Golpo romantic golpo আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন

আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১৫


#আলতোছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন_(১৫)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
শিকদার বাড়ি অন্যসব বাড়ি থেকে আলাদা। এর পেছনের কারণ কেবল,একান্নবর্তী পরিবার আর তাদের একের প্রতি অন্যের ভালোবাসাই নয়,বরং ওরা সবাই সবার সাথে ভীষণ বন্ধুত্বপূর্ণ। এই বাড়িতে গুরুজনদের সম্মানও দেয়া হয়,আবার তাদের সাথে যে কোনো আয়োজনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উল্লাসও করা হয়। বাবা আছেন,চাচা আছেন মানেই এক কোণে চুপ করে থাকব,এমনটা হয় না এখানে। এই যে এখন,
আমজাদ একবার বলতেই পার্টির রেশ কেমন চুটকিতে বদলে গেল৷ গানই শুরু হলো প্রথমে। শিকদার বাড়ির চার কর্তার মাঝে আফতাব সব থেকে ভালো গান গাইতে পারেন। ভদ্রলোকের কণ্ঠও চমৎকার!
আর তার চেয়েও ভালো গিটার বাজায় সাদিফ। কোর্সই করেছিল একটা। আর দুজনের এই সুন্দর প্রতিভা কাজে লাগানো হলো আরো চমৎকার ভাবে। আফতাব গান গাইছেন,
“ Pehla nasha pehla khumaar,
naya pyaar hai naya intjaar
Kar lu main kya apana haal
aye dil-e-bekaraar
Mere dil-e-bekaraar tu hi bata!”
পাশে হাসিমুখে স্বতঃস্ফূর্ত হাতে গিটার বাজাচ্ছে সাদিফ। গানের ছন্দে ছন্দ মেলাতে সবাই ধীরুজ হাতে তালি বাজাচ্ছিল। পিউয়ের অস্থির চোখ ফাঁকফোকরে ঘুরলেও, অন্য এক জোড়া পাখির চোখাচোখি দারুণ জমে উঠেছে। পুষ্প-ইকবাল যখন যেভাবে পারছে দেখছে একে অপরকে। মাঝেমধ্যে পার্টির ওই আবছা আলোর মাঝেও মাই লাভের উদ্দেশ্য ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিচ্ছে ইকবাল। মেয়েটা তখন লাজে মরিমরি হয়। চোখ রাঙায় কখনো!
আফতাব গাইতে গাইতে এগিয়ে এলেন। মাইক্রোফোন এক হাতে রেখে,আরেক হাত রুবায়দার সামনে পাততেই হোওঅঅঅঅ বলে চ্যাঁচিয়ে উঠল সবাই।
রুবায়দা লজ্জায় কী করবেন বুঝতে পারলেন না। তাকালেন মিনার দিকে। মিনা পিঠে হাত দিয়ে ঠেলে দিলেন ওনাকে। তাদের সবার পরনে পিচ কালার শাড়ি! শাড়ি ভরতি স্টোন! চুল খোপা করা,ফুল হাতা ব্লাউজ। সাজলে তিন গিন্নী একইরকম সাজেন সব সময়।
চিৎকার আর উল্লাসের ফাঁক গলেই ধূসর নিচে নেমে এলো। আফতাব গাইতে গাইতে স্ত্রীর হাত ওপরে তুলে ঘোরালেন। দুবার চক্কর কাটলেন রুনায়দা। সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ল আরো। ভিড়ে এসে দাঁড়াতেই বাবা মায়ের এমন সুন্দর দৃশ্য দেখতে পেলো ধূসর। অবাক হলো না! আফতাব-রুবায়দাই এ বাড়িতে প্রথম লাভ ম্যারেজ করেছিলেন। ও ছোটো থেকেই বাবা মায়ের এমন মাখোমাখো প্রেম দেখেছে। ধূসরের একটা পার্সনাল হ্যান্ডিক্যাম আছে। শুধু সেটাই অন করল ও। আলগোছে লেন্স জুম করে ভিডিও করল ওনাদের। গানের শেষে আফতাব হাঁটুগেড়ে বসে দু হাত শাহরুখ খানের মতো ছড়িয়ে দিলেন। রুবায়দা হাসতে হাসতে মুখ চেপে ধরলেন নিজের। কী যে লজ্জা পাচ্ছেন তিনি! কিন্তু বাকিরা হাত তালিতে ফেটে পড়ল। পিউ এত জোরে জোরে তালি বাজাল,যেন এক্ষুনি হাত ছিড়ে রক্ত এলো বলে। পরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল,
যার বাবা-মা এত রোমান্টিক, তাদের ছেলেটা এমন পান্তাভাত হলো কী করে হুহ…
বলতে বলতে পিউয়ের বেখেয়ালি নজর সামনে পড়ল। চমকে উঠল অমনি। ধূসর তার চেয়েও দ্রুত নজর সরিয়ে ফেলল অন্যদিকে। পিউ চোখ ঝাপটায়! বিভ্রান্ত হয় কিছু। ধূসর ভাই ওকে দেখছিল? নাকি অন্ধকারে ওই ভুল দেখল? ধুর,ওকে কেন দেখবে! অত ভালো দিন কি আর এসেছে? ভুলই দেখেছে হয়ত।
পিউ ঠোঁট উলটে ফের পার্টির ফোকাস পয়েন্টে ঘাড় ঘোরাল। তড়িৎ, ধীরুজ গতিতে তীর্যক চোখদুটো সরিয়ে আবার ওর মুখে এনে ফেলল ধূসর।
পিউয়ের লেহেঙ্গার কাপড়ে চুমকি বসানো। জ্বলজ্বল করছে সবুজ আলোয়। চুড়ি ঝুনঝুন করছে হাত নাড়লেই। চুল প্রায় লতানো কোমরের নিচে পড়ে। শরীরের কোথাও একটুখানি বাড়তি মেদ নেই,চর্বি নেই। যেন শুকনো পাতা একটা। শুধু পেছনে একটা লেজ লাগালেই,কাঠবিড়ালির মতো দেখাবে। আর
এই মেয়ে কিনা ওর নাম দিয়েছে ডেইরিমিল্ক! অথচ ওর এক হাতের তালুতে মেয়েটার গোটা মুখটা আঁটবে কিনা সন্দেহ!
ইকবাল কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিলো তক্ষুনি। ফিসফিস করে বলল,
“ চোখে চোখে কথা বলো,
মুখে কিছু বলো না,
মনও নিয়ে খেলা করো,
এ কী ছলনা!”
তারপর ভ্রু নাঁচিয়ে নাঁচিয়ে বলল,
“ কী,উম? উম,উম উম?”
পিউকে দেখাল বারবার।
ধূসর খুব আস্তে উত্তর দিলো,
“ মার কি এখানে খাবি,না বাইরে?”
ইকবাল পিঠ সটান করে বলল,
“ আমি ভালো ছেলে,তোর মতো বাজে কথা না বলে পার্টি এঞ্জয় করি।”
পিউ কাউকে কল দিচ্ছে। সে ধরল। ওপাশ থেকে গাড়ি-ঘোড়ার হর্ন পেরিয়ে চ্যাঁচাল,
“ পিউ আমি আসছি এইত,আর পাঁচ মিনিট।”
“ আসতে হবে না। রাস্তায় থেকে যা। পাঁচ মিনিট পর কি পার্টি ছুটি দিতে আসবি?”
“ এমন করিস না। সাজতে একটু দেরি…”
পিউ রেগে লাইন কেটে দিলো। পুষ্প বলল,
“ কী, আর কতদূর?”
“ জানি না তো। জিজ্ঞেস করিস না। একটা লেইট লতিফ মেয়ে। কোথাও টাইমলি দেখা যায় না।”
পুষ্প হাসল। বলল,
“ আচ্ছা ছাড়। যা না একটা গান গেয়ে আয়।”
পিউ আঁতকে তাকাল।
“ আমি? না না।”
“ ওমা এমন করলি কেনক্স? তুইতো স্কুলের অনুষ্ঠানে কত গাস!”
পিউ মিইয়ে গেল এবার। কী করে বোঝাবে,তখনকার ব্যাপার আর আজকের ব্যাপার আলাদা। আজ তো সামনে ঐ মানুষটা আছে! পিউ তার দিকে চোরা নয়ন তুলতেও পারল না,শোনা গেল আনিসের কণ্ঠস্বর। মোলায়েম সুরে ডাকলেন,
“ পিউ মা এদিকে আয়।”
পুষ্প বিজয়ী হেসে বলল,
“ হাহাহা,দেখব এবার কীভাবে না গেয়ে পারিস।”
পিউ পড়ল বিপাকে। ধূসরের সামনে ওর আওয়াজ বের করতে কষ্ট হয়,লজ্জা লজ্জা লাগে; সেখানে গান? সুর? এসব আসবে?
ওকে দোনামনা করতে দেখে সাদিফই এগিয়ে এলো সবেগে। সবার মাঝেই হাতটা টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
“ আরে পিউ চল,এত লজ্জা কীসের? তোর গান কি সবাই প্রথম শুনবে নাকি!”
পিউ আর কিছু বলতে পারল না।
চিবুক নুইয়ে হেঁটে গেল ফোকাস পয়েন্টের দিকে। আনিস ওকে এক কাঁধে আগলে নিয়ে বললেন,
“ আমাদের পিউ খুব ভালো গান গায়। প্রতি বছর স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একটা প্রাইজ ওর জন্যে বরাদ্দ থাকেই।”
পিউ মিনমিনিয়ে বলল,
“ কিন্তু, আজ না গাইলে হতো না?”
“ কেন মা,গাইবে না কেন? চাচ্চুর প্রথম বিয়ে হচ্ছে আর তুমি গাইবে না তা হয়!”
সাদিফ দুষ্টু হেসে বলল,
“ প্রথম বিয়ে! চাচ্চুর কি আরো শখ আছে নাকি!”
পিউ ফিক করে হেসে ফেলল এই কথায়। আনিস থতমত খেয়ে বললেন,
“ আরে ওই আর কি বলে ফেলেছি। নে পিউ,গান ধর। বেশি সাধব না কিন্তু। তাড়াতাড়ি গা!”
জোর করে হাতের মুঠোয় মাইক্রোফোনটা গুজে দিয়ে ভদ্রলোক ভিড়ে স্ত্রীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। ইকবাল আবার কাঁধ দিয়ে ধূসরকে ধাক্কা দিলো।
“ উম হুম গান গাইবে!”
ধূসর এবার দাঁত চেপে বলল,
“ জুতোর বাড়ি খেতে না চাইলে মুখ বন্ধ কর।”
ইকবাল ফুঁসে বলল,
“ হোয়াট! জুতোর বাড়ি? একজন সভাপতিকে বাড়িতে ডেকে এত বড়ো অপমান। থাকব না আমি। থাকবই না।”
ইকবাল ঘুরে এক পা এগোতে নিয়েও থেমে বলল,
“ যাচ্ছি যে আটকাবি না?”
ধূসর চোখের ইশারায় দেখাল,
“ দরজা ওদিকে।”
ইকবাল থম ধরে চেয়ে রইল। পরপর আগের জায়গায় এসে বলল,
“ যাব না। আমি ইকবাল পাঠান, উত্তর ঢাকার প্রধান সভাপতি। আমি তোর মতো উটের কথায় চলি?
আমার যখন ইচ্ছে হবে, তখন যাব।”
এদিকে পিউয়ের হাসি কমে এসেছে। আবার হুড়মুড়িয়ে জেঁকে ধরেছে অস্বস্তি,অপ্রস্তুতির পীড়া। আজ সারাদিন এত্ত কোক আর আইসক্রিম খেয়েছে, গলার কী অবস্থা কে জানে! তারওপর ধূসর ভাই….
পিউ অস্থির অস্থির করতে করতে মাইক্রোফোন দুহাতে চেপে জড়োসড়ো হলো। তাকাল পাশ ফিরে। ধূসরের অভিব্যক্তি বোঝার ইচ্ছে জাগল একটু। ঠিক তক্ষুনি ফোনে ম্যাসেজ এলো ওর। রওনকের ম্যাসেজ দেখে ধূসর তাড়াতাড়ি ইনবক্স খুলল।
“ আম সো সরি ধূসর,আমি আসতে পারিনি। আসলে দুপুরের দিকে একটা কাজে বের হয়েছিলাম। হঠাৎ উল্টোদিক থেকে একটা সি এনজি এসে একদম পায়ের ওপর দিয়ে গিয়েছে। কেটেছে অনেকখানি!”
ধূসর একটু উদ্বীগ্ন হয়ে টাইপ করল,
“ সে কী! জানালে না কেন?”
“ চাইনি এরকম একটা দিনে তোমাকে বাড়তি প্যারায় ফেলতে। তখন বললেই চলে আসতে আমি জানি।”
ধূসরের হাত ব্যস্ত কীবোর্ডে। চোখ-মন সবই সেথায়। পিউ যে গাইতে দাঁড়িয়েছে সেদিকে খেয়ালই তো নেই। মেয়েটা হতাশ হলো আরেকবার। অথভচ বাকি অতিথিদের সবাই উন্মুখ হয়ে আছে ওর গান শোনার জন্যে। বাঁধন, সে বুকে দুইহাত গুঁজে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে। ভাবছে, ছোট্ট মেয়েটা গাইতেও পারে? তাও পিউ বারবার আড়চোখে কেবল ধূসরকেই দেখল। দৃষ্টি ক্ষুধা মেটালো যেন। নাহ,সে তাকায় না। পাথর তো! পিউ ব্যর্থ শ্বাস ফেলল। ততক্ষণে গিটারের তারে হাত দিয়েছে সাদিফ। ওই তাল,আর এই ব্যর্থতা পিউয়ের কণ্ঠফুড়ে বেরিয়ে এলো গান হয়ে-
“ Agar Tum Mil Jao
Zamana Chodd Denge Hum
Tumhe Paakar Zamane Bhar Se
Rishta Tod Denge Hum
Agar Tum Mil Jao
Zamana Chodd Denge Hum …”
বসন্তের কলতানের চেয়েও মিষ্টি সুর কানে আসা মাত্রই ম্যাসেজ লিখতে থাকা আঙুলগুলো কীবোর্ডে ক্ষণিকের জন্যে থমকাল ধূসরের। এক মূহুর্তের জন্যে থামল সে নিজেও। রওনক আবার ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। লিখেছে,
“ পার্টি কেমন চলছে? আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। ড্রেসিং করিয়ে এসেছি।”
ধূসরের এর বিপরীতে উত্তর দেয়ার কথা। কিন্তু কেন যেন কপাল কুঁচকে স্ক্রিনেই চেয়ে রইল ও। চোখমুখ শিথিল হওয়ার বদলে,বরফের খণ্ডের ন্যায় দেখাল। পিউ তখনো বেহালার মতো সুর নিয়ে গাইছে,

Bina Tere Koi Dil Kash
Nazara Hum Na Dekhenge …
Tumhe Na Ho Pasand Usko,
Dobara Hum Na Dekhenge,
Teri Surat Na Ho Jis Mein…,
Hm hm hm..Teri Surat Na Ho Jis Mein,
Wo Sheesha Tod Denge Hum,
Agar Tum Mil Jao
Zamana Chodd Denge Hum!”
ইকবাল বুকে হাত দিয়ে বলল,
“ হায়হায় রে, কী গান! ডেডিকেটেড টু আ হতচ্ছাড়া আমি জানি!”
ধূসর ঢোক গিলল। এক, দুই সেকেন্ড পর স্ক্রিনে চটপট হাত চালিয়ে টাইপ করল,
“ ঠিক আছে, রেস্ট নাও!”
এরপর ফোনটা পকেটে ভরে অতিথিদের ভিড় মাড়িয়ে চলে গেল কোথাও। পিউ অমনি উদ্রগীব হয়ে দেখল তাকে। ধূসর ভাইয়ের কি গান ভালো লাগেনি? ও কি খুব খারাপ গাইল? পিউয়ের আর সুর তুলতে ভালো লাগল না। ওখানেই থামল সে। হাত তালির পরপরই ইকবাল চোরাই পথে বার্তা পাঠাল কাউকে,
“ পিউপিউ কী গাইলো মায়াই লাভ!
তুমিও তো আমার জন্যে এরকম একটা গান টান গাইতে পারো!”
পুষ্প ম্যাসেজ পড়ে সোজা ওর দিকে চায়। ইকবাল ভ্রু উঁচায়,আর অমনি ফটাকসে ভেংচি কাটল মেয়েটা।
এদিকে সাদিফ আমজাদকে গিয়ে বলল,
“ চাচ্চু, এতক্ষণ গান হলো এবার একটু নাচ হলে কেমন হয়?”
আমজাদ স্ফূর্ত চিত্তে বললেন,
“ ভালো হয়, খুব ভালো হয়। তোমরা সব আমাকে কেন জিজ্ঞেস করো বলো তো! করো না, যা ভাল্লাগে।”
“ কিন্তু চাচ্চু,আমি তো কাপল ডান্সের কথা ভাবছিলাম।”
মিনা বললেন,
“ কিন্তু তাতে তো অনেক কাপল লাগে রে সাদিফ। এত কই?”
“ এই তো,আমাদের দেখা সেরা কাপল! এরা আছে না?”
আমজাদ আর মিনাকে দুহাতে টেনে ফোকাস পয়েন্ট অবধি নিয়ে এলো সাদিফ। দুজনেই সামান্য ভড়কালেন। বিব্রত হয়ে পড়লেন লাজে। না না, করলেন বার বার। অথচ ইতোমধ্যে সবাই মিলে হইহই আড়ম্ভ করে দিয়েছে। আজমল,আফতাব আর আনিস একইসাথে মিছিলের মতো স্লোগান দিচ্ছেন,
“ ভাইজান,ভাইজান,ভাইজান!”
ইকবাল চাপা কণ্ঠে বলল,
“ হিটলার,হিটলার! হিটলার।”
রুবা,জবা সহ নারীমহলের হালকা পাতলা আওয়াজ এলো,
“ আপা,আপা আপা!”
আমজাদ দুইহাত তুলে বললেন,
“ ঠিক আছে ঠিক আছে। নাচছি! কিন্তু আমি কি একা বিয়ে করেছি? এখানে অনেকেই মিসেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারাও আসুক। রাশেদ ভাইজান,আপনিও আসুন।”
মিনার বড়ো ভাই রাশেদ থতমত খেয়ে বললেন,
“ আমি? না না আমি না।”
আফতাব বললেন,
“ আরে কীসের আমি না? আসুন তো!”
“ তাহলে কিন্তু তোমাকেও নাচতে হবে।”
“ নাচব, কী সমস্যা? আমি আর আমার মিসেস তো অলওয়েস রেডি,তাই না রুবা!”
এভাবে একে একে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের সবাই ভিড়ে গেল। আনিসকেও সুমনার হাত ধরে ঠেলে দিলো সকলে। ওয়াজিদ তার স্ত্রী সহ ভিড়লেন। কাপল এখানে কম নেই! লম্বাটে ফাঁকা জায়গাটা মূহুর্তে চ্যাপ্টা আর গোল করে চারদিক ঘিরে দাঁড়াল বাকিরা। ধূসর মাত্রই ইকবালের পাশে এসে দাঁড়াল আবার। কোথায় যে যায় এত!
এর মাঝেই সাদিফ এসে পুষ্পর হাত ধরে বলল,
“ আয় পুষ্প, আমরাও নাচি।”
পুষ্প মানা করল না। হেসেই চলল ওর সাথে। এর আগেও ওরা কত নেচেছে এভাবে। কিন্তু ইকবালের পায়ের রক্ত মাথায় উঠল অমনি। মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁত খিচে খাবলে ধরল ধূসরের কব্জি। খেয়াল এলো হঠাৎ। পাশ ফিরতেই দেখল ধূসর কপাল কুঁচকে হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে। ইকবাল নিজেও ভড়কায়। পরিস্থিতি সামলাতে ওর হাত টিপতে টিপতে কাঁধ অবধি তুলে বলল,
“ মাসল মাসল,খুব সুন্দর মাসল তোর!”
পিউ খুব আনচান করছে। ছটফটিয়ে চেয়ে আছে ধূসরের দিকে। এক পা এগোয়,আবার পিছিয়ে আসে। নাচার জন্যে মানুষটার কাছে যাবে কি?
পাশ থেকে তক্ষুনি কেউ বলল,
“ ভুলেও না। সবার সামনে মানা করলে ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যাবে।”
চমকে পাশ ফিরল মেয়েটা। তানহাকে দেখে বলল,
“ তুই কখন এলি?”
“ যখন তুই তোর ধূসর ভাইয়ের দিকে হাঁ করে ছিলি তখন।”
“ আস্তে বল,কেউ শুনবে!”
পরপর তানহার দিকে চোখ পড়ল পিউয়ের। অবাক হয়ে বলল,
“ তুই কি বিয়ে খেতে এসেছিস, নাকি নিজে বিয়ে করতে!”
তানহা বলল,
“ এভাবে বলছিস কেন? একটু সেজেছি, বেশি তো না!”
পিউ আর কথা বাড়াল না৷ ওর মাথায় ঘুরছে নাচের কথা। ধূসরকে সবার মধ্যে নিয়ে যাবে কী করে? এগোতেও ভয় লাগছে! মানুষটা হ্যান্ডিক্যাম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভিডিও করছেন।
পিউ আঙুলের ডগায় চুল প্যাঁচাল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। ভাবল কত কী!
তক্ষুনি খেয়াল করল, বাঁধন ওর দিকে আসছে। পিউ সোজা হয়ে দাঁড়ায় তৎক্ষনাৎ। বাঁধন ছেলেটা ঘুরেফিরে ওকেই নোটিশ করছে মানে এখানে ঘাপলা নিশ্চয়ই থাকবে। এখন কি নাচতে বলবে! একবার এসে বললে মানা করবে কী করে?
ও কাছে আসার আগেই পিউ চট করে সরে গেল। একদম গিয়ে লুকালো সুমনার মায়ের পেছনে। বাঁধন ঘুরে আসতে আসতে দেখল জায়গা ফাঁকা,পিউ নেই। এদিক-ওদিক চাইল ও। পাশে তানহা থাকায় জিজ্ঞেস করল,
“ এখানকার মেয়েটা কোথায়?”
তানহা কাঁধ উঁচিয়ে বোঝাল – “ কোন মেয়ে,চিনি না ভাইয়া।”
“ ওপ্স! আই মিসড এগেইন।”
পিউ দুই গাল ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল বাঁধনকে ফিরে যেতে দেখে। সামনে ঘুরতেই দেখল সুমনার মা কিছুটা প্রশ্ন নিয়ে চেয়ে।
হাসল পিউ। ফটাফট বলল,
“ আসলে নাচব না তো। আবার মুখের ওপর মানা করলেও কেমন দেখাতো! তাই…”
উনি বললেন,
“ তুমি কি আসলেই এবার কলেজে উঠবা?”
“ জি জি।”
“ বুঝা যায় না। মনে হয় নাইনে পড়ো! অনেক পিচ্চি পিচ্চি লাগে!”
পিউয়ের মন খারাপ হয়ে গেল। পিচ্চি লাগে? ওয়েট,এই ছোট লাগার জন্যেই ধূসর ভাই পাত্তা দেন না,ব্যাপারটা আবার এমন নয় তো!
পিউ ভাবতে বসল,আচমকা খেয়াল পড়ল রিনির দিকে। রিনি ধূসরের দিকে যাচ্ছে। ব্যস,পিউয়ের সব আনন্দ-ভাবনা মূহুর্তেইক্স শেষ। চোখ প্রকট করে চেয়ে রইল ও। মেরুদণ্ড ভেসে উঠল পেছনে। ওই চারচোখী আবার ওদিকে কেন যায়? ধূসর ভাইকে ডান্স অফার করবে নাকি! ও তো দেখতে সুন্দর, উনি তো ফেরাতেও পারবেন না। শত হলেও মেহমান, চাচার শ্বশুর বাড়ির গেস্ট এসব ভেবে হাতে হাত রেখে রাজি হয়ে যাবেন। আবার থেকে এসেছেন বিদেশে। ওখানে এসব কত্ত হয়! না বলবেনই বা কেন? কিন্তু বেঁচে থেকে এসব পিউ কীভাবে দেখবে?
ওর হাহুতাশের মাঝেই রিনি সত্যিই গিয়ে ধূসরের পাশে দাঁড়াল। এপাশটায় ছিল ইকবাল। ওর রুক্ষ,ছটফটে চাউনি সাদিফ আর পুষ্পতে। নজর ফিরল রিনির আওয়াজে। ডাকল,
“ এক্সকিউজ মি!”
ধূসর জানে ওকে ডাকছে। তাও ব্যস্ত রইল ভিডিওতে। ভান করল শোনেনি। রিনি আবার বলল,
“ শুনুন না!”
ও ইকবালকে বলল,
“ তোকে ডাকছে।”
“আমাকে কেন ডাকবে!”
রিনি বলল,
“ না না,আপনাকে বলেছি। মিস্টার ধূসর!”
ধূসর সন্তর্পণে চ সূচক শব্দ করে পাশ ফিরল। রিনি
নির্দ্বিধায় হাত পেতে বলল,
“ ডান্স?”
অদূরে থাকা পিউয়ের, এই দৃশ্যে মনে হলো বুক ফুড়ে কলিজা বাইরে চলে আসবে। পাংশুটে মুখে লেহেঙ্গা দুইহাতে চেপে ধরল জোরে।
তবে
ধূসর সাথে সাথেই বলল,
“ নো।”
“ প্লিজ!”
“ আমি ডান্স করি না। আই ডোন্ট লাইক দিস!”
ইকবালের মাথায় চমৎকার একটা বুদ্ধি এলো তখনই। মূহুর্তে রিনির পেতে রাখা হাতটা ধরে বলল,
“ ও একটু নিরামিষ আপু,আপনি ওকে ছাড়ুন। আসুন আমি ডান্স করছি।”
রিনি আর কিছু বলল না। ইকবালের সাথে যেতে দেখে পিউ প্রথমে চোখ ঝাপটায়। বিভ্রান্ত নজরে ভাবে,এর মানে উনি মানা করে দিয়েছেন?
পিউয়ের মলিন চেহারায় জ্যোৎস্না উঠল সহসা। দুই গাল ভরে হেসে ধূসরের দিকে তাকাল, তক্ষুনি ফিরল মানুষটাও। চোখাচোখি হতেই পিউ হাসল আরো বেশি! কিন্তু ধূসর চুপ করে চোখ সরিয়ে ফের সামনে চাইল যেন কিছুই হয়নি।
যে যেভাবে পার্টনার পেয়েছে,তাকে নিয়েই নাচছিল। ফ্লোর এখন কেবল স্বামী-স্ত্রী কেন্দ্রিক নেই! পুষ্প নাচতে ভালোবাসে। পিউ যেমন গানে ভালো, ও তেমন নাচে ভালো। ক্লাস এইট অবধি স্কুলে অংশ নিতো!
নাচার ফাঁকে হঠাৎ ইকবালকে পাশে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল ও। চেয়ে রইল গোল গোল চোখে। বুঝতেই পারল না,ইকবাল ডান্স ফ্লোরে কী করে! জীবনে তো একে নাচতে দেখেনি। নিজের দিকে পুষ্পর এই ড্যাবড্যাবে চাউনি আরেক দিকে চেয়ে চেয়েই টের পেলো ইকবাল। এঞ্জয় করল ও। আর সেই অন্যমনস্কতায় স্টেপ ভুল হলো পুষ্পর। কয়েকবার রিপিট হওয়ায় সাদিফ বলল,
“ পুষ্প কী করছিস,সবাইকে দেখে স্টেপ ধর। পরে যাবি তো!”
“ সরি সরি!”
ইকবাল সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে বলল,
“ সাদিফ বাবু,এসো পার্টনার এক্সচেঞ্জ করি।”
“ আরে ইকবাল ভাই,আপনিও এখানে?”
“ আমি সব খানে। তুমি ওসব বাদ দিয়ে পয়েন্ট ধরো। নাচের একটা মূল থিম থাকে না? পার্টনার এক্সচেঞ্জের? আসো,ওটা করি।
এখন নিশ্চয়ই ভাববে, সবাই করবে না। তাহলে তুমি আমি কেন?”
ইকবাল রিনিকে দেখিয়ে বলল,
“ দেখো এই আপাও চশমা পরে,তুমিও চশমা পরো। তোমাদের কাকতালীয় মিল তো আল্লাহ বানিয়ে পাঠিয়েছেন। নাও নাও,ওনাকে তোমার সাথে নাও।”
রিনি বুঝল না ওর সাথে হচ্ছে কী? প্রশ্নের উত্তর মেলার আগেই ইকবাল ওর হাতটা সাদিফের হাতে সপে দিয়ে,পুষ্পকে নিজ দায়িত্বে নিজের কাছে টেনে আনল। যেন এক রকম কেড়ে নিলো মেয়েটাকে। সাদিফ কিছু বলল না। প্রসঙ্গ ডান্স পার্টনারের,একজন হলেই হচ্ছে! তবে ইকবালের এই আচরণ সন্দেহের জন্ম দিলো একটু। বেছে বেছে পুষ্পকেই কেন? এদের দুজনের মধ্যে কিছু চলছে কী!
এদিকে পুষ্প আহাম্মক বনে গেছে। কোত্থেকে কী ঘটল! অথচ ইকবাল ওকে কাছে পেতেই আকাশের চাঁদ পেলো যেন। কোমরে হাত রেখে আঙুল দাবাতেই পুষ্প চাপা কণ্ঠে বলল,
“ একটু সামলে,আশেপাশে সবাই আছে।”
“ ওটাই তো সমস্যা মাই লাভ,তোমাকে দেখলে নিজেকে সামলানো যায় না।
কিন্তু তুমি সাদিফের সাথে নাচতে এলে কেন হ্যাঁ?”
“ এলে কী হয়েছে? আমার ভাই হয়!”
“ আচ্ছা, ভাই-ই যেন থাকে!”
**
পিউ আবার চড়ুই পাখি হয়ে গেছে। এত আনন্দ হচ্ছে ওর! ধূসর ভাই ওকে পাত্তা দেয় না এই দুঃখের চেয়ে, কাউকেই পাত্তা দেয় না ওই সুখ পাচ্ছে বেশি। আর সেই জোরে মেয়েটা বুকে সাহস এনে পিলপিল করতে কর‍তে ধূসরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল,যেখানটায় এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল ইকবাল।
ধূসর নিঃসন্দেহে লম্বা ওর চেয়ে। তাও পিউ গলা উঁচু করে দেখতে চাইল ওর ক্যামেরার স্ক্রিনে! নাগাল পেলো না। পরেছিল হিল। পায়ের গোড়ালি উঁচু করে আঙুলে ভর দিতে গিয়েই বাঁধল বিপদ। ফের হিল কাত হয়ে ধূসরের গায়ের ওপর হেলে পড়ল মেয়েটা। ধূসর সরল না,ধরলও না। তাকাল বিরক্ত চোখে৷ কেমন গমগম করে বলল,
“ ঠিক করে খাস না? যখনই দেখি কোথাও না কোথাও পড়ছিস!”
পিউ নিজেই সোজা হয়ে বলল,
“ সরি সরি,আসলে হিলের অভ্যেস নেই তো।”
ধূসর আবার ক্যামেরায় ফিরতেই বলল,
“ ইয়ে, আপনি কী ভিডিও করছেন ধূসর ভাই? একটু দেখি!”
দেখাল না সে। পিউর মানহানী হলো। অন্য কেউ হলে এমন ইগো দেখাতো, কিন্তু এই মানুষটার বেলায় পারল না। উশখুশ করে নিজেই বলল,
“ আচ্ছা, এটা দিয়ে ছবি তোলা যাবে না? জানেন,আমাকে আজ কেউ ছবি তুলে দেয়নি। সবাই নিজেদের মত ব্যস্ত। এমনিতে সাদিফ ভাই সব সময় দিতো,কিন্তু আজ সেও এত লাফালাফি করছে! ইয়ে মানে,ধূসর ভাই আপনি আমাকে কিছু ছবি তুলে দেবেন?”
ধূসর পিউয়ের ফন্দি বুঝল বোধ হয়। ধারালো চোখটা ঘুরিয়ে চাইল ওর দিকে। গম্ভীরমুখে বলল,
“ কেন? তোর ছবি তুলে আমার কী লাভ?”
পিউ উদ্দ্বেগ নিয়ে বলল,
“ আমি অনেক অনেক অনেক অনেক দোয়া করব আপনার জন্যে। বলব,আপনাকে যে সত্যিকারের ভালোবাসে সে যেন আপনাকে পায়।”
ধূসর এক ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ ভালোবাসার কী বুঝিস তুই!”
পিউয়ের চোখের সঙ্গে ঠোঁটদুটোও কাঁপল কিছু। এই প্রশ্নের উত্তর ওর কাছে আছে। চাইলেই দিতে পারবে। কিন্তু মাথা নুইয়ে নিলো কী ভেবে। ধূসর হ্যান্ডিক্যাম আরিফের হাতে দিলো হঠাৎ। ওকে
বলল,
“ চল!”
বিস্মিত বনে মুখ তুলল পিউ।
“ হ্যাঁ, সত্যি তুলে দেবেন?”
ধূসর আগে আগে হেঁটে গেল। নিঃশব্দে বোঝাল,তার পিছু নিতে। পিউ ছুটল দুরন্ত পায়ে। ছবির কর্ণার আলাদাই এখানে। তার ওপর ফুলে ফুলে সজ্জিত স্টেজে ছিল বর-কনের বসার জায়গা। যেখানটা এখন ফাঁকা পড়ে আছে,সবাই নাচের ওখানে থাকায়। ধূসর সেথায় এসে থামলেও, পিউ খুশির তোড়ে কথা বলতে পারল না। শুধু ফ্যাসফ্যাসে শ্বাস শোনা গেল,আর অল্প একটু আওয়াজ। জিজ্ঞেস করল,
“ ও-ওখানে বসব?”
“ যা।”
তুরন্ত, ছুটে গিয়ে স্টেজের রাজকীয় সোফায় বসল মেয়েটা। ধূসর ফোন বের করল। ক্যামেরা তাক করতেই পিউ পোজ দেয়ার বদলে কেন যেন জমে গেল তুষারের ন্যায়। অবিশ্বাস আর উত্তেজনায় ওর সারা শরীর কাঁপছে। ধূসর ভাই ফটোগ্রাফার, আর ও মডেল?
এ-ও সম্ভব বুঝি!
চলবে… See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply