অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৬০)
সোফিয়া_সাফা
ফিরে দেখা অতীত <২>
সকালবেলা।
উদ্যান জানত আজ তার জন্মদিন, তবুও তার মাঝে কোনো উৎসাহ কিংবা হেলদোল ছিল না। টেবিলের ওপর ঝুঁকে সে একাগ্র মনে ড্রইং করছিল। তখনই হঠাৎ দরজায় একটা মৃদু আওয়াজ হলো। সে দেখল, বর্ণপ্রিয়া এসেছে। উদ্যান অবাক হলো না। এই মহিলাই একমাত্র তার জন্মদিনের কথা মনে রাখে। অন্যান্য দিনগুলোতে তার দেখা না মিললেও এই বিশেষ দিনটা সে উদ্যানের সাথেই কাটায়।
বর্ণপ্রিয়া তার ভারি শরীরটা সামলে সাবধানে এগিয়ে এল। টেবিলের এক কোণে নামিয়ে রাখল নিজের হাতে বানানো একটা লালচে স্ট্রবেরি কেক। তারপর উদ্যানের চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে তার আঁকা ড্রইংয়ের দিকে তাকাতেই উদ্যান তড়িঘড়ি করে হাত দিয়ে সেটা ঢেকে ফেলল।
গম্ভীর গলায় বলল, “আমি ড্রইং এ ভালো নই।”
ছেলের কথা শুনে বর্ণপ্রিয়া হাসল। হাত নেড়ে ইশারায় বোঝাতে চাইল, ‘তাতে কী? আমি একটু দেখি?’
উদ্যান এবার সরু চোখে তাকাল, জেদ ধরে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর অস্ফুট স্বরে বলল, “বললাম তো, ভালো হয়নি।”
বর্ণপ্রিয়া দমে না গিয়ে মুখটা একটু গোমড়া করতেই উদ্যান হার মানল। হাত সরিয়ে নিতেই বর্ণপ্রিয়া ক্যানভাসটা দুহাতে তুলে ধরল। তার চোখের মণিগুলো যেন বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। উদ্যান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “এতো অবাক হচ্ছেন কেন?”
বর্ণপ্রিয়া ড্রইং-এ ইশারা করতেই উদ্যান বুঝে নিল সে কী জানতে চাইছে। সে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে কেকটা কাটল। তারপর খেতে খেতে বলল, “এটা সাজেক ভ্যালি। আমার এক সহপাঠী বলেছে তারা গ্রীষ্মের ছুটিতে সেখানে গিয়েছিল, জায়গাটা নাকি খুব সুন্দর।”
বর্ণপ্রিয়া আবারও কিছু বোঝাতে চাইল। উদ্যান ফটাফট বুঝে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ আমিও যেতে চাই সেখানে। কিন্তু মনে হয়না যেতে পারব। পিপি চলে যাওয়ার পর কারো মন ভালো নেই। বাবা ভুলেই গেছেন তার একটা ছেলে আছে। দাদাভাই তো বিছানা থেকে উঠতেও ভুলে গেছেন।”
কথাগুলো বলতে বলতেই উদ্যানের চোখজোড়া নুয়ে পড়ল। ছেলের মন খারাপ বুঝতে পেরে বর্ণপ্রিয়ার মুখটাও কালো হয়ে গেল। নিজের কারণে বর্ণপ্রিয়ার মন খারাপ হওয়াটা উদ্যানের পছন্দ হলো না। সে চট করে প্রসঙ্গ বদলে ফেলল, “কেকটা ভালো হয়েছে। আপনি খুব ভালো কেক বানান।”
বর্ণপ্রিয়ার মুখ আবারও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উদ্যান এবার তির্যক চোখে তার স্ফীত উদরের দিকে তাকাল। বর্ণপ্রিয়া কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আঁচল টেনে পেটটা ঢাকার বৃথা চেষ্টা করল।
“আপনার বেবি হবে কবে?” উদ্যানের সরাসরি প্রশ্নে বর্ণপ্রিয়া ইশারায় জানালো; খুব শীঘ্রই।
উদ্যান আর কিছু বলল না। তাকে চুপচাপ খেতে দেখে বর্ণপ্রিয়া ইশারায় জানতে চাইল, “তোমার বোন হলে খুশি হবে নাকি ভাই?”
বর্ণপ্রিয়া ভেবেছিল এই জটিল ইশারা হয়তো উদ্যান বুঝবে না। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে উদ্যান বলল, “দুটো হলেই খুশি হবো। কোনোভাবে দুটো হওয়া সম্ভব নয়?”
বর্ণপ্রিয়া ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। উদ্যান জানলার বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আপনমনে বলতে লাগল, “আমার এক সহপাঠীর বোন আছে। আরেক সহপাঠীর ভাই আছে। ওরা ওদেরকে ভাইয়া ভাইয়া বলে ডাকে। আমারও খুব ইচ্ছে হয় ভাইয়া ডাক শুনতে। আপনার বেবি হলে নিশ্চয়ই আমাকে ভাইয়া বলে ডাকবে?”
বর্ণপ্রিয়া আবেগ সামলাতে না পেরে জোরে জোরে মাথা নেড়ে হাতের চুড়ি বাজানোর ইশারা করল। উদ্যান বুঝে নিল তার কথা, “ঠিক আছে, এবার বোন হলেই চলবে। তারপর নাহয় ভাই হবে।”
ছেলের কথায় বর্ণপ্রিয়ার বুকটা এক অজানা সুখে ভরে উঠল। উদ্যানের সাথে কথা বলতে গিয়ে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে না। ছেলেটা যেন বলার আগেই বুঝে যাচ্ছে তার কথা। সে আবারও উদ্যানের আঁকা ছবিটার দিকে তাকাল। তার ছেলে পাহাড় দেখতে চায়, মেঘ ছুঁতে চায়; এই জন্মদিনে এটাই হোক তার উপহার। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। আজ তাশরিফ বাড়িতে নেই, এটাই সুযোগ।
উদ্যান ওখানে গিয়ে কতো খুশি হবে কল্পনা করতেই তার মুখটা আনন্দে ঝলমল করে উঠল। সে উদ্যানের হাত ধরে নিজের দিকে ফেরাল। তার সংকল্প বুঝতে পেরে উদ্যান কিছুটা শঙ্কিত হয়ে বলল, “আপনি অসুস্থ শরীর নিয়ে কীভাবে যাবেন?”
বর্ণপ্রিয়া আত্মবিশ্বাসের সাথে হাসল। ইশারায় বোঝালো, ‘কোনো সমস্যা হবেনা, তুমি রেডি হয়ে নাও। আমি লাঞ্চ তৈরি করে ব্যাগপ্যাক করে নিচ্ছি। অনেক মজা হবে আজ।’
উদ্যান আর দ্বিমত করল না। তার খুশি দেখে ভাবল বর্ণপ্রিয়া হয়তো তার চেয়েও বেশি এক্সাইটেড সেখানে যাওয়ার জন্য।
,
,
,
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে গাড়ি যখন ওপরের দিকে উঠছিল, জানলার বাইরে বয়ে যাচ্ছিল শীতল হাওয়ার ঝাপটা। গাড়ির ভেতরেই তারা দুপুরের খাবারটা সেরে নিল। বর্ণপ্রিয়ার হাতে বানানো বিরিয়ানি খেয়ে উদ্যানের চোখমুখে খুশির রেখা ফুটে উঠল। সে ভুলে গেল তাকে নিয়ে রেহানার করা সব খারাপ মন্তব্যের কথা। অবশ্য সে যবে থেকে বুঝতে শিখেছে তবে থেকে রেহানার থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে নিয়েছে। বর্ণপ্রিয়ার বিরুদ্ধে খারাপ কথা শুনতে তার ভালো লাগতো না।
বিকেলের ম্লান আলো যখন সাজেকের পাহাড়গুলোতে আছড়ে পড়ল, চারপাশটা এক মায়াবী রূপ নিল। রুইলুই পাড়ার নির্জন রাস্তা দিয়ে তারা রিসোর্টের পথে হাঁটছিল। পেছনে বিশ্বস্ত ড্রাইভার ব্যাগ নিয়ে আসছে। দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তিতে বর্ণপ্রিয়া কিছুটা অসুস্থ বোধ করলেও মুখে হাসি ধরে রাখল। ছেলের এই বিশেষ দিনটা সে কোনোভাবেই নষ্ট করতে চায় না।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বর্ণপ্রিয়া উদ্যানের হাতটা ধরল। উদ্যান চমকে উঠল। সে বর্ণপ্রিয়ার চোখের দিকে তাকাতেই দেখল সেখানে এক অতল আকুতি। উদ্যান তার ইশারা বুঝেও না বোঝার ভান করে মুখ ফিরিয়ে নিল। বর্ণপ্রিয়া ভাবল ছেলে হয়তো বুঝতে পারেনি, তাই সে আবারও হাত নাড়িয়ে কিছু বোঝাতে চাইল। এবার উদ্যান হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল, “রেহানা ফুপু বলেছেন আপনি শুধু বাড়ির বউ হন, তাছাড়া আর কিছু নন। আমার মা হওয়ার অ্যাবিলিটি আপনার মাঝে নেই। আর আমিও সেটাই মনে করি।”
বর্ণপ্রিয়ার পা থেমে গেল। উদ্যান তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “আপনাকে সবাই খারাপ বলে। আপনাকে নিয়ে আজেবাজে কথা শুনতে শুনতে আমি বিরক্ত হয়ে যাই। মনে হয়, তারা খারাপটা আপনাকে নয় ডিরেক্ট আমাকে বলছে। কেন এমন মনে হয়? শুধুই কি আপনার গর্ভে আমার জন্ম হয়েছে বলে? এতো কিছু সহ্য করার পরেও আপনার সাথে আমি কথা বলি, এটাই কি যথেষ্ট নয়? আপনি এখন চাইছেন আমি আপনাকে ‘মা’ বলে ডাকি?”
বর্ণপ্রিয়ার টলটলে চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা লোনা পানি গড়িয়ে পড়ল। সে কম্পিত হাতে ইশারায় বোঝালো; সে নির্দোষ। সে কথা বলতে পারে না, লিখতেও জানে না, তাই কাউকে কোনোদিন কিছু বোঝাতে পারেনি। উদ্যান তার কথা বুঝতে পেরে থমকে গেল।
নিচু স্বরে প্রশ্ন করল, “সবাই একসাথে কীভাবে ভুল বুঝেছিল?”
বর্ণপ্রিয়া আর বিস্তারিত কিছু বোঝাতে পারল না। উদ্যান নেহাতই বাচ্চা ছেলে সবকিছু খুলে বলা সম্ভবও নয়। সে শুধু ইশারায় বলল, ‘তুমি যখন বড় হবে আমি তোমাকে সব খুলে বলবো। কিন্তু এখন আমার কথাই বিশ্বাস করে নাও। সবাই আমাকে বিনা অপরাধে শাস্তি দিয়েছে, তুমিও দিওনা। ঘৃণা করো না আমাকে। একবার কি ‘মা’ বলে ডাকা যায়না? একবার ডাকো না!’
বর্ণপ্রিয়ার ডুকরে ওঠা কান্নায় উদ্যানের মন নরম হলো। সে চাইলো তাকে মা বলে ডাকতে কিন্তু দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে শব্দটা যেন জিভের ডগায় এসেও আটকে রইল। তার মনে হতে লাগল, মা ডাকটা অনেক কঠিন আর লজ্জার। সে কোনোভাবেই শব্দটা বের করতে পারল না। বর্ণপ্রিয়া ছেলের দ্বিধা বুঝতে পেরে তার মাথায় হাত রাখল। চোখ মুছে আবারও ছেলের হাত ধরে ইশারায় বলল, ‘ঠিক আছে। নিজের ওপর চাপ প্রয়োগ কোরো না, শুধু মনে রেখো আমিই তোমার মা। আর তোমার মা এমন কিছুই করেনি যার জন্য তোমাকে মাথা নিচু করে বাঁচতে হবে। তুমি যেদিন সব সত্যিটা জানতে পারবে সেদিন তোমার বাবাকে আমার হয়ে বুঝিয়ে বলবে ঠিক আছে? আর কাউকে বোঝানোর দরকার নেই।’
উদ্যান মাথা নিচু করে সায় জানাল। ঠিক সেই মুহূর্তে বর্ণপ্রিয়া অনুভব করল, তার পেটের ভেতর ছোট্ট প্রাণটা নড়েচড়ে উঠছে। সে দাঁত চেপে উদ্যানের হাতটা নিজের পেটের ওপর রাখল। মুহূর্তেই উদ্যানের ঝিমিয়ে পড়া চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল। হাতের তালুতে এক নব প্রাণের স্পন্দন অনুভব করে সে এক অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠল।
হঠাৎই বর্ণপ্রিয়া দেখল ফারহান তাদেরকে পাশ কাটিয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে সামনের দিকে চলে যাচ্ছে। ফোনে ব্যস্ত থাকায় সে বর্ণপ্রিয়াকে খেয়াল করেনি। বর্ণপ্রিয়া আশেপাশে তাকাতেই দেখল, পারভীন কিছুদূর থাকা এক কাঠের বেঞ্চের ওপর বসে আছে। সে উদ্যানের হাতটা ছেড়ে দিয়ে ছুটে গেল সেদিকে।
আচমকা বর্ণপ্রিয়াকে সামনে দেখে পারভীনের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ভয়ে তার বুক ধড়ফড় শুরু হলো; ভাবল হয়তো তার ভাইও আশেপাশেই আছে। সে দ্রুত উঠে চলে যেতে চাইল, কিন্তু বর্ণপ্রিয়া খপ করে তার হাত ধরে ফেলল। পারভীনের ঈষৎ স্ফীত উদর দেখে বর্ণপ্রিয়া মুহূর্তেই অনুমান করে নিল; সে-ও মা হতে চলেছে।
আজ বর্ণপ্রিয়া আরও একবার বোঝানোর চেষ্টা করল তাকে। কিন্তু পারভীন ভাইয়ের ভয়ে তটস্থ হয়ে পালিয়ে যেতে চাচ্ছিল।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে উদ্যান দ্রুত পা চালাল। সে বুঝতে পারছে বর্ণপ্রিয়া পারভীনকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে। আর পারভীন অকারণেই ভয় পাচ্ছে। উদ্যান যখন মাত্র দু-হাত দূরত্বে, ঠিক তখনই ঘটল এক বীভৎস ঘটনা। আতঙ্কিত পারভীন নিজেকে বাঁচাতে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে বসল বর্ণপ্রিয়াকে।
সবকিছু যেন হঠাৎ স্লো-মোশন হয়ে গেল। উদ্যান নিজের চোখের সামনে দেখল তার মাকে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে। সবটা ঘটে যেতে দেখেও উদ্যান কিছুতেই প্রতিরোধ করতে পারল না। শুধু আপনা আপনি মুখ থেকে বেরিয়ে এল এক আর্তচিৎকার। “মাহ!”
উদ্যান মা বলে ডাকল ঠিকই কিন্তু বর্ণপ্রিয়া সেই ডাক শুনতে পেল না। তার পা পিছলে গেল খাড়া টিলার কিনারে। উদ্যান ঝাঁপিয়ে পড়েও ধরতে পারল না তাকে। সে দেখল তার মায়ের শেষ চাহনি, যা সে কোনোদিনও ভুলতে পারবে না। পড়ার সময় বর্ণপ্রিয়া চিৎকার করতে পারেনি, তার শব্দহীন মুখটা কেবল একবার হাঁ হয়েছিল, আর সে হাতদুটো প্রসারিত করে শেষবারের মতো ছুঁতে চেয়েছিল নিজের ছেলেটাকে।
মুহূর্তের মধ্যে খাড়া টিলা থেকে নিচের ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন খাদের গভীরে তলিয়ে গেল বর্ণপ্রিয়ার শরীরটা। পারভীন থরথর করে কাঁপছিল। সে ভয়ার্ত চোখে একবার নিচের দিকে তাকাল, তারপর পাশে তাকিয়ে দেখল উদ্যানকে। উদ্যান পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; চোখের মণি দুটো স্থির।
মুহূর্তেই পারভীনের মেরুদণ্ড বেয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে বুঝল, সে কতোবড় অন্যায় করে ফেলেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যেন আকাশের বাঁধ ভাঙল, প্রবল বৃষ্টি নামল সাজেকের বুকে।
কয়েক ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানের পর বর্ণপ্রিয়ার ক্ষতবিক্ষত শরীরটাকে উদ্ধার করা সম্ভব হলো। উদ্যানের পাশে সেই মুহূর্তে কেউ ছিল না। ফারহান শুধু উদ্ধারকারীদের কল দিয়ে ভারমুক্ত হয়ে চলে গিয়েছিল পারভীনকে নিয়ে। পারভীন হয়তো থাকতে চেয়েছিল কিন্তু ফারহান থাকতে দেয়নি তাকে।
অ্যাম্বুলেন্সে করে বর্ণপ্রিয়ার মৃতদেহ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলো। উদ্যান শুধু নির্বাক হয়ে পাশে বসে ছিল মায়ের। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গা কাঁপিয়ে জ্বর এসেছিল তার। তাশরিফ ইমার্জেন্সি ফ্লাইটে বাড়িতে ফিরে দেখল বর্ণপ্রিয়ার লাশ তার অপেক্ষায় রেখে দেওয়া হয়েছে। পাশেই শুইয়ে রাখা হয়েছে এক ছোট্ট ফুটফুটে কন্যাসন্তান; বাচ্চাটাকে পেট কেটে বের করা গেলেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
মেয়েটার মুখটা দেখে তাশরিফের বুকে তীব্র ব্যাথা শুরু হলো। উদ্যান যেন শোক সহ্য করতে না পেরে পাথরে পরিনত হয়েছিল। ছেলেকে কাঁদতে না দেখে তাশরিফ অবাক হয়েছিল সেদিন। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শরীর, ভেজা কাপড়গুলো গায়ের তাপে শুকিয়ে স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। তবুও মা বোনকে রেখে কোথাও যেতে নারাজ সে। তাশরিফ ছেলেকে বোঝাতে লাগল, “তোমার জ্বর এসেছে, রুমে চলো। আমি ঔষধ খাইয়ে দিচ্ছি।”
উদ্যান হাত ছাড়িয়ে নিল, “আমি কোথাও যাবো না। ওনাকে চোখ খুলতে বলুন।”
“ও আর কখনো চোখ খুলবে না উদ্যান। ও মারা গেছে।”
কথাটা শুনে উদ্যান গর্জে উঠল, “উনি মারা যান নি, ওনাকে খুন করা হয়েছে। আপনার বোন খুন করেছে ওনাকে। আর আমার বোনটাকেও…”
তাশরিফ ছেলের কণ্ঠ শুনে চকিত নয়নে তাকাল। “তুমি ভুল বুঝছো উদ্যান, তোমার পিপি কল দিয়ে সব জানিয়েছে আমায়। ওটা একটা দূর্ঘটনা ছিল। ও ইচ্ছে করে বর্ণপ্রিয়াকে ধাক্কা দেয়নি।”
উদ্যান বাবাকে সরিয়ে দিয়ে রাগে ফেটে পড়ল, “একদম চুপ, আমি নিজের চোখে দেখেছি। আপনার বোন ফেলে দিয়েছে ওনাকে। আর আমি যখন বলেছি ফেলে দিয়েছে তখন এটাই সত্যি। পালটা কেউ যুক্তি রাখতে এলে আমি তার জবান বন্ধ করে দেবো।”
তাশরিফ বুঝতে পারল, তাদের মৃত্যুটা উদ্যানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। তাই আর সে ছেলেকে জোর করে কিছু বোঝাতে গেল না। উদ্যানকে কোনো ভাবেই সরিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল না বর্ণপ্রিয়ার থেকে। শেষ মুহূর্তে তাশরিফ ছেলেকে বলল, “বাবা, ওদের কষ্ট হচ্ছে। তুমি আর এভাবে জেদ করো না।”
উদ্যান কোনো কথা শুনল না। টলমল পায়ে সে খাটিয়ার পাশে গিয়ে বসল। উদ্ভ্রান্তের মতো খাটিয়ায় চিবুক ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “আপনি না মা ডাক শুনতে চেয়েছিলেন? দেখুন, আমি ডাকছি আপনাকে। মা… ও মা! দয়া করে একবার চোখ খুলুন। আমাকে একটা সুযোগ দিন। এতোটা নিষ্ঠুর হবেন না।”
এরপর সে কাঁপাকাঁপা হাতটা রাখল মায়ের পাশে শুয়ে থাকা সেই নিথর ছোট শরীরটার মাথায়। তার বোনটা কতো সুন্দর, যেন কোনো শিল্পী পরম মমতায় মোমের পুতুল গড়েছেন; তবে প্রাণ সঞ্চার করতেই ভুলে গেছেন।
“আপনি না বলেছিলেন ও আমাকে ভাইয়া বলে ডাকবে? তাহলে ডাকছে না কেন? ও কি আমার ওপর রাগ করেছে? আপনিও কি আমার ব্যবহারে খুব বেশিই কষ্ট পেয়েছেন? আমি আর কক্ষনো আপনাকে কষ্ট দেবো না মা। কেউ আপনাকে কষ্ট দেওয়ার সাহস দেখাবে না। আপনি চোখ খুলুন না।”
তাশরিফ এসে ছেলেকে সরিয়ে নিতে চাইল। উদ্যান চিৎকার করে বলল, “ছাড়ুন আমাকে, উনি এখনই চোখ খুলবেন। আমার মা চোখ খুলবেন। আমার মাথায় হাত রাখবেন। আমি একবার জড়িয়ে ধরবো তাকে।”
বিলাপ করতে করতে এক সময় উদ্যান নিস্তেজ হয়ে পড়ল। কাজের লোকগুলো তাকে শক্ত করে ধরে রাখল যাতে সে আর ছুটতে না পারে। তাশরিফ চলে গেল স্ত্রী এবং মেয়ের খাটিয়া তুলতে।
“নিয়ে যাবেন না… নিয়ে যাবেন না। আমার মাকে নিয়ে যাবেন না। ওনাকে মা ডাকা বাকি আছে এখনো। আমার বোন এখনো আমাকে ভাইয়া বলে ডাকেনি।”
উদ্যানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে দ্রুতবেগে। তাশরিফ খানজাদা বাধ্য হয়ে ডাক্তার ডাকে। ডাক্তার এসে উদ্যানকে ঘুমের ঔষধ দেয়। কারণ এ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। উদ্যান বারবার কবরস্থানে চলে যাচ্ছিল।
বর্তমান!
ফুল যেন সবকিছু নিজের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল। সে দেখতে পাচ্ছে উদ্যান আকুতি মিনতি করে তাদেরকে আটকাতে চাইছে। ফুল হাত বাড়িয়ে সেই ছোট্ট উদ্যানকে জড়িয়ে ধরতে চাইল। কান্নায় ফেটে পড়ে বলল, “ওনার সাথে এমন করবেন না। যেতে দিন ওনাকে; আটকে রাখবেন না। ওনার ভীষণ প্রয়োজন কাউকে। ওনাকে একটু জড়িয়ে ধরুন। মায়ের কাছে গিয়ে কাঁদতে দিন। আপনারা বুঝতে পারছেন না? উনি কাঁদেন নি একটুও। এটা ভালো লক্ষ্মণ নয়।”
সামনে বসে থাকা উদ্যান নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে তার কথা শুনল। তারপর বলল, “এখনই চোখের জল ফুরিয়ে ফেলিস না। আরও অনেক কিছু জানা বাকি আছে।”
সোহম, লুহান আর মেলো অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকাল তার দিকে। তখন রিদম, অনিও অডিও কলে যুক্ত ছিল তাদের সাথে। ফুল কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে বলল, “আমি আর কিছু জানতে চাই না। আমি এটাও জানতে চাইনা আমার মা কে। আমি সেটা জানার আগেই তাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছি। সে একজন খুনি, আপনি তাকে শাস্তি দিন।”
“তোর সৌভাগ্য যে তাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।”
দেয়ালের সাথে মাথা এলিয়ে দিল ফুল। ফিসফিসিয়ে বলল, “তাহলে আর কী! আমাকেই মে’রে ফেলুন। এই কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না।”
উদ্যান তার কথা গায়ে মাখল না। নির্বিকার কণ্ঠে বলল, “লেট মি ফিনিশ ফার্স্ট।”
অতীত!
বর্ণপ্রিয়া পৃথিবী ছেড়েছে কয়েকমাস পার হয়ে গেছে। লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন এসেছে উদ্যানের মাঝে। আগে যাও সে কথা বলতো সবার সাথে এখন তাও বলেনা। একেবারেই নির্জীব হয়ে গেছে ছেলেটা। তাশরিফ অবাক হয়ে ভাবেন, ছেলের মধ্যে এমন পরিবর্তন আসার কারণ কী? দেখতে গেলে বর্ণপ্রিয়ার সাথে ছেলের সম্পর্ক অতোটাও গভীর ছিল না। তবে কী এমন হলো?
তাশরিফ জানতেন না, বর্ণপ্রিয়া ছিল উদ্যানের ছায়াসঙ্গী। আড়ালে থেকেও তিনি সর্বক্ষণ ছেলের পাশে পাশে থাকতেন। উদ্যান স্কুলে যাওয়ার পর তিনি এসে ওর রুম গুছিয়ে দিতেন, জামাকাপড় সব ঠিকঠাক করে রাখতেন। সবসময় ছেলের পছন্দ অপছন্দের খেয়াল রাখতেন। টিফিন থেকে শুরু করে স্ন্যাকস পর্যন্ত নিজের হাতে বানিয়ে দিতেন।
উদ্যান এতটাই গম্ভীর ছিল যে তার অসুখ বিসুখ হলেও সে কাউকে যেচে বলতে যেতো না, কিন্তু বর্ণপ্রিয়া তার হাঁটার ধরন দেখেই সব বুঝে যেতেন সবকিছু। সশরীরে থাকার অনুমতি না পেলেও মনকে মানাতে না পেরে লুকিয়ে লুকিয়ে ঠিকই ছেলের শিওরে গিয়ে বসে থাকতেন। কিন্তু এখন উদ্যানের সেই ছায়াসঙ্গী টা আর নেই।
বর্ণপ্রিয়া শুধু তাশরিফের শান্তির জায়গাই ছিল না উদ্যানেরও একমাত্র সাহারা ছিল। তার অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশে সবসময় জ্বলতে থাকা একমাত্র ধ্রুবতারা ছিলেন তার মা বর্ণপ্রিয়া। যে শারীরিক ভাবে উপস্থিত না থাকলেও সে সবসময় তার উপস্থিতি ফিল করতে পারতো।
আর আজ হঠাৎ করেই উদ্যান তাকে ফিল করতে পারছে না। এটা কতোটা যন্ত্রণাদায়ক সেটা কেউ কি বুঝতে পারছে? সত্যি বলতে উদ্যানকে কেউ বুঝতে পারেও না, শুধু তার মা ছাড়া। সেই মা-ই হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে। তাকে একা করে দিয়ে।
উদ্যানের দাদাভাই আগের তুলনায় এখন একটু সুস্থ হয়েছেন। একমাত্র নাতিকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলেকে আবারও বিয়ে করাবেন। তাশরিফ এবারও বাবার কথার বিরুদ্ধে যেতে পারলেন না। খানজাদা নিবাসে বউ হয়ে পদার্পণ করলেন মাহবুবা সুলতানা। সঙ্গে ছিল তার চার বছরের ছেলে। স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেকে নিয়েই বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তিনি ছিলেন তিন বোনের মধ্যে সবার বড়। বাবার বয়স হয়েছে, কোনো ভাইও নেই; সব মিলিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছিলেন তিনি। তখনই বিয়ের প্রস্তাব আসায় বাধ্য হয়েই মত দিয়ে দিয়েছিলেন।
এবার তাশরিফের সব অভিযোগ মিটে যাওয়ার কথা ছিল। কেননা মাহবুবা সুলতানা কথা বলতে পারতেন, যথেষ্ট শিক্ষিত এবং বুদ্ধিমতী ছিলেন। তবুও তাশরিফ কোনো এক অজানা মায়ায় আবদ্ধ থাকতেন সারাক্ষণ। বর্ণপ্রিয়া যেন অজান্তেই তার মনে জায়গা করে নিয়েছিল বহু আগেই। সেই মায়াবী মুখের অধিকারী সরল নারীকে সে ভুলতে পারেন নি কিছুতেই। বাড়ির প্রতিটি দেয়াল যেন বর্ণপ্রিয়ার অনুপস্থিতিতে গুমরে গুমরে কাঁদতো।
মাহবুবা সুলতানা বউ হয়ে এসেই চাইলেন সংসারটাকে নিজের ধাঁচে গড়ে নিতে। যথেষ্ট সফলও হলেন, কারণ বাড়িতে তাকে বাধা দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। রেহানাও ততদিনে ফারহানের সাথে সম্পর্কের পাঠ চুকিয়ে ফেলেছেন। ফেলবেন না-ই বা কেন? তাদের পরিকল্পনা শুধু বিয়েতেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল অথচ পারভীন এখন অন্তঃসত্ত্বা। ফারহান এই ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিতে চাইলেও রেহানা শুনতে চান নি। বুকের ভেতর জমে থাকা সবটুকু ভালোবাসা পাথরচাপা দিয়ে সম্পর্কের ইতি টেনেই ক্ষান্ত হয়েছেন তিনি। ফলস্বরূপ এখন একদম চুপচাপ হয়ে গেছেন।
সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিতে নিতে উদ্যানের বেশ সময় লাগলেও এখন সে আগের তুলনায় স্থির আছে। মাহবুবা সুলতানার সহানুভূতিতে নয় বরং নিজ প্রচেষ্টায়। সে নিজেই নিজেকে সামলে নিয়েছে। দাদাভাই অবশ্য তাকে সাহায্য করেছেন। কারণ তিনি বুঝেই গেছেন তাশরিফ কখনোই মাহবুবার কাছে যাবেন না। এই বংশের একমাত্র ভবিষ্যৎ হচ্ছে উদ্যান।
মাহবুবা সুলতানার থেকে কোনো কিছু আশা করে না উদ্যান। তাই তার ব্যবহার খারাপ না ভালো সেটাও সে জানেনা। তার যখন খেতে ইচ্ছে করে তখন সে নিজেই কিচেনে গিয়ে বেড়ে খায়। যখন ইচ্ছে করেনা তখন তাশরিফ শতবার ডেকেও তাকে খাওয়াতে পারেন না। খাওয়া দাওয়া বা অন্যান্য বিষয় নিয়ে উদ্যানকে কখনো অভিযোগ করতে দেখা যায়নি। সবাই ধরেই নিয়েছে মাহবুবা সুলতানা সৎ মা হলেও তাকে আর নিজের ছেলেকে সমান ভালোবাসেন। যেটা ছিল একেবারেই অকাট্য মিথ্যা।
উদ্যান মাঝেমধ্যেই দেখে ফেলত, মাহবুবা সুলতানা লুকিয়ে লুকিয়ে ভালো কিছু রান্না করে নিজের ছেলেকে খাওয়াচ্ছেন। তবে দেখেও না দেখার ভান করতো উদ্যান। অবশ্য তখন তার মনে পড়ে যেতো মায়ের কথা। সবচেয়ে বেশি মনে পড়তো অসুখ বিসুখ হলে। সেইসব দিনে উদ্যান কাউকে কিছু না বলে জানালা দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো কবরস্থানের দিকে।
তার মতো চাপা স্বভাবের ছেলের পাশে মা না থাকাটা কতো বড় শূন্যতা ছিল, তা ঐ জানলাটা ছাড়া আর কেউ কোনোদিন উপলব্ধি করতে পারেনি।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ২৮০০+
(শুধু বলবো ফ্ল্যাশব্যাক এখনো শেষ হয়নি।)
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব (৪০ এর বর্ধিতাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১