#নূর_এ_সাহাবাদ
#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৫৫
নিজের চুল নিজে টানছে আর ছটফট করছে চন্দ্রা। অস্ফুট স্বরে কিছু বলছে। বোঝা যাচ্ছে না সেটা। হঠাৎ করেই ধড়ফড় করে উঠে বসল। শ্বাস প্রশ্বাস অস্বাভাবিক দ্রুত। মনে হচ্ছে বুকটা ফেটে যাবে এখনি। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। কপাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। অন্ধকার কক্ষের মধ্যে কিছুক্ষণ দিশেহারা হয়ে চারপাশে তাকালো সে। চকিতে চোখ গেল পাশের দিকে।
আবিদ ঠিক আগের মতই পাশে শুয়ে আছে।
জীবিত, সুস্থ, নিঃশ্বাস নিচ্ছে। প্রভার বুক থেকে যেন একটা পাহাড় নেমে গেল। বুকে হাত দিয়ে শুকনো গলায় বলল
“আল্লাহ…”
আবিদের ঘুম ভেঙে গেল চন্দ্রার ছটফট এ। চোখ মেলে উঠে বসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল
“কি হয়েছে?”
চন্দ্রপ্রভা কিছু বলতে পারলো না। তার ঠোঁট কাঁপছে, হাত কাঁপছে। আবিদ দ্রুত উঠে হারিকেনটা জ্বালালো। আলো জ্বলতেই দেখতে পেল প্রভার মুখে স্পষ্ট ভয় আর আতঙ্ক। ঘেমে নেয়ে একাকার। আবিদ এগিয়ে এসে রত্নার কাছে দাড়ালো
“রত্না? কি হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?”
আবিদ কে অবাক করো দিয়ে রত্নপ্রভা ঝুঁকে এসে তার বুকে মুখ গুঁজে দিল। আবিদ থমকে গেল স্ত্রীর এমন কান্ডে। এতদিনেও যা কখনো ঘটেনি। হলো টা কি মেয়েটার? প্রভা কাঁপছে সাথে হাঁপাচ্ছেও। মনে হচ্ছে খুব ভয় পেয়েছে। কিছুক্ষণ পর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে।
“আ…আবিদ। আবিদ আমার খুউব ভয় লাগছে…”
আবিদ বিস্মিত চোখে তার মাথার দিকে তাকিয়ে রইলো। জড়তা নিয়েই মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“কি হয়েছে বলুন?”
রত্নপ্রভা মাথা নাড়লো।
“আ…আমি খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। খু…ব খারাপ। আমি…. আমি”
গলাটা ভেঙে যাচ্ছে তার। আবিদ আলতো করে তাকে আগলে নিল। তাকো শান্ত করার চেষ্টা করলো
“শান্ত হোন। শান্ত হোন শাহজাদি। ওটা স্বপ্ন ছিল। বাস্তব না। আপনি ঠিক আছেন। আমি আছি না? কিচ্ছু হবে না আপনার। আপনি শান্ত হোন”
প্রভা চোখ বন্ধ করে রইলো। স্বপ্নের দৃশ্যগুলো মাথার মধ্যে ঘুরছে। আরও শক্ত করে আবিদের জামা আঁকড়ে ধরলো। আবিদ শান্ত গলায় বলল
“পানি আনবো? পানি খাবেন? দাঁড়ান”
চন্দ্রা আরও জোড়ে ঝাপটে ধরলো আবিদ কে
“ নাহ…না আপনি কোথাও যাবেন না।”
আচমকা আবিদ কে ছেড়ে চোখ বড় বড় করে তাকালো চন্দ্রা।
“আম্মা? আম্মা কোথায়? আম্মা ঠিক আছে তো? না না, আম্মার কিচ্ছু হতে পারে না।”
অন্ধকারের মধ্যে আবিদ কে পিছে ফেলে ছুটতে লাগলো চন্দ্রা। সে যে ভরাপুরা পোয়াতি তা মাথায় ই নেই। আবিদ ভয় পাচ্ছে পড়ে যাবে নাকি
“শাহজাদি থামুন, কি করছেন আপনি। পড়ে গেলে অনর্থ ঘটে যাবে। শাহজাদি…..”
আবিদের মায়ের ঘরের সামনে গিয়ে থামলো প্রভা। ভদ্রমহিলা ঘুমাচ্ছে। বুকে হাত দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস নিলো। সবাই ঠিক আছে। কারও কিচ্ছু হয় নি। সে কাওকে হত্যা করেনি। আঁচল সামলে নিয়ে আবিদের হাত ধরে চলে আসলো ঘরে”
প্রভা কে বসিয়ে আবিদ হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগলো। ঘেমে একাকার মেয়েটা। পাশে বসে বলল
“আপনাকে আর আমাদের সন্তান দুজনকেই আল্লাহর হেফাজতে রাখবেন শাহজাদি”
“শাহজাদি বলবেন না আমায়। আমি শাহজাদি নই। আমি রত্না নই। আমি….”
“চন্দ্রপ্রভা তাই তো?”
আবিদের কথায় যেন আশ্চর্যের চূড়ায় উঠে গেল চন্দ্রা। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে আবিদ নিজেই বলল
“ আমাদের বিয়ের দিনই সম্রাজ্ঞী আমায় জানিয়েছেন কথাটা। যে আমি নাসিরাবাদ এর জামাই। সাহাবাদ এর না হলেও নাসিরাবাদ এর শাহজাদি তো আপনি।”
চন্দ্রার চোখ পানিতে টইটুম্বুর
“আমি নাসিরাবাদ এর কেউ নই?”
আবিদ পাশে বসে প্রভার কাধে হাত রাখলো
“ঠিক আছে। আপনি আমার এই ছোট্ট ঘরটার শাহজাদি”
আবিদ আলতো করে তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল
“ঘুমিয়ে পড়ুন। আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
চন্দ্রা চোখ বন্ধ করে শুয়ে পরলো। বুকের ভেতরের তীব্র আতঙ্কটাও একটু একটু করে কমতে লাগলো।
রাতের সেই ভয়ংকর স্বপ্নের পর আর ঠিকমতো ঘুম হয়নি চন্দ্রপ্রভার। ভোরের আলো ফুটতেই তীব্র ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো সে। প্রথমে ভেবেছিল ছোটাছুটির ফলে ব্যাথা করছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ব্যথাটাও বাড়তে লাগলো। আবিদ উঠানে ফুল গাছগুলোয় পানি দিচ্ছে। ভেতর থেকে রত্নপ্রভার চাপা গোঙানির শব্দ আসে। আবিদ পানির পাত্র ফেলে ছুএে যায় সেদিকে।
“রত্না? কি হয়েছে?”
রত্নপ্রভা দাঁতে দাঁত চেপে বিছানার চাদর মুঠো করে ধরলো।
“আ…আবিদ…”
আবিদ বুঝতে পারলো তার প্রসব ব্যাথা শুরু হয়েছে। দাইমাকে খবর দেওয়া হলো। আশেপাশের মহিলারা এসে ঘর ভরে ফেললো।
আবিদকে প্রায় জোর করেই কক্ষের বাইরে বের করে দেওয়া হলো। বেচারা উঠানে পায়চারি করতে লাগলো। মুখে অস্থিরতা। বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। ভেতর থেকে রত্নপ্রভার কষ্টের শব্দ শুনলেই ছটফটানি আরও বাড়ছে। তার মা এসে বললেন
“এভাবে ছটফট করলে হবে? শক্ত হ বাজান”
আবিদ শুকনো গলায় বলল
“আম্মা, ও খুব কষ্ট পাচ্ছে।”
“সন্তান জন্ম দেওয়া সহজ না বাবা। এই সময় সকল মাই গো ই কষ্ট হয়”
অবশেষে কিছুক্ষণ পর কক্ষের ভেতর থেকে ভেসে এলো এক নবজাতকের কান্না।
আবিদ স্থির হয়ে গেল। দৌড়ে দরজার কাছে চলে এলো। দাইমা বের হয়ে হাসিমুখে বলল
“মাশাআল্লাহ। আল্লাহ সুন্দর একটা কন্যা সন্তান দিছে আমনেরে নায়েব। আমগো কিন্তু বখশিশ দেওন লাগবো হুমম”
আবিদের চোখ ভিজে উঠলো। অজান্তেই ঠোঁট থেকে বের হলো
“আলহামদুলিল্লাহ…”
খবর সাহাবাদ প্রাসাদে পৌঁছে গেল। বিকেলের মধ্যেই ঘোড়ার গাড়ি এসে থামলো আবিদের বাড়ির সামনে।বাকের শাহ্, বাইজিদ, মেহেরুন্নেসা আর ছোট্ট জান্নাত। সবাই এসেছে নবজাতককে দেখতে। মেহেরুন্নেসা কক্ষে ঢুকেই রত্নপ্রভার পাশে গিয়ে বসল। তার পাশে কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট শিশুটি ঘুমিয়ে আছে। মেহেরুন্নেসা আলতো করে তাকে কোলে তুলে নিলো। মুখ খানায় হাসি ফুটে উঠলো।
“মাশাআল্লাহ নাকটা পুরো আবিদ ভাইয়ের থেকে চুয়ে নেওয়া।”
আবিদ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলো। সবাই হেসে উঠলো। মেহেরুন্নেসা শিশুটার গোলাপি মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ। তারপর মৃদু স্বরে বলল
“এর নাম আমি রাখবো।”
শিশুটার কপালে চুমু খেয়ে বলল
“এর নাম হবে শাখা।”
নামটা শুনে প্রভার মুখেও সন্তষ্টির হাসি ফুটে উঠলো। স্বয়ং সম্রাজ্ঞী তার কন্যার নাম রাখছে।
মেহেরুন্নেসা নিজের অলংকারের থলি খুললো। সেখান থেকে বের করলো ছোট্ট একটা পান্নাখচিত চুলেট কাটা। সবুজ পান্না পাথর বসানো সূক্ষ্ম কারুকাজের অলংকার। আলো পড়তেই ঝিলমিল করে উঠলো। সে শিশুটার পাশে রেখে বলল
“এটা আমার পক্ষ থেকে আমার দ্বিতীয় কন্যার জন্য।”
এদিকে জান্নাত তো মহাখুশি। সে হামাগুড়ি দিয়ে বিছানায় উঠে এসেছে। বারবার শিশুটার ছোট্ট হাত ধরার চেষ্টা করছে।
“বাবা…..আআআ”
বাইজিদ কে ডেকে দেখাচ্ছে শিশুটিকে। নিজের ভাষায় কী যেন বলছে। শাখা হঠাৎ হাত নেড়ে দিলে জান্নাত খিলখিল করে হেসে উঠলো। আবার শিশুটার দিকে ঝুঁকে পড়লো। তার চোখে বিস্ময়। মনে হচ্ছে জীবনে প্রথমবার নিজের চেয়ে ছোট কাউকে দেখেছে। পুরো ঘর তখন হাসি আর আনন্দে ভরে আছে। চন্দ্রার চোখ খুঁজে চলেছে সুনেহেরা কে। নিজের বোন না হলেও কখনো ভালোবাসা কম দেয়নি সুনেহেরা কে। কিন্তু সত্যিটা জানার পর সুনেহেরা কেন জানি দূরে সরে গেল চন্দ্রার থেকে। বড় আশা নিয়ে মেহেরুন্নেসা কে জিজ্ঞেস করলো
“মেহের, সুনেরাহ আসেনি?”
মেহেরুন্নেসার মুখটা কালো হয়ে এলো।
“আসলে….”
কারও মুখেই কোনো উত্তর মিলল না। চন্দ্রা ঠোঁট চেপে নিজের কান্না আটকালো। হয়তো তার সাথে সাথে তার মেয়েকেও ঘৃণা করে সুনেহেরা। শাখার আগমনের পর আবিদ চন্দ্রার সম্পর্কও ঠিক হলো। আর পাঁচ টা স্বামী স্ত্রীর মত তারাও সুন্দর জীবন কাটাতে লাগলো।
****
দিন গড়িয়ে সপ্তাহ। সপ্তাহ গড়িয়ে মাস। মাস পেরিয়ে আবার বছর। সময়ের নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে চললো সাহাবাদ। ছোট্ট জান্নাত এখন বড় হয়েছে। ৪ বছর বয়স তার। বুদ্ধি মতী আর বিনয়ী জান্নাত। মেহেরুন্নেসার সবটুকু গুণ নিয়ে সে বেড়ে উঠছে। বাকের শাহ্ তো নাতনির কাছে পুরোপুরি হার মেনে বসে থাকেন।
এমন সময়েই আবার সুখবর এলো সাহাবাদে।
মেহেরুন্নেসা দ্বিতীয়বারের মতো মা হতে চলেছে।
পুরো মহলে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। বাইজিদ আগেরবারের ঘটনার পর এবার আরও বেশি সতর্ক। মেহেরুন্নেসা কোথায় যাচ্ছে, কি খাচ্ছে, বিশ্রাম নিচ্ছে কিনা সবকিছুতেই তার নজর।
এত বছর পেড়িয়েও স্ত্রীর প্রতি এতটুকু ভালোবাসা কমেনি জমিদার সাহেব এর। অবশেষে অপেক্ষার অবসান হলো। এক বর্ষণমুখর রাতে জন্ম নিলো আরেকটি কন্যা সন্তান। শিশুটিকে প্রথম কোলে নিলো সুনেহেরা।
অনেকক্ষণ ভেবে সুনেহেরা বলল
“ওর নাম হবে সাহারা।”
বাইজিদ ভ্রু কুচকে তাকায়
“সাহারা?”
“হ্যাঁ। মরুভূমির মত বিশাল আর স্বাধীন হবে আমার ভাইজানের মেয়ে।”
নামটা সবারই পছন্দ হলো। সেদিন থেকেই সাহাবাদের নতুন সদস্য হয়ে উঠলো ছোট্ট সাহারা। কিন্তু জন্মের পর থেকেই সবাই একটা বিষয় লক্ষ্য করলো। এই মেয়েটা ঠিক জান্নাতের মত না। একদমই না। জান্নাত যেখানে সারাক্ষণ হাসি খুশি আর মায়ের বাধ্য লক্ষি মেয়ে। কিন্তু সাহারার ভিতর জিদ টা একটু বেশিই লক্ষ করা যায়। জান্নাতকে একটু হাসালেই গড়িয়ে পড়ে।
সাহারা অহেতুক সচরাচর হাসে না। বেশির ভাগই গম্ভীর থাকে।
তার চোখ দুটো ছিল অবিশ্বাস্য সুন্দর। একদম বাইজিদের মত সবুজাভ। সূর্যের আলো পড়লে চোখে যেন পান্নার আভা খেলে যেত। আর চুল দেখে তো সুনেহেরা গর্বে বুক ফুলিয়ে বলে
“দেখেছো? আমার মেয়ে পুরো আমার মত হয়েছে।”
ঘন সোনালি চুলগুলো জন্মের কিছুদিন পর থেকেই সবাইকে অবাক করতে শুরু করলো। রাজ্যের গুণীরা বলতেন
“এ মেয়েটা বড় হয়ে পুরো ঝড় হবে।”
আর সেই কথার সত্যতা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগলো না। সাহারার জেদ ছিল ভয়ংকর। কোনো কিছু চাইলে চাই-ই। না পেলে পুরো মহল মাথায় তুলে ফেলতো। সাহারার জিদের কাছে সআ সময় হেরে যেত জান্নাত। নিজের পছন্দের জিনিস গুলো হাসিমুখে বোন কে দিয়ে দিত। বাইজিদ দুই মেয়েকে কখনোই মেলাতে পারে না। দুই জন দুই মেরুর। একজন হাসিখুশি বাধ্য মেয়ল। অন্যজন ছটফটে, জেদি, গম্ভীর। দুই বোন এর একই রক্ত।
তবুও যেন আকাশ-পাতাল পার্থক্য। মেহেরুন্নেসা মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বলে
“একজন বসন্ত তো আরেকজন ঝড়।”
দেখতে দেখতে পাঁচটি বছর কেটে গেল।
পাঁচ বছর। এ মোটেও অল্প সময় নয়। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সাহাবাদের ওপর আর কোনো হামলা হয়নি। না কোনো শত্রু সৈন্য এসেছে। না কোনো অদ্ভুত নরপিশাচ দেখা গেছে। না অঙ্কুরের কোনো বার্তা। না কোনো হুমকি। মানুষটা পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গেছে মনে হয়। শুরুতে সবাই সতর্ক ছিল। প্রতিটা অচেনা মুখকেও সন্দেহ করতো। কিন্তু সময় বড় অদ্ভুত জিনিস। সবচেয়ে গভীর ভয়কেও একসময় নিস্তেজ করে দেয়।
এখন সাহাবাদের মানুষ স্বাভাবিক জীবনেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। জান্নাত এখন ছয় বছরের মেয়ে। কোথ থেকে একটা সাদা বিড়াল এনে দিয়েছে আবিদ। সারাদিন সেটার পেছনে দৌড়ায়।
মেয়েটা ভীষণ মায়াবী আর লক্ষী। সাহারা যেন জন্মগতভাবেই রাজকীয়। কম কথা বলে। হাসে কম। তবে মারাত্মক বিচ্ছু। যতসব উদ্ভট কাজ কাম করে ৩ বছরের মেয়েটা।
মাঝেমধ্যে জান্নাতের বিড়াল টা কে কাধে তুলে মহলের বাইরে রেখে আসে। বিড়াল টা জ্বালায় তাকে। একদম পাঁজি। সাহারার জিনিস নষ্ট না করলে ওর ভালোই লাগে না। জান্নাত কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে আবার তাকে কুড়িয়ে নিয়ে আসে মহলে। বকেও দেয় আচ্ছা করে
“তুই বারবার বোনের পুতুল ছিঁড়িস কেন? এবার বার করে দিলে আর ঘরে নেব না তোকে মিনু”
সাহাবাদের প্রাসাদে এখনও শান্তির আবহ। বাকের শাহ্ আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধ হয়েছেন।
দরবারের অধিকাংশ দায়িত্ব এখন বাইজিদ আর মেহেরুন্নেসাই সামলায়। সেদিন দুপুরে দরবার শেষ হওয়ার পর রাজকীয় উদ্যানের ছাউনির নিচে বসেছিল সবাই। মেহেরুন্নেসা সাহারার চুল বেঁধে দিচ্ছিল। জান্নাত তখন একটা প্রজাপতির পেছনে ছুটছে। হঠাৎ বাইজিদ বলল
“আমার মনে হয় এবার একবার রাজ্যের বাইরে যাওয়া উচিত আমাদের। বহু দিন ঘোরা হয় না।”
কথাটা শুনে সবাই তাকালো। মেহের ভ্রু তুললো।
“কোথায়?”
বাইজিদ কেদারায় হেলান দিয়ে বলল
“অনেক বছর হয়ে গেল সাহাবাদের বাইরে কোথাও যাওয়া হয় না। সবসময় রাজনীতি, দায়িত্ব… মানুষেরও তো বিশ্রাম প্রয়োজন।”
সুনেহেরা সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠলো
“আমি যাবো! আমি পাহাড় দেখতে চাই।”
জান্নাত দূর থেকে দৌড়ে এসে বলল
“বাবা আমি কিন্তু ঘোড়া নিয়ে যাবো।”
সাহারা গম্ভীর মুখে বসে। সে ছুটে এসে বাবার গলা ধরে ছোট্ট করে বলল
“বাবা আমিও যাবো।”
সুনেহেরা সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠলো।
“তুমি না গেলে কি আর যাওয়া হয়?”
মেহেরুন্নেসা চুপচাপ স্বামীর দিকে তাকালো।
“হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নিলেন যে?”
বাইজিদ কিছু একটা ভাবলো আনমনে। তারপর গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল
“কারণ রাজ্য এখন নিরাপদ বউজান।এই সুযোগ একটু ঘুরে আসার।
মাহাদি মাথা নেড়ে বলল
“সত্যি বলতে কি, আমারও মনে হয় ওরা অনেক আগেই অন্য কোনো দেশে পালিয়েছে।”
বাইজিদ ও সম্মতি দিল
“যদি আক্রমণ করতেই চাইতো, এতদিনে করতো।”
“তাহলে কোথায় যাওয়ার পরিকল্পনা?”
বাইজিদের চোখে অনেকদিন পর ছেলেমানুষি ঝিলিক দেখা গেল।
“এই মাসের মধ্যেই রওনা হবো। পুরো পরিবারকে নিয়ে। রাজ্যের বাইরের অঞ্চলগুলো ঘুরে দেখবো। নদী, পাহাড়, বন, প্রাচীন নগরী সব।”
জান্নাত আনন্দে লাফিয়ে উঠলো।
“আমরা কি জাহাজেও উঠবো?”
“হ্যা মা”
“হাতিও দেখবো?”
“হুমমম।”
“বাঘ?”
“ না না ।”
সবাই হেসে উঠলো। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ প্রহরী অদ্ভুতভাবে আকাশের দিকে তাকালো। পশ্চিম আকাশে তখন কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। যেন কোনো ঝড় ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। সাহাবাদের মানুষ, দীর্ঘ পাঁচ বছরের শান্তিতে অভ্যস্ত হয়ে, সেই ঝড়ের আভাস এখনো টেরই পায়নি ।
সাহাবাদ প্রাসাদে তখন উৎসবের আমেজ। জান্নাত তো আনন্দে ঘুমাতেই পারছে না। সারাদিন একে ওকে প্রশ্ন করছে, আর কয়দিন বাকি? কে কে যাবে। শাখাও যাচ্ছে কি না? বাইজিদ চন্দ্রা আর শাখাকেও নিয়ে যাবে আবিদ এর সাথে।
***
সেনা উদ্যানের প্রশিক্ষণ প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে সৈন্যদের অনুশীলন দেখছে মাহাদি। পেছন থেকে সুনেহেরার কণ্ঠ ভেসে এলো।
“আপনি এখনো মুখ গোমড়া করে আছেন কেন?”
মাহাদি ঘুরে তাকালো। সুনেহেরা দুই হাত কোমড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“কি হয়েছে?”
“কিছু না।”
“মিথ্যা বললে একদম গর্দান নিয়ে নিব বলে দিচ্ছি”
মাহাদি দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“আমি আপনাদের সঙ্গে যাচ্ছি না শাহজাদি”
“মানে?”
“মানে আমি সাহাবাদেই থাকবো।”
মুহূর্তে মেয়েটার মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল।
“কেন?”
“কারণ আমি সেনাপতি। রাজপরিবারের সবাই একসাথে বাইরে যাবে। তখন রাজ্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব কাউকে না কাউকে নিতে হবে। আর সেটা আমি।”
সুনেহেরা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো।
“আপনি ছাড়া আর কোনো সেনাপতি নেই?”
“না।”
“উপসেনাপতি আছে।”
“আছে।”
“তাহলে?”
মাহাদি মৃদু হেসে মাথা নাড়লো।
“সব দায়িত্ব অন্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।”
সুনেহেরা বিরক্ত হয়ে বলল
“সবসময় দায়িত্ব দায়িত্ব দায়িত্ব! আপনার জীবনে আর কোনো শব্দ নেই?”
মাহাদি বর্মের আড়ালে মৃদু হেসে বলল
“এজন্যই ভালোবাসতে বারণ করেছিলাম শাহজাদি”
সুনেহেরা এবার একেবারে সামনে এসে দাঁড়ালো।
“অ্যাহহহ, বারণ করেছিলো? আপনি উস্কেছেন আমাকে?”
মাহাদি বোকা বোকা তাকিয়ে বলল
“কখন?”
“আপনি যাবেন?”
“না”
মাহাদির উত্তর শুনে সুনেহেরা রাগে ফুঁসতে লাগলো।
“আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি না গেলে আমিও যাবো না।”
সে একরকম জেদ করেই বসল।
“আপনি থাকলে আমিও থাকবো। আপনাকে রেখে আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
মাহাদি কপালে হাত ঠেকালো। এই মেয়ের জেদের সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন। অনেকক্ষণ বোঝানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। সুনেহেরা একই কথা বলছে। শেষ পর্যন্ত মাহাদি একটু নরম গলায় বলল
“জাহ্নবী আমার দিকে তাকাও।”
সুনেহেরা মুখ ফিরিয়ে ছিল। তবু তাকালো। মাহাদি শান্ত স্বরে বলল
“তুমি কত বছর পর রাজ্যের বাইরে যাচ্ছো জানো?”
সে চুপ।
“তুমি পাহাড় দেখতে চেয়েছিলে। নদী দেখতে চেয়েছিলে। নতুন অঞ্চল দেখতে চেয়েছিলে।”
সুনেহেরা বাচ্চাদের মত আবদার করে বলল
“কিন্তু সেগুলো তো আপনার সাথে”
মাহাদি হাতের চামড়ার খোলস টা খুলে সুনেহেরার গাল ছুঁয়ে বলল
“আর আমি তো হারিয়ে যাচ্ছি না। তোমরা ঘুরে আবার ফিরে আসবে। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো।”
সুনেহেরার চোখ একটু নরম হলো। মাহাদি মৃদু হাসলো।
“রাজ্যের দায়িত্ব আমার। আর আমার দায়িত্ব পালন করতে দেখেই তো তুমি এতদিন গর্ব করেছো।”
কথাটা শুনে সুনেহেরা চুপ করে গেল। কিছুক্ষণ পর ধীর গলায় বলল
“সত্যি অপেক্ষা করবেন? নাকি ওই বনিক এর মেয়ে কে বিয়ে করে নেবেন?”
মাহাদি এবার হেসে ফেললো।
“ওহহ আপনি শুনেছেন কথাটা?”
সুনেহেরা চোখ পাকিয়ে তাকায়
“আপনি বিয়েতে মত দিয়েছেন?”
মাহাদি সুনেহেরা কে রাগাতে বলল
“জমিদার স্বয়ং যেখানে সম্বন্ধ করছে। সেখানে আমার আর কোনো কথা থাকতে পারে নাকি?”
“ঠিক আছে আমি আমার তলোয়ার টায় শান দিই গিয়ে। ফিরে এসে আপনার আর আপনার স্ত্রী দুজনেরই মুন্ডু নামাবো আমি”
মাহাদি হো হো করে হেসে উঠলো। সুনেহেরা গম্ভীর মুখে চলে যেতে গিয়ে আবার ফিরে তাকালো। মাহাদি কে এই প্রথমআার এভাবে হাসতে দেখলো সে। মাহাদি হাসি থামিয়ে এগিয়ে এসে বলল
“চিন্তা করবেন না শাহজাদি। এই বিশাল দেহ আর পাথুরে মন এর দখলদারি সেই কবেই আপনাকে দিয়ে দিয়েছি। কেউ আসলে বলে দেব শাহজাদি আগে থেকেই ওই ইংরেজিতে কি যেন বলে?”
সুনেহেরা কাচুমাচু মুখেও বলল
“বুকিং”
“হ্যা হ্যা। আপনি ঘুরে আসুন”
সুনেহেরা আরো একটু একটু এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। মুখ ভাড় করেই বলল
“এবার মাথার ওটা খুলুন”
মাহাদি আস্তে করে মাথা আর মুখ ঢেকে রাখা লোহার খোলস টা খুলল। সুনেহেরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো লালচে মুখটার দিকে। তারপর চোখ নামিয়ে বলল
“চোখ বন্ধ করুন”
মাহাদি চোখ বন্ধ করে বলল
“চোখ টোখ তুলে নেবেন নাকি? কথা দিচ্ছি কারও দিকে তাকাবো না। তাও এই অধম এর চোখ জোড়া নেবেন না। নইলে আপনাকে দেখবো কি করে?”
“খালি বাজে কথা। ঝুঁকুন অল্প। পাহাড়ের মত লম্বা”
মাহাদি ঝুঁকে মুখ নিচু করলো। সুনেহেরা ওমনি টপ করে একটা চুমু খেল মাহাদির পুরুষালী ঠোঁট জোড়ায়। মাহাদির শরীর বিদ্যুৎস্পষ্ট হলো যেন। চোখ খোলার আগেই সুনেহেরা হাওয়া।
দৌড় লাগালো মহলের দিকে মাহাদি তখনও দাঁড়িয়ে আছে। পিছন ফিরতেই দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিললো। তারপর সুনেহেরা মুখ লুকিয়ে দ্রুত হাঁটা দিল। মাহাদি নিজের অজান্তেই একটু হেসে ফেললো।
কেমন হয়েছে জানিও প্রিয় রা । তোমাদের ঈদ কেমন কাটলো হুমমম। সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করিও পাখিরা
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৫
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৭
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২০
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩২ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫৫
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১