#কিস_অফ_বিট্রেয়াল
#পর্ব_৩৮
#লামিয়া_রহমান_মেঘলা
[ কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ ]
সকালবেলার নরম রোদ জানালার ফাঁক গলে এসে সেরিনের চোখের পাতায় আলতো করে স্পর্শ করতেই তার ঘুম ভাঙল। বাইরে ছিল এক নির্মল সকাল। আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল ধবধবে আলো, আর মৃদু বাতাসে দুলছিল দূরের গাছের পাতাগুলো। প্রকৃতি যেন নতুন দিনের আগমনী বার্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জানালার ওপারে।
সেরিন পিটপিট করে চোখ মেলে সূর্যের আলো যেদিক থেকে আসছিল সেদিকে তাকাল।
জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল কায়ান। তার উপরের শরীরে কোনো পোশাক ছিল না। এলোমেলো কোঁকড়া চুলগুলো সকালের বাতাসে আরও অগোছালো হয়ে উঠেছিল। পরনে ছিল শুধু কালো রঙের একটি ট্রাউজার। সোনালি রোদ এসে পড়েছিল তার শরীরে, আর সেই আলোয় তাকে যেন অসাধারণ দীপ্তিময় লাগছিল। তীক্ষ্ণ মুখাবয়ব, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব আর স্বাভাবিক সৌন্দর্যের এক অনন্য মিশ্রণ ছিল তার মাঝে। সকালের শান্ত আলোতে তাকে যেন আরও বেশি সুদর্শন মনে হচ্ছিল।
সেরিন একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
জীবনের পথচলায় এমন একটি সকাল তার জন্য অপেক্ষা করে আছে, কখনও কল্পনাও করেনি সে। চারপাশের নিস্তব্ধতা, জানালার বাইরে ভেসে আসা পাখিদের ডাক আর ভোরের কোমল আবহ মিলেমিশে মুহূর্তটিকে আরও সুন্দর করে তুলেছিল।
সেরিনকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কায়ান ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এল।
সেরিনের কাছে এসে তার কপালে স্নেহভরা একটি চুম্বন এঁকে দিল সে।
সেরিন চোখ বন্ধ করে নিজের গায়ে জড়িয়ে থাকা চাদরটি আরও শক্ত করে ধরল।
কায়ান হালকা হেসে তার দিকে তাকাল। তারপর নাকে আলতো করে চুম্বন দিয়ে বলল,
“এত লজ্জা কেন পাও?”
সেরিন মৃদু স্বরে বলল,
“ক কোথায়?”
কায়ানের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
“আমি কাল রাতে সব দেখে ফেলেছি।”
কথাটি শুনে সেরিন লজ্জায় কায়ানের বুকে মৃদু আঘাত করল। কায়ান আবারও স্নেহভরে তার কপালে চুম্বন রেখে বলল,
“ফ্রেশ হবে, চলো।”
এরপর কায়ান সেরিনকে চাদরে মুড়িয়ে ওয়াশরুম পর্যন্ত নিয়ে গেল।
দুজন প্রস্তুত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
সেরিন গোলাপি রঙের একটি শাড়ি পরেছিল। কোমল রঙের সেই শাড়িটি তার ফর্সা গায়ের রঙের সঙ্গে অপূর্ব মানিয়ে গিয়েছিল। সকালের আলোয় তাকে যেন আরও স্নিগ্ধ ও মায়াবী লাগছিল।
অন্যদিকে কায়ানও অফিসের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।
শাড়ি পরা সেরিনকে দেখে কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল সে। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল মেয়েটির ওপর।
সেরিনের কোমরের নিচ পর্যন্ত নেমে আসা ঘন কালো চুলগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল কায়ান। দীর্ঘ, মসৃণ চুলগুলো যেন তার সৌন্দর্যে আলাদা এক মাত্রা যোগ করেছিল।
চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে কায়ানের মনে একটি ভাবনা এল।
আজ অফিস থেকে ফেরার পথে সেরিনের জন্য কিছু সুন্দর হেয়ার অ্যাক্সেসরিজ কিনে আনবে সে।
এইসব ভাবতে ভাবতেই কায়ান পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে গেল।
এরপর দুজন একসঙ্গে নিচে নেমে এল সকালের নাশতা করার জন্য।
বাইরে তখন রোদের উজ্জ্বলতা আরও বেড়েছে। বাগানের ফুলগুলো শিশিরভেজা পাপড়ি মেলে দাঁড়িয়ে আছে, আর চারদিকে ছড়িয়ে আছে এক শান্ত, প্রশান্ত সকালের আবেশ। নতুন দিনের সেই সুন্দর সূচনায় পাশাপাশি হেঁটে চলল কায়ান আর সেরিন।
———-
ডাইনিং টেবিলে সকালের নাশতার আয়োজন জমে উঠেছে। সবাই নিজ নিজ জায়গায় বসে নীরবে খাবার খাচ্ছে। ঘরজুড়ে ছড়িয়ে আছে এক প্রশান্ত সকালের আবহ।
সেরিন আজও খেয়াল করল, শিমুল যেন কোনো এক অদৃশ্য চিন্তায় ডুবে আছে। মেয়েটার মুখে স্বাভাবিক হাসি থাকলেও চোখেমুখে স্পষ্ট অস্থিরতার ছাপ। বিষয়টা সেরিনের নজর এড়াল না। মনে মনে সে ঠিক করল, সবাই অফিসে চলে গেলে শিমুলকে একান্তে জিজ্ঞেস করবে কী হয়েছে তার।
এমন সময় আহি মুখ তুলে বলল,
“ভাইয়া, তোমার কথা মতো আমি সেরিনের সব কাগজপত্র ভার্সিটিতে জমা দিয়েছি। সেরিনের ভর্তি হয়ে গিয়েছে। পরশু থেকে সেরিনের ক্লাস শুরু।”
কথাটা শুনে সেরিন বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। সে তো নিজের রেজাল্ট সম্পর্কেই ঠিকমতো কিছু জানত না।
কায়ান স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খাবার খেতে খেতে বলল,
“সেরিন, তোমার মেরিট অনেক ভালো ছিল। তুমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে চান্স পেয়েছ।”
কথাটা শুনে সেরিন এবং শিমুল দুজনেই অবাক হয়ে গেল।
পরমুহূর্তেই সেরিন উঠে গিয়ে শিমুলকে জড়িয়ে ধরল।
শিমুল স্নেহভরে সেরিনের কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“মা বাবা জানলে ভীষণ খুশি হবে।”
মা বাবার প্রসঙ্গ উঠতেই কায়ানের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। তার চেহারায় গম্ভীরতার ছায়া নেমে এলো। গভীর কণ্ঠে সে বলল,
“বলার আগে একবার ভেবে নেবে, সেরিন। এবার কিছু হলে আমার সামনে কে আছে, সেটা ভুলে যাব।”
শিমুল সবই বুঝতে পারল। তাই ঠোঁটে জোর করে একটি হাসি টেনে এনে বলল,
“ভাইয়া, আপনি কিন্তু আসলেই অনেক পজেসিভ।”
কায়ান নির্বিকার স্বরে উত্তর দিল,
“একটা মাত্র বউ আমার।”
বানু মির্জা ছেলের চোখেমুখে জমে থাকা রাগ স্পষ্ট বুঝতে পারলেন। পরিবেশটা হালকা করার জন্য তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“সেরিনের এত সুন্দর একটা খবর শুনে খুব ভালো লাগল। মতিউরকে বলে পাড়ায় মিষ্টি বিলিয়ে দিও, কায়ান।”
সঙ্গে সঙ্গে জেবরানও উৎসাহ নিয়ে বলে উঠল,
“হ্যাঁ, এটা ভালো বুদ্ধি। আমার কিউট শালি আসলেই দারুণ কাজ করে ফেলেছে।”
আহি হেসে বলল,
“হ্যাঁ, যা বলেছ জেবরান ভাই। চট্টগ্রামে টেকা সত্যিই খুব কষ্টের। আমি এত প্রিপারেশন নিলাম, সব জায়গায় হলো, শুধু চট্টগ্রাম হলো না। আবার আমাকে পরের বছর পরীক্ষা দিতে হলো।”
কিছুক্ষণ পর কায়ান চেয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়াল।
“আচ্ছা, আমার হয়ে গেছে। আম্মা বেগম, আমি আসছি।”
তার সঙ্গে সঙ্গেই জেবরানও উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ভাই, আমাকে নিয়ে যাও।”
কায়ান সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,
“চল।”
এরপর কায়ান এবং জেবরান একসঙ্গে বেরিয়ে গেল।
আহিও নিজের ব্যাগ গুছিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
মুহূর্তের মধ্যেই ব্যস্ত সকালের সেই টেবিল ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে এল, আর বাড়ির ভেতর নেমে এলো এক শান্ত নিস্তব্ধতা।
———-
সবাই চলে যাওয়ার পর সিকদার নিবাস যেন এক মুহূর্তেই নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে মানুষের কণ্ঠস্বর, হাসি আর কথাবার্তায় ভরপুর ছিল চারপাশ, এখন সেখানে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত শান্ত নীরবতা।
সেরিন ব্রেকফাস্ট টেবিলের বাকি কিছু কাজ গুছিয়ে উপরে চলে এলো।
শিমুল তখন ফোনে মা বাবার সঙ্গে কথা বলছিল। তার কণ্ঠে ছিল একরাশ প্রশান্তি।
“হ্যাঁ ভাইয়া আসলেই ভালো, আম্মা। আমাদের সেরিনকে যতটা যত্ন সে করেছে, অন্য কেউ পারত না। এত ধৈর্য সত্যি কারোর নেই।”
ওপাশ থেকে কী বলা হলো, তা সেরিন শুনতে পেল না।
তবে কিছুক্ষণ পরই শিমুল কল কেটে দিল।
ফোন নামিয়ে পেছনে তাকাতেই সেরিনকে দেখে খানিকটা অবাক হয়ে গেল সে।
“কিরে, তুই কখন এলি?”
“মাত্র।”
“আয়, বস।”
সেরিন এগিয়ে গিয়ে শিমুলের পাশে বসল।
শিমুল ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী হয়েছে?”
সেরিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর স্বরে বলল,
“আপু, তোমার কী হয়েছে?”
প্রশ্নটা শুনে শিমুল অবাক হলো। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেন, কী হবে?”
“আজকাল তোমার মুড ভীষণ অফ অফ লাগে। কেন বলো তো?”
শিমুল হালকা হাসার চেষ্টা করল।
“আরে না, তেমন কিছু না। তুই অসুস্থ ছিলি তাই।”
সেরিন মাথা নেড়ে বলল,
“না আপু, আমি জানি। তোমাকে আমি ছোট থেকে চিনি। আমাকে বলো প্লিজ।”
সেরিনের চোখে এতটা উদ্বেগ আর ভালোবাসা দেখে শিমুলের চোখ হঠাৎ ভিজে উঠল।
পরমুহূর্তেই সে সেরিনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“সেরিনরে।”
“কী হয়েছে আপু? বড় কোনো ঘটনা ঘটেছে কি?”
এই প্রশ্নের পর আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না শিমুল।
সে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল,
“আমি কখনো মা হতে পারব না, সেরিন।”
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সেরিনের মনে হলো যেন পায়ের তলার মাটি সরে গেছে।
সে অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইল নিজের বোনের দিকে।
“কী বলছিস আপু এসব?”
শিমুল চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,
“হ্যাঁ। আমি বেশ কয়েকবার ট্রাই করেছি। কিন্তু আমি কনসিভ করতে পারছিলাম না। জেবরানকে বলিনি এ কথা আমি।
এরপর কক্সবাজার গিয়েছিলাম এই কারণেই। ভাবলাম, বিয়ের দুই বছর হতে চলল, এবার ট্রাই করা উচিত। হয়তো পরিবেশ বদলালে ভালো কিছু হবে।
এবার জেবরানও জানত।
কিন্তু ফলাফল শূন্য।
তখন জেবরান বলল, আমরা আবার ট্রাই করব। কিন্তু আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। সব বলে দিই ওকে।
সব শুনে ও আমাকে ডক্টরের কাছে নিয়ে যায়।
রিপোর্টে এসব আসে।
আমি পারব না।
হাজার চেষ্টা করলেও হবে না।
আমার সন্তান ধারণ করার কোনো ক্ষমতাই নেই।”
শেষ কথাগুলো বলেই শিমুল আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল।
সেরিন দ্রুত বোনকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল।
“কাঁদিস না আপু। কথাটা তুই আর ভাইয়া ছাড়া কেউ জানে?”
শিমুল মাথা নেড়ে বলল,
“না। তোর ভাইয়া অনেক ভালোবাসে আমাকে। এত বড় সংবাদ শোনার পরেও আমাকে বলেছে কোনো চিন্তা না করতে।
সে সবসময় আমার পাশে আছে।
আমার ভয় হয়, সেরিন।
কতদিন এই ভালোবাসা থাকবে।
যদিও জেবরান নিজেই বলেছে, সে আমাকে নিয়ে ইন্ডিয়া যাবে। প্রয়োজন হলে পৃথিবীর সব দেশে যাবে।
কিন্তু আমার কষ্ট হয়, সেরিন।
লোকটাকে এভাবে দেখে।
আমি জানি, দিন শেষে তারও বাবা হওয়ার অধিকার আছে।
আমি… আমি…”
বাকিটুকু আর বলতে পারল না শিমুল।
কান্না তার সমস্ত কথাকে গ্রাস করে নিল।
সেরিন নিথর হয়ে বসে রইল।
চারপাশের সবকিছু যেন হঠাৎ ঝাপসা হয়ে এসেছে তার কাছে।
এবার সে বুঝতে পারল, কেন গত কয়েক মাস ধরে শিমুলকে এত উদাস, এত অন্যমনস্ক আর ভাঙাচোরা লাগছিল।
তার হাসির আড়ালে যে এত বড় এক যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিল, তা কেউ বুঝতেই পারেনি।
চলবে?
Share On:
TAGS: কিস অফ বিট্রেয়াল, লামিয়া রহমান মেঘলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৪৪
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ২০
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ২৩
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ১
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ২
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩৩
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩২
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ১৬
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৩১
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩৫