Golpo romantic golpo কালারব্লাইন্ড

কালারব্লাইন্ড পর্ব ১০


#কালারব্লাইন্ড — ১০

#সোফিয়া_সাফা

দেয়ালঘড়িতে সময় এখন সকাল আটটা। রঞ্জকের খাটের পাশের বিশাল জানালার পর্দা ভেদ করে সূর্যের আলো তীর্যকভাবে এসে পড়েছে তার ঘুমন্ত মুখে। তবে রোদটুকু এতই ক্ষীণ যে পুরুষের গাঢ় ঘুমে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটাতে পারছে না। 

রঞ্জক উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে। আলুলায়িত চুলগুলো কপালের ওপর ছড়িয়ে আছে তার। গৌর বর্ণের ত্বক আলোর সংস্পর্শে এসে খানিকটা রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। গোলাপি নয়, খানিকটা ঈষৎ বাদামি রঙের পেলব ঠোঁট দুটো আলতোভাবে একে অপরকে ছুঁয়ে আছে। মুখ জুড়ে গোছানো চাপদাড়ি; আগে ক্লিন সেভ করতে দেখা যেতো তাকে কিন্তু যবে থেকে রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে নাম লিখিয়েছে, সেদিন থেকেই ক্লিন সেভ করতে প্রায় দেখা যায় না তাকে। দুহাতে বালিশ আঁকড়ে ধরে শায়িত আছে সে।

একটানা ফোনের রিংটোনের শব্দে ঘুমজড়ানো হাতেই পাশের টেবিল থেকে ফোনটা হাতড়ে কানে চেপে ধরল রঞ্জক। ওপাশ থেকে তুষারের অস্থির কণ্ঠ ভেসে এলো, “তুই ঘুমাচ্ছিস দোস্ত?”

“হুম…” ঘুমভারী গলায় সংক্ষিপ্ত জবাব রঞ্জকের।

“আমি সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি। আর তুই ঘুমাচ্ছিস? কী যে শুনিয়ে দিলি আমাকে। প্লিজ দোস্ত বল না, তুই মজা করছিস। সেই পান্না চোখের মেয়েটা বিবাহিতা নয়।”

রঞ্জকের চোখ থেকে ঘুম ছুটে গেল এক লহমায়। ফট করে চোখ মেলে বিরক্ত ঝাড়লো, “তুই এই সাতসকালে এটা বলতে কল দিয়েছিস?”

“সকাল? ও হ্যাঁ, সকাল হয়ে গেছে। আমি তাহলে তোদের বাড়িতে আসছি বুঝলি। মেয়েটার সাথে একটু কথা বলিয়ে দিবি আমায়।”

একমুহূর্তও ভাবল না রঞ্জক। বলে দিল, “মেয়েটা চলে গেছে।”

তুষারের মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল, “আমাকে ওর বাড়ির অ্যাড্রেসটা দে তাহলে।”

“জানি না।”

“ধ্যাৎ মরণ! তোর বাবা আছেন বাড়িতে?”

“জানি না।”

“তাহলে কী জানিস তুই?”

“কিচ্ছু জানি না। কল রাখ, ঘুম কমপ্লিট হয়নি আমার।”

“আর এদিকে যে আমি ঘুমাতেই পারিনি তার কী হবে?”

“ঘুমের ওষুধ খা।”

“কী! তুই আমাকে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ম`রে যেতে বলছিস?”

“এক লাইন বেশি বুঝিস কেন? এক-দুটো খাবি সমস্যা হবে না।”

“এখন ঘুমাতে গেলে অফিস টাইম মিস করে ফেলবো। তোর তো কঙ্কা আছে, দেরি করে গেলেও সমস্যা হয় না।”

“রাখ তুষার, ঘুমাতে দে।”

“ঘুমা তুই, আমি আসছি।”

“কোথায় আসছিস?”

“তোদের বাড়ি।” কথাটি শেষ করেই খট করে লাইনটা কেটে দিল তুষার।

ঘুমাতে তো বলে দিল সে, কিন্তু রঞ্জকের চোখের অবশিষ্ট ঘুমটুকু কেড়ে নিয়েই কল কাটলো। থম মেরে কিছুক্ষণ বসে থেকে লাফিয়ে উঠল রঞ্জক। মাথাটা রিমরিম করছে। তুষার এসে যদি কোনোভাবে আলতাকে দেখে ফেলে তাহলে তার মিথ্যা ধরা পড়ে যাবে। মেয়েটাকে তো আর ভরসা নেই। নির্ঘাত তুষার এলেই তারও নিজের স্বামীর কথা মনে পড়ে যাবে। ঠিক স্বামীর কথা নয়, জুবার কথা। হ্যাঁ, জুবার জন্যই যে মেয়েটাকে ঘরের সামনে আনাগোনা করতে দেখা যায় তা খুব ভালো করেই জানে রঞ্জক।

কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে এসে চোখে চশমা পরে নিল রঞ্জক। গায়ের পাজামা স্যুট বদলাতে গিয়ে সময় ব্যয় করল না। কপালের ওপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলতে ঠেলতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। 

এদিকে ঘুম থেকে উঠে চটজলদি ফ্রেশ হয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে বসেছে আলতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই গৃহকর্মী খাবার নিয়ে উপস্থিত হবে। তার আগেই মুখে ভালোভাবে কনসিলার, ফাউন্ডেশন আর কমপ্যাক্ট পাউডার মেখে দাগগুলো যতটা সম্ভব আড়াল করে ফেলতে হবে। ইছাপূর্ণা সকালে একবার এসেছিলেন, তারপর আবার নিজেদের ঘরে ফিরে গেছেন। তাদের থাকার ব্যবস্থাও দোতলাতেই করা হয়েছে। আলতার মন ভালো করার জন্যই মূলত আরিজ মাহতাবির নিজে গিয়ে তাদের নিয়ে এসেছেন। বেশ কিছুদিন এবাড়িতেই থাকবেন তারা—যতদিন না আলতা নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে।

আলতা নিজের সাজে এতটাই বিভোর হয়ে ছিল যে দরজার মুখে এসে দাঁড়ানো দীর্ঘ অবয়বটাকে খেয়ালই করেনি। আয়নায় চোখ রেখে তখন ব্যস্ত হাতে ঘাড়, গাল আর বুকের ওপরের কালচে হয়ে যাওয়া আঁচড়ের দাগগুলো ঢাকছিল সে। দাগগুলো কোনোদিন পুরোপুরি যাবে কি না, আলতা জানে না। ক্ষতগুলো ছিল গভীর। সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে হয়তো অনেকটাই মিলিয়ে যেত। যা পায়নি সে। তাই তো সময়ের সাথে সাথে ক্ষত শুকিয়ে গেলেও দাগগুলো রয়েই গেছে। 

ইছাপূর্ণা এসে চলে যাওয়ার পর দরজাটা আর লক করা হয়নি, আলগাই ছিল। রঞ্জক নক করার উদ্দেশ্যে হাত তুলতেই দরজার ফাঁক দিয়ে আয়নার সামনে বসে থাকা আলতাকে চোখে পড়ল তার। কী করছে মেয়েটা, দেখার কৌতূহলে দরজাটা সামান্য ঠেলে ভেতরে উঁকি দিল সে।

পেছন থেকেই নজরে এলো আলতার ব্যস্ত হাতের নড়াচড়া। শাড়ির আঁচল সামান্য সরিয়ে পেটের ওপরের ক্ষতচিহ্নগুলোতে কনসিলারের প্রলেপ লাগাচ্ছিল মেয়েটা।

কী করছে মেয়েটা, সেটা ভালো করে দেখার তাগিদেই রঞ্জক দরজাটা আরও একটু ঠেলে ভেতরে ঢুকল। আয়নায় ফুটে ওঠা তার প্রতিচ্ছবি তখনও আলতার চোখে পড়েনি। সে নিচু হয়ে শরীরের দাগগুলো লুকাতেই তৎপর। তবে আয়নায় ভেসে থাকা প্রতিফলনে আলতার কাজকর্ম সব নিখুঁতভাবে দেখতে পাচ্ছে রঞ্জক। সে বেখেয়ালি হয়ে ধীরপায়ে হেঁটে এসে দাঁড়াল কিশোরীর ঠিক পেছনে। দৃষ্টি তখনও আয়নায় নিবদ্ধ।

কনসিলারের প্রলেপ লাগানো শেষ করে প্রসাধনীটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখল আলতা। তারপর আয়নার দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠল।

এতটাই ভয় পেয়ে গেল যে মুখ দিয়ে চিৎকার বেরিয়ে এলো,

“আল্লাহ গো!”

রঞ্জক আয়না থেকে চোখ সরিয়ে সরাসরি তাকাল ভীতসন্ত্রস্ত কিশোরীর মুখপানে। আলতা তড়িঘড়ি শাড়ির আঁচল টেনে নিজেকে যতটা সম্ভব আবৃত করে ফেলল।

আতঙ্কিত স্বরে বলল, “আ-আপনি?”

রঞ্জক কোনো উত্তর দিল না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ড্রেসিং টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা প্রসাধনীগুলোর দিকে তাকাল। আচমকাই এগিয়ে গিয়ে একটার পর একটা হাতে তুলে দেখতে লাগল।

তার কাণ্ডকারখানা দেখে আলতা অজান্তেই শুকনো ঢোক গিলল। একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। সবচেয়ে বড় দুটি প্রশ্ন হলো, লোকটা হঠাৎ তার ঘরে কেন এলো? আর এসে এমন অদ্ভুত আচরণই বা করছে কেন?

রঞ্জক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল আলতার দিকে। মনে পড়ে গেল তুষারের বলা কথাগুলো,

“ওর দুটো পান্নার মতো সবুজ চোখ আছে। চুলগুলোও রক্তের মতো লাল। গালের ওপর টোকা দিলেই মনে হয় রক্ত—”

হ্যাঁ, রক্ত এবার উঠে গেল রঞ্জকের মাথায়। অনুসন্ধানী চোখজোড়া সরু করেও আলতার সেই বিশেষ সবুজ চোখ কিংবা লাল চুল কোনোটাই সে দেখতে পেল না। তার দৃষ্টিতে কিশোরীর চোখ ও চুল দুটোই কালচে রঙের। যা খুবই সাধারণ, কী এমন অসাধারণ আছে এতে? কিচ্ছুই তো নেই! 

রাগে রঞ্জকের ঘাড়ের শিরা টনটন করছে। সামনে বসে থাকা কিশোরী যেন তার ধারালো দৃষ্টির অভিমুখে জমে কাঠ হয়ে গেছে। রঞ্জক চোখ ঘুরিয়ে আবারও টেবিলের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। অজানা আক্রোশে এক ঝটকায় ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা সব প্রসাধনী মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিল সে। 

বিকট আওয়াজে দু’হাতে কান চেপে ধরে চোখ বুজে নিল আলতা। তবুও সমস্ত বাধা টপকে রঞ্জকের মুখনিঃসৃত বিষাক্ত কথাগুলো শ্রবণগোচর হলো তার,

“মুখে এসব মেখেই পরপুরুষকে আকৃষ্ট করিস, তাই না? কুত্তাগুলোকে কাছে টানতে দিব্যি এসব মাখবি, আর সেই কুত্তাগুলো কামড়ে দিলেই দোষ?” 

আলতার হাত দুটো শক্তি হারিয়ে কান থেকে আলগা হয়ে খসে পড়ল। হতচকিত চোখজোড়ায় জমতে শুরু করল নোনাজল। রঞ্জক বেশ অনেকটা ঝুঁকে পড়ল তার মুখের ওপর। কিশোরীর চোখে চোখ রেখে উগড়ে দিল,

“সত্যি করে বল, আর কয়জন পুরুষের লালসার শিকার হলে শান্তি পাবি তুই? আমি নিজেই না হয় ব্যবস্থা করে দিলাম!”

রঞ্জক আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। তার আগেই আলতার হাত উঠে গেল। নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে অজান্তেই থাপ্পড় মেরে দিল রঞ্জকের গালে। 

কিশোরীর দুর্বল হাতের থাপ্পড়ে খুব বেশি জোর ছিল না, তবুও ঠাস করে একটা শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। রঞ্জকের ডান গালটা মুহূর্তেই ঝিনঝিন করে উঠল। বাঁ দিকে ঈষৎ ঘুরে গেল তার মুখ। ব্যাপারটা বুঝতে তার একটু সময় লাগল। সে পুনরায় আলতার ওপর চোখ ফেরাতেই দেখল, একহাতে নিজের মুখ চেপে ধরে নিজের বাঁ হাতের দিকে কান্না উপচে পড়া চোখে চেয়ে আছে কিশোরী; যেন সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না এইমাত্র কী অনর্থ করে ফেলেছে!

রঞ্জক সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার শান্ত চোখের চাউনি আটকে গেল দরজার ওপর। অকস্মাৎ দীর্ঘ কদমে সে চলে যেতে লাগল সেদিকে। আলতা ভাবল, অপমানিত হয়ে লোকটা বুঝি রেগেমেগে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাই সেও হাঁটা ধরল রঞ্জকের পিছু পিছু; উদ্দেশ্যে ছিল লোকটা বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই দরজা লাগিয়ে দিয়ে নিজেকে ভেঙে পড়ার অনুমতি দেবে সে। কিন্তু সে যেমনটা ভেবেছিল, তেমন কিছুই হলো না। রঞ্জক বেরিয়ে না গিয়ে উল্টো দরজাটা আটকে দিল ভেতর থেকে। 

আলতার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। রঞ্জক ঘুরে তাকাতেই তার রক্তিম চোখমুখ দেখে ঢোক গিলল সে। চোখের সামনেটা ঝাপসা হয়ে এলো তার। রঞ্জক হুড়মুড় করে কয়েক কদম এগিয়ে গেল তার দিকে। রঞ্জক যত এগিয়ে যাচ্ছিল, আলতার শঙ্কিত পা-জোড়াও ততই পিছিয়ে যাচ্ছিল।

প্রচণ্ড শীতল কণ্ঠে রঞ্জক বলল, 

“তুই আমাকে থাপ্পড় মেরেছিস? এতো বড় সাহস তোর?”

রঞ্জকের গতির সাথে তাল মিলিয়ে পিছতে গিয়ে আলতার পা খাটের ফুটবোর্ডের সাথে ধাক্কা খায়। টালমাটাল হয়ে কিশোরী ধপ করে বসে পড়ল খাটের ওপর। রঞ্জক সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় তার বিশাল ছায়ার নিচে হারিয়ে গেল আলতার ছোট্ট অবয়ব।

রঞ্জক খাটের একেবারে কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আলতার পাশে একটি হাঁটু তুলে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে শরীরটা তার দিকে ঝুঁকিয়ে আনল। আচমকা একহাত গলিয়ে দিল আলতার কানের পাশ দিয়ে তার চুলের ভাঁজে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আর রুক্ষ হাতের দখলদারি স্পর্শে ব্যথায় কুঁকড়ে গেল মেয়েটা।

রঞ্জক তার নিচু করে রাখা মাথাটা জোরপূর্বক সোজা করে দেখল বন্ধ চোখের পাতা ভেদ করে নৈশব্দ্যে ধাবমান হয়েছে অশ্রুজল।

“ওপেন ইওর আইস!” খুবই কাঠখোট্টা শোনালো তার কণ্ঠ।

আলতা চোখ খুলল না; বরঞ্চ আরও শক্ত করে বুজে ফেলল চোখের পাতা দুটো।

“চোখ খোলো মেয়ে, আমিও দেখি তোমার চোখের মধ্যে কী এমন আছে। যা দেখিয়ে তুমি সব ছেলেদের এভাবে বশ করে ফেলছো।”

ঘৃণায় আলতার পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। রঞ্জকেরও ধৈর্যশক্তি ফুরিয়ে আসছে।

“ওকে সো, তুমি চাইছো আমি আঙুল ঢুকিয়ে… তোমার চোখদুটো বের করে এনে তারপর দেখি। কী তাই তো?”

আলতা বাধ্য হয়েই নিজের চোখের পাতা তুলল। রঞ্জকের মুখটা এতটা কাছে দেখে আবারও দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে এলো তার। রঞ্জক কয়েক সেকেন্ড অপলক তাকিয়ে রইল চোখজোড়ার দিকে। আরও একবার খুঁজে ফিরল সেই কথিত আকর্ষণ। কিন্তু এবারও ব্যর্থ হলো।

নিজের ব্যর্থতা লুকাতে সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “আই ক্যানট সি এনিথিং স্পেশাল। বাট আই অলরেডি হেট ইউর আইজ। ইউর হেয়ার টু। একচুয়ালি, আইভ স্টার্টেড হেটিং এভরিথিং এবাউট ইউ।”

আলতার মুখ থেকে ফোঁপানোর আওয়াজ নির্গত হলো। রঞ্জক যেন আরও মেতে উঠল নিজের উন্মাদনায়। ঠোঁটজোড়ার ওপর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে অন্য হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরল আলতার নিচের ঠোঁট। খসখসে আঙুলের চাপে লিপস্টিকটা ঠোঁটের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।

“এসব লাগিয়ে অন্যদের আকৃষ্ট করার প্ল্যান তাই না? আমি মেরে ফেলবো তোমাকে।”

রঞ্জক ঠোঁটের লিপস্টিক মুছে দিয়ে গালের ওপরেও ঘষতে শুরু করল। আলতা আর সহ্য করতে পারল না। কান্না জড়িত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল, “ছাড়ুন আমাকে। ছেড়ে দিন। যান এখান থেকে, চলে যান।”

রঞ্জক শুনলো না। 

“আমি তোমার আসল চেহারা দেখতে চাই মেয়ে। দেখতে দাও আমাকে।”

আলতার ভেতরে ভয় জেঁকে বসলো। রঞ্জকের ঘষাঘষিতে ইতোমধ্যেই গালের আঁচড়ের দাগগুলো হালকা ফুটে উঠতে শুরু করেছে!

“এমন করবেন না… আল্লার দোহাই লাগে ছেড়ে দিন আমাকে!” বলতে বলতেই আলতা কাঁপা কাঁপা হাতে রঞ্জকের হাতটা সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু তার এই প্রতিরোধ যেন রঞ্জকের উন্মাদনাকে আরও উসকে দিল। সে একহাতে আলতার হাতদুটো চেপে ধরে গালের ওপরের মেক-আপের আস্তরণ তুলতে শুরু করল।

“কেন স্পর্শ করছেন আমাকে? আপনার হাত নোংরা হয়ে যাবে তো। ছেড়ে দিন না। কেন নিজের হাত নোংরা করছেন?”

কথাটা ভারী হলেও রঞ্জকের উন্মুখ মস্তিষ্কে চেপে বসা উন্মাদনার কাছে ফিকে পড়ে গেল। গালের ওপরের দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠতেই রঞ্জকের হাত থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে লোকটা উন্মত্তের মতো আচরণ করছিল, হঠাৎ সে বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গেল।

“এ-এগুলো কী? ক-কিসের দাগ?” তোতলাতে লাগল সে। 

আলতার ফোঁপানোর শব্দ ক্রমেই জোরালো হতে লাগল। রঞ্জক তাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিল। 

“আর কোথায় কোথায় আছে এমন দাগ?”

আলতা উঠে বসতে যাবে তার আগেই রঞ্জক চড়ে গেল তার ওপর। পেটের বাঁ দিকে কাপড় তুলে দেখার জন্য হাত এগিয়ে নিল সে। আলতা নিজের দুহাতে তার হাতটা সরিয়ে দিতে চাইলো,

“আল্লাহ্! কী করছেন এগুলো? ছেড়ে দিন আমাকে। আমি আর সইতে পারছি না। আপনি মুক্তি চান তো? আমি দিয়ে দেবো। সত্যি বলছি, দিয়ে দেবো। শুধু ছোঁবেন না আমাকে। আর একটাবারও ছোঁবেন না।”

রঞ্জক নিজেকে থামাতে পারছিল না। 

“আমাকে দেখতে দাও মেয়ে।”

“কেন দেখতে চাইছেন?”

“জানি না। শুধু জানি আমাকে দেখতেই হবে। হয় তুমি আমাকে নিজে থেকে দেখাও নয়তো আমি নিজেই তোমার জামাকাপড় টেনে ছিঁড়ে সব দাগ খুঁজে বের করব!”

আলতা কোনোমতেই শক্তি খাটিয়ে রঞ্জককে আটকাতে পারছিল না। তাই সে বলেই উঠল, “আচ্ছা! আপনি দয়া করে ছাড়ুন আমাকে… আমি নিজেই দেখাচ্ছি আপনাকে।”

রঞ্জক বহু কষ্টে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে পাশে বসতেই আলতা এক লাফে খাট থেকে নেমে কয়েক কদম পিছিয়ে দাঁড়াল। রঞ্জক সতর্ক হয়ে যেতেই আলতা বলে উঠল, “দেখাচ্ছি, আমি সত্যিই দেখাচ্ছি! আপনি খাটেই বসুন, নইলে ভালো করে দেখতে পাবেন না।”

রঞ্জক শুনলো তার কথা। স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে সে আলতার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। আলতাও ভেজা চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। বুকভরে শ্বাস টেনে নিয়ে আলতা নিজেকে ধাতস্থ করল। তারপর একদিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল, “ওই দেখুন, আপনার মাছগুলো জুবার মতো আকাশে উড়ছে।”

রঞ্জক সঙ্গে সঙ্গে আলতার আঙুল অনুসরণ করে সিলিংয়ের দিকে তাকাল। কিন্তু অস্বাভাবিক কিছুই দেখতে পেল না। সে চশমার ফ্রেমটা আঙুল দিয়ে সামান্য ঠেলে একটু ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। ঠিক তখনই দরজা খোলার শব্দ হলো।

রঞ্জক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল, মেয়েটা পালিয়ে যাওয়ার তাগিদে দরজা খুলে দৌড় লাগিয়েছে।

“এই মেয়ে! কোথায় যাচ্ছো? দাঁড়াও বলছি। দাঁড়াও।”

রঞ্জক তড়িঘড়ি খাট থেকে নেমে পিছু নিল তার। আলতার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে। সে জানে এই সময় কেবল একজন মানুষই এই পাগলাটে লোকটার হাত থেকে বাঁচাতে পারে তাকে। সেই লোকটার কাছেই যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিঁড়ির দিকে ছুট লাগিয়েছে সে। পথিমধ্যে শাড়ির আঁচল টেনে মুখের অর্ধেকটা ঢেকে নিতেও ভোলেনি।

রঞ্জকের ঘরে এসে তুষার তাকে খুঁজে না পেয়ে লিফটের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। তন্মধ্যেই সিঁড়ি বেয়ে ধেয়ে আসা আলতা তার সাথে ধাক্কা খেতে খেতে নিজেকে সামলে নিল। 

আলতাকে অতর্কিতে সামনে দেখে তুষার চমকে উঠল, “তুমি? রঞ্জক তো বলল তুমি নাকি চলে গেছো।”

আলতা তুষারকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তুষার কৌতূহলী হয়ে বারবার তার পথ আগলে দাঁড়াল। ইতস্তত করে বলল,

“তোমার সাথে কি একটু কথা বলা যাবে?”

আলতা ভয়ে ভয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখল রঞ্জক প্রায় চলেই এসেছে। সে কোনোমতে তুষারকে ভ্যাবাচেকা খাইয়ে সিঁড়ি বেয়ে পাঁচ তলায় উঠে গেল। 

আলতা যে পথে গেল, সেদিকেই তাকিয়ে রইল তুষার। তাকে কদাচিৎ খেয়াল করল না রঞ্জক। আলতার পিছুপিছু সিঁড়িতে পা রাখতেই তুষার পেছন থেকে হাত ধরে থামাল তাকে।

“এই কী রে? তুই না বললি মেয়েটা চলে গেছে? তাহলে কি এইমাত্র মেয়েটার ভূত দৌড়ে গেল?”

তুষারকে দেখে রঞ্জকের মেজাজ খারাপ হলো। হাত সরিয়ে দিয়ে আবারও সামনে এগোতে লাগল। তুষার বলে উঠল, “বাই অ্যানি চান্স, তুই কি মেয়েটাকে তাড়া করছিস? ও কি তোর থেকেই পালাচ্ছে?”

থেমে গেল রঞ্জক। চোখ বুজে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল তৎক্ষণাৎ। ফোলা মুখটা ঘুরিয়ে পিছু ফিরে বলল, “একদমই না। আমি তো এএম এর ঘরে যাচ্ছিলাম।”

“ও আচ্ছা, তাই নাকি?” তুষারের কণ্ঠে অবিশ্বাস স্পষ্ট।

“হুম, তুই ঘরে গিয়ে বোস। আমি এএম এর সঙ্গে কথা বলে আসছি।”

রঞ্জক আবারও পা বাড়াতেই তুষারও তার পিছু হাঁটা ধরল, “আমিও তাহলে তোর সাথে ওপরে যাচ্ছি।”

রঞ্জক মেজাজ হারিয়ে থমকে দাঁড়াল, “আরে তোর যেতে হবে না। আমি এক্ষুনি আসছি। তুই ঘরে যা।”

“আরে আমি কি তোদের পিতা পুত্রের কথা শুনতে যাবো? আমি তো ওই মেয়েটার সাথে ভাব জমাতে যাবো। মনে তো হচ্ছে ও ওপর তলাতেই থাকে।”

“ও দোতলাতে থাকে।” রঞ্জকের মুখ থেকে ফট করে বেরিয়ে গেল।

“তাহলে ওপরে গেল কেন?”

“তুষার! এতো প্রশ্ন করছিস কেন?”

“তো করবো না? তোকে আর বিশ্বাস নেই। কেমন মিথ্যা বলে দিলি যে মেয়েটা নাকি চলে গেছে। এখনো নিশ্চয়ই মিথ্যাই বলছিস। মেয়েটা নিশ্চিত ওপরেই থাকে। দেখি, সর। যেতে দে আমায়।”

রঞ্জক যেতে দিল না। উল্টো বাধা হয়ে দাঁড়ালো, “তুই যেতে পারবি না।”

“কেন পারব না হুম? মেয়েটা কি তোর বোন?”

“না।”

“তাহলে কি গার্লফ্রেন্ড?”

“না।”

“মনে মনে ওকে পছন্দ করিস?”

“একদম না।”

“তাহলে সমস্যা কী তোর? সামনে থেকে সর।”

রঞ্জক সোজা হয়ে দাঁড়াল। তুষারের চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত শান্ত ও ঠান্ডা গলায় বলল, 

“ও আমার বউ।”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply