Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৪৭


#জল_তরঙ্গের_প্রেম

পর্ব সংখ্যা;৪৭

#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি

দেওয়ান বাড়ির ড্রয়িং রুম জুড়ে একরাশ পিনপতন নীরবতা বিরাজমান।

ড্রাইনিং স্পেসের ফ্যান আর এসি দুটোই অফ। ড্রয়িং রুমে হিটার অন। জানলা দরজা গুলো বন্ধ থাকায়; হিটারের তাপে বাড়ির ভেতরে তেমন শীত লাগছে না।

ফারহান দেওয়ান সুতির ফতোয়া আর লুঙ্গি পরেই রাতে খাবার খাওয়ার জন্য টেবিলে উপস্থিত হয়েছেন। বুশরা একে একে সকল পদের খাবার গুলো এনে টেবিল সাজাচ্ছেন। ওনার সাথে হাতে হাতে সাহায্য করছে নতুন কাজে যোগ দেওয়া মেয়েটি। সে এই বাড়িতে এসেছে যে একমাস হতে চলেছে। রিমঝিম গত মাসে কাজ ছেড়ে দিয়ে ছিলো। বুশরা আর সাহানার এই হাড়ির রেশারেশি তার সহ্য হয়নি বলে। নতুন মেয়েটার বয়স ষোলো কিংবা সতেরোর মাঝামাঝি মনে হচ্ছে। সেদিকে এক বার তাকিয়ে ড্রয়িং রুমে চোখ বুলালেন ফারহান দেওয়ান। ফোরকান দেওয়ান টিভিতে খবর দেখছেন। তার পরণে শার্ট আর ট্রাউজার। খুব মনোযোগ সহকারে বিটিভিতে ছোটো ভাইকে খবর দেখতে দেখে গম্ভীর কণ্ঠে ডাক দিলেন তিনি।

–” ফোরকান খেতে আয়।”

–” আসছি ভাইজান। আপনি শুরু করুন। দেশের হাল চাল দেখলেন? বাচ্চা কাচ্চা গুলো দিন দিন অধঃপতনের দিকে ঝুঁকছে।”

মৃদু শ্বাস ছেড়ে, নিচু কণ্ঠে ফারহান দেওয়ান বললেন।

–” নিজের ঘরের মানুষদের ই ঠিক করতে পারছি না। অন্যের বাচ্চা কে কি আর বলবো।”

বুশরা ডালের বাটিটা এনে টেবিলে রাখতেই ফারহান দেওয়ান তার দিকে তাকালেন।

–” তিন্নি কোথায়? ওকে খেতে ডাকোনি?”

স্বামীর প্রশ্নে, বুশরার মুখশ্রীতে একরাশ বিরক্তি এসে ভিড় জমালো। চেয়ার টেনে স্বামীর পাশে বসে পড়লেন তিনি।

–” সে এখন আর আমার কথা শুনছেন নাকি? মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি হলে মায়ের কাছে আর সন্তান থাকে? আমি কে? তার তো এখন মাসি হয়েছে।”

–” হেয়ালিপনা করো না বুশরা। সোজাসুজি কথার জবাব দাও।”

–” তিন্নির ভাবির সাথে আছে। আপনাকে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন। হাত ধুয়ে আসুন।”

–” না, তিন্নিকে ডাকো। সবাই আসুক। একসাথে খাবো।”

নাকের ডগায় একরাশ রাগ আর বিরক্তি নিয়ে সিড়ির দিকে চলে গেলেন বুশরা। সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলায় পা রাখতেই সাহানারা আর তিন্নি ও রুম থেকে বেরিয়ে এলো। সেখানেই থেমে গেলেন বুশরা।

–” এই তিন্নি খেতে আয়। তোর বাবা অপেক্ষা করছে। আর ডাকতে হলে থাপ্পড় মারবো এসে।”

বুশরার কথা কর্ণকুহরে প্রবেশ করতে সাহানার মাথায় র*ক্ত উঠে গেলো। কড়া স্বরে কিছু কথা শোনাতে নিয়ে ও চুপ করে গেলেন তিনি। মনে মনে কিছু একটা ভেবে মুচকি হেসে, তিন্নিকে সাথে নিয়ে নেমে এলেন। ততক্ষণে ফোরকান দেওয়ান ও টেবিলে এসে বসে পড়েছেন। ভাতের বল হাতে নিয়ে একে একে সবার প্লেটে ভাত বেড়ে দিলেন সাহানারা। তরকারি দিয়ে নিজে ও বসে পড়লেন চেয়ারে।

–” আমার একটা কথা আছে ভাই সাহেব।”

সাহানার শীতল কন্ঠে; ভাতের প্লেটে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই ফারহান দেওয়ান জবাব দিলেন।

–” বলো?”

–” আমি তরী আর তরঙ্গ কে আবার বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে চাইছি। দু’জনেই আমাদের বাড়ির সন্তান হয়ে ভাড়া বাড়িতে কষ্ট করে থাকুক তা আমি চাইছি না।”

–” তোমরা যদি নিজেদের মতো করে মানিয়ে চলতে পারো। আমার আপত্তি নেই। এটা তাদের ও বাড়ি। আমি কোনো কালেই চাইনি ওরা বাড়ি ছাড়ুক।”

–” তাহলে আপনি একবার তরীকে ফোন করুন ভাই। মেয়েটার এখন আপনাকে প্রয়োজন।”

–” দেখছি।”

সস্থির শ্বাস ফেললো সাহানারা। সব কিছু এভাবে গুছিয়ে আনতে পারলে বাড়িটা আবার আগের মতো খুশিতে ভরে উঠবে। যেই প্রতিজ্ঞা চার বছর আগে করে ও তিনি পূরণ করেননি। সেই প্রতিজ্ঞা এইবারে তিনি পূর্ণ করবেন। নিজের সবটুকু উজাড় করে মেয়ে দুটোকে ভালো রাখবেন। তরীর প্রেগন্যান্সির সময় তাকে একটু ও মায়ের অভাব বুঝতে দিবেন না। বাকি খাওয়ার সময়টুকুতে কেউ আর কোনো কথা বললো না। কিন্তু সাহানার চোখ এড়িয়ে গেলো না বুশরার হিংস্র চাহনি। তা দেখে ও কোনো প্রতিক্রিয়া করলেন না তিনি।

*******

বারান্দায় দাঁড়িয়ে শীতার্ত রাতের চাঁদ উপভোগ করছেন ফোরকান দেওয়ান। আজ অকারণেই ওনার মনটা ভালো। শুধু ভালো না, খুব ভালো।

তাই তো শীতের দোহাই না মেনেই বারান্দায় এসে উপস্থিত হয়েছেন। রুমে ফিরে স্বামীকে না দেখতে পেয়ে ভ্রু জোড়া সংকুচিত হয়ে এলো সাহানারার। ওয়াশরুমের দরজায় একবার চোখ বুলিয়ে দেখলেন।

–” তরঙ্গের বাবা?”

–” বলো?”

–” কোথায় তুমি?”

–” বারান্দায়।”

–” রুমে আসো, শীতের মধ্যে বারান্দায় কি করছো? ঠান্ডায় গলা বসে যাবে।”

স্ত্রীর ডাকে রুমে ফিরে এলেন ফোরকান দেওয়ান। কথা ছাড়াই সাহানার সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। দীর্ঘদিনের নিজের সকল অপূর্ণতা, জড়তা কাটিয়ে ভণিতা ছাড়াই স্বামীর বুকে জায়গা করে নিলেন সাহানারা।

–” আমাকে তুমি আগের মতো আর ভালোবাসো না।”

–” কে বলেছে?”

–” আমি, বলতে পারবে? শেষ কবে আমাকে সানু বলে ডেকেছো?”

–” সানু না ডাকার অর্থ আমি তোমাকে ভালোবাসি না?”

–” হ্যাঁ, ওই যে কি বলে না। হ্যাঁ, হ্যাঁ ভালোবাসার ভাষা। সানু ডাক তাতো তোমার ভালোবাসার ই ভাষা।”

স্ত্রীর আবেগাপ্লুত কথায় মুচকি হাসলেন ফোরকান দেওয়ান। আজ অনেকদিন পর স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদলেন সাহানারা। ফোরকান দেওয়ান পরম ভালোবাসায় নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খেলেন।

স্বামীর ভালোবাসাময় স্পর্শে লাজুক হাসি ফুটল সাহানারার ওষ্ঠে। লজ্জায় ফোরকান দেওয়ানের বুক থেকে সরে এসে বিছানায় রাখা নিজের শাড়িটা হাতে তুলে নিলেন তিনি। অগোছালো শাড়িটার মাঝে ভাঁজ ফুটিয়ে তোলার মাঝে মিছে রাগী কণ্ঠে ধমকালেন সাহানারা;-

–” ছিঃ! বুড়ো কালে ভীমরতি! বউ-ছেলে, নাতি-নাতনি দিচ্ছে। সেই কালে তিনি এখন ঢং করছেন!”

বউয়ের লাজুক কথায়; শব্দ করে হেসে উঠলেন ফোরকান দেওয়ান। তাঁর হাসির শব্দে যেন সারা ঘর কেঁপে উঠল। তাতে সাহানারা আর ও গুটিয়ে গেলেন। লজ্জায় হাঁসফাঁস করে উঠলেন তিনি।

–” ঢং না গো, প্রিয়তমা। ছেলে-বউ, নাতি-নাতনি দিলেই কি তুমি আমার বেগানা হয়ে যাচ্ছ?”

–” ভালো হচ্ছে না কিন্তু! ওভাবে হাসবে না তো। আমি কিন্তু আবার আগের সাহানারা হয়ে যাবো।”

অর্ধাঙ্গিনীর বয়সের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সেই লাজুক হাসি মাখা মুখখানি দেখে আবার ও হেসে উঠলেন ফোরকান দেওয়ান। এগিয়ে এসে সাহানারাকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলেন তিনি।

–” তোমার এই ষোড়শী লাজুক হাসি হেসো না কো। আমি খুন হয়ে যাব সানু। হার্টের প্রবলেম আছে কিন্তু!”

–” জানো?”

–” তুমি না বললে জানবো কিভাবে গো?”

–” আমাদের তরঙ্গ টা না বাবা হবে। যাকে আমি সেদিন পর্যন্ত বকে ভার্সিটির হলে পাঠিয়েছে। তুমি বোঝো ওইটুকু ছেলেটা নাকি বাবা হবে! পাগল ছেলেটার কাঁধে এতো বড় দায়িত্ব দিয়েছেন আল্লাহ্! ভাবতেই আমার খুশিতে কান্না পাচ্ছে।”

কথা শেষ করার আগেই কেঁদে ফেললেন সাহানারা। খুশিতে ওনার অশ্রু সিক্ত দু’চোখ চকচক করছে। তার ছেলেটা হুট এতো বড় হয়ে গেলো। ফোরকান দেওয়ানের চোখ ও ছলছল করছে। পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই বলে উনি কাঁদতে পারছেন না। একমাত্র সন্তান বাবা হবে। এর থেকে খুশির খবর আর কি হতে পারে বাবা – মায়ের কাছে। মায়া, মায়া স্বরে ফোরকান দেওয়ান সুধালেন;-

–” এক বয়সে সন্তান-নাতিপুতি সবাই ছেড়ে চলে যায়। বয়স কালে কেবল জীবন সঙ্গীই আত্মার সঙ্গী হয়ে বেঁচে থাকে। তুমি আমার আত্মার সঙ্গী সানু।”

–” আপনি আমার মাথার তাজ। যেই তাজ ছাড়া সাহানারা শূন্য।”

*******

শীতের দিন গুলো খুব ছোটো হওয়াতে সন্ধ্যা আর রাত হয় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর।

টিউশনি শেষে আধ ঘন্টা আগে বাসায় ফিরেছে তরঙ্গ। বর্তমানে বিছানায় টান টান ভাবে পা মেলে আধ শোয়া হয়ে ফোন স্ক্রল করছে সে। কিচেন থেকে দু’কাপ চা বানিয়ে এনে তরঙ্গের সামনা সামনি পিঁড়ি টেনে বসলো তরী। চায়ের কাপ গুলো মেঝেতে রেখে দিলো। তরীকে বসতে দেখে ফোন রেখে দিলো তরঙ্গ। পা জোড়া গুটিয়ে নিয়ে ঘুরে বসলো।

–” হঠাৎ এতো রাতে চা কেন?”

–” ইচ্ছে হলো! কেন, খাবেন না?”

বিশেষ কায়দায় নিজের এক ভ্রু উঁচিয়ে তরীর দিকে তাকালো তরঙ্গ। ফিচেল কণ্ঠে আওড়ালো সে।

–” তা কখন বললাম? কিন্তু তোমার এখন চা খাওয়াটা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।”

–” আপনাকে কিছু কথা বলতাম তরঙ্গ। একদম ফাজলামি করবেন না কিন্তু!”

–” ছিঃ, আমি হলাম স্ট্রেট ফরোয়ার্ড মানুষ। সেখানে তুই কিনা আমাকে ফাজিল বলছিস?”

–” একশো বার বলবো। আপনি সেটাই!”

–” আচ্ছা, ফাজলামি করবো না বল।”

#চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply