#কিস_অফ_বিট্রেয়াল
#পর্ব_৩৫
#লামিয়া_রহমান_মেঘলা
[ কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ ]
সিকদার নিবাস আজ যেন আলোর এক রাজ্যে রূপ নিয়েছে। বিশাল বাড়িটার প্রতিটি কোণ ঝলমল করছে রঙিন বাতির কোমল আভায়। ছাদের কার্নিশ জুড়ে ঝুলছে ছোট ছোট আলোকমালা, দূর থেকে দেখলে মনে হয় রাতের আকাশের তারা নেমে এসে ঘিরে রেখেছে পুরো প্রাসাদটাকে। উঠানজুড়ে সাদা আর গোকাপি ফুলের সাজ, মাঝেমধ্যে টগর আর রজনীগন্ধার মিষ্টি সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
সন্ধ্যার আকাশটাও আজ অদ্ভুত সুন্দর। দূরের কালচে মেঘগুলো ধীরে ধীরে জমে উঠেছে। বাতাসে বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ। মাঝে মাঝে ঠান্ডা হাওয়া এসে ফুলের মালাগুলো দুলিয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে প্রকৃতিও যেন এই আয়োজনের অংশ হয়ে উঠেছে। দূরে কোথাও মৃদু বজ্রের গর্জন, আর তার মাঝেই বাড়িভর্তি মানুষের হাসি আনন্দে চারপাশ জীবন্ত হয়ে আছে।
এই পুরো আয়োজনের পেছনে রয়েছে আহি, জেবরান আর শিমুলের অক্লান্ত পরিশ্রম। সকাল থেকে এক মুহূর্তের জন্যও তারা বসেনি। কখনো ফুলের সাজ ঠিক করেছে, কখনো অতিথিদের বসার ব্যবস্থা দেখেছে, আবার কখনো রান্নাঘরে গিয়ে সবকিছু তদারকি করেছে।
বানু মির্জা খানিক আগেই এসে পৌঁছেছেন সিকদার নিবাসে। বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই তাঁর চোখ জুড়িয়ে গেল। চারপাশের সাজসজ্জা দেখে তাঁর ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। ছেলে মেয়েদের এত আন্তরিক আয়োজন দেখে বুকের ভেতরটা আনন্দে ভরে উঠল তাঁর।
শিমুল তখন কুলার উপর ধান আর ধুগলা সাজাতে ব্যস্ত। হলুদের আভা মাখা ধান, লাল আলতার ছোঁয়া আর ফুলের পাপড়ি দিয়ে কুলাটা এমন যত্নে সাজানো যেন এক টুকরো শিল্পকর্ম। ঠিক তখনই নিঃশব্দে এসে তার পেছনে দাঁড়ালেন বানু মির্জা।
“বাহ, বেশ সুন্দর সাজিয়েছো তো। আগে থেকে জানতে কিভাবে সাজায়?”
শিমুল ঘুরে তাকালো। শ্বাশুড়িকে দেখে মিষ্টি করে হেসে বলল,
“না আম্মা। আপনি যেদিন আমাকে বরণ করেছিলেন, আপনার হাতের কুলাটা দেখেছিলাম। এত সুন্দর করে সাজানো ছিল যে আজও মনে আছে। আমিও ওভাবেই চেষ্টা করেছি।”
বানু মির্জার চোখে মুগ্ধতা ফুটে উঠল।
“বেশ সুন্দর হয়েছে।”
শিমুল তখন আবার ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
“আম্মা বেগম, আপনি শাড়িটা বদলে আসুন। ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছে কায়ান ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে। সবাই এসেছে। আপনি একটা নতুন শাড়ি পরুন।”
বানু মির্জা মৃদু হেসে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
শিমুল আবার হাতে হাতে সবকিছু গুছিয়ে নিতে লাগল। কারো পানির ব্যবস্থা করছে, কারো বসার জায়গা ঠিক করছে, আবার কোথাও ফুলের মালা বেঁকে গেলে নিজেই দাঁড়িয়ে ঠিক করে দিচ্ছে।
আহি আজ বড্ড খুশি। মেয়েটা নিজেও খুব সুন্দর করে সেজেছে। হালকা সাজে তার মুখটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। চারপাশে এত আনন্দ, এত উচ্ছ্বাস দেখে তার চোখেমুখে প্রশান্তির আলো ছড়িয়ে আছে।
সবাইকে এতটা খুশি দেখে আবু সুফিয়ান নীরবে বসে ভাবছিলেন, হয়তো তিনি ভুল ছিলেন। চারপাশের হাসি আনন্দ দেখে মনে হচ্ছে না এটা কায়ানের দ্বিতীয় বিয়ে। বরং মনে হচ্ছে বহুদিনের অপূর্ণ একটা ভালোবাসা আজ পূর্ণতা পাচ্ছে।
তার ভাবনার মাঝেই এসে পাশে বসল জেবরান।
“আব্বু, কিছু ভাবছেন?”
জেবরানের কণ্ঠে আবু সুফিয়ানের ধ্যান ভাঙল। তিনি ধীরে সোজা হয়ে বসলেন।
জেবরান মিষ্টি হেসে শ্বশুরের হাতে হাত রাখল।
“আমি জানি আব্বু, আপনার হয়তো মানতে কষ্ট হচ্ছে সেরিনের হাসবেন্ডের আগে একটা বিয়ে ছিল। কিন্তু বিশ্বাস করুন, সেই বিয়েটা কোনো বিয়েই ছিল না। আহির চোখেমুখে দেখুন কত আনন্দ। আম্মা বেগমও খুশি। সবাই খুশি কেন জানেন? কারণ সিকদার কায়ান মাহবুব আজ তার ভালোবাসার মানুষটাকে পেয়েছে।
আমি জানি আপনি সেরিনকে নিয়ে চিন্তা করেন। শিমুল হয়তো রাগের মাথায় আপনাকে অনেক কথা বলেছিল। কিন্তু বিশ্বাস করুন আব্বু, সেরিন সুখী হবে। আমার ভাইয়া ওর জন্য একদম পারফেক্ট।”
আবু সুফিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বাইরে টুপটাপ করে হালকা বৃষ্টি নামতে শুরু করবে হয়ত কিছুক্ষণ পরেই। ঠান্ডা বাতাস এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে চারপাশ। সেই শান্ত বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় জেবরানের কথাগুলো তাঁর মনেও একফালি আশার আলো জ্বালিয়ে দিল।
———-
হাসপাতালের নির্জন কেবিনে বসে নিজের হাতে নিজের স্ত্রীকে সাজিয়ে দিয়েছিল কায়ান।
তার পরনে ছিল সাদা রঙের একটি পাঞ্জাবি। মানুষটা যেন যা-ই পরে, তাতেই অসাধারণ সুদর্শন লাগে।
ধীর হাতে কায়ান সেরিনের কোমড়ে বেল্টটি জড়িয়ে দিল। তারপর অত্যন্ত যত্নে তাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
হাসপাতাল থেকে সিকদার নিবাস খুব বেশি দূরে নয়। তাই দীর্ঘ সময় ড্রাইভ করার প্রয়োজন পড়ল না।
গাড়ি যখন সিকদার নিবাসের সামনে এসে থামল, চারপাশের সাজসজ্জা দেখে অবাক হয়ে গেল সেরিন। পুরো বাড়িটা আলোয় ঝলমল করছে। রঙিন বাতির নরম আভা, ফুলের সাজ আর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা উৎসবের আবহ মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে তুলল।
সেরিনের চোখের কোণায় প্রশান্তির জল চিকচিক করে উঠল।
কায়ানও কম অবাক হয়নি। এত অল্প সময়ের মধ্যে তার ভাইবোনেরা এত বিশাল আয়োজন করে ফেলবে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি।
কায়ান যখন সিকদার নিবাসের সদর দরজার সামনে গাড়ি থামাল, তখন দেখতে পেল সবাই দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন বানু মির্জা। হাতে বরণ করার কুলা। মুখভর্তি এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি।
কায়ান ধীরে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। তারপর অত্যন্ত সাবধানে সেরিনকে পাজকোলে তুলে নিল।
সেরিন একবার মুখ তুলে তাকাল কায়ানের দিকে।
লোকটার চোখেমুখে আজ এক অন্যরকম আনন্দ। তার চোখ দুটো যেন আলোয় ঝলমল করছে। বহুদিনের অপূর্ণতা শেষে আজ যেন সে তার পৃথিবীকে নিজের হাতে ছুঁয়ে পেয়েছে।
কায়ান সবার সামনে দিয়েই ধীর পায়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল।
শিমুল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেরিনের এই করুণ অবস্থা দেখছিল। মেয়েটার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। চোখে টলমল করে উঠল পানি।
তবুও কোথাও একটুখানি শান্তি অনুভব করল সে।
কারণ এত বাধা, এত কষ্ট, এত রক্তক্ষরণের পরও শেষ পর্যন্ত ওদের ভালোবাসা সবার সামনে হার মানেনি। বরং সমস্ত অন্ধকার পেরিয়ে আজ নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
কায়ান, সেরিনকে পাজকোলে তুলেই এগিয়ে এলো সিকদার নিবাসের দিকে।
বানু মির্জা ভীষণ খুশি হয়ে ছেলে এবং ছেলের বউকে বরণ করলো।
আশেপাশে ততক্ষণে মানুষ চলে এসেছে।
সবাই জেনে গেছে বউ এসেছে।
পাড়াপ্রতিবেশি সেরিনকে দেখে খুব অবাক হয়েছে৷ সেই সাথে বেশ কানাঘুষাও করছে।
বানু মির্জার চোখের ইসারায় কায়ানকে শান্ত থাকতে বলে।
কায়ান সেরিনকে নিয়ে ভেতরে চলে যায়।
ভেতরেও সুন্দর করে সাজিয়েছে ওরা।
কায়ান সোজা হেঁটে নিজের রুমের দিকে চলে যায় এমন সময় দরজা থামিয়ে দাঁড়ায় আহি,
“এই যে দাঁড়ান ভাই আমার কোথায় যাচ্ছেন এত সহজে?’
কায়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
” রুমে যাচ্ছি৷”
“না না এত সহজেত না। আপনার রুম এত কষ্ট করে কোমড় ব্যথা করে সাজিয়েছি আমি। আমাকে পারিশ্রমিক দিতে হবে নাহলে রুমে যাওয়া যাবেনা।”
ততক্ষণে বানু মিজা এসে বলেন,
“এই মেয়ে দেখছিস না সেরিনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তা ছাড়৷”
“আম্মা বেগম প্লিজ তোমার ছেলে কোটিপতি আমার দিকে কিছু টাকা ছুড়ে মারলে কিছুই হবেনা ওর৷ এই ভাইয়া টাকা দে।”
“সেরিন আমার গলা জড়িয়ে ধরো শক্ত করে।”
কায়ানের কথা শুনে সেরিন তাই করে।
কায়ান বাম হাতে সেরিনকে ছেড়ে পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে আহিকে দিয়ে দেয়,
“যা খুশি কর শুধু আমার কার্ড’স গুলো সামলে।”
আহিত টাকা পেয়ে দরজা ছেড়ে দেয়। সে মহা খুশি। কায়ানও মিষ্টি হেসে রুমে চলে যায়।
লাল গোলাপ শহ লাভ বেলুন আরও লাল মোমবাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে রুমটা।
কায়ান, সেরিনকে নিয়ে বিছনায় শুইয়ে দেয়।
“শাড়ি বদলে দিব জান?”
“উহু, পরে বদলে দিয়েন৷”
কায়ান, সেরিনের কপালে চুমু খায়।
“ওকে।”
এরপর সেখানে উপস্থিত হয় কিছু মহিলা।
কায়ান পেছনে শিমুলকে দেখে আর কিছু বলেনা।
মহিলাদের ভেতর থেকে কাজ নেই তাই বেরিয়ে যায়।
শিমুল এগিয়ে এসে সেরিনের পাশে বসে,
“কষ্ট হচ্ছে কোথাও?”
“উহু৷’
শিমুল মৃদু হাসে,
” ওনাদেরত চিনিস?”
সেরিন একটু মাথা ঘুরিয়ে দেখে। হ্যাঁ এদেরকে সেরিন ভালো করেই চেনে। শিমুলের বিয়ের পর এরাই এসে নানান কথা শোনাত। সেরিনও মাঝে মধ্যে জাবাব দিত আর বলত এই বাড়িতে আমি জীবনে বিয়ে করে আসব না।
নিজের বাচ্চামি দিন গুলোর কথা মনে পড়লে হাসি এসে যায় সেরিনের ঠোটে। সত্যি কি ঘৃণা না করত সে কায়ানকে।
সেরিনকে দেখে ওরা সবাই কটু কথা বলেনি তা নয়। বলেছে অনেক কটু কথা। কিন্তু সেরিন ওদের পাত্তা দেয়নি। উল্টে কিছু জবাবা দিয়েছে যার জন্য ওরা রেগে চলে গিয়েছে।
চলবে?
Share On:
TAGS: কিস অফ বিট্রেয়াল, লামিয়া রহমান মেঘলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৬
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৫৮
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৪৩
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ৬
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৩৩
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ১৯
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩১
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ১৭
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৬৫