আদিল মির্জা’স বিলাভড
৬৭.
–
গ্রাউন্ডফ্লোরের এই গেস্টরুমটা শান্তর। ছোটোবেলায় সে এখানেই থাকত। ঘরটা নিজ হাতে গুছিয়ে দিয়েছিলেন গুলনাহার। একমাত্র ছেলের কাছের মানুষগুলোর প্রতি তার মায়ার শেষ ছিল না। সেদিক থেকে শান্তকে অতিমাত্রায় স্নেহ করতেন। কাছে বসিয়ে দুপুরের খাবার বেড়ে খাওয়াতেন! বছরের বিশেষ দিনগুলোতে দুহাত ভরতি শপিং করিয়ে দিতেন। ঘরটা, আজও ঘরটা ঠিক একইরকম আছে। যেভাবে রেখে যাওয়া হয়েছিল! ঝুমুর দাঁড়িয়ে আছে ঘরের মধ্যিখানে। ছোটোবেলায় শুনেছিল, আজই তার প্রথম আসা এই ঘরটিতে! কৌতূহলী চোখ ঘুরিয়ে একেএকে দেখল সবটা। ছুঁলো অনেককিছু! শান্তর বাইকের প্রতি আকর্ষণ ছিল। যেই জন্যে অনেকরকম বাইকের ছোটো মডেল সাজিয়ে রাখা। শান্তর কত কী জিনিসপত্র এখানে! ছোটোবেলার কাপড়চোপড়ও কী যত্নে রাখা আছে! বোঝাই যাচ্ছে, ঘরটা সম্ভবত প্রায়ই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়। সবকিছু চকচক করছে এখনো। ঝুমুর টুকটুক করে ঘরজুড়ে ঘুরতে ঘুরতে একসময় এসে থামল শেল্ফের কাছে। বইয়ের ফাঁকেফাঁকে হঠাৎ চোখে পড়ল একটি ছবি। বেশ পুরোনো! ছবিটা খোলা মাঠে তোলা। শান্ত একটি শুভ্র রঙা ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছুটছে দুরন্ত বেগে। কী সুন্দর প্রাণখোলা হাসি মানুষটার! ঝুমুর আলতো করে আঙুল ছোঁয়াল স্বামীর প্রাণবন্ত মুখখানায়। হাস্যোজ্জ্বল মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকতে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে দিনদুনিয়ার হদিস ছিল না। কখন যে কেউ ঘরে ঢুকেছে, টেরই পায়নি। হুট করে কেউ হাত বাড়িয়ে ছবিটা কেড়ে নিতেই হড়বড়িয়ে ফিরে তাকাল। সুপ্তি নাক কুঁচকে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে –
‘এক বিছানায় ঘুমিয়েও তৃপ্তি মেটে না? এখনো লুকিয়ে লুকিয়ে ছবি দেখা লাগবে!’
ঝুমুরের চামড়া ভীষণ পাতলা! গ্রামের ভীষণ ঘরকুনো মেয়েটি সে! অল্পতেই লজ্জায় নুইয়ে পড়ে দৃষ্টি। এমন কথায় রীতিমতো লজ্জায় কানমুখ লাল করে ফেলল। কিছু না বলে সোজা দুম করে একটা কিল বসিয়ে দিল সুপ্তির হাতে। অস্পষ্ট শব্দ তুলে ব্যথায় ককিয়ে উঠল সুপ্তি। হাতটা ধরে কাইকুই করতে করতে গিয়ে ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ল টানটান হয়ে। সঙ্গে সঙ্গে কেমন সতর্ক হলো ঝুমুর। ছানাবড়া হলো তার চোখজোড়া। হৈহৈ করে উঠল –
‘কীরে কীরে! বিছানায় ল্যাডা মারছিস কেন?’
‘ওমা, এখানে ঘুমাব তাই ল্যাডা মারছি!’
ঝুমুরের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যাওয়ার জোগাড়, ‘কীইইই!’
‘কী নয়, জিইইই! আজ আমি এখানেই ঘুমাব। তোর সাথে, তোর ঠিক পাশে।’
বলতে বলতে বালিশটা বুকে জড়িয়ে উল্টে শুয়ে পড়ল সুপ্তি। উদাস চোখের মণি ঘুরে বেড়াল ঝুমুরের বিবর্ণ মুখ জুড়ে। সাথে একটার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল। তার যে আজকের রাত নিয়ে চিন্তাভাবনা যে ছিল একেবারেই ভিন্ন!
‘ভেবে রেখেছিলাম, ভাবির সাথে আজ সারারাত আড্ডা দেব! কিচ্ছু হলো না!’
সেসব কানে গেল না মেয়েটার। ঝুমুর তখনো আতঙ্কে বাকরুদ্ধ, ‘ত-তুই এখানে শুবি?’
সুপ্তি মনে মনে পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে। ঝুমুরকে নাস্তানাবুদ করতে পারলে কী-ই বা লাগে! মেয়েটা বিয়ের পর একেবারে গোল্লায় গেছে। বর ছাড়া যদি আর কিছু বোঝে! কী ঢং! এতো ভালোবাসা তার সহ্য হয় না। একরাত বরের সাথে থাকতে পারবে না এতে এতো আতঙ্কের কী আছে? আশ্চর্য!
‘হু! কেন? তুই চাস না আমি– তোর এই আদুরে বোন তোর সাথে শোক? বল? কীরে, বল? উত্তর দে!’
ঝুমুর দোটানায় পড়ে গেল। আড়চোখে দুবার তাকাল সুপ্তির গম্ভীর মুখের দিকে। মনের কথাটা কিছুতেই মুখে আনতে পারল না। যদি কষ্ট পায়? বিপাকে পড়ে কোনোরকমে আমতা-আমতা করে মিথ্যে বলল –
‘না না। তা না… থাক না, তোর ইচ্ছে হলে।’
সুপ্তি এবার মহাখুশি গলায় ঘোষণা দিল, ‘যতদিন আছি এখানে, আমরা একসাথেই ঘুমাব।’
ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল ঝুমুরের মুখ। ওই মুখটার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বেশ কষ্টে ঠোঁট টিপে হাসি আটকাল সুপ্তি। দেখছো! বিয়ের পর এই মেয়ে কেমন জামাইয়ের ন্যাওটা হয়ে গেছে? কী ভয়ানক! ঝুমুরের ফ্যাকাসে মুখের ভাব দেখে আরেক দফা হাসি পেলেও সুপ্তি হাসল না। পড়ে রইল হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আড়চোখে দেখল ঝুমুর ফোনে কুটকুট করে মেসেজ লিখেছে। দাঁত দিয়ে জিভ কেঁটে ববিদ্যুৎ বেগে নামল বিছানা থেকে। ছোঁ মেরে কেড়ে নিল ঝুমুরের হাত থেকে ফোন। সাথে সাথে ঝুমুর বানরের মতো লাফিয়েঝাপিয়ে ফোন নেয়ার জন্য তাড়া করল। গলা নামিয়ে অনুনয় করে গেল –
‘ফোন দে। মেসেজ দেখিস না! প্লিজ দেখিস না!’
সুপ্তি শুনলে তো। মেসেজ পড়ার জন্য ফোন নিয়ে বেরিয়ে এল দৌড়ে। ছুটতে ছুটতে দৃষ্টি রাখল ফোন স্ক্রিনে। ঝুমুর লিখেছে, ‘আপনি আজ ভাইয়াদের সাথে থাকুন। রুমে আসবেন না।’
উত্তরে শান্তর সংক্ষিপ্ত টেক্সট, ‘আপনায় মাথায় তুলে আছাড় মারব, জান।’
সুপ্তি খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল তা পড়ে। শান্ত ভাই একটা যাচ্ছেতাই! হনুমান কোথাকার! ঝুমুর তখনো ওর পেছনে দ্রুত দৌড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যের বাড়িতে ওভাবে দৌড়াতে ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। এতো রাতে গলা তুলতেও পারছে। সুপ্তি দৌড়াচ্ছিল ফোন স্ক্রিনে চেয়ে। সামনেটা দেখেনি একমুহূর্তের জন্য। এরমধ্যেই ঘটল অঘটন! দৃষ্টি সামনে ফেলে চোখ তার ছানাবড়া অথচ নিজের দুরন্ত কদম থামাতে ব্যর্থ হলো। ধেয়ে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সামনের শরীরের ওপরে পড়ল! এলেন থতমত খেয়েছে বেশ! দেখল নিজের ফাঁকা হাতটা, যা সুপ্তির কোমর শক্ত করে ধরে রেখেছে! সুপ্তি পরমুহূর্তেই ব্যাঙের মতো লাফিয়ে সরে এল। চোখদুটো ড্রামের সাইজে বড়ো হয়ে আছে। এলেন হাতটা মুঠো করে নিজের প্যান্টের পকেটে ভরে সামান্য কাশল। ঝুমুর এসে পৌঁছেই আগে কেড়ে নিল নিজের ফোন। নিজেকে শান্ত করে তাকাল এলেনের দিকে। শুধাল –
‘আরে ভাইয়া, এতো রাত হলো, ঘুমাননি?’
এলেনের অন্যহাতে একটা কাঁচের বোতল। এটাই সে নিতে এসেছিল। কোনোরকমে তা লোকাল। আড়চোখে সুপ্তির মুখের দিকে একপল চেয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বলে, ‘এইতো ঘুমাতে যাব।’
সুপ্তি তাড়া দিল, ‘যান যান, তাড়াতাড়ি ঘুমান। তাড়াতাড়ি ঘুমানো স্বাস্থ্যের জন্য হানিকারক!’
ঝুমুর কাঁধ দিয়ে বোনকে খুঁচিয়ে চোখ রাঙাল, ‘তাড়াতাড়ি না ঘুমালে হানিকারক!’
সুপ্তি জিভ কেটে তাকাল এলেনের দিকে। চোখে চোখ পড়তেই ফাঁকা হেসে বলে, ‘ওইতো, না বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। এলেন ভাই ইন্টেলিজেন্ট মানুষ। নিশ্চয়ই বুঝে নিয়েছে।’
ঝুমুর দুপাশে মাথা নাড়াল। হনহনিয়ে উল্টোপথে হাঁটা ধরল। সুপ্তি ‘আরে দাঁড়া’ বলে পিছু নিতে চেয়েছিল। এলেনের প্রশ্নে থমকে গেল –
‘আমি নাহয় ইন্টেলিজেন্ট, বুঝে নিয়েছি। বাট হোয়াট অ্যাবাউট ইউ, মিস সুপ্তি শিকদার? আপনি এতো আনইন্টেলিজেন্ট কেন?’
সুপ্তির মুখটা হা হয়ে এল! এলেনের নির্বিকার মুখটা ভালোভাবে দেখে নিশ্চিত হয়ে নিল এই বাক্য আদোও এই পুরুষের মুখ থেকে বেরুল কি-না! পরপরই নাক ফুলাল। মনে মনে দিল দুটো গা লি। আনইন্টালিজেন্ট তোর চৌদ্দগোষ্ঠী রে! দুকদম এগিয়ে গিয়ে মুখ ভেংচি কেটে, ঘুরে হনহনিয়ে হাঁটা ধরল। এলেন দেখছিল, হঠাৎ পিনপতন নীরবতা ভাঙল মেয়েলি কণ্ঠে –
‘এই মহল্লার পোলা আবুল, আবুলের খুব ঠ্যালা…
চান্দাবাজি, ধান্দাবাজি করে আবুল মেলা…
পুলিশখান, জেলখানা যেন পান্তাভাত,
আমার নাম লেইখাছে আবুল পুইড়া তাহার হাত…
ঠোঁটের ফাঁকে ভইরা রাখে ঈগল মার্কা গুল,
পাড়ার লোকে নাম রাখছে তার পাংকু আবুল…
পাড়ার লোকে নাম রাখছে তার পাংকু আবুল।’
থতমত খাওয়া এলেনের হাত থেকে কাঁচের বোতলটা পড়তে পড়তে বাঁচল! হতভম্ব গলায় বিড়বিড় করল সে, ‘শান্তর র ক্ত ত গায়ে!’
–
কনকনে শীতল রাত। গা-ছমছমে নীরবতা শুধু এ ঘর নয়, পুরো প্রাসাদজুড়েই ছড়িয়ে আছে। বিছানার চাদরটা গাঢ় লাল রঙের, সিল্কের মোলায়েম কাপড়। বারান্দার দরজা খোলা থাকায় হিমেল বাতাস ঢুকে দুলিয়ে দিচ্ছে পর্দাগুলো। পিনপতন নীরবতায় পর্দার মৃদু আওয়াজটুকু বেশ শোনা যাচ্ছে। নক্ষত্রে মোড়া আকাশের বুকে জ্বলছে চাঁদখানা। তার রুপালি আলো এসে পড়েছে গোলাকৃতির বিশাল বিছানাটার ওপর। এত বড় বিছানাটার অর্ধেকাংশই ফাঁকা পড়ে আছে। বিছানার এক কোণেতে দুটো উন্মুক্ত শরীর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে শুয়ে আছে সফেদ কম্ফোর্টারের ভেতরে। বরাবরই আদিলের শরীরের উষ্ণতা বেশি। এইজন্যই রোযা গভীর ঘুমেও তার বুক থেকে একচুল নড়তেও নারাজ। শক্ত বুকের সাথে নিজেকে মিশিয়ে বাচ্চাদের মতো ঘুমুচ্ছে। এই ঘুমন্ত মুখ দেখতে দেখতেই চোখ লেগে এসেছিল আদিলের। রোযার নড়চড়ে ছুটে যায় ঘুমটা। কম্ফোর্ট সরে গিয়েছে গায়ের ওপর থেকে একটু। রোযার ফর্সা কাঁধ উন্মুক্ত হয়ে আছে এতে! ওখানে স্পষ্ট দাগ বসে আছে তার আঙুলের। আদিলের আঙুলগুলো দাগের ওপরে থাকল কিছুক্ষণ! শীতে চামড়া কাটা দিয়ে উঠেছে। দ্রুত কম্ফোর্টার তুলে দিল, ঢেকে দিল রোযাকে মাথা পর্যন্ত। আরেকটু গাঢ়ভাবে বুকে মিশিয়ে নিল নিজের সাথে। বড় বড় চুলগুলো মুখের সামনে এসে পড়েছে। এতে বিরক্ত হচ্ছে, তবে সরাচ্ছে না। আদিল আলতোভাবে চুলগুলো মুখের সামনে থেকে সরিয়ে দিল। সরাতে নিয়ে র ক্তিম গালটা ছুঁলো পাশাপাশি। রোযা আগে নাকফুল পরতো না। ইদানিং পরে, ডায়মন্ডের। এতো সুন্দর দেখায়! আদিল মুখটা এগিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল গালে, এরপর নাকফুল পরা নাকের পাটায়! এতে বুঝি বেশ বিরক্ত হলো রোযা। ঘুমের ঘোরেই গোঙাল সে। নড়ল তার দুচোখের পাপড়ি। স্বপ্ন দেখছে বোধহয়! ঘুমন্ত কণ্ঠে বেরুনো কথাগুলো অস্পষ্ট আর কেমন ভাসাভাসা হয়ে এল –
‘আপনি আমার কোনো কথা শোনেন না! কেন? আমি যা বলব, শুনবেন। ঘুমাবেন! আপনার ঘুমের, খাওয়াদাওয়ার কোনো ঠিকঠাকানা নেই। আই হেইট দ্যাট। এখন থেকে ভোর করে আপনার বেরুনো নিষেধ। সকালে নাস্তা সেরে তবেই কাজে যাবেন। তার আগে সব কাজ বসিয়ে রাখবেন।’
আদিল মাথাটা নুইয়ে একেবারে রোযার মুখের কাছে রেখেছিল। চোখ বুজে, নিশ্বাস আটকে… কান পেতে শুনছিল। মনে হচ্ছিল শ্রুতিমধুর কিছু শুনছে সে। যা সারাজীবন শুনে যেতে পারবে। এবং চায়ও। সারাজীবনের জন্য। ঘুমের ঘোরে বলতে বলতে রোযা দুহাতে আদিলের কোমর জড়িয়ে ধরেছে আরও শক্ত করে। প্রতুত্তরে আদিল যত্নের সাথে বুকে মিশে থাকা মাথায় হাত রেখে ফিসফিস করে বলে –
‘মাঝেমধ্যে আর্জেন্ট সিচুয়েশন তৈরি হয়। তখন ত যেতে হয়, কী করব?’
রোযার উত্তর এল সময় নিয়ে। অস্পষ্ট ভাবে, ‘আপনার কাজ গুরুত্বপূর্ণ নাকি আমি, হুমমম?
আদিলের হাসিটুকি গাঢ় হয়। আওড়ায় সে, ‘তবে বলুন, ডানে যাব নাকি বায়ে? আপনি চাইলে সোজাও যেতে পারি।’
রোযা ঘোরে মিটিমিটি হাসছে। জবাব এল না এবারে আর। পিনপতন নীরবতা বয়ে গেল সবটা জুড়ে। সময় নিল আদিল। রোযার মাথাটা নিজের বুক থেকে সরিয়ে নরম বালিশে রেখে বিছানা থেকে নেমে এল। কোনোরকমে একটা টি-শার্ট জড়িয়ে ফোনটা তুলে নিল হাতে। ম্যানেজারের নম্বরে কল লাগাতে লাগাতে বেরুল ঘর ছেড়ে। জরুরি আলাপ করতে করতে এল দোতলায়। পৌঁছাল হৃদির রুমের সামনে। সজাগ ছিলেন মরিয়ম বেগম। হৃদি পুতুল জড়িয়ে ঘুমুচ্ছে। কথা শেষ করে ঘুমন্ত মেয়েকে কোলে তুলে নিল আদিল। বরাবরই বাচ্চাটার ঘুম পাতলা। দুলতে দুলতে, নিভুনিভু একচোখ মেলে চাইল বাবার মুখে্র দিকে। দুহাতে গলা জড়িয়ে চোখের পলকে বাবার গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে কাঁধে ঘুমিয়ে পড়ল। মেয়ের কান্ডে হাসে আদিলের ধূসর চোখজোড়া। একটা হাত ব্যস্ত পিঠ বুলিয়ে ঘুম পাড়াতে। সেভাবেই উঠে এল তিনতলায়। ঘরে পৌঁছে বিছানায় শুইয়ে দিল হৃদিকে, ঠিক রোযার পাশে। ছোটো শরীরের অস্তিত্ব বুঝে স্বভাবতই ঘুমন্ত রোযা হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিয়েছে মেয়েকে। আদিল দেখল তার মেয়ে কেমন রোযার বুকে বিড়ালছানার মতন মিশে গিয়েছে! পরপর নিজেও শুয়ে পড়ল মেয়ের পাশে। দুটো শরীরই ডানহাতে নিজের সাথে জড়িয়ে রাখল। বুঝল চোখজোড়া! চাঁদের আলো এসে পড়ছিল তাদের ওপরে…
–
বেশ কয়েকটি দিন শিকদার বাড়ির সকলে ছিলেন ম্যানশনে। এরপর উঠেছেন শান্তর ফ্ল্যাটে। সেখানেও কদিন থেকে তবেই গ্রামে ফিরবেন। সবকিছু ফেলে এখানে আর কতদিনই বা থাকা সম্ভব? তারা চলে যাওয়াতে হৃদিকে বেশ মন খারাপ করতে দেখা গিয়েছিল। উপায়ন্তর না পেয়ে শান্ত আজ সকালে তাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে গেছে। সেখান থেকে মেয়েটা আবার চলে গেছে নানাবাড়ি। তার নাকি নানা-নানি আর মামাকে ভীষণ মনে পড়ছে। মেয়ে যে সেই গেছে, ফিরে আসার কোনো নামগন্ধই নেই। অগত্যা রোযা তৈরি হয়ে নিচে নেমে এল। মেয়েকে নিজে আনতে যাবে। পাশাপাশি পরিবারের সাথেও দেখা হয়ে যাবে। অনেকদিন হচ্ছে দেখাসাক্ষাৎ নেই। ওই ট্যাবে একটু-আধটু ভিডিওকলে কথা হয় মাত্র! রোযার পরনে সিল্কের অফহোয়াইট রঙের একেবারে সাদামাটা শাড়ি। চুলগুলো খোঁপা করে বাঁধা। তার সঙ্গে আছে নূরজাহান, সাথে যাবে বলে।
ড্রাইভওয়েতে ইতোমধ্যে তিনটি গাড়ি প্রস্তুত দাঁড়িয়ে আছে। এলেন সামনের গাড়িটার সামনে অপেক্ষা করছিল। রোযাকে আসতে দেখে এগিয়ে এসে প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা মেলে ধরল। উঠে বসল রোযা। তার পাশে উঠে বসেছে নূরজাহান। গাড়িগুলো ড্রাইভওয়ে পিষে ছুটে বেরিয়ে এল। তারপর মিলিয়ে গেল সড়কের ব্যস্ততায়। পথটা বেশ খানিকটা দূরের। বাইরেটা দেখতে দেখতে শুধায় রোযা –
‘তোমার বস কোথায়? এখনো অফিসে?’
এলেন ড্রাইভারের পাশের আসনে বসেছিল। তার দৃষ্টি ঘুরছিল চারপাশে। রোযার প্রশ্নে তা স্থির হলো। কিছুক্ষণ ভেবে বলল –
‘জি, ম্যাডাম। কিছু মিটিং আছে।’
রোযার চিন্তা হয়। নিচু স্বরে আওড়ায়, ‘তোমরা দুজনেই তো তার কাছের মানুষ। দুজনকেই পাঠিয়ে দিল! কেন? বাকিরা তো ছিল।’
এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য রোযার জানা আছে। তাই আশা করেনি। কারণ বাকি আর শান্ত-এলেন তো এক নয়। তাদের ক্ষমতা, দায়িত্ব—সবকিছুই আলাদা। আর ঠিক এই কারণেই রোযার চিন্তা হচ্ছে! অনেকটা পথ অতিক্রম করে গাড়ি এসে থামল তালুকদার বাড়ির সামনে। বাড়ির এরূপ দেখে চমকে উঠল রোযা। তাদের সেই সাধাসিধে বাড়ির প্রবেশপথটা আর আগের মতো নেই। উঁচু করে দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে চারপাশে। দরজায় বসানো হয়েছে বিশাল লোহার গেট। গাড়ির শব্দ পেয়ে রাজু ছুটে এসে গেট খুলে ধরেছে। তার পেছনেই হৃদি। তাদের পেছনে শান্ত, ক্লান্ত দাঁড়িয়ে আছে। হৃদি খিলখিল করে হেসে ডাকছে –
‘মম…মম…!’
মামার সাথে সারাবেলা খেলেছে। গায়ে ধুলো লাগিয়েছে। নাকে একটু মাটি লেগে আছে। চুলগুলোর এলোমেলো অবস্থা। দুজনেই এতক্ষণ এখানেই খেলছিল, অপেক্ষা করছিল রোযার জন্য। রোযা প্রবেশ পথ থেকেই দরজা খুলে নেমে এল। রাজু দৌড়ে এগিয়ে এলো ঠিকই, কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়ল না আগের মতো। রোযা মৃদু হাসে এদৃশ্যে! ভাই তার বড়ো হয়ে গেছে! নিজেই এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে নিল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মুছে দিল কপালের ঘামটুকু। অন্যহাতে তেড়ে আসা মেয়েকে জড়িয়ে নিল। আজিজুল সাহেব, নিপা বেগম বেরিয়ে এসেছেন। মেয়ে আর নাতির জন্য ভদ্রমহিলা সকাল থেকে পিঠা বানাচ্ছিলেন। হাত দুটো মুছতে মুছতে ফ্যাচফ্যাচ করে ওঠেন –
‘আমার মা!’
রোযার চোখদুটো জ্বালা করে! নিজেকে সামলে বাচ্চাদের খেলতে পাঠিয়ে মায়ের বুকে মিশে গেল। আজিজুল সাহেব মেয়ের মাথা বুলিয়ে দিলেন –
‘সব ঠিক আছে তো, মা? ভালো আছো তো?’
হেসে ফেলল রোযা। এই প্রশ্নের উত্তরগুলো যে তাকে দেখলেই পাওয়া যায়। তারপরও বাবা-মায়ের মন তো! খচখচানিটা থেকেই যায়। নিপা বেগম মেয়েকে নিয়ে ভেতরে যেতে যেতে বলেন –
‘দুটো দিন না পারলেও, আজ রাতটা এখানে থাক না মা! জামাই যদি রাজি হয়।’
রোযা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারল না। আদিল মির্জার রাজি হওয়ার সম্ভাবনা জিরোর কোঠায়। তবে মাকে নিরাশ করতে ইচ্ছে হলো না তার। অগত্যা বলল, ‘থাকব আজ।’
আজিজুল সাহেব খুশি হলেন। লাফিয়ে উঠল রাজু যে পেছন পেছন চলে এসেছে, ‘সত্যিইই, আপু? থাকবে তুমিই? থাকো না। আজ যেও না।’
হৃদি মামার উচ্ছ্বাস দেখে নিজেও ঘোষণা দিল মায়েরআঁচল টেনে, ‘মাম্মা, লেটস স্টে হেয়ার। ক্যান উই?’
রাজুর দিকে চেয়ে ফের বলে, ‘মামা, উই’ল ডেফিনেটলি স্টে হিয়ার, ডোন্ট ওরি।’
নিপা বেগম নাতির তোতাপাখির মতন বলা ইংরেজি গুলো সচরাচর বোঝেন না। মেয়ের হাত টেনে আস্তে করে জিজ্ঞেস করেন, ‘এইটুকু বাচ্চা, ও এমন ফটরফটর ইংরেজি বলে কেন? বাংলা তো পারে ভালোই।’
রোযা হেসে ফেলল মায়ের প্রশ্নে। মেয়ের চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে মণি ঘোরাল মেয়ের ধূসর চোখে, নাকে মুখে। পুরোই যে আদিল মির্জার একটা ফটোকপি! আদুরে ভঙ্গিতে বলল –
‘বাপের মতন হয়েছে যে! ইংরেজদের বংশধর তারা। ফটরফটর ইংরেজি ঝাড়ে দুজানাই। শুনেছি হৃদির দাদাও এমন ছিলেন। কথায় কথায় ইংরেজি বলতেন।’
হৃদি সেসব কানে তোলে না। সে অদূরে দাঁড়ানো শান্তর দিকে তাকাল। আজ সারাদিন শান্তর সাথে থেকে অনেক কাছের হয়ে গিয়েছে আগের তুলনায়। বডিগার্ড আংকেল থেকে সম্বোধন এসে নেমেছে, চাচ্চুতে। ঠোঁট ফুলিয়ে হৃদি আবদার করে বলে –
‘চাচ্চু, ড্যাডকে কল দাও। আমি কথা বলব।’
শান্ত তখুনি ভিডিওকল লাগাল। সময় নিয়ে রিসিভ হলো সে কল।
–
সূর্য ডুবেছে অনেকক্ষণ। লিভিংরুমে বসে এতক্ষণ বাবা-মায়ের সঙ্গে গল্প করছিল রোযা। সারাদিন টৈটৈ করে খেলাধুলা করে একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়েই তার কোলে এসে ঘুমিয়ে পড়েছি্ল হৃদি। এযাত্রায় ঘুমন্ত মেয়েকে নিয়ে রুমে চলে এল সে। বিছানায় শুইয়ে দিল, ঢেকে দিল গা। এরপর থেকে নিজ ঘরেই পায়চারি করছে। টুকটাক জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল। দেখছিল তার টেবিল খানা। তখুনি হঠাৎই তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকল রাজু। প্রবেশ করেই দরজাটা বন্ধ করে দিল কেম্ন! তার আচরণে লুকোচুরির আভাস। রোযা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই রাজু এগিয়ে এসে তার হাতে ধরিয়ে দিল নিজের ফোনটা। গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলে –
‘আপু, তোমার সঙ্গে জিহাদ ভাইয়া কথা বলতে চান। তার নাকি খুব জরুরি কথা আছে।’
মুহূর্তেই উত্তেজিত হয়ে পড়ল রোযা, ‘তোকে কীভাবে পেল ও?’
‘আমি স্কুল থেকে ফিরছিলাম, তখন! মুখ ঢাকা ছিল।’
রোযার দুই ভ্রুর মাঝখানে ভাঁজ পড়ল, ‘কীভাবে জানল আমি এখানে? ও কোথায়?’
রাজু এত কিছু জানলে তো! সে অসহায় ভঙ্গিতে বলল, ‘জানি না তো। আমাকে মাত্রই কল দিল।’
সন্দেহের কাঁটা বিঁধল রোযার মনে। জিহাদ কীভাবে জানল সে এখানে? তখনই হাতের ফোনটা ফের বেজে উঠল। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে অবশেষে কল রিসিভ করল রোযা। ফোনটা কানে ঠেকাতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল চেনা কণ্ঠস্বর –
‘রোযা!’
সাথে সাথে রোযা কোনো জবাব দিল না। জিহাদ পাগলের মতো ডেকে চলল –
‘রোযা, রোযা, রোযা…।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলল রোযা। একবার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই রাজু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দরজাটাও ভিড়িয়ে দিল। রোযা ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল জানালার সামনে। কুয়াশায় বাইরেটা আচ্ছন্ন প্রায়। চোখে ভাদল জিহাদের মুখ। ওর প্রতি জমে থাকা সমস্ত ক্ষোভ যেন মনের অতল থেকে ধীরে ধীরে মুছে গেছে। হয়তো জিহাদের প্রতারণা এখন আর তার জীবনে তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না। তবে জিহাদ তার বহু বছরের পুরোনো বন্ধু। যে তার বিপদে আপদে ছিল সবসময়! কণ্ঠটা তাই অজান্তেই নরম হয়ে এল।
‘তোকে বলেছিলাম, আমার সঙ্গে আর যোগাযোগ করিস না, জিহাদ! কেন কথা শুনিস না?’
জিহাদের কণ্ঠস্বর আর্তনাদের মতো শোনাল, ‘এত কথা ফোনে বলতে পারব না। আমার সঙ্গে দেখা কর, প্লিজ! আমার অনেক কিছু বলার আছে। তুই অনেক কিছু জানিস না!’
রোযার জবাব স্পষ্ট, ‘অসম্ভব! যা বলার ফোনে বল।’
‘ট্রাস্ট মি, রোযা। ফোনে বলা সম্ভব না। এগুলো তোর জানা উচিত! অনেক অনেক কিছু বলার আছে আমার। একটাবার দেখা কর। একটাবার! প্লিজ! আই রিকোয়েস্ট, আই বেগ ইউ। আগেও তোকে বলতে চেয়েছিলাম, পারিনি! একটাবার শুনেই দেখ!’
কথাগুলো শুনে চিন্তায় পড়ে গেল রোযা। চোখের সামনে ভেসে উঠল দু-দুবারের ঘটনা। দুবারই জিহাদের কিছু বলার ছিল। শুনতে পারেনি সে! কী বলতে পারে? রোযার কণ্ঠ নেমে এল –
‘তুই মরতে চাস?’
ওপাশ থেকে জিহাদের কণ্ঠ আরও ব্যাকুল হয়ে উঠল –
‘তোকে এসব না জানাতে পারলে মরে গিয়েও শান্তি পাব না। বিশ্বাস কর, তোর সবটা জানা দরকার। প্লিজ, রোযা!’
রোযা কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার পক্ষে একা বাড়ি থেকে বেরোনো ভীষণ কঠিন। শান্ত আর এলেন দুজনই এই বাড়িতে আছে। তাদের চোখে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। জিহাদ তখনো অনবরত অনুরোধ করে চলেছে –
‘আমি উত্তর দিকের ওই ভাঙাচোরা, পরিত্যক্ত পুরোনো বাড়িটাতে আছি। প্লিজ, আয়। প্লিজ! একটাবার দেখা কর আমার সঙ্গে।’
রোযা আর কিছু না বলে হঠাৎই কলটা কেটে দিল।
কয়েক মুহূর্তের ব্যবধান। তারপরই একের পর এক কল আসতে শুরু করল জিহাদের। বিপরীতে রোযা সময় নিয়ে অবশেষে লিখল –
‘আসছি!’
–
ট্যাক্সিটা এসে থামল পরিত্যক্ত পুরোনো বাড়িটার সামনে। গলিটাও বেশ নির্জন। কুয়াশা রাতের অন্ধকারকে যেন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চারপাশে পিনপতন নীরবতা। আশপাশে একটা কুকুরেরও দেখা নেই। ড্রাইভার আড়চোখে বারবার দেখছিলেন রোযাকে। এ যাত্রায়ও দুবার তার দিকে তাকিয়ে শেষমেশ কৌতূহল সামলাতে না পেরে নাক গলালেন –
‘ম্যাডাম, আপনার এইহানে কী কাম? আমারে কন দেহি, আমি কইরা দেই।’
রোযা তখন চারদিকে তাকাচ্ছিল। আগে এদিকে দুটো বাড়ি ছিল, মানুষজনও থাকত। এখন সেগুলোও ফাঁকা পড়ে আছে। ফিরে তাকাল ড্রাইভারের দিকে। ভাড়া মিটিয়ে শান্ত স্বরে বলল –
‘ভাই, আপনি এখানে একটু অপেক্ষা করুন। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসব।’
ড্রাইভার ইতস্তত করলেন। আড়চোখে তাকালেন অন্ধকারে ডুবে থাকা বাড়িটার দিকে। তার চোখেমুখেই স্পষ্ট, রোযাকে ওখানে যেতে দিতে চাইছেন না। কিন্তু ততক্ষণে শাড়ির কুঁচিগুলো সামলে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করেছে রোযা। বাড়িটা পুরোনো হলেও একসময় যে রাজকীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয়েছিল, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। বিশাল দরজা, উঁচু ছাদ আর প্রশস্ত সিঁড়িতে অতীতের আভিজাত্যের ছাপ রয়ে গেছে। ভেতর থেকে মৃদু আলো এসে পড়ছে। তাই এগোতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছিল না।
অবশেষে ডাকল –
‘জিহাদ?’
কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো পুরোনো দেয়ালে। ডাকতে ডাকতে দোতলায় উঠে এল রোযা। পুরো তলাটা হলদেটে মৃদু আলোয় আলোকিত। চারপাশ ফাঁকা, কেবল এক পাশে রাখা দুটো চেয়ার। আশপাশে চোখ বুলিয়ে আবারও ডাকল –
‘জিহাদ?’
পরমুহূর্তেই সামনের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল একটি ছায়ামূর্তি। রোযা ফিরে তাকাল। জিহাদ দাঁড়িয়ে আছে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তারই দিকে। ওই দৃষ্টি রোযা চেনে, অসহায় অনুভব করে। এগুতে এগুতে তাড়া দিল –
‘ম রতে না চাইলে দ্রুত বলে ভাগ এখান থেকে!’
জিহাদের মুগ্ধ দৃষ্টি ঘুরে বেড়াল পরিবর্তিত রোযার ওপর। মাথা থেকে পা পর্যন্ত বারবার দেখেও যেন চোখের তৃষ্ণা মিটছে না। কী আভিজাত্যে মুড়িয়ে আছে! আগের থেকে সুন্দর হয়েছে বেশ! বিস্ময়মাখা কণ্ঠে অস্ফুটে বলে উঠল –
‘অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছিস।’
রোযার নির্বিকার জবাব, ‘স্বাভাবিক। নাউ আই অ্যাম ম্যারিড।’
ঢোক গিলল জিহাদ। সঙ্গে সঙ্গে চোয়াল শক্ত হয়ে এল তার। মুহূর্তেই চোখেমুখে ফুটে উঠল চাপা ক্ষোভ।
‘ওই লোকটাকে মেনে নিয়েছিস? কীভাবে পারলি? ওই খারাপ লোকটার সঙ্গে সংসার কীভাবে করতে পারছিস তুই?’
কথাগুলো বলতে বলতেই তেড়ে এল রোযার দিকে। রোযা নড়ল না এতে। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
জিহাদের চোখ দুটো ক্রমশ লাল হয়ে উঠছে। কণ্ঠস্বরও পাল্টে গেল। হিসহিসে স্বরে বলে উঠল –
‘কীভাবে পারলি? ওই লোক তোকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে! ক্ষমতার জোরে অপকর্ম করে তোকে ছিনিয়ে নিছে! ওকে কীভাবে তুই এক্সেপ্ট করলি?’
জিহাদের এসব উল্টাপাল্টা কথা শোনার ধৈর্য রোযার নেই। শীতল কণ্ঠে বলল –
‘তুই আমাকে এসব বলতে ডেকেছিস?’
কথাটা বলেই ঘুরে দাঁড়াল রোযা। আর এক মুহূর্তও এখানে থাকার ইচ্ছে নেই তার। সে চায় না আদিল পর্যন্ত খবর পৌঁছাক। চায় না জিহাদের কোনো ক্ষ তি হোক। কিন্তু চলে যাওয়ার আগেই জিহাদের পরবর্তী কথাগুলো পা দুটোকে মেঝেতে গেঁথে দিল যে –
‘আমি সজ্ঞানে তোকে ছাড়া কখনো কোনো মেয়ের দিকে তাকাইনি। তোর মতো কাউকে পেয়ে আমি কীভাবে অন্য কাউকে দেখতাম বল? আমি তো কল্পনাও করতে পারিনি, তুই ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে কখনো ভাবব!’
কণ্ঠস্বর ক্রমশ ভারী হয়ে উঠল জিহাদের –
‘এই আদিল মির্জা আমার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে। ধ্বংস করেছে আমাকে। ছিনিয়ে নিয়েছে তোকে আমার কাছ থেকে! এই লোক প্ল্যান করে সব করেছে, রোযা। ও একটা ভিলেন।’
রোযা ধীরে ধীরে ফিরে তাকাল। জিহাদ বলে গেল –
‘রিধিমা তখন গ্রামে গিয়েছিল বেড়াতে। দুদিন থাকবে বলেছিল। একদিন ওর কাছে দুজন লোক আসে। চেহারা ঢাকা থাকলেও নিজেদের পরিচয় স্পষ্ট করে জানায়। তারা আদিল মির্জার লোক ছিল! তারা ওকে আমাকে মেরে ফেলার ভয় দেখায়। সেই সঙ্গে কয়েক লাখ টাকার অফারও দেয়। বিনিময়ে ওকে আমার সঙ্গে শুতে হবে। যেভাবেই হোক না কেন!’
একটু থামল জিহাদ। রোযার মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও বলতে শুরু করল –
‘রিধিমাও আমাকে পছন্দ করত। লোভে পড়ে ও রাজি হয়ে যায়। ওই দিন আমি কলিগদের সঙ্গে একটা ভিআইপি রেস্টুরেন্টে বসেছিলাম। হঠাৎ সেই রেস্টুরেন্টের মালিক আর ম্যানেজার আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। তখন বুঝিনি, তারা কেন আমার মতন সাধারণ একজনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে! কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আমার সঙ্গে আড্ডা জমিয়ে ফেলে। দামি মদ আসে, সঙ্গে নানা রকম খাবার। তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার খাতিরে সেদিন অনেক ড্রিংক করে ফেলেছিলাম। একসময় নিজের ওপর আর নিয়ন্ত্রণ ছিল না।’
কথা বলতে বলতে একবার চোখ বন্ধ করল জিহাদ –
‘বাড়িতে তখন বাবা-মা কেউ ছিল না। মাতাল অবস্থায় বাড়ি ফিরে সোজা নিজের ঘরে চলে যাই। আর সেই সুযোগটাই নিয়েছিল রিধিমা।’
জিহাদের বিস্তৃত বর্ণনা শেষে নামল থমথমে, পিনপতন নীরবতা। জিহাদ আকুল দৃষ্টিতে চেয়েইছিল রোযার চোখমুখের দিকে। কিন্তু যেমন প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশা করেছিল তার কিছুই পেল নাম রোযা হতবিহ্বল হয়েছে, ব্যস, এইটুই! এমন প্রতিক্রিয়া যে আশা করেনি জিহাদ। কণ্ঠ কাঁপে জিহাদের –
‘সময় আছে রোযা। কাম উইদ মি! ওই লোক খারাপ, খারাপের সা…’
কথাগুলো শেষ করতে পারল না জিহাদ। অবশেষে নির্বাক পুতুলের মতো মুখ খোলে রোযা। তার নোয়ানো দৃষ্টি তুলে তাকা্য জিহাদের চোখে। ভেসে বেড়াল তার নির্বাক কণ্ঠ –
‘তুই আমাকে চিনিসনি, না? আমিও তো খারাপ। ভালোরা কখনো আদিল মির্জার মতন কাউকে ভালোবাসে না।’
থমকে গেল জিহাদের গোটা দুনিয়া। দুকদম পিছিয়ে গেল ক্রমশ। ভেঙে এল স্বর, ‘এরপরও?’
রোযা লোকাল আঁচলের তলায় নিজের কম্পিত হাত খানা। যেমন নির্বাক তাকে দেখাল ভেতরে ততটাই অগোছালো হয়ে পড়েছে সে। ধড়ফড়িয়ে বেড়ানো হৃৎপিণ্ড সামলে গেল কোনোরকমে। উত্তর না পেয়ে পরমুহূর্তেই তেড়ে এল। হঠাৎ খামচে ধরল রোযার হাতটা। হকচকিয়ে ওঠে রোযা –
‘ওই লোকের সব তুই মেনে নিচ্ছিস! তাহলে আমি কি দোষ করেছি? ওই লোকও ত বিয়ে করেছিল। তার ত বাচ্চা আছে। আমাকে তাহলে কেন মেনে নিস নাই? বল? কেন না? আমি কেন না? আমি কেন না?’
দিকবিদিকশুন্য হওয়া জিহাদের চোখে চেয়ে রোযা ভেতরে অসহায় অনুভব করল। এতবড় একটা ঘটনা জানার পরও সে কীভাবে যেন আওড়াল কেবল, ‘কারণ তুই আদিল মির্জা না!’
জিহাদের চোয়াল ক্রমশ শক্ত হতে থাকল। ক্ষোভে, হিংসায় আর চোখে কিছু দেখতে পেল না বোধহয়। হঠাৎ পাগলের মতো বিলাপ জুড়ল, ‘তুই আমার রোজা।’
ব্যস, রোযাকে আর ভাবার উপায় না দিয়ে উদভ্রান্তের মতো টেনে নিতে চাইল নিজের সাথে। রোযা জোরজবরদস্তি করছিল বলে এযাত্রায় পকেট থেকে একটা সাদা ভেজা রুমাল বের করল। সতর্ক হয় রোযা। মুখ ফিরিয়ে জিহাদের ওপর আক্রমণ করতে চায় তখুনি গু লির শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো বাড়িটা। আর্তনাদ করে দু হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল জিহাদ। গু লি লাগায় গল গল করে র ক্ত পড়ছে হাঁটু থেকে। প্যান্ট ভিজে উঠেছে। রোযা ফিরে তাকাল। যেটাার ভয় পেল, তাই হলো। আদিল মির্জা স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছে অদূরে। পেছনেই শান্ত, এলেন। আদিলের নির্বাক ওই মুখে চেয়ে ক্ষোভে রীতিমতো রোযার দমবন্ধ হয়ে এল। নিজেকে তার পাগল পাগল লাগছে! এতো এতো মিথ্যেচার সে আর নিতে পারছে না। অথচ আদিলের বন্দুক ধরা হাত তখনো নামেনি। পুনরায় গু লি ছুঁড়বে দেখে রোযা শক্ত কণ্ঠে বলে ওঠে –
‘গু লি করবেন না…’
শোনে না! আদিলের দ্বিতীয় গু লি গিয়ে লাগে জিহাদের দ্বিতীয় পায়ে। ও চিৎকার করে শুয়ে পড়ে। কুঁকড়ে আর্তনাদ করে যায়। হতবিহ্বল হয় রোযা। আশা করেনি যে! ছলছল করে ওঠে ওর চোখদুটো। আদিলের নিশানা পাল্টে গিয়ে পড়ে জিহাদের বুকে। রোযা দিশেহারা হয়ে পড়ে। দাঁড়ায় গিয়ে আদিলের বন্দুকের সামনে –
‘গু লি করতে নিষেধ করছি!’
আদিলের প্রাণহীন, থমথমে কণ্ঠ ভেসে বেড়াল, ‘শান্ত! ম্যাডামকে নিয়ে যা।’
‘কোথাও যাচ্ছি না আমি। ওর কিচ্ছু করবেন না!’
জিহাদ দুটো গু লি খেয়েও উঠে বসার চেষ্টা করছিল তখন। এযাত্রায় ডেকে ওঠে, ‘রোজা!’
রোযা ঘুরে তাকাল। জিহাদের এঅবস্থা দেখে চোখে ভাসল ওর বাবা-মায়ের মুখগুলো। জিহাদ একমাত্র সন্তান তাদের। এই ছেলে ব্যতীত দুনিয়াতে তাদের কিচ্ছু নেই। এতদিনে সম্ভবত একটা বাচ্চার বাবাও হয়েছে। স্ত্রী আছে! ও কিছু হলে আন্টি, আংকেলের কি হবে? ওই বাচ্চাটার কি হবে? রোযা ভাবতে পারছে না। অথচ শান্ত এদিকে স্পষ্ট লক্ষ্য করল আদিলের ভয়ানক অবস্থা! অনেককাল বাদে এভাবে আদিলকে ও রাগতে দেখছে। ওই চোখদুটো দেখেই শান্তর ভয়ে গা কাটা দিল। পরপরই দেখল আদিল ঝড়ের বেগে এগুল সামনে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জিহাদের মুখ বরাবর ঘুষি বসাল। দুটো ঘুষিতেই র ক্তে ভেসে গেল জিহাদের মুখ। আদিলের হুংকার পড়ল –
‘উচ্চারণ করবি না এই নাম! ডোন্ট ইউ ডেয়ার!’
রোযা ছুটে গিয়ে আটকাল আদিলের হাত। ডুকরে উঠল প্রায়, ‘ও ম রে যাবে, আদিল। থামুন, দোহাই লাগে।’
আদিল থামল। র ক্ত লাল চোখে তাকা রোযার চোখে। যে চোখে চেয়ে কেঁপে উঠল রোযা অন্তরাত্মা সহ পুরো শরী। হঠাৎ রুক্ষ হাতে টেনে ধরল রোযার হাত। রোযার চোখের দিকে চেয়ে থেকেই অন্যহাতে বন্দুকটা নিশানায় বসাল জিহাদের বুকের দিকে। হিংসায়, ক্ষোভে জ্বলেপুড়ে গেল তার ভেতরটা। রোযার কাঁপল রোযার ঠোঁট, হৃৎপিণ্ড। দুগাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল চোখের জল। জিহাদকে বাঁচানোর জন্য যা এল বলে বসল –
‘গু লি করুন শুধু, আপনি আমার ম রা দেহ দেখবেন…’
রোযা কথাটুকু শেষ করতে পারে না। তার হাত ধরা হাতটা একঝটকায় তার গলা চেপে ধরল। সোজা গিয়ে পিষে ধরল পিলারের সাথে। ব্যথা গোঙাল রোযা। চোখ উল্টিয়ে এল প্রায়। আদিল সিংহের মতন হিসহিসিয়ে গেল –
‘এতো শখ ম রার? এতো….’
দম নিতে পারছিল না রোযা। দুহাতে দুর্বল ভাবে চেপে ধরেছিল আদিলের হাতটা যা তার গলা চেপে ধরেছে। তারপরও জেদি, অশ্রুসিক্ত চোখে চেয়ে থেকে বলে গেল –
‘আপনার মতন একটা সাইকোর থেকে মৃত্যু উত্তম! মে রে ফেলুন আমায়। নাহলে আজকের পর থেকে দেখবেন আমি কীভাবে আপনার থেকে পালাই।’
গলা থেকে আদিলের হাতটা এসে পিষে ধরল রোযার চোয়াল। বাবামায়ের মৃত্যুর পরে সে এতটা উদভ্রান্ত হয়নি। হিংসার দহনে সে চোখে কিছু দেখছে না! জ্বলেপুড়ে আঙ্গার হচ্ছে সব! রোযার রক্তিম চোখে চেয়ে নুইয়ে আনল মাথা। শক্তি প্রয়োগ করল, ব্যথায় গুঙিয়ে উঠল রোযা। আদিলের অন্য হাতটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিল তাকে নিজের শক্ত বুকের সাথে। কণ্ঠ নেমে এসেছে। এতটাই ভয়ানক শোনায় যে রোযার আত্মা পর্যন্ত কেঁপে ওঠে –
‘কী বললে?’
কণ্ঠ আরও নিচু, বরফশীতল হয়ে আসে, ‘সে ইট অ্যাগেইন, রোজ-আ! আরেকবার উচ্চারণ করো, আই’ল লক ইউ আপ!’
রোযার চোখ বুজে আসতে চাইল। ও আওড়াল, কম্পিত হাত বাড়িয়ে ছুঁলো আদিলের বুক। কোনোরকমে আওড়াল মাত্র –
‘ছেড়ে দিন ওকে আদিল। বাঁচতে দিন। ওর পরিবার আছে, ওর একটা বাচ্চা আছে। ও ওর বাবামায়ের একটা মাত্র সন্তান। ওর কিছু হলে পুরো পরিবার ভেঙে যাবে।’
আদিল সাথে সাথে ছেড়ে দিল রোযার চোয়াল। পরমুহূর্তেই চোখ বুজে রোযা ঢলে পড়ল পেছনে। আদিল হাওয়ার বেগে ফের জাপ্টে ধরল পাতলা শরীরটা। চোয়ালে, গলায় পাঁচ আঙুলের এতো বিচ্ছিরি দাগ বসেছে যে কেঁপে উঠল আদিলের হৃৎপিণ্ড। চোখ বুজল সে একমুহূর্তের জন্য!
____________
চলবে –
® নাবিলা ইষ্ক।
Share On:
TAGS: আদিল মির্জা’স বিলাভ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫০
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৪৮
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৬৮
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৪৯
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৪৪
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৮
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৪
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৬০
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৯
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৬৫