Golpo romantic golpo কালারব্লাইন্ড

কালারব্লাইন্ড পর্ব ১২


#কালারব্লাইন্ড — ১২

#সোফিয়া_সাফা

সময়টা তখন বিকেলবেলা। ছিমছাম ব্যালকনিতে পেতে রাখা নরম গদির ওপর গুটিসুটি মেরে বসে আছে আলতা। নিজের পা দুটো জোড়া করে বুকের কাছে টেনে এনে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে সে; শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে বাইরের প্রকৃতির দিকে। তার লালচে চুলগুলো পিঠের ওপর অবিন্যস্তভাবে ছড়িয়ে আছে। আলতার পাশেই চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছেন তার মা ইছাপূর্ণা। তিনি মেয়েকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করে চলেছেন। অবশ্য পুরোপুরি বুঝিয়ে উঠতে পারছেন না।

“তোর শ্বশুর বলেছেন আমাদের মাসখানেক থাকতে। কিন্তু তোর বাপকে নিয়ে অতোদিন থাকলে মান-সম্মানের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তাছাড়াও বাড়িতে হাঁস-মুরগি, ছাগল আছে। তোর কাকি ঠিকমতো দেখাশোনাও করবে না। তাই ভেবেছি কাল-পরশুই ফিরে যাবো।”

মায়ের কথাগুলো আলতার কানে পৌঁছালেও সে কোনো উত্তর দিল না। ইছাপূর্ণা মেয়ের হাতটা মুঠোয় নিয়ে বললেন, “তুই বুঝতে পারছিস তো মা? তোকে এই বাড়ির লোকেদের মন জুগিয়ে চলতে হবে, বিশেষ করে জামাইয়ের। আর যাই হোক, রঞ্জক কিন্তু বাড়ির লোকেদের কিছুই জানায়নি। তোর হাতে এখনো সময় আছে ওকে নিজের বশে আনার।”

আলতা ক্লান্ত চোখে মায়ের দিকে তাকাল। মেয়ের চোখের ভাষা ঠিক ঠাহর করতে পারলেন না ইছাপূর্ণা। খানিকটা হকচকিয়ে তিনি গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললেন, “অন্তত একবার চেষ্টা করে তো দেখ। আমার বিশ্বাস, তুই একটু চেষ্টা করলেই পারবি।”

আলতার চাউনি ধীরে ধীরে অবুঝের মতো হয়ে এলো। ইছাপূর্ণা ধারণা করলেন, মেয়ে তার কথা বুঝতে পারছে না। তাই তিনি সহজ করে বোঝানোর প্রয়াস করলেন,

“অনেকের ভাঙা সংসারও জোড়া লেগে যায় একটা সন্তানের বদৌলতে। তুই-ই ভেবে দেখ না, তুই যদি না জন্মাতিস তাহলে আমি তোর বাপের সংসার করতেই পারতাম না।”

কথাটা শুনেই আলতা তেঁতে উঠল, “খুব ভালো হতো আমি না জন্মালে। তোমাদের সংসার ভেঙে গেলে আরও ভালো হতো। প্রতিনিয়ত তোমাকে ওই অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে হতো না।”

ইছাপূর্ণা মেয়ের মুখ চেপে ধরলেন। চারপাশটা একবার আতঙ্কিত চোখে দেখে নিলেন। তারপর কাঁপা গলায় বললেন, “অলক্ষুণে কথা বলিস না মুখপুড়ি। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে স্বামী ছাড়া নারীদের কোনো মূল্য নেই। যে নারীকে তার স্বামী ছেড়ে দেয়, সেই নারীর মরে যাওয়া উচিত।”

মায়ের হাতটা সরিয়ে দিল আলতা। চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল, “তুমি কি আমাকে মরে যেতে বলছো?”

ইছাপূর্ণার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। শিউরে উঠে বললেন, “একদম না। তুই কেন মরবি? তোর স্বামী আছে, সাজানো-গোছানো সংসার আছে। তোকে যেন মরতে না হয়, সেইজন্যই তো আমি তোর সংসারটা বাঁচাতে চাইছি।”

আলতার চোখজোড়া টলমল করে উঠল। দৃষ্টি কোনো এক ঠিকানাহীন স্থানে নিবদ্ধ করে রুদ্ধশ্বাসে বলল, “যেই সংসারের জন্মই হয়েছে মৃত অবস্থায়, সেই সংসারকে তুমি কীভাবে বাঁচাবে? তার চেয়ে আমাকেই মেরে ফেলো।”

ইছাপূর্ণা নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। আলতা নিজেই বলে চলল, “আমাকে বোঝাতে এসো না যে বাবা তোমাকে আমার জন্য রেখেছে। সত্যি তো এটাই তুমি নিজেই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সব অত্যাচার সহ্য করেও তার সংসারে পড়ে আছো।”

ইছাপূর্ণা খানিকক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর গলা পরিষ্কার করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুরে বললেন, “এটা সত্যি নয়। তুই না জন্মালে তোর বাপ আরেকটা বিয়ে করার অনুমতি পেয়ে যেতো। তখন আর আমার কিছুই করার থাকতো না।”

“কিন্তু তোমরা কোনোদিনও আমাকে চাওনি মা। তোমরা একটা ছেলেসন্তান চেয়েছিলে।”

ইছাপূর্ণা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। তিনি প্রস্থান করার উদ্দেশ্যে মুখ ঘুরিয়ে উঠে দাঁড়াতেই আলতা নিস্তেজ হাতে তার শাড়ির আঁচল টেনে ধরল। অত্যন্ত নিচু গলায় বলল, “আমি না জন্মালেই ভালো হতো মা। এটা তুমি মেনেই নাও এবার। এই দেখো, আমিও মেনে নিয়েছি।”

“জন্ম-মৃত্যু আমাদের হাতে নেই আলতা। আমরা শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টাটুকুই করতে পারি। এরচেয়ে বেশি কিছুই না। তোকেও সেটাই করে যেতে হবে।”

“আমি করিনি বলছো?”

ইছাপূর্ণা মেয়ের দিকে তাকালেন, “এখন করছিস না।”

“আর কী করতে বলছো? বেঁচে থাকার চেষ্টাতেই তো নির্লজ্জের মতো এখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছি। আমার জায়গায় তুমি হলে পারতে এতোটা নির্লজ্জ হতে?”

ইছাপূর্ণা মেয়েকে কাছে টেনে নিলেন। মেয়ের মাথার ওপর নিজের থুতনি নামিয়ে রেখে বললেন, “যা হয়েছে তাতে তোর কোনো দোষ ছিলো না মা। তুই তো আমার নিষ্পাপ বাচ্চা, পাপী তো তারা যারা তোকে কলঙ্কিত করেছে। মরে যাওয়া তো তাদের উচিত। আমি এক ব্যর্থ মা, যে নিজের ফুটন্ত ফুলকে নরপিশাচদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারিনি।”

মায়ের শরীরের পরিচিত ঘ্রাণে আলতা কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পেল। সে হাত উঁচিয়ে মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরতে যাবে, তখনই তার মা বলে উঠলেন, “মাকে খারাপ মনে করিস না আলতা। মা তোর খারাপ চাইনা। তোকে তোর সংসার আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে হবে।”

ইছাপূর্ণা মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “রঞ্জক তোর কাছে না এলেও তুই সবসময় ওর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করবি। আমি কী বলতে চাইছি, তুই বুঝতে পারছিস তো মা?”

ইছাপূর্ণার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলেও তিনি ইনিয়েবিনিয়ে বললেন, “একটা বাচ্চা হয়ে গেলেই রঞ্জক আটকা পড়ে যাবে। তখন ও চাইলেও আর তোকে ছাড়তে পারবে না। তোর সাথে আগে কী হয়েছে, সেটাও বাইরের কারো কাছে বলতে পারবে না। কারণ তখন আর তুই শুধু ওর স্ত্রী থাকবি না, ওর সন্তানের মাও হয়ে যাবি।”

ইছাপূর্ণার কথাগুলো শুনে আলতার পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে গেল। মাকে জড়িয়ে ধরার উদ্দেশ্যে ওঠানো হাতদুটো আপনা-আপনি থমকে রইল মাঝপথে। মেয়ের নীরবতায় ইছাপূর্ণা বুঝতে পারলেন না, সে আদৌ কথাগুলো বুঝতে পেরেছে কি না। তাই তিনি মেয়েকে ছেড়ে দিয়ে একটু দূরত্ব বাড়িয়ে মেয়ের মুখটা দুহাতের আঁজলায় নিলেন।

সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের লাল হয়ে ওঠা মুখটা দেখে থমকে গেলেন তিনি। আলতার চোখ দুটোও লালবর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। 

ইছাপূর্ণা শুকনো ঢোক গিললেন, “আল-তা…”

“তুমি চাইছো এইবার আমি যেচে পড়ে ধ`র্ষণ হতে যাই? বলো মা, তুমি কি এটাই চাইছো?”

ইছাপূর্ণার চোখ বড় বড় হয়ে গেল, “এসব তুই কী বলছিস আলতা? রঞ্জক তোর স্বামী হয়।”

“তো? বাচ্চা জন্ম দিতে হলে তো সেই স্বামীর দ্বারাই ধ…?”

ইছাপূর্ণা মেয়ের মুখ চেপে ধরলেন, “বালাইষাট! তোর মাথা ঠিক আছে তো? কিসের সাথে কী মেলাচ্ছিস? স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার পবিত্র সম্পর্ক নিয়ে এমন মন্তব্য করতে বিবেকে বাধলো না?”

আলতা তার হাত সরিয়ে দিল। নিস্তরঙ্গ কণ্ঠে বলল, “আমি ভুল কিছু বলিনি মা। একে তো সে আমাকে স্ত্রী হিসেবে মানে না, আর নাতো আমার ভালো লাগে তাকে। তাই সে আমার কাছে এলে আমার ততোটাই কষ্ট হবে, যতোটা সেদিন হয়েছিল। আমি সহ্য করতে পারব না। আমি ওগুলো সহ্য করতে পারব না। আমার খুব কষ্ট হবে। খুব কষ্ট হবে।”

বলতে বলতেই আলতা নিজের শরীর চুলকাতে শুরু করল। বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “ওরা এখানে ছুঁয়েছে, ওখানেও… নোংরা হয়ে গেছে। আমার পুরো শরীর নোংরা হয়ে গেছে। আমাকে পরিষ্কার করতে হবে। দাগগুলো লুকাতে হবে। হ্যাঁ, এক্ষুণি করতে হবে।”

ইছাপূর্ণা হকচকিয়ে গেলেন। আলতা তাকে সরিয়ে দিয়ে পাগলের মতো ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। ইছাপূর্ণা আটকানোর চেষ্টা করেও পারলেন না।

সময় বয়ে গেল অনেকক্ষণ। ইছাপূর্ণা কয়েকবার ডাকাডাকি করে চুপ হয়ে গেলেন। এমন ঘটনা আগে বহুবার ঘটেছে। তাই তিনি অতটা উদগ্রীব না হয়ে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলেন।

আধাঘণ্টা পর দরজা খুলে ভেজা কাপড়েই বেরিয়ে এলো আলতা। ইছাপূর্ণা কোনো প্রশ্ন করলেন না, কোনো কথাও বাড়ালেন না।

আলতা কাঠের পুতুলের মতো আলমারি খুলে শুকনো কাপড় নিয়ে আবার ওয়াশরুমে ফিরে গেল। ভেজা কাপড় বদলে সোজা গিয়ে বসল ড্রেসিং টেবিলের সামনে। তার চালচলনে কোনো প্রাণ খুঁজে পেলেন না ইছাপূর্ণা। কেবল অনুতপ্ত হয়ে খাটের পাড়ে বসলেন।

রঞ্জকের ভেঙে ফেলা প্রসাধনীগুলো কুড়িয়ে আবার গুছিয়ে রেখেছিল আলতা। টেবিলের ওপর সেগুলোই সাজানো ছিল। আলতা সেগুলো দিয়েই নিজের দাগগুলো লুকাতে শুরু করল।

ইছাপূর্ণা ভেবে পেলেন না কীভাবে মেয়ের মনটা হালকা করবেন।

“আরে, তোকে তো বলাই হয়নি। তুই চলে আসার পরেরদিনই লাবুটার দুটো ছানা হয়েছে।”

কথাটা শুনেই আলতা চমকে তাকাল মায়ের দিকে।

ইছাপূর্ণা মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, “শুধু তাই নয়, ওই যে মুরগীটাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না, আমরা তো ধরেই নিয়েছিলাম হয়তো শেয়ালে নিয়ে গেছে, সেটাও নিজেই বাড়িতে চলে এসেছে।”

“লাবু সুস্থ আছে তো?”

মেয়ের প্রশ্ন শুনে ইছাপূর্ণা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “হ্যাঁ, ওর পায়ের ব্যথাটাও সেরে গেছে।”

“আর ছানাদুটো?”

“ওরাও ভালো আছে। দেখতে একদম ওদের মায়ের মতো চকচকে কালো হয়েছে। সারাদিন দস্যিপনা করে বেড়ায়। পেট থেকে পড়েছে, তার পরেরদিনই কী করেছে জানিস?”

“কী করেছে?”

মেয়ের আগ্রহ দেখে ইছাপূর্ণা খুশি হলেন।

“তোর কাকির ঘরে ঢুকে বিছানার ওপর গড়াগড়ি খেয়ে এসেছে।”

এবার হেসেই ফেলল আলতা। খুব বেশি নয়, তবে ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটল। আবার আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল, “কাকি তাহলে ঠিকই বলতো মা, আমি আসলেই একটা অপয়া। দেখো না, আমি চলে আসার পর কতগুলো ভালো ঘটনা ঘটেছে। লাবুর পা ভালো হয়ে গেল, ঝুমুও নিজেই বাড়িতে ফিরে এলো।”

ইছাপূর্ণার মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল। মেয়েটার মন ভালো করতে চেয়ে উল্টো আরও খারাপ করে দিয়েছেন তিনি।

“তুই এমনটা কেন ভাবছিস? হতেও তো পারে এই বিয়ের মাধ্যমে তোর জীবনেও সুখ আসতে চলেছে। তুইও তো ঝুমুর মতো নিজের বাড়িতে ফিরে এলি। এবার শুধু লাবুর মতো…”

আলতা শান্ত চোখে তাকাতেই ইছাপূর্ণা হাসার চেষ্টা করলেন, “ওর মতো সুস্থ হয়ে ওঠ।”

বাচ্চার কথাটা ইচ্ছা করেই চেপে গেলেন আলতার মা।

আলতা আবার সাজে মনোযোগী হয়ে বলল, “আমি বাড়িতে ফিরে আসিনি মা। উল্টো বাড়ি থেকে বিদেয় হয়েছি। এটা আমার বাড়ি নয়।”

ইছাপূর্ণা মলিন হাসলেন। নরম গলায় বললেন, “পাগলি মেয়ে, বিয়ের পর স্বামীর বাড়িই তো নিজের বাড়ি। তোকে এই বাড়িটাকেই নিজের মনে করতে হবে। তবেই না বাড়িটাও তোকে আপন করে নেবে।”

মায়ের কথাগুলো আলতার একদম ভালো লাগছিল না। তবুও সে মাকে বেরিয়ে যেতে বলতে পারছে না। এই মুহূর্তে তার কাউকে প্রয়োজন। একা একা থাকলে তার খুব খারাপ লাগে। অথচ মায়ের কথাগুলোও ভালো লাগছে না।

ভাবনার মধ্যেই কেউ একজন দরজায় কড়া নাড়ল। আলতা ঝাঁকুনি খেয়ে পিছু ফিরতেই দেখল, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ধারা। তার সঙ্গে একটি মেয়ে। মেয়েটির হাতে একটা বড় টেডিবিয়ার। অথচ মেয়েটাকেই যেন আস্ত একটা পুতুলের মতো লাগছে।

ধারাকে দেখে আলতা থমকে রইল। এ বাড়িতে আসার প্রথম দিন ধারাকে দেখেছিল সে। তারপর থেকে আর দেখা হয়নি। হয়তো রঞ্জক নিষেধ করে দিয়েছিল বলেই আর আসেনি তার কাছে।

“হেই আলতা, কী করছো?”

আলতা কোনো উত্তর দিতে পারল না। শুধু হাতে ধরে থাকা প্রসাধনীটা টেবিলের ওপর রেখে ঝটপট উঠে দাঁড়াল।

ধারা নিজেই ফের অনুমতি চাইল, “ভেতরে আসবো?”

আলতা তাদের দিকে ফিরে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, আসুন না।”

ধারা ভেতরে আসতে আসতে বলল, “আন্টিও আছে দেখছি।”

ইছাপূর্ণা সৌজন্যমূলক হাসলেন।

ধারা এবার নিজের মেয়েকে পরিচয় করিয়ে দিল, “এই হচ্ছে আমার মেয়ে ইরা।”

সঙ্গে সঙ্গেই ইরা ছুটে গিয়ে জাপ্টে ধরল আলতাকে।

বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল আলতা। চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল তার। মেয়েটা উচ্চতায় আলতার থুতনি অবধি লম্বা।

ইরা আলতাকে ছেড়ে দিয়ে চওড়া হেসে বলল, “হাই মিমু, অবশেষে তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারলাম।”

আলতা বুঝে উঠতে পারল না, তার কী বলা উচিত।

ধারা জোরপূর্বক হেসে বলল, “একটু সহ্য করে নাও আলতা। এতো করে বললাম একটু ভদ্র হয়ে থাকতে, কিন্তু পারল না। ঝাঁপিয়ে পড়ল তোমার ওপর। প্রথম সাক্ষাতেই কেউ এমন করে?”

ইরা গাল ফুলিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ হতেই পারে, কিন্তু আমি মিমুকে সেই ফার্স্ট ডে থেকেই ফলো করে আসছি। তুমি আমাকে আটকে না রাখলে এটা আমাদের রেগুলার মিট-আপ হতো।”

বলেই ইরা আলতাকে নিয়ে খাটের ওপর বসল। এরপর শুরু হলো ইরার একটানা গল্প। আলতা শুধু শুনেই যাচ্ছিল, মাঝেমধ্যে তাকাচ্ছিল তার দিকে।

“তুমি জানো, আমি কতোবার তোমার সাথে দেখা করতে চেয়েছি। মা শুধু বলেই গেছে, মেজো মামুর আগে নাকি তোমার সাথে কেউ দেখা করতে পারবে না। আর আজকে আমি দেখেই ফেলেছি মামুকে তোমার ঘরে আসতে।”

আলতা চমকে তাকাল।

ইরা ঠোঁট চেপে হেসে বলল, “মামু লুকিয়ে লুকিয়ে বউয়ের সাথে দেখা করতে এলেই কি আমি জানতে পারব না ভেবেছে? আমার একটা চোখ তো সবসময় তোমার ঘরের দিকেই থাকে। মামুকে তোমার ঘরে ঢুকতে দেখেই আমি মাকে গিয়ে বলেছিলাম।”

বলতে বলতেই ইরার মনে পড়ে গেল, সে মাকে নিয়ে ঘরের সামনে আসতেই দেখেছিল আলতা দৌড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। রঞ্জকও তখন তার পিছু নিতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ধারা ডেকে উঠেছিল,

“আরএম? তুই?”

ধারার ডাকে থেমে গেল রঞ্জক। পিছু ফিরতেই ধারা বলে উঠল, “ইরা বলল তুই এই ঘরে এসেছিস। আমি একদমই বিশ্বাস করিনি। ভেবেছিলাম ও মিথ্যা বলছে। তুই আমাদের দূরে থাকতে বলে নিজেই চুপিচুপি বউয়ের ঘরে আসিস?”

রঞ্জক কোনো উত্তর দেয়নি। ফের আলতার পিছু নিতে ছুটে গিয়েছিল।

ধারা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, “ইরা সকালেই আসতে চেয়েছিল। কিন্তু তুমি বেরিয়ে গেলে, তারপর আর ফিরে এলে না। ওর স্কুলের সময় হয়ে যাচ্ছিল, তাই আর অপেক্ষা করতে পারেনি। এখন স্কুল থেকে ফিরে শুধু ড্রেসটা চেঞ্জ করেই চলে এসেছে।”

আলতা পাশে বসে থাকা ইরার দিকে তাকাতেই ইরা উৎফুল্ল মেজাজে বলে উঠল, “মিমু, তুমি না খুব সুন্দর। আমার তোমাকে খুব পছন্দ হয়েছে।”

আলতার গালে লালচে আভা দেখা দিল। ইরার গালে হাত রেখে বলল, “তুমিও খুব মিষ্টি দেখতে। তোমাকেও আমার অনেক বেশি পছন্দ হয়েছে।”

“সত্যি বলছো?”

“হ্যাঁ, একদম সত্যি।”

ইরা খুশিতে গদগদ হয়ে আবারও আলতার বাহু আঁকড়ে ধরল।

সন্ধ্যার দিকে ইরাকে নিয়ে গেল ধারা। বিকেল থেকে এ পর্যন্ত ইরা তার মামীর সাথেই ছিল। এখন আলতা নিজের খাটের ওপর পা তুলে আনমনা হয়ে বসে আছে। অন্যান্য দিন তো সময়ই কাটে না তার। আজ ইরা সঙ্গে থাকায় সময় কীভাবে কেটে গেছে, টেরই পায়নি সে। মেয়েটা এতো এতো কথা বলেছে, তবুও যেন তার কথা শেষ হয়নি। তাই যাওয়ার সময় বলে গেছে, পড়া শেষ করে সে আবারও আসবে।

এভাবেই বসে থাকতে থাকতে আলতার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছিল। এমন সময় দরজায় নক করার শব্দ হলো। দরজা খুলে দেওয়ার জন্য এগিয়ে গেল আলতা। ভেবেছিল, তার মা এসেছে। যদিও সকালের রঞ্জকের আকস্মিক আগমনের পর থেকে দরজা খুলতেও একটু ভয় লাগে তার। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে দরজা খুলতেই নিজের শ্বশুরমশাইকে দেখতে পেল।

আরিজ মাহতাবির একা আসেননি। সঙ্গে ফারিশ ও তাঁরাও আছে। তাঁরার মুখটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে নিজের ইচ্ছায় আসেনি। স্রেফ চাচার মুখের ওপর না বলতে পারেনি বলেই এসেছে।

আলতা একটু অবাক হলেও দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াল। আরিজ মাহতাবির তাদের দুজনকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। সিটিং স্পেসে বসে আলতাকেও ডাকলেন তিনি, “বউমা, এদিকে এসো। তোমার সাথে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করতে এসেছি।”

আলতা মাথায় কাপড় টেনে ধীরপায়ে শ্বশুরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

আরিজ মাহতাবির কিছুক্ষণ গম্ভীর থেকে বললেন, “আমি তোমাকে পড়াশোনা করাবো বলে ঠিক করেছি। তোমার মতামত কী?”

আলতা তৎক্ষণাৎ শ্বশুরের মুখের দিকে তাকাল। যেন বুঝেই উঠতে পারেনি, এইমাত্র তিনি কী বললেন।

আরিজ মাহতাবির কণ্ঠে স্নেহ মেখে ফের শুধালেন, “তুমি কি পড়াশোনা করতে চাও?”

আলতা প্রথমে কোনো শব্দ খুঁজে পেল না। তারপর অস্ফুটস্বরে আওড়াল, “আ-আমি কীভাবে? না মানে, আমি তো…”

“আমি জানি, তুমি প্রাইমারি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছো। মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওনি।”

তাঁরা চমকে উঠল, “সুযোগ পায়নি মানে? ফেল করেছিল নাকি? ওহ হো, চাচ্চু! এবার এটা বোলো না যে তুমি একটা ফেলটুসকে বাড়ির বউ বানিয়েছো।”

আলতার চোখেমুখে অস্বস্তি ফুটে উঠল।

আরিজ মাহতাবির ঠান্ডা গলায় বললেন, “ও ফেল করেনি। হাইস্কুলটা ওদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে, তাই আর ভর্তি হতে পারেনি।”

আলতা নিজের মধ্যেই গুটিয়ে গেল।

আরিজ মাহতাবির মিথ্যা বলেছেন।

হাইস্কুল দূরে থাকার কারণে নয়। আলতা ভর্তি হতে পারেনি, কারণ কেউ তাকে পড়াতে চায়নি। সে প্রাইমারি স্কুলেও পড়াশোনা করেনি। যেটুকু অক্ষরজ্ঞান লাভ করেছে, সবটুকুই তার চাচাতো ভাইয়ের বদৌলতে।

ভাইয়ের কথা মনে পড়তেই আলতার মনটা আরও বিষণ্ণ হয়ে গেল।

তখনই আরিজ মাহতাবির তাঁরাকে শাসিয়ে উঠলেন, “পরেরবার থেকে মুখ খোলার আগে মাথায় রেখো, তুমি বাড়ির বউকে নিয়ে মন্তব্য করতে যাচ্ছো।”

তারা রেগে গেলেও তা প্রকাশ করল না। একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল।

আরিজ মাহতাবির আলতার উদ্দেশ্যে বললেন, “আমি তোমাকে লেখাপড়া করতে জোর করছি না। এটা এমন কিছু নয়, যা তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও করতে হবে। তুমি চাইলে তবেই আমি কথা আগাবো।”

“আমি করতে চাই।”

তার উত্তরে আরিজের সঙ্গে সঙ্গে ফারিশও খুশি হলো।

আরিজ কথা এগিয়ে নিলেন, “তাহলে কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নাও বউমা।”

কলেজের কথা শুনে আলতা থতমত খেয়ে গেল, “কল-এজ?”

“হ্যাঁ, তোমার বয়স অনুযায়ী তোমাকে একেবারে কলেজেই ভর্তি হতে হবে। নয়তো পিছিয়ে পড়বে।”

“কিন্তু… আমি কি পারব?”

“চিন্তা কোরো না, ফারিশ তো আছেই। তোমার ছোট দেওর। ইরার পাশাপাশি ও তোমাকেও পড়াবে।”

আলতা এবার ফারিশের দিকে তাকাল। নিজের ওপর আলতার দৃষ্টি পড়তেই ফারিশ হাসি উপহার দিয়ে বলল, “হ্যালো, আমি ফারিশ। প্রফেশনাল টিচার নই, তবে ভবিষ্যতে হবো। তোমার ইচ্ছাশক্তি থাকলে খুব দ্রুতই শিখতে পারবে।”

এরপর আরিজ মাহতাবির ফারিশের সঙ্গে কথা বলতে বলতে প্রস্থান করলেন। তাঁরাও চলে গেল তাদের সাথেই।

রাত এখন দশটা। ইরা ডিনার করে আলতার ঘরে চলে এসেছে। কিছুক্ষণ পর একজন গৃহকর্মী আলতার জন্য খাবার নিয়ে এলো। আলতা তখন ইরার চুলে বেণি করে দিচ্ছিল। ইরা তো এই কথা, সেই কথা বলেই যাচ্ছে।

গৃহকর্মী খাবারগুলো টেবিলের ওপর রেখে আলতাকে ডাকল, “সাহেবা, শুনছেন?”

আলতা চোখ ফিরিয়ে তাকাতেই গৃহকর্মী হাতে ধরে রাখা একটা বড়সড় শপিংব্যাগ দেখিয়ে বলল, “এটা মেজো সাহেব পাঠিয়েছেন। কোথায় রাখবো?”

আলতা থমকে গেল, “কে পাঠিয়েছে?”

ইরা বলে উঠল, “আরে, মেজো মামু পাঠিয়েছে। মানে তোমার জামাই।”

আলতার শরীর ঠান্ডা হয়ে এলো। “আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে না তো? না মানে, উনি আমার জন্য পাঠিয়েছেন?”

“হ্যাঁ, তিনি বলেছেন আপনার কাছে পৌঁছে দিতে।”

“ক-কী আছে ওটাতে?”

“তা তো আমি বলতে পারবো না।”

ইরা আলতার দিকে ফিরে বলল, “আরে মিমু, এতো প্রশ্ন না করে নিজেই গিয়ে দেখো না। মামু নিশ্চয়ই তোমার জন্য স্পেশাল কিছু পাঠিয়েছে।”

ইরা একপ্রকার আলতাকে ঠেলে পাঠিয়ে দিল।

আলতা দোনোমনা করতে করতেই শপিংব্যাগটা হাতে নিল। গৃহকর্মী বেরিয়ে যেতেই আলতা ব্যাগটা খাটের ওপর রাখল। ইরা উৎসুক হয়ে পাশে এসে দাঁড়াল। তার মাথার একটা বেণি বাঁধা হয়েছে, আরেকপাশের চুলগুলো খোলা।

আলতা ব্যাগটা খুলে উল্টে ধরতেই ভেতর থেকে খাটের ওপর ঝরে পড়ল একগাদা মেকআপ সামগ্রী।

এতো এতো সাজ-প্রসাধনী দেখে ইরার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।

“বাপরে! মামু তো দেখছি মিমুকে পুরো মেক-আপের গোডাউন গিফট করেছে।”

চলবে…

(আগামীকাল আমার পরীক্ষা আছে। তবু্ও কোনোরকমে লিখে দিলাম এটুকু। যদিও এই পর্বে আরও অনেকটা লেখার ইচ্ছে ছিল, লিখতে পারিনি। দুঃখিত প্রিয় পাঠক। পরবর্তী পর্ব বড় করে দেওয়ার চেষ্টা করবো। রেসপন্স করতে ভুলবেন না।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply