Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৭


যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ

ইশরাতজাহানজেরিন

পর্ব_৭

সাইকোলজিস্ট মীর আব্রাহাম রাজ তার চেম্বারে ব্যস্ত। তার চেম্বারে একটা সাইকোলজি ভাব আছে। দেয়াল জুড়ে হালকা ধূসর আর অফ-হোয়াইটের মিশ্র রঙ। চোখে লাগে না, বরং মনকে অদ্ভুত ভাবে কেমন করে যেন স্থির করে দেয়। একপাশে বড় জানালা, সেখানে পাতলা সাদা পর্দা হালকা বাতাসে দুলছে। বিকেলের সূর্যের আলো ভেতরে এসে নরম একটা সোনালী আভা তৈরি করছে। ডান পাশে কাঠের বুকশেলফ। সাজানো বইগুলো খুব গোছানো। মনোবিজ্ঞান, মানব আচরণ, ট্রমা থেরাপি, রিলেশনশিপ ডাইনামিক্স নিয়ে নানা বই। কয়েকটা বইয়ের পাশে ছোট্ট সাকুলেন্ট গাছ।
রুমের মাঝখানে মুখোমুখি দুটো আরামদায়ক সোফা। রোগীর জন্য পাশে একটা ছোট টেবিল টিস্যু বক্স, এক গ্লাস পানি, আর একটি ছোট্ট নোটপ্যাড রাখা আছে। মীর আব্রাহাম রাজের বসার জায়গাটা সিম্পল। একটা ডার্ক গ্রে আর্মচেয়ার, হাতে চামড়ার ফাইল। সে কথা বলার সময় সরাসরি চোখে তাকান না সবসময়, বরং মাঝেমধ্যে নোট নেয়, আবার মাথা তুলে গভীর মনোযোগে শোন। এতে রোগী অস্বস্তি বোধ করে না, বরং নিরাপদ মনে করে। এক কোণে নরম আলোয় জ্বলছে একটি স্ট্যান্ড ল্যাম্প। আলোটা তীব্র নয়, বরং উষ্ণ। দেয়ালে টাঙানো একটি ফ্রেমে লেখা,
“Your feelings are valid. Let’s understand them.”

আজও রাজ ব্যস্ত তার রোগীকে নিয়ে। আজকে ২ দিন ধরে নতুন যেই রোগীর সে চিকিৎসা শুরু করেছে তার নাম মারশিয়া অবনী। মেয়েটার বাবা তাকে গ্রাম থেকে চিকিৎসা করানোর জন্য এনেছিলেন। একেবারে শান্ত প্রকৃতির একটা মেয়ে। ওর অতীত শুনে মেয়ের বাবাকে সে কথা দিয়েছে কোনো টাকা ছাড়াই সে সাহায্য করবে। এখানে লোকটির থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। একটা জায়গাও ঠিক করে দিয়েছে রাজ। অবনী মানসিক ট্রমায় চলে যাওয়া একজন রোগী। বেশ কয়েকবার সুইসাইড করার চেষ্টা করেছিল। অবনীর বাবা মুখে সব ঘটনা শুনেছে রাজ, আসলে মেয়েটির পূর্বে একটা ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই ছেলে তাকে ব্যবহার করে প্রেমের নামে। বিয়ে করার আশ্বাস দিয়ে পতিতালয়ে বিক্রি করে দিয়েছিল, কেবল কী তাই? মিথ্যা বিয়ের নাটক করে কাবিন নামায় সাইন করিয়েছিল। তবে বিয়ের ২ মাস না যেতেই অবনী মা হয়ে যায়। কেবল যে ওই ছেলে অবনীর বাচ্চা নষ্ট করেছে তা নয়, বরং বাচ্চা নষ্ট করিয়ে তাকে বিক্রিও করে দিয়েছিল। তবে বাঁচার তাগিদ নিয়ে অবনী সেখান থেকে পালিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে বাব-মায়ের কাছে চলে যায়। গ্রামের সবাই অবনীর বাবাকে একঘরে করে দিয়েছে। মেয়ের কারণে কাজ, সম্মান সব চলে যায়। তবুও অবনীর বাবা আদরের মেয়েকে ছেড়ে দেননি মরার জন্য। অবনী বাড়ি আসার এক মাসের মাথায় তার প্রাক্তন স্বামীর বিষয়ে সব জানতে পারে। জানতে পারে ওই বিয়েটাও মিথ্যা ছিল, তাছাড়া প্রেমের নাম করে মেয়ে পালিয়ে নিয়ে বিক্রি করাই ওই ছেলের পেশা। ছেলের ৫ বছরের একটা বাচ্চা আর বউও নাকি আছে। এসব জানার পর কতবার যে অবনী আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিল। এখন আগের থেকে বেটার তবে কথা বলেনা। কেমন যেন অদ্ভুত হয়ে গেছে। হুট করে আর সহ্য না করতে পারলে কেঁদে উঠে। চিৎকার করে কাঁদে। রাজ আরেকবার অবনীর দিকে তাকালো। এত সুন্দর একটা মেয়েকে কেউ এমন করে ব্যবহার করতে পারে? বুকটা বুঝি একটু কাঁপল না? অবনীকে পাশের চেম্বারে পাঠিয়েছে রাজ। কিছুক্ষণের মধ্যে রাজ উঠে সেখানে গেল। প্রথমে কেবল দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে অবনী জানালার পাশে বসে আছে। চুলগুলো এলোমেলো, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। শুধু জানালার কাঁচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছে যেন।
রাজের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি দোলা দিল। এটা কি শুধু দায়িত্ব? নাকি তার থেকেও একটু বেশি কিছু? সে গভীর শ্বাস নিয়ে ভেতরে ঢুকল।

“অবনী… আমি ভেতরে আসতে পারি?”

কোনো উত্তর নেই। তবে অবনী চোখ ঘুরিয়ে একবার তাকাল। সেটুকুই অনুমতি ধরে নিয়ে রাজ চেয়ার টেনে একটু দূরে বসল। ইচ্ছে করেই দূরে। সে জানে দূরত্বটাই এখন কতটা দরকার। এই দুইদিন সেশন শুরু করেনি। আজকে প্রথম সেশন। রাজ নরম কণ্ঠে বলল,

“আজ থেকে আমরা একটু একটু করে কথা বলার চেষ্টা করব। তুমি চাইলে কথা না বললেও চলবে। শুধু বসে থাকলেও হবে।”
অবনী স্থির। রাজ ফাইল খুলে রাখল, কিন্তু চোখ ফাইলে নয় মেয়েটার অদুরে মুখটার পানে।

“তুমি কি জানো, ট্রমা মানে কী?” কোনো জবাব এলো না। রাজ পুনরায় বলল, “ট্রমা মানে হলো, মন যখন একটা ঘটনার ভার নিতে পারে না, তখন সে নিজেকে বন্ধ করে দেয়। তুমি এখন নিজেকে বন্ধ করে রেখেছো। এটা তোমার দোষ না।”

অবনীর আঙুলগুলো শক্ত হয়ে এলো। রাজ লক্ষ্য করল। “তুমি রাগ করছো? ভয় পাচ্ছো? নাকি কিছু মনে পড়ছে?” হঠাৎ অবনীর ঠোঁট কেঁপে উঠল। খুব আস্তে বলল, “সবাই… মিথ্যে বলে।”
রাজ থমকে গেল। এটাই তার প্রথম শব্দ।
“হ্যাঁ,” রাজ ধীরে বলল, “অনেকেই মিথ্যে বলে। কিন্তু সবাই না।” অবনী চোখ তুলে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে সন্দেহ, অবিশ্বাস। “আপনিও?”

প্রশ্নটা ছুরির মতো কেটে গেল রাজের বুকের ভেতর।
কিছুক্ষণের নীরবতা। তারপর সে খুব স্থির গলায় বল,
“আমি যদি কখনো মিথ্যে বলি, তুমি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে যাবে। তাই না?” অবনী কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু তার চোখ সরাল না। রাজ ডায়রীতে নোট লিখল। ডায়াগনোসিস:
পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, সিভিয়ার ট্রাস্ট ইস্যুজ, সুইসাইডাল আইডিয়েশন। সে ঠিক করল, প্রথম ধাপে স্ট্যাবিলাইজেশন থেরাপি এরপর ধীরে ধীরে ট্রমা-ফোকাসড সি-বি-টি সেলফ-ওয়ার্থ রিবিল্ডিং এক্সারসাইজেস দিবে। রাজ উঠে দাঁড়িয়ে আরেকটা ডায়রী অবনীর হাতে দিয়ে বলল, “এটা তোমার জন্য। কথা বলতে ইচ্ছে না করলে এখানে লিখবে। রাগ, ঘৃণা, গালি সব লিখতে পারো।”

অবনী তাকাল না। কিন্তু ডায়েরিটা টেবিলে রেখে সে উঠে যাচ্ছিল, ঠিক তখন অবনী আস্তে বলল,

“কেন করছেন?”

রাজ থামল। “কী?”

“এত… ভালো আচরণ?” এই প্রশ্নের পেছনে কত ভাঙা রাত জমে আছে! রাজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“কারণ তুমি এটা পাওয়ার যোগ্য।” অবনীর চোখ হঠাৎ ভিজে উঠল। সে মুখ ফিরিয়ে নিল।
কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি নোংরা…”
রাজ হঠাৎ একটু কড়া গলায় বলল, “না। তুমি ভিকটিম। অপরাধী না।”
ঘরটা ভারী হয়ে গেল। রাজের ভেতরের দ্বন্দ্ব। কিছুক্ষণ অবনীকে একা থাকতে দেওয়া উচিত।
কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে রাজ নিজের বুক স্পর্শ করল। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত।
সে জানে রোগীর প্রতি এইরকম অনুভূতি বিপজ্জনক।
নৈতিকতার সীমানা আছে। তবু অবনীর চোখের সেই অসহায় দৃষ্টি তার মনে বারবার ভেসে উঠছে।
“এটা সহানুভূতি… শুধু সহানুভূতি,” সে নিজেকে বোঝায়। কিন্তু মনের এক কোণে খুব নরম একটা কণ্ঠ বলে, “না, এটা অন্য কিছু।”

দুই ঘন্টার মাথায় হঠাপাশের কেবিন থেকে চিৎকার ভেসে আসতেই রাজ ছুটে গেল। দেখল অবনী মেঝেতে পরে আছে। চিৎকার করে কান্না করছে। বারবার বলছে, “ওরা আসবে… আবার নিয়ে যাবে… আমি যাব না… আমি মরব…”
রাজ ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে নিচু হয়ে বসে বলল, “আমি আছি। কেউ আসবে না।”

অবনী হঠাৎ তার কোটের হাতা শক্ত করে ধরে ফেলল। “ছাড়বেন না…” সেই স্পর্শে রাজের ভেতর কেঁপে উঠল কিছু একটা। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।

“আমি কোথাও যাচ্ছি না। তুমি নিরাপদ।” ধীরে ধীরে অবনীর কান্না থামল। তার মাথা একটু ঝুঁকে এল রাজের কাঁধের দিকে। রাজের হাত মাঝআকাশে থেমে গেল। সে কি ছুঁবে? না কি দূরে থাকবে? শেষ পর্যন্ত সে খুব সাবধানে অবনীর মাথার ওপরে হাত রাখল। একজন চিকিৎসকের মতো। একজন অভিভাবকের মতো। কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা বুঝে গেল
এই মেয়েটাকে সে শুধু রোগী হিসেবে আর দেখতে পারছে না।

অবনীকে সময় নিয়ে শান্ত করাতেই কিছুক্ষণের মধ্যে সে ঘুমিয়ে পড়ল। তার বাবা এখনো বাইরে বসে আছে। অবনী ঘুমিয়ে যেতেই তাকে কিছুক্ষণ ভালো করে দেখল রাজ। অতঃপর বাইরে বের হয়ে তার বাবাকে বলল, “অবনী ঘুমাচ্ছে। আপনি যেতে পারেন ভিতরে।” লোকটি ভেতরে যেতেই রাজ বাইরে বের হলো। করিডোরে বের হয়ে রাজ ফ্লোরের দিকে তাকাল। নিজেকে প্রতিজ্ঞা করল,
“আমি ওকে আগে সুস্থ করব। ওর ভরসা ফিরিয়ে দেব।

তারপর… যদি ভাগ্যে থাকে… তখন ভাবব। কিন্তু কী ভাবব? কেবিনে গিয়ে অবনীকে ঘন্টা দুয়েক আগে দেওয়া ডায়েরিটা একবার খুলল সে। তাতে স্পষ্ট লেখা, “সব পুরুষ খারাপ না।”

মীর বাড়ির লোকেরা সবাই খাওয়া-দাওয়া করে যার যার রুমে চলে গেছে। আব্রাজ পায়চারি করছে। ঘুম আসছে না তার। বিয়ে করতেই হবে। বউ ছাড়া রাতে ঘুম আসে না। বউ ছাড়া এই গরম কালেও শীত লাগে। হঠাৎ তার রুমের দরজায় শব্দ হতেই সে পেছন ফিটে বলল, “আসো, আসো কে আসবা আসো। বউ নাই আমার, এত বালের লক করতে পারি না রুম। যেহেতু আমি জনগনের নেতা তাই আমার রুমি সবার জন্য উন্মুক্ত।”

আব্রাজ পেছন ফিরে দেখলেন তার বাবা আয়মান হোসেন এসেছেন। “ কিরে এখনো ঘুমাসনি?”

“আমি কচি মানুষ, দেরি করে ঘুমালেও সমস্যা নেই। তুমি বুড়া মানুষ, জলদি ঘুমাও। নইলে মরবা।”

“নিজের বাপকে কেউ এমন করে বলে?”

“বলে। দেশের নেতা বলে। আমি তো ভালোর জন্যই বললাম। আমি তো তাও তোমার ভালো করছি, তুমি বাবা হিসেবে ছেলের ভালোর জন্য কী করেছো?”

“ছেলের ভালোর জন্য কি এমন করতে পারি?”

“এই যে এত বড় ছেলে তোমার অথচ বিয়ে দিচ্ছো না।”

“আরে কত বয়স হলো তোমার আব্রাজ? এখনো বিয়ের বয়স হয়েছে? পরে বিয়ে করবে।”

আব্রাজ নিজের কপালকে খাস বাংলায় মনে মনে গালি দিয়ে এবার বাবার দিকে তাকিয়ে গান ধরল,

~ত্রিশে দিছি পা আর কবে বিয়া করবাম

লেট করলে হবে দেরি

কবে ইস্টুকুলু করবাম

ঘুম আসে না ভালো লাগেনা ব্যাকাইদা বেরাম

আমায় বিয়া দাও বিয়া দাও বিয়া দাও বাজান~

সাঁঝ একটু পর পর তেজের রুমের চারপাশে উঁকি ঝুঁকি মারছে। তেজের সাথে তার বেশ ভালোই খাতির আছে। কিন্তু বুক নিসপিস করছে কারণ এই লোক তার ঘোড়ার ডিমের ভাই। তলে তলে বিয়ে করে বসে আছে অথচ সাঁঝকে কিছু জানায়নি। মাত্র একরাতই তো বাড়ির বাইরে ছিল, বাসায় এসে এসব কী দেখতে হচ্ছে? পোড়া কপাল। ভাই-ভাবী কি রুমে চুমু খাচ্ছে? আচ্ছা ভাই-ভাবীর চুমু খাওয়ার সিন উঁকি মেরে দেখলে কী পাপ হবে? ফেসবুকে এই নিয়ে একটা জিজ্ঞাসা পোস্ট করলে মন্দ হয়না। এমনিতেও তার ফলোয়ারের অভাব নেই। এই তো বাসায় এসে চেক করে দেখলো ৫৬টা ফলোয়ার থেকে ৫৭ জন অনুসারী হয়েছে তার৷ সাঁঝ আর ভাবল না। সরাসরি পোস্ট করতেই কিছুক্ষণের মধ্যে একটা কমেন্ট চলে এলো। সাঁঝ ভালো করে ভ্রু কুঁচকে কমেন্টটা পড়তেই বলে উঠল, “এটা কোন শালায়রে! কত কমেন্ট করেছে মাইরি। বলে কিনা দামড়া হয়ে নিজের গতি না করে যারা ভাইয়ের চুমু খাওয়ার সিন দেখে তারা একটা আস্তো গন্ডার? ওদের কাদা পানিতে চুবিয়ে রোদে শুঁকিয়ে শুঁটকি বানিয়ে ফ্রিজআপ করা উচিত। সাঁঝ এখন ব্যস্ত তবে এটার উচিত জবাব সে ১০০% দিবেই। সে আরেকটু উঁকি মারতে যাবে তার আগেই হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজন বলে উঠল, ” এক্সকিউজ মি?”

সাঁঝ পেছনে ফিরে দেখল আরযান দাঁড়িয়ে আছে। গায় টিশার্ট আর টাউজার। নির্গাত এখন ফুটবল খেলতে যাবে। আরযানকে দেখতেই সাঁঝ ভদ্র সাজার নাটক করে বলল, “ইয়ে মানে আপনি ভাইয়া।”

“এখানে কী তোর?”

“মনে হলো ভেতর থেকে কে জানি বাঁচাও বলে চিৎকার করল। আমার তো হৃদয় অনেক বড় তাই বাঁচাতে চলে এলাম।”

“যা নিজের রুমে যাহ। অন্যের বাসর ঘরের সামনে এই রাতের বেলা দাঁড়িয়ে আছিস। ছোট মা মনে হয় তোর জন্মের সময় চোখে কাজল লাগিয়ে দেয়নি? যাহ রুমে যাহ। নইলে এবার ওয়াশরুমে বন্ধ করলে ছুটির ঘন্টা বাজবে না।”

সাঁঝের সকালের কথা মনে পড়ে গেল৷ এই রসকসহীন লোক তাকে ওয়াশরুমে টানা ২ ঘন্টা আঁটকে রেখেছিল। ভাই আর সে বন্দি হতে চায় না। সাঁঝ একটু বুক বাঁকিয়ে বলল,

“আপনি আমার সাথেই কেন এমন করেন? তেজ ভাইয়া প্রেম করে বিয়ে করেছে। তাকে কিছু বললেন না কেন? প্রেম না এই বাড়িতে নিষিদ্ধ?”

“তোর মতো মিচকে ইঁদুরের থেকে আমার মতামত নিতে হবে?”

“তাহলে আমিও বিয়ে করব।”

“হ্যাঁ, ওয়েট কর জলদি তোকেও বিয়ে দেওয়া হবে।”

“হায় খোদা, মেতো মারযাওয়া, সত্যি?”

“ঢং করিস না। ওইসব তোকে সুট করে না। যাহ তুই তোর রুমে। আমি তোর জন্য একটা ড্রেন পরিষ্কার করা কালুয়া খুঁজে দেখছি। যাহ।”

গালি দিতে দিতে রুমের দিকে এগিয়ে যায় সাঁঝ। না এই লোকের একটা গতি এইবার করতেই হবে। অনেক জ্বালাচ্ছে এই লোক। ভাই হয়ে বোনের ভালো দেখতে পারেনা। এমন মানুষ আমি জীবনে দু’টো দেখিনি। যাওয়ার সময় আরেকবার পেছন ফিরে তেজের রুমের দিকে তাকায় সাঁঝ। কিসের সাউন্ড ছিল ওইটা? নতুন ভাবী চিৎকার করছিল কেন? তেজ ভাইয়া আবার মারধোর করল না তো? ইশরে এখন এই চিন্তায় সারারাত জেগে কাটাতে হবে দেখছি।

রাতটা আজকে উত্তেজনায় থরথর করছে। শহরের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম এটা। আলো ঝলমলে এই দৃশ্যের ভেতর কেবল একটাই নাম আর তা হচ্ছে মীর আরনাভ রাত। গেট খুলতেই দর্শকের ঢল। সবার চোখে একই উন্মাদনা। একবার শুধু মঞ্চে তাকে দেখা, তার কণ্ঠে প্রিয় গানটা শোনা। বিশেষ করে তরুণীরা। কেউ পোস্টার হাতে, কেউ ব্যানার, কেউ আবার আরনাভের নাম লেখা জামা পড়ে এসেছে। হঠাৎ আলো নিভে যায়। কয়েক সেকেন্ডের অন্ধকার। তারপর এক ঝলক সাদা স্পটলাইট মঞ্চের মাঝখানে এসে পড়ে। সেই আলোয় দাঁড়িয়ে মীর আরনাভ রাত। স্টেডিয়াম একসাথে নিঃশ্বাস ফেলল, তারপর বিস্ফোরণের মতো চিৎকার,
দর্শকরা একসাথে বলে উঠল। “আরনাভ! আরনাভ! আরনাভ!”

আরনাভ হাসল। মাইক্রোফোনটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে বলল, “আজকের রাতটা শুধু তোমাদের জন্য। যতক্ষণ গাইব, মন দিয়ে শুনবে আর মনে রাখবে, তোমাদের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় দূর্বলতা।”

গিটার বেজে উঠল। প্রথম সুর ছুঁতেই দর্শকদল নিস্তব্ধ। তারপর ধীরে ধীরে সবাই একসাথে গাইতে শুরু করল। হাজার হাজার কণ্ঠে এক গান। মুহূর্তটা যেন স্বপ্নের মতো। একটা রোমান্টিক গানের সময় আরনাভ চোখ বন্ধ করে গাইল। সামনের সারির মেয়েরা মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে আলোয় ভাসিয়ে দিল পুরো স্টেডিয়াম।
এক তরুণী বন্ধুদের বলল, “ওকে একবার কাছ থেকে দেখলেই হলো… জীবনের জন্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।”
বন্ধু মুচকি হেসে বলল, “তাই তো ৭ হাজার টাকা দিয়ে মিট সেশনের টিকিট কেটেছিস!” তারা হাসল।

কনসার্ট শেষ হতে রাত গভীর। তবু কেউ যাচ্ছে না। ঘোষণা এলো “এখন শুরু হচ্ছে মীর আরনাভের এক্সক্লুসিভ মিট অ্যান্ড গ্রিট সেশন।” বিশেষ পাসধারীরা লাইনে দাঁড়াল। প্রত্যেকে ৭ হাজার টাকা দিয়ে এই কয়েক মিনিটের সুযোগ কিনেছে। কিন্তু তাদের কাছে এটা টাকার হিসাব নয়, একটা স্বপ্নপূরণ। এক এক করে তারা ভেতরে ঢুকছে। এক তরুণী সামনে এসে দাঁড়াতেই হাত কাঁপছে। আরনাভ তাকে নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “নার্ভাস হচ্ছো কেন?”

“আপনাকে সামনাসামনি দেখব ভাবিনি কখনো… আজ যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না।”

আরনাভ হাসল, অটোগ্রাফ দিলো তার ডায়েরিতে।

“স্বপ্ন দেখতে থাকো। আর নিজের গল্পের প্রধান চরিত্র নিজেই হও।” তরুণীর চোখে জল টলমল করল। সে বেরিয়ে গেল, মুখে পরিপূর্ণ তৃপ্তির হাসি। তবে এত এত মানুষ হাসি মুখে বাইরে বের হলেও বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা, সুহানা এলহাম কিছুতেই খুশি হতে পারছে না। তার বিরক্ত লাগছে। এটা কোথায় ফেঁসে গেল সে? খালি বান্ধবীর মুখের দিকে চেয়ে সহ্য করতে নিচ্ছে সব। নইলে কী এখানে দাঁড়িয়ে থাকত। সুহানা, তার বান্ধবী সামিরার দিকে আরেকটিবার তাকিয়ে বলল,”এই বাল বাড়ি চল। তোর কিডনি বেচলেও তো ৭ হাজার হবে না। তুই এসেছিস গায়ক তাদের সাইন নিতে। আর ভাই একটা সাইনে এমন কী আছে? যাহ তোকে চকবাজার থেকে রাতের সাইনের একটা চিপ কপি এনে দিবো। তবুও বাড়ি চল। আমার না হয় সমস্যা হবে না। কিন্তু তোর বাবা-মা যদি জানে তুই কনসার্ট দেখার জন্য রাত করে বাইরে বের হয়েছিস তার ওপর আবার টিউশনের ৩ হাজার টাকা মেরে টিকেট কেটেছিস তাহলে সমস্যা হয়ে যাবে রে।”

“এতকিছু করে শেষে আমি হেরে যেতে পারি না। তুই তো জানিস রাতকে আমি কতখানি পছন্দ করি, আমি উন্মাদ তার জন্য। এই সুযোগ কি করে হাতছাড়া করতাম? তোকে এনেছি কেন? কর না একটা ব্যবস্থা।” সুহানা এবার সামিরার দিকে তাকিয়ে বলল, “খালি বেস্ট ফ্রেন্ড দেখে তোর জ্বালা মেনে নিচ্ছি। নইলে কবেই ঠেসে একটা চর লাগাতাম।”

সুহানা এগিয়ে গেল সিকিউরিটি গার্ডের দিকে। তার পেছন পেছন এগিয়ে এলো সামিরা। সে এগিয়ে যেতেই সিকিউরিটি গার্ড বলল,”ভাইয়া আপনার গেইট পাস দেখি।” পেছন থেকে সামিরা বলল, “ভাইনা না,এটা আপু।” লোকটি অবাক হলো। দেখতে তো ছেলেদের মতোই লাগছে। শার্ট, প্যান্ট পড়া। ছেলেদের হেয়ারকাট৷ টোম বয় নাকি? লোকটি সরি চেয়ে বলল,”পাস দেন।”

সুহানা এবার লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল,”পাস? আরে সেটা তো ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেছে? কেমন সিকিউরিটি সিস্টেম আপনাদের? একটা ভিড় সামলাতে পারলেন না? আপনাদের কারনে তো আমাদের পাস ভিড়ের মাঝে সেই যে হাত থেকে পড়ল। আর খুঁজে পাচ্ছি না। এখন গেলতো আমাদের ১৪ হাজার মাটিতে মিশে? যান একটু মাফ করতে পারি, আমার বান্ধবীকে ভেতরে যেতে দেন। সে গেলেই হবে।”

“এভাবে বললেই হলো নাকি? পাস ছাড়া নট এলাউ।”

বাইরে বেঁধে গেল ঝগড়া। ওদিকে রাতও হয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই এই গার্ডকে ম্যানেজ করা যাচ্ছে না। শেষে সুহানা ফিসফিস করে সামিরাকে বলল,”বাল বাসায় চল তো। এতক্ষণ তোর বাড়ির লোক নির্গাত জেগে গেছে। বোন চল। আর দুনিয়ায় আরো অনেক ভালো গায়ক আছে। শুনেছি এই রাতের জীবন নাকি রাতের মতোই অন্ধকার। পূর্বে প্রেম করে ছ্যাকা খেয়ে গায়ক হয়েছে।”

“সমস্যা কী? আমি ঝোনাকি হয়ে তার অন্ধকার জীবনে আলো ফুটাব।”

“মর তুই।”

তাদের চেঁচামেচি শুনে ভেতর থেকে রাত বের হয়ে এলো। জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? কোনো সমস্যা?”

গার্ড তাকে সালাম দিয়ে বলল,”দেখুন না, এই মেয়েদুটো বলছে তাদের নাকি পাস ছিল, হারিয়ে গেছে। এখন পাস ছাড়া কী করে এদের ঢুকতে দেই?”

সামিরার তো রাতকে দেখে বেহুঁশ হওয়ার পালা। তবে সুহানার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। সে গার্ডের সাথে পুনরায় তর্কে জড়াতে গেলে হঠাৎ রাত বলল,”ওদের ভেতরে আসতে দেন।” রাত বলেই ভেতরে চলে গেল। তবে যাওয়ার আগে আরো একবার পেছন ফিরে সুহানার দিকে তাকালো। অদ্ভুত সুন্দর তো! এমন ছিমছাম টোম বয়ও এত সুন্দর হতে পারে?

চলবে?

(রিচেক দেওয়া হয়নি আজকে।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply