‘আদিল মির্জা’স বিলাভড’
— ২৬
চাঁদটা ঠিক তালুকদার বাড়ি্র ওপরে জ্বলজ্বল করছে। চাঁদের আলোয় আর মিহি বাতাসের স্পর্শে চারপাশটা ভীষণ আদুরে লাগলেও, ভেতরটা হয়ে আছে থমথমে, নিষ্প্রাণ। চঞ্চল রাজুও কেমন চুপসে গিয়েছে। সারাটাদিন পেরিয়ে এতো রাত হতে চলল অথচ ছেলেটা একটা কিচ্ছু মুখে তোলেনি। প্রায় নিত্যদিনই খুঁড়ে খুঁড়ে হাঁটতে বেরুতেন আজিজুল সাহেব। আজ আর ভদ্রলোক বাড়ি থেকেই বেরুননি। সারাদিন রুমে বন্দী হয়ে ছিলেন। নিপা বেগম কিছুক্ষণ আগেই স্বামীকে জোরপূর্বক এনে বসিয়েছেন ড্রয়িংরুমে। টি-টেবিলেই রাতের খাবারটা পরিবেশন করেছেন। চোখ রাঙিয়ে বোঝালেন, খেতেই হবে। এরপর নিজ হাতে ছেলেকে খাইয়ে নিজেও দু-মুঠো ভাত মুখে দিয়েছেন। খেয়ে চুলোয় চা বসিয়েছিলেন আজিজুল সাহেবের জন্য। চা-খোর মানুষটা আজ সারাদিন এক কাপ চা-ও খায়নি। তাই চটজলদি এখন বানিয়ে দিচ্ছেন। বানিয়ে হাতে ধরিয়ে দিলে না খেয়ে যাবেই বা কোথায়? চা লোভী যে! সামনে পেলে ঠোঁট ছোঁয়াবেই।
আজিজুল সাহেব অসহায় মুখ করে তাকালেন স্ত্রীর দিকে। তারপরে হাতে ধরানো চায়ের কাপের দিকে। চেয়ে থেকেই ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এখন মেয়েটার বাসায় থাকার কথা ছিলো। তার পাশেই বসে টেলিভিশন দেখতে দেখতে দুষ্টুমি করার কথা ছিলো। অথচ, মেয়েটার চিহ্ন মাত্র নেই। বুকের ভেতরটা ভার ভার লাগছে। একটাদিন কাটাতে পারছেন না। রাত কাটছে না। তাহলে কীভাবে পারবেন দিনের পর দিন মেয়ে ব্যতীত জীবন কাটাতে? অসহায় তিনি অবশেষে ঠোঁট ছোঁয়ালেন কাপে। আওড়ালেন –
‘ঘরদোর কেমন ফাঁকাফাঁকা লাগছে! মেয়েটার জন্য বড্ড চিন্তা হচ্ছে।’
নিপা বেগম ছটফট করছেন জানালার কাছে দাঁড়িয়ে। এযাত্রায় পুনরায় জানালার পর্দা সরিয়ে একপলক বাইরে তাকিয়ে ভালোভাবে দেখলেন। যেন নিশ্চিত হচ্ছেন। চিন্তিত কণ্ঠে বললেন –
‘রোযার বাবা, বাইরে তো দেখছি এখনো কতগুলো গার্ড! ওরা এখনো কেনো আছে?’
চমকে উঠলেন ভদ্রলোক। বললেন, ‘সকাল দিকে না সব চলে গেলো? আবার আসবে কেনো?’
বলতে বলতে ভদ্রলোক চায়ের কাপ রাখলেন টি-টেবিলের ওপর। দ্রুতো ক্লাচ ধরে কোনোরকমে উঠে দাঁড়ালেন। আওড়ালেন, ‘নাকি যায়ইনি?’
রাজুও ছুটে এসে দাঁড়িয়েছে জানালার কাছে। তাদের প্রধান ফটকের ওখানে কয়েকটি গার্ড এখনো পাহারা দিয়ে রেখেছে। আজিজুল সাহেব ওদের ভালোভাবে লক্ষ্য করেন। সবগুলোর হাতে বন্দুক। ওরা ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে তাঁক করে আছে কোথাও একটা। অসন্তুষ্ট হলেন আজিজুল সাহেব –
‘এখনো এমন পাহারা দিয়ে রেখেছে কেনো? কী সমস্যা ওদের! আমার মেয়ের জীবন নষ্ট করেও শান্তি হয়নি দেখছি! একটা বিহিত তো করতেই হয়। তোমরা থাকো ভেতরে। আমি গিয়ে দেখছি।’
স্বামীর হাতটা চেপে ধরলেন নিপা বেগম। ভয়ার্ত দৃষ্টি্র ইশারা দিয়ে বোঝালেন আবারও তাকাতে। আজিজুল সাহেব বিরক্ত চোখে তাকাতেই আঁতকে ওঠেন। তাদের দুয়ার ভেঙে যেই গাড়িগুলো ঢুকতে চাচ্ছে ভেতরে, তাদের উদ্দেশ্য অজানা তবে শুভকর নয় তা বোঝা যাচ্ছে। ওইসব গাড়িগুলোতে থাকা ভিন্ন পোশাকের লোকগুলো একপ্রকার বাড়ি ধ্বংস করতে চাচ্ছে যেন। ওরা ব ন্দুকের গু লি ছুঁড়ছে ঠিক বাড়ির দিকে। আর তাদের ফটক পাহারা দিতে থাকা গার্ডগুলো প্রতিরোধ করছে সমানে। ওরা না থাকলে হয়তোবা ইতোমধ্যে ভেতরে ঢুকে তাদের জানে মে রে ফেলতো! গায়ের পশম দাঁড়িয়ে পড়েছে নিপা বেগমের। জাপ্টে ধরেছেন ছেলের শরীর। ইতোমধ্যে গোলাগুলির তীব্র শব্দে কেঁপে উঠেছে তালুকদার বাড়ির ভূমি পর্যন্তও।
দুজন গার্ড এসে দাঁড়িয়েছে তাদের বাড়ির বন্ধ দরজার সামনে। ওদের ছোঁড়া একেকটা গু লির শব্দে আজিজুল সাহেবের হাত কাঁপে। উনি চিৎকার করছেন –
‘কারা ওরা? কেনো হা ম লা করছে?’
প্রত্যুত্তর করেনি কেউ। তবে আদিল মির্জার রেখে যাওয়া গার্ড কোনো সাধারণ গার্ড তো নয়! এইযে অজানা, অচেনা প্রায় দু-গাড়ি ভরতি লোকজন এসে হামলা চালালো —তাদের সামলানোর জন্য আদিল মির্জার রেখে যাওয়া ওই ছয়-সাতজনই কেমন যথেষ্ট! র ক্তা র ক্তির এক তাণ্ডব চলল উঠোন জুড়ে। সবকিছু যখন শান্ত হলো উঠোনের মাটিতে চারটা লা শ পড়ে রইলো।
গুরুতর আ হত হয়েছে তালুকদার বাড়ি পাহারা দেয়া গার্ডদের একজন। বুকে গু লি লেগেছে। ভরভর করে র ক্ত বেরুচ্ছে। নিপা বেগম থরথর করে কাঁপেন ওই দৃশ্যে। কদম বাড়াতে নিলেও কেমন মিইয়ে যান। তবুও ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। এতক্ষণ ওরা তাদের সুরক্ষার চাদরে আগলে রেখেছিক। বাঁচানোর চেষ্টায় মশগুল ছিলো। তাদের এতক্ষণ ধরে সুরক্ষিত রাখা একজন ম রতে বসেছে তা কীভাবে দাঁড়িয়ে দেখবেন? ভদ্রমহিলা ছুটলেন দরজার দিকে। থামাতে পারেনি আজিজুল সাহেব। নিপা বেগম দরজা খুলে বেরুলেন দ্রুতো। ইতোমধ্যে হৈচৈ পড়েছে বাকিদের মধ্যেও। গু লিবিদ্ধ ছেলেটি পড়ে আছে উঠোনের মাটিতে। নিপা বেগম গিয়েই শাড়ির আঁচল দিয়ে চেপে ধরলেন ছেলেটার বুক। ভরভর করে বেরুনো র ক্ত আটকালেন কোনোরকমে। ইতোমধ্যে গার্ডদের একজন গাড়ি ড্রাইভ করে কাছেই এনেছে। ওকে হসপিটাল নেবে…..
—
গ্লাস শাওয়ার এনক্লোজারের ভেতরে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো পেটানো শরীরটা উন্মুক্ত, অবাধ্য, অসামাজিক। ওয়াল সিলিং শাওয়ার থেকে বৃষ্টির মতো ঝরছে কনকনে ঠান্ডা জল। ভিজিয়ে দিচ্ছে চওড়া কাঁধ, সুগঠিত বুক আর টানটান বাহু। চওড়া ডান কাঁধের বাজপাখির ট্যাটুটা জলের স্পর্শে সতেজ হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, এইতো দু-পাখা ঝাপটে উড়াল দেবে। মেসি আন্ডারকাট দেয়া চুলগুলো চোখের ওপরে লেপ্টে আছে। ধূসর রঙা চোখজোড়া আধবোজা। ঘনঘন নেয়া প্রত্যেকটা শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে গাঢ়ভাবে ওঠানামা করছে সুগঠিত, উন্মুক্ত বুক। বেশ অনেকটা সময় নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকল ঝর্নার নিচে।
গ্লাস শাওয়ার এনক্লোজারের দরজাটা আধখোলা ছিলো। বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলো শান্ত। দৃষ্টি জমিনে। আদিল বেরিয়ে এলো এযাত্রায়। ছন্নছাড়া ভঙ্গিতে গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে কালো রঙের বাথরোব। শান্ত নির্বিকার মুখে বলল –
‘রওশন আহ ত হয়েছে।’
আদিলের কদম থামল না। বিশেষ পরিবর্তন হলো না অভিব্যক্তির। এলেন আড়চোখে বসের বিশেষ প্রতিক্রিয়া না দেখে নিজেই বলল –
‘বুড়োটা ম রতে না মর তেই আবারও শুরু করেছে। ম্যাডামের পুরো ফ্যামিলি মা রার আদেশ দিয়েছিলো সম্ভবত। আর কলের ওপর কল তো দিয়ে যাচ্ছে সকাল থেকে। জেনে গেছে বিয়ের বিষয়টা।’
আদিল শুনল তবে সে-বিষয়ে কোনো কথা বলল না। মতামত দিলো না। শুভ্র রঙা তোয়ালে দিয়ে এলোমেলো ভঙ্গিতে মাথা মুছতে মুছতে অস্পষ্ট প্রশ্ন করল –
‘কী করছে?’
শান্ত প্রশ্নের সাথে সাথে জবাব দিলো, ‘ম্যাডামের পরিবার ঘুমাচ্ছে আপাতত। ভয় পেয়েছিল ভীষণ। ভয় পেলেই বা কী? রাত হয়েছে। ঘুম তো আসবেই, তাই না?’
আদিলের ব্যস্ত হাত থামল। থামল চলন্ত কদম। সে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই শান্তর বুকটা ছ্যাত করে উঠল। ধূসর চোখের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলাতেই মেরুদণ্ড বেয়ে ভয়ের শিহরণ ছুটে গেলো। ও দ্রুতো শ্বাস আটকে যন্ত্রের মতো বলে গেলো –
‘ম্যাডাম প্রিন্সেসকে ঘুম পাড়াচ্ছেন।’
সন্তুষ্টিজনক জবাবে আদিলের দৃষ্টি সরল। নড়ল কদম। বুক ভরে স্বস্তির শ্বাস ফেলল শান্ত। ওর মনে হচ্ছিল এই বুঝি বস ওর গ র্দান কেটে ফেলল! এলেন অবশ্য খুশিই হয়েছে। একদম ঠিকই আছে। দেখছে না, বসের মেজাজ খারাপ? তারওপর আবার ইন্টুপিন্টু খেলতে চাইলো কেনো? কানের নিচে কয়টা বস দিলেই না দারুণ হতো!
‘খেয়েছে কিছু?’
আদিলের দ্বিতীয় প্রশ্নে থমকাল শান্ত। খেয়াল করল, রোযা সকাল থেকে কিচ্ছুটি মুখে তোলেনি। আর না দোতলার ওই রুম থেকে বেরিয়েছে। এবারে জবাবটা এলেন দিলো –
‘খায়নি। মিসেস মরিয়ম এসে জানিয়েছিল।’
আদিলের কদম থেমেছে গিয়ে গ্লাস ওয়ালের সামনে। কপালে সূক্ষ্ণ ভাঁজ পড়েছে। থমথমে মুখের চোয়াল শক্ত হলো আরও গাঢ়ভাবে। দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সুদূর প্রধান ফটকের দিকে। বডিগার্ড সব একত্রে দাঁড়িয়ে। সম্ভবত কোনো ঝামেলা হয়েছে! শান্ত বিষয়টা লক্ষ্য করে মুহূর্তে। গম্ভীরমুখে দ্রুতো বেরিয়ে আসে। পেছনে এলেনও….
.
রোযা অসহায় চোখে দেখল তার বুকের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা ছোটো মাথাটা। একটু পরপর মাথাটা উঁচিয়ে চোরের মতো তাকাচ্ছে রোযার মুখের দিকে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললেই দ্রুতো চোখজোড়া বুজে নিচ্ছে। হৃদি আজ সারাদিন রুম ছেড়ে বেরোয়নি। রোযার পাশ ঘেঁষে ছিলো। রোযা বসলে পিছুপিছু বসেছে, ও দাঁড়ালে দাঁড়ালে পিছুপিছু দাঁড়িয়েছে। অনেকটা সময় ধরে মিহি স্বরে রোযা একটা গল্প বলছিল। গল্পটা সিংহ আর শেয়ালের। ঘণ্টাখানেক ধরে ওকে ঘুম পাড়াতে অনেক গল্পই বলা শেষ। গল্প একটার পর একটা শেষ হচ্ছে, অথচ এই মেয়ের চোখে ঘুম আসার খবর নেই। বিড়ালছানার মতন বড়ো বড়ো চোখে চেয়েই আছে কেমন!
‘ঘুম আসছেই না?’
হৃদি জোড়ালো ভাবে মিশে যায় বুকের সাথে। পিটপিট করে চেয়ে এইটুকুন গলায় বলে, ‘আসছে…’
রোযা অসহায় হয়ে পড়ে, ‘ঘণ্টাখানেক ধরে শুনছি এই কথা।’
হৃদি ঠোঁট ভেঙে ডাকল, ‘মা!’
রোযা গলে গেলো অমনি। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আরও ভালোভাবে ওর শরীরটা বুকে জড়িয়ে ছোটো নাকে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল, ‘হুম..কী? কী বলতে চাইছো?’
হৃদি ফিসফিস করল, ‘আমি রাতে ঘুমালেই তো তুমি চলে যেতে এই বাড়ি থেকে। তাই আমার ঘুমাতে ভয় হচ্ছে। আম স্কেয়ার্ড।’
রোযা গভীরভাবে দেখল ছোটো পুতুলের মতো মুখটা। চোখজোড়া ভিজে এলো। মনে পড়ল বাবা-মায়ের কথা। ছোটো ভাইয়ের কথা। নিজের বাড়িটার কথা। অসহায় অনুভব করল বড্ড। ও চাইলেও যে যেতে পারবে না আর। সম্ভব না! ওর জীবন যে কখনো আগের মতো হবে না। সারাটাজীবনের জন্য ওতপ্রোতভাবে এই বাড়ি আর আদিল মির্জার সাথে তার নাম জুড়ে গেছে। জুড়ে গেছে ভাগ্যের সাথে ভাগ্য। রোযা চোখ বুজে একমুহূর্তের জন্য। নিজেকে সামলে হৃদির মুখটা আদর করে বলে –
‘কোথাও যাবো না, মা। তোমার সাথেই থাকব। তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাও। হুম?’
হৃদি গাল ভরে হাসল। রোযার গলা দু-হাতে জড়িয়ে একদম গায়ের ওপর উঠে গেলো। বুকে মাথা রেখে মিইয়ে যাওয়া গলায় আওড়াল বাচ্চাবাচ্চা কণ্ঠে –
‘মম…’
রোযা মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘হুমম..?’
হৃদির কণ্ঠ অস্পষ্ট হয়ে এলো, ‘ডোন্ট লিভ মি!’
ওই বাক্যে কী ছিলো রোযার জানা নেই! কিন্তু তার চোখজোড়া ভরে এলো। গড়গড়ড় করে চোখের জলে গাল ভিজে গেলো। ভেজা চোখে দেখল ঘুমন্ত ছোটো মুখটা। ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমের মধ্যেও বিড়বিড় করে যাচ্ছে একটাই কথা। কীভাবে সহ্য হবে তার? বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে মনে হলো। রোযা আলতোভাবে জড়িয়ে রাখল হৃদিকে। মুখ নামিয়ে চুমু বসাল ঘুমন্ত মুখ জুড়ে। নিস্তব্দ রুমে ভাঙা কণ্ঠে আওড়াল –
‘হাউ ক্যান আই লিভ ইউ এলোন, বাচ্চা? মমি লাভস ইউ আ লট।’
.
রোযার চোখজোড়া সম্ভবত লেগে এসেছিল। ফোনের মৃদু শব্দে ঘুমটা ছুটে গেল। উঠতে চাইলে খেয়াল করল হৃদি মুঠোবন্দি করে রেখেছে তার বুকের দিকের কাপড়। রোযা হেসে ফেলে নিঃশব্দে। আলতোভাবে ছাড়ায় ছোট্ট হাতটা। কম্ফোর্টারের ভেতরে ভালোভাবে ঢেকেঢুকে উঠে দাঁড়াল। ফোনটা সাইড টেবিলের ওপরে রাখা। রোযা ফোন হাতে তুলে নিলো। সকাল বেলায় যেই সিম দিয়ে জিহাদ মেসেজ করেছিল, ওটা দিয়ে অনেকগুলো মেসেজই এসে আছে। রোযা হৃদিকে নিয়ে সারাদিন এতো ব্যস্ত ছিলো যে এসবে খেয়াল রাখার সময় ছিলো না। এযাত্রায় সময় নিয়ে মেসেজ গুলো পড়বে বলে ঠিক করতেই চোখ গেলো জিহাদের শেষ দুটো মেসেজে –
‘হি’জ ডেঞ্জারাস রোযা। স্টে এওয়ে ফ্রম হিম।’
‘আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। দেখা করো একবার। প্লিজ। আমার অনেককিছু বলার আছে।’
রোযা চমকে ওঠে। কোন বাইরে? কোথায়? এই বাড়ির বাইরে নাতো? ও কীভাবে জানল রোযা এখানে? রোযা জুতোতে পা গলানোরও সময় পেলো না। নগ্ন পায়েই ছুটল দরজার দিকে। রুম থেকে বেরিয়ে করিডোর দৌড়ে পার করে সিঁড়ি ধরল। মরিয়ম বেগম তখন সবেমাত্র খাবারের ট্রে হাতে সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রেখেছিলেন। রোযাকে এমন হন্তদন্ত ভঙ্গিতে নামতে দেখে চিন্তিত হলেন। সাবধানী গলায় বললেন –
‘ধীরেসুস্থে নামুন, ম্যাডাম! কী হয়েছে? আমাকে বলুন!’
রোযা শুনল না। তাকাল না। সিঁড়ি বেয়ে নেমে ছুটল দুয়ার দিকে। দুয়ারের সামনে আসতেই অস্পষ্ট ভঙ্গিতে নীরবতা ভেঙে আসা গোঙানির আওয়াজ শুনতে পেলো। চিনতে পারল জিহাদের কণ্ঠ। প্রধান দরজা তখন অল্প খোলা। বডিগার্ড কিছু ভেতরে বাদবাকি সব দরজার ওপারে। শান্ত আর এলেনকেও দেখা গেলো। ওত দূর থেকেও মা রের শব্দ ভেসে আসছে। রোযা আঁতকে ওঠে! ছেলেটা কী পাগল? মাথা খারাপ! এখানে চলে এসেছে! ওকেই এভাবে মার ছে নাকি? রোযা ছুটে বেরুতে চাইলে বাঁধ সাধল দুয়ারের সামনে দাঁড়ানো গার্ড দুটো।
রোযা ওদের তোয়াক্কা করে না। সে ইতোমধ্যে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছে। তা হচ্ছে, গার্ডরা তাকে কখনো ছোঁবে না। তা তাকে আটকানোর জন্য হলেও! যা করার দূর থেকেই করে। রোযা মুহূর্তে ধেয়ে এগুকো…গার্ড দুটো আপনাআপনি সরে গেলো এমনভাবে যেন রোযা কোনো ভাইরাস। ছুঁলেই ওই রো গে ওরা ম রে যাবে। রোযা দৌড়াল ড্রাইভওয়ে ধরে। নগ্ন পায়ে ছোটা তার মুখের ওপর পড়ছে ড্রাইভওয়ের পাশে দাঁড়ানো সব আউটডোর ল্যাম্পপোস্টের সাদা আলো। খোঁপায় বাঁধা চুলগুলো ছুটে পিঠ ছুঁয়ে কোমর বেয়ে নামল। মৃদু বাতাসে তা দুলছে। দ্রুতো ভঙ্গিতে ছোটা ফর্সা নগ্ন পায়ে সম্ভবত কিছু একটা বিঁধেছে। রোযা মৃদু কণ্ঠে গুঙিয়ে ওঠে। তবে থামল না।
এযাত্রায় দৌড়ানো রোযাকে লক্ষ্য করল শান্ত, এলেন সহ বাকিরাও। ওরা আশ্চর্য হয়ে আছে। ওদের পলক পড়ে, মস্তিষ্ক নড়ে। ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রত্যেকটা বডিগার্ডের দ্রুতো দৃষ্টি নামে। মাথা সহ শরীরটা একসাথে সৈনিকের মতো ঘুরে যায়। বড়ো দরজাটা চোখের পলকে বন্ধ হয়। সবগুলোর পিঠ দেখে রোযা হতবিহ্বল। হঠাৎ এমন কাণ্ডে কিংকর্তব্যবিমুঢ়। প্রত্যেকের ওমন প্রতিক্রিয়াতেও থামাল না চলন্ত কদম। ছুটতে ছুটতে ও চেঁচাতে চাইল শান্ত-এলেনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু পারল না। কণ্ঠ ডুবে গেলো বেরুনোর আগেই। অনুভব করল নিজের নরম পেটের ওপরে এক শক্ত থাবসিংহের থাবার মতোই রুক্ষ ওই স্পর্শে রোযা ভয়ে সিঁটিয়ে যায়। পরমুহুর্তেই হাওয়ায় উঠে আসে তার এইটুকুন পাতলা শরীরটা। তার পিঠের সংস্পর্শে আসে এক শক্ত, উন্মুক্ত বুক। রোযা সীৎকার দিয়ে ওঠে। আতঙ্কে মাথা ঘোরাতেই সাদা আলোয় ধূসর রঙা চোখের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলে। থমথমে গভীর স্বরে ওই কণ্ঠের একেকটি শব্দে রোযার মুখে আতঙ্কিত মুখে আঁধার নামতে থাকে –
‘ইউ ওয়ানা রান ফ্রম মি? হুম….? রান… রান… রাননন…এজ মাচ এজ ইউ ওয়ান্ট। রান ইফ ইউ ওয়ান্ট, রোজ-আ…ইট ওন্ট সেইভ ইউ। আই’ল কেইজ ইউ। জাস্ট লাইক দিস….’
ভূমিকম্পের মতো কাঁপে রোযার শরীর। শক্ত হাতের ওই স্পর্শে ও মিইয়ে যায়। শক্ত করে বুজে নেয় চোখজোড়া। তখনো অস্পষ্ট ভঙ্গিতে ভেসে আসছে জিহাদের করুণ স্বর। রোযা অসহায় কণ্ঠে আওড়ায় –
‘ওকে যেতে দিন, প্লিজ। মা রতে নিষেধ করুন। মার তে নিষেধ কর…’
রোযা কথা শেষ করতে পারে না। যেভাবে হাতে থাকা বই উড়িয়ে আবার হাতে রাখে? ঠিক ওভাবেই ওর জিরো ফিগারের শরীরটা ওমনভাবে মাটির ওপরে রেখেই ঘুরিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় আদিল। পার্থক্য, তখন রোযার পিঠ তার বুকে মিশে ছিলো। এযাত্রায় উন্মুক্ত বুকের সংস্পর্শে আসে বুক। রোযার পুরো নারী সত্তা কেঁপে ওঠে। ছলছলে দৃষ্টি তুলে যখন ও তাকাল, ঘাবড়ে গেলো। ওমন তীক্ষ্ণ চোখজোড়া র ক্তিম হয়ে আছে। যেন র ক্ত বেরুবে। রোযার শ্বাস গলায় আটকে যায়। ওই দৃষ্টি থেকে দৃষ্টি সরানোরও সাহস পায় না কিছুটা সময়। একপর্যায়ে দৃষ্টি সরাল। যখন দু-হাতে আদিলকে ঠেলে সরিয়ে নামতে ওই উন্মুক্ত বুকে হাত রাখল…হাতজোড়াও কাঁপল সঙ্গে সঙ্গে কানের কাছে থাকা মুখ থেকে মৃদু, ভারিক্কি শ্বাস নেওয়ার আওয়াজও শোনা গেলো। রোযা লজ্জায় হাঁসফাঁস করে। ফের শুনতে পায় জিহাদের আর্তনাদ। দাঁতে দাঁত পিষে ওঠে –
‘ওকে যেতে দিন।’
আদিল নির্নিমেষ চোখে চেয়ে থেকে অনেকটা সময় পরে আওয়াজ তোলে –
‘শান্ত!’
শান্ত ফিরল না। ওভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে থেকেই বলল, ‘ইয়েস বস!’
‘গার্বেজটাকে সোজা গ্রামে ফেলে আসবি। বলে দিবি, ওকে আমি ঢাকাশহরে দেখলে দশ হাত মাটির নিচে পুঁতে ফেলব।’
‘ইয়েস বস।’
রোযার পাপড়িগুলো কাঁপে থরথর করে। বাইরের মারধর থেমেছে। আর শব্দ আসছে না। রোযার শ্বাসপ্রশ্বাস শান্ত হয়। আওড়ায় –
‘ছাড়ুন…ছাড়ুন।’
আদিল মনে হলো ওই কথা শুনল না। নির্নিমেষ চোখে দেখল শুধু তার মুখের খুব কাছে থাকা সুন্দর মুখটা। রোযা আড়চোখে চেয়ে রেগেই যায় এবারে। মাঝপথে এমন বিশ্রী ভাবে ধরে রাখার মানেটা কী? ব্যস, বেফাঁসে মুখ দিয়ে এমন প্রশ্ন বেরোয় যা করে ও নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।
‘আপনার চাই কী আমার কাছে বলুনতো?’
আদিলের জবাবটা ভীষণ সময় নিয়ে আসে।
‘আমি কি চাই, তা যদি বুঝতে অসুবিধে হয় মিসেস আদিল…তাহলে আমি করে বুঝিয়ে দিই? ইন ডিটেইলস?’
রোযা প্রত্যুত্তরে শুধু সাপের মতন মুষড়ে উঠল। আরও গাঢ়ভাবে স্পর্শ অনুভব করে পাথরের মতো থমকে গেলো। ওর অবস্থা দেখে এযাত্রায় আদিল ওমন ফানুশের মতো পাতলা শরীরটা নামাল। নিজের পায়ে থাকা জুতোজোড়া খুলে ওই জুতোতেই পা রাখালো। রোযার ছোটো পা-জোড়া ভীষণ আনন্দের সাথে হারিয়ে গেলো ওমন ছোটোখাটো গুহার ন্যায় জুতোজোড়ায়। তবে ও অপারগ ওই জুতো পরায়। জুতো থেকে পা বের করে নগ্ন পায়েই ফের হাঁটা ধরল বাড়ির দিকে। দু-কদমও হাঁটতে পারেনি। পেছন থেকে ঝড়ের গতিতে আদিলের শক্তপোক্ত হাতজোড় তার কোমর ধরে সোজা নিজের ডান কাঁধের ওপর উঠিয়েছে। রোযার অর্ধেক শরীরই ঝুলছে। ব্রাউন রঙের লম্বা চুলগুলো মাটি স্পর্শ করবে প্রায়। বেচারি আতঙ্কে বাকরুদ্ধ! সমানে নামার জন্য মুষড়ামুষড়ি করতেই একপর্যায়ে একটা শক্ত থাপ্পড় এমন জায়গাতে পড়ল যে রোযা থতমত খেয়ে ওঠে। মুখ হা হয়ে আসে। পুরো মুখ র ক্তিম হয়ে যায়। চিৎকার করে ওঠে বিবেক ফিরতেই –
‘ল ম্পট কোথাকার…’
আদিল বেশ নির্বিকার ভাবেই শুনল। এমনভাবে হাঁটছে যেন স্লো-ওয়াকে বেরিয়েছে! রোযা লজ্জায় হাঁসফাঁস করে তাকায় সামনে – পেছনে! কেউ তাকিয়ে নেই, তারপরও লজ্জায়, অসহায়ে ওর দমবন্ধ হয়ে আসছে। এযাত্রায় চোখ পড়ে যে কাঁধে ও আছে, ওই কাঁধে। একটা ট্যাটু এখানটায়। কী ভয়ংকর দেখতে!
চলবে ~~~
® নাবিলা ইষ্ক।
Share On:
TAGS: আদিল মির্জাস বিলাভড, নাবিলা ইস্ক
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩১
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১০
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৯
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৭
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৩
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৪
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১১
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৭
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৪
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ২২