Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৯০(প্রথমাংশ)


জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব :৯০(প্রথমাংশ)
ক’পি করা নিষিদ্ধ
সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
বাইরে মাতাল করা ঝোড়ো হাওয়া বইছে। আর সেই উন্মত্ত বাতাসের বুকে ভর করে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি যেন কুয়াশার চাদর হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। নিঝুম রাতের স্তিমিত পরিবেশের চারপাশটা বড় রোমাঞ্চকর ঠেকছে। ঠিক সেই মূহুর্তে কালবৈশাখী ঝড়ের দমকা হাওয়ার মতো হসপিটালে হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ ঘটে এক দুর্ধর্ষ নারীর। লম্বাটে নারীকায়ায় জড়ানো খানদানি মখমলে শাড়ি। ফর্সা কোমল মুখাবয়বে এই মূহুর্তে এক রহস্যময় পৈশাচিক তৃপ্তির ছাপ। নুলক চৌধুরী কোনোদিকে দৃষ্টিপাত না করেই সোজা এসে অবস্থান করেন নোহার আইসিইউ কেবিনের ভেতর। বিছানায় শয্যাশায়ী অবচেতন আদুরে কণ্যাকে দেখতে পেয়েই পা থমকালো রমণীর। চোখে-মুখের পৈশাচিকতা এক লহমায় উবে গিয়ে হানা দিল একরাশ কোমলতা।
মধ্যবয়সী এই রমণীকে কে বলবে যৌবন পেরিয়েছে সেই কবে! বরং এখনো মনে হয় বিশ-পঁচিশের যুবতী। তবে বোধহয় দেহের বল তার এখন কমে আসছে। এই তো ধীর পদচারণে এগিয়ে গিয়ে বসল বিছানার পাশে রাখা টোলখানায়। অপলক শয্যাশায়ী মেয়ের পানে চেয়ে রইল খানিকটা সময়। টলমলে হয়ে উঠল তাঁর নয়নজোড়া। এই মূহুর্তে একটু যে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে তারও উপায় নেই। থাকবে কি করে? মেয়েটার মাথায় যে চিকিৎসার যন্ত্রপাতি ভর করে আছে। হাত পায়ে দখল করে আছে ক্যানুলা আর সাদা গজে মোড়ানো ব্যান্ডেজ। বুকে বড় বেদনার চাপ অনুভব করছেন নুলক চৌধুরী। পরক্ষনেই চেহারা কঠিন হয়ে আসল তাঁর। ঠোঁটের কোণায় পৈশাচিক হাসির রেশ। তিনি নাক টেনে সিক্ত গলায় বলে উঠলেন,
–“কি ভেবেছিল ওরা? আমাকে ঠকিয়েছে বলে আমার মেয়েকেও ঠকিয়ে পাড় পেয়ে যাবে? এতই সোজা! ছোট থেকে ভালোবেসে গেলাম ইকবাল ভাইকে। আর কি করলো সে? আমাকে ঠকিয়ে আমার ছোট বোনকে বিয়ে করে নিল! নাবুও ঢ্যাংঢ্যাং করে ইকবাল ভাইয়ের গলায় ঝুলে পড়ল। বুঝিয়ে দিল সৎ বোন কোনোদিন আপন হয় না।
একসময় আমার খুব গিল্টি ফিল হতো। মনে হতো ছোট মাকে খু”ন করার পরিকল্পনায় আমি থেকে মস্ত বড় পাপ করেছি। সবসময় অপরাধবোধ করতাম। কিন্তু না, আমার সব অনুভূতি পায়ে পিষে দিল আমার আপন বাবা আর সৎ বোন। তারপর বাবাকেও খু”ন করার পরিকল্পনা করতে আমার হাত বিন্দু মাত্র কাঁপেনি। সবাই আমার সাথে বেইমানি করে গেল। আমাকে একটা নিগ্রোর মতো দেখতে মুর্খ ক্রি’মি’নাল লোকের সাথে বিয়ে দিয়ে দিল। এমনকি বাবা ম’রার আগে তার সব প্রোপার্টি নাবুটার নামে দিয়ে দিল। খুব রা’গ হতো আমার। ইচ্ছে করতো গলা টিপে একদম মে”রে ফেলি। ইকবাল ভাইয়ের পাশে শুধু আমাকে মানায়, আর কাউকেই না৷ কিন্তু নাবুটার কপাল বড় ভালো। বারবার আমার হাত থেকে বেঁচে গেছে। কিন্তু…”
নুলক চৌধুরী বলতে গিয়ে থামলেন। অক্লিষ্ট ভঙ্গিমায় এক মূহুর্ত আপনমনে কিছু ভাবলেন। অতঃপর ক্রর হেসে বলে উঠলেন,“কিন্তু জেসমিন আমার হাত থেকে মুটেও পাড় পায় নি। মনিরাটাকে যেভাবে বিষ দিয়ে মে’রেছি, ঠিক একই ভাবে জেসমিনকেও নিজ হাতে মে’রেছিলাম।”
এইটুকু বলে বড় উদাস হয়ে গেলেন তিনি। ঔদাস্য ভঙ্গিমাতেই বলে উঠলেন,“তারপর আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে আমার পেটে সন্তান ধরিয়ে দিল আমার সবচেয়ে অপছন্দের লোকটা। যাকে দেখলেই আমার গা গুলিয়ে আসত। নিজের ছেলে পৃথিবীতে আসার পর আমি পা’গলামি করা ছেড়ে দিলাম। সবকিছুর হক ছেড়ে দিলাম। নাবুর সংসারে কখনো বাঁধ হয়ে দাঁড়ায় নি। বহু বছর এই দেশমুখো হইনি। তারপর যখন ফিরলাম তখন জেসমিনের ছেলেটা বেশ বড় আর বোঝধার হয়ে গেছে। নাবিলার সুখ আমার সহ্য হয়নি। তাই ইমরানের কানে একটু একটু করে বি”ষ ঢালতে লাগলাম। আমি এই কাজে একদম সফল হয়েছি।”
শেষ বাক্যটা আওড়ে বেশ গর্ববোধ করলেন নুলক চৌধুরী। অপরদিকে সেই তখন থেকে দরজার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা নাবিলা চৌধুরীর চোখ দুটো জলে টইটম্বুর হয়ে উঠেছে। নুলক চৌধুরীকে হাসপাতালে ফিরে আসতে দেখেই আইসিইউ কেবিনের দিকে এসেছিলেন। তারপর নুলক চৌধুরীর নিজ মুখে বলা কথাগুলো শুনার পর থেকেই বরফের ন্যায় জমে গেলেন নাবিলা চৌধুরী। নুলক চৌধুরী এখনো ঠাহর করতে পারেননি কেবিনে কারো উপস্থিতি। তিনি মেয়ের পানে চেয়ে ফের বলতে লাগলেন,
–“আমার জীবনটা শেষ করেও নাবিলার সাধ মিটেনি। তার মেয়েটাকে লাগিয়ে দিল আমার মেয়েটার জীবন শেষ করার জন্য। সবাই তো জানতো আমার মেয়েটা একটা সিআইডি অফিসারের জন্য দিনরাত পাগলামি করে। তবুও ইচ্ছে করে ইতি হারামজাদিটা তোমার থেকে কেঁড়ে নিল ছেলেটাকে৷ কি ব’জ্জাত মেয়ে! এমন ভান করত যে কিচ্ছু বুঝে না৷ অথচ মায়ের মতো ঠান্ডা মাথার ক্রি’মি’নালি করে ঠিক তোমার পছন্দের মানুষটাকে কেড়ে নিল।
আমি বুঝি নিজের ভালোবাসাকে না পাওয়ার য’ন্ত্রণা কেমন। প্রতিটি মূহুর্ত কিভাবে বেঁচেও ম’রার মতো জীবন অতিবাহিত করতে হয়।”
ক্রোধে ফেটে পড়ছেন নুলক চৌধুরী। তার চোয়াল ইস্পাতের ন্যায় শক্ত হয়ে গেছে। অতি ক্রুধে লালচে বর্ণ ধারণ করা চোখ দুটো দিয়ে যেন অশ্রু নয়, অগ্নীগিরির লাভা গড়িয়ে পড়ছে। নুলক চৌধুরী দু’হাত মুষ্টি বদ্ধ করে দন্তপাটি পিষে কটমট আওয়াজ তুললেন। অতঃপর ক্রোধিত কণ্ঠে হিসহিস করে বলে উঠলেন,
–“কি ভেবেছিল সংসার করবে? আমার মেয়েকে ম’রনের দোয়ারে পাঠিয়ে ছুটিয়ে সংসার করবে! মরণদশা!”
তাচ্ছিল্য করে হাসলেন তিনি। বলে উঠলেন,“এবার কর ছুটিয়ে সংসার! জাহান্নামে গিয়ে কর৷ একদম দমটা নি’কড়ে দিয়ে এসেছি।”
–“ক..কি করেছিস আমার মেয়ের সাথে?”
অতি পরিচিত গলার স্বর কর্ণগোচর হতেই চমকে উঠলেন নুলক চৌধুরী। চকিতে দৃষ্টি ঘুরাতেই অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে থাকা নাবিলা চৌধুরীকে দেখতে পান। ঝটপট দাঁড়িয়ে পড়লেন নুলক চৌধুরী। তবে কিছু বলার বা বুঝে উঠার ফুরসতটুকু পেলেন না। নাবিলা চৌধুরী ছুটে এসে নুলক চৌধুরীর উপর আক্রমণ চালালেন। সপাটে চ’পেটাঘা’তের ফলে নিজ স্থান থেকে নড়ে গেলেন নুলক চৌধুরী৷ গালে হাত ধরে বুনো ক্ষ্যাপাটে দৃষ্টিতে তাকাতেই নাবিলা চৌধুরী নুলক চৌধুরীর দু’বাহু থাবা মে’রে ধরে ক্রন্দনরত অবস্থায় গর্জে উঠলেন,
–“বল তুই আমার মেয়ের সাথে কি করেছিস?”
এই মূহুর্তে নাবিলা চৌধুরীকে দিশেহারা আর এলোমেলো ঠেকছে। উনার দুর্বল দেহ থরথর করে কাঁপছে অজানা শঙ্কায়। চিৎকার শুনে বাইরে থেকে ছুটে আসল পলি৷ ভেতরের এহেন দৃশ্য দেখে কিছু বুঝে উঠার আগেই তার কর্ণগোচর হলো নুলক চৌধুরীর বিদ্রুপ মাখা গলার স্বর,
–“মে’রে দিয়েছি।”
নুলক চৌধুরীর চেহারা বড় ভয়ংকর ঠেকছে। চোখদুটোতে অদ্ভুত হিংস্রতা। তিনি দুই হাত তুলে ধরে নাবিলা চৌধুরীকে দেখিয়ে বললেন,
–“এই দুই হাতে মে’রে দিয়ে এসেছি ব’জ্জা’তটাকে। বালিশ চাপা দিয়ে একদম দমটাকে নি’কড়ে দিয়ে এসেছি।”
বলেই পৈশাচিক চাপা হাসিতে ফেটে পড়লেন তিনি। নাবিলা চৌধুরীর সর্বাঙ্গ ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। নিশ্বাস ভেতরে আঁটকে গেছে। তিনি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। পলি আতংকে দিশেহারা। তনু বুক তীব্রভাবে উঠানামা করছে। কিছুই তার বোধগম্যে আসছে না। তবুও নিজেকে সামলে ছুটে গিয়ে শাশুড়িকে পিছন থেকে আঁকড়ে ধরেছে যেন দেহের ভারসাম্য হারিয়ে লুটিয়ে না পড়ে।
নাবিলা চৌধুরী এক মূহুর্ত সময় লাগল সংবিৎ ফিরতে। মস্তিষ্ক সচল হতেই ঝাপিয়ে পড়লেন নুলক চৌধুরীর উপর। নুলক চৌধুরীর গলা দু’হাতে টিপে ধরে হুংকার ছাড়লেন,
–“বা’ন্দির বাচ্চা, তুই আমার সন্তানের সাথে কি করেছিস? তোকে আমি মে’রে ফেলব আজ। আমার সবসময় সর্বনাশ করে আজ আমার মেয়ের সাথে কি সর্বনাশ করেছিস?”
পাগলের মতো আচরণ করছেন নাবিলা চৌধুরী। সন্তান হারার শঙ্কায় গলা ফাটিয়ে কাঁদছেন। নুলক চৌধুরী কোনো ক্রমেই নাবিলা চৌধুরীর থাবা থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারছেন না। তিনি দু-হাতে এলোপাতাড়ি নাবিলা চৌধুরীকেও আ’ঘাত করছেন। পলি চিৎকার করছে। নাবিলা চৌধুরী এবং নুলক চৌধুরীকে ছাড়াতে চাইছে। কিন্তু কিছুতেই পারছে না। নাবিলা চৌধুরী নিজের দেহের সর্বোচ্চ জোর দিয়ে চেপে ধরেছেন নুলক চৌধুরীর গলা। এবার আর পেরে উঠছেন না নুলক চৌধুরী। শক্ত থাবাড় তোড়ে দম বন্ধ হয়ে আসছে তাঁর। সাথে চোখ দুটোও যেন উল্টে আসছে। নিজেকে রক্ষা করতে আশেপাশে হাতড়াতে লাগলেন। খুব বেশি কসরত করতে হলো না নুলক চৌধুরীকে৷ খুব সহজেই হাতের নাগালে পেয়ে গেলেন একটি দানি। তা মূহুর্তেই হাতে নিয়ে সপাটে আ’ঘাত হানলেন নাবিলা চৌধুরীর উপর। নাবিলা চৌধুরী থমকে গেলেন। পলি এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। কাচের দানি হওয়ায় নাবিলা চৌধুরীর মাথায় সজোরে আঁচড় পড়তেই ভেঙে খন্ডিত হয়ে পড়ল। টুকরো কাচগুলো টাইলসের মেঝেতে পরে টুংটুং আওয়াজ তুলে আরও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র টুকরোয় পরিণত হলো। মাথায় হাত ধরে নিজ স্থান থেকে ঢেলে পড়লেন নাবিলা চৌধুরী। তাজা লাল র’ক্তে রঞ্জিত তার সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল, সেই সাথে রঞ্জিত হলো তার হাতজোড়া।
খুব স্বল্প সময়ে অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে সময়টা। এতটাই দ্রুত ঘটে গেল যে বাইরে থেকে এখানে কেউ ছুটে এসে পৌঁছাবে তারও ফুরসত হয়ে উঠল না। কি থেকে কি হয়ে গেল কিছুতেই বোধে আসছে না পলির। যেন চোখের সামনে পুরো দৃশ্যটা এক জীবন্ত হাড়হিম করা দুঃস্বপ্ন! সে সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। নুলক চৌধুরী পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়লেন। বড় ভ’য়ংকর ঠেকছে থাকে। অদ্ভুত পৈশাচিক দৃষ্টিতে আহত নাবিলা চৌধুরীর পানে চেয়ে বলে উঠলেন,
–“যা তুইও ম’র। ম’রে গিয়ে মেয়ের সাথে জাহান্নামে সুখ দুঃখ ভাগ করে নে। টাটা, টাটা।”
কি কাতরই না ঠেকছে নাবিলা চৌধুরীর অশ্রুসিক্ত চাহনি। তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি যাকে ছোট থেকে আপন বোন ভেবে এসেছে সে তার সৎ বোন। যে তার মাকে মে’রেছে, বাবাকে মে’রেছে এমনকি জীবনের এই শেষ পর্যায়ে জানল আদুরে মেয়ের মৃ’ত্যুর খবর। তাও আবার তার বোন খু”ন করেছে নিজ হাতে! নাবিলা চৌধুরী টালমাটাল অবস্থায় আরও ঢলে পড়লেন নিজ স্থান থেকে। এদিকে পৈশাচিক আনন্দে আত্মহারা নুলক চৌধুরী। পলির যখনই হুঁশ ফিরলো তক্ষুনি ঝাপিয়ে পড়ল। নুলক চৌধুরীর হাতে চেপে ধরে নুলক চৌধুরীর গলায় দানির ভাঙা অংশ চেপে ধরল তীব্র আক্রোশে। আচমকা হা’মলা প্রতিরোধ করে উঠতে পারলেন না নুলক চৌধুরী। খেই হারিয়ে কাচ ভাঙা মেঝের উপর পড়লেন। সেই সাথে কচমচ শব্দ করে তার মাথার শক্ত আবরণ ভেদ করে ঢুকল বেশ কিছু কাচের টুকরো। নুলক চৌধুরী শুধু গো’ঙ্গিয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন। পলিও নুলক চৌধুরীর সমান তালে মেঝেতে বেসেছে। অতঃপর চিৎকার করে কাচের ভাঙা খন্ডটি নুলক চৌধুরীর গ’লা থেকে টেনে ফের বসিয়ে দিয়েছে।
বাইরে ধমকা হাওয়া বইছে। হসপিটালের এই দিকটা জনমানবশূন্য থাকে আজকাল। শুধু নোহার কড়া নিরাপত্তার জন্য। তাই তো বাইরে মানুষের কাছে প্রথমেই পৌঁছায়নি শোরগোল। এই মধ্যরাতে চিৎকার চেচামেচি শুনে কিছুক্ষণের মধ্যেই সকল ডাক্তার এবং নার্স কেবিনের দিকে ছুটে এসেছে। সকলে পৌঁছাতেই দেখতে পেল এই বি’ভৎস কান্ড। পলি এভাবে কাউকে আক্রামণ করায় সকলে আতংকে দূরে সরে গেল। চিৎকার চেচামেচি করে বলতে লাগল,
–“খু”ন খু”ন..!”


ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে আমার আর ইফানের খুব একটা দেরী হলো না। তবে ততক্ষণে যেন সব আমাদের হাতের বাহিরে চলে গেল। আমি ছুটে এসে কেবিনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সকলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে হুরমুড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে গিয়েও থমকে গেলাম। পরক্ষণেই ইফান আমার পিছনে এসে থমকে দাঁড়াল। ইফানের উপস্থিতিতে সকলে ভয়ার্ত চেহারায় কয়েক হাত দূরে সরে গেল। র”ক্তাক্ত মেঝেতে পড়ে আছে দুটো দেহ। নাবিলা চৌধুরীর মাথা কোলে তুলে নিয়ে বসে আছে পলি। সারা হসপিটালে এখন শুধু পলির আ’র্তনাদগুলো চারপাশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এখন পলির সাথে সমেত হলো মীরার আ’র্তনাদ। আমি ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই ইফানের ফ্যাকাশে মুখাবয়ব আমার চোখের তারায় ভেসে উঠল। ইফান যেন এই মূহুর্তে অন্য দুনিয়ায় হারিয়ে গেছে। চাতক পাখির ন্যায় আকুলতা ভর্তি দৃষ্টি তার বি’ধস্ত, আ’হত মায়ের পানে স্থির। অজানা শঙ্কায় আমার বুক কাঁপছে হাতুড়ির মতো। আমি অস্ফুটে আওড়ালাম,
–“ইফান…!”
ইফানের কর্ণপাত হওয়ার আগেই সে কম্পিত কণ্ঠে আওড়ালো,“মাআ..”
অতঃপর সংবিৎ ফিরতেই ইফান ছুটে গেল মায়ের নিকট। হাঁটু গেড়ে বসেই মায়ের দেহ পাগলের ন্যায় আঁকড়ে ধরল। মায়ের তাজা র’ক্ত মাখা গালখানা আলতো থা’প্পড়ে সিক্ত কাতর গলায় ডাকতে লাগল,
–“মম, মম!”
কি বি’ষাদময় ঠেকল মাফিয়া বসের কণ্ঠনালির আওয়াজ। তবে বহুদিন পর সন্তানের মুখে আদুরে মা ডাক শুনে কোন মা সাড়া না দিয়ে চুপ থাকতে পারে? অর্ধচেতনাহীন নাবিলা চৌধুরীও সন্তানের ডাক উপেক্ষা করতে পারলেন না। আধবোজা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকালেন সন্তানের পানে। তার চোখের তারায় সব যেন ঝাপসা ঠেকছে। অনেক কসরত করার পর সন্তানের কাঙ্ক্ষিত চেহারা যেন আঁধারে আচমকা প্রদীপের আলোর শিখা জ্ব’লার ন্যায় আলোকিত হলো। আচমকা তার অধরকোণে স্মিত হাসির রেখা ফুটে ওঠল। যেন মরুভূমির তপ্ত বালুচরে শেষ বেলায় তৃষ্ণা মেটানোর জন্য এক ফোঁটা পরম অমৃতের সন্ধান মিলল।
নাবিলা চৌধুরী এখন পৃথিবীর সকল বাস্তবতা ভেদ করে কোনো এক অজানা সুখের রাজ্যে পাড়ি জমাচ্ছেন। চোখের সামনে ভাসছে সেই শৈশবের ছোট্ট ইফানের মায়াবী মুখখানা। যে সন্তান মায়ের আঁচলের নিচে সর্বদা নিজেকে লুকিয়ে রাখত। আবার কখনো অজানা কারণে মায়ের চোখের পানে অশ্রুসিক্ত চোখে চেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে ফুপিয়ে উঠত। যেন বিনা বাক্যে ছোট্ট ইফান মায়ের কাছে কিছু একটা অভিযোগের স্বরে বলতে চাইতো। কিন্তু কেন যেন কখনো সেই অভিযোগের কথা কখনো মায়ের কাছে বলেনি। নাবিলা চৌধুরীর বুক কেঁপে ওঠে সন্তানের আদুরে চেহারা দেখে।
নাবিলা চৌধুরীর ঠোঁটের এক টুকরো হাসি সেই কখন উবে মলিনতায় রুপ নিয়েছে। তিনি ঘোরের বশে ধীরে ধীরে হাত এগিয়ে দেয় সন্তানের কোমল কপোলখানা একটু খানি ছুঁয়ার জন্য। হায় আপসোস! দেহের শক্তি যে তার হ্রাস পাচ্ছে। তাই তো হাত খুব কসরত করে হাত উঁচিয়েও সন্তানের গালের নাগাল পাওয়ার আগেই তা হেমন্তের ঝরাপাতার মতো নিস্তেজ হয়ে নিচের দিকে খসে পড়তে লাগল। কিন্তু মেঝে স্পর্শ করতে পারল না। ইফান খপ করে বাতাসে লুফে নিল মায়ের র’ক্তমাখা, অবসন্ন হাতটা। অতঃপর নিজের গালে তা চেপে ধরল। মূহুর্তেই তার ফর্সা মুখাদল র’ক্তে মাখামাখি হলো। সেসবে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই মাফিয়া বসের। তার কাণ্ডজ্ঞান যে লুপ পেয়েছে এই মূহুর্তে। অবুঝ শিশুর ন্যায় কম্পিত গলায় শুধাল,
–“ও মম কি হয়েছে তোমার?”
ছেলের অবুঝ গলা শুনে ঘোর কাটল নাবিলা চৌধুরীর। আবারও আধবোজা নয়নে সন্তানের চেহারার পানে তাকাল। অধর কোনো হানা দিল বিষাদময় হাসির রেখা। নিভে আসা প্রদীপের আলোর মতো ক্ষীণ গলায় অস্ফুটে আওড়ালেন,
–“আ…আমি ঠিক আছি আমার বাবা।”
হুঁশ ফিরল ইফানের। সহসা হুংকার দিয়ে উঠলো,“মিথ্যা কথা। তুমি ঠিক নেই।”
ভয়ে সকলে আরও দূরে ছিটকে গেল। আমি ছুটে গিয়ে নাবিলা চৌধুরীর মাথায় ক্রন্দনরত অবস্থায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। নাবিলা চৌধুরী নিভু নিভু চোখে আমাকে দেখল। তারপর তাকে ঘিরে বসে থাকা মীরা, ইনান, পলিকেও দেখল। যেন বিদায়ের এই অন্তিম লগ্নে, অনন্তকালের সফরে পাড়ি জমানোর আগে শেষবারের মতো সবাইকে এক পলক দেখে নিল। তার দু-চোখ দিয়ে অনর্গল তপ্ত নোনাজল গড়িয়ে পড়তে লাগল। ইফান ফের হুংকার ছুড়ল,
–“ইনান ডাক্তার ডাক। ডাক্তার, ডাক্তার।”
বাইরের মানুষগুলো উদগ্রীব হয়ে উঠল। ভ’য়ে এগোনোর সাহস পাচ্ছে না কেউ। সশ’স্ত্র গার্ডরা ডাক্তারদের দিকে বন্দুক ঠেকালো। সকলে দ্রুত ছুটতে লাগল নাবিলা চৌধুরীর ট্রিটমেন্ট করার জন্য। নাবিলা চৌধুরী জুড়ে জুড়ে শ্বাস টানতে লাগলেন। আমাদের কা’ন্না আর আ’র্তনাদের আওয়াজও ততই তীব্র হতে লাগল। ইফান দিশেহারা হয়ে পড়ল। মায়ের হীম হয়ে আসতে থাকা দেহখানা বুকের সাথে ঝাপটে ধরে ভয়ার্ত কম্পিত কণ্ঠে আকুতি করে ওঠল,
–“ডোন্ট ডো দিস। মম, প্লিজ ডোন্ট ডো দিস। তুমি জান তুমি ছাড়া আমার পৃথিবীতে আর নিজের বলতে কেউ নেই। তুমি অন্তত আমাকে ছেড়ে যেও না। সব সহ্য করতে পারব বাট তোমার চলে যাওয়া সহ্য করতে পারব না।
সকলে আমাকে হৃদয়হীন জা”নোয়ার মনে করে বলে তুমিও কি আমাকে সত্যি সত্যি জা”নোয়ার ভেবে বসেছ! মম আমার ক’ষ্ট হয়, সত্যি ক’ষ্ট হয়। আমি জা’নো’য়ারের থেকেও অধম হলেও বিশ্বাস কর আমারও হৃদয় আছে। প্লিজ আমার সাথে এমন করো না।”
হঠাৎই ইফান নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার কাঁধে মাথা রাখা নাবিলা চৌধুরী হিসহিসিয়ে বলে উঠলেন,
“আমি খ..খুব খা’রাপ মা। তোমার সব কষ্টের কারণ আ..আমি। দ…দেখ আজ সর্বহ..হারা হয়ে গেলাম। সব হা..হারিয়ে ফেললাম। আমার বাজান, আমাকে ক্ষ’মা করে দ…দিও….
ইফান স্তব্ধ হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে আছে। নিশ্চুপ হয়ে মায়ের পরের বাক্যটা শুনার অপেক্ষা করছে। হায় ভবিতব্য! সময়ের কাটা চলতে লাগল, সাথে ইফানের অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলো৷ তবে আর সেই অপেক্ষার সমাপ্তি হলো না। আর মায়ের গলা মাফিয়া বসের বুকে বিরহ সুর হয় তোলপাড় চালাল না। সে পাথরের মতো নিথর হয়ে বসে রইল মায়ের প্রাণহীন দেহ বুকে জড়িয়ে ধরে। আমিও স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। চারপাশে শুধু বিষন্ন নিরবতা। বাইরে তুমুল ঝড় তুফান হচ্ছে। ভারী বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজ আমার কানে কারো আ’র্তনাদ হয়ে বিঁ’ধছে। মনে হচ্ছে, আজ স্বয়ং নির্মম প্রকৃতিও এই অপরাজেয়, নি’কৃষ্ট ব্লা’ডিবি’স্টের অসহায়ত্ব দেখে আকাশের সবটুকু জল ঢেলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
কেবিনে শয্যাশায়ী নোহার এত কোলাহলে শারীরিক অবনতি হতে লাগল। ইসিজিতে রেখাগুলো কখনো দ্রুত গতিতে তো কখনো একেবারে ধীর গতিতে চলতে লাগল। বাইরে থেকে একদল লোক এসে নোহাকে এখান থেকে নিয়ে গেল দ্রুত। তারপর! তারপর সময়ের সাথে সাথে রাতের কৃষ্ণতা আরও গাঢ় হলো, আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ল প্রকৃতির আদিম তাণ্ডব। ইফান এখনো পাথরের ন্যায় বসে। সমুদ্রের অতল গভীরে ঝিনুক যেমন তার খোলসের ভেতর অত্যন্ত গোপনে কোনো মূল্যবান মুক্তো লুকিয়ে রাখে, ঠিক তেমনি নিজের বুকের নিবিড় অন্ধকারে মাকে একইভাবে আগলে ধরে রেখেছে মাফিয়া বস। সে স্তব্ধ, নির্বাক। ভাগ্যিস লোকটা অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ করতে পারে না। নয়তো আজ সকলে দেখতে পেতো মাফিয়া বসের উন্মাদনা আর বিষন্ন আ’র্তনাদ।
ঝড়ের তান্ডব রাতের শেষ প্রহরে এসে স্তিমিত হলো। তবে এখনো কেবিনের নিরবতায় এক বিন্দু ভাটা পড়ল না। উপস্থিত দৈত্যের মতো কালো পোশাকধারী গার্ডরা শির নুইয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে পুরো কেবিন ঘিরে। যেন বসের সাথে আজ তারাও নিঃশব্দে শোক পালন করছে। বাইরে থেকে ফজরের আযানের সুমধুর সুরেলা ধ্বনি ভেসে আসছে। সেই সাথে ভেসে এলো পুলিশের গাড়ির বাজখাঁই সাইরেনের আওয়াজ।
চলবে,,,,,,,,
কি আর বলব আজ! খুব ভ’য়ে ভ’য়ে পর্বটি আপলোড করলাম। শুধু এটুকুই বলব আমি গল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আমার সাজানো প্লট অনুযায়ীই লিখেছি! যা আগে থেকেই সব সাজানো ছিল।
নেক্সট পর্ব থেকে গল্পের ক্লাইমেক্স আবারও ঘুরে যাবে। অনেক অনেক দিনের দূরত্ব ঘুছিয়ে এবার ইফান জারাময় পর্বগুলো আসতে চলেছে।
অনেকদিন পর গল্প দিলাম ভুল ত্রুটি থাকলে ধরিয়ে দিয়েন। আর যারা পড়েছেন তারা রিয়েক্ট আর আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করতে ভুলবেন না কেমন!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply