে যে আমাদের রেস্টুরেন্টের বিজনেস আছে, ঐটা পুরোপুরি দাঁড় করাবে আগে। তারপর মাসুদ ভাই আর কুলসুম আপুকে বুঝিয়ে দিয়ে আসবে।”
“ওহ! আইডিয়া তো খারাপ না।”
“কিন্তু অপেক্ষা কষ্টের!”
“তা অবশ্য মন্দ বলেননি। অনেক ভালোবাসেন মনে হচ্ছে?”
গুনগুন মুখে উত্তর দিল না। মৃদু হাসল শুধু।ওয়েটার এসে কফি দিয়ে যাওয়ার পর গুনগুন বলল,
“আপনার খবর বলুন।”
কফির কাপে চুমুক দিয়ে সমুদ্র নিজের ব্যাপারে বলছিল। আড়চোখে দেখছিল গুনগুনের নির্লিপ্ত মুখটা। গুনগুন চেষ্টা করছিল মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার। কিন্তু পারছিল না। প্রণয়কে ছাড়া কোনো ছেলে মানুষের সাথেই সময় নিয়ে কথা বলতে, আড্ডা দিতে ওর ভালো লাগে না।
সমুদ্র যখন কথায় বিরতি নিয়েছে, ঠিক তখনই সুযোগ বুঝে গুনগুন হাত ঘড়িতে সময় দেখল। ব্যস্ততার বাহানা দিয়ে বলল,
“এখন আমাকে উঠতে হবে, ভাইয়া। মামি নয়তো পরে দুশ্চিন্তা করবে।”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। কোনো সমস্যা নেই।”
গুনগুন বিল দিতে গেলে, সমুদ্র বাধা দিয়ে বলল,
“পাগল আপনি? আমি দিচ্ছি।”
“আমি দিলেই বা কী সমস্যা?”
“অনেক সমস্যা। আপনি এখনো স্টুডেন্ট। তাছাড়া কফির অফার তো আমি দিয়েছিলাম।”
গুনগুন আর কিছু বলল না। কফিশপ থেকে বের হয়ে সমুদ্র বলল,
“আমাদের কি আবার দেখা হতে পারে?”
গুনগুন ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“খুব সম্ভবত না! প্রণয় যদি জানে তাহলে খুব কষ্ট পাবে। আজ যে দেখা হয়েছে আমাদের, এটা অবশ্য আমি নিজেই ওকে বলে দেবো। কিন্তু দেখা হওয়াটা যদি কন্টিনিউয়াসলি হতে থাকে তাহলে ও ভীষণ কষ্ট পাবে। আর আমি নিজেও এমন কিছু চাই না। তবে আপনার সাথে আজ দেখা হয়ে ভালো লাগল।”
সমুদ্রের কিছুটা খারাপ লাগলেও সে তা মুখে প্রকাশ করল না। উপরন্তু সে নিজেও মুচকি হেসে বলল,
“ঠিক আছে। সমস্যা নেই।”
“আসছি তাহলে? ভালো থাকবেন।”
“আপনিও।”
গুনগুন বাড়ির পথে হাঁটা দেওয়ার পর, সমুদ্রও উলটো পথে হাঁটা শুরু করেছে। প্রথমদিকে রিজেকশনটা খুব গায়ে লাগলেও পরে মাথা ঠান্ডা হওয়ার পর, বিষয়টা ভেবে ভালো লেগেছে সমুদ্রের কাছে। ভালোবাসা তো আসলে এমনই হওয়া উচিত?
.
.
প্রণয় একগাদা বইখাতা নিয়ে রুমে বসে আছে। আগামী মাসে ওর মিডটার্ম পরীক্ষা। ভালো রেজাল্ট করা জরুরী। গুনগুন দেশ ছাড়ার আগে থেকেই প্রণয় তার আগের ভার্সিটিতে খোঁজ-খবর নিয়ে আবার সেমিস্টার শুরু করেছিল। তিনটা সেমিস্টার বাকি ছিল। তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা না থাকলেও এখন আছে। প্রণয় তো আর গুনগুনের স্বপ্ন ভাঙতে পারত না, তাই ওর সাথে সাথে নিজেও আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। সে টার্গেট নিয়ে রেখেছিল স্পাউজ ভিসায় জাপান গেলেও গ্রাজুয়েশন শেষ করেই যাবে। তারপর ওখানে গিয়ে জব করার পাশাপাশি সম্ভব হলে মাস্টার্সটাও করে ফেলবে। গুনগুনের ওপর যেমন সে নির্ভরশীল হয়ে থাকবে না, তেমনই গুনগুনের কষ্ট হবে এমন কোনো কাজও করতে দেবে না। এত কিছু মাথায় রেখেই সে পুনরায় পড়াশোনা শুরু করেছে।
প্রণয়ের এই সিদ্ধান্তে সবথেকে বেশি খুশি হয়েছে কুলসুম। ওকে ফুল মানসিক সাপোর্ট দিচ্ছে। অন্যদিকে মাসুদের সাপোর্টও কম না। প্রণয়ের অবর্তমানে সে একাই পুরো রেস্টুরেন্টের দেখভাল করে। তবে এই যে প্রণয় এত কষ্ট করছে এর কিছুই গুনগুন এখনো জানে না। সামনে গিয়ে একেবারে সারপ্রাইজ দেবে। গুনগুনের চমকে যাওয়া হাসি হাসি মুখটা সামনে থেকে দেখতে চায় প্রণয়। তাই সে বিজনেসের অজুহাত দিয়ে জাপানে যাওয়ার সময়টা পেছাচ্ছে। এতে দূরত্বের সময়টুকু দীর্ঘ হলেও ফলটা যে মিষ্টি হবে তাও প্রণয় খুব ভালো করেই জানে।
পড়ার সময় গুনগুনের কথা আবার মনে পড়ে গেল প্রণয়ের। ফোন করবে কিনা ভাবছিল যখন, গুনগুন নিজেই তখন ফোন করল। বইগুলো বন্ধ করে সরিয়ে রেখে রিসিভ করল প্রণয়। ঐপাশ থেকে গুনগুন হাসিমাখা মুখে বলল,
“কেমন আছেন?”
প্রণয় রহস্য করে বলল,
“যেমন আপনি আছেন।”
“বিরহে।”
প্রণয় চোখ দুটো ছোটো ছোটো করে বলল,
“তোমার থেকেও অধিক বিরহে আমি পু’ড়’ছি।”
“ভালো যখন বেসেছেন, তখন বিরহের অনলে পু’ড়’বে’ন না তা কি হয়?”
“তোমার জন্য সব অনলে পু’ড়’তে রাজি।”
“খুব না?”
“হু, খুব! শোনো?”
“কী?”
“তোমাকে একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।”
গুনগুন মুখ ঢেকে হেসে ফেলল। লজ্জা পেয়ে বলল,
“ইচ্ছে করলেই বা এখন উপায় কী? তবে চাইলে একটা উড়ন্ত চুমু দিতে পারেন।”
প্রণয় শার্টের কলার পেছনের দিকে টেনে নিয়ে বলল,
“শুধু উড়ন্ত চুমু কেন? ঘুমন্ত চুমু, দূরন্ত চুমু সব দেবো।”
গুনগুন হাত দিয়ে মুখ ঢেকে শব্দ করে হাসছে। প্রণয় মুগ্ধ হয়ে দেখছে সেই হাসি। ল্যাপটপের স্ক্রিনে গুনগুনের হাস্যরত মুখটার ওপর হাত বুলাল আলতো করে।
হাসি থামিয়ে গুনগুন বলল,
“আপনি কি সমুদ্র ভাইয়াকে চিনেন?”
“সমুদ্র কে?”
“আরে শেলী আন্টির ছেলে। আমরা যেই বাসায় থাকতাম ঐ বাসার বাড়িওয়ালার ছেলে।”
“ওহ। দেখেছিলাম কয়েকবার অনেক আগে। কেন?”
“সে তো জাপানে থাকে।”
“তুমি জানলে কী করে?”
“আজ দেখা হয়েছিল।”
“পরে?”
“পরে পাশের একটা কফিশপে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ কথা হয়েছে।”
প্রণয়ের মুখটা শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গেছে। ম্লানমুখে বলল,
“ওহ।”
“আপনি কি মন খারাপ করলেন?”
“না।”
“মনে হচ্ছে।”
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে প্রণয় বলল,
“শোনো গুনগুন, আজ থেকে একটা কথা মনে রাখবে, তোমার জীবনে কেউ আসুক, কেউ তোমাকে পছন্দ করুক, কেউ প্রপোজ করুক এসব আমাকে আর বলার দরকার নেই।”
“কেন এমন বলছেন?”
“কারণ…”
একটু থামল প্রণয়। তারপর বলল,
“এসব শুনলে আমার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ভেঙে যায়। বুকটা কেমন যেন করে ওঠে! সহ্য করতে পারি না।”
“কিন্তু আপনাকে না বললে তো আমারই বেশি কষ্ট হবে। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হবে। আর আমি ওনাকে স্পষ্ট বলেছি, আমি আর দেখা করব না।”
“কেন বললে না দেখা করার কথা?”
“কারণ আপনি কষ্ট পাবেন। আপনার কষ্টটা আমি সহ্য করতে পারি না।”
“তুমি কেন নিজের চারপাশটা এত সীমাবদ্ধ করে রাখছ? ছেলে ক্লাসমেটদের সাথেও মেশো না, পরিচিত কারো সাথেও না। কেন?”
“সব অনুভূতির কি ব্যাখ্যা হয়? জানেন না, কিছু অনুভূতি শুধু অনুভব করার জন্যই সৃষ্টি হয়।”
“তবুও সবাইকে এভাবে দূরে ঠেলে দিচ্ছ কেন?”
“কারণ আমার ছোট্ট পৃথিবীতে জায়গা আছে শুধু একজনের জন্য। আর সে আপনি।”
চলবে….
[আর মাত্র একটা পর্ব বাকি আছে।]
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩২
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৮ (১ম অংশ)
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৮ (২য় অংশ)
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩০
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১২