Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৮


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ২৮

মেহেরুন্নেসা এবং মিরান দু’জন নিঃশব্দে অন্দরমহল পেরিয়ে প্রাসাদের পেছনের দিকে এগিয়ে গেল। এই দিকটায় খুব কমই কেউ আসে। পথটা ক্রমশ নির্জন হয়ে উঠলো। গাছের ছায়া, ভাঙা দেওয়াল, শ্যাওলা ধরা ইট সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন অন্য এক জগতের মতো লাগছিল।
কিছুদূর যাওয়ার পর মিরান থামলো। মেহেরুন্নেসা সামনে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।
একটা দালান। কিন্তু সেটা সাধারণ কোনো দালান না। প্রাসাদের পেছনের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই স্থাপনাটা যেন সময়ের বাইরে পড়ে আছে। লম্বা খিলান দরজা, দেয়ালে খোদাই করা জটিল নকশা, কোথাও কোথাও ফাটল ধরা পুরোনো পাথর, আবার তার মাঝেই নতুন করে বসানো মার্বেলের টুকরো, যেন কেউ পুরোনো কিছুকে আড়াল করে নতুন রূপ দিতে চেয়েছে।

দালানের উপরের অংশে ঝুলছে কাঁচের ভাঙা লণ্ঠন, যেগুলোর ভেতরে ক্ষীণ আলো জ্বলছে। সেই আলোয় পুরো জায়গাটা কেমন রহস্যময় লাগছে। সুন্দর, অথচ অস্বস্তিকর। দরজাটা অল্প খোলা ছিল। মিরান ঠেলে খুলতেই ভেতর থেকে এক ধরনের ঠান্ডা সুগন্ধ বেরিয়ে এলো। মেহেরুন্নেসা ভেতরে পা রাখলো। আর ঢুকেই থমকে গেল। ঘরটা অদ্ভুত সুন্দর। চারপাশের দেয়াল জুড়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ ফুল, লতা, পাখির নকশা। কিন্তু সেই নকশাগুলোর মাঝে মাঝে এমন কিছু চিহ্ন খোদাই করা, যেগুলো অচেনা। যেন কোনো গোপন ভাষা।

মেঝেতে পুরু নরম কার্পেট। পায়ের শব্দই শোনা যায় না। ঘরের মাঝখানে বিশাল একটা পালঙ্ক। গাঢ় লাল মখমলের চাদর পাতা। চারপাশে হালকা সাদা পর্দা ঝুলছে, যেগুলো বাতাসে আস্তে আস্তে দুলছে। ঘরের চার কোণে ছোট ছোট প্রদীপ জ্বলছে। সেই আলোয় পুরো ঘরটা সোনালি আভায় ভেসে যাচ্ছে। অথচ কোথাও একটা চাপা অন্ধকার লুকিয়ে আছে।বমেহেরুন্নেসার গা শিউরে উঠলো। এমন সুন্দর জায়গা… অথচ এত ভয় লাগছে কেন?

তার মনে হঠাৎ একটা চিন্তা খেলে গেল। সে কি ঠিক করেছে এখানে এসে? মিরানের ওপর ভরসা করা কি ভুল হলো? যদি এটা কোনো ফাঁদ হয়?
বাইজিদ তো এখন প্রাসাদে নেই… বানিজ্যিক কাজে রাজ্যের বাইরে গেছে। এই মুহূর্তে যদি কিছু হয়। তার বুকটা ধক করে উঠলো। সে এক পা পিছিয়ে যেতে চাইল। ঠিক তখনই মিরান তার হাতটা আলতো করে ধরে ফেললো।
“ভয় পাচ্ছো?”
মেহেরুন্নেসা কিছু বললো না। শুধু চোখে আতঙ্ক নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। মিরান তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে গিয়ে পালঙ্কের উপর বসালো।
“বসো।”
তার গলায় অদ্ভুত শান্তি। মেহেরুন্নেসা অনিচ্ছায় বসে পড়লো। নরম মখমলের স্পর্শে শরীর ডুবে গেল, কিন্তু মনটা আরও অস্থির হয়ে উঠলো।
চারপাশে তাকিয়ে সে অনুভব করলো এই ঘরটা শুধু সুন্দর না। এই ঘর কিছু লুকিয়ে রেখেছে।
কিছুমেহেরুন্নেসা পালঙ্কের কিনারায় বসে আছে। তার আঙুলগুলো আঁকড়ে ধরা, চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি। ঘরের নরম আলো, সুগন্ধ, আর নিস্তব্ধতা সব মিলিয়ে পরিবেশটা যেন অদ্ভুত ভারী।

মিরান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। যেন কোথা থেকে শুরু করবে ভাবছে।
তারপর ধীরে ধীরে বলল
“তোমার সব কৌতূহল এর উত্তর দিতে হলে গোড়া থেকে আসতে হবে বেগম”
মেহেরুন্নেসা চুপচাপ তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
মিরান এগিয়ে এসে একটু দূরে দাঁড়ালো। তার চোখে তখন অন্যরকম গভীরতা।
“শুরু করছি জমিদার গিন্নিনকে দিয়ে। শাহজাদা বাইজিদের মা… মাইমুনা শেখ।”
নামটা উচ্চারণ করার সময় তার কণ্ঠে অদ্ভুত এক সম্মান মিশে গেল।
“তিনি সাধারণ কোনো নারী ছিলেন না। একজন যোদ্ধার মেয়ে ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তলোয়ার চালাতে জানতেন, ঘোড়ায় চড়তে জানতেন… যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়ানোর সাহস ছিল তার চোখে।”
মেহেরুন্নেসার কপাল কুঁচকে গেল। মিরান ফের বলল
“বাকের শাহ্ একবার বাণিজ্যের কাজে অন্য এক রাজ্যে গিয়েছিলেন। সেখানেই প্রথম দেখেন মাইমুনাকে। বলা হয়… প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হয়ে যান তিনি।”
মিরান একটু থামলো।
“তারপর তাকে বিয়ে করে নিয়ে আসেন সাহাবাদে।”
ঘরের ভেতর নীরবতা আরও ঘন হলো।
“শুরুতে সবকিছু খারাপ ছিল না। সংসার চলছিল… মোটামুটি। মাইমুনা শেখ নিজের মতো করে মানিয়ে নিয়েছিলেন। যদিও এই প্রাসাদের নিয়ম, এই আড়ম্বর কিছুই তার নিজের জগতের মতো ছিল না।”
মেহেরুন্নেসা নিঃশ্বাস আটকে শুনছে।
মিরানের গলা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠলো
“তারপর শাহজাদা দুনিয়ায় আসে। পরে আসে রত্নপ্রভা। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই গুঞ্জন শুরু হয়।”
সে চোখ তুলে তাকালো মেহেরুন্নেসার দিকে।
“মারজান বেগমের নাম শোনা যেতে থাকে।”
মেহেরুন্নেসার বুকটা ধক করে উঠলো।
“ বলা হতো… বাকের শাহ্ আর মারজান বেগমের মধ্যে সম্পর্কটা শুধুই আত্মীয়তার ছিল না। তার চেয়ে বেশি কিছু।”
ঘরের বাতাস যেন আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।
“প্রাসাদের দেয়াল খুব শক্ত, বেগম… কিন্তু ফিসফাস থামানো যায় না। দাসীরা জানতো, প্রহরীরা জানতো… এমনকি মাইমুনা শেখও বুঝতে পেরেছিলেন।”
মিরানের কণ্ঠ এবার নিচু, কিন্তু তীক্ষ্ণ।
“একজন যোদ্ধার মেয়ে ছিলেন তিনি। অপমান সহ্য করার মতো মানুষ না।”
মেহেরুন্নেসার আঙুল আরও শক্ত হয়ে এলো।
“তারপর… খুব অল্প কিছুদিনের মধ্যেই— হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ে”
মিরান ধীরে ধীরে বললো
“মাইমুনা শেখ মারা গেছেন।”
একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো।
“কারণ বলা হলো… সাপের কামড়ে মৃত্যু।”
মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস আটকে গেল। মিরান ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো।
“কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজ ছিল না।”
সে একটু ঝুঁকে এলো, কণ্ঠ আরও নিচু
“প্রাসাদের ভেতর কেউ কোনো সাপ দেখেনি সেদিন। কেউ কোনো চিৎকার শোনেনি। অথচ… এক যোদ্ধার মেয়ে, যে ছোটবেলা থেকে জঙ্গলে বড় হয়েছে… সে কি করে সাপের কামড়ে এভাবে মারা যায়?”
মেহেরুন্নেসার চোখ বড় হয়ে গেল। মিরান সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
“ অনেকেই বলতো… এটা দুর্ঘটনা না।”
একটু থামলো ।তারপর ফিসফিস করে বললো
“এটা ছিলো… পরিকল্পিত।”
ঘরের ভেতর হঠাৎ যেন সব আলো ম্লান হয়ে গেল। মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে উঠলো। তার মনে হলো— এই প্রাসাদের দেয়ালের ভেতর কত কিছু লুকিয়ে আছে, যা কেউ জানে না… বা জানতে চায় না।
ঘরের ভেতর নীরবতা যেন আরও ঘন হয়ে উঠেছে। মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে বসে আছে, কিন্তু তার বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। মিরান আবার ধীরে হাঁটা শুরু করলো। তার পায়ের শব্দও যেন কার্পেট গিলে ফেলছে।
“এখন শুনো… মারজান বেগমের কথা।”
মেহেরুন্নেসাও মনোযোগ দিল। মিরানের ঠোঁটে হালকা এক তিক্ত হাসি ফুটে উঠলো।
“ এই মহলে তিনি এসেছিলেন কোনো সাধারণ পথ ধরে না।”
সে একটু থামলো, তারপর নিচু গলায় বললো—
“নিজের স্বামীকে হত্যা করে।”
মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“ হ্যাঁ… কথাটা গোপন রাখা হয়েছিল। বাইরে কেউ জানতো না। কিন্তু ভেতরের লোকেরা জানতো… বা অন্তত সন্দেহ করতো। তার স্বামী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন। আর তার কিছুদিনের মধ্যেই, মারজান বেগম এই প্রাসাদে।
মিরানের চোখে তখন তীক্ষ্ণ ঝিলিক।
সুন্দরী ছিলেন… বুদ্ধিমতীও। মানুষকে নিজের দিকে টানার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার।”

ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠলো।
“বাকের শাহ্ তখনো মাইমুনা শেখের স্বামী। কিন্তু ধীরে ধীরে… সেই দূরত্ব তৈরি হতে লাগলো। আর সেই ফাঁকটাই ব্যবহার করেছিল মারজান।”
মেহেরুন্নেসা নিঃশব্দে শুনছে।
“একসময় পুরো প্রাসাদেই কানাঘুষা শুরু হলো। কারো সামনে কিছু না, কিন্তু আড়ালে আড়ালে… সবাই বুঝতে পারছিল, সম্পর্কটা কেমন।”

মিরান থামলো। চোখ সরু করে তাকালো সামনে।
“তারপর… মাইমুনা শেখ মারা গেলেন। আর তার কিছুদিন পর… মারজান বেগম যেন এই প্রাসাদের ছায়ার মতো হয়ে উঠলেন। তার উপস্থিতি, তার প্রভাব সবকিছু বাড়তে লাগলো।”

মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছে।
“কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ না।”
মিরানের কণ্ঠ আরও নিচু হলো।
“ কারণ… যেভাবে মাইমুনা শেখ মারা গিয়েছিলেন। প্রায় একইভাবে…..
সে একদম কাছে ঝুঁকে এলো।
“ মারা গেলেন মারজান বেগমও।”
মেহেরুন্নেসা নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইলো।
“বলা হলো… বিছার কামড়ে মারা গেছে তিনি। এক রাতে… নিজের কক্ষেই। কারো কোনো শব্দ শোনা যায়নি। সকালে গিয়ে দেখা গেল তিনি আর নেই।”
মিরান সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
“ অদ্ভুত না?”
তার চোখে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন।
“একের পর এক… একই ধরনের মৃত্যু।”
সে ধীরে ধীরে বললো—
“আগে মাইমুনা শেখ… তারপর মারজান বেগম।”
মেহেরুন্নেসা কাপা কাপা গলায় বলল
“তাহলে মারজান বেগম…..

“হ্যা….সেটাই প্রশ্ন। তাহলে উনি বেঁচে কি করে আছেন? সেদিনের পর থেকে দুই বছর সে রাজ্যবাসীর কাছে মৃতই ছিলো। কিন্তু বিপত্তি বাধলো দুই বছর পরে। সে হঠাৎ উদয় হলো কোথা থেকে যেন। জানা গেল দূরে কোনো মাদ্রাসায় ছিলো। জমিদার গিন্নি হওয়ায় প্রজারা মাথা ঘামাতে পারলো না”

মেহেরুন্নেসার আঙুলগুলো কাঁপতে লাগলো।
মিরান তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
“ এই প্রাসাদে… কেউই আসলে নিরাপদ না, বেগম।”
তার কণ্ঠে এবার কোনো নাটকীয়তা নেই।
শুধু নিঃসন্দেহ সত্যের মতো ভারী একটা সুর।
ঘরের নরম আলো হঠাৎ যেন আরও অন্ধকার লাগতে শুরু করলো মেহেরুন্নেসার কাছে। মেহেরুন্নেসা এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। কিন্তু এবার তার ধৈর্য ভেঙে গেল। সে এক ঝটকায় সোজা হয়ে বসলো। চোখে স্পষ্ট উত্তেজনা আর অস্থিরতা।
“সেসব না হয় বুঝলাম…”
তার গলা কাঁপছে, কিন্তু শব্দগুলো পরিষ্কার।
“ কিন্তু গতরাতে আমি আমার ভাইজানকে দেখেছি জঙ্গলে। তোমাদের সাথে। আজ সে মারা গেল কিভাবে?”
সে থামলো না।
“আর… আমি যার হাতে পড়েছিলাম। সে একজন পুরুষ ছিল। সে কে? আমি তার কাছ থেকে ছাড়া পেলাম কি করে?”

প্রশ্নগুলো যেন একসাথে ছুটে এলো। ঘরের ভেতর হঠাৎ আবার নীরবতা। মিরান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো মেহেরুন্নেসার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে একটা কুটিল হাসি ফুটে উঠলো।
“অবশেষে… আসল প্রশ্ন।”
সে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে অন্ধকার, গাছের ছায়া নড়ছে।
“যাকে তুমি দেখেছো সে সাধারণ কেউ না।”
মেহেরুন্নেসার বুক ধকধক করছে। মিরান ঘুরে তাকালো তার দিকে।
“ সে এই অন্ধকার দুনিয়ার রাজা।”
শব্দগুলো খুব নিচু স্বরে বলা, তবু যেন দেয়ালে প্রতিধ্বনি হলো।
“তার কোনো নাম নেই সবার সামনে। কেউ তাকে ডাকে না। কিন্তু সবাই তাকে চেনে।”
মিরান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
“জমিদাররা… যাদের তুমি এত ক্ষমতাবান ভাবো, তারা নিজেরাই তার কাছে ঋণী।”
মেহেরুন্নেসার চোখ বড় হয়ে উঠলো।
“ এই রাজ্যের যে গোপন বাণিজ্য… যে লেনদেন, যে চুক্তি তার অর্ধেকই তার নিয়ন্ত্রণে। সে ছায়ার আড়াল থেকে সব চালায়।”

মিরানের চোখে অদ্ভুত ঝিলিক।
“জমিদাররা তার সাথে ভাগে ব্যবসা করে। লাভের হিসাব, মানুষের হিসাব… সবকিছু।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।
“তাকে ছাড়া… তারা অচল।”
মেহেরুন্নেসার গলা শুকিয়ে গেল।
“আর আমার ভাই…?”
সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো। মিরান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে বললো
“তোমার ভাই… খুব বেশি কিছু জেনে ফেলেছিল। এই দুনিয়ায় একটা নিয়ম আছে, বেগম। যারা বেশি দেখে… বেশি বোঝে… তারা বেশিদিন বাঁচে না।”
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
সে ফিসফিস ক”রে বললো
“আর… আমি?
মিরান এবার একদম কাছে এসে দাঁড়ালো।
“তুমি বেঁচে আছো… কারণ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার ছিল।”
তার ঠোঁটে আবার সেই কুটিল হাসি।
“ আর যাকে তুমি ভয় পাচ্ছো… যার হাতে পড়েছিলে”
সে ধীরে ধীরে বললো
“তার কাছ থেকে তুমি ছাড়া পেয়েছো… কারণ সে নিজে তোমাকে ছেড়ে দিয়েছে।”
মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।
“ কেন…?”
প্রশ্নটা খুব আস্তে বের হলো তার ঠোঁট দিয়ে।
মিরান চোখ সরু করে তাকালো।
“সেটা… এখনও বলার সময় আসেনি।”

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো।
কিন্তু এবার সেই নীরবতার ভেতর লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো অন্ধকারের আভাস। মেহেরুন্নেসার বুক উঠানামা করছে দ্রুত। তার চোখে ভয়, রাগ, অবিশ্বাস সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত ঝড়। সে কাঁপা গলায় বললো
“তাহলে সে-ই কি আমার ভাইজানকে হত্যা করেছে?”
ঘরের বাতাস যেন থমকে গেল। মিরান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তার মুখে সেই আগের কুটিল হাসিটা নেই এবার। চোখদুটো স্থির। তারপর ধীরে মাথা নাড়লো।
“ না।”
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা আরও কেঁপে উঠলো।মিরান এবার একটু সামনে এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠস্বর ঠান্ডা, নিরাবেগ
“শুধু সে না…”
একটু থামলো।
তারপর নিঃশব্দে বললো
“মেরেছি আমরা সবাই মিলে।”
শব্দগুলো যেন ছুরি হয়ে বিঁধলো। মেহেরুন্নেসার চোখ হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে উঠলো। সে বিশ্বাস করতে পারছে না।
“কি…?”
তার গলা ভেঙে গেল। তারপর মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখে জমে উঠলো ঘৃণা। সে পিছিয়ে গেল এক পা।
“ তুমি…!”
তার কণ্ঠ কাঁপছে, কিন্তু সেই কাঁপনের ভেতর স্পষ্ট ঘৃণা।
“তুমি পারলে…? ওহহ তুমি তো আবার খুনি”
তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
“আমার ভাইজান…!”
কথা শেষ করতে পারলো না সে। কান্নায় গলা আটকে গেল। সে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো। বুক ফেটে যাচ্ছে যেন। মিরান স্থির দাঁড়িয়ে রইলো।
তার চোখে কোনো দুঃখ নেই, কোনো অনুতাপ নেই শুধু অদ্ভুত এক কঠিন সত্যের ছায়া।
সে ধীরে ধীরে বললো
“সব সত্যি চোখে দেখা যায় না, বেগম।”
মেহেরুন্নেসা কান্নার ভেতরেই তাকালো তার দিকে। মিরান এবার একদম কাছে এসে দাঁড়ালো।
তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু প্রতিটা শব্দ ভারী
“এমন কিছু সত্যি আছে, যেগুলো তুমি জানলে…”
তার চোখ সরাসরি মেহেরুন্নেসার চোখে
“তুমি নিজেই হত্যা করতে তোমার ভাইকে।”
মেহেরুন্নেসা স্তব্ধ হয়ে গেল। কান্না থেমে গেল না, কিন্তু তার ভেতরে যেন নতুন এক ভয় জন্ম নিল।
কারণ এই কথাগুলো মিরান বলছে এমনভাবে যেন এটা কোনো হুমকি না বরং নিশ্চিত সত্য।

মেহেরুন্নেসা এখনও স্তব্ধ। তার চোখের জল থামেনি, কিন্তু কান্নার শব্দ যেন হারিয়ে গেছে। শুধু নিঃশ্বাসটা ভারী হয়ে উঠেছে।
সে ফিসফিস করে বললো
“কি এমন সত্যি…?”
মিরান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো
“সেদিন… যেদিন শাহজাদা তোমাকে তোমাদের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল। তুমি কি ভেবেছিলে, সেটা শুধু তোমার ভাইয়ের কোনো ছোটখাটো অপরাধের শাস্তি?”
সে মাথা নাড়লো না। শুধু তাকিয়ে রইলো।
মিরান এবার এক পা এগিয়ে এলো।
“রত্নপ্রভা কে কেউ আটকে রাখবে… অত্যাচার করবে… এমন বীর এখনো জন্মায়নি সাহাবাদে।”
তার কণ্ঠে দৃঢ়তা।
“ সে নিজের ভাগ্য নিজেই বদলাতে পারে।”
মেহেরুন্নেসার কপাল কুঁচকে গেল।
“তাহলে…?”
তার গলা কেঁপে উঠলো। মিরান এবার একটু থামলো। যেন কথাগুলো মাপছে।
তারপর ধীরে, খুব ধীরে বললো—
“আসল ঘটনা হলো… তোমার ভাই মাহবুব তোমাকে বিক্রি করতে চেয়েছিল।”
মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল। মেহেরুন্নেসার চোখ বড় হয়ে গেল। ঠোঁট কাঁপতে লাগলো।
“ না…আমি জিবনেও বিশ্বাস….. “

“তুমি থামবে?”

মিরান এর ধমকে থামলো মেহের। মিরান বিরক্তি নিয়ে বলল
“তেমার কি মনে হয়? এত রাতে কারাগার থেকে পালিয়ে, তোমায় এই নির্জন জায়গায় নিয়ে এসেছি মিথ্যা কথা শোনাতে?”

মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে ফলল। মিরান স্থির দাঁড়িয়ে রইলো।
“আমি সেই লোকটাকে চিনি… যার কাছে তোমাকে দেওয়া হতো। কিন্তু তার নাম এখন বলবো না।”
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছে।
“ না… ভাইজান এমন করতে পারে না…!”
সে মাথা নাড়তে লাগলো, চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে একের পর এক। মিরানের কণ্ঠ এবার আরও ঠান্ডা
“এসব বিশ্বাস করা কঠিন… তাই না?”
একটু ঝুঁকে এলো সে।
“ কিন্তু সত্যি সবসময় সহজ না। আর সেই কারণেই…
সে ধীরে ধীরে বললো
“শাহজাদা নিজে গিয়েছিল তোমাকে আনতে।
মেহেরুন্নেসার চোখ কেঁপে উঠলো।”
“সে তোমাকে শাস্তি দিতে নয়, তোমাকে বাঁচাতে নিয়ে এসেছে। ভালোবেসে নিয়ে এসেছে”

শব্দগুলো যেন ধীরে ধীরে ঢুকে গেল তার ভেতরে।
মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে বসে রইলো। মিরান সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
“এরপর… তোমাকে এই মহলে নিয়ে আসা হয়।”
তার কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা নেই। শুধু একের পর এক উন্মোচিত হতে থাকা সত্যের ভার।
মেহেরুন্নেসার মনে হচ্ছিল। তার পুরো পৃথিবীটা যেন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। চোখের পানি মুছে বলল
“আমি অরণ্য শাহ্ এর ব্যাপারে জানতে চাই। সে এখন কোথায়? সবাই বলে সে বেচে নেই। কিন্তু সেদিন রাতে জাহাজে আমি তাকে দেখেছি”

মিরান ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো।
“অরণ্যের কাহিনি জানতে হলে যেতে হবে ৮ বছর অতীতে। সে ছিলো ছন্নছাড়া, বেখেয়ালি। জমিদার বাড়ির বড় শাহজাদি রত্নপ্রভার সাথে তার প্রেম ছিল। যে সে প্রেম নয়। কঠিন প্রেম। তবে রত্নপ্রভাই কিন্তু আগে প্রেমে পড়েছিল অরণ্যের। অরণ্য তার পর প্রেমে মন দিলো। এমন ই এক নিরব রাতে মারজান তার কাল হলো”

মেহেরুন্নেসার রক্ত হিম হয়ে আসে। এগিয়ে আসে খানিকটা মিরান এর দিকে।
“তারপর? তারপর কি হয়েছিলো বলো না”

মিরান কিছু বলতে যাবে ওমনি ভারি দরজা টায় খটাখট শব্দ হয়। চমকে ওঠে দুজনই। এতরাতে এখানেনকে এলো। মিরান পর্যন্ত চমকে উঠলো। এখন তো কারো আসার কথা না। মেহেরুন্নেসা ফিসফিস করে বলল
“দরজা খুলো না। কোনো বিপদ হতে পারে আমাদের”

দেরি হওয়ার জন্য দুঃখীত। লেখা হয়ে গেছিলো অনেক আগেই। কিন্তু বিদ্যুৎ এর জন্য পোস্ট করতে পারিনি। আগামী পর্বে অরণ্যের কাহিনি ক্লিয়ার হবে। কেমন হইছে বলিয়েন।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply