তোমার_হাসিতে
ফারহানাকবীরমানাল
৩১.
ভেবেছিলাম দাদি বাবার কথা বুঝবেন। কিন্তু না, তেমন কিছু হলো না। দাদি খানিকক্ষণ থম মে’রে বসে রইলেন। তারপরই তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “ছেলে বউ দালালি করতে আমায় এসব বোঝাতে এসেছিস? আমার ছেলেকে জে’লে পাঠিয়ে নিজের ছেলে বউ নিয়ে সুখে সংসার ফাঁদবি। তামিমের ভাগের সম্পত্তি নিজেরা ভোগ করবি। যেন আমারটুকুও দখলে রাখতে পারিস তাই আমাকেও হাত করতে চাইছিস? শোন সবুর, এত বোকা আমি না। আমার ছেলেকে সরিয়ে নিজেরা সব ভোগদখল করবি এমন চিন্তা করলে ভুল বড় ভুল করছিস। আমি বেঁচে থাকতে কখনো তোদের এই শখ পূরণ হবে না।”
বাবা বললেন, “মা, তোমার এমন কেন মনে হচ্ছে? তুমি কী কখনো আমায় এসব বলতে শুনেছ নাকি এমন কিছু করতে দেখেছ?”
“আগে দেখিনি। এখন দেখছি। দুধকলা দিয়ে সব কালসাপ পুষেছি। বড় ভাই হয়ে ছোট ভাইয়ের বিপদের দিনে তার পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো ক্ষতি করতে চাইছিস? তুই তো এমন ছিলি না।”
“মা, আমি কখনো ছোট ভাইয়ের ক্ষ’তি চাইনি। তোমার ছোট যখন বেকার ছিল তখনও কিছু বলেনি। দিনের পর দিন সে এই সংসারে ভাত খেয়েছে। আমি কখনো তাকে কিছু বলিনি। বরং তুমি বলেছ। উঠতে বসতে খাওয়ার খোঁটা দিয়েছ।”
“মায়ের খোঁটায় কিছুই হয় না।”
বাবা হাসলেন। বরফ শীতল গলায় বললেন, “মায়ের খোঁটাতেই সবকিছু হয়। অন্য মানুষের কথা খুব বেশি গায়ে লাগে না।”
চিৎকার চেঁচামেচিতে সবাই বসার ঘরে জড় হয়েছে। রাত দুপুরে এমন চিৎকার চেঁচামেচি ফুফু ভীষণ বিরক্ত হলো। তেঁতো গলায় বলল, “মাঝরাতে কী শুরু করেছ? তোমাদের চিৎকার চেঁচামেচি জড় হয়ে যাবে।”
দাদি বললেন, “হলে হোক। সবাই জানুক এই বাড়িতে কী হয়েছে। কীভাবে আমার ছেলেকে ঠকানোর চেষ্টা হচ্ছে। আমার ছেলে কিছু করেনি, তা-ও তাকে জে’লে ভরে রাখা হচ্ছে।”
বাবা বললেন, “সত্যিই কী তোমার ছেলে কিছু করেনি?”
“না করেনি। সে আমাকে বলেছে– সে এই কাজ করেনি।”
“কে বলেছে? তামিম?”
দাদি কথার জবাব দিলেন না, রাগে কটমট করতে লাগলেন। আজকে বাবুইও এসে বসার ঘরে দাঁড়িয়েছে। সচারাচর তাকে এসব ঝামেলায় দেখা যায় না। আজ এসেছে। কী মনে করে এসেছে সে কথা বোঝা যাচ্ছে না। বাবুইয়ের হাত কাঁপছে। সে নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে। কপাল পর্যন্ত ঘোমটা টেনে রেখেছে। বাবুইয়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে তিমুর দিকে তাকালাম। তিমু কটমটে দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ যেন আমাকে ভস্ম করে দেবে।
বাড়ির পরিবেশ থমথমে। কেউ কোন কথা বলছে না। মা এসব ঝামেলায় আসেনি। ঘরে বসে আছে। বাবা তাকে ঘরে বসিয়ে রেখেছে। ফুফু দাদির সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে। সাহসে কূল পাচ্ছে না৷ কাল বাদে পরশু তানহার বাবার কে’সের শুনানি। আদালতে যেতে হবে৷ ফুফু সেই পর্যন্ত এ বাড়িতে থাকতে চায়। দাদির হাবভাব এমন হলে তা আর সম্ভব হয়ে উঠবে না। একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে নিজের ঘরে ঢুকে গেলাম। দাদি চুপ করেছে। রাতের ঘটনা এখানেই শেষ।
রাতের ঘটনা রাতে শেষ হলো না। দাদির চিৎকারে আবার ছুটে যেতে হলো। তিনি আব্বার জিনিসপত্র বাইরে ছুটে ফেলছেন। তীক্ষ্ণ গলায় বলছেন, “বেরিয়ে যা। তুই তোর বউ ছেলে-মেয়েকে নিয়ে এক্ষুনি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা।”
বাবা আর কিছু বললেন না। ঘন্টা খানেক দাঁড়িয়ে দাদির কান্ড দেখলেন। মা’কে কাছে দেখে বরফ শীতল গলায় বললেন, “সাজ্জাদের মা, তৈরি হও। আমরা বের হবো।”
সেই রাতেই বাবার সাথে বেরিয়ে আসতে হলো। দাদি আটকাবে, নিষেধ করবে এ জাতীয় সূক্ষ্ণ আশা মনে বিঁ’ধ’লেও কাজে কিছু হলো না। মা বলল, “এত রাতে কোথায় যাব? আব্বাদের ওখানে গেলে নানান প্রশ্ন করবে।”
বাবা বললেন, “কোথাও যেতে হবে না। আজ আমরা ঘুরব।”
“কী বলছেন আপনি?”
“ঠিক কথা বলছি। কত মানুষ রাতবিরেত ঘুরে বেড়ায়। আজ না হয় আমরা তিনজন ঘুরলাম। নদীর পাড়ের ওই দিকটায় যাব। ওদিকে বাতাস থাকবে।”
“এত রাতে?”
“আরে চিন্তার কিছু নেই। সাজ্জাদ আছে, আমি আছি। ভয় কী?”
“না, ভয় না।”
“কিছু খাবে? বাসস্ট্যান্ডের ওখানে তিনটে দোকান আছে। যেখানকার খাবার খুব বাজে। পাশে ঝুপড়ি মতো আছে একটা। সেখানে মাঝরাতে পরোটা গোশত পাওয়া যায়। সব দিন পাওয়া যায় না। মাঝেমধ্যে যায়।”
বাবা মাকে আর আমাকে ওই দোকানে নিয়ে গেলেন। ভাগ্য ভালো। কাঠের চুলায় গরুর গোশত রান্না আছে। পাশেই পরোটা বানানোর ব্যবস্থা। লোকজন নেই। বাবা গিয়ে দোকানিকে সালাম দিলেন। অন্তরঙ্গ সুরে বললেন, “লোকজন হয়নি এখনো?”
“হয়েছে। গোশত রান্না হয়নি দেখে ঘুরতে গেছে। এসে পড়বে। দেড় কেজি গোশত, আড়াই কেজি ময়দা। কিছু বাঁচে না।”
“বিক্রি হয়ে যায়।”
“হ্যাঁ, সব বিক্রি হয়ে যায়। আপনাদের ভাগ্য ভালো। আগে এসেছেন। বসেন। ওইখানে বেঞ্চি পাতানো আছে। বেঞ্চিতে গিয়ে বসেন। রান্না শেষ।”
ঝগড়া অশান্তিতে মাঝরাতে বাড়ি ছাড়া হয়েছি। দাদি জিনিসপত্র বাইরে ছুঁড়ে ফেলেছে। যাওয়ার জায়গা নেই। খুব খারাপ সময়। অথচ আমার মনে হচ্ছে– জীবনে সেরা একটা রাত পার করছি। বাবা মা পাশাপাশি বসে আছে। চাঁদের আলো তাদের গায়ে এসে লাগছে। মায়ের মুখ দুশ্চিন্তায় ভরা। বাবার মুখ শান্ত। যেন নদীর জোয়ার থম খেয়েছে। ভীষণ ভালো লাগছে দেখতে। দোকানি তিনটে প্লেটে পরোটা গোশত দিয়ে গেল। সুইচ টিপে বাতি জ্বালিয়ে দিলো। বাবা বললেন, “খাওয়া শুরু করো। এই দোকানের রান্না ভালো হয়।”
রান্না ভালো। সত্যিই ভালো। মুখে লেগে থাকার মতো। খাওয়া শেষে খানিকক্ষণ বসে একটু জিরিয়ে নিলাম। লোকজন আসতে শুরু করেছে। বাবা আর বসলেন না, আমাদের নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। গোটা রাত সারা শহর ঘুরে বেড়ালাম। কী অদ্ভুত অনুভূতি। ল্যামপোস্টের আলো জ্বলছে। রাস্তার পাশে কুকুর শুয়ে আছে৷ কখনো সখনো এক দুটো জোনাকি পোকা দেখা যাচ্ছে। হালকা বাতাস। খুব ইচ্ছে করল– বাবা মায়ের মাঝখানে গিয়ে তাদের দু’জনের হাত ধরে ফেলি। বয়স অল্প হলে এই ইচ্ছে পুষে রাখতে হতো না। অবলীলায় হাত ধরে ফেলতে পারতাম। আজ পারলাম না। কোথাও যেন আটকে গেলাম। বুকের মধ্যে চাপা ব্যাথা অনুভব হলো। খুব কী ক্ষতি হতো যদি আজকের রাতে আমার বয়স কমে বাচ্চাদের কাতারে চলে আসত? হতো না নিশ্চয়ই। বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের করে দিলাম। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ইচ্ছেগুলো অপূর্ণ থাকে। কেন থাকে? আক্ষেপ বাঁচিয়ে রাখতে? এমন কী ক্ষতি হতো যদি এসব ইচ্ছে পূরণ হয়ে যেত? আক্ষেপ ফুরিয়ে যেত বোধহয়। কিছু আক্ষেপ ফুরিয়ে যেতে নেই। জমা রাখতে হয়।
রাত প্রায় শেষ। নদীর পাড়ে খুব বাতাস। গায়ে হীম ধরে যায়। মা বলল, “এইভাবে ঘোরাঘুরি করা ঠিক হচ্ছে না। শত্রুর অভাব নেই। কখন কে কোথায় থেকে চলে আসে বলা যায় না।”
“তাহলে কী করবে?”
আমি বললাম, “বাদশাকে কল দেব? মোটরসাইকেল নিয়ে আসবে।”
“একটা মোটরসাইকেলে তিনজন হবে? কী যে বলিস না তুই!”
“তা-ও ঠিক। তাহলে কী করবে?”
বাবা বললেন, “সকাল হয়ে এসেছে। খানিকক্ষণ পরই ফজরের আজান হবে। তোমরা দু’জনে সাজ্জাদের নানাবাড়িতে যাও।”
“আর তুমি? তুমি কী করবে?”
“ফজরের নামাজ পড়ে, দোকান থেকে কিছু খেয়ে অফিসের দিকে যাব।”
মা প্রথমে রাজি হতে চাইল না। পরে বাবার কথায় রাজি হলো। চাঁদ এখনও ডোবেনি। মা বাবা পাশাপাশি হাঁটছে। আমি গিয়ে তাদের মাঝখানে দাঁড়ালাম। তরল গলায় বললাম, “আমি তোমাদের হাত ধরে হাঁটব।”
তারা কী ভাবল কে জানে। যা খুশি ভাবুক। জীবনে এমন দিন আর না-ও আসতে পারে। ভবিষ্যতের কথা বলা যায় না। অনেক কিছুই হতে পারে। তবে আজকের রাত বিশেষ। এই রাতে আমি আমার কোন ইচ্ছে অপূর্ণ রাখতে চাই না। খানিকক্ষণ হাঁটার পর মায়ের মুখে দিকে তাকালাম। মায়ের চোখ ভিজে উঠেছে। বাবাও দুই দুইবার করে শার্টের হাতায় চোখ মুছেছেন। কী অদ্ভুত! এখানে কাঁদার কী আছে? এমন সুন্দর পরিবেশ। রাত প্রায় শেষ, খোলা আকাশের নিচে নিরিবিলি পরিবেশ, শীতল বাতাস, অচেনা ফুলের মিষ্টি একটা গন্ধ নাকে লাগছে। চারপাশের সবকিছু কী সুন্দর স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে। এর মাঝে এক ছেলে তার বাবা মায়ের হাত ধরে হাঁটছে। ছেলেটার বয়স একটু বেশি। কত বেশি? সতেরো আঠারো হবে। এর আর এমন কী ব্যাপার? একি! আমার চোখজোড়াও এমন ভিজে উঠেছে কেন? কেন কাঁদছি আমি? খুশিতে? তবে কী সব সুখ হাসিতে প্রকাশ পায় না?
পরের দিনটা নির্বিঘ্নে কে’টে গেল। মা’কে নিয়ে নানাবাড়িতে এসেছি। বাবা অফিস শেষ করে এদিকে আসবেন। নানা নানি কিছু জানানো হয়নি। মা সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। বলেছে– আমি নাকি আসতে চেয়েছি। নানা-নানি খুব হেঁসে। উৎফুল্ল গলায় বলেছে– এই সাজ্জাদ আগে শুক্রবার পড়লেই আমাদের বাড়িতে আসার বায়না ধরত। এখন তো বড় হয়ে গেছে। এখন আর সময় কই।
সকাল এগারোটায় কোর্ট বসার কথা। এখন বাজে দশটা ঊনচল্লিশ। বাবার সাথে কোর্টের সামনে এক চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে আছি৷ মা আসেনি৷ ইচ্ছে করেই নিয়ে আসা হয়নি। মা সব শুনে সামলাতে পারবে না। ফুফুর আসার কথা ছিল৷ সে এখনও আসছে না৷
নয়টা ঊনষাট পর্যন্ত ফুফুর আশায় কোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। সে এলো না। বাবা বললেন, “চল আমরা ভেতরে গিয়ে বসি।”
ভেতরে গিয়ে দেখি ফুফু বসে আছে৷ তার সাথে তিমুও এসেছে৷ আমি গিয়ে ফুফুর পাশে বসলাম। গলার স্বর অনেকখানি নিচু করে বললাম, “দাদি কী কিছু বলেছে?”
ফুফু বলল, “না, মা কিছু বলেনি। এখানে আসতে চেয়েছিল। আমি নিয়ে আসিনি। অহেতুক ঝামেলা।”
বিচারক চেয়ারে বসে হাতের ইশারা করলেন। দু’পক্ষের উকিল আছে৷ আসামি পক্ষের উকিল দেখে আমার বেশ মায়াই লাগল৷ সে সবকিছু জানে৷ তানহার বাবা কী করেছে না করেছে৷ সব জেনেশুনে অপরাধীর পক্ষে কথা বলবে– শুধুমাত্র টাকার জন্য। মানুষের জীবনে টাকার এত প্রয়োজন।
আদালতের কাজ শুরু হয়েছে। তানহার বাবার বিরুদ্ধে প্রমাণ খুব শক্ত। রইস উদ্দীনের দেওয়া ভিডিওগুলো আছে। রইস উদ্দীন নিজেও উপস্থিত আছে। সে আজ সাক্ষ্য দেবে। এর বাইরে কিছু ছেলেপেলে জোগাড় হয়েছে। তারাও বলবে।
বাদশার আদালতে ঢুকতে দেরি হলো। সে বিচারকের কাছে ক্ষমা চেয়ে আমার পাশে এসে বসল। গলার স্বর অনেকখানি নিচু করে বলল, “আজকে রায় দেবে না। দেখিস ঠিক একটা কায়দা করে তারিখ পিছনে নেবে।”
পক্ষের উকিল তারিখ পেছানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করল। লাভ হলো না। বিচারক বললেন, “কে’সকে টেনেহিঁচড়ে লম্বা করার কিছু নেই। সাক্ষ্য, প্রমাণ স্পষ্ট। কাজেই আদালতের সিদ্ধান্ত শোনাতে বিলম্ব করা শুধুমাত্র সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছু না।”
বিচারক সিদ্ধান্ত শোনালেন। সবকিছুর বিবেচনায় মৃ’ত্যুদন্ডের রায় শোনলেন। তানহার নানি, মা দু’জনে কেঁদে উঠল। পক্ষের উকিল তাদের স্বান্তনা দিয়ে বলল, “চিন্তা করবেন না। আপিল করে এ রায় পরিবর্তন করা যাবে। এত দুশ্চিন্তার কিছু নেই।”
চলবে
Share On:
TAGS: তোমার হাসিতে, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৯
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৪
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ১
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৭
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৫
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৩০
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৯
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৮
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৭
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৮