Golpo romantic golpo আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন

আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১৩


#আলতোছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন_(১৩)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
নিচ থেকে হঠাৎ ভেসে আসা শব্দে আনিস-সুমনার প্রেমালাপ থামল। এতটুকুতেই আপনি ছেড়ে তুমিতে চলে এসেছিলেন আনিস। এবার চটপট উঠে এলেন তিনি।
বিড়বিড় করলেন,
“ কীসের আওয়াজ ওখানে?”
পিউয়ের চোয়াল ঝুলে পড়ল। এই রে,চাচ্চু টের পেয়েছে! এখন যদি ধূসর ভাই বলে দেয় ওরা আঁড়িপেতে কথা শুনছিল,চাচ্চু কী ভাববে?
আর নতুন ছোটো মা,সেও তো খারাপ ভাববে ওদের! ইস, ওদের এখানে আসাই ঠিক হয়নি।
আনিস,সুমনা দুজনেই দ্রুত এসে দাঁড়ালেন। অমনি পিউ মাথা নত করল। চোখমুখ দেখে মনে হলো মস্ত বড়ো অপরাধী সে। আনিস একটু অবাক হলেন ওদের দুজনকে দেখে। ধূসর যতটা পোক্ত চিবুকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, পিউ ততটাই কুকড়ে যাওয়ার যোগাড়। একবার পিউ, আরেকবার ধূসরকে দেখলেন আনিস। জিজ্ঞেস করলেন,
“ কী হয়েছে রে?”
পিউ নিচের ঠোঁটটা ছটফটিয়ে দাঁত দিয়ে কামড়ে মুখগহ্বরের ভেতর নিয়ে গেল। পেটের কাছে জড়োসড়ো হাতের আঙুল কচলাল সমানে। এখন কী যে হবে! চাচ্চু,ছোটো মা যেমন -তেমন ; কিন্তু ধূসর ভাই তো এই কথা নিচে গিয়েও সবাইকে বলে দেবেন। আম্মু তো আর আস্ত রাখবে না তখন। অথচ আপুটা ঠিক ওকে ফাঁসিয়ে দিয়ে নিজে ভেগে গেল! হুহ…
পিউয়ের সরু নাকটা ভয়ে পিটপিট করছিল। কাঁদবে কাঁদবে ভাব। ধূসর তক্ষুনি বলল,
“ কথা শেষ হলে নিচে এসো, খেতে ডাকছে।”
চকিতে মাথা তুলে চাইল পিউ। দৃষ্টি ছাপানো অবিশ্বাস নিয়ে দেখল ধূসরের মুখটা। আনিস বললেন,
“ ওহহ,তোরা কি ডাকতে এসেছিলি?”
“ হ্যাঁ। এসো।”
তারপর আবার নেমে গেল ধূসর। পিউ তখনো হতবাক,বিহ্বল! আনিস সুমনাকে বললেন,
“ এসো।”
সুমনা এক সিঁড়ি নামেন। পেছন ফিরে দেখেন একটা জড়বস্তুর মতো দাঁড়িয়ে আছে পিউ। চোখের পাতায় নড়ন-চড়ন নেই। ভদ্রমহিলা ডাকলেন হাত ঝাঁকিয়ে,
“ পিউ? যাবে না?”
মেয়েটা নড়ে উঠল। হ্যাঁ হ্যাঁ বলে চলল চাচির সাথে। কিন্তু এতক্ষণের বিবর্ণ মুখটায় এক টুকরো গোধূলি এসে বসল রাতারাতি। ধূসর ভাই ওকে কিছু বললেন না, আবার চাচ্চুর থেকেও লুকোলেন। কেন?
তাহলে কি ধূসর ভাইয়ের মনেও ওর জন্যে সামথিং সামথিং শুরু হয়ে গেছে?


পিউ নিচে আসা মাত্রই পুষ্প ওর হাত ধরে টানল,কিন্তু পিউ গেল না। গাট হয়ে রইল অভিমানে।৷ পুষ্প বলল” রাগ করেছিস? রাগ করিস না। ধূসর ভাইকে দেখে ভয় পেয়েছিলাম!”
“ হুহ!”
“ ভাইয়া তোকে কিছু বলেছে? বকা দিয়েছে?”
পিউ এ যাত্রায় মিটিমিটি হাসল। বলল,
“ নাহ! উনি আমাকে কখনো বকা দিতে পারেন?”
পুষ্প বুঝতে পারল না। চোখ পিটপিট করে ভাবল, কেন? পারবে না কেন?
ওয়াজিদের স্ত্রীর নাম দোলা। বাবা সরকারি চাকরি করেন। ভালো পরিবারের মেয়ে! শিকদার বাড়ি আসা থেকে তার চেহারার অবস্থা দুরুহ। তার চেয়ে কম সুন্দরী, কম লেখাপড়া জানা সুমনার এত ভালো বাড়িতে বিয়ে হবে,এ যেন মেনে নেয়া কষ্টের।
কিন্তু ওয়াজিদ আর সুমনা শুরু থেকে যে ভয়ে ছিলেন তা আর নেই। বরং এ বাড়ির প্রত্যেকের ব্যবহার আর আন্তরিকতায় মুগ্ধ সকলে। ওয়াজিদের চাচাও বেশ পুলকিত এ নিয়ে। একটা মানুষেরও আচার-আচরণে বাড়তি ভাব নেই,ইগো নেই। জলের মতো স্বচ্ছ,মাটির মতো নরম যেন।
দু পক্ষেরই দু পক্ষকে পছন্দ হয়ে গেল। আজকেই সুমনাকে নিজেদের জন্যে পাকাপোক্ত করতে,আংটি পরিয়ে রাখতে চাইলেন মিনা। কেউই দ্বিমত করেনি এ নিয়ে। সবার মাঝে একই সোফায় কাছাকাছি বসে,আনিস আংটি পরালেন সুমনাকে। অমনি পিউ-পুষ্প হাত তালি দিয়ে উঠল। ওদের দেখাদেখি রাদিফ,জবাও তালি বাজায়। বাকিরাও বাজাল সাথে সাথে। ঘরময় হাততালির বৃষ্টির সঙ্গে আনিস-সুমনা আমজাদকে সালাম করতে গেলে আটকালেন তিনি। চাচাকে দেখিয়ে বললেন,
“ আঙ্কেল গুরুজন এখানে,ওনার আগে আমি কেন?”
দুজন সুমনার চাচাকে সালাম করলেন। একে একে বয়সে বড়ো সকলকেও করলেন পা ছুঁয়ে। ওয়াজিদ এক পর্যায়ে বললেন,
“ আমজাদ ভাই,আমরা তো সব দেখেই গেলাম। এবার আপনারা দেখবেন না? আমার ওই ছোট্ট ফ্ল্যাটটাতো আর আমাদের আসল পরিচিতি না। আমাদের গ্রামেও একটু খোঁজ খবর নিতে চাইলে নিতে পারেন।”
“ তার কোনো দরকার নেই। আমি মানুষের ব্যবহারে বিশ্বাসী!
আর গ্রামে গেলে বড়োজোর আপনাদের অতীত নিয়েই হয়ত শুনব। ওসব জেনে কী হবে? বর্তমানই আসল। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ সুমনা আমার ভাইকে কেমন রাখবে। আমাদের সাথে কেমন মিশে থাকবে? যুগ যুগ ধরে চলা এই একান্নবর্তী পরিবারটা কখনো ও ভাঙতে চাইবে না তো!”
সুমনা আঁতকে চাইলেন ওনার পানে। এ কথা যেন শোনাও পাপ। আমজাদ হাসলেন তাতে। ওয়াজিদ বললেন,
“ আমার বোনটা তরলের মতো। যে পাত্রে রাখবেন ও তেমনই থাকবে। ওর জন্যে কোনোদিন আপনাদের ক্ষতি হবে না আমি এটুকু জানি।”
“ তাহলে আর কিছু জানার আগ্রহ আমার নেই।”
“ তা বললে হবে না ভাইজান!
আপনাকে যেতেই হবে। আব্বাজান আমাকে কল করে বারবার বলে দিয়েছিলেন,আপনাদের নিমন্ত্রণের কথা। শরীর ভালো থাকলে নিজেই চলে আসতেন। প্লিজ,না করবেন না। অনুরোধ! একবার সময় করে বড়োরা এসে আমাদের বাড়িঘর দেখে গেলেন না-হয়!”
এত অনুনয় আর ফেলা গেল না। আমজাদ একবার ভাই,একবার স্ত্রী সবার সাথে মুখ দেখাদেখি করে স্বায় দিলেন শেষে। দুপুরের খাওয়া দাওয়া শুরু হলো। এলাহি আয়োজন সেখানেও। আস্ত মুরগীর গ্রীল থেকে শুরু করে কত পদের রান্নাবান্না!
সুমনাকে চেয়ার টেনে দিলো পুষ্প। হেসে বসলেন তিনি। বললেন,
“ আমার না তোমাদের দুবোনকে খুব ভালো লেগেছে। তোমরা খুব মিষ্টি!”
হাসল ওরা। পিউ বলল,
“ আপনি আমাদের চেয়েও মিষ্টি!”
“ আপনি বলছো কেন? তুমি করে ডেকো।”
দুবোন ফটাকসে আওড়াল
“ আচ্ছা ছোটো মা!”
সুমনা লজ্জায় থতমত খেয়ে গেলেন সবার সামনে। মাথা নুইয়ে চেয়ারে বসলেন দ্রুত। আনিস হাত ধুয়ে হাজির হলেন। ওপাশে যেতে নিলেই জবা বললেন,
“ তুমি আবার ওদিকে যাচ্ছো কেন? বসো এখানে।”
সুমনার পাশের চেয়ারটায় ধরে বসিয়ে দিলেন ওনাকে। দুজন লজ্জায় চুর হয়ে চুপচাপ রইলেও, সকলে ঠোঁট চেপে হাসল। মিনা ভাতের ব্যোল সামনে রেখে বললেন,
“ নাও ভাই,বেড়ে বেড়ে খাওয়াও। এখন থেকেই কিন্তু দায়িত্ব নেয়া শুরু করতে হবে।”
আনিস বড়ো ভাইদের সামনে মাথা তুলতে পারছেন না। শুধু ঘাড় কাত করলেন।
এদিকে
পিউ আজ বিশ্বকাপ জিতেছে। এই প্রথম ধূসরের পাশের চেয়ার দখল করতে পেরেছে বলে ঠোঁটে হাসি ধরছে না। মায়ের কথায় টনক নড়ল যেন। অমনি নিজের প্লেটটা এগিয়ে ধরে বলল,
“ ধূসর ভাই, আমাকেও ভাত দিন না!”
ধূসর ওর দিকে তাকায় না। এক পল ঝিম ধরে ভাবে,এরপর প্লেটটা হাতে নিয়ে দু চামচ ভাত তুলে দিলো। পিউ বলল,
“ আরো দিন।”
আরেক চামচ তুলল ধূসর। পিউ বলল,
“ আরো দিন।”
ধূসরের কপালের ভাঁজ ভেসে উঠল অমনি। দিলো আরেক চামচ। পিউ ফের বলল,
“ আহা এরকম কম কম দিচ্ছেন কেন? প্লেটই ভরেনি। আমি অনেক খেতে পারি। কিন্তু মোটা হই না।”
ধূসর ভাতের ব্যোলটা তুলে এনে দুম করে রাখল ওর সামনে। কিছু বিরক্তি নিয়ে বলল,
“ নিজেরটা নিজে নিয়ে খা।”
পিউ ঠোঁট উল্টে ফেলল। নাহ,অল্প পাওয়ার খুশিতে বেশি উড়ে ফেলেছিল বোধ হয়। ফোস করে শ্বাস ফেলার মাঝেই সাদিফ বলল,
“ কী লাগবে তোর? কোনটা নিবি? দে প্লেট দে।”
পিউ আস্তে আস্তে বলল,
“ লাগবে না ভাইয়া। তুমি খাও।”
ধূসরের হাত ভাতের মধ্যে চলছিল। পিউয়ের কথায় থামল সেটা। এক সেকেন্ড কপাল টানটান করে,কী যেন ভেবে পরপরই খাওয়ায় ব্যস্ত হলো আবার।
সুমনার পরিবার বিকেলে বিদেয় নিলেন। উবারে এসেছিলেন ওনারা। যাবেনও উবারে। কিন্তু তাতো আর হতে দিলেন না আমজাদ। নিজের গাড়িতে ওনাদের পৌঁছে দেয়ার জন্যে সাদিফ আর আফতাবকে পাঠিয়ে দিলেন।
শিকদার বাড়ির চত্বরের এক পাশ থেকে আমজাদের সাদা গাড়িটা ছুটে বেরিয়ে গেল, ওইপাশের লন থেকে নিজের নীল গাড়ি নিয়ে বের হতে নিলো ধূসর। রুবায়দা অবাক হয়ে বললেন,
“ ওমা,তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
“ যেজন্যে থাকতে বলেছিলে,সেটা তো শেষ।”
“ তাই বলে চলে যাবি? আজ সবাই বাড়িতে,আজ থাক।”
“ রাতে আসব।”
ছেলেটা কথা শুনল না। আমজাদ বিরক্তি নিয়ে গজগজিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন। রুবায়দা হতাশ হয়ে বললেন,
“ মোটে ঘরে থাকতে চায় না। কী যে করি!”
পুষ্প দুষ্টুমি করে বলল,
“ মা না বলল,চাচ্চুকে ঘরে রাখার উপায় ছোটোমাকে আনা? তাহলে ধূসর ভাইয়ার জন্যেও একটা ভাবি নিয়ে এসো মেজো মা।”
পিউ রুষ্ট চোখে চাইল বোনের দিকে। এ কেমন অলক্ষুণে কথা? যেখানে ও রেডিমেড ঘরে পড়ে আছে,সেখানে আবার বাইরে থেকে কাউকে আনতে হবে কেন!
রুবায়দা বললেন,
“ আনব আনব। আনিসের বিয়ে আগে হোক,এরপর তো ওরই সিরিয়াল!”
সবাই কথা বলতে বলতে ভেতরে ঢুকে গেলেও পিউ মুখ ভোঁতা করে দাঁড়িয়ে রইল দোড়গোড়ায়। ধুর,মুডটাই খারাপ হয়ে গেছে!


কিছুদিন পরের কথা!
গতকাল রাতে বাড়িতে একটা বোর্ড মিটিং হয়েছে। সুমনার গ্রামের বাড়ি কে কে যাবেন সে নিয়ে! বরিশাল,মানে লম্বা একটা জার্নি। একবেলা হয়ত বসতে পারবেন কোনোরকম। তাই ঠিক হলো অল্প কজন যাবে। আফতাব,ধূসর আর সাদিফ। কিন্তু আফতাব বড়ো ভাই অন্তঃপ্রাণ। কিছুতেই একা যাবেন না। সাদিফ জানাল,তার কাল অডিট ফার্মে থাকা খুব জরুরি। কালই ফলাফল আসবে ঐ প্রজেক্ট নিয়ে। আবার ঘরবাড়ি দেখার ব্যাপার, সাথে মেয়েলোক প্রয়োজন। কিন্তু মিনা একা যাবেন না। অগত্যা ঠিক হলো বাড়ির সবাই যাচ্ছে। এর মাঝে জবা তুললেন ভিন্ন সুর। মিনমিনিয়ে জানালেন,
“ ভাইজান রাদিফের ড্রয়িং এক্সাম! এটেন্ড করলে ভালো হতো।”
“ আচ্ছা কোনো সমস্যা নেই। যেও তাহলে!”
ধূসর এই মিটিংয়ে ছিল না। এত তাড়াতাড়ি কি আর ফেরে? আমজাদই বললেন,
“ জমিদারকে একটা ফোন করো আফতাব। আগে শুনে নাও সে যাবে কিনা!”
আফতাব সাদিফকে বলল,
“ তুই কল দে।”
সাদিফ কল করল। পিউ অমনি বসল নড়েচড়ে। ধূসর বাইক চালাতে চালাতেই রিসিভ করে বলল,
“ বল।”
“ ভাইয়া,কাল সবাই বরিশালে যাবে। ছোটোমাদের বাড়ি। তুমি যাচ্ছ…”
অর্ধেকপথেই ধূসর বলল,
“ আমার হবে না। কাল আমার কাজ আছে। সকাল সকাল বের হব।”
সবার মধ্যে একটা বিশদ নিরাশা দেখা গেল। আমজাদ বিড়বিড় করলেন,
“ জানতাম এমনই বলবে। উহ,কাজ আছে! ওইতো রেডিশেডি হয়ে সাথে কটা বানর সেনা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো! থাক,ওর যেতে হবে না। আমরাই যাব।”
পিউয়ের সব উচ্ছ্বাস মাটি। মিনা তক্ষুনি বললেন,
“ এক কাজ করি তাহলে, জবাও যাবে না যখন এ দুটোকেও রেখে যাই। পুষ্পটা লং জার্নিতে হাতপা ছেড়ে দেয়; ওকে সামলাব, না ওদিক দেখব?”
পুষ্প অমনি মনে মনে একটা ছক এঁকে ফেলল। আর পিউ লাফিয়ে বলল,
“ আচ্ছা আম্মু। আমরা বরং থেকেই যাই। একটা বেলা তো? ও আমি তোমাকে ছাড়া কষ্ট করে থেকে যাব।”
মিনা বললেন,
“ তুমি যে কত আমাকে ছাড়া কষ্ট পাও মা,তা আমার বেশ জানা আছে!”


সকাল বেলা…
ঘুমে বিভোর থাকা পিউয়ের মনে হলো কেউ গা ধরে ঝাঁকাচ্ছে! কে ঝাঁকাবে? কানে এলো ফিসফিসে শব্দ,
“ পিউ, এই পিউ ওঠ না। পিউ!”
আরামের নিদ্রার এমন চরম ব্যাঘাতে বিরক্ত হয়ে চোখ মেলল ও। বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে এলো অমনি। পুষ্প রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে।
“ কোথায় যাচ্ছিস আপু?”
পুষ্প বলল,
“ ইকবালের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। আমার ফিরতে একটু দেরি হতে পারে। সেজো মা ফিরলে কিন্তু বলিস না। বলিস যে রিংকিদের বাড়ি গিয়েছি নোটস আনতে।”
পিউ উঠে বসে বড়ো হাই তুলল। পরপর সচকিতে বলল,
“ আর আম্মুরা? সবাই চলে গেছে?”
“ সে তো ঘন্টাখানেক আগেই গেল। আম্মু ডাকতো তোকে,বাবা মানা করলেন।”
“ আর সাদিফ ভাই?”
“ ভাইয়াও!”
“ ধূ-ধূসর ভাই?”
“ সবাই গেলে সে কি বসে আছে? তার না আরো সকালে যাওয়ার কথা? আর আমি কি সবার খোঁজ নিয়েছি বলতো! উঠলামই কিছুক্ষণ আগে। ওদিকে ইকবাল ফোন করছে। তুই একটু দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে যা না! সেজো মা আসার আগে বের হই।”
পিউ ফোস করে শ্বাস ফেলে গা থেকে কাঁথা সরিয়ে নিচে নামল। পুষ্প যেতে যেতে বলল,
“ পারভীন এখনো আসেনি। সেজো মা তোর জন্যে নাস্তা বানিয়ে রেখেছে, খেয়ে নিস। আর বাড়ি ফাঁকা দরজা ভালো লাগিয়ে রাখিস কেমন!”
“ আরে এত চিন্তা করিস না। সেজো মা একটু বাদেই এসে পড়বে। তুই যা!”
পুষ্প বোনের গালে চুমু খেয়ে বলল,
“ আমার বোনটা এত ভালো!”
পিউ সদর দরজা চাপিয়ে ফ্রেশ হতে ঢুকল। দাঁত ব্রাশ করে,চোখমুখ ধুয়ে বসল খাবার টেবিলে। দুটো রুটি,আলু ভাজি,ঘন ডাল, আর ডিম সেদ্ধ রাখা। পাশে কার্টুন ছেড়ে খেলো একা একা। সব গুছিয়ে রেখে এলো সিঙ্কে। রুমে গিয়ে বই নিয়ে বসল। ওর পরীক্ষা শেষ। আপাতত কোনো পড়াশোনা নেই। এই কদিন পিউ মোটামুটি মুক্ত! তাই একটু-আধটু গল্প-টল্প পড়ছে। হাতের বইটা রোমান্টিক উপন্যাস ছিল। নায়ক-নায়িকার কেমিস্ট্রির অংশে পিউয়ের চোখমুখ পাল্টাল হঠাৎ। কবিতার লাইনগুলো মনে ধরল খুব। পিউ
ঝট করে খাতা টেনে হাসিহাসি চেহারায় লিখল,
“ ভালোবাসা কোনো দৃশ্য হলে,
তার রং নীল।
আর নামটা তুমি!
যেখানে এসে কবিতার মতো থমকাই আমি।
যেথায় এসে আমার সব অনুভূতি থামে,
আমি ডুবেছি তোমার সেই এক সমুদ্র প্রেমে!
আমার, তার, আর আমাদের গল্পে,
কল্পে,অতি অল্পে,
কিংবা আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথনে,
শব্দ নেই , ভাষা নেই,
শুধু স্পন্দন এখানে!”
বাকিটুকু পিউ নিজে বানিয়ে লিখল,
সে জানে না,
বোঝে না এসব!
তার মাঝে প্রেম নেই; আবেগ নেই হয়ত।
তবে আমার প্রেমের কিছু হলেও দেখতো!
তাও আমি মরেছি,
তার প্রেমে পড়েছি,
জেনেবুঝে সে মানবকে
দিয়েছি অন্তঃপটে ঠাঁই!
কান পেতে শুনুন,
হৃদয়ের ফিসফিস গুনুন,
কারণ নেই,
না আছে জবাব,
শিকদার ধূসর মাহতাব
আপনি বোঝেন?
আমি আপনাকে ঠিক কতটা চাই!”
পিউ মুচকি হাসল শেষ লাইনে এসে। চেয়ারে পিঠ ছেড়ে চোখ বুজতেই ধূসরের মুখটা ভেসে উঠল অমনি। মেয়েটা গালে হাত দিয়ে বলল,
“ কী যে হলো আমার!
আপনাকে দেখার পর,আমার চোখ আর কাউকে খুঁজতে চায় না!”
আচমকা পিউ উচ্ছ্বল হয়ে পড়ল। কী যেন ভেবে ছুটল পুষ্পর ঘরে। আলমারিটা খুলল তারপর। পুষ্পর মাত্র ৫-৬টা শাড়ি আছে। অবিবাহিত মেয়েদের যা হয়! গত সপ্তাহে অনলাইন থেকে একটা নীল রঙের প্লেন জর্জেট শাড়ি কিনেছিল। ভাঁজ অবধি খোলেনি। কিন্তু দুরন্ত পিউ মূহুর্তে ওটা বের করে গায়ে পরে ফেলল।
বয়সে এতটুকু হলেও,ও ভালো শাড়ি পরতে জানে। মেজো মায়ের কাছে শেখা! ম্যাচিং ব্লাউজ ছিল এটার, হাফ হাতা। শাড়ি পরে পিউ চুল খুলে দিলো। পাঞ্চক্লিপ সরাতেই সুরসুর করে সব নেমে গেল কোমরের নিচে। পুষ্পর চুড়ির আলনা থেকে নীল চুড়ি বের করে দুহাত ভরে পরলো তারপর। ঠোঁটে ডাস্টি রোজ লিপস্টিক, কানে দুটো এন্টিকের ঝুমকো পরে নিজেকে ঘুরেফিরে দেখল পিউ। ইস,সুন্দর লাগছে খুব! কিন্তু পেট, বুক- পিঠ সব বেরিয়ে আছে। এই শাড়ি আপু কিনলো কেন? আম্মু তো পরতেই দেবে না। আর ইকবাল ভাইয়াও যা পজেসিভ!
তাতে পিউয়ের কী? এখন তো বাড়ি ফাঁকা। এখন ও পাখি। আর এই পাখি প্রেমে পড়েছে না? মনের আনন্দে সে এখন উড়বে,লাফাবে।
আঁচল ওড়াতে ওড়াতে পিউ লিভিংরুমে এলো। সদর দরজার ছিটকিনিটা তুলল আগে। যাতে কেউ এলেও চাবি দিয়ে ঢুকতে না পারে। এখানকার টিভিটা ৭৫”, গোটা একটা দেওয়াল নিয়ে বসানো। পিউ স্ট্যান্ড ফ্যান সেট করে নিজের দিকে ফেরাল। ফ্যানের বাতাসে চুল উড়লে নিজেকে হিরোইন মনে হয়! তারপর রিমোর্ট টিপে ইউটিউব ধরল টিভিতে।
প্রচণ্ড ধুমধুম আওয়াজে ধূসরের ঘুম ছুটে গেল। চ সূচক শব্দ করে কপালে ভাঁজ ফেলে চোখ মেলে চাইল সে। এত জোরাল শব্দে গান বাজছে কোথায়?
ধূসর কানে বালিশ চেপে ঘুমোতে চাইলেও হলো না। গান ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেউ একজন গলা ছেড়ে গাইছে! আওয়াজটা নিচ থেকে আসছে না?
বাড়িতে হিসেব মতো পিউ আর পুষ্প থাকার কথা। মেজাজ খারাপ করে উঠে এলো ধূসর। দুটোকে যে কী করবে এখন!
কাল রাত থেকে মাথাব্যথা ওর। সেজন্যে সকালে বেরও হয়নি! তবে
ঘরের চৌকাঠ পার হতে গিয়েও থামল হঠাৎ। মনে পড়ল ও খালি গায়ে। আর সেবার পিউ যেভাবে ওকে দেখছিল! ধূসর বিরক্ত চোখমুখেই চেয়ারের ওপর থেকে কালো শার্টটা টেনে গায়ে চড়াতে চড়াতে বেরিয়ে এলো বাইরে। তিন তলা থেকে দোতলা অবধি এসে এক পল চাইল নিচে। ওভাবেই পা রাখতে গেল সিঁড়িতে।
তবে সোজাসুজি বসার ঘরের মেঝেতে চোখ পড়া মাত্রই সেই পা হড়কে গেল আজ। পাহাড়ের মতো অটল ধূসর আজ কাউকে দেখার অন্যমনস্কতায় পড়তে নিলো,ধড়ফড় করে সিঁড়ির হাতল এক হাত দিয়ে চেপে ধরল অমনি। পরপর আস্তেধীরে শাণিত নয়ন ঘুরিয়ে ফিরল আবার সেদিকে।
নিচে একটা নীলকণ্ঠ পাখি নাচছে। ভীষণ লম্বা খোলা চুলের সাথে উড়ছে শাড়ির আঁচল। পেলব হাত,সরু কোমর নাড়িয়ে নাড়িয়ে টিভিতে গানের সাথে ঠোঁট মিলিয়ে গাইছে,
“ মন নিলো সে,মন নিলো সে,
মন টেকে না ঘরে।
কেড়ে নিলো সে,
সিধাসাদা মন জাদু করে!”
পিউ মগ্ন হয়ে নাচছে। যেন পৃথিবীর কোনো কিছুতে তার কোনো মোহ নেই। নড়চড়ের কারণে মাঝেমধ্যে কোমরের শাড়ি সরে পেট বেরিয়ে আসছে। ব্লাউজের গলা থেকে মেয়েলি আর্কষণীয় ভাঁজ বোঝা যায়। পাতলা শরীরে তার চেয়েও পাতলা শাড়ি জড়ানো। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যে ধূসর যেন নির্বাক হয়ে পড়ল। বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল ওখানে। তন্ময় হয়ে দেখলই শুধু। পিউয়ের চুল এত বড়ো? খেয়াল করেনি তো। অন্যসময় ওকে দেখতে যতটা ছোটোখাটো লাগে,আজ তো লাগছে না!
ধূসর এক পা এক পা ফেলে একেকটা সিঁড়ি বেয়ে নামে। ঘুম ঘুম চোখ,কপালে ভাঁজ,এলোমেলো চুল। দাঁড়াল ট্রাউজারের দুই পকেটে দুহাত গুজে।
পিউ তখনো নেচে নেচে গাইছে,
“ টেকে না মন আমার ঘরে,
বউ সেজে যাব বন্ধুর ঘরে,
ফিরে ফিরে দেখি শুধু তারে,
সে মনের বারান্দায় উঁকি মারে!
প্রথম দেখায় আমি গলে গলে যাই,
সিনেমার মতো ওরনা উড়ে যায়,
চিঠি আসে বন্ধুর গোপনে,
জড়িয়ে ধরে সে আমায় স্বপনে।
মন নিলো সে,মন নিলো সে
মন টিকে না ঘরে।
কেড়ে নিলো সে,
সিধাসাদা মন জাদু করে।”
পিউ দুহাত মেলে পাখির মতো চক্কর কাটতে কাটতে হুট করে চোখ পড়ল বারান্দার থাই গ্লাসটায়। দিনের আলোতে বাইরেটা পরিষ্কার। তবে পেছনে কারো অবয়ব ঝাপসা দেখা যাচ্ছে সেথায়। মেয়েটা থেমে গেল অমনি। চমকে পিছু ফিরে চাইল। ঠোঁট দুটো হাঁ হয়ে দু প্রান্তে ছড়িয়ে গেল অমনি। ধূসর ভাই!
উড়ন্ত পাখি ঝুপ করে মাটিতে পড়লে যেমন লাগে? সংকীর্ণ পিউ অমন গুটিয়ে গেল মূহুর্তে। ভীষণ লজ্জা পেয়ে শাড়ির আঁচল সহ সব টেনেটুনে ঠিকঠাক করতে চাইল। হাত কচলাল! ঠোঁট টিপল বারবার। চিবুক গলার ভাঁজ হতে উঠছেই না। আপু তো বলল বাড়ি ফাঁকা। তাহলে ধূসর ভাই কোত্থেকে এলো? ইস,পিউ আজ কেন যে একবার ওনার ঘরটা দেখে আসেনি! মনেই ছিল না।
মেয়েটার এই উশখুশ করার পুরোটা সময় ভ্রুদুটো গুছিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পা থেকে মাথা অবধি দেখল ধূসর। পিউ
একটুখানি চোরা চোখের কোণ তুলতেই ভ্রু নাঁচিয়ে স্থুল স্বরে বলল,
“ হয়েছে?”
কণ্ঠ ভাঙা, গম্ভীর আরো! বোঝাই গেল,সদ্য ঘুম থেকে উঠে এসেছে। পিউ বিভ্রান্ত হয়ে বলল,
“ জী মানে ক-কী?”
“ বিড়ালের মতো লাফানো?”
পিউ ঠোঁট উলটে মাথা নত করল। ঘাড় নাড়তেই ধূসর বলল,
“ রুমে যা।”
বাধ্য মেয়েটা চুপচাপ আনত হয়ে ঘরের পথ ধরল। পাশ কাটানোর সময় স্বভাবসুলভ চোরা চোখ তুলে তাকাল আবার। এমনিতে ধূসর কখনো তাকায় না। অথচ আজ আড়চোখে চাইল সেও। ঠান্ডা দৃষ্টিজোড়া সোজাসুজি দেখে অমনি পিউয়ের বুক ছলাৎ করে উঠল। এত ধার কারো চোখে থাকে কখনো?
বুকে ছুরি ঢুকে গেল তো। মেয়েটা চপল পা চালিয়ে ওপরে ছুটে চলল সহসা।
ধূসর এসে রিমোর্ট তুলে টিভি বন্ধ করল। ফ্যানের সুইচ টিপতে টিপতে একবার তাকাল ওপরে। দোতলায় দাঁড়িয়ে পিউ উঁকিঝুঁকি মারছিল৷ ও চাইতেই ধরা পড়ে ফের ঘরের পানে ছুটল ধড়মড় করে। এইবার আলগোছে হাসল ধূসর । পাতলা ঠোঁট তুলে দন্তপাটি বাইরে না আসা সামান্য হাসি। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“ those big fish eyes!”
চলবে… See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply