Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৪৬


#জল_তরঙ্গের_প্রেম
পর্ব সংখ্যা;৪৬
#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি
প্রতিদিনের ন্যায় বিকেলের সিগন্ধ বাতাসের মাঝে বারান্দায় বসে আছে তরী। হাসপাতাল থেকে তাকে বাসায় রেখে শপিং মলে চলে গিয়ে ছিল তরঙ্গ। শপিং মলের ওয়ার্ক আওয়ার শেষ হলে টিউশনিতে যাবে সে।
ফিরতে ফিরতে রাতের দশটা, সাড়ে দশটা। ছেলেটাকে এতো কষ্ট করতে দেখতে তরীর একটু ও ভালো লাগে না। তরঙ্গ টা পাগল বটে। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে রাজপথে নেমে এসেছে কেবল তার জন্য। পাগল না হলে কি এমন বোকামি করে? স্বার্থের পৃথিবীতে সে ভালোবাসেছে। নিজের বিলাস বহুল ক্যারিয়ারের পরিবর্তে স্ট্রাগল বেছে নিয়েছে। কতো বোকা ছেলেটা। তরঙ্গের কথা ভাবতে ভাবতে ওষ্ঠে হাসি ফুটে উঠলো তরীর।
আলতো ভাবে পেটে হাত বুলালো সে। ইশশ, তার শরীরে ধীরে ধীরে তরঙ্গের অংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভাবতেই অবাক লাগে। সেদিন ও ছেলেটা ভালোবাসি, ভালোবাসি বলে কান ঝালাপালা করে দিতো। প্রতিবার বিরক্ত হয়ে পালিয়ে বেড়াতো তরী। আর আজ তারই অংশ তরীর গর্ভে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো তরী। ঘরের মধ্যে বেসিনের আয়না ছাড়া অন্য কোনো আয়না না থাকায় থাই গ্লাসের জানলার সামনে এসে দাঁড়ালো সে। সূর্য পশ্চিমে ডলে পড়ায় থাই গ্লাসের অপর সাইডে রোদ এসে পড়েছে।
রৌদ্রের সোনালি প্রতিফলনে তরীর অবয়ব আর ও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। শাড়ির উপরেই পেটে হাত রাখলো তরী। পেট টা এখনো স্বাভাবিক আছে। তবুও, অদ্ভুত অচেনা অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরছে। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো তরী। গায়ের রঙটা কি আগের থেকে কিঞ্চিত উজ্জ্বল হয়েছে? রোদের প্রভাবে বোঝা যাচ্ছে না। মিষ্টি হাসলো সে। দুপুরে ঘুমানো বিছানা টা গুছিয়ে পুনরায় বারান্দায় গিয়ে বসতেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। এই সন্ধ্যা লগ্নে কে এলো ভাবতেই তরঙ্গের কথা মাথায় এলো তরীর। সে ছাড়া আর কে-ই বা আসবে! উৎফুল্ল হয়ে ছুটে দরজার কাছে এসে থামলো মেয়েটা। খুশি মনে দরজার পিপহোলে উঁকি দিতেই সবটুকু হাসি মিলিয়ে গেলো তার।
দরজার অপর প্রান্তে চাচি দাঁড়িয়ে। হাতে একটা বাজারের থলে। চিন্তার চাপ পড়লো তরীর কপালে। দরজা খুলবে নাকি খুলবে না সেই দ্বিধায় পড়লো সে। দ্বিধান্বিত হয়ে বেড রুমের দিকে ফিরে যেতে নিতেই পুনরায় সাহানারা কড়া নাড়লেন। নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করলো তরী। শত হোক; চাচি তরঙ্গের মা। নিজের ছেলের বাসার দরজা থেকে কোনো মা’কেই ফিরিয়ে দেওয়া অন্যায়। শাড়ির আচঁল টেনে মাথায় কাপড় চাপলো সে। তরী দরজা খুলতেই অমায়িক হাসলেন সাহনারা। দ্রুত গতিতে এগিয়ে এসে তরীকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। আচমকা চাচির এমন আচরণে গুটিয়ে গেলো তরী। সে কি করবে বুঝতে পারলো না। আগের মতোই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো তরী। শীতল কন্ঠে সাহানারা সুধালেন;-
–” চাচিকে জড়িয়ে ধরবি না মা? চাচি পাপ করেছি। অনেক পাপ করেছি। কিন্তু তুই তো বরাবর ই আমাকে ক্ষমা করে গেলি। আজ করবি না? একবার জড়িয়ে ধর না তরী।”
চাচির কাকুতি মিনতি জড়ানো কন্ঠ কানে পৌঁছাতে শক্ত তরী ভেঙে গেলো। বহুদিন পর এমন মায়ের মতো কারো ছোঁয়া পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সে। পরক্ষণেই চাচিকে বুকে জড়িয়ে ধরলো তরী।
–” চাচি, ওও চাচি।”
তরীর কান্না দেখে নিজেকে সামলাতে পারলেন না সাহানারা। অপরাধ বোধের কড়াঘাতে জড়জরিত তিনি।
–” আমাকে মাফ করে দে তরী। অনেক অন্যায় করেছি তোদের দুই বোনের সাথে। তোদের মা’কে প্রথম থেকেই আমি সহ্য করতে পারতাম না। সেই রেশ ধরে তোদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে ছিলাম এতোদিন। ফল সরূপ আমার ছেলেটা আমার থেকে পালিয়ে, পালিয়ে থাকছে। এতো করে ফোন দিচ্ছি তরঙ্গ টা ধরছে না। আমাকে আর শাস্তি দিস না তোরা।”
কি বলবে ভেবে পেলো না তরী। সে ওভাবেই মিশে থাকলো চাচির বুকের সাথে। হঠাৎ, গা গুলিয়ে উঠলো তরী। সাহানারা কে ছেড়ে দিয়ে। দ্রুত পায়ে হুড়মুড়িয়ে বেসিনের এসে বমি করে দিলো। তরীকে আচমকা বমি করতে দেখে ঘাবড়ে গেলেন সাহনারা। দরজার ছিটকিনি দিয়ে তিনি ও এসে দাঁড়ালেন মেয়েটার পাশে। চিন্তিত কণ্ঠে হায়, হায় করে উঠলেন;-
–” আল্লাহ, আল্লাহ কি হলো তোর? বমি করছিস কেন?”
বমি করা শেষ হতেই শরীর ছেড়ে দিলো তরী। দেয়াল ধরে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যেতে নিতেই সাহানারা বুকে টেনে নিলেন। চিন্তায় ভ্রু জোড়া সংকুচিত হয়ে কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হয়েছে ওনার।
–” তরঙ্গ কে ফোন করবি? দেখ তো কি হলো তোর?”
হাত নাড়িয়ে না বোঝালো তরী। চাচির হাত আঁকড়ে বিছানায় এসে বসলো সে। সাহানারা এখনো চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছেন। তরীর বেশ অস্বস্তি হচ্ছে তাতে। চাচি কিছু বুঝে যায়নি তো? আঁচলে মুখ মুছলো তরী। সাহানারা উঠে গিয়ে গ্লাস ভর্তি করে পানি নিয়ে এলো।
–” ধর পানি খা।”
তরীর পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে পানি পান করলো। সন্দেহের দৃষ্টিতে তরীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সাহানারা ফের বললেন।
–” গত মাসে কি তোর পিরিয়ড মিস গেছে তরী?”
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাহানারার দিকে মুখ তুলে চাইলো তরী। জড়তা আর লজ্জায় হুট করে চাচিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো তরী। এতেই যা বোঝার বুঝে গেলেন সাহনারা। অভিজ্ঞ চোখ বলে কথা। তরীর শরীরের সূক্ষ্ম পরিবর্তন গুলো ও খুব সহজে ধরে ফেলেছে। খুশিতে সাহানারা ও কেঁদে ফেললেন।
–” আলহামদুলিল্লাহ,”
চুলে হাত বুলিয়ে তাকে থামানোর চেষ্টা করলেন মধ্যবয়সী, মমতাময়ী, মিষ্টি মা। যার পরিচয় কেবলই— মা। তরঙ্গ, তরী আর তিন্নির মা। তাঁর মনে এখন আর সন্তানদের নিয়ে কোনো ভেদাভেদ নেই। আছে কেবল সন্তানদের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা।
–” এভাবে কাঁদছিস কেন বোকা মেয়ে? শরীর খারাপ করবে তো। তোর স্বামী যদি জানে; যে আমার জন্য তার বউয়ের শরীর খারাপ করেছে। আমাকে আর তোর ত্রিসীমানায় ও আসতে দিবে না সে।”
সাহানারা থামলেন,
–” ছেলেটা বড্ড ভালোবাসে তোকে। তুই বলতেই পাগল রে মা। নিজের জন্য না হলে ও। ওই পাগলটার জন্য নিজের যত্ন নিস।”
চাচিকে ছেড়ে দু’হাতে চোখ মুছে নিলো তরী। হাসার চেষ্টা করে প্রশ্ন করলো সে;-
–” তুমি বাসা কীভাবে চিনলে চাচি? তরঙ্গ বলেছে?”
–” আমাকে একদম চাচি ডাকবি না তো। ছেলেকে বিয়ে করে দাদি বানিয়ে দিচ্ছিস। এই দিকে আবার চাচি, চাচি ও করছিস।”
–” উমম,,”
–” হ্যাঁ, ডাক মা।”
–” বাসা কিভাবে খুঁজে পেলে আআ..ম্মু?”
তরীর চুলের মাঝে হাত রাখলেন সাহানারা। আলতো হাতে বিলি কেটে দিতে দিতে বললেন;-
–” সেই ছেলে বলবে আমাকে? বাপরে সে তো আমাকে শক্র ভাবে। তরঙ্গের একটা বন্ধু আছে না। কি জানি, হ্যাঁ রাদিফ। ওর কাছ থেকেই ঠিকানা নিয়েছি।”
–” আচ্ছা, তিন্নি কেমন আছে?”
–” তোদের জন্য মন খারাপ মেয়েটার। আমার সামনে কাঁদে না। কিন্তু ওর চোখ মুখ দেখলেই বোঝা যায়। ও খুশি নেই।”


সন্ধ্যায় সাতটা বাজে,
ড্রয়িং রুমের মেঝেতে বসে কার্টুন দেখছে তিন্নি। চাচি আর বোন বাড়িতে না থাকায় পড়তে বসছে না বাচ্চাটা। টিভি দেখার মাঝে কলিংবেল বেজে উঠতে ছুটে গিয়ে টিভি বন্ধ করে। দরজার কাছে ছুটে গেলো সে। দরজা খুলতেই মিষ্টি হেসে তিন্নিকে কোলে তুলে নিলে সাহানারা। বয়সের তুলনায়, গ্রোথে চিকন হওয়াতে তিন্নিকে সহজেই কোলে নিয়ে হাঁটতে পারে তরী আর সাহানারা।
–” কি করছিলো আমার মা টা? সন্ধ্যায় কিছু খেয়েছে সে?”
চাচির গলা চেপে ধরলো তিন্নি। অভিমানী সুরে জবাব দিলো;-
–” টিভি দেখছিলাম, কিছু খাইনি।”
–” বুশরা কিছু দেয়নি তোকে?”
–” না।”
দীর্ঘ শ্বাস চেপে তিন্নিকে নিয়ে সোফায় এসে বসলেন সাহানারা। বাচ্চাটাকে পাশে বসিয়ে দিয়ে। কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে একটা বক্স বের করলো।
–” আমি কোথায় গেছি জানিস?”
–” কোথায় গেছো?”
–” তোর ভাইয়ার বাসায়। তোর জন্য একটা জিনিস এনেছি। কিচেন থেকে চামুচ নিয়ে আয়।”
চাচির কথা শেষ হওয়ার আগেই তিন্নি দৌড়ে চামচ নিয়ে এলো। সাহানারা ব্যাগ থেকে বের করা বক্সটা তিন্নির দিকে বাড়িয়ে ধরতে। সে কেঁড়ে নিয়ে বক্স খুলতেই অবাক চোখে চেঁচিয়ে উঠলো।
–” পায়েস! আপু রান্না করেছে? তুমি তরঙ্গ ভাইয়ার বাসায় গিয়েছিলে?”
–” হ্যাঁ, তোর আপু রান্না করে দিলো তোর জন্য।”
চামচে নিয়ে পায়েস মুখে নিলো তিন্নি।
–” আমাকে নাওনি কেন?”
–” চল আমরা তোর ভাই-বোন দুটোকেই এই বাড়িতে নিয়ে আসি। তাহলে প্রতিদিন তরীর হাতের পায়েস খেতে পারবি।”
–” ভালো হবে, ভালো হবে।”
#চলবে
( কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! আর পরবর্তী পর্ব ইনশাল্লাহ জলদি দিবো।) See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply