Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৪৬


আদিল মির্জা’স বিলাভড

৪৬

লিভিংরুমের সোফার ঠিক মধ্যিখানে দুটো পা ঝুলিয়ে বসে আছে হৃদি। পরনে স্লিপিং পিজি সেট। মরিয়ম বেগম ওপর থেকে নিয়ে নেমেছেন হৃদির পছন্দের কম্ফোর্টার। কম্ফোর্টারটিতে ডিজনিল্যান্ডের ডিজাইন করা হয়েছে। আজ বেশ ঠান্ডা পড়েছে। শাঁ শাঁ বাতাস প্রবেশ করছে বাড়ির প্রধান দরজা দিয়ে। মরিয়ম বেগম বন্ধ করতে চেয়েছেন, হৃদি দিচ্ছে না। বাচ্চাটা নজর রাখছে, তার বাবা-মা এই ফিরবে বলে! মরিয়ম বেগম এসে কম্ফোর্টার দিয়ে ছোটোখাটো শরীরটা ঢেকেঢুকে রাখলেন। হৃদির মনোযোগ তাতে সরেনি। কোলে রাখা একটি ফটো অ্যালবামেই দৃষ্টি অনবদ্য। ভীষণ যত্নের সাথে একেকটি পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখছে। এই অ্যালবামের সব ছবি হৃদির। বাবার সাথে হৃদি, বডিগার্ড আংকেলসদের সাথে হৃদি। ছোটো হৃদি, এখনকার হৃদি… সব বয়সের হৃদি দিয়ে ভরতি। হৃদির ছোটো আঙুলগুলো থমকাল একটি ছবির কাছে। বাবার কোলে ভীষণ ছোট্টো হৃদি। এইটুকুন সে! মাথার তালুতে কয়েকটি চুল দাঁড়িয়ে আছে কেমন! সে চুলটুকুই ব্যান্ডে বাঁধা। কী ফানি লাগছে! হৃদি ফিক করে হেসে ফেলল। তাকাল তার বাবার ছবির দিকে। আদিল মির্জার পরনে সফেদ প্যান্টের সাথে, সফেদ শার্ট। শার্টের সামনের সবগুলো বোতামই খোলা। উন্মুক্ত বুকে ছোটো হৃদি লেপ্টে আছে। উষ্কখুষ্ক ছোটো চুলের মাথাটা নুইয়ে বুকের কাছে থাকা মেয়ের নাকের ওপরে ঠোঁট ছুঁয়েছে কেবলই আদিল — তখনই ক্লিক। হৃদি এই ছবিগুলো এতবার দেখেও আশ্চর্য না হয়ে পারে না। এতো ছোটো সে ছিলো? ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আওড়াল –

‘ন্যানি, মানুষ এতো ছোটোও হয়? দ্যাখো আই ওয়াজ সো টাইনি। আই কান্ট বিলিভ দিস ইজ মি!’

মরিয়ম বেগম ছবিটা দেখে মুচকি হাসেন। হৃদির চোখের সামনে আসা চুলগুলো গুছিয়ে বলেন –

‘তখন আমাদের প্রিন্সেসের বয়স মাত্র একমাস পনেরো দিন।’

হৃদি মাথা্টা আরও নুইয়ে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল অনেকটা সময়। ছবিতে থাকা আদিলের মুখ ছুঁয়ে আওড়ায় –

‘ড্যাডিকে তো একই লাগছে দ্যাখো। একটুও পরিবর্তন হয়নি।’

কথাটুকু শেষ করে চোখ তুলে তাকাল এবার। ঠোঁট উল্টে ফেলল –

‘ড্যাড, মম কখন ফিরবে?’

মরিয়ম বেগম মিহি স্বরে বুঝিয়ে গেলেন, ‘একটু সময় তো লাগবেই। আমাদের প্রিন্সেস ঘুমিয়ে পড়ুক তবে?’

হৃদি মন খারাপ নিয়ে তাকাল দরজার দিকে। দুপাশে মাথাটা নাড়িয়ে বোঝাল ঘুমাবে না। বিড়বিড় করল –

‘মম ছাড়া আমার একটুও ভালো লাগে না!’

‘প্রিন্সেস কিন্তু ম্যাডামকে প্রমিজ করেছে দ্রুতো ঘুমোবে বলে!’

হৃদি গাল ফুলিয়ে রাখল, ‘কিন্তু আমার ঘুম আসছে না, ন্যানি।’

মরিয়ম বেগম ভাবলেন একটু। বললেন, ‘কার্টুন ছেড়ে দিই?’

হৃদি মাথা নাড়াল। তার দৃষ্টি পড়েছে ট্যাবলেটের ওপরে। হঠাৎ অ্যালবাম সরিয়ে নামল সোফা থেকে। নিজেই গিয়ে হাতে নিলো ট্যাবলেটটা। তার যেহেতু ভীষণ মনে পড়ছে বাবা-মাকে সে কথা বলবে। বলবে, দ্রুতো ফিরতে।

ঋণা্ সাপের মতো ফোঁসফোঁস করে ওঠে। সবচেয়ে দুর্বল স্থানে বুঝি ব্যথা লেগেছে। পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠে। হাওয়ার বেগে হামলে পড়তে চাইল রোযার ওপরে। বাঘের ন্যায় খামচে, কামড়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করতে চাইল রোযার শরীর। রোযা এক ইঞ্চিও নড়ল না। দাঁড়িয়ে থাকল একই স্থানে, বাঁধ সাধল শান্ত। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে চোখের পলকে। ঋণার আক্র মণ পড়ল শচওড়া পিঠে। এতে শান্ত বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া দেখাল না। শুধু আস্তে করে বলল –

‘ম্যাডাম, পেছান। আমি দেখছি।’

রোযা শোনে না সে কথা। দিকবিদিকশুন্য হওয়া ঋণার চোখে চেয়েই থাকে। তার কানে তখনো বেজে যাচ্ছে ঋণার বলা, ‘আমার বাচ্চা! আমিরা আমার বাচ্চা!’

সাধারণ একটা কথাই তো বলেছে! অথচ রোযা মানতে পারল না। হৃদপিণ্ডটা বুঝি দু-ভাগ হয়ে এলো। আমিরা তার বাচ্চা। সে পেলেছে, বড়ো করেছে। বাচ্চার জন্য বলিদান করেছে নিজের জীবন, স্বাধীনতা। তাহলে কোন সাহসে বলবে বাচ্চা ওর? কোন স্পর্ধায়? রোযার তীব্র ক্ষো ভ চোখের দৃষ্টিতে বাসা বাঁধল। ফলস্বরূপ র ক্তিম হলো মণির চারপাশ। নিজেকে নির্বিকার রাখল। আপদমস্তক ঋণার ওপরে চোখ বুলিয়ে কাটকাট কণ্ঠে বলা কথাগুলো শুনে শান্তর মুখা হা হয়ে আর আসেনি। শুধু ক্লান্তর রিভলভার ধরা হাতটা নড়ে ওঠে –

‘আপনি এতো হাইপার কেনো হচ্ছেন, মিসেস চৌধুরী? আপনার হাসবেন্ড বুঝি স্যাটিসফাই করতে পারে না? ওপস, আই এম এক্সট্রিমলি সরি। ভুলেই গিয়েছিলাম আপনার হাসবেন্ড তো বৃ দ্ধ! একা পা কব রে ছিলো। এখনতো পুরোপুরি। ফ্রাস্ট্রেশনে ভুগছেন? ভুগছেন কেনো? বিয়ে করায় তো ক্লাসটপার। আরেকটা বুড়ো দেখে করে ফেলেন না।’

ঋণা রাগে কাঁপছে রীতিমতো। থরথর করে। চিৎকার করে ওঠে। হায়ানা হয়ে আক্রমণ করতে ব্যাকুল –

‘মা** বাচ্চা! খান ** বাচ্চা, তোর এই জিহ্বা আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলব। তোর আমি এমন অবস্থা করব নিজের মুখ দেখাতে পারবি না। তুই আমাকে চিনস নাই। আমি ঋণা সওদাগর তোর—’

শেষ করতে পারল না ঋণা। শান্তকে নিজের সামনে থেকে সরাল রোযা। তার ওপরে প্রায় হামলে পড়তে চাওয়া ঋণা ওঠানো হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। খুব সামনেই এসে দাঁড়াল নির্ভীক ভঙ্গিতে। ভয়ংকর চোখে তাকিয়ে কটমট করা ঋণার চোখে চেয়ে মাথা নোয়াল। ফিসফিস করে বলে গেলো –

‘ডোন্ট ইউ নো হু মাই হাসবেন্ড ইজ? ইটস আদিল মির্জা। কী মনে হয়? ছুঁতে পারবি আমাকে? এই জনমে না!’

রোযা থামে একমুহূর্তের জন্য। ফের বলে, ‘আমার বাচ্চা আর আমার স্বামী – দুটো থেকে দূরে না থাকলে তোকেই আমি এই রাতের বেলায় সূর্য দেখাব।’

ঋণার চোয়াল নড়ে। তিলেতিলে নয়, এখুনি মে রে ফেলতে চাইল। কঠোর গলায় আদেশ ছুড়ল নিজের পার্সোনাল বডিগার্ডকে, ‘শুট হার, হাসান। জাস্ট শুট!’

ক্লান্ত বলে ওঠে, ‘বাড়াবাড়ি করবেন না্, মিসেস চৌধুরী। আমাদের বাধ্য করলে উই উইল শুট – ই উ!’

হাসান ইতোমধ্যে রিভলভার তাঁক করেছে। সাথে তাদের বাকি বডিগার্ডস। বিপরীতে ক্লান্তও তাঁক করেছে হাতের রিভলভার। চুপচাপ রোযার ভীষণ পাশে দাঁড়িয়ে আছে শান্ত। পাশ থেকে নড়ছে না, চেয়ে আছে ঋণার দিকে সতর্ক চোখে। ওসময় বেজে ওঠে শান্তর ফোন। শান্ত ফোন বন্ধ করতে পকেট থেকে বের করেই, থমকে গেলো। স্ক্রিনে প্রিন্সেস লেখা। রোযা আড়চোখে তাকাতেই দেখল ওই দৃশ্য। মুহূর্তে বন্ধ হলো হৃৎপিণ্ডের র ক্তক্ষরণ। হাত বাড়াল। শান্ত ফোন এগিয়ে দিলো। রোযা একপলক তাকাল হিসহিস করতে থাকা ঋণার দিকে। কল রিসিভ করল। স্ক্রিনে ভেসে এলো ছোটো একটা গোমড়া মুখ। রোযাকে দেখতে পেতেই সে মুখে হাসি ফুটে উঠল। চিকচিক করল চোখজোড়া। রোযার জ্বলেপুড়ে যাওয়া হৃদয় শান্ত হয়ে পড়ে মুহূর্তে। হৃদির উচ্ছ্বাস নিয়ে বলা কথাগুলো শুনতে পেলো উপস্থিত সবাই। ঋণাও, তার চোখমুখ থমকাল –

‘মম.. মাম্মা– আ্ই মিস ইউ সো মাচ। কখন ফিরবে তুমিই?’

রোযা হেসে বলে, ‘জলদি ফিরব, সোনা। তোমাকে বলে এলাম দ্রুতো ঘুমোতে! শোনোনি কেনো কথা?’

‘আই রিয়েলি ক্যান্ট স্লিপ উইদাউট ইউ, মা। আমি অ্যালবাম দেখছিলাম, জানো? ওখানে আমি কতো টাইনিইই! তোমাকে আমার আর ড্যাডের ছবি দেখাব। অফকোর্স উইদ ড্যাড। ড্যাড আর তুমি কখন ফিরবে বলো?’

রোযা ভুলে বসে কোথায় আছে সে। দৃষ্টির সামনে শুধু হাসতে থাকা পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর মুখটাই ভেসে আছে –

‘চলে আসব, মা। খুব জলদি। এসে দেখব, হুম?’

‘ড্যাডকেও লাগবে। নিয়ে আসবে সাথে হু? আমি কিন্তু তোমাদের অপেক্ষায় থাকব। আমি ঘুমাব না।’

রোযা ভীষণ আদর করে বলে, ‘ঘুম এলে ঘুমিয়ে যেও, সোনা। জেদ করে না। জলদি জলদি ফিরব।’

হৃদি হেসে হাত নাড়াচ্ছে। রোযাও হাত নাড়িয়ে কল কেটে ফোন এগিয়ে দিলো শান্তর দিকে। শান্ত ফোন নিয়ে পকেটে ভরে রাখল। সে দাঁড়িয়ে ছিলো রোযার সামনে, হিমালয়ের মতন। রোযা তাকাল সামনে। ঋণার চোখমুখে ক্ষো ভের বাইরেও কিছু একটার প্রলেপ ছড়ানো। কীসের? রোযার জানার আগ্রহ এলো না। আর দাঁড়াল না ওখানে। কদম বাড়াল সিঁড়ির দিকে।

.

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন আবেদীনের ছোটো ভাই জয়নাল আবেদীন দোতালার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো এতক্ষণ যাবত। পাশেই পুলিশ আইজিপির ভাগ্নে সিয়ামও আছে। তাদের হাতে ড্রিংকের গ্লাস। তিনতলা থেকে দোতালা নেমে এসেছে অনেকক্ষণ। এতক্ষণ যাবত হাতের গ্লাস থমকে ছিলো। দৃষ্টি অনড় ছিলো গ্রাউন্ডফ্লোরে, ঠিক মধ্যে দাঁড়ানো কালো শাড়ি পরিহিত নারীর ওপরেই।

জয়নালের চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে গেলো শাড়ি পরিহিত শরীরটা। যে ধীরেসুস্থে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। সিয়ামের যেন বোধশক্তি ফিরেছে। মুখ দিয়ে শব্দ বেরুলো –

‘ড্যাম্ন! ওই শা লার পো তো আর এভাবে এভাবে পাগল হয় নাই। কী ঝাঁজাল মা ল ধরে আনছে! যেমন দেখতে তেমন তেজ মাইরি!’

জয়নাল বিপরীতে চুপ হয়ে থাকল। শুধু অনুভব করল তার হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করছে। ভীষণ স্লোলি বিট করছে! মুহূর্তে দু ভ্রুয়ের মাঝে ভাঁজ পড়ল। দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হলো। সিঁড়ি বেয়ে ওঠা শরীরটা থামল হঠাৎ। ঘুরে কিছু একটা সম্ভবত বলল! জয়নাল অনুসরণ করল সবটাই। সিয়াম তখনো ভীষণ অশ্লীল ভঙ্গিতে বলে যাচ্ছিল –

‘এই মাল শা লায় কই থেকে ধরে আনলো! এতো ভালো লাক শা লার!’

দৃষ্টির বাইরে শরীর চলে গেলেও দৃষ্টি ফেরাল জয়নাল অনেকক্ষণ। একপর্যায়ে কদম বাড়াল নিচে। উদ্দেশ্য নিচতলা। অনুসরণ করল সিয়ামও। মুখ তার তখনো চলছে। বারংবার দৃষ্টি যাচ্ছে ওপরে।

.

কানের ব্লুটুথ সরাল আদিল। এলেনের বাড়িয়ে ধরা টিস্যু নিয়ে মুখ মুছল স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। উঠে দাঁড়াল। দিকপাল চ্যাটার্জি তখনো হতভম্ব –

‘হলো কী তোমার? হটাৎ করে ওমন কাশলা কে? ঠান্ডা লাগল নাকি?’

আদিল জবাব দিলো না। তাকাল দরজার দিকে। তার ধূসর চোখের দৃঢ় দৃষ্টির সামনেই বন্ধ দরজাটা মেলে ধরল ক্লান্ত। রোযা প্রবেশ করল। পেছনে শান্ত। আদিল দেখল এগিয়ে আসা শরীরটা। পা থেকে মাথা পর্যন্ত! রোযা চোখে চোখ রাখে না। এসে দাঁড়াল পাশে। শুধাল –

‘কখন ফিরব?’

দিকপাল চ্যাটার্জি উঠে এলেন, ‘কী বলেন এইটা ম্যাডাম! দেরি আছে। সবে শুরু।’

রোযা জবাব দিতে পারল না। অনুভব করল একটা উষ্ণ হাত ইতোমধ্যে তার কোমরে রাজত্ব জুড়েছে। শক্ত সেই বাঁধন। নিজের পাশে মিশিয়ে দৃষ্টি নুইয়ে আওড়াল –

‘ডিড ইউ এঞ্জয়?’

রোযার গলাটা শুকিয়ে এলো। কীসের ভিত্তিতে এমন কথা বলল? নিচ থেকে ঘুরে আসার মধ্যে এঞ্জয়ের কি আছে? কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? রোযা চমকে তাকাল। আদিলের ধূসর চোখজোড়ায় দৃষ্টি পড়তেই শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণ নামল। থমকাল হৃৎপিণ্ড। কী ধরনের তান্ডব যে দেখল ওই চোখে তা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব না! রোযা দৃষ্টি ফিরিয়ে আনল। কাঁপল তার হাত, ঠোঁট। আদিল আওড়াল ফের –

‘হুমমম?’

রোযা ঢোক গিলে কোনোরকমে বলে, ‘কোনোরকম।’

‘আসলটা এঞ্জয় করলে কোনোরকম থেকে এক্সেলেন্ট বলতে বাধ্য হবেন, আই অ্যাশিউর ইউ মিসেস মির্জা।’

কু-ইঙ্গিতটা ফের এলো। কী অশ্লীল শোনাল! থমকাল হৃৎপিণ্ড। এতো দ্রুতো তো নিচের কথোপকথন জানার কথা না। এখনো তো শান্ত, ক্লান্ত লোকটার আশেপাশে ভেড়েনি। ওপর থেকে শোনার কথাও না। তবে? আদিল ইতোমধ্যে তাকে নিয়ে গিয়ে বসেছে সোফায়। রোযা আর ভাবতে চাইল না। কথা ঘোরাল –

‘হৃদি অপেক্ষা করছে। কখন ফিরতে পারব?’

হাতের মুঠোয় থাকা পাতলা কোমরে চাপ দিয়ে আদিল আওড়াল, ‘আর কিছুক্ষণ। আমরা ব্যাক করব অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল।’

অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল! এই কথাটা এতো জোড়ালো শোনাল যে রোযার শুধু বাড়ি নয় সব ছেড়েছুড়ে পালাতে ইচ্ছে করল। সে তো দুধের বাচ্চা না। লোকটা যে সব শুনেছে দিব্যি তার বোঝা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু শুনল কীভাবে? এতো দ্রুতো কে এসে বলল?

‘তো আদিল, সামনে নির্বাচন। মাথায় রাইখো আমারে। এবারে কিন্তু লড়াই কঠিন। সাদ্দাম দাঁড়াইব। জানোই তো জনগণ ওই মগারে সেই ভালোবাসে। ও আমার পথের সবচেয়ে বড়ো কাঁটা। গোড়া থেকে উপড়ে ফেললে কেমন হয়?’

আদিল তাকাল না মান্নান সাহেবের দিকে। দিকপাল চ্যাটার্জির বাড়িয়ে দেয়া সিগারেটটা নিলো। ঠোঁটে পিষেই আওড়াল –

‘গদি পাওয়ার আগেই ছাড়া লাগবে, মন্ত্রী সাহেব। নির্বাচনের ক্যান্ডিডেট উপড়ে কী বোঝাবেন? জনগণের কতো পাওয়ার তা আপনার ধারণা বাইরে না।’

‘তাইলে কি হাত গুটিয়ে বসে থাকব?’

আদিল ফিরে তাকাল এবার, ‘হাত গোটাবেন কেনো! টাক দিবো ভোটার কিনবেন। যতো প্রয়োজন ততই।’

মান্নান সাহেবের মুখ লটকে এলো। বলে ফেললেন –

‘বিনিময়ে তো তুমি আমার সব র ক্ত চুষে খেয়ে ফেলো মিঁয়া! মাথায় যা চুল আছে তা-ও বেশিদিন থাকবে বলে মনে হয় না! তোমার লাইগা আমার গদি নড়ে ওঠে।’

আদিল ভ্রু নাচাল, ‘আমার কোটি-কোটি টাকা হুদাই আত্মসাৎ করতে চান, বউ লাগেন নাকি?’

দিকপাল চ্যাটার্জি হো হো করে হেসে ওঠেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শুধালেন, ‘ম্যাডামের পেছনে হুদাই ভাঙবা নাকি কোটি-কোটি টাকা?’

‘ভাঙব না কেনো? এখন আমার ইনকাম তার জন্যই বরাদ্দ। এই জানও।’

পাশে রোযা নির্বিকার থাকতে চাইল। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না তাদের কথোপকথনে। আলাপ শেষ করে দিকপাল চ্যাটার্জি উঠে দাঁড়ান। বলেন –

‘আসেন সবাই, ভোজন শেষ করি। গার্ডেনে পার্টি আছে। সেইইই মাল আসছে। নাচ দেখবেন নাকি গান?’

রোযা নাকমুখ কুঁচকে আড়চোখে চেয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। ইতোমধ্যে সবাই তিনতলা থেকে নেমে গিয়েছে নিচে। শেষে নামছে আদিল, রোযাকে নিয়ে। আদিলের এক হাত রোযার কোমরে, অন্যহাতে সিগারেট। পেছনে শান্ত, এলেন, ক্লান্ত, ধ্রুব। দোতলার সিঁড়ি বেয়ে সবে নিচতলার সিঁড়িতে পা ফেলেছিল তখুনি হলরুমের ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম বলে ওঠে –

‘আদিল মির্জার বউকে দেখোনাই মনে হয়! শালার বউ দেখতে হেব্বি। দেখে আমার শ্বাস এখনো মনে হয় গলায় আটকে আছে। বুকটা ভার ভার লাগছে। আগুন দেখতে আর তেজেও। আমার তো চোখে ভাসছে এখনো। কল্পনা করছি আমার শরীরের নিচে পিষে ধরেছি, ড্যাম্ন। কী ফিগা….’

দিকপাল চ্যাটার্জি গর্জে উঠেছেন ততক্ষণে, ‘বন্ধ করো এটারে। কে অন করছে? কার ম রার শখ জাগছে?’

বন্ধ করা হয়েছে ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম। সিয়ামের অশ্লীল কথাগুলোর সমাপ্তি ঘটল। ততক্ষণে আদিলের পাশে থাকা রোযার শরীর বরফের মতো জমে গেছে। ইতোমধ্যে পুরো হলরুমে পিনপতন নীরবতা বয়ে গেলো। দিকপাল চ্যাটার্জি আতঙ্কে এইটুকুন হয়ে গেছেন। তার পার্টিতে এসে যদি ওই হারামজাদা ম রে তাহলে জবাবদিহিতা তো তাকে করতে হবে! তিনি ব্যাকুল হয়ে পড়লেন –

‘আদিল.. আদিল লিসেন টু মি -’

রোযা চোখ বুজল। অনুভব করল তার পাশের শরীরটা এযাত্রায় নড়েছে। না তাকিয়েও ভয়াবহ ক্রো ধ অনুভব করতে পারছে। আদিল গায়ের কোট খুলল দ্রুতো। সেই কোট রোযার গায়ে পরাতে পরাতে আদেশ ছুঁড়ল –

‘খান কি * পো * রে আঁটকে রাখ।’

রোযা তাকাল সামনে দাঁড়ানো চোখমুখে। আদিল তাকায়নি। সে শান্তর দিকে তাকিয়ে আছে। শান্ত ছুটেছে সাথে সাথে। আদিল রোযাকে নিয়ে কদম বাড়াল বেরুনো মেইন গেইটের দিকে। দিকপাল চ্যাটার্জি পিছুপিছু এলেও একটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারল না। আদিলের চোখমুখে তাকিয়েই তার আত্না নড়ে উঠল যে। বেরুনোর পুরো পথটা রোযা নীরব রইল, আদিলও। ম্যানশন থেকে বেরিয়ে সোজা গাড়ির সামনে এসে থামল আদিল। এলেন গাড়ির ব্যাকসিটের দরজা মেলে ধরল। আদিল গাড়ির হাতলে হাত রেখে রোযাকে বসাল ভেতরে। তাকাল অবশেষে। কণ্ঠ দমিয়ে রাখার চেষ্টা –

‘বাড়ি যাও…’

রোযা কিছু বলতে পারল না। বলেই দরজা লাগিয় দিয়েছে। ক্লান্ত উঠে বসেছে ড্রাইভিং সিটে, পাশে ধ্রুভ। দেখল আদিল শার্টের হাত দুটো ফোল্ড করতে করতে ফের প্রবেশ করছে ম্যানশনের ভেতরে। রোযা শান্ত হতে পারল না। ওই অশ্লীল কথা্র তেমন প্রভাব না পড়লেও তার সামনে এতক্ষণ থাকা ভয়ানক আদিল মির্জা প্রভাব ফেলেছে! কী করবে? মে রে ফেলবে? রোযা ভাবতে পারল না আর। ইতোমধ্যে গাড়ি চলতে শুরু করেছে। রোযা নিজেকে সামলাতে চাইল, চাইল স্বাভাবিক রাখতে। কিন্তু পারছে না! রোযা অস্পষ্ট স্বরে প্রশ্ন করে –

‘কী করবে ওই লোকের?’

ধ্রুভ উত্তর করল না। রোযা উত্তরের আশায়ও নেই। তবে ক্লান্ত করল –

‘মে রে ফেলবে!’

রোযা চোখ বুজল! না, ওমন শয়তান মা রা যাবে এইজন্য তার অস্থিরতা কাজ করছে না। করছে অন্যকারণে। এতো এতো মানুষ ওখানে! বলে বেড়িয়ে মে রে ফেললে ঝামেলা হবে না? রোযা এতকিছু তো বুঝে না। গাড়ি ছুটছে দ্রুতো গতিতে। কতক্ষণ হলো জানা নেই, হঠাৎ ফোন বাজল ক্লান্তর। ক্লান্ত তাকাল, অচেনা নাম্বার। ধরল সে। ব্লুটুথ থেকে বেরিয়ে এলো দিকপাল চ্যাটার্জির আর্তনাদ –

‘ক্লান্ত, কী মনে হয় তোমার? ম্যাডাম পারবে আদিলকে থামাতে? তাড়াতাড়ি বলো! কী ভয়ংকর কাণ্ড হবে ভাবতে পারছো? আড়ালে আবডালে মার লে অন্তত মাটি চাপা দেয়া যেতো। ভরা মজলিশে ও আইজিপির ভাগ্নে -কে মার লে কী হতে পারে ভাবতে পারছো? এর ওপর আই জিপি, কায়সার আহমেদ খবর পেয়ে আসছে, এদিকেই। মিডিয়া, পুলিশ ফোর্স আনলে কতো ঝামেলা হবে ভাবতে পারছো?’

ক্লান্ত থমকাল, ভাবল। হঠাৎ বলল, ‘কথা বলুন…’

ধ্রুব চমকে ওঠে। তার আশ্চর্যান্বিত দৃষ্টির সামনে ক্লান্ত ফোন বাড়িয়ে দিলো পেছনে হঠাৎ। রোযা অবুঝ, তবে ফোন নিলো। কানে গুঁজল। শুনল চুপচাপ। কল কেটে গেলে ফোনটা বাড়িয়ে দিলো। একটা শব্দ উচ্চারণ করে না অনেকক্ষণ! ক্লান্তও কোনো শব্দ বলে না। একই গতিতে গাড়ি চলতে থাকে। পিনপতন নীরবতা ভাঙল রোযার প্রশ্নে –

‘কী মনে হয়, সে থামবে আমার কথায়? আমার উপস্থিতিতে?’

ক্লান্তর কাটকাট জবাব এলো, ‘থামবে।’

রোযা চুপসে গেলো। বাজল দিকপাল চ্যাটার্জির কথাগুলো, ‘এইমুহূর্তে আদিলকে থামানো জরুরি। কায়সার ভীষণ সেয়ানা। ফাঁকা হাতে আসবে না। মিডিয়া আনবে। ঝামেলা হবে।’

পরমুহূর্তেই ভেসে এলো মেয়ের আবদার, ‘ড্যাডিকে নিয়ে ফেরো মম।’

রোযা দম নিলো ছোটো করে। অবশেষে শক্ত গলায় বলল –

‘গাড়ি ঘোরাও।’

ক্লান্ত যেন এই আদেশের অপেক্ষাতেই ছিলো। ঝড়ের বেগে গাড়িটা ঘুরে গেলো। যেই পথ পেরিয়ে এসেছে, সেই পথেই তীব্র গতিতে ছুটল।

.

শ ক্ত ঘুষিতে সিয়ামের চোপাটা নড়ে ওঠে। ভেঙে যায় দাঁত। গল গল করে রক্ত বেরুচ্ছে। সেই র ক্ত ছিঁটকে এসে পড়েছে আদিলের সাদা শার্টের হাতায়। ইতোমধ্যে সিয়ামের বডিগার্ড একটা পাশেই ফ্লোরে কাতরাচ্ছে সমানে। তার মুখ পাড়া দিয়ে ধরেছে শান্ত।

‘আদিল, আদিল কাম ডাউন, কাম ডাউন -থামোওওও…দোহাই লাগে.. ও আইজিপির ভাগ্নে –’

আদিল ফিরে তাকাল হঠাৎ। চোখমুখের ওমন ভয়ংকর অভিব্যক্তি দেখে দিকপাল চ্যাটার্জি থমকে পড়েন, শ্বাস আটকে আসে গলায়। ভয়ে ক্রমাগত পিছু চলে আসেন। আদিলের টগবগিয়ে ওঠা র ক্ত তখন চোখে এসে পৌঁছেছে। ওই চোখের দৃষ্টির চেয়েও ভয়ানক শোনাল হিমালয় ছোঁয়া বজ্র কণ্ঠ –

‘আমার স্ত্রীকে যেই শরীরের নিচে ও পিষে ফেলার কল্পনা করেছে – ওই শরীর আমি আমার নিজ দু-হাতে কাট ব। প্রত্যেকটা অংশ, প্রত্যেকটা। আইজিপি কেনো, এই পৃথিবীর কোনো ক্ষ মতা ওকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না।’

দিকপাল চ্যাটার্জি আর একটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারলেন না। সিয়াম হাঁটু ভেঙে পড়েছে ফ্লোরে। তাজা র ক্ত মুখ থেকে মুছে তাকাল আদিলের র ক্তিম চোখে –

‘আমার মামা আসতেসে। মার লে এখুনি গু লি ক। নাহলে –’

আদিল হাতের পিস্তলটা ছুঁড়ে ফেলল, ‘তোকে গু লি করব না! তোর মামার সামনেই মার ব। তিলে তিলে, ছিঁলে ফেলব।’

গ্রাউন্ডফ্লোর কেনো, পুরো ম্যানশন ফাঁকা। শুধু আব্দুল মান্নান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মাথায় হাত চেপে বসে আছেন এককোণে। এযাত্রায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী উঠে দাঁড়ালেন। তাকালেন না ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসা র ক্তাক্ত সিয়ামের দিকে। শুধু বলে গেলেন –

‘আমি এই ঝামেলার মধ্যে নাই।’

আব্দুল মান্নানও কাউকুই করে চলে যাচ্ছেন পেছনে পেছনে। দিকপাল চ্যাটার্জির গলা শুকিয়ে এলো। ততক্ষণে আদিল সিয়ামের ঘাড় ধরে ফ্লোরে আঘাত বসাচ্ছে একের পরে এক। ভয়ানক শব্দের পাশাপাশি র ক্তের ছাপ পড়ল ফ্লোরে। চোখমুখ র ক্তে ভেসে গিয়েছে। চেনার উপায় নেই। বাইরে থেকে একজন বডিগার্ড দৌড়ে এলো –

‘স্যার, সম্ভব পুলিশ ফোর্স আসছে। মিডিয়াও আছে সাথে!’

দিকপাল চ্যাটার্জির মাথায় হাত। তিনি অনুনয় করলেন একরকম, ‘আদিল পরে মাইরো। আড়ালে। এখুনি কেনো?’

আদিল উত্তর দিলো না। হাত বাড়াতেই একটা চাকু এনে ধরিয়ে দিয়েছে এলেন। ওটা নিয়ে ইতোমধ্যে বসিয়ে দিয়েছে সিয়ামের ঊরুতে। চিৎকার ভেসে বেড়াল দেয়ালে দেয়ালে। ওই আর্তনাদে যায় আসে না দিকপাল চ্যাটার্জির। সে তাকাচ্ছে দরজার দিকে বারংবার। শান্ত হঠাৎ করে হাঁটা ধরল। সে বেরুবে, থামাবে মিডিয়া, আইজিপিকে। তখুনি প্রধান দরজাটা খোলা হলো সজোরে। আদিল ফিরে তাকাল না। সে চাকুটা সিয়ামের বুকের মাঝ বরাবর বসাবে তখুনি ডাক পড়ল –

‘শুনুন….’

আদিলের হাত থমকাল, থমকাল দৃষ্টি! রোযা ছুটে আসছে, হন্তদন্ত ভঙ্গিতে। তার পেছনে ক্লান্ত, ধ্রুব। ইতোমধ্যে বাইরে থেকে পুলিশের গাড়ির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, শোনা যাচ্ছে গর্জন, পিস্তলের শব্দ। আদিলের দৃষ্টি পড়ল ক্লান্তর ওপরে –

‘ক্লান্ত!’

ওই ডাকে ক্লান্তর হাঁটু ভেঙে আসতে চাইল। রোযা হৃৎপিণ্ড তখন ধড়ফড় করছে। আশেপাশে কোথাও তাকাল না। সোজা এসে ধরল আদিলের হাতটা।

‘আসুন, উঠুন।’

আদিল উঠে দাঁড়াল। হাতে তখনো চাকু। বলতে নিলো –

‘তুমি ফিরে যা…’

বলতে পারল না। ব্যাকুল ভাবে রোযা হাত ধরে টানল। আদিল হতভম্ব! রোযা টানতে টানতে বলে গেলো –

‘আপনি আমার সাথে এখুনি ফিরবেন, মিস্টার মির্জা।’

___________

চলবে –

® নাবিলা ইষ্ক।

[ ঈদ মোবারক মাই বিলাভডস। ঈদ মোবারক। চাঁদ রাত মাটি করে লিখে দিলাম। জানি, আপনারা ব্যস্ত। কমবেশ সবাই। পরে পড়ে নিয়েন। ভালোবাসা জানবেন। ভুলত্রুটি পাবেন যেহেতু ভীষণ তাড়ায় শেষ করলাম। বুঝেশুনে পড়ে নেন। কেমন?

পুনরায় ঈদ মোবারক। ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply