Golpo romantic golpo প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা

প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১৪


প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||১৪||

ফারজানারহমানসেতু

রাতের খাবার শেষে রোজা ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি।
“এইবার বুঝবে হিটলার! দুদিন এসেই আমার উপর দুইযুগের চেনা লোকের মতো ট্রিট করছে! মনে হচ্ছে আমি তার জাতশত্রু। কিন্তু কথা হলো
বড় আম্মুর সামনে মুখ ফসকে নাম বলে দিলাম, নয়তো আর একটু মজা হতো।”

কিন্তু নিচে তখন অন্য দৃশ্য। ডাইনিং টেবিলে তানিয়া নেওয়াজ, তাজারুল নেওয়াজ, রেহেনা নেওয়াজ সবাই বসে। তুবা চুপচাপ পানি খাচ্ছে। তূর্জান সিঁড়ি দিয়ে নামল। মুখে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য।

তাজারুল নেওয়াজ হেসে বললেন, “এই তূর্জান, শোনো তো, আজকে নাকি ভার্সিটিতে একটা প্রফেসর আমাদের রোজাকে ম্যানারলেস বলেছে?”

মোস্তফা নেওয়াজ আস্তে করে বললো, “ আমি এমন জামাইকে মেয়ে দিবো না। যে বউয়ের খেয়াল রাখতে পারে না!”

ওনার কথা শুনে সবাই মিটমিটে হাসছে। মিরান কিছু বলতে যেয়েও উপর তলার দরজার আড়ালে মুখ দেখে বলল না। সে বললে বেশি কিছুই বলবে, যা এখন রোজার জন্য ঠিক না। মিরান তূর্জানসহ বাড়ির সকলকে ইশারায় বোঝালো উপরে রোজা আছে। বাড়ির সবাই তাই আর রোজার নাম নিলো না কথার মাঝে। তবে সবার কথায় তূর্জান বেশ বুঝতে পারল তাকে খোচানো হচ্ছে।থেমে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো ।
তারপর ধীর গলায় বলল,“হুম,বলেছে।”

তানিয়া নেওয়াজ চোখ কপালে তুলে এমনভাবে বললেন,যেন প্রথমবার শুনলো কথাটা। “মানে? তুমি জানো?”

“ শুধু আমি না তোমরাও জানো । তাই কি বলবে সোজা বলো। “

এক মুহূর্তে যেন বাড়ির বাতাস জমে গেল। তুবা মাথা নিচু করে ফেলল। রেহেনা নেওয়াজের মুখ হাঁ হয়ে গেল।এই ছেলে রেগে গেল না কি?

তাজারুল নেওয়াজ বললেন, “ তুমি রোজাকে দাড় করিয়ে রেখেছিলে?”

“ জি আব্বু। কারণ সে ক্লাসে গল্প করছিল। আমি ঢোকার পরেও দাঁড়ায়নি। আর আমার ক্লাসে ডিসিপ্লিন কম্প্রোমাইজ করব না।”

তূর্জানের চোখের গভীরে চাপা আগুন,উপরে রোজা দরজার আড়াল থেকে সব শুনছিল। মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।“এই ব্যাটা হিটলার নিজেই স্বীকার করে নিল সব!”

তানিয়া নেওয়াজ বললেন,“কিন্তু রোজা তো বলল তুমি তাকে ম্যানারলেস বলেছো!”

তূর্জান হালকা হেসে বলল, “বাড়িতে সে যা-ই হোক, ক্লাসে সে আমার স্টুডেন্ট। আর স্টুডেন্ট যদি ম্যানার না মানে, তাহলে সেটাই বলব।”

এইবার রোজা সিঁড়িতে আসতেই তূর্জানের সামনে বাধলো। তূর্জান সিড়ি বেয়ে নিজের রুমে যাচ্ছিলো । চোখ লাল হয়ে আছে। তূর্জানের হেডএকের প্রবলেম আছে, হয়তো তাই চোখ জ্বলছে।

রোজার দিকে একপলক তাকিয়ে দোতলায় চলে গেলো। রোজাও কম কি তূর্জানের পিছু পিছু দোতলায় গিয়ে তূর্জানের সামনে দুহাত ছড়িয়ে দাড়াল। তূর্জানের একমূহুর্তে মনে হলো রোজা আগের মতোই আছে, কিছুই বদলায় নি। রোজা এখন নানা ধরনের প্রশ্ন করবে তা তূর্জান জানে। এটা ছোটবেলার অভ্যাস।তূর্জানও প্রেয়সীর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি, যেকোনো পরিস্থিতিতে, যেকোনো সময়। সমাজ এমন ছেলেদের বউ পাগল বললেও ইসলাম এদেরকে শ্রেষ্ঠ স্বামী বলে। তূর্জান সমাজের কথা কমই মানে। জীবন একটা, এই জীবনটুকুতে নাহয় পরিবার নিয়ে সুখে থাকা যাক। তাদের রাগ, অভিমান, অনুভূতি সব মেনে নেওয়া যাক। তবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটু রাগালেও মন্দ হয় না।

তূর্জান ভ্রু উচিয়ে বলল, “ কি? এমন হাত ছড়িয়ে দাড়ালি কেন?তোর হাত কতবড় হয়েছে সেটা দেখাচ্ছিস? “

রোজা হতবাক, তার বড় আব্বু কি কোনো পাগলের বাবা। মানুষের কয়টা রুপ হয়। বাড়িতে একরকম যেন একটু ভালো একটু রাগী , বাইরে আরেকরকম, একেবারে ভালো, সাধু ভালো কথা বাদে কিছুই জানে না।। ভার্সিটিতে আরেক রকম, ওখানে রাগীভাব ছাড়া ভালোর ভ ও পাওয়া যাবে না। এ তো গিরগিটির চেয়েও ফাস্ট।

রোজাও কম না, তা বোঝাতে বলল, “ হুমম! দেখুন তো, আমার হাত কতবড় হয়েছে? “

“ কি দিয়ে মাপবো? আমার হাত দিয়ে? “

রোজা হ্যাঁ বলেও, না বললো কারেন্টর বেগে। যদি এই ব্যাটা হিটলার সত্যিই কাছে এসে রোজার দুইহাতে হাত রাখে। তওবা তওবা, রোজা আজ পর্যন্ত প্রেম করে নাই। তার না হওয়া হাজবেন্ডের জন্য, আর এই ছেলে বলে হাত দিয়ে মাপ বে! ছিহ! ছিহ!

রোজা কথা ঘুরিয়ে বলল,“ ওয়াও! খুব প্রফেশনাল, তাই না? বাড়িতে চাচাতো বোন, আর বাড়িতে কথা বলে মাথা খেয়ে ফেললেও কিছু বলেন না। আর বাইরে গিয়ে প্রফেসর, বদমেজাজি ! এত ডিসিপ্লিন ছিল তো আমাকে আগেই বলতেন ?”

তূর্জান ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে বলল, “আমি তোকে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট দেবো, এটা কেন ধরে নিয়েছিস?”

“ কোথায় ধরলাম? আর আপনার বিষয়ে এসব ধরা ঠিক না!”

“ রেগে আছিস? “

“ নাহ! দেখুন আমি হাসছি। আমার তো রাগ নেই।”

“ তা রাগের কারণ কি জানতে পারি? “

“ সত্যিই আপনি জানেন না!”

“ রাগের কারণ কি? “

“কারণ আমাকে একঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছেন!আমার পা ব্যাথা হয়ে গেছে।”

“কারণ তুই নিয়ম মানিসনি তাই দাড় করিয়ে রেখেছি ।”

তুবা রুমে যাচ্ছিলো। ওদের ঝগড়া দেখে বেশ ভালোই লাগছে, একদম স্বামী স্ত্রীর ঝগড়ার মতো। তবে এদের এই ঝগড়া যদি কেউ শুনে নেও। যদিও নিচের তলায় উপরের কথা কমই যায়। বা রোজা তূর্জানের কথা শোনা যাচ্ছে না।

তুবা আস্তে বলল, “রোজা প্লিজ…, সোনা বোন থেমে যা।”

কিন্তু রোজা থামার পাত্রী না। তা দেখে তুবা রুমে চলে গেলে। কি আর করার, হাজবেন্ড ওয়াইফ ঝগড়া করছে করুক।

রোজা আবার বলল, “ আর রবিনকে সিট চেঞ্জ করতে বললেন কেন? সে কি করেছে?”

তূর্জানের চোখ কঠিন হয়ে গেল।এই মেয়ে পাগল না কি? যেখানে আজ দশ বছরের মধ্যে তূর্জান নিজের বউয়ের সাথে ভালো করে কথা বলতে পারলো না। সেখানে অন্য ছেলে এসে তার বউয়ের সাথে হেসে কথা বলবে তা সহ্য করে নেবে। যদিও দোষ রোজার না, সেটা তূর্জান জানে। ওই ছেলেই বারবার রোজার সাথে কথা বলছিলো।

আর তূর্জান রোজার ফ্রিডম নষ্ট করতে চায় না। তূর্জান জানে, প্রিয় মানুষকে আগলে রাখতে, তবে মেয়েরা ছেলেদের সাথে কথা বলবে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে। সেখানে ওই ছেলে কাছে থেকে কথা বলছিলো, সে যার দোষ হোক তার বউ কথা তো ওই ছেলের সাথে কথা বলেছে, এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। আর এমন ছেলে তূর্জান না।

আর তাছাড়াও তূর্জানের ক্লাসে পুরো সময় মাথা নিচু করে রাখলেও তূর্জান একটু পর পরই রোজার দিকে তাকিয়ে ক্লাস নিয়েছে। ব্যক্তিগত নারীকে দাড় করিয়ে তাকিয়ে পুরো ক্লাস নেওয়ার যে অনুভূতি তা এই ভোলাভুলি মেয়ে কি করে বুঝবে। তবে একে বলে লাভ নেই!

তাই মুখে গাম্ভীর্য ভাব রেখে বলল, “আমার ক্লাসে কেউ অপ্রয়োজনীয় কথা বলবে না।”

“ ভারী লোক তো আপনি, এই তূর্জান ভাই সত্যি একটা কথা বলেন তো!”

“ কি? “

“ আপনি কি সিআইডি? “

“ আমি সিআইডি হতে যাবো কোন দুঃখে? “

“ তাহলে কে কার সাথে কথা বলছে তাতেও আপনার সমস্যা? আর আপনি জানেন আমরা অপ্রয়োজনীয় কথা বলছিলাম। আমি তো ওই ছেলের সাথে কথা বলতেই চাইনি!”

“ তাহলে কি বলছিলি? “

“ ওই ছেলে বারবার ডিসটার্ব করছিলো তাই বলছিলাম, যেন ডিসটার্ব না করে! আপনারা ছেলে মানুষ ভালো না। “

“ হোয়াট! “

“ সিঙ্গেল মেয়ে দেখলেই, আপনারা…. “

“ কি আমরা কি? আর একটা ছেলের জন্য পুরো ছেলে জাতি খারাপ হয় কিভাবে? “

“ যেভাবে সেভাবেই!”

তাজারুল নেওয়াজ এবার গম্ভীর হলেন। নিচতলা থেকে দুজনের কথা পুরো না শোনা গেলেও কিছু হালকা পাতলা শব্দ কানে যাচ্ছে।

তিনি বললেন “দুজনেই চুপ করো । এটা বাড়ি, কোর্টরুম না। আর আমার বাড়িতে কোনো উকিল ও নেই।”

যেহেতু রোজাদের আর তূর্জানের রুম পাশাপাশি। তাই দুজনেই চুপ করে হাটতে লাগলো রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। তূর্জান ধীরে বলল, “রোজা, তুই বুঝতে পারছিস না। আজ তোকে দাঁড় করানোটা আমার জন্যও সহজ ছিল না।”

“মানে?”

“পুরো ক্লাসের সামনে যদি তোকে ছেড়ে দিতাম, সবাই বলত আমি নিজের আত্মীয়কে ফেভার করছি। তখন তোরই অপমান হতো।”

রোজা চুপ করে রইলো। তূর্জান গলা আরও নিচু করে বললো, “আর একটা কথা, আমি চাই না কেউ তোর নামে বা আমাদের পরিবার নিয়ে কথা তুলুক।”

এই কথাটা অদ্ভুতভাবে থেমে রইল। রোজার বুকের ভেতর কেমন ধক করে উঠল। কিন্তু মুখে রাগই রইল, তাহলে কি রোজা এতদিন ভুল পথে চলেছে, এই শহরে তাদের ভালোই নাম ডাক। আসলেই তো রোজার এমন চলাফেরায় কেউ যদি বলে, নেওয়াজ পরিবারের মেয়ে ভালো না, তাহলে খুব খারাপ হবে বিষয়টা ।

রোজা মিনমিন করে বলল, “ সরি, আর এমন হবে না। তাহলে আপনি আগে বললেন না কেন?”

“কারণ তুই শুনতে চাইতিস না।”

এক সেকেন্ডের জন্য দুজনের চোখে চোখ পড়ল। বৈদ্যুতিক আলোয় এই প্রথম তূর্জান রোজার দিকে ঘোর লাগা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল। তবে এখন এই তাকানো তেও কেমন গিল্টি ফিল হয়। মনে হয় সেদিন থেকে গেলে আজ এভাবে তাকিয়ে ঘন্টা পার করলেও কেউ কিছু মনে করতো না। রোজাও নিশ্চই তূর্জানের সঙ্গ দিয়ে এভাবে তাকিয়ে থাকার পাল্লা দিতো। তবে হালকা আলোয় যেন রাগ, অহংকার, আর অদ্ভুত এক টান মিশে আছে।

তাকানোর মাঝেই তানিয়া নেওয়াজ সিড়ি বেয়ে উপরে এলেন। তূর্জান যে নিচে চা আনতে গিয়েছিলো, তা তিনি ভালো করেই জানেন। তবে পায়ের শব্দে ততক্ষনে তূর্জান স্বাভাবিক হয়ে দাড়াল।

তূর্জানের হাতে চায়ের কাপ দিয়ে তানিয়া নেওয়াজ নরম গলায় বললেন, “ দুজনেই বড় হয়েছে। ঝগড়া থাকতেই পারে। কিন্তু বাইরে গেলে নিজেরা নিজেদের সম্মান রক্ষা করবা। বুঝছো? আর এমন কোনো কাজ কারোরই করা উচিত না। যেখানে পরিবারের সম্মানে আঘাত লাগে।বলেই তিনি চলে গেলেন।

তূর্জানও আর বেশি কথা বাড়ালো না। শুধু বলল, “ রুমে গিয়ে ওষুধ খেয়ে নিস, পা ব্যাথা কমে যাবে!”

“ খাবো না! কাটা ঘায়ে লবন দিতে এসেছে। আপনার জন্য আমার পা ব্যাথা হয়েছে হিটলার লোক। “

“ নাইস নেইম! ওষুধ খেয়ে নিস। “

বলেই নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো। রোজা বুঝতে পারলো না এ সত্যিই পাগল কিনা? হিটলার নাইস নেইম হয় কি করে?

ইনশাআল্লাহ চলবে….

পাখিরা যে স্পয়লার ছিলো ওটা এই পর্বের শেষাংশে আসবে। তূর্জান আর রোজার খুনসুটি ঝগড়া তোমাদের কেমন লাগছে বলে যেও। আরো খুনসুটি আছে, সো অভ্যাস করে নাও রোজার স….
আর কিছু কমু না। আমার পেইজ

Farzana Rahman Setu

গল্পটা ভালো লাগলে ফলো দিয়ে যাও।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply