Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫২


আদিল মির্জা’স বিলাভড

৫২.

–

যতক্ষণ আদিলের জ্ঞান ছিলো রোযার ওপরে সেভাবে তার শারীরিক ভার ছাড়েনি। খুঁড়িয়ে হাঁটছিল, শুধুই ডান হাতটা কাঁধে রেখেছিল। অথচ ধীরেধীরে ক্রমশ শরীরের ভার গাঢ় হয়ে পড়েছে রোযার ওপরে। মুহূর্তে সতর্ক হলো রোযা। তার থেকেও সতর্ক হয়েছিল শান্ত। যে পেছনে ছাতা ধরে তালে তাল মিলিয়ে হাঁটছিল। তৎক্ষণাৎ ছাতা ফেলে ধরল পড়তে নেয়া আদিলের শরীর। আদিল জ্ঞান হারিয়েছে। নিস্তেজ মাথাটা দুলে পড়েছে। রোযার দিকেই। রোযা তাকাল। দেখল নীলাভ মুখ খানা। অবশেষে ধীরে হাতটা বাড়িয়ে আদিলের গালে তালু ছুঁয়ে উঁচিয়ে ধরে রাখল।

পেছন থেকে এলেন, ক্লান্ত এসে ধরেছে ছাতা। ধারালো বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস আর মেঘের গর্জনে কাঁপছে ভূমি। সেসব ভেদ করে কানে এলো পদচারণের ভেজা শব্দ। কয়েকজন ছুটে আসছে সামনে থেকে, ম্যানশনের দিক থেকে। তীব্র বৃষ্টিতে তাদের ভালোভাবে দেখা গেলো কাছাকাছি আসায়। পঞ্চান্ন – ষাটোর্ধ বয়সী দুজন সামনে। এই বৃষ্টির মধ্যেও বোধহয় রোযা তাদের কাঁদতে দেখছে। গর্জনও তাদের ডুকরে ওঠা আওয়াজ দমাতে ব্যর্থ। র ক্তিম দৃষ্টিতে আদিলের দিকে চেয়ে বিড়বিড়িয়ে চলেছেন। শান্ত তাদের দিকে মাথা দুলিয়ে জলদি জিজ্ঞেস করল কদম বাড়াতে বাড়াতে –

‘ম্যানশন খোলা হয়েছে?’

আনোয়ার খন্দকার এসে পৌঁছালেন তখুনি। অশান্ত, অবিন্যস্ত তিনি ভিজেনেয়ে একাকার। এসেই শান্তর থেকে নিজের কাঁধে নিলেন আদিলকে। ভিজে ভিজে ছুটলেন ম্যানশনের দিকে। আদেশ ছুড়লেন শান্তর দিকে –

‘ডক্টর মোজাফফর আসছে। রিসিভ কর তাকে। জলদি আন।’

শান্ত গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছে। রোযাকে থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ক্লান্ত আস্তে করে বলে, ‘ম্যাডাম…চলুন!’

রোযা তাকিয়ে আছে সামনে। আদিলকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে সব ছুটেছে পরিত্যক্ত ম্যানশনের দিকে। শীতে হাড়গোড় অবধি কেঁপে উঠল রোযার। নিজেও দ্রুতো কদম বাড়াল। পুরোটা পথ ছাতা ধরে রাখল ক্লান্ত। আদিলের অবস্থা, এই ম্যানশন, অপরিচিত মানুষ সব মিলিয়ে রোযার মাথার ভেতরটা জোটবদ্ধ। তবে একটা প্রশ্নও করতে ইচ্ছে হলো না। ব্যাকুল হয়ে প্রবেশ করল চওড়া সিঁড়ি গুলো বেয়ে ম্যানশনের ভেতরে।

দীর্ঘতম মেরুণ কারপেটের ওপরে কদম ফেলে থমকাল একমুহূর্তে জন্য। প্রত্যেকটা দেয়াল সাদা কাপড়ে ঢেকে আছে। ঢেকে রাখা হয়েছে ফার্নিচার, সহ সকল আসবাবপত্র। রোযা সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলো ওপরে। এসে পৌঁছাল এক রাজকীয় রুমের সামনে। দরজা খোলা, বিস্তৃত বেডরুম। বিশাল খাটে শোয়ানো হয়েছে আদিলকে। আনোয়ার খন্দকার ইতোমধ্যে কাপড় পাল্টে দিয়েছেন। দুটো কম্ফোর্টার দিয়ে ঢেকে রেখেছেন শরীরটা। রুমে থাকা লোকজন এযাত্রায় চেপে দাঁড়িয়েছে। পথ দিয়েছে রোযাকে প্রবেশ করার।

রোযা প্রবেশ করল। দৃষ্টি সেঁটে থাকল আদিলের চোখমুখের ওপরেই। ফ্যাকাসে হয়ে আছে। ভ্রুদ্বয়ের মাঝে অজস্র ভাঁজ। গুঙিয়ে কিছু একটা বলছে। আনোয়ার সাহেব সরে দাঁড়ালেন বিছানার কাছ থেকে। রোযা এসে দাঁড়াল কাছে। চেয়ে থাকল শুধু। ভাঙা এক বয়স্ক নারী কণ্ঠ শোনা গেলো –

‘বউমা, কাপড়চোপড় বদলে নিন।’

রোযা তাকাল সঙ্গে সঙ্গে। সাদা শাড়ি পরিহিত একজন বয়স্ক নারী। বয়সটা আনুমানিক পঞ্চান্ন। চোখমুখ লাল, খুব কেঁদেছেন বোঝা গেলো। গলা ভেঙে গিয়েছে। তারপরও যথাসম্ভব নরম কণ্ঠে কী অমায়িকভাবে সম্বোধন করলেন। রোযা এধরনের সম্বোধন এই প্রথম শুনে কিছুটা চমকেই উঠল। তিনি বলে গেলেন –

‘আমার সাথে আ্সুন, কিছু পরতে দিই।’

রোযা নড়ল না। জবাব দিতে পারল না। দৃষ্টি ফিরিয়ে পুনরায় তাকাল আদিলের দিকে। এবারের আনোয়ার সাহেব মাথা নুইয়ে রেখে বললেন –

‘ম্যাডাম, আপনি যা্ন। আমরা আছ….–’

আনোয়ার সাহেব কথা শেষ করতে পারেন না। আদিল ভীষণ জোরে জোরে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করছে যেন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে! বুকের ওঠানামার গতিও দ্রুতো হচ্ছে। হঠাৎ কেমন দুমড়েমুচড়ে ওঠে বিছানার ওপরে। বিভৎস এক চিৎকারে কেঁপে ওঠে চারিপাশ –

‘মায়ায়ায়া…পাপায়া…’

আনোয়ার সাহেবের চোখ লাল হয়ে উঠেছে। অন্যপাশে গিয়ে পাগলের মতো ছুঁয়ে দেন আদিলের মুখ। ডাকেন –

‘আদিল, আদিল…’

বিছানায় ছটফট করার শরীর ওই ডাকে সাড়া দেয় না। থামে না তার গোঙানো, ছটফটানো। আনোয়ার সাহেবের ক্রমাগত ডাকার ফলস্বরূপ শুধু আদিলের মিহি স্বরের একটা শব্দ শোনা যায় –

‘রোজআ…’

আদিলের এমন অবস্থা দেখে থমকে গিয়েছিল রোযা। ভয়ে কেঁপে উঠলেও এযাত্রায় ধড়ফড়িয়ে গিয়ে ধরল হাতটা। কম্পিত গলায় দ্বিধা নিয়ে বলে গেলো –

‘শান্ত হোন। আ-আমি আছিই…এইতো! যাচ্ছি না…শান্ত হোন।’

মলিন ওই কণ্ঠে ঘোরে থাকা কাতরানো শরীরটায় বোধহয় সামান্য বোধ ফিরল। মস্তিষ্ক সচল হলো। চোখ মেলেনি তখনো। কেমন গোঙাচ্ছে –

‘কে!’

রোযা আরও এগোয়। মুখের সামনে গিয়ে জানায়, ‘আমি, আমি রোযা…’

‘রোজ-আ…’

রোযা আরও শক্ত করে ধরল হাতটা, ‘হু…’

‘রোজআ…’

রোযা কান পাতল। পাশে বসে মাথাটা একদম মুখের সামনে নিয়ে গেলো। ফিসফিস করে ডাকল –

‘আদিল, এইতো আমি, শান্ত হোন –’

আদিল চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করল। সব আবছা, অস্পষ্ট হলেও চোখের সামনে রোযার মুখটা চাঁদের মতন জ্বলজ্বল করছে। রোযার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। টলমল করছে। আদিলের গলা বসে গিয়েছে। ভাঙা, অস্থির –

‘রোজআ…’

পরপরই উন্মাদের মতো আওড়ে গেলো –

‘ওসমান মির্জার মতো ভালো হওয়ার বোকামি আমি কখনো করব না। কখনো পিছু ফিরব না। আমি তোমায় ভালোবেসে আরও জঘন্য হব, আরও নিচে নামব। যতটা নামলে আরও শক্তিশালী হব, যতটা হলে তোমায় বুকের ভেতর নিয়ে বাকিটা জীবন সহিসালামত কাটাতে পারব।’

আদিলের চোখ বুজে গিয়েছে পুরোপুরি। ডান চোখের কোণ ঘেঁষে নেমেছে একফোঁটা জল। অন্যদিকে রোযার দুগাল বেয়ে জল গড়াচ্ছে সমানে। মাথাটা ঠেকাল আদিলের নিস্তেজ হাতের ওপরে। তখুনি শব্দ শোনা গেলো। রোযা তাকাল মাথা তুলে। হাওয়ার গতিতে প্রবেশ করলেন ডাক্তার মোজাফফর। তাকে দেখে রোযা সোজা হয়ে বসল। অন্যপাশে গিয়ে বসেছেন মোজাফফর। দ্রুতো আদিলকে দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। একফাঁকে শুধু বললেন –

‘ম্যাডাম, আপনি অসুস্থ হবেন। ফ্রেশ হয়ে আসুন।’

রোযা সেকথা কানে তুলল না। বসে থাকল একইরকম ভাবে। শুধু বলল –

‘তাকে দেখুন…’

মোজাফফর সাহেব আর কিছু বললেন না। আদিলের চেকআপ করে শিরায় স্যালাইন লাগিয়েছেন। ঔষধের লিস্ট লিখতে লিখতে উচ্চগলায় নির্দেশ দিতে থাকলেন। রোযা শুনছিল মন দিয়ে। আনোয়ার সাহেব ফট করে বললেন –

‘তুমি থাকবা সারারাত। জ্ঞান ফিরুক।’

মোজাফফর সাহেব ঘাড়টা বেঁকিয়ে আড়চোখে চেয়ে মুখ বাঁকালেন তবে দ্বিমত করলেন না। উঠে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললেন –

‘এভাবে ঝামেলা করার দরকার নেই। যার যার কাজে যাওয়া হোক।’

বলতে বলতে তিনি বেরিয়ে গিয়েছেন। পেছনে আনোয়ার সাহেব ছুটেছে। রুম ভরতি মানুষজনের কেউই আর নেই। রোযা একাই বসে থাকল। অনুভব করল তার শরীর কাঁপছে। তার চেয়েও জোরসে কাঁপছে তার হৃৎপিণ্ড। আদিলের কথাগুলো কানের কাছে বেজে যাচ্ছে। তার ভেতরে অনেকরকম অনুভূতির মিশ্রণ তৈরি হয়েছে। যার নাম দেয়া যাচ্ছে না। অথচ মনে হচ্ছে পুড়ে যাচ্ছে কিছু একটা! যন্ত্রণা হচ্ছে! রোযার অন্যহাতটা উঠে গেলো আদিলের গালে। সবসময় ছাঁটা দাড়িগোঁফ গুলো একটু বেড়েছে। কতক্ষণ রোযা বসেছিল খেয়াল নেই তার। কাঁধে হাতের স্পর্শে চমকে ওঠে। পিছু চেয়ে দেখল সে বয়স্ক নারী দাঁড়িয়ে আছেন। ভদ্রমহিলা আস্তে করে জানালেন –

‘আমি জুলেখা, বউমা। আসুন সাথে। কাপড়চোপড় বদলে নিন। অসুস্থ হয়ে পড়বেন।’

রোযা ঘাড় ঘুরিয়ে ফের তাকাল আদিলের মুখের দিক। হাতটা পাশে রেখে গায়ের কম্ফর্টার টেনে দিলো গলা পর্যন্ত। অবশেষে উঠে দাঁড়াল। বেরিয়ে এলো জুলেখা বেগমের সাথে। তারা করিডোর ধরে হাঁটছে, কোনো কথা নেই। নিচে অনেককে দেখতে পাচ্ছে রোযা। ওখানকার অনেককে এই প্রথম সে দেখছে। জুলেখা বেগম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটা রুমের সামনে নিয়ে এলেন। রুমে প্রবেশ করে বুঝল ভালোভাবে সবটা সাদা কাপড়ে আবৃত। সবকিছু! বিশাল রুমের একটা জিনিসও দেখা যাচ্ছে না। জুলেখা বেগম এগিয়ে গিয়ে টেনে সরালেন একটা সাদা কাপড়। ভীষণ চমৎকার ওয়ারড্রোব। তা খুলে তিনি ভীষণ যত্নের সাথে বের করে দিলেন একটা আকাশী রঙের শাড়ি। রোযা স্পষ্ট দেখল ভদ্রমহিলার হাতটা একটু কেঁপেছে। ভীষণ স্বাভাবিক থাকতে চেয়ে ফিরে চেয়ে হালকা হেসে বলেন –

‘আপনার শাশুড়ির শাড়ি। ব্লাউজ, পেটিকোট আপনার হবে। আমাদের বেগমের গড়নও এমনই ছিলো।’

বাড়িয়ে দেয়া শাড়িটা হাতে নিলো রোযা। এখনো নতুনের মতো। জামদানী শাড়ি। একটা সুঘ্রাণ নাকে প্রবেশ করল। রোযা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে দুবার ছুঁলো শাড়িটা। জুলেখা এই রুমের ওয়াশরুম দেখিয়ে বলেন –

‘কাপড় বদলে আসুন, আমি খাবার পরিবেশন করতে বলে দেই!’

রোযা মাথা নাড়িয়ে বলে, ‘খাবো না, আপনাকে কী ডাকব?’

‘আপনি চাইলে খালা ডাকতে পারেন।’

রোযা মাথা দুলিয়ে বলে, ‘তুমি করে বলুন, খালা।’

জুলেখা বেগম হাসেন। প্রসন্ন চোখে পুনরায় দেখে রোযাকে আপদমস্তক। অন্যমনস্ক হয়েই আওড়ান –

‘আমাদের বেগমের কতো শখ ছিলো পুত্রবধূর! ছেলেকে বিয়ে করিয়ে বাড়িতে মেয়ে আনবে–’

জুলেখা থেমে গেলেন। না ইচ্ছে করে নয়। রোযা খেয়াল করল ভদ্রমহিলার গলা রোধ হয়ে এসেছে। আর বলতে পারলেন না। রোযা চুপ করে গেলো। কদম বাড়াল ওয়াশরুমের দিকে। তার কাছে একটা ব্যাপার পরিষ্কার। আদিল মির্জার বাবা-মায়ের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিলো না। অস্বাভাবিক এই মৃত্যুতে ধ্বসে পড়েছে সাজানোগোছানো এক রাজপ্রাসাদ। আর এটাই এই রাজপ্রাসাদ। এখানেই একসময় একটা সুখী পরিবারের সুখের সংসার ছিলো।

.

আকাশী রঙের জামদানি শাড়িটা পরনে আকাশী রঙের ব্লাউজের সাথে। শাড়ি পরিহিত রোযা নামছে সিঁড়ি বেয়ে। নিচে তখনো উপস্থিত ছিলো আনোয়ার খন্দকার, মোজাফফর উদ্দিন, জুলেখা বেগম সহ বাড়ির আরও কর্মচারী। শান্ত, এলেন ওরাও কিংকর্তব্যবিমুঢ়! রোযা নামতে নামতে দেখল এতোগুলো লোকের চমকানো চোখমুখ। পাশেই নূরজাহানকে দেখতে পেলো। সম্ভবত মাত্রই এসে পৌঁছেছে। রোযাকে দেখছে অপলক দৃষ্টিতে। থমথমে পরিস্থিতি অনুভব করতে পারছে রোযা। নূরজাহান মুগ্ধ হয়ে আওড়ে বসে –

‘একমুহূর্তের জন্য মনে হলো আমাদের বেগম সাহেবা!’

রোযা নেমে এসে নিজের পরনের শাড়িটা বুলিয়ে আস্তে করে বলে, ‘নিশ্চয়ই তিনি আমার থেকেও ভীষণ সুন্দর দেখতে ছিলেন। এই শাড়ি পরনে তার কোনো ছবি আছে?’

নূরজাহান তাকাল জুলেখা বেগমের দিকে। ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। রোযা এতে কথা ঘোরাতে চাইল তবে তার আগেই তিনি আঙুল তুলে দেখালেন দেয়াল। গ্রাউন্ডফ্লোরের সামনের দেয়াল। পুরোটা দেয়াল সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। রোযা ইশারা বুঝে নিজেই এগিয়ে গেলো। হাত বাড়িয়ে আস্তে করে টানতেই কাপড়টা সরে এলো, ফ্লোরে পড়ল। রোযার দৃষ্টি থমকায়, শ্বাস আটকে আসে গলায়।

সুউচ্চ দেয়ালেজুড়ে বিশাল আকৃতির ছবি টানানো। রাজকীয়, আভিজাত্যের প্রতীক সে ছবি। সোফায় বসা তিনজন মানুষের। ডান পাশে একজন লম্বাচওড়া, সুদর্শন পুরুষ। পরনে কালো স্যুট। গুরুগম্ভীর চোখমুখে হাসির রেখা। একজন ভীষণ সুন্দরী নারী তার পাশে। যার মাথা থেকে পা পর্যন্ত আভিজাত্যে মোড়ানো। রোযার পরনের শাড়িটাই নারীর পরনে। গলায় পুতির মালা। কানে পুতির টপ। দুহাতে সোনার চুড়ি। মিষ্টি করে হাসছেন ক্যামেরার দিকে চেয়ে। তার পাশেই একজন যুবক, রোযার দৃষ্টি থমকায়। ঝলমলে হাসি যুবকের ঠোঁটে। চিকচিক করছে চোখজোড়া। ভীষণ আরাম করে বসে আছে। পরনে বাবার মতন পরিপাটি স্যুট না। অগোছালো স্যুট। একটা ফর্মাল নেভিব্লু প্যান্ট, সাদা শার্টের ওপরে নেভিব্লু কোট। কোটের বোতাম গুলো সব খোলা। শার্টেরও ওপরে তিনটে বোতাম খোলা। রোযা অপলক দেখল সেই যুবককে। কী অচেনা! রোযার মনে হলো সে হাসির শব্দ শুনতে পারছে। তাদের হাস্যোজ্বল পরিবারের সুমধুর হাসির ধ্বনি।

রোযা কতক্ষণ সে ছবি দেখল সে জানে না। একপর্যায়ে হঠাৎ তাড়াহুড়ো করে প্রত্যেকটা দেয়ালের সাদা কাপড় টেনে নামাতে লাগল। তাকে কেউ বাঁধা দিলো না। সবাই থমকে দাঁড়িয়ে আছে। রোযা সব নামিয়ে একেক করে সবগুলো দেখল। কতো স্মৃতি! কতো ছবি! কী জীবন্ত আজও সবটা! রোযার হাত কাঁপে। সবটা দেখতে দেখতে বুকের ভেতরটা কেমন যেন মুষড়ে ওঠে। চোখ গিয়ে থামে ছোটো এক ফ্রেমে। ওখানে আদিল হাসছে! কোনো সাধারণ হাসি নয়। প্রাণোচ্ছল হাসি। মায়ের আঁচল ধরে প্রাণখোলা হাসতে থাকা সেই আদিলের সাথে আজকের আদিল মির্জার যে কোনো মিল নেই।

পিনপতন নীরবতা ভাঙল শান্ত। সে এসে কাপড় গুলো জমিন থেকে তুলে নিচ্ছে। জুলেখা বেগম বোধহয় এভাবে এই ম্যানশন দেখে অভ্যস্ত নন। তিনি বারেবারে চোখ নামিয়ে রাখছেন। পুরোপুরি তাকাচ্ছেন না ছবিগুলোর দিকে। বললেন –

‘বউমা, আসো খেয়ে নাও কিছু।’

রোযা ফিরে তাকাল আচমকা। র ক্তিম চোখে চেয়ে এতোগুলো মানুষের সামনেই জিজ্ঞেস করে বসল, ‘খালা, নূরজাহান, আমাকে কী বলা যায়? বলা যায় তাদের সম্পর্কে?’

আনোয়ার সাহেব দৃষ্টি নামিয়ে রেখে আস্তে করে বলেন, ‘ম্যাডাম, তারা আপনারও বাবা-মা!’

রোযার বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠল। আদিলের বাবা-মা সম্পর্কে তো তারও বাবা-মা হয়। বেঁচে থাকলে তো বাবা- মা-ই সে ডাকতো। রোযা ঢোক গিলল। পুনরায় বলল –

‘আমাকে বলুন না। বলুন, বাবা-মায়ের সম্পর্কে। কীভাবে.. কীভাবে এমন হলো! তারা…’

রোযা মা রা যাওয়া শব্দটা উচ্চারণ করতে পারল না। নিচতলা জুড়ে পিনপতন নীরবতা নেমেছে। কেউ একটা শব্দ উচ্চারণ করছে না। রোযা একএক করে সবার দিকে চেয়ে আশা ছেড়ে দিলো। তাকাল ফের দেয়াল গুলোর দিকে। এই হাস্যোজ্জ্বল পরিবার সম্পর্কে, এই আদিল সম্পর্কে জানার তৃষ্ণায় তার বুক হাহাকার করে উঠছে। তখুনি জুলেখা বেগমের কণ্ঠ ভেসে বেড়াল ম্যানশনের প্রতিটা দেয়াল জুড়ে। সেই কথাগুলো বাড়ি খেয়ে পৌঁছাল উপস্তিত প্রত্যেকের কানে –

‘সালটা দুহাজার চার, আঠারো বছর আগের ঘটনা। আদিল বাবা তখন সবে আঠারোতে পড়েছে….’

মনে হলো তার প্রত্যেকটা শব্দ জীবিত করে তুলেছে আজ থেকে আঠারো বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো। তারা শব্দে জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে। স্তব্ধ এই ম্যানশন যেন ফিরে পেয়েছে সেই জাকজমকপূর্ণ অতীত। ম্যানশনের আনাচেকানাচে ভেসে বেড়াচ্ছিল সুখের গুঞ্জন….

[ অতীতের শুরু এখান থেকে – ]

২০০৪ সাল, অক্টোবর, ১০।

বিস্তৃত জায়গা। ওপরে খোলা আকাশ। জমিনে সবুজ ঘাসের সমাহার। খোলা নীল সাদা আকাশে্র নিচে, সবুজ ঘাসের ওপরে ছুটছে দুটো ঘোড়া। হাওয়ার গতির চেয়েও দ্রুতো সেই ঘোড়ার গতি। সেই গতি আরও বাড়াতে উতলা হয়ে আছে ঘোরা নিয়ন্ত্রণে রাখা শরীর দুটো। তাদের পরনে রাইডি পোশাক। পাল্লা দিয়ে ছোটো তাদের উদ্দেশ্য সর্বপ্রথম সীমানা পেরুনো। ওসমান মির্জা গতি বাড়ালেন –

‘হেইয়ায়ায়ায়া….’

এতে ঘোড়া আরও পাগলা গতিতে ছুটেছে। ওসমান মির্জা এগিয়ে গিয়েছেন অনেকটা। পেছনে ছোটা যুবক বেশ পিছু পড়ে গিয়েছে। হঠাৎ যুবকের ধূসর চোখজোড়া হেসে ওঠে। মুহূর্তে চিৎকার করে ওঠে –

‘আমার বাদশাহ, রান ফাস্ট…ফাস্ট ফাস্ট….হেইয়া….’

ঘোড়ার গতি বেড়েছে। ঝড়ের বেগে ছুটেছে। পিছু ফেলেছে ওসমান মির্জার ঘোড়া। ওসমান মির্জাও বাড়িয়েছেন গতি। এযাত্রায় দুজনের ঘোড়া সমান গতিতে ছুটেছে। ওসমান মির্জার শ্যামবর্ণ মুখে চিন্তা ফুটে ওঠে মুহূর্তে! ভাঁজ পড়ে কপালে। খানিক ধীর হয় গতি। একফাঁকে চেয়ে ধমকে ওঠেন –

‘আদিল!! ষ্টুপিড বয়। সিট ডাউন।’

আদিলের হাসির শব্দ ভেসে বেড়াল, ‘ভিকটরি ইজ মাইন, মিস্টার মির্জা। আপনি আপনার প্রমিজ ফুলফিল করার প্রস্তুতি নিন। বাদশাহ, দৌড়া!’

ওসমান মির্জাকে ফেলে আদিল ছুটেছে বেগতিক গতিতে। মাথাটা ঘুরিয়ে পিছু তাকিয়ে ডান চোখ টিপে সীমানা পেরিয়ে বেরিয়ে গেলো। ওসমান মির্জা শব্দ করে হেসে ঘোড়ার গতি ধীরে ধীরে কমিয়ে থামলেন পুরোপুরি। কয়েক মিনিটের মাথায় দেখা গেলো পেছন থেকে আরও কিছু ঘোড়া ছুটে আসছে। ওসমান মির্জার সামনে এসে থামল। সামনের জন্য ঘোড়া থেকে নেমে হেসে বলে –

‘আপনাকে হারানোর একজন চলে এসেছে, বস!’

ওসমান নিজেও নামলেন ঘোড়া থেকে। ছেলের যাওয়া পথে চেয়ে গর্ব নিয়ে বলেন, ‘তাইতো মনে হচ্ছে, সাইফ! ছেলে বড়ো হয়ে গেছে।’

ওসমান মির্জা পার্সোনাল বডিগার্ড, তার ডান হাত সাইফ। সাইফের পাশেই তার বা হাত আসাদ। আসাদ হো হো করে হাসতে হাসতে বলে ওঠে –

‘বস, বাবা কিন্তু কোনো অংশে আপনার চেয়ে কম হবে না! সিংহ হবে সিংহ! এই আন্ডারওয়ার্ল্ড… ‘

ওসমান মির্জা হাতের রাইডিং গ্লোভস খুলতে খুলতে হেঁটে এগুচ্ছেন ছাউনির দিকে। আসাদের কথা থামিয়ে বললেন –

‘আদিল এসবের বাইরেই থাকবে আসাদ। আমি চাই না আমার ছেলে এসবে জড়াক। নিজেকে প্রটেক্ট করার জন্য ওর যতটুকু শেখা উচিৎ তার শিক্ষা দিয়েছি শুধু। তবে এই র ক্তপিপাসুর দুনিয়ায় ওকে আমি যেতে দেব না।’

আসাদ কিছু বলতে চাইল বোধহয় হয়। সাইফের সতর্ক চোখে চেয়ে আর কিছু বলল না। ছাউনির কাছে চেয়ার-টেবিল বসানো বিশ্রামের জন্য। ওসমান বসলেন। তাকে ধরিয়ে দেয়া শরবতের গ্লাসে চুমুক দিতেই ঘোড়ার আওয়াজে তাকালেন দৃষ্টি তুলে। আদিল ফিরছে। কাছাকাছি এসে দুষ্টু হেসে বলল –

‘আসাদ চাচ্চু, কেমন দিলাম তোমার বসকে?’

বলতে বলতে ঘোড়া থেকে নেমেছে আদিল। আসাদ মুখ টিপে বলে, ‘কঠিইইন!’

চোখ রাঙালেন ওসমান। ধমকালেন, ‘ঘোড়া থেকে পড়লে কী অবস্থাটা হতো? তোমার কমনসেন্সের অনেক অভাব!’

আদিল বসেছে বাবার পাশের চেয়ারে এলোমেলো ভঙ্গিতে। ধূসর মণিজোড়া চিকচিক করছে সূর্যের আলোয়। চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে। ছাঁচা, তীক্ষ্ণ চোয়াল। টেবিলের ওপরে দু-পা তুলে দিয়ে কাদচিৎ হয়ে হাতে তুলে নিয়েছে পানির ছোটো বোতলটা। আড়চোখে চেয়ে বলে –

‘সাইফ চাচ্চু, নিউজ করতে বলোতো। আগামীকালের নিউজপেপারের ফ্রন্টে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা চাই, আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিং, মিস্টার ওসমান মির্জা ঘোড়ার রেসে হেরে গেলেন এক আঠারো বছরের যুবকের নিকট। কী লজ্জাজনক!’

উপস্থিত সকলে চাপা হাসলেও ওসমান নির্বিকার। চোখমুখ কাটকাট। বাদামি মণিজোড়া, লম্বা নাক, দুগাল জুড়ে চাপদাড়ি। সাইফ অবশ্য শব্দ করেই হেসে উঠেছে। ওসমান মির্জা তখনো বকে গেলেন –

‘ঘোড়ার ওপরে উঠে দাঁড়াতে গেলে কেনো তুমি? এতো পা ভাঙার শখ, আমিই ভেঙে দিই। লুলা করে বসিয়ে রাখি একেবারে!’

আদিল কিছু বলতে নিয়ে সামনে তাকিয়ে হঠাৎ ঠোঁট টিপে হেসে উঠতেই মনে হলো ওসমানের মেরুদণ্ড বেয়ে শিহরণ বয়ে গেলো। অনুমান মোতাবেক শোনা গেলো এক সুমধুর নারী কণ্ঠ। যেই কণ্ঠে স্পষ্ট সন্দেহ –

‘কার পা ভাঙবেন, লুলা করবেন বলছেন?’

ওসমান মির্জা বিদ্যুৎ গতিতে উঠে দাঁড়ালেন। ফিরে তাকিয়ে দেখলেন গুলনাহার আসছেন। তার পেছনে জুলেখা, সাবানা। গুলনাহারের পরনে মার্জিত ভাবে সিল্কের ফ্লাওয়ার প্রিন্টেড শাড়ি। চুলগুলো খোঁপায় আঁটকে আছে। সুন্দর চোখমুখ কুঁচকে তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন –

‘কার পা ভাঙবে বললেন?’

ওসমান গলাটা পরিষ্কার করে বললেন, ‘সাইফের! ওর পা বড়ো হয়ে গেছে।’

গুলনাহার সন্দেহ চোখে দেখলেন তবে সে বিষয়ে ঘাঁটালেন না। তোড়জোড় দেখালেন –

‘আপনার কমনসেন্সের এতো অভাব কেনো বলুনতো? আপনি ভরদুপুরে এমন রোদে ছেলেকে নিয়ে ঘোড়ার রেস করেন? খাওয়াদাওয়া করতে হবে না?’

আদিল এতো শব্দ করে হেসে উঠল যে সাইফ, আসাদও নিজেদের মুখ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। কিছুক্ষণ আগেই ওসমান ছেলেকে বকলেন কমনসেন্সের অভাব নিয়ে। এখন স্ত্রীর তার জনসম্মুখে এসে তাকে বকছেন কমনসেন্সের অভাব নিয়ে! সবই নিয়তি! বরাবরই তার মোটা চামড়া। এসব গায়ে লাগে না। নাক চুলকে বললেন –

‘এইতো ফিরব!’

আদিল এগিয়ে এসে মায়ের শাড়ির আঁচলে ঘর্মাক্ত মুখটা ঘষল। গুলনাহার নিজের চেয়েও লম্বায় বড়ো হয়ে যাওয়া ছেলের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে নিয়ে বললেন –

‘চলো, খাবে এসো। কী বেলা হয়ে গেলো!’

ওসমানের দিকে চেয়ে পুনরায় ধমকে ওঠেন গুলনাহার, ‘আসুন, খেয়ে উদ্ধার করুন আমায়!’

স্ত্রীর বাধ্য পুরুষ ওসমান মির্জা হাঁসের মতন পিছু পিছু চলছেন। আদিলকে আশেপাশে না দেখে তখুনি খপ করে আঁচলটা টানলেন। অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন –

‘স্বামীর ঘাম চোখে পড়ে না তোমার? কপাল মুছে দাও।’

গুলনাহার ত্যক্তবিরক্ত! চোখ রাঙিয়ে তাকালেন ঠিক। তবে আঁচল তুলে মিছেমিছি মোছার চেষ্টা করলেন। সিল্কের শাড়িতে কী আর ওভাবে ঘাম মোছা যায়? যায় না। তাও মুছলেন। ওসমান ফিসফিস করলেন –

‘কাল আমাদের বিবাহবার্ষিকী। এখনো ত বললা না কী চাই?’

গুলনাহার ফের হাঁটছেন, ওইতো দেখা যাচ্ছে তাদে ম্যানশন। পেছনের ওই জায়গাটুকু শুধুমাত্র এই ঘোড়া চালানোর জন্যই বানানো।

‘কিচ্ছু চাই না। আলহামদুলিল্লাহ্, আমার সব আছে।’

ওসমান হাঁটতে হাঁটতে ঝুঁকে আছেন, ‘যেমন?’

গুলনাহার ঠোঁট টিপে হেসে আওড়ান, ‘আমার স্বামী!’

ওমনি ওসমান হুড়োহুড়ি করে ধরতে গেলে কদম বাড়ালেন গুলনাহার। না ফিরে চেয়েই হুশিয়ার করলেন –

‘পেছনেই ছেলে আছে। খবরদার ধরাধরি করবেন না!’

ওসমান কথা শুনলেন। তবে ঝামেলা করলেন ম্যানশনের ভেতরে প্রবেশ করতেই।

_______

চলবে –

® নাবিলা ইষ্ক।

[ মাই লাভস, কিছু কথা বলে দিতে চাই। গল্পের রান ইয়ার ২০২২। অর্থাৎ গল্প ২০২২ অনুযায়ী চলছিল। আমরা অতীতে এসেছি, ২০০৪ এ। এবং অতীত সম্ভবত দুটো পর্বে পাবেন। আমি চেষ্টা করব এরচেয়েও কমে শেষ করতে। এই অতীতটুকু পড়বেন কেমন? ভালোবাসা জানবেন। ভালোওবাসিইইই।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply