Golpo romantic golpo আসবো ফিরে আবারো

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪৩(প্রথমাংশ+শেষাংশ)


#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৪৩ [ প্রথমাংশ ]

#সুরভী_আক্তার

মেঘা নিশ্চুপ । চোয়াল খিচে মুখ ফিরিয়ে নিলো । রৌদ্র ছাড়লো ওর হাত । সুডৌল কাঁধে লুটানো কেশ রাশীর এক গাছি টেনে নাকের কাছটায় চেপে ধরলো । দীর্ঘ শ্বাসে মাদকিয় ঘ্রাণ টেনে নিলো অন্তরালে । 

কেমন করে তাকালো মেঘার দিকে । বললো হাস্কি টোনে….

” তোর সামান্য চুলের ঘ্রাণেই সব উৎকণ্ঠা শিথিল হয় আমার , কলিজা ঠান্ডা হয়ে যায় , না জানি তোকে পেলে আরো কি হবে ! মরে না যাই সেদিন…..

” রৌদ্র …

রমনীর ভয়ার্ত বিচলিত স্বর । উত্তর তৎক্ষণাৎ…

” ইয়েস সুইটহার্ট ! তোর মুখে নিজের নাম শোনাটা তো আরো বেশি পীড়াদায়ক । ভয়ংকর সুখানুভূতি পূর্ণ যন্ত্রনা আছে এতে । এ কেমন তৃপ্তি বলতো , যেখানে তৃপ্ত হয়েও যন্ত্রণা পায় এ হৃদয় ! এ বোধহয় জাদুকরী যন্ত্রণা , যা এই বেপরোয়া ছন্নছাড়া মনটা পেতে মরিয়া । 

মেঘা নিজেকে ধাতস্থ করে । একটু সরে দাঁড়ায় । চোখ কাঁপে তিরতির করে । দৃষ্টি ছলকায় । তবুও চাহনি ফেরানোর দিশা পায় না । রৌদ্র চেয়ে থেকে আবার বলে….

” আমাকে নিঃশেষ করার হাতিয়ার তুই , আবার অনিঃশেষ করার হাতিয়ার ও সেই তুই । অক্ষয় করেই রাখ সানি , ক্ষয় হতে চাইনা সহজে । 

মেঘা পূনরায় মুখ ফিরিয়ে নেয় । 

লোকটার দিকে তাকানো যাবে না । তাকালেই অনর্থ । রৌদ্র আর দাঁড়ালো না । রমনীর উপেক্ষা তার সহ্য ক্ষমতার বাইরে । ও এই মেয়ের থেকে দূরে থাকতে পারবে , যেভাবে পাঁচ বছর ছিলো সেভাবে । তবুও ওর উপেক্ষা মানতে পারবে না । 

★

সেভাবেই দিন কাটছে । মেঘা নির্বিকার নিস্তেজ । আর রৌদ্র সেই বেপরোয়া হয়েই । বেপরোয়া হলেও সময় করে একবিংশী কে জ্বালাতে ভোলে না । রমনী তাকে এড়িয়ে চলে । আর সেই এড়িয়ে চলা প্রতিটা ধাপকে অনুসরণ করে আরো কাছাকাছি যাওয়ার পাঁয়তারা করে রৌদ্র । মাঝে মাঝে ভাবে , এই মেয়ে এতো ত্যাড়া ক্যান ? কিছুতেই বোঝার চেষ্টা করে না তাকে । 

ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একে একে সিগারেট ফুকছে সে । সন্ধ্যার আঁধার নামছে চারিদিকে । ধরিত্রী তিমিরে ডুবেছে । শীতের কবলে আশপাশ আবছা । বোঝার জোঁ নেই কয়েক হাত দূরের দৃশ্য । বেশ ঠান্ডা নেমেছে এ বছর ।

যেনো ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ন্যায় শীত পড়ছে । তবে রৌদ্রের ভাবান্তর নেই । একটুও শীতাতপ অনুভব হচ্ছে না তার । এই যে ঘন্টা খানেক আগে বাড়ি ফিরেছে । মিনিট বিশেক ধরে লম্বা শাওয়ার নিয়েছে । ঘরে ছিলো কিছুক্ষণ । অতঃপর দীর্ঘ পঁচিশ মিনিট যাবৎ এই ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুকছে একে একে । দুটো প্যাকেট অলরেডি শেষ । অর্ধেক করে ফুকছে , বাকি অর্ধেক টা পিষে ফেলছে পায়ের নিচে । গায়ে কিছু নেই । উদ্যম শরীরে কেবলই একটা ট্রাউজার । আর গলায় টাওয়েল । 

শূন্যে তাকিয়ে এক ধ্যানে মগ্ন সে । 

ধ্যান ভাঙলো পুরুষালি ডাকে….

” রুডি ,,, এই ঠান্ডায় ছাদে একলা দাঁড়িয়ে কি করছিস ? 

সচকিতে ঘাড় ঘোরালো যুবক । সায়ান ? এই অসময়ে ? সাথে আরো একজন আছে । রৌদ্র চেনে । শুভ্র আর সায়ানের ফ্রেন্ড #অর্ক । দেশে থাকে না । 

শুভ্রর বিয়েতে আসতে পারে নি । এখন হয়তো দেশে ফিরে দেখা করতে এসেছে । রৌদ্র দুজনকেই দেখলো । নাক মুখ দিয়ে কালো ধোঁয়া বের করে গা ছাড়া ভাবে বললো….

” সিগারেট খাচ্ছি ব্রো । 

” শরীরে কিছু নেই , ঠান্ডা লাগছে না ? 

” উঁহু , স্টিল গরম লাগছে । তা তুমি , হঠাৎ , কখন এলে ? 

” এইতো আধা ঘন্টা হবে । 

” ছাদে কেনো ? সিগারেট খাবে ? দেবো একটা ? 

সায়ান একটু খানি হাসলো । ছাদে এসেছে মূলত এই সিগারেটের জন্যই ? অর্ক খায় । ওকে নিয়ে ছাদে উঠেছে তাই । তবে সে খায় না । ছুঁয়েও দেখে না । দূরে থাকে শত হাত । কারন টা তার কিউটিপাই । সে যে সহ্য করতে পারে না সিগারেটের ধোঁয়া । তার জন্য যা ক্ষতিকর , তা কি করে বরদাস্ত করবে সায়ান ? 

সে হেসে বলে…

” আমার জন্য সিগারেট নিষিদ্ধ , ব্রো ? যা অনুমোদিত , তার জন্য নিষিদ্ধ জিনিস ছোঁয়ার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই আমার । আর এমনিতেও সিগারেট হারাম । যে হালাল ওষ্ঠাধরে আমার স্ত্রীর অধিকার, সেই হালাল অধরে হারাম জিনিস ছুঁইয়ে তিক্ততা বাড়াই কি করে বল ? সে যে তিক্ততা বিদ্বেষী । 

রৌদ্র শুনে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে । সে জানে কিছু মিছু । শুধু সে নয় , এ বাড়ির মোটামুটি সবাই জানে । সায়ান শাফাহ্ কে পছন্দ করে । পছন্দের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে । এখন এটাকে পছন্দ করা বলা চলে না । 

শাফাহ্ একটু এলোমেলো । তার বোধশক্তি কম । কিছুটা ছেলেমানুষী করে । বাচ্চা স্বাভাবের । ও যেমন , তেমনটাই থাকবে । ওর স্বভাবটা অপরিবর্তনীয় । বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে মেন্টাল হেলথ গ্রোথ হয় নি যথাযথ । 

ওর সাথে মানিয়ে নেওয়া টা খুব সহজ , আবার ওকে মানানো টাও এক পর্যায়ে খুব কঠিন । সায়ান পারে ওকে মানাতে । মানিয়ে নিতেও তৎপর সে । 

তবে একটু সময় দিতে চায় । পরিবার থেকে বাঁধা নেই । সায়ান চাইলেই যখন তখন ওকে নিজের করে ঘরে তুলতে পারে । 

রৌদ্র হেসে বললো….

” এতো ধৈর্য রাখো কি করে ? বিয়ে করে নাও ব্রো , বিয়ের থেকে উত্তম কিছু আর হয় না । 

” আচ্ছা , তুই তো ধৈর্যবান যুবক । বিয়ে করে রাজ্য জয় করে ফেলেছিস পুরো ! 

” রাণী হীনা রাজ্য জয় করে লাভ নেই ভাইয়া । আমার রাজ্য নয় , রাণীকে লাগবে ‌। 

” অবশেষে রাণীর কথা মনে পড়েছে তাহলে ? 

” ভুলিনি কখনো । আলাদা করে মনে পড়ার প্রশ্নই ওঠে না । তার বিচরণে উত্তাল আমি । সে ছিলো আমার হৃদকোঠরে । আর এখনো আছে । 

সায়ান ঘাড় উঁচায় । অন্যপাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছে অর্ক । ও সেদিকে এক পলক তাকালো । ফের রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে আগ্রহী হয়ে জানতে চাইলো….

” তাই ? হৃদকোঠরে মেঘা ছিলো বুঝি ? 

” হু , আজীবন থাকবে । 

” মেয়েটার জীবনটা তোর জন্য পাল্টে গেছে রুডি । অনাথ ছিলো মেয়েটা । ওর সাথে এমনটা না করলেও পারতি । 

” কি করেছি ? কিছুই করিনি । ছুঁই নি এখনো অবধি । 

” তা বলছি না । নেশার ঘোরে জোর করে বিয়ে করলি ওকে , এটা কি ভালো করেছিস বল ? 

রৌদ্র শব্দ করে হেসে উঠলো । আধ খাওয়া সিগারেট টা ছাদের মেঝেতে ফেললো । মাছি তাড়ানোর মতো করে হাত নাড়লো মুখের সামনে । মাথা ঝাঁকিয়ে বললো কিছুটা বিড়বিড়ে নোয়ানো স্বরে….

” ইউ আর এবসোলিউটলি রং ব্রো , নেশার ঘোরে নয় । প্রেমের ঘোরে বিয়ে করেছি আমি ওকে । মারাত্মক প্রেমের ঘোরে । ইডিয়ট একেবারে প্রেমের মায়াজালে জড়িয়েছে আমায় । আমি কি করতাম ? রিটার্ন হিসেবে তাইতো আমিও ওকে জড়িয়ে নিলাম আমার জালে । 

সায়ান পরিষ্কার শুনলো না । 

” কি বললি , বুঝিনি । 

” নাথিং । আমি বরং একটা সাজেশন দেই তোমায় , বিজনেস ছেড়ে ক্যাটবেরির একটা ফ্যাক্টরি খুলে ফেলতে পারো । তুমি যাকে চাও , সে চকলেট বলতেই অজ্ঞান ।  টাকা কড়ি যা কামাবে , ওর চকলেটের পিছেই শেষ হবে সব । 

সায়ান হেসে ফেলে । 

” হলে হবে , ওর জন্যই তো কামাচ্ছি । 

সিগারেট খাওয়া শেষে ছাদ থেকে একসাথে নেমেছে ওরা ।

★

শিশির আর ইকরা’র বিয়ের বাকি নেই বেশিদিন । হাতে গোটা দিন দশেক আছে । সময়ের চর্কায় দিন কাটছে আপন গতিতে । আজ দুপুরের দিকে মেয়েটা এসেছে কাবির ম্যানসনে । আসার কথা ছিলো আরো আগে । আসবে আসবে করেও আসা হচ্ছিলো না । যেহেতু হাতে সময় নেই , তাই ইনভাইট করতে চলে এসেছে আজ । 

দুপুর আড়াইটার দিকে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল । আসতে আসতে তিনটে বেজে গেছে । শুভ্রর বউ’ভাতে প্রথম আসা হয়েছিলো এ বাড়িতে । সবার সাথে পরিচয় আছে টুকটাক । আজ আবার পরিচিত হলো । ড্রইং রুমে সবার সাথে টুকটাক কুশল বিনিময় করে শাফাহ্ আর মেঘার সাথে ওদের ঘরে উঠেছে সে । কফি পাঠিয়েছেন শাহিনা কাবির । ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ওরা তিনজন । পাঠানো কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে এতক্ষণে । 

শিশিরের দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে আছে দুই রমনী । তবুও কিংকর্তব্য বিমূঢ় নীরব সেই মেয়ে । দুজনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতেও কোনো ভাবাবেগ নেই ‌। যেনো সবটা নরমাল । মেঘা ওকে স্বাভাবিক দেখে শক্ত কন্ঠে বলে….

” কি রে , কিছু বলছিস না যে ? চুপ করে আছিস কেনো ? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর ? 

শিশির নিরুদ্বেগ । ধীরে হাঁফ ছেড়ে বললো…

” মাথা ঠিক আছে একদম । আর কি বলবো ? 

” কি জন্য এসেছিস এখানে ? 

” বিয়ের দাওয়াত দিতে । কেনো , আসা বারন আমার ? 

” শিশির , তুই সবটা মেনে নিচ্ছিস কি করে ? 

প্রত্যুত্তরে শ্যামলিনী কন্যা বোঝানোর মতো করে বলে….

” বলি শোন , উত্তর দে তো ,, ভাগ্যের লিখন খন্ডানো যায় কখনো ? আমার ভাগ্য তো তোদের মতো সোনায় মোড়ানো নয় মেঘা । সোনা না হোক , যা আছে এই ভাগ্যে , তাই সই ।

মেঘা দুদিকে মাথা নাড়ায় । অবাকের ভঙ্গিতে বলে…

” তাই বলে ঐ বখাটে ছেলেটাকে বিয়ে করবি ? সবটা জেনে ? তোর বাড়িতেও জানাস নি ? খোঁজ নেয় নি তারা ?

” নাহ্ ,, জানালে আমার আপুর সুখ বিসর্জন দিতে হবে । জানাবো না । 

” তোর আপুর সুখ রক্ষা করতে গিয়ে নিজের সুখ বিসর্জন দিবি তুই ? 

” কে বললো আমি আমার সুখ বিসর্জন দেবো ? তোরা জানিস আমি সুখি হবো কি–না ? যদি সুখি হই , তখন ? 

” ঐ ছেলেটার সাথে সুখে থাকার স্বপ্ন দেখিস তুই ? 

” স্বপ্ন দেখতে তো ক্ষতি নেই । পূরন হওয়া না হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার । আমি আমার ভাগ্যকে বিশ্বাস করি । যিনি আমার ভাগ্য লিখেছেন , তিনি নিশ্চয়ই আমার সহ্য ক্ষমতা টাকে নির্ধারণ করে তবেই লিখেছেন আমার ভাগ্য । আমার ভাগ্যে ততটুকুই সুখ দুঃখ থাকবে , যতটুকু থাকার কথা । যা হবার তা হবে মেঘা , চিন্তা করিস না তো । দেখ , আমি চিন্তা করছি ? চিল বেবি… বিয়ে আমার । তোদের ফ্রেন্ডের বিয়ে । দাওয়াত করতে আসলাম তোদের , আর তোরা কিনা মুখ কালো করে বসে আছিস এভাবে ? যাবি না আমার বিয়েতে ? বাড়তি কোনো ফাংশন হবে না , শুধু বিয়ের একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান হবে আমাদের সামর্থ্য মতো । তোদের সবাই আসা চাই । 

মেঘা তাজ্জব বনে । কি দিয়ে তৈরি এই মেয়ে ? এতোটা শক্ত দেখায় কি করে নিজেকে ? সেদিনের ঐ ঘটনাটা বেমালুম চেপে গেছে নিজের পরিবারের কাছে । 

নিজের চিন্তা করছে না একবারও । 

রৌদ্র ও বেপরোয়া , মেঘার সাথে তুই তুকারি করে । কিন্তু কই , ঐ ছেলেটার মতো উশৃঙ্খল নয় সে ! 

দেরি হয়ে যাচ্ছে । তাড়াহুড়ো করে মেঘা আর শাফাহ্ কে নিয়ে ওদের ঘর থেকে বেরোলো শিশির । চলে যাবে এখন । নিচে নামলো । রুবিনা কাবির আর শাহিনা কাবির ড্রইং রুমে ছিলেন । শিশির মুচকি হেসে তাদের দিকে এগোয় । স্বভাব সুলভ শান্ত কন্ঠে বলে….

” আন্টি , আসি আজ ? সবাই আসবেন কিন্তু আমার বিয়েতে । আমি অপেক্ষা করবো সবার জন্য । আমাদের কেউ নেই আন্টি , আপনারা আসলে খুব খুশি হবো । দোয়া করবেন আমার জন্য । 

রুবিনা কাবির এক গাল হাসলেন । হাস্যোজ্জ্বল মুখে এগিয়ে মেয়েটার মুখে আদুরে হাত বোলালেন । ঠান্ডা স্বরে বললেন….

” তুমি খুব মিষ্টি একটা মেয়ে, মা । দেখো , অনেক সুখি হবে তুমি । অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইলো নতুন জীবনের জন্য । আর তোমার বিয়েতে যাবো অবশ্যই । 

শিশির হাসে এক চিলতে । 

আদ্র করিডোর থেকে সবটা দেখেছে । শিশিরের এ বাড়িতে আসার খবর শুনেছে একটু আগে বাড়ি ফেরার পর । তখন থেকেই উদগ্রীব আরো বেশি । 

এই মেয়ে চলে যাবে এক্ষুনি । আদ্র তড়িঘড়ি করে নিজের ঘরে ঢুকলো । চাবি আর ব্লেজার নিয়ে বেরোলো ঝটপট । ততক্ষণে শিশির সদর পেরিয়ে বাইরে বেরিয়েছে মেঘা আর শাফাহ্ কে সাথে নিয়ে । বাড়ি থেকে একটু হেঁটে যেতে হবে মেইন রোড পর্যন্ত । তার পর রিকশার দেখা মিলবে । সদর পেরিয়ে বাইরে দাঁড়ালো ওরা । গেইটের বাইরে বেরোবে না দুই রমনী । 

শিশির কে বিদায় দিতে গিয়ে আদ্র কে চোখে পড়লো । ছটফট করে সদর পেরিয়ে বেরোচ্ছে সে । বাইরে যাবে বোধহয় । এই সুযোগে শিশির কে সাথে নিয়ে গেলে মন্দ হয় না । এই চিন্তা আসা মাত্রই বিদ্যুতের গতিতে ডাকলো শাফাহ্….

” শিশির দাঁড়া …

একটু থেমে আদ্র কে ডাকে…..

” ভাইয়া , বাইরে যাচ্ছো ? শিশির কে নিয়ে যাও না প্লিজ । মোড়ের মাথায় নামিয়ে দিলেই হবে । এতোটা পথ হেঁটে যাবে মেয়েটা ? 

আদ্র যেনো এটারই অপেক্ষায় ছিলো । বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো সে । ঠোঁটের কোণে দেখা মিললো এক চিলতে বাঁকা হাসি । শিশির বাঁধা দেবে জানা আছে । তার আগেই কাউকে বুঝতে না দিয়ে আদ্র চটপট বলে….

” ওকে….

তোরা ভেতরে যা । 

খুশিতে চিকচিক করে ওঠে শাফাহ্ । মেঘা আর ও ভেতরে ঢুকে যায় । 

আদ্র শিশিরের দিকে তাকায় নি । পার্কিং লটের দিকে ঢুকেছে সে । তাড়াহুড়ো করে বাইক বের করলো । ততক্ষণে রমনী গেইট পেরিয়ে গেছে । 

হাঁটা ধরেছে আপন খেয়ালে । আদ্র বাইক স্টার্ট করে ছুটিয়ে নিয়ে যায় । ইচ্ছে করেই গাড়ি বের করে নি । বাইক থামালো শিশিরের পাশে, হেলমেটের কাচ তুলে এবার তাকালো মেয়েটার দিকে । ভারী গলায় এক প্রকার আদেশ করলো….

” ওঠো । 

শিশির বাইক দেখে বলতে নেয় সবে….

” স্যার….

” শাট আপ বেয়াদব , মুখে মুখে তর্ক করবে না । উঠে বসতে বলেছি ওঠো । 

ধমকে রমনী আনচান করে । আদ্র কথাই শুরু করতে দিলো না ওকে । কিভাবে ও আদ্রের কাছাকাছি এভাবে বাইকে বসতে পারে ? গাড়ি হলে তবুও চলতো ‌। 

আদ্র ওর অস্বস্তি বুঝলো । কয়েক পলক চেয়ে থেকে তাকালো রমনীর কাঁধের ব্যাগের দিকে । সেটাকে ইশারা করে বললো…

” ব্যাগটা দাও দেখি…

” সরি ? 

” ব্যাগ দাও বেয়াদব । তোমার ব্যাগ । কানে খাটো ? কথা শোনো না তুমি ? 

মেয়েটা চমকায় । নিজের ব্যাগ ওনাকে দিতে যাবে কেনো ? উল্টে আরো বেশি ব্যাগ টাকে আঁকড়ে ধরলো সে । আদ্র ওর কারবার দেখে এবার সত্যি সত্যিই বিরক্ত হয় । মুখে চ সূচক শব্দ উচ্চারণ করে এক প্রকার টেনে নেয় মেয়েটার ব্যাগ । ভড়কায় রমনী । আদ্র ব্যাগটা বাইকের সিটে রাখলো নিজের পিছনে । ইশারা করে বললো….

” এবার বসো ,,, 

মেয়েটা কিছুটা অবাক হলেও মানিয়ে নেয় । দ্বিরুক্তি করে না আর । মাঝামাঝি ব্যাগের প্রাচির । তবুও আলগোছে অনেকটা পিছিয়ে কোনো রকমে উঠে বসলো বাইকে । ঢের দূরত্ব দুজনার মাঝে । শিশির কোনো রকমে বাইক ধরে চেপে বসার চেষ্টা করলো ‌। স্বস্তি পেলো না । দম খিচে তবুও মানিয়ে নিলো । কোনো রকমে মেইন রোডে গিয়ে নেমে পড়তে পারলেই বাঁচে । 

আদ্র মিররে দৃষ্টি রেখে আলতো চোখে পরখ করলো ওকে । ধীরে স্টার্ট করলো বাইক । 

মোড়ের মাথা পেরোতে না পেরোতেই শিশির দম ফেলে বলে….

” স্যার,, আমাকে এখানে নামিয়ে দিন । এরপর যেতে পারবো আমি । 

আদ্র কেবলই শুনলো । এক কান দিয়ে শুনে বের করে দিলো আরেক কান দিয়ে । মোটরবাইকের গতি বাড়ালো তড়তড় করে । গতি বাড়তেই দমকা হাওয়া লাগলো এই ঠান্ডায় । শিশির তিরতির করে কেঁপে ওঠে আকস্মিক হাওয়ার ঝাপটায় । 

আদ্রকে ফুল স্পিডে কাঙ্ক্ষিত পথের বিপরীতে মোড় ঘোরাতে দেখে ছলকে ওঠে রমনীর কোমল বক্ষস্থল । তৎক্ষণাৎ চোখ জোড়া বৃহৎ করে ফেলে সে । এক হাতে বাইক চেপে ধরে, অন্যহাতে খামচে ধরে নিজের ব্যাগটা । ভড়কে যায় সে ‌। আদ্র পথ ঘোরালো কেনো ? এদিকে তো ওর বাড়ির পথ নয় ! মেয়েটা কেমন অজানা উশখুশ ভয়ে ঢোক গেলে । ভয়ার্ত কন্ঠে উচ্চারণ করে…..

” আ…আদ্র স্যার ,, এদিকে কোথায় যাচ্ছেন ? 

আমি বাড়ি ফিরবো , আমার বাড়ির পথ ভিন্ন । বাইক থামান । আমি নামবো । এখানেই নামিয়ে দিন আমায় ? 

চলবে…….

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৪৩ [ শেষাংশ ]

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )

আদ্র নিরুদ্বেগ । তার কোনো চিত্তবিকার নেই রমনীর কথার পৃষ্ঠে । সে বাইকের গতি বাড়ায় আরো । কোন দিকে ছুটে চলেছে তা সে ব্যাতীত আর কে জানে ?

আদ্রের এমন আচরনে শিশির ভড়কায় আরো বেশি । কেমন ভয় লাগে তার । অযথা সন্দেহ জাগে । যদিও সে ভাবনা মনের বিপরীতে । তবুও ধরা গলা তুঙ্গে তুলে আবার বলে মেয়েটা…

” কি হলো , আমার কথা কানে যাচ্ছে না আপনার ? আমি বাইক থামাতে বলেছি । নামিয়ে দিন আমায় । ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন আমায় নিয়ে ? স্যার , আমি নামবো । প্লিজ নামিয়ে দিন !

” শাট আপ বেয়াদব ,, ঘ্যান ঘ্যান করবে না কানের কাছে । চুপচাপ বসে থাকো…

ফের তপ্ত ঝাড়ি । মেয়েটা চমকায় । কেমন হাত পা শিরশির করে । আতঙ্কে ঝমঝম করে পুরো শরীর ।

আদ্র মিররে দেখলো ওর অস্বাভাবিক ভয় টুকু । দুদিকে মাথা নাড়ালো । কি ভাবছে এই মেয়ে ? উল্টো পাল্টা কিছু নয়তো ?

বারবার বিরক্ত হচ্ছে আদ্র । তবে ঠান্ডা বিরক্তি তার । শিশিরের আতকানো অশান্ত চেহারা দেখে আর বেশিদূর এগোনো হলো না ।

রাস্তার একধারে খোলা আকাশের নিচে জন্মানো এক সুবিশাল শিমুল গাছের নিচে বাইক থামালো রয়ে সয়ে । অমনি প্রাণ ফিরে পায় রমনী । বাইক থামাতেই ব্যাগ হাতে তড়িঘড়ি করে নেমে পড়ে । আদ্র নেমে হেলমেট খোলে মাথা থেকে । এলোমেলো ঝাঁকড়া চুল ঠেলে পিছনের দিকে হটিয়ে দেয় । রেগে তাকিয়ে খানিকটা চিবিয়ে বলে….

” পালাচ্ছি তোমায় নিয়ে ? এভাবে ভয় পাচ্ছো কেনো ?

শিশির পেছায় । চোখ তুলে বলে …

” আমি বাড়ি যাবো । এদিকে তো আমার বাড়ি নয়….

” শশুর বাড়ি তোমার এদিকে , খুব যাওয়ার সখ হয়েছে সেখানে ? শশুর বাড়িতেই নিয়ে যাচ্ছিলাম ! বেয়াদব !

নাক ফুলিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো শিশির । আদ্র শান্ত হলো । সংযত হয়ে বললো….

” এই শোনো , কথা আছে তোমার সাথে । একটু নির্জনতা প্রয়োজন ছিলো । তাই এদিকে এসেছিলাম । কিছু প্রশ্ন করবো , নরমালি উত্তর দেবে । হেরফের করেছো তো থাপ্পর খাবে বলে দিলাম । এই বিয়েতে রাজি হয়েছো কেনো তুমি ?

সোজাসুজি প্রশ্ন । শিশির তব্দা খায়…

প্রশ্ন টা ব্যাক্তিগত ভাবে নিতেই বিব্রত বোধ করে ।

” সরি !!

” রাখো তোমার সরি ! খালি কথায় কথায় সরি বলা অভ্যাস তোমার ? যা বলেছি তার উত্তর দাও । বিয়ে করছো কেনো তুমি ?

” স্যার ,, আমার প্রাইভেট ম্যাটারে ঢুকে পড়ছেন আপনি ।

” আমি জানি এটা পার্সোনাল কোয়েচশন । বাট রিল্যাক্স,, আমার দিকে তাকাও ।

রাইট নাউ , আই এম নট ইউর টিচার । মেঘা আর টুকটুকির ভাইয়া হিসেবেই ধরো । প্রশ্ন গুলোর উত্তর দাও আমায় ! আমি জানতে চাই , কেনো করছো তুমি এই বিয়ে ? যার সাথে তোমার বিয়ে হচ্ছে , তার সম্বন্ধে কতটুকু জানো তুমি ? কি আন্দাজ আছে তোমার ? তুমি ভাবতে পারছো ও কতটা খারাপ ছেলে ? আরে ও একটা স্ক্রাউন্ডেল ‌। পথে ঘাটে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা , নেশা করা , মারপিট করা , মাল খেয়ে টাল হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা স্বভাব ওর ! তুমি নিজ চোখে দেখেছো তো সেদিন , তাহলে কেনো এই সম্পর্কে জড়াচ্ছো তুমি ?

শিশির স্তব্ধ হয় । আয়ানের এমন উদ্ভট প্রসঙ্গ উঠতেই ঝিমিয়ে আসে রমনী । চোখ নামায় আলগোছে । আদ্রের সামনে কেমন লজ্জিত অবস্থার সম্মুখীন হয় সে । কথা ফোঁটে না জবানে ‌। আদ্র উত্তরের অপেক্ষা করলো ‌। না পেয়ে আবারো বিচলিত হয়ে বললো….

” বেয়াদব , কথা বলো ! কিছু জানতে চেয়েছি তোমার থেকে ! সবটা জেনেও কেনো ঐ বাজে ছেলেটাকে বিয়ে করছো তুমি ?

” আমি উত্তর করতে বাধ্য নই, স্যার । এটা আমার পার্সোনাল লাইফ , আমাকেই ভাবতে দিন ।

” বলেছি না মুখে মুখে তর্ক করবে না । উত্তর করো আমার প্রশ্নের । নয়তো ভালো হবে না বলে রাখলাম ।

শিশির তবুও নিশ্চুপ ‌। এখান থেকে কেটে পড়ার পাঁয়তারা করছে মনে মনে । আদ্র চোয়াল শক্ত করলো । আর চুপ থাকতে পারলো না । মোক্ষম কথাটা বেরিয়ে গেলো জিভ ফসকে….

” যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছো , সে একজন রে*পিস্ট । রে*প কেসে মামলা আছে তার নামে । জেল খেটেছে অনেক বার । টাকা দিয়ে ছাড়ানো হয়েছে জেল থেকে । এটা জানো ?

শোনা মাত্রই ছলকে তাকায় শ্যামলিনী কন্যা । ধক্ করে ওঠে বক্ষস্থল । চোখ জোড়া কাঁপে ধিকধিক করে । চোখাচোখি হয় আদ্রের সাথে । মেয়েটার মাথা যেনো চক্কর দিয়ে উঠলো । কেঁপে উঠলো পুরো ধরনী । পায়ের তলার মাটি সরলো ।

চোখ জোড়া ছলছল হতে সময় লাগে না ।

আবার ,, তীব্র অস্বস্তি প্রকাশ হতেও সময় লাগে না । চোখ নামিয়ে নেয় মেয়েটা । চিবুক গলায় মিশিয়ে চোখ বুজে নেয় । ভীষণ জ্বলে দুচোখ । এটাই শোনার বাকি ছিলো বোধহয় । এটাও কি সত্যিই ? সত্যিই হলেও বা আদ্র জানলো কি করে ?

আদ্র ওর অপ্রিতিকর অবস্থা বুঝলো । কন্ঠ নামিয়ে ধীরে বললো….

” আই নো, তোমার এসব শুনতে খারাপ লাগছে । বাট এটা সত্যিই । আমি খোঁজ নিয়েছি ঐ ছেলেটার সম্পর্কে । সবটা জেনেছি । ও ভালো ছেলে নয় , খারাপ বললেও কম হয়ে যাবে । বুঝতে পারছো তুমি ?

আকস্মিক মেয়েটার নাক টানার শব্দ শোনা যায় । আর পারে না রমনী । আর কত চেপে রাখবে নিজেকে ? কত গুমড়ে মরবে ? শেষ ধাক্কায় এসে গুঁড়িয়ে পড়লো । ফুঁপিয়ে উঠলো চিবুক নামিয়ে । কাঁদতেও জড়তা , অথচ চোখ জড়তা মানতে বিমুখ আজ ।

আদ্র ওর ফোপানোর শব্দে ছ্যাত করে ওঠে । ঝুঁকে তাকায় রমনীর মুখ পানে । আজ উদ্বিগ্ন হয়ে প্রথম উচ্চারণ করে রমনীর নাম…

” শিশির ,,, কাঁদছো কেনো ? আমি তোমাকে কষ্ট দিয়ে এসব বলতে চাই নি । না বলেও উপায় ছিলো না….

” আমার ও উপায় নেই স্যার । উনি যেমনই হোক , আমাকে এই বিয়েটা করতেই হবে ।

রমনী চোখ মুছে নেয় । ঠেলে ফেলে সব রুদ্ধতা । হাসার চেষ্টা করে । আদ্র শুধোয়….

” কেনো ? কিসের এতো বাধ্যবাধকতা ? জানতে পারি ?

মেয়েটা বলবে না বলে পন করেছে । কোথাও একটা বলার ইচ্ছেও আছে । আদ্র ওকে চুপ দেখে আবার বলে অত্যন্ত মোলায়েম কন্ঠে….

” বলো শিশির ? কেনো করছো এই বিয়েটা ?

মেয়েটা হাঁফ ছাড়ে । রাস্তার দিকে পিঠ ফিরিয়ে উল্টো দিকে মুখ করে দাঁড়ায় । চোখ বুজে দীর্ঘ শ্বাস টেনে নেয় ভারাক্রান্ত বুকে । কন্ঠ কাঁপছে । কান্না পাচ্ছে ভীষণ । এভাবে গুমড়ে থাকা যায় না আর । মন হালকা হওয়া প্রয়োজন ‌। হয়তো চিৎকার করে কান্না করতে হবে , নয়তো মনের সব কথা উগড়ে দিতে হবে কারোর সামনে । আদ্রকেই পেলো মুখোমুখি । কান্না চেপে ভেজা গলায় বলতে শুরু করে রমনী….

” আমরা খুব সাধারণ , স্যার । সাধারনের থেকেও সাধারণ ‌। এই ধরুন তিন বেলা দুমুঠো খাওয়ার সামর্থ্য আছে কেবল । জানেন , এক সময় আমাদের একটা সুখি পরিবার ছিলো । আব্বু , আম্মু , আপু , আমি আর ভাই মিলে । ভাই তখন খুব ছোট । আমার নয় বছর বয়স । তখন আব্বু মারা যায় রোড এক্সিডেন্টে । আপু আমার থেকে দু বছরের বড় । এ জগতে আমাদের আর কেউ নেই । আব্বু চলে যাওয়ার পর আম্মু দিশেহারা হয়ে পড়েছিল আমাদের নিয়ে । প্রথম বছর আব্বুর রেখে যাওয়া সেভিংস দিয়ে চলেছি টানাপোড়েনে । দ্বিতীয় বছর থেকে শুরু হয় দূর্ভোগ । আমাদের মানুষ করার জন্য আম্মু অন্যের বাড়িতে কাজ করতো । তখন আমার আর ভাইয়ের খেয়াল রাখতো আপু । ঐ ছোট বয়সে রান্না করতো আমাদের জন্য ‌। ভাইকে সামলাতো । পড়াশোনাও করতো ।

বছর দশেকের মাথায় জানতে পারি ভাইয়ের ব্রেন টিউমার । নরমাল ছিলো তখন । টাকার অভাবে চিকিৎসা হয় নি । আর এখন ওর টিউমার থার্ড স্টেজে । ক্যান্সার হয়েছে আমার ভাইয়ের ! আমি ক্লাসে দেরি করে আসার জন্য অযুহাত দেই নি কোনোদিন আপনাকে ! সত্যিই বলেছিলাম । আপনি মিথ্যে ভেবেছিলেন ।

যাই হোক , এখন আসি আমি এই বিয়েটা কেনো করছি ? করছি তো আমার আপুর জন্য । আবিদ ভাইয়া আপুকে খুব ভালোবাসে । আমি তো জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি , কিন্তু আমার আপু ? আপু কিছুই পায় নি জীবনে । সবটা বিসর্জন দিয়ে এসেছে । বিয়ে , নিজের জীবন , সংসার , এসবের চিন্তাও করে নি কখনো । সবসময় আমাদের কথা চিন্তা করে গেছে । দিনশেষে হাড়ভাঙা খাটুনি করেও ক্লান্তি দেখায় নি কখনো । ওর জীবনে কিছু পাওয়ার ছিলো , প্রয়োজন ছিলো কাউকে ! এসেছে আবিদ ভাইয়া । আপু আমাদের ছাড়বে না । তাই ভাইয়া আপুর জন্য নিজের পরিবার ছাড়তেও রাজি । ওনার ছোট ভাইয়ের মতো খারাপ নন উনি । ইনফ্যাক্ট , ওনার ভাইয়ের সাথে আমার বিয়ে হবে , এটাতেও রাগারাগী করেছিলেন । আমাকেও বুঝিয়েছেন ‌।

তাদের পরিবারের শর্ত , তারা আবিদ ভাইয়ার বিনিময়ে আমাকে চায় ‌। ছোট ছেলের বউ করতে চায় আমায় ‌।

আপু এটাতেও রাজি ছিলো না । কিন্তু আমি রাজি । আমার আপুর জন্য । আমি তো পেয়েছি বলুন , বাকিটা জীবন আমার আর কিছু না পেলেও চলবে । এবার আমার আপুর পাওয়ার পালা । ওর একটা সংসার হোক । আমি চাই ও সুখী হোক । তাই করছি এই বিয়েটা….

বলতে গিয়ে পুরোটা সময় গলা কেঁপেছে রমনীর । চোখ ঝড়িয়েছে অশ্রুর ঝর্না ‌। আপন খেয়ালে গাল বেয়ে পানি বয়ে গেছে চোখ ছাপিয়ে । আদ্র ছটফট করতে শুরু করে মেয়েটার ভেজা চোখ দেখে । কেমন চিনচিনে যন্ত্রণা লাগে তার । যন্ত্রনা ধরে রেখেই বলে এক বাক্য…

” আর তোমার সুখ ?

” লাগবে না ! আমি যথেষ্ট সুখ পেয়েছি জীবনে ‌। বাকিটা জীবন না হলেও চলবে…..

থামে একটু । ভেজা গাল মোছে ।

হাসার চেষ্টা করতে গিয়ে হেঁচকি ওঠে গলা চিরে । ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা । নিজের এমন জীবনের প্রতি ক্ষণে ক্ষণে আফসোস হয় তার । ফের গাল ভেঁজে ঝরঝরিয়ে । কান্নারত কন্ঠে বলে….

” আমার আব্বু বেঁচে থাকলে হয়তো আমাদের জীবনটা এমন হতো না, স্যার । এখন আর কিছু করার নেই । আমি আমার আপুকে সুখি দেখতে চাই । আর উনি , উনি বখাটে ? হোক , আপত্তি নেই আমার । বিয়ের পর যদি পরিবর্তন হয় , তাহলে তো ভালো ।

আদ্র রমনীর চোখ জোড়ার পানে থমকায় । মেয়েটার আঁখি দ্বয়ের আর্দ্র কিনারে রক্ত জমাট বেঁধেছে । লালচে হয়ে উঠেছে চোখ জোড়া । দেখেই বোঝা যাচ্ছে , কতটা কষ্ট চেপে জবান খুলেছে । চোখ টই টুম্বুর । বারবার পানি ঝরেও ভরাট হতে সময় লাগছে না । মায়াময় মুখ খানা ফিকে হয়ে এসেছে রমনীর । আদ্রের হাঁসফাঁস লাগে ওর চোখে পানি দেখে । সেদিন রিকশায় ওর চোখের জল দেখেও ঠিক এমনটাই লেগেছিলো । ছটফট করেছিলো অন্তরাত্মা । যেনো খুব কষ্ট হচ্ছে তার । আজও ব্যাতিক্রম নয় । বুক কেমন মুচড়ে আসে । চিনচিনে ব্যথা পায় কোথাও একটা । সহসা চোখ নামিয়ে পেছায় আদ্র । হেলে পড়ে বাইকের সিটে । মাথা নামিয়ে বুকের বাম পাশে হাত উঠিয়ে জোরে জোরে শ্বাস টানে । সচকিতে পিছু ফিরে তাকায় শিশির । আদ্রের এমন বিচলিত হাঁসফাঁস অবস্থা দেখে থতমত খায় ‌। দ্রুত চোখ মুছে এক কদম এগোয়…..

সব ভুলে খানিক উদ্বিগ্ন হয়ে শুধোয়….

” স্যার ,, আর ইউ ওকে ? কি হলো হঠাৎ ? এমন করছেন কেনো ? পানি খাবেন ?

বলতে বলতে উতলা হয়ে নিজের ব্যাগে হাত ঢোকায় রমনী । ওয়াটার বোতল বের করে । অর্ধেক পানি আছে বোতলে । বাকি অর্ধেক ও খেয়েছে । বোতলের মুখোয় মুখ লাগিয়েছিলো । মনে পড়তেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো….

মিনমিন করে বললো….

” আমি তো মুখ লাগিয়ে খেয়েছি !

আদ্র শুনলো । পরোয়া না করে এক নিমিষেই ওর হাত থেকে বোতলটা ঝটকা মেরে ছিনিয়ে নিলো । ছিপি খুলে নিজেও মুখ লাগিয়ে ঢকঢক করে খালি করলো পুরো বোতল । শেষ করে ফাঁকা বোতলটা কেমন আগ্রাসী হয়ে ছুড়ে মারলো পিচ ঢালা রাস্তার একধারে ।

শিশির তাজ্জব বনে । চাহনি বড় বড় করে বিস্মিত হয়ে তাকায় । ভেজা চোখের পাপড়ি । গাল বেয়ে পানি গড়ানোর ছাপ স্পষ্ট । আদ্র উদ্বিগ্ন হয়েই নিবিড় ভাবে দৃষ্টি রাখে রমনীর ভেজা শীতল মুখ পানে । এই ঠান্ডাতেও যুবকের কপালের ধারে ঘাম জমেছে । রাগ দেখিয়ে আঙ্গুল তুলে শাশ্বিয়ে বললো সে….

” এই শোনো ,, এই বিয়ে করবে না তুমি ! কিছুতেই করবে না । আমি হতে দেবো না এই বিয়ে । আমার কাছে তোমার সুখ সবার আগে । যেখানে সুখ নেই সেখানে ঠাই হবে না তোমার । এই বিয়ে তো হবে না । কিছুতেই হবে না….

শিশির এবারে সম্বিতে ফেরে । খানিক আগে প্রকাশ করা দূর্বলতা টুকু ঘুচিয়ে ফেলে তৎক্ষণাৎ ।

মুখ কুঁচকে সুক্ষ্ম করে । বলে….

” কি বলছেন আপনি ? আপনি আমার বিয়ে হতে না দেওয়ার কে ?

আদ্র চোয়াল খিচলো । হাতে হেলমেট তুলে নিয়ে মাথায় পড়ে নিলো । গ্লাস নামিয়ে মুখশ্রী আড়াল করে হিসহিসিয়ে বললো….

” আমি যে কে , সেটা পরে বুঝতে পারবে । বেয়াদব,, সুখ চাও না তুমি ? যা চাওনা , সেটাই তোমার হবে । যা হবে , তা সামলানোর জন্য প্রস্তুত হও এবার । বেয়াদব…

বলেই বাইকে উঠলো । কথা গুলো পরিষ্কার শুনতে পেলো না শিশির । আদ্র বাইকে উঠে গজগজ করে বলে…..

” ওঠো এখন । শশুর বাড়ি না হোক , বাপের বাড়িতেই পৌঁছে দেই । সময় হলে শশুর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব টাও আমার । ওঠো বেয়াদব….

শিশির মুখ ভেংচায় । চোখ মুখ ভালো ভাবে মুছে নেয় ‌। ফাঁক রেখে দ্বিরুক্তি হীন উঠে বসে দ্বিতীয় বার ।

🟥 এরপর থেকে প্রত্যেক টা পর্বেই ধামাকা হবে । প্রত্যেক টা চরিত্রের টুইস্ট শুরু আবারো । দ্রুত রেসপন্স পূর্ণ করবেন । একেক টা পর্বে একেক রেসপন্স কেন 😒 ? সমান ভাবে রেসপন্স পূর্ণ করুন ,, বেয়াদব ! 🟥

#চলবে…………

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply