Golpo romantic golpo কালারব্লাইন্ড

কালারব্লাইন্ড পর্ব ২


#কালারব্লাইন্ড — ০২

#সোফিয়া_সাফা 

চারতলার করিডর নীরবতায় ডুবে আছে। আরজু বেগম সামনে হাঁটছেন। তার পিছু পিছু আলতা। বুকের সঙ্গে জাপটে ধরা জুবার খাঁচাটাও এতক্ষণে কেমন যেন ভারী হয়ে উঠেছে। আলতার মধ্যে অস্বস্তি কাজ করছে। সে চুপচাপ মাথা নিচু করে হেঁটে গেলেও জুবা কুটুর কুটুর চোখে চারপাশ অবলোকন করতে ব্যস্ত।

করিডরের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে আরজু বেগম থামলেন একটা নির্দিষ্ট কক্ষের সামনে। তার থামার সাথে সাথেই আলতাও পায়ের গতি কমিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে পড়ল। আরজু বেগম দরজার পাশে থাকা কালো প্যানেলে হাত ছোঁয়াতেই মৃদু শব্দে লক খুলে গেল।

তিনি আলতার দিকে ফিরলেন। মেয়েটার মুখ এখন আর ঘোমটার আড়ালে নয়; তবুও মাথাটা অতিরিক্ত ঝুঁকিয়ে রাখার কারণে চোখ-মুখ পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না।

আরজু বেগম আলতার হাতের ওপর হাত রাখলেন। অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে আলতার শরীরটা মৃদু কেঁপে উঠলেও সে মুখ তুলে তাকাল না।

“তোমার নাম আলতা, তাইতো?” আরজু বেগমের গলাটা ভারী হলেও সাবলীল।

আলতা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। দরজা ঠেলে আলতাকে সাথে নিয়ে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে আরজু বেগম আবার বলে উঠলেন, “এতোটা সংকোচ বোধ করার কিছুই নেই। আজ থেকে এটাই তোমার ঘর-সংসার। আর এখানকার মানুষগুলোও তোমার নিজের। নিজের বাড়িতে নিশ্চয়ই কেউ এমন আতঙ্কে শক্ত হয়ে থাকে না?”

শব্দগুলো আলতার কানে পৌঁছাল ঠিকই, কিন্তু কোনো প্রতিধ্বনি তৈরি করল না। তার অনুভূতির জায়গাটা যেন পুরোই ফাঁকা। ঘরে পা রাখতেই চোখে পড়ল পরিপাটি এক ড্রইংরুম; যেখানে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। আরজু বেগম নববধূকে একটা সোফায় বসিয়ে দিয়ে তার থুতনি উঁচু করলেন। আলতা তবুও চোখ মেলাল না তার সাথে। 

“তুমি নিঃসন্দেহে রূপবতী…কিন্তু রঞ্জকের পাশে এক্কেবারে বেমানান।”

আলতা চোখ বুজল। বুকের ছাতিটা ধড়ফড় করে উঠল তার। হাতে ধরে থাকা খাঁচাটা শক্ত হাতে চেপে ধরতেই জুবা তার অস্বস্তি টের পেয়ে ডানা ঝাপটে চেঁচিয়ে উঠল। 

আরজু বেগম একটু থমকালেন। পরক্ষণেই নববধূর খিঁচিয়ে রাখা চোখের দিকে চেয়ে শীতল কণ্ঠে শুধালেন, “যে রূপ তোমার স্বামীর মনই গলাতে পারবে না… বলো তো, সেই রূপ তোমার ঠিক কোন কাজে আসবে?”

আলতার ভেতর থেকে ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দ বের হতেই আরজু বেগম সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। কিন্তু তার চেহারার কঠিন্য এতটুকু কমলো না।

​“আমি তোমাকে ভয় দেখাতে চাইছি না, আলতা। শুধু বোঝাতে চাইছি, শুধু রূপ দেখিয়েই রঞ্জুর মন গলিয়ে ফেলবে, এমন কোনো অলীক স্বপ্ন যদি দেখে থাকো, তবে তা এখনই ঝেড়ে ফেলো। বাস্তবতা হলো, ও তো লাল আর সবুজ রঙের তফাতটাই আলাদা করতে পারে না!”

আলতা এবারও সম্পূর্ণ নীরব। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। আরজু বেগম একটু বিরক্ত হয়ে ভ্রু কোঁচকালেন, “তুমি কি আদৌ বুঝতে পারছো আমার কথা?”

আলতাকে আগের মতোই ওপর-নিচ মাথা নাড়তে দেখে আরজু বেগমের মনে সন্দেহ দানা বাঁধল, “তুমি… কথা বলতে পারো তো?”

জুবা চেঁচিয়ে উঠতেই আলতা খেই হারিয়ে তার ওপর চড়াও হলো, “চুপ! একদম চুপ থাক, জুবা!”

ধমক খেয়ে জুবার কর্কশ গলার আওয়াজ মিইয়ে এলো। একটু কুঁকড়ে গিয়ে করুণ স্বরে বলল, “জুবআ… জুবআ…” যেন আদুরে কণ্ঠে বোঝাতে চাইল; সে একদম চুপ থাকবে।

আরজু বেগম বুকে হাত গুটিয়ে পুরো বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আলতা তার দিকে না তাকিয়েই বলল, “আমি আপনার কথা বুঝতে পেরেছি।”

“আচ্ছা, বেশ।” আরজু বেগম ঘড়ির দিকে এক নজর তাকিয়ে বললেন, “বসে বসে ঘুমিয়ে পোড়ো না আবার। রঞ্জুর জন্য অপেক্ষা কোরো। কী জানি, ছেলেটা আবার কোথায় গেল। আমি গিয়ে বরং ফোন দিয়ে দেখি।”

বলতে বলতেই আরজু বেগম প্রস্থান করলেন। তিনি দৃষ্টির আড়াল হতেই আলতা সোফায় শরীরটা ছেড়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুকটা ভার হয়ে আছে তার। 

সামনের কাচের নিচু টেবিলটায় খাঁচাটা নামিয়ে রেখে আলতা দরজাটা খুলে দিতেই জুবা ডানা ঝাপটে ‘ফুড়ুৎ’ করে বেরিয়ে এলো। 

আলতার কাঁধের ওপর বসতেই আলতা চোখ পাকিয়ে শাসাল, “তোকে বলছিলাম না চুপচাপ থাকতে? শুনলি না কেন আমার কথা?”

পাখিটা আলতার এক কাঁধ থেকে উড়ে গিয়ে অন্য কাঁধে বসে ডানা জোড়া গুটিয়ে নিল। আলতা খুব ভালো করেই জানে, জুবার পেটে খিদে। কিন্তু এই অপরিচিত জায়গায় সে কিছুই করতে পারবে না।

জুবার মতো অবুঝ প্রাণীটাও হয়তো আঁচ করতে পারছে তার এই অসহায়ত্ব। তাই তো খুব একটা উৎপাত করছে না। নইলে এতক্ষণে সারা ঘর জুড়ে ওড়াউড়ি আর চেঁচামেচি করে কান ঝালাপালা করে দিত।

আলতা উঠে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখে নিল। ড্রইংরুমের বাকি তিন দেওয়ালে তিনটি পৃথক দরজা রয়েছে। অন্য সময় হলে আলতা এখানেই বসে থাকতো কিন্তু জুবার খিদে নিবারনের জন্য খাবার প্রয়োজন। তাকে খাবার জোগাড় করতে হবে। 

আলতা ডানপাশের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার হাতল ঘুরিয়ে একটা দম নিয়ে নিজের মনকে বোঝালো, “শুধুমাত্র জুবার জন্য করছি। আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।”

দরজা ঠেলে আলতা ধীরে ধীরে ভেতরে পা বাড়াল।

দরজা পেরোনোর পর প্রথম কয়েক সেকেন্ড তার মনে হলো, সে নির্ঘাত ভুল জায়গায় চলে এসেছে। বিস্ময়ে তার চোখের মণি দুটো বড় বড় হয়ে গেল!

ঘরের বিপরীত পাশের পুরোটা দেয়ালজুড়ে একটা বিশাল কাচের আয়তক্ষেত্র। যেন পুরো দেয়াল টাই কাচের তৈরি। ভেতরে নীলচে স্বচ্ছ পানির ভেতর স্বাচ্ছন্দ্যে সাঁতরে বেড়াচ্ছে নানা প্রজাতির মাছ। 

কোনোটা মন্থর গতিতে হেলেদুলে ভেসে বেড়াচ্ছে, কোনোটা আবার দল বেঁধে একসঙ্গে একেক দিকে বাঁক নিচ্ছে। নরম আলোয় তাদের শরীর কখনো রুপালি, কখনো সোনালি, কখনো লালচে আভায় ঝলমল করে উঠছে।

আলতা কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। এত বড় অ্যাকোয়ারিয়াম সে জীবনে দেখেনি। তা-ও আবার একটা বন্ধ ঘরের দেয়ালজুড়ে!

দেয়ালের প্রায় পুরোটা যেন কাচের ভেতর বন্দি একখণ্ড জলজ পৃথিবী। পানির নিচে কৃত্রিম পাথরের খাঁজ, বাঁকানো পুরনো কাঠের ড্রিফটউড, আর তার ফাঁকে ফাঁকে লম্বা লম্বা জলজ উদ্ভিদ। পানির অদৃশ্য স্রোতের সাথে পাতাগুলো দোল খাচ্ছে। একেবারে নিচের স্তরে একঝাঁক ছোট ছোট রঙিন মাছ লুকোচুরি খেলছে। আর ঠিক মাঝখানটায় ডানা মেলে রাজকীয় ভঙ্গিতে ভেসে বেড়াচ্ছে বিশালাকার কয়েকটি এঞ্জেলফিশ।

আলতা বুঝতেও পারল না, কখন সে এক পা এক পা করে বিশাল অ্যাকোয়ারিয়ামটার একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। তার চোখ আটকে গেল ক্ষুদ্রায়তনের কিছু ছোট মাছগুলোর ওপর। হঠাৎ করেই অজস্র অতিক্ষুদ্র মাছ দেয়ালের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এক ঝলকে ছুটে গেল।

​“কী সুন্দর মাছগুলো!” অজান্তেই আলতার থমকে যাওয়া ঠোঁট দুটো একটুখানি ফাঁক হয়ে গেল। বিস্ময়ের ঘোরে ভেসে এলো শব্দ দুটো।

​জুবাও যেন আলতার এই আকস্মিক মুগ্ধতার ভাগীদার হলো। সে চটপটে ভঙ্গিতে ডানা ঝাপটে উৎসাহ নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “জুবা! মাছ! মাছ!”

​আলতার গম্ভীর মুখের কঠিন রেখাগুলো এবার আলতো হয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি। জুবা তার স্নিগ্ধ মুখখানা দেখে মাছ দেখার চেয়েও বেশি আনন্দিত হলো। ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে বলল, “আলতা হাসে! আলতা হাসে!” 

পাখির মুখে নিজের নাম আর এই উচ্ছ্বাস দেখে আলতা হাতের তালুটা বাড়িয়ে দিল। জুবা অমনি ফুড়ুৎ করে এসে বসে পড়ল তার হাতের ওপর। আলতা পাখির পালকে আঙুল বোলাতে লাগল, কিন্তু তার মুগ্ধ নয়নজোড়া তখনও মাছগুলোর ওপর আটকে ছিল।

কাচের দেয়ালের সামনে থাকা ছোট্ট একটা ডিজিটাল ডিসপ্লের দিকে চোখ গেল আলতার। সেখানে কয়েকটি সংখ্যা, ভেতরের তাপমাত্রা আর কিছু অপরিচিত যান্ত্রিক সংকেত মিটমিট করে জ্বলছে। সবকিছু এতো নিখুঁতভাবে সাজানো, যেন প্রতিদিন কেউ একজন পরম যত্নে এই কৃত্রিম জগতটার খেয়াল রাখে।

আলতা প্রস্থানের উদ্দেশ্যে ঘুরে দাঁড়াতেই তার দৃষ্টি গেল ঘরের অন্যপ্রান্তে। সেদিকের দেয়ালজুড়ে আরও বেশ কয়েকটি আলাদা কাচের ট্যাংক। প্রতিটির সাজসজ্জা একে অপরের চেয়ে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র।

ঘরের কোথাও কোনো তীব্র আলো নেই। সিলিংয়ের গোপন ফাঁক গলে উষ্ণ হলদেটে আলো মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। আর অ্যাকোয়ারিয়ামগুলোর ভেতর থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে নীলচে আর হালকা বাসন্তী আভা। বিষণ্ণতা এবং জাদুকরী আলোর এই অদ্ভুত মিশেলে ঘরটায় এক অদ্ভুত আবহ বিরাজমান। 

আলতা কালক্ষেপন না করে বেরিয়ে এলো ঘর নামের অ্যাকোয়ারিয়াম থেকে। বুকভরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করল সে। ড্রইংরুমে ফেরত এসে সে দ্বিতীয় দরজাটির দিকে এগিয়ে গেল। এবার যথেষ্ট মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই দরজার হাতল ঘোরাল সে। 

কিন্তু দরজাটা খুলতেই অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য তার সামনে উন্মোচিত হলো। দরজার ওপারে এক পা রাখতেই মনে হলো—কোনো এক গহীন অরণ্যে এসে পড়েছে সে!

যেদিকেই তাকাচ্ছে শুধু গাছ আর গাছ। প্রকৃতির এই সোঁদা গন্ধ পেতেই জুবা আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। আলতার কাঁধ ছেড়ে খুশিতে ডানা মেলে সে উড়ে গেল ভেতরের দিকে।

“জুবা! কোথায় চললি? ফিরে আয় বলছি।”

জুবা শুনল না। বাধ্য হয়ে আলতাও পা বাড়াল তার পিছু পিছু। খাবারের তালাশে জুবা নিজের মতো উড়ে চলে গেল গহীনে।

এদিকে আলতা খুঁজে ফিরছে তাকে। ভয়ে বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে তার। ঘর নামের জঙ্গলটা শুধু গাছগাছালিতেই পূর্ণ নয়। মেঝে পুরোটাই কাঁচা মাটি দ্বারা আবৃত। সেই মাটিতে সুপরিকল্পিত একটা পুকুর খোদাই করা আছে। 

আলতা কল্পনাও করতে পারছে না, এমুহূর্তে সে চারতলায় অবস্থান করছে। পুকুরটা অবশ্য বেশি গভীর নয়। মেপে দেখলে বড়জোর ফুট তিনেক হবে। পুকুরের চারপাশেও লাইটিং করা; নীল-হলুদ আলোয়। পানি এতোটাই স্বচ্ছ যে তলানিতে মাছের সাথে সাথে নুড়িপাথর গুলোও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। 

পুকুরের পানিতে রঙ বেরঙের কইফিশ সাঁতরে বেড়াচ্ছে। আকারে তুলনামূলক বড় এগুলো। পুকুরের ওপরে একটা ছোট্ট কাঠের সেতু নির্মিত। আলতা সাবধানে পা ফেলে সেতুটা পেরিয়ে অন্য পাড়ে গেল।

ভেতরে ঢোকার পর থেকেই তার কানে একটা অবিরত ঝরঝর শব্দ আসছিল। শব্দটা খুব চেনা; এটা খুব সম্ভবত জলপ্রপাতের শব্দ। তাদের গাঁয়ের পাহাড়ি ঢালে এমন বহু ঝর্ণা দেখেছে সে। কিন্তু এখানে? সে ভুল শুনছে না তো! 

শব্দ অনুসরণ করে খানিকটা দূর এগোতেই সে প্রত্যক্ষ করল—ঘরের পেছনের দেয়াল ঘেঁষে ওপর থেকে ঝর্ণার রূপে পানি আছড়ে পড়ছে নিচের পাথুরে কুণ্ডে! 

আলতা পলকহীন চোখে, বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক সেই মুহূর্তে জুবা ডানা ঝাপটে এসে নামল তার কাঁধে। খিদে মেটানোর তৃপ্তি এখন তার চোখে-মুখে। তার ছোট্ট লাল ঠোঁটের কোণে লেগে আছে পাকা পেয়ারার দুটো দানা। জঙ্গল ঘরের কোণে হয়তো কোনো মিষ্ট পেয়ারা গাছ খুঁজে পেয়েছিল সে।

অন্য সময় হলে হয়তো আলতা রূপকথার এই জগত দেখে আনন্দে আত্মহারা হতো, কিন্তু অজানা এক আশঙ্কায় তার ভেতরটা হিম হয়ে এল। পাখিটাকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরল সে। তারপর তড়িঘড়ি বাইরে বেরিয়ে এসে ধড়াস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে জুবাকে বুকের সাথে লেপটে ধরে মেয়েটা হাপাতে লাগল খুব।

ড্রইংরুমের অন্য পাশের বন্ধ দরজাটা খোলার আওয়াজে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে। তন্মধ্যে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল ধারা। একহাতে তার একখানা গাঢ় নীল রঙের জামদানী শাড়ি। অন্যহাতে সুবাস ছড়ানো খাবার ভর্তি ট্রে।

ট্রে-টা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে ধারা আলতার দিকে ফিরল। মুখে এক টুকরো অমায়িক হাসি ফুটিয়ে চপল গলায় শুধাল, “কী করছো, হুম?”

​আলতা উত্তর না দিয়ে ডানে-বামে মাথা নাড়ল। ধারা নিজেই এগিয়ে গেল তার দিকে। তাকে নিয়ে সোফায় বসিয়ে দিতে দিতে বলল, “রাতে তোমার খাওয়া দাওয়া হয়েছে কী না, তা তো আমার জানা নেই। ফুপি আমাকে এই শাড়িটা দিয়ে পাঠালেন, তাই ভাবলাম শাড়ির সাথে সাথে এই সুযোগে খাবারটাও নিয়ে আসি।”

আলতার পেটে খিদে ছিল। সে প্রায় পুরোটা দিন ধরেই অভুক্ত, শরীরটাও অবশ হয়ে আসছে ক্রমশ। তবুও অজানা জড়তায় তৎক্ষনাৎ খাবার প্লেটের ওপর হামলে পড়তে পারল না। 

ধারা তার আড়ষ্টতাটুকু বুঝতে পারল, সে চট করে আলতার গা ঘেঁষে বসল, তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দু-হাত ধরে বলল, “আমাকে ননদিনী ভাবার কোনো দরকার নেই। নিজের বোন মনে করবে, ঠিক আছে?”

আলতা মাথাটা আলতো করে নাড়ল। ​ধারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হেসে বলল, “হু, বুঝতে পারছি, নতুন জায়গা—মানিয়ে নিতে তোমার একটু সময় লাগবে। আচ্ছা, ওসব কথা থাক…” 

বলেই সে হাত ছেড়ে টেবিল থেকে জামদানী শাড়িটা তুলে আলতার কোলের ওপর মেলে ধরল, “দেখো তো শাড়িটা কেমন?”

আলতা কিছুক্ষণ থমকে থেকে বলল, “সু…ন্দর!”

ধারা হাফ ছাড়ল, “যাক বাবা! কিছু তো অন্তত বললে। তোমাকে কিন্তু লাল শাড়িতে দারুণ মানিয়েছে। কিন্তু কী আর করার, আমাদের ভাইটা তো লাল আর সবুজের তফাতটাই বোঝে না! তুমিই বলো, নতুন বউ রংচটা একটা শাড়ি পরে সামনে গেলে নিশ্চয়ই ওর ভালো লাগবে না। তাইতো আমি তোমার জন্য নীল রঙের এই শাড়িটা এনেছি। আমার বিশ্বাস, এটাতেও তোমাকে দারুণ লাগবে।”

আলতা আর কোনো উত্তর খুঁজে পেল না, নীরবই রইল। 

ধারা ঠোঁট উল্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শুধাল, “তুমি একা একা শাড়িটা পরতে পারবে তো? নাকি আমি পরিয়ে দিয়ে যাবো?”

আলতা একটা ঢোক গিলে গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে বলল, “আমি পারব।”

ধারা বুঝতে পারল, মেয়েটা এমুহূর্তে একা থাকতে চাইছে। তাই সে-ও বাকি কথা তুলে রেখে উঠে দাঁড়াল। 

“আরএম যে কেন এখনো ফিরছে না কে জানে। নতুন বউ রেখে বাইরে সময় কাটাচ্ছে! বোকা হাঁদারাম কোথাকার! ধ্যাৎ! আমি যাচ্ছি বুঝলে? ওইদিকে বেডরুম তুমি খেয়েদেয়ে ওখানে চলে যেও।”

আলতা সম্মতিসূচক মাথা নাড়তেই ধারা চলে গেল। অতিবাহিত হলো কয়েক মিনিট। আলতা আশেপাশে নজর বুলিয়ে ধীরহাতে টেবিলে রাখা ট্রে থেকে ভাতের থালাটা টেনে নিল। 

আলতার কোল থেকে জুবাও তড়িৎ গতিতে নেমে এল কাচের টেবিলটায়। আলতা সালাতের বাটিটা একটু এগিয়ে দিতেই জুবা লোভাতুর ভঙ্গিতে টুকটুক করে খুঁটে খেতে শুরু করল—কাঁচামরিচ, গাজর, শশা আর টমেটোর টুকরোগুলো।

একটু আগে পেয়ারা গাছে পেয়ারা পেলেও আলতার টানে মন না মানায় পেট ভরে খাওয়া হয়নি পাখিটার। ফিরে আসার তাগিদে শুধু কিছুটা খেয়েই উড়ে এসেছিল। পাখিটাকে খেতে দেখে আলতাও ভাতে হাত দিল। ভাতের প্রথম লোকমা মুখে নিতেই, চোখের কোল দুটো ভিজে উঠল নোনা জলে। সে পাথরের মতো নিস্পৃহ ভঙ্গিতে কেবল চিবিয়ে যেতে লাগল। এরইমধ্যে চোখের কোণ বেয়ে দু’ফোটা নোনাজল টুপ করে ঝরে পড়ল ভাতের প্লেটে।

খাবারটুকু কোনোমতে শেষ করে আলতা সোফায় হাঁটু গুটিয়ে গুটিশুটি মেরে বসল। পেট ভরা থাকায় জুবাও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। আলতা সাবধানে জুবাকে তুলে নিয়ে খাঁচায় ঢুকিয়ে শিকের লকটা আটকে দিল। 

তারপর সোফার ওপরেই দু’হাতে হাঁটু আঁকড়ে উদাসীন চোখে চেয়ে রইল ঘরের এক কোণে। নাতো সে নীল শাড়িটা গায়ে জড়ালো আর নাতো বেডরুমে যাওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। 

ঘণ্টা খানেক ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বসে থাকতে থাকতে কখন যে ক্লান্তি এসে আলতার চোখের পাতা দুটো ভারী করে দিয়েছিল, তার হিসাব রইল না।

ওদিকে আকাশের পূর্ব কোণে সূর্য কেবল নিজের লালচে আলোর আভাস ছড়াতে শুরু করেছে। রঞ্জক নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। গায়ে থাকা শার্টটা ঘামে একদম জবজবে হয়ে পিঠের সাথে লেপ্টে আছে, মাথার অবিন্যস্ত চুলগুলো এসে পড়েছে কপালে। বাঁ হাত দিয়ে ডান হাতে প্যাঁচানো ‘হ্যান্ড র‍্যাপ’ খুলতে খুলতে সে সোজা নিজের বেডরুমের দিকে এগোচ্ছিল। সাদাটে র‍্যাপারের ওপর দিয়েও তার রক্তাক্ত আঙুলের গাঁটগুলো স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। হ্যান্ড র‍্যাপের গায়ে লেগে থাকা তাজা লাল রক্তগুলোকে রঞ্জকের ধূসর চোখে ময়লা ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। 

হঠাৎ করেই নীরব ঘরে অতিরিক্ত কারো উপস্থিতি টের পেয়ে রঞ্জকের পায়ের গতি থমকে গেল। চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ড্রইংরুমের সোফাটার দিকে। সোফায় কুঁকড়ে শুয়ে থাকা একটা মেয়ের অবয়ব নজরে আসতেই চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার। চোখের দৃষ্টিতে নেমে এলো কঠোরতা। দ্রুত পদক্ষেপে এসে থামল সোফার একদম মুখোমুখি। 

কয়েক মিনিট পর—

ঘুমের ঘোরে জুবার চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভেঙে গেল আলতার। সে কেবল পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাতে যাবে; ঠিক তখনই এক মগ কনকনে ঠান্ডা পানি আছড়ে পড়ল তার মুখের ওপর!

শ্বাসনালীতে পানি আটকে গিয়ে আলতা কেশে উঠল। দু’হাতে তড়িঘড়ি মুখ মুছে চোখ মেলে তাকাতেই আতঙ্কে শরীর জমে গেল তার। চোখের সামনে ভয়াল রূপে দাঁড়িয়ে আছে তার স্বামী, রঞ্জক!

“এই মেয়ে কে তুমি? আমার ঘরে ঢোকার সাহস পেলে কোথায়?”

এমন রূঢ় প্রশ্নে আলতা থরথর করে কেঁপে উঠল। ভেজা কাপড়ের ওপর হাত বুলিয়ে সে নিজেকে যতটা সম্ভব আবৃত করার চেষ্টা করল। কিন্তু তার ঠোঁট দুটো দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।

জবাব না পেয়ে রঞ্জকের মেজাজ আরও তুঙ্গে উঠল। পাশে রাখা বালতি থেকে প্লাস্টিকের মগটায় আবারও পানি তুলে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “উত্তর দাও, নইলে আবারও ওয়াটার থেরাপি দেবো।”

“আ…আমি আলতা।”

‘আলতা’ নামটা কানে পৌঁছাতেই রঞ্জকের কানে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল কাজী সাহেবের সেই উদাত্ত কণ্ঠ—“দশ লক্ষ টাকা দেনমোহর প্রদানে মানতাশা রেহবার আলতাকে বিবাহ করিতে সম্মত থাকলে বলুন… কবুল!”

কথাটা মনে পড়তেই রঞ্জকের চোখ দুটো যেন ক্রোধে আরও কুঁচকে গেল। পরক্ষণেই হাতের মগে থাকা পুরোটা পানি সে এক ঝটকায় ছুড়ে দিল আলতার মুখের ওপর!

এরপর খালি মগটা বিকট শব্দে আছড়ে মারল মেঝেতে। প্লাস্টিকের মগটা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। আলতার দিকে এক পা এগিয়ে রঞ্জক বিষাক্ত গলায় উগড়ে দিল, “ওহ্, তার মানে তুমিই আমার সেই ধ`র্ষিতা বউ?”

চলবে… 

(যারা যারা পড়ছেন প্রত্যেকে রেসপন্স করুন প্লিজ।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply