Golpo romantic golpo কালারব্লাইন্ড

কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৬


#কালারব্লাইন্ড — ১৬

#সোফিয়া_সাফা

জুবাকে খাইয়ে-দাইয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে সকাল হয়ে গিয়েছিল রঞ্জকের। সেই ঘুম যখন ভাঙল, বিকেলের মিষ্টি রোদ তখন ঘরের কোণে হেলে পড়েছে। পরপর দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি, কর্মস্থলে যাওয়ার তাড়া নেই। ধীরেসুছে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে সে নিচে নেমে এলো। বেশ কিছুটা দেরি হয়ে যাওয়ায় খাবারের টেবিলে সে একাই। লাঞ্চ সেরে রঞ্জক চলে গেল নিজের ইনডোর গার্ডেনে।

পাঁচতলা ভবনের মাহতাবির ক্যাসেলের এই বিশেষ অংশটি চারতলায় এসেই থেমেছে, ওপরের ফোল্ডিং ছাদটি ইচ্ছেমতো সরিয়ে রাখা যায়। কাচের দেয়াল ভেদ করে বিকেলের রোদ এসে পড়েছে গাছের পাতায় পাতায়। রঞ্জক মৃদু লয়ে পায়চারি করছে, এক হাতে সংবাদপত্রের পাতা মেলানো, অন্য হাতে কানের কাছে ফোন ধরা। ফোনের অপর প্রান্তের জটিল কথামালায় তার কপাল কুঁচকে উঠছে বারে বারে। বৈষয়িক আলোচনার মারপ্যাঁচে যখন সে বুঁদ হয়ে আছে, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি কাচ ভেদ করে ছিটকে গেল সুদূর নিচে, সবুজ লনের পানে।

লনের সুবিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসের বুক চিরে কে বা কারা যেন বেশ কটা দাগ কেটে বানিয়েছে এক অদ্ভুত আয়তাকার ছক। আর সেই ছকের ভেতর এক পায়ে ভর দিয়ে, সমস্ত সমর্পণ নিযুক্ত রেখে অদ্ভূত খেলায় মগ্ন হয়ে আছে এক শাড়ি পরিহিতা কিশোরী!

রঞ্জক চোখের চশমাটা আলতো আঙুলে নাকের ওপর একটু তুলে ধরল। তার বিশ্লেষণী নজর স্থির হলো নিচে। কিশোরীর অনতিদূরেই দাঁড়িয়ে আছে ধারা আর ইরা। কোমরে শাড়ির আঁচল শক্ত করে পেঁচিয়ে চঞ্চল পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে খেলছে মেয়েটি। তার প্রতিটি লাফ আর ছন্দের সাথে পিঠের ওপর আলুলায়িত চুলগুলো যেন ডানা মেলে নৃত্য করছে। 

রঞ্জকের চশমার পেছনের প্রখর, রাশভারী দৃষ্টি ধীরলয়ে শিথিল হয়ে এলো, ফুটল এক অদ্ভুত কোমলতা। নিঃশব্দে কান থেকে ফোনটা নেমে এলো নিচে। বুকের ওপর দু-হাত বেঁধে সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল; মুগ্ধ অনুভবে।

এদিকে লনের সুবিস্তীর্ণ জায়গায় এক্কা-দোক্কা খেলতে পেরে মন কিছুটা হালকা হয়েছে আলতার। কপাল বেয়ে ঝরে পড়া সূক্ষ্ম ঘামের রেখা ছাপিয়ে তার মুখের অভিব্যাক্তি ভীষণ তৃপ্তিদায়ক। কিন্তু খেলার মাঝপথেই অসাবধানতায় দাগের ওপর পা পড়ে গেল তার।

​ইরা অমনি লাফিয়ে উঠে চিল্লিয়ে বলল, “ইয়াহু! মিমু আউট। এবার আমি খেলবো।”

অভিমানে ঠোঁট দুটি ফুলিয়ে একাকার করে দাগের বাইরে এসে দাঁড়াল আলতা। অচেনা অপরিচিত খেলা হওয়ায় ইরা এখনো খেলাটা আয়ত্ত করতে পারেনি তাই সে কয়েক মুহূর্তেই বাদ পড়ে গেল। ধারাও খেলার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না; এক পায়ে ভর দিয়ে ভারসাম্য ধরে রাখতে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে বৈকি। 

আবার আলতার পালা এলো। একখণ্ড চ্যাপ্টা পাথর ছুড়ে মারল ছকের নির্দিষ্ট জায়গায়। তারপর বুক ভরে শ্বাস টেনে, এক পা শূন্যে তুলে ঝাপিয়ে পড়ল ছকে। মুখ দিয়ে একটানা উচ্চারণ করতে লাগল, “কুৎ… কুৎ… কুৎ…”

কিন্তু হঠাৎই মাঝপথে যেন বাতাস ভারী হয়ে এলো। আলতার দম ফুরিয়ে এলো আচমকা! তীব্র হাঁসফাঁস অনুভবে ফুসফুস বাতাস পাওয়ার জন্য আকুপাকু করে উঠল, বাধ্য হয়ে খেলা থামাতে হলো তাকে।

এতো দ্রুত আলতাকে হারতে দেখে অবাক হয়ে গেল ইরা আর ধারা। যে মেয়েটা একাই পুরো ছক দখল করে রেখেছিল, যার সাথে কোনোভাবেই পেরে ওঠা যাচ্ছিল না, অকস্মাৎ কী হলো তার? 

​আলতার নাকটা কুঁচকে এলো। মুখে একরাশ অস্বচ্ছ বিষাদ মেখে সে চোখ ঘুরিয়ে চারপাশটা পরখ করতে লাগল। সন্দেহাতীত আকুলতায় তার চোখ আটকে গেল চারতলার ওপর—রঞ্জকের গার্ডেনের সেই কাচের কিনারায় যেখানটায় রঞ্জক দাঁড়িয়ে ছিল একটু আগেই! কিন্তু এখন সেখানে কেউ নেই, খালি। রঞ্জক যেন তার এলোমেলো দৃষ্টির হেরফের আঁচ করতে পেরে আড়ালে সরে গেছে আগেভাগেই। 

ধারা এগিয়ে গেল বিষাদগ্রস্ত মানবীর দিকে, “কী হয়েছে আলতা?” 

আলতা মুখ ফুলিয়ে ডানে-বামে মাথা নাড়ল। তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছুক্ষণ ধুলো-ঘাসের মাঝে অহেতুক দাপাদাপি করে ফিরে গেল নিজের ঘরের দিকে।

রাতে খাবার টেবিলে পরিবারের সবাই বসে খাওয়াদাওয়া করছিল। উইকেন্ড গুলোতে একসাথে বসে খাবার খাওয়ার চিত্র নতুন নয় এবাড়িতে। বিশেষ করে রাতের খাবারটা একসাথেই খাওয়া পড়ে। টেবিলে টুকটাক আলাপ আলোচনা চলমান থাকলেও রঞ্জক নির্বিঘ্নে খাবার খাচ্ছে।

“গুঞ্জন কবে নাগাদ ফিরবে ভাইয়া?” মালেকা বেগমের প্রশ্নের জবাবে আরিজ মাহতাবির বললেন, “সাজিদ বলেনি কবে ফিরবে?”

মালেকা মুখ খোলার আগেই তাঁরা বলে উঠল, “বাবা এই ব্যাপারে কিছু জানে না। সে বলেছে তুমি আসতে না বলা পর্যন্ত তোমার বড় ছেলে আসবে না।”

আরিজ মাহতাবির প্লেটের খাবারে মনোযোগী হয়ে নিরাসক্ত গলায় বললেন, “ওর সাথে কথা হয়েছে আজ। বলে দিয়েছি এই সপ্তাহেই যেন ফিরে আসে।”

তাঁরা উৎফুল্ল গলায় বলল, “সত্যি বলছো চাচ্চু?”

ভাতিজির কণ্ঠে উছলে পড়া আনন্দের উৎস খুঁজতে গেলেন না আরিজ মাহতাবির। বলা চলে বাড়ির প্রত্যেকে এই খুশির পেছনের কারণ সম্পর্কে অবগত। 

আরিজের নীরবতায় প্রশ্রয় পেয়ে মালেকা বেগম বলেই ফেললেন, “গুঞ্জন ফিরে এলে আমি আর দেরি করতে চাই না ভাইয়া। তাঁরা আর গুঞ্জনের বিয়ের কথাটা এবার এগোনো দরকার।”

আরিজ মাহতাবির চোখ তুলে তাকাতেই মালেকা সাহস কুড়িয়ে নিয়ে যোগ করলেন, “গুঞ্জনের আগে রঞ্জকের বিয়েটা হয়ে গেল। এরপর যদি বড় ভাইয়ের আগে ছোট ভাই বাবা হয়ে যায় সেটাই বা কেমন দেখাবে?”

কথাটা শুনে রঞ্জক চমকে তাকাল ছোট চাচির দিকে। তার তাকানো দেখে মালেকা জোরপূর্বক হেসে বললেন, “আমি কি ভুল কিছু বলেছি?”

রঞ্জক নিজের ভাবভঙ্গি ধরে রেখে হাত বাড়িয়ে পানির গ্লাসটা তুলে নিল। এক ঢোক পানি গিলে গলা ভিজিয়ে, ভারিক্কি গলায় বলল, “তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো আমি যাকে বিয়ে করেছি তাকে বউ হিসেবে মেনে নিইনি। তাই উদ্ভট কথা বলে নিজেকে হাসির পাত্রী বানিয়ো না।”

টেবিলে উপস্থিত সবাই রঞ্জকের কথা শুনে আঁড়চোখে তাকাল তার দিকে। সালিহা খাতুন মৃদু হেসে আওড়ালেন, “তাতে কী? তোমার বাবাও বড় গলায় বলে বেড়াতেন তোমার মাকে মেনে নেয়নি তারপরও তো তুমি জন্ম নিয়েছিলে। আমাদের বউমার সাথেও তেমন কিছু হবে না তার কী নিশ্চয়তা আছে?”

ধারা মুখ টিপে হাসলেও তাঁরা অসন্তোষে চোখ উল্টে মুখ বাঁকাল। রঞ্জক বিষিয়ে ওঠা গলায় খ্যাঁক করে উঠল। তীব্র আক্রোশে বলল, “নিশ্চয়তা অবশ্যই আছে কারণ আমার ক্যারেক্টর আমার স্বনামধন্য বাপের মতো লুজ নয়।” বলতে বলতেই রঞ্জক তার বাবার পানে বিদ্রুপাত্মক দৃষ্টে তাকাল, “ঠিক বললাম না?”

আরিজ মাহতাবিরের থমথমে মুখে সামান্যতম আলো-ছায়ার পরিবর্তনও ঘটল না। তিনি নিজের খাবারের প্লেটটা একটু দূরে ঠেলে সরিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। 

​সবাই যখন তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে ছিল, তখনই চোখে পড়ল ডাইনিং রুমের বিশাল দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে ফারিশ ও ইরা। তাদের ঠিক পেছনেই জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আলতা। রঞ্জক অবশ্য এখনো ঘাড় ফেরায়নি, তাই সে তাদের দেখতে পায়নি। আরিজ মাহতাবির তাদেরকে পাশ কেটে বেরিয়ে গেলেন। 

সালিহা বেগম পরিস্থিতি অন্যদিকে ঘোরাতে বললেন, “তোরা এলি তবে? আয় আয় খেতে বস।”

বড় চাচির কথায় রঞ্জক অলস ভঙ্গিতে ঘাড় ঘোরাতেই নজরে এলো আলতা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ফারিশ আলতার দিকে চেয়ে মৃদু স্বরে বলল, “চলো।”

​আলতা অস্বস্তিতে মুখ তুলে তাকাতেই রঞ্জক ঘাড় সোজা করে আবার নিজের খাবারের প্লেটে মন দিল—যেন আশেপাশে গুরুত্বপূর্ণ কিছুই ঘটছে না। 

“আপনারা খেয়ে নিন। আমি না হয় পরে খাবো।” আলতা অনুচ্চস্বরে বলল। তারপর উল্টো ঘুরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে চাইল। ​

কিন্তু সে এক পা ফেলার আগেই ইরা খপ করে তার হাতটা চেপে ধরল, “আরে মিমু তুমি চলে যাচ্ছো কেন? দুপুরে যেমন একসাথে বসে খেয়েছি। এখনো একসাথে বসেই খাবো।”

আলতা নিজের শুকনো ঠোঁটে জিভ বোলালো, “আমি… আমি একটু পরে আসি?”

ইরা বেঁকে বসল, “তুমি কি এখানে বসে খেতে চাইছো না? ঘরে বসে খাবে? ঠিক আছে, আমিও তোমার সাথে ঘরে বসেই খাবো।”

আলতা দোটানায় পড়ে গেল। অস্ফুটস্বরে কিছু একটা বলে চাইল, “ই-ইরা… শোনো…”

“তুমি কি আগের মতো একা একা খেতে চাইছো মিমু? তাহলে বলে দাও, আমি তোমাকে জোর করব না।” 

আলতা মুখ ফুটে বলতে পারল না কিছুই। জিভের আগায় চলে আসা কথাটা চেপে গিয়ে সে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ডাইনিং টেবিলের দিকে পা বাড়াল। মনে মনে ভাবল সে আসন গ্রহণ করা মাত্রই হয়তো অন্যপ্রান্তে বসে থাকা রঞ্জক উঠে চলে যাবে। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটলো না। রঞ্জক ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে খেয়েই চলল।

আলতা মাথা নিচু করে প্লেটের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। তাকে চামচের দিকে উদাসীন চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইরার পাশে বসা ফারিশ ধীরকণ্ঠে বলল, “দুপুরে যেমন হাত দিয়ে খেয়েছিলে এখনো তেমনি খেতে পারো।”

কথাটা শুনে রঞ্জকের খাওয়ার গতি মন্থর হয়ে এলো। বুকের ভেতরে একটা গোলমেলে অনুভূতি মোচড় দিয়ে উঠল। এদিকে আলতা কারও পানে চোখ তুলে তাকাল না। একপাশে লালচে চুলগুলোর পরিপাটি বেণি ঝুলিয়ে সে শান্ত মনে হাত দিয়েই ভাত মাখতে শুরু করল। 

রঞ্জক বিষাক্ত নজরে একে একে টেবিলে বসে থাকা প্রত্যেককে দেখে নিতে লাগল। তাঁরা বাদে প্রায় সবাই আলতার দিকে তাকাচ্ছে বারংবার। ইভান আর ধারার স্বামী কৌশিকের তাকানোটা রঞ্জকের কাছে ভালো ঠেকলো না। উপরন্তু ফারিশই বা কেন এতো দরদ দেখিয়ে ঘনঘন তাকাচ্ছে আলতার দিকে? 

রঞ্জকের বিরক্তির মাত্রা বাড়লো। রাগে কিড়মিড় করতে করতে সে হঠাৎ একচামচ ভাত উঁচিয়ে ধরে টেবিল কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “ওহ শিট! এই মেয়ে এই, খাবার টেবিলে মাথায় কাপড় দিয়ে বসোনি কেন? এই দেখো তোমার মাথার চুল আমার খাবারে এসে পড়েছে।”

হঠাৎ এমন গর্জনে আলতা হতবুদ্ধি হয়ে তাকাল। রঞ্জক আরও একধাপ গলা চড়িয়ে বলল, “এক্ষুণি মাথায় কাপড় দাও, কুইক। একটা চুলও যেন দেখা না যায়।”

আলতা ভীরু চোখে একবার ডানে বায়ে তাকাল। রঞ্জক চোখ রাঙিয়ে বলল, “আশেপাশে কী দেখছ? তোমাকেই বলছি, ড্যাম ইট!”

বাড়ির সবার সামনে এমন অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে কুণ্ঠায় জড়সড় হয়ে গেল আলতা। ধীর হাতে শাড়ির আঁচল টেনে মাথা ঢেকে নিল। 

ধারা কপাল কুঁচকে বলল, “তুই ওকে ধমকাচ্ছিস কেন? টেবিলের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে চুল উড়ে গিয়ে তোর পাতে ল্যান্ড করেছে? তোর ধারণা এখানে উপস্থিত শুধু আলতার মাথাতেই চুল আছে?”

“চুল সবার মাথাতেই আছে কিন্তু এই চুলটা ওই মেয়েটার।” 

ধারা চাপা কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “তুই এত শিওর হয়ে কীভাবে বলছিস যে ওটা আলতারই চুল?”

রঞ্জক থতমত খেয়ে গেলেও মুখে কোনো ভাবান্তর প্রকাশ পেতে দিল না। সামলে নিয়ে বলল, “কারণ এটা মেয়েদের চুল। আমাদের বাড়ির ছেলেরা এতোবড় চুল রাখে না।”

ইরা বলে উঠল, “মেজো মামু, তুমি কি বোঝাতে চাইছ এই বাড়িতে মিমু ছাড়া আর কোনো মেয়ে নেই?”

ইভানও সায় দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আর একটু ভালো করে তাকিয়ে দেখ, নতুন বউয়ের চুল সুন্দর করে বেণি করা, অথচ আমাদের তাঁরার চুল একদম খোলা। হতে তো পারে ওটা তাঁরারই চুল!”

তাঁরা রক্তচক্ষু মেলে ইভানের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “অসম্ভব ওটা আমার চুল হতেই পারে না। বরঞ্চ ওটা তোমার বউয়ের চুল হতে পারে, ইভান ব্রো।”

ইভান অবাক হওয়ার ভান করে বলল, “আমার বউ? কই আমার বউ? আমি তো দেখতেই পাচ্ছি না। কই গো বউ? কই তুমি? দেখি না কেন তোমাকে?”

তাঁরা ভেংচি কেটে বলল, “তুমি কি চুলটা দেখতে পাচ্ছো?”

ইভান রঞ্জকের তুলে ধরে রাখা চামচের দিকে সূক্ষ্ম নজর বুলাতে গেল। তা দেখে রঞ্জক চট করে চামচটা নিচে নামিয়ে রাখল। 

ইভান তৎক্ষণাৎ সন্দেহভরা গলায় বলল, “কই দেখি, চুলটা আমার কাছে দে।”

রঞ্জক থমকে গেল। চুল কোত্থেকে আসবে? সে তো মিছে ছুতোয় আলতার চুল ঢাকতে চেয়েছে। এরা এতো কেন ঘাটাঘাটি করছে? 

রঞ্জক তেঁতো স্বরে বলল, “চুল দিয়ে কী করবি?”

তাঁরা ফোড়ন কাটল, “ডিএনএ টেস্ট করবে ব্রো। তুমি চুলটা ওর দিকে পাস করে দাও।”

“সিরিয়াসলি? ডিএনএ টেস্ট?!” ধারা চরম হতবাক।

​রঞ্জক দাঁতে দাঁত চেপে চাপা গলায় বলল, “কোনো ডিএনএ টেস্টের প্রয়োজন নেই। এটা যে ওই মেয়েটারই চুল, সে বিষয়ে আমি শতভাগ নিশ্চিত!”

ফারিশ এতোক্ষণ চুপ থাকলেও এবার মুখ খুলল, “তুমি যেভাবে দাবি করছ, তাতে তো মনে হচ্ছে সত্যিই ডিএনএ টেস্ট করানো ছাড়া উপায় নেই।”

“বললাম তো প্রয়োজন নেই।”

“তাহলে এটাই বলে দাও তুমি এতোটা নিশ্চিতভাবে কীভাবে বলছো?” ফারিশ জোর দিল।

রঞ্জক কোণঠাসা হয়ে পড়ল। অতোশতো না ভেবেই বলে দিল, “কারণ ওর চুলের রঙ লাল। তাই তো সবাই ওর দিকে তাকিয়ে থাকে, রাইট? এই চুলটাও লাল রঙের।”

রঞ্জকের উত্তরে সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেলেও আলতা ঠোঁট চেপে রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। রঞ্জক তার দৃষ্টি এড়িয়ে অস্বস্তি লুকাতে দ্রুত মুখে খাবার পুরতে যাচ্ছিল অমনি আরজু বেগম বলে উঠলেন, “কিন্তু তুই তো কালারব্লাইন্ড।”

মায়ের কথার রেশ ধরে ইভান চোখ বড় বড় করে বলল, “আরে হ্যাঁ, তাই তো! তুই না প্রোটানোপিক? তারপরও কীভাবে বুঝলি ওই চুলটার রঙ লাল?”

এহেন প্রশ্নে রঞ্জকের পক্ষে আর বসে থাকা সম্ভব হলো না। সে একপ্রকার ছিটকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। 

ইভান পেছন থেকে চিল্লিয়ে তাগাদা দিল, “আরে দাঁড়া দাঁড়া! চুলটা রেখে যা!”

রঞ্জক শুনলো না, চলেই গেল। ইভান মাথা চুলকে বিড়বিড় করে উঠল, “যাহ বাবা! ও এমন স্ট্রেইজ বিহেভ করছে কেন?”

সালিহা খাতুন অসন্তোষ প্রকাশ করে ধীরকণ্ঠে বললেন, “এভাবে বারবার ওকে মনে করিয়ে দেওয়াটা কি জরুরি যে ও রঙান্ধ?”

আরজু বেগম নির্বিকার রইলেন। আলতা নিঃশব্দে হাত চালিয়ে আবার খেতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পরেই পরিবেশের আবহ বদলে দিয়ে রঞ্জক সেখানে ফের হাজির হলো। ততক্ষণে আলতার খাবার প্রায় শেষ পর্যায়ে। রঞ্জক আঁড়চোখে খেয়াল করল, এখনো কৌশিক আর ইভান চোরা চোখে আলতাকে দেখেই যাচ্ছে। 

রঞ্জক হাতের ফোনে দৃষ্টি আটকে বলল, “আমার ঘরে থাকা পাখিটা দুদিন ধরে অসুস্থ, কোনো খাবার মুখে তুলছে না। মনে হয় ডায়রিয়া হয়েছে। হেগে হেগে আধমরা হয়ে গেছে। আমি তো দুর্গন্ধের ঠেলায় কাছেও ঘেঁষতে পারছি না।” 

খাবারের টেবিলে রঞ্জকের এমন অমার্জিত কথায় মুহূর্তেই স্তব্ধতা নেমে এলো। সবাই খাওয়া থামিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল রঞ্জকের দিকে। 

ইভান হতভম্ব গলায় বলল, “হোয়াট্‌স রং উইথ ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ, ব্রো?”

“কেন বুঝতে পারিসনি? বাংলাতেই তো বললাম।”

“বুঝতে পেরেছি কিন্তু এভাবে না বললেও হতো।”

“আই নো, বাট সবাই যাতে বুঝতে পারে তাই সহজ বাংলায় বললাম।”

আলতা তো অজান্তেই উঠে দাঁড়িয়েছে। চোখের কোণে জমাটবদ্ধ আতঙ্ক উপচে পড়ল তার। রঞ্জক সেই চোখে চোখ না রেখেই বলল, “কেউ যদি ওকে আমার ঘর থেকে বের করে আনতে পারে, আমি তাকে নগদ একশত এক টাকা উপহার দেবো।”

আরজু বেগমের ইশারায় গৃহকর্মী নাবিল বিনীত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল রঞ্জকের দিকে, “আমি এখনই গিয়ে ঘর আর খাঁচা পরিষ্কার করে দিচ্ছি, মেজো সাহেব।”

রঞ্জক চকিতে ভ্রূ কুঁচকে তার দিকে তাকাল, “আমি কি তোমাকে যেতে বলেছি, নাবিল?”

ধারা টিটকারি মেরে বলল, “তাহলে কি তুই আমাদের কাউকে যেতে বলেছিস? তোর ধারণা আমরা একশত এক টাকার লোভে সেই অসুস্থ পাখিটাকে বের করে আনতে যাবো যার কাছে তুই পেট লাভার হয়েও ঘেঁষতে পারছিস না?”

“একশত এক টাকা তোর কাছে কিছুই মনে হলো না? জানিস একশত টাকা উপার্জন করতে কতোটুকু পরিশ্রম করতে হয়?”

ধারা মুখ বাঁকিয়ে বলল, “ঠিক আছে তুই-ই তাহলে বের করে আন গিয়ে। আমি তোকে একশো না পুরো পাঁচশো পাঁচ টাকা দেবো। আর তুই যদি না পারিস তাহলে ভেবে দেখ একশোর পরে আরও কয়েকটা শূন্য বসিয়ে বাজেট বাড়ালে যেতে পারি আমি।”

রঞ্জক প্রচণ্ড বিরক্ত হলো, “অই, তুই তোর পন্ডিতি বন্ধ কর তো! তোকে যেতে হবে না। যে একশো এক টাকার বিনিময়ে রাজি হবে সেই যাক। তোর মতো নবাবের বেটিকে দিয়ে কাজ করালে পোষাবে না আমার।”

নাবিল আবার বলল, “আমিই তো করে দিচ্ছি, মেজো সাহেব…”

রঞ্জকের চোখ-মুখ রাগে রক্তবর্ণ ধারণ করতে শুরু করল। পকেটে ফোনটা চট করে পুরে ফেলে, শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে বলল, “তুমি সত্যিই যেতে চাইছো?”

নাবিল ভয় পেয়ে গেল। আশ্চর্য! অন্য সময় তো কার্য হাসিলে রঞ্জক এভাবে ভয় দেখায়। অথচ আজ উল্টোটা করছে কেন? 

নাবিল শুকনো ঢোক গিলে বলল, “ইয়ে মানে আমি যেতে চাইছি না। কিচেনে আমার প্রচুর কাজ পড়ে আছে… ক্ষমা করবেন, আমি যেতে পারব না!”

রঞ্জক নাবিলের বাহুতে আলতো হাতে দুটো চাপড় মেরে বলল, “ভেরি স্যাড! বাট ইটস ওকে… যাও, নিজের কাজ করো গিয়ে।”

নাবিল দ্রুত পায়ে কিচেনের দিকে চলে গেল। আরজু বেগম স্তম্ভিত হয়ে রঞ্জকের এই খামখেয়ালি আচরণ দেখলেন। বাকিরাও নিজেদের মতো পুরো ঘটনাটা বিশ্লেষণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। 

রঞ্জক অবশ্য কাউকে জট খোলার সুযোগ দিল না। হঠাৎ ফোনে কল আসার ভান করে কানের কাছে ফোন নিয়ে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, রেডি থাক… আমি এক্ষুণি আসছি! আজ রাতে তোদের বাড়িতেই থাকব বুঝলি? ঘরে ঢোকার কোনো স্কোপই নেই রে ভাই!”

বলতে বলতেই রঞ্জক সদর দরজার দিকে হাঁটা ধরল। পরপরই টেবিল ছেড়ে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল আলতা। বুকের ভেতরটা তার অনবরত বিকট শব্দে ধকধক করছে। সে কাউকে কিছু না বলে তড়িৎ গতিতে দৌড় লাগাল সিঁড়ির দিকে। চঞ্চল পায়ে এক নিঃশ্বাসে সিঁড়ি ডিঙিয়ে চলে এলো চারতলায়; রঞ্জকের ঘরের সামনে। আলতো হাতে দরজার কপাটে মৃদু বলপ্রয়োগ করতেই খুলে গেল দরজাটা। পা বাড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে নেবে তখনই কানের কাছে বেজে উঠলো রঞ্জকের মুখনিঃসৃত কিছু তিক্ত কথা:

‘তোমার বাড়িতে কি জায়গার অভাব পড়েছিল? যে এই নোংরা আবর্জনাকে আমার ঘরে পাঠিয়ে দিলে?’

আলতার পা মাঝপথেই থমকে গেল। কানের পর্দায় আবার ধাক্কা খেলো স্বামীর তাচ্ছিল্য ভরা কণ্ঠ: 

‘শুনে রাখো সবাই। এই মেয়েটার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমি কোনোদিনও ওকে বউ হিসেবে মেনে নেব না।’

আলতা দুহাতে নিজের কানে চেপে ধরল। এক অদেখা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল তার শরীর। উল্টো ঘুরে চলে যেতে নেবে তখনই মনে পড়ে গেল জুবা অসুস্থ! সে এভাবে চলে যেতে পারে না। তাকে যে করেই হোক জুবাকে বের করে আনতে হবে।

আলতা নিরুপায় হয়ে আবার দরজার দিকে ফিরল। সমস্ত অপমান গিলে খেয়ে নিশ্চল পায়ে চৌকাঠ পেরোলো সে। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল সে; কোন দিকে যাবে এখন? বিশাল সেই অ্যাকুয়ারিয়ামের দিকে? নাকি ইনডোর গার্ডেন কিংবা বেডরুমের দিকে? ঠিক কোনদিকে গেলে সে তার জুবাকে পাবে? 

আলতা দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে গার্ডেনের দরজার সামনে পৌঁছালো। দরজার নব ঘোরানোর চেষ্টা করেও সফল হলো না। এরপর দিশেহারা হয়ে বেডরুমে প্রবেশের চেষ্টা করল কিন্তু সেই দরজাও খুললো না। যার মানে রঞ্জক হয়তো লক করে রেখে গেছে সবগুলো দরজা। 

কিশোরীর সরল মন ধাঁধায় পড়ে গেল! দরজায় তালা লাগিয়ে কেন লোকটা হাহুতাশ করছিল তবে? সে যদি জুবার কাছে পৌঁছানোর দরজাই খোলা না রাখে তাহলে কেউ কীভাবে জুবাকে বের করে আনবে?

আলতা প্রাণপণে দরজার লক খোলার নিষ্ফল চেষ্টা করে যাচ্ছিল এমন সময় পেছনে থাকা ড্রইংরুমের ভারী দরজাটা সপাটে বন্ধ হওয়ার শব্দ শ্রবণগোচর হলো। চকিতে পেছনে ফিরে তাকাল আলতা। চোখের সামনে যা দেখল, তাতে তার পুরো শরীর হিম হয়ে এলো! 

বন্ধ দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দণ্ডায়মান রঞ্জক। সে নিচু চোখে নিজের দুই হাতে কালো রঙের একজোড়া গ্লাভস এঁটে নিচ্ছে। রঞ্জকের শান্ত, নিটোল ধূসর নেত্রদ্বয়ের পেছনে ঠিক কী মনোভাব লুকিয়ে আছে—তা অনুমান করার ক্ষমতা নেই আলতার। ভয়ে কিশোরীর বুকের ভেতরের অলিন্দ-নিলয় যেন নিমেষে সংকুচিত হয়ে এলো!

“আ-আপনি? আপনি না বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন?” আলতার কণ্ঠস্বর কাঁপতে কাঁপতে আটকে গেল। সে আতঙ্কে পেছাতে পেছাতে বন্ধ বেডরুমের দরজার সাথে নিজেকে একেবারে মিশিয়ে ফেলতে চাইল।

রঞ্জক হাতা গুটিয়ে শান্ত পায়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, “বেরিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এলাম।”

​“ক-কেন?”

​“মুড চেঞ্জ হয়ে গেছে।”

আলতার ভয়ার্ত চাউনির অভিমুখে রঞ্জক ফিচেল হাসলো। ষোড়শীর দিকে আর এক পা এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “ওহ হো, তুমি তো আবার ইংরেজি বোঝো না! বাংলায় বলছি, বাড়ি থেকে বেরোনোর সাথে সাথেই আমার মন-মতলব পরিবর্তন হয়ে গেল। তাই ফিরে এলাম।”

আলতার বুক ওঠানামা করতে লাগল, শ্বাসের গতি তাল হারিয়ে এলোমেলো হয়ে গেল। দক্ষ শিকারির ন্যায় এক পা দুই পা করে তার দিকেই অগ্রসর হচ্ছে রঞ্জক।

​আলতা জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, “আ-আমি জুবাকে নিয়ে যেতে এসেছি… ও-ওকে নিয়ে যেতে দিন।”

“ও আচ্ছা। তুমি তাহলে একশত এক টাকার লোভে পড়ে আমি বেরোনো মাত্রই ছুটে চলে এলে?”

আলতার গলা শুকিয়ে এলো। কান্না গিলে গলা ভিজিয়ে বলল, “আমার কোনো টাকা লাগবে না। শুধু আমাকে ওর কাছে যেতে দিন। আমি ওকে নিয়েই চলে যাবো।”

রঞ্জক একেবারে আলতার সামনাসামনি চলে গেল। যদিও তাদের মাঝে তখনও সামান্য ব্যবধান বিদ্যমান। আলতা আতঙ্কে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল। মাথাটা নিচু করে অনুনয়ের সুরে বলল, “আমি শুধু জুবার জন্য এসেছি… বিশ্বাস করুন, আমার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই! ওকে দিয়ে দিলে আমি আর কোনোদিন আপনার ঘরে পা রাখব না!”

রঞ্জক আচমকা আলতার কবজি চেপে ধরল। আলতার শরীরটা মারাত্মকভাবে ঝাঁকি দিয়ে উঠল। সে অবাক দৃষ্টে রঞ্জকের ধরে রাখা হাতের দিকে তাকাতেই রঞ্জক বলল, “গ্লাভস পরে নিয়েছি। এবার আর তোমার সংস্পর্শে আমার হাত নোংরা হওয়ার আশঙ্কা নেই।”

আলতার ডাগর চোখ দুটো নোনা জলে ভরে উঠল। রঞ্জক তাকে টেনে নিয়ে গেল সোফার দিকে। 

আলতা অসহায় গলায় বলল, “দিয়ে দিন না… জুবাকে দিয়ে দিন! দয়া করে ওকে কষ্ট দেবেন না, দিয়ে দিন…”

সোফার একদম সামনে এসে রঞ্জক একটা নিচু টুল টেনে এনে সেখানে আলতাকে বসিয়ে দিল। হাত ছেড়ে দিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “বসো এখানে। পুরো ত্রিশ মিনিট চুপটি করে বসে থাকতে পারলে তবেই জুবার সান্নিধ্য পাবে।”

“সত্যি বলছেন? জুবাকে দিয়ে দিবেন?”

রঞ্জক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত গুঁজে শীতল কণ্ঠে বলল, “আগে বসো ত্রিশ মিনিট… তারপর ভেবে দেখবো।”

আলতা কিছুটা শান্ত হয়ে বসতেই রঞ্জক অন্যদিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে আলতার পেছনের সোফায় বসে পড়ল সে। আলতা সন্দিগ্ধ চোখে পেছনের দিকে তাকাতেই রঞ্জক একটি ছোট বক্স খুলে মেলে ধরল তার সামনে। 

“এগুলো আমি তোমার জন্য এনেছি,” রঞ্জকের রাশভারী কণ্ঠে আলতার সূক্ষ্ম ভ্রূজোড়া কুঁচকে একাকার হয়ে গেল।

​“আমার জন্য?” আলতা অবাক না হয়ে পারল না।

রঞ্জক কোনো কথা না বলে অনুচ্চ লয়ে ওপর-নিচ মাথা নাড়ল। আলতা বক্সটার ভেতরের দিকে ভালো করে নজর দিতেই দেখল; সারি সারি সাজানো বেশ কয়েকটি প্লাস্টিকের কেস।

“কী এগুলো?”

রঞ্জক একটি কন্ট্যাক্ট লেন্সের কেস হাতে তুলে নিয়ে বলল, “এগুলো চোখে পরে।”

​“চোখে পরে?! কেন?”

রঞ্জক কেসটি খুলতে খুলতে বলল, “বেশি প্রশ্ন কোরো না। আমি তোমাকে পরিয়ে দিচ্ছি। তারপর তুমিই বুঝতে পারবে এগুলো কী আর কেন পরে।”

কেস থেকে একজোড়া লেন্স বের করে অ্যাপ্লিকেটরে রেডি করে নিল রঞ্জক। আলতা পুরোটা সময় কপালে ভাঁজ ফেলে তাকিয়ে রইল। 

পর মুহূর্তেই রঞ্জক নিজের এক হাত বাড়িয়ে আলতার চিবুক চেপে ধরে তাকে নিজের একদম কাছাকাছি টেনে আনল! 

আলতা হড়বড়িয়ে উঠে তোতলাতে লাগল, “ক-কী করছেন?”

আলতার সন্ত্রস্ত মুখের ওপর আরও কিছুটা ঝুঁকে পড়ল রঞ্জক, সরাসরি চোখ রাখল আলতার ভয়ার্ত চোখে। রঞ্জকের নিঃশ্বাসের উত্তাপ আর এমন অতর্কিত সান্নিধ্যে আলতার নিঃশ্বাস আটকে গেল যেন!

“ছা-ছাড়ুন আমাকে, ছেড়ে দিন।” আলতা চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলে ছটফট করতে লাগল।

​রঞ্জক কড়া গলায় বলল, “স্থির থাকো। চোখ মেলে তাকাও আমার দিকে। এটা পরিয়েই ছেড়ে দেবো।”

আলতা শুনতেই পেল না। তার ছটফটানি আর হাত-পা ছোড়াছুড়ি দ্বিগুণ বেড়ে গেল। যা দেখে রঞ্জক বিরক্তির স্বরে ধমকে উঠল, “কথা না শুনলে এক্ষুণি ঘর থেকে বের করে দেব তোমাকে! তখন জুবাকে চোখের দেখাও দেখতে পাবে না। তাই ভালোয় ভালোয় তাকাও আমার দিকে।”

জুবার প্রসঙ্গ আসতেই আলতা থমকে গেল। সে ভয়ে ভয়ে, কাঁপা কাঁপা পলকে রঞ্জকের দিকে তাকাল। রঞ্জক তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে, অতি সাবধানে অ্যাপ্লিকেটর দিয়ে আলতার চোখে কন্ট্যাক্ট লেন্স পরাতে উদ্যত হলো। 

লেন্সের সংস্পর্শে আসতেই আলতার চোখজোড়ায় হুহু করে জল উপচে পড়ল, নোনাজলে ভরে গেল গাল। চোখের সাদা অংশ বিষম জ্বালায় লালচে হয়ে উঠলেও রঞ্জকের রঙান্ধ চোখে সেই লালিমা ধরা পড়ল না। দুটো চোখেই সাবধানে লেন্স পরিয়ে রঞ্জক আলতাকে ছেড়ে দিল।

“আহ্ কী পরিয়েছেন এগুলো? খুব জ্বালা করছে।” বলতে বলতেই আলতা নিজের চোখ ডলতে উদ্যত হতেই রঞ্জক তার হাতজোড়া চেপে ধরে বলল, “প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হবে। তারপর আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। হাত দিয়ে ডলতে যেও না তাতে সমস্যা হবে।”

“এখনো কমছে না খুব জ্বলছে। আপনি কী করেছেন? আমার চোখ! আমার চোখ নষ্ট করে দিয়েছেন?”

“দিতেও পারি। তুমি আমাকে থাপ্পড় মেরেছিলে তা মোটেও ভুলে যাইনি আমি।” রঞ্জকের হটকারিতায় আলতার বুকটা ভারী হয়ে এলো। হাত ছাড়ানোর চেষ্টা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “সামান্য একটা থাপ্পড়ের প্রতিশোধ নিতে আপনি আমার চোখ নষ্ট করে দিয়েছেন? আপনি এমনটা কীভাবে করতে পারেন? আমার চোখ ঠিক করে দিন… দয়া করে আমার চোখ আগের মতো করে দিন!”

​“কেন ঠিক করব? তুমি আমাকে থাপ্পড় মেরেছ, তাই আমিও—”

“আপনিও কী হ্যাঁ? সামান্য একটা থাপ্পড়ের বদলা নিতে কেউ কারো চোখ নষ্ট করে দেয়? আহ্… আমার চোখ!” 

“এখনো জ্বালা করছে?” এই প্রশ্নে আলতার টনক নড়লো সে অনুধাবন করল জ্বালাপোড়া আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। 

“জ্বালা কমলে চোখ মেলে তাকাতে পারো এখন।”

আলতা পিটপিট করে তাকাতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল রঞ্জকের তীক্ষ্ণ মুখচ্ছবি। ঝটকা মেরে বেশ অনেকটা সরে গেল আলতা। সে বুঝতেও পারেনি তারা এতোটা কাছাকাছি ছিল। দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে শাড়ির আঁচলে চোখ মুখ মুছে নিয়ে বলল, “এবার জুবাকে ফিরিয়ে দিন।”

“সবেমাত্র আট মিনিট হয়েছে। এখনো বাইশ মিনিট বাকি। চুপচাপ আমার সামনে এসে স্থির হয়ে বোসো।”

আলতার মেজাজ খারাপ হলেও উপায়ান্তর না পেয়ে সে অগত্যা রঞ্জকের দিকে পিঠ ফিরিয়ে আবার চুপচাপ টুলে বসে পড়ল। রঞ্জক হাতের গ্লাভস ঠিক করে আলতার পিঠের ওপর ঝুলে থাকা চুলের বেণিতে হাত দিল। আচমকা অনাকাঙ্ক্ষিত ছোঁয়ায় শিউরে উঠে বিদ্যুৎবেগে পেছনে ঘুরে তাকাল আলতা! 

মুখে কিছু না বললেও তার আতঙ্কিত আর প্রশ্নবিদ্ধ চোখের চাউনি দেখে রঞ্জক আলতো আঙুলে নিজের চশমার ফ্রেমটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে বলল, “তোমার হেয়ারফল হচ্ছে তাই একটা হেয়ারপ্যাক লাগিয়ে দিচ্ছি, এতে হেয়ারফল কমে যাবে।”

আলতার চাউনিতে অবিশ্বাস ফুটে উঠলেও রঞ্জক তা এড়িয়ে গিয়ে বলল, “কী? হেয়ারফল মানে বুঝতে পারোনি? এটা মানে…”

“আপনি চুল পড়ার কথা বলছেন তো? আমি বুঝতে পেরেছি। ফারিশ ভাইয়া শিখিয়েছে হেয়ার অর্থ চুল।”

“বাহঃ ভালোই শেখাচ্ছে দেখছি।”

“হুম।”

​“হয়েছে, এবার সামনের দিকে মুখ করে সোজা হয়ে বসো।”

আলতা ফিরল না। একই ভঙ্গিতে একদৃষ্টে চেয়ে রইল। রঞ্জক তার সাথে নজর মেলালো না, হাতঘড়ির ওপর অলস চোখজোড়া বুলিয়ে বলল, “তুমি কিন্তু সময় নষ্ট করছো।”

“আপনি জানেন? আপনাকে আমার চুল পড়া নিয়ে ভাবতে হবে না।”

রঞ্জক নিজ উদ্যোগে আলতার ঘাড় সোজা করে দিল। বিরক্তি চেপে বলল, “আমাকে কী ভাবতে হবে আর কী ভাবতে হবে না তা তোমাকে বলে দিতে হবে না।”

বলেই রঞ্জক আলতার চুলে হাত দিল। আলতা চুপটি করে বসে থাকল। রঞ্জক তার বেণি খুলে চুলগুলোয় আঙুল চালিয়ে আলগা ও ঝরঝরে করে নিল। হঠাৎ আলতার মনে ভয় দানা বাধল। কিশোরী তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না। আপনি আমার চুল কেটে ফেলবেন না তার কী নিশ্চয়তা আছে?”

রঞ্জক এই দফায় চোখ তুলে তাকাল আলতার দিকে, “তোমার ট্রাস্ট ইস্যু আছে দেখছি।”

অনভ্যস্ত এই শব্দটার মানে বুঝতে পারল না আলতা। রঞ্জক বুঝিয়ে বলল, “ট্রাস্ট ইস্যু মানে বিশ্বাসজনিত সমস্যা। কাউকে বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে অসুবিধা হওয়া, এমনকি স্পষ্ট কোনো কারণ না থাকলেও কারো প্রতি আস্থা রাখতে না পারাকে ট্রাস্ট ইস্যু বলে।”

আলতা নিজের অস্বস্তি লুকিয়ে বলল, “তো আপনাকে বিশ্বাস করারও তো কোনো কারণ নেই। তখন খাবার খাওয়ার সময় কার না কার চুল আপনার পাতে পড়েছে আর আপনি সোজা আমার ওপর চেঁচিয়ে উঠলেন। সবার সামনে আমাকে অপমান করে যে আনন্দ পায় তাকে বিশ্বাস করবো? দুঃখিত আমি তা পারবো না।”

“আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে বলিওনি। করতে হবে না আমাকে বিশ্বাস, শুধু জুবার স্বার্থে আমি যা করতে বলছি তা বিনাবাক্যে করে যাও।”

আলতা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। রঞ্জক বলল, “তোমার হাতে বেশি সময় নেই। আমার কথা শুনতে অসুবিধা থাকলে চলে যেতে পারো।”

“আপনি তাহলে জুবাকে দেবেন না?”

“না, জুবাকে পেতে চাইলে আমার কথা শুনতে হবে।”

কোনো বিকল্প পথ না থাকায় আলতা অনিচ্ছাসত্ত্বেও এগোলো এবং বাটির দিকে তাকাল। বাটির ভেতর থকথকে একধরনের সাদা ঘন মিশ্রণ। আলতা শাড়ির আঁচল সামলে টুলে বসে পড়তেই রঞ্জক দু’হাতে মিশ্রণ নিয়ে নিখুঁতভাবে আলতার চুলে মাখতে লাগল। বিড়বিড়িয়ে নিচু স্বরে বলল, “যাই হোক চুল কেটে ফেলার বুদ্ধিটা কিন্তু খারাপ ছিল না। এই হেয়ারপ্যাকে কাজ না হলে সেটাই করতে হবে।”

আলতা আঁতকে উঠে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাতেই রঞ্জক তার চুল টেনে ধরল। মুহূর্তেই ষোড়শীর ঠোঁটের ফাঁক গলে যন্ত্রণার সুর বেরোল, “আউচ!”

“স্থির থাকো মেয়ে। নইলে ব্যথা পাওয়া সুনিশ্চিত।”

আলতার নাকের পাঠা লাল হয়ে এলো।

“আমার চুল এমনিতেই পড়ে না। এসব দেওয়ার পর যদি পড়ে তাহলে বুঝতে হবে আপনার টোটকাতেই ভেজাল ছিল।”

রঞ্জক প্রত্যুত্তর করল না। সে থোড়াই চুল পড়ার জন্য হেয়ারপ্যাক দিচ্ছে? সে তো দিচ্ছে অন্য কাজে।

​চুলের প্রতিটা পরতে প্যাক অ্যাপ্লাই শেষে রঞ্জক চুলগুলো খোপা বাঁধার চেষ্টা করল। কিন্ত সামলাতে না পেরে শেষমেশ হেয়ারব্যান্ড দিয়ে কোনোমতে পেঁচিয়ে আটকে দিয়ে বলল, “ব্যস! আমার কাজ শেষ এবার তুমি আসতে পারো।”

বলেই রঞ্জক নিজের হাতের ব্যবহৃত গ্লাভস জোড়া খুলতে খুলতে দরজার দিকে পা বাড়াল। বন্ধ দুয়ারের কপাট ফাঁক করে পেছনে নজর ফেরাতেই দেখল; কিশোরী তার দিকে ক্ষুব্ধ চোখে চেয়ে আছে। 

রঞ্জক বুকে হাত গুটিয়ে বলল, “কী হয়েছে?”

“আপনি জুবাকে দেবেন বলেছেন। তাড়াতাড়ি দিন ওকে।”

রঞ্জক একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “ওহ্, হুম। এক মিনিট দাঁড়াও।”

​রঞ্জক ড্রয়ার থেকে আরেক জোড়া গ্লাভস বের করে আবার হাতে এঁটে নিল। আলতা বিষয়টা অবাক চোখে খেয়াল করলেও গুরুত্ব দিল না। 

রঞ্জক বেডরুমের দরজা খুলে দিয়ে বলল, “যাও, জুবা ভেতরে আছে।”

আলতা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না, “আ-আমি ভেতরে য-যাব?”

​“হ্যাঁ, তোমাকেই বলেছি। ভেতরে যাও।”

আলতার চোখজোড়া আনন্দে ঝলমল করে উঠল! সে আর দ্বিধায় আটকে না থেকে ভেতরে ঢুকে পড়ল। রঞ্জকও গেল তার পিছু পিছু। দরজায় আলতার সাড়াশব্দ পাওয়া মাত্রই খাঁচার ভেতরে থাকা জুবা ডানা ঝাপটাতে লাগল!

“আলতা! আলতা! মা! মা-আআ!”

শেষের মা ডাকটা শুনে আলতার ত্রস্ত পা জোড়া থমকে গেল। সে যে কতোবার জুবার মুখ থেকে মা ডাক শুনতে চেয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। পাখিটা এর আগে কোনোদিনও ডাকেনি। অথচ এখন কোনো প্রত্যাশা না থাকা সত্ত্বেও মা ডাকল।

আলতার চোখজোড়া ছলছল করে উঠল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে হাত বাড়িয়ে আবার ছুটে যেতে উদ্যত হলো, “জুব-আ!”

আলতা দুপা এগোতেই রঞ্জক তড়িৎ বেগে তার বাহু টেনে ধরল। এক প্রকার জোর করেই তাকে টেনে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে যেতে রুক্ষ কণ্ঠে বলল, “দেখা পেয়ে গেছো। বেশ, এবার বের হও ঘর থেকে।”

আলতা প্রাণপণ চেষ্টা করেও জুবার কাছে পৌঁছাতে পারল না। রঞ্জক তাকে ঘরের বাইরে বের করেই দম নিল। 

আলতা এবার না পেরে ফুপিয়ে উঠল, “আপনি বলেছিলেন জুবাকে দিয়ে দিবেন।”

রঞ্জক হাতের গ্লাভস দুটো খুলে আলতার মুখের ওপর ছুড়ে মারল। বিদ্রুপ মাখানো শ্লেষের সুরে বলল, “আমি একেবারে দিয়ে দেবো বলিনি। দেখা করতে দিয়েছি এটাই অনেক। এখন যাও এখান থেকে।”

আলতার ভেতর জেদ চেপে বসল। রাগের বশে উগড়ে দিল, “আপনি একটা মিথ্যাবাদী, জোচ্চর, ভাওতাবাজ। আমি আপনাকে ঘৃণা করি।”

“সেম টু ইউ।” বলেই আলতার মুখের ওপর ধাম করে দরজাটা লাগিয়ে দিল রঞ্জক।

রাগে দুঃখে আলতার শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। দাঁতে দাঁত চেপে সে ফিরে এলো নিজের ঘরে। দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে সেখানেই বসে পড়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁন্নায় ভেঙে পড়ল সে। হঠাৎ আলতা অনুভব করল তার চোখ আবার জ্বলছে; ভীষণ অস্বস্তি হতে লাগল তার। চোখ মেলে সামনে তাকাতেই সবকিছু ঝাপসা, অস্পষ্ট আর ধোঁয়াটে নজর এলো। 

ভয় পেয়ে চোখ কচলাতে লাগল মানবী। তাতে লাভের লাভ কিচ্ছুটি হলো না উল্টো তীব্র ব্যথা শুরু হলো। মনে পড়ে গেল রঞ্জক চোখ ডলতে নিষেধ করেছিল। 

ভীতসন্ত্রস্ত আলতা হাতড়াতে হাতড়াতে ড্রেসিং টেবিলের দিকে অগ্রসর হলো। ঝাপসা চোখে আয়নায় ভেসে ওঠা নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে আতঙ্কে সবটুকু শক্তি খাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, 

“নাআহ্!”

চলবে…

শব্দসংখ্যা: ৪৫০০+

(আমি অত্যন্ত দুঃখিত। এতোদিন গল্প দিতে পারিনি। আমি অনেক বড় একটা ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে ঝামেলা মিটে গেছে। যারা আমাকে মেসেজের ওপর মেসেজ দিয়েছেন তাদেরকে এত্তগুলা ভালোবাসা। আমি কাউকে রিপ্লাই দিতে পারিনি তার জন্য সরি। এই পর্বটায় রেসপন্স করুন। পরবর্তী পর্ব দ্রুত দেওয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply