Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৯


লেখিকাসুমিচৌধুরী [৩৯]

নদীর পাড়টা যেন ক্ষণিকের জন্য একদম থমকে গেছে। চারপাশের ঝোড়ো বাতাস বইছে, প্রকৃতিও যেন থমকে দাঁড়িয়ে নদীর পাড়ের এই নাটকীয় দৃশ্যটা দেখছে ইশতিয়াকের গলার আওয়াজে রূপা নিজের চোখ থেকে কালো কাপড়টা টেনে খুলে ফেলল। সামনে তাকাতেই তার দুটো চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম! সামনে ইশতিয়াক হাঁটু গেড়ে বসে তার দিকে একটা লাল গোলাপ বাড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার থেকেও রূপা বেশি অবাক হচ্ছে ইশতিয়াকের মুখে এসব কথা শুনে। ইশতিয়াক তাকে ভালোবাসে মানে? এসব কী পাগলামি! রূপা চরম ধাক্কা খেয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সীমার দিকে তাকাল। সীমা অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রূপা পুনরায় ইশতিয়াকের দিকে তাকাল। এমন এক পরিস্থিতিতে কী বলবে, সে যেন ভেবেই পাচ্ছে না; তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।ইশতিয়াক আবারও আকুল হয়ে বলল,

—-” কী হলো রূপা? আমার ভালোবাসা কি অ্যাকসেপ্ট করবে না? বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি!”

রূপা এই মুহূর্তে কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না, তার মাথা কাজ করা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। তবুও নিজের মেজাজ সামলে মুখ খুলে কড়া কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই নদীর পাড়ের থমথমে আবহাওয়াকে এক লহমায় চূর্ণ করে দিয়ে একটা ধারালো, পুরুষালি শিস বাজানোর সুর সবার কানে আছড়ে পড়ল।শিসের সুর শুনে সবাই একযোগে চরম অবাক হয়ে পেছনে ফিরে তাকাল। রূপাও চট করে ঘাড় ঘোরাল। আর পেছনে তাকাতেই যা দেখল, তাতে মুহূর্তের মধ্যে তার আত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম হলো!
বাঁধন নিজের দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে একদম সটান হয়ে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে ফুরফুরে মেজাজে শিস বাজাচ্ছে। তার পেছনে অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইন বিস্ময়ে হা করে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।

হুট করে এখানে বাঁধনকে এই রূপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রূপার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। সে ভয়ে বার বার শুকনো ঢোক গিলতে লাগল। ওদিকে অপরাধবোধে সীমার শরীরও থরথর করে কাঁপছে। ইশতিয়াক বিরক্ত হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।বাঁধন ধীর পায়ে, মেপে মেপে কদম ফেলে ওদের দিকে এগিয়ে আসলো। সে একদম রূপার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তারপর উপস্থিত সবাইকে চরম অবাক করে দিয়ে, বাঁধন খুব আয়েশ করে ইশতিয়াকের কাঁধে নিজের একটা হাত ভর দিয়ে দাঁড়াল। তারপর ইশতিয়াকের দিকে তাকিয়ে বেশ শান্ত গলায় বলল,

—-” কী ভাই, প্রপোজ করছিলি? তা এইভাবে কেউ প্রপোজ করে? একটু তো রোমান্টিক হবি! এর থেকে তো একটা প্রতিবন্ধীও হাজার গুণ ভালো প্রপোজ করতে পারে!”

ইশতিয়াক বাঁধনকে চেনে না। সে ঘন ভ্রু কুঁচকে বেশ গম্ভীর ও রাগী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

—-” আপনি কে ভাই? আর মাঝখান থেকে এসব ফাজিলমি করছেন কেন?”

বাঁধন ঠোঁটের কোণে হাসি বজায় রেখে বলল,

—-” আমি কে, সেটা না জানলেও তোর খুব একটা অসুবিধা হবে না ভাই। তার আগে বল, প্রপোজ কি কেউ এভাবে শুকনো মুখে করে?”

ইশতিয়াক মেজাজ সামলে বলল,

—-” তো কীভাবে করে?”

বাঁধন এবার এক অদ্ভুত, বাঁকা হাসি দিল,

—-” দাঁড়া, আমি দেখাচ্ছি।”

কথাটা বলেই বাঁধন রূপার সামনে ভেজা বালুর ওপর ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল! বাঁধনের এই কাণ্ড দেখে ওমর, জেইন, অ্যান্সিরা তো বটেই, রূপাও চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল বাঁধন আসলে কী করতে চাইছে!বাঁধন রূপার ভয় পাওয়া, থরথর করে কাঁপতে থাকা ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসল। তারপর দুই হাত দুই দিকে মেলিয়ে দিয়ে, রূপার মায়াবী চোখের গভীরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

—-” রূপা, তোমাকে আমি যেদিন প্রথম দেখেছি, সেদিন থেকেই আমার এই বুকের বাঁ পাশটা হঠাৎ চিনচিন করে উঠেছিল। সেদিন থেকে আমি সেই চিনচিনের আসল ব্যথাটা বুঝতে পেরেছি। এটা আসলে অন্য কিছু নয়, তোমাকে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলার মিষ্টি একটা ব্যথা! বিশ্বাস করো রূপা, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি! আমি তোমাকে না পেলে সত্যিই মরে যাবো আই লাভ ইউ রূপা!”

একটু থেমে, নদীর পাড়ের হাওয়ায় নিজের কণ্ঠস্বর মিলিয়ে দিয়ে পুরো চিৎকার করে বলে উঠল বাঁধন,

—-” আই লাভ ইউ সো মাচ রূপা!”

বাঁধনের মুখ থেকে বের হওয়া এই তিনটা শব্দ যেন এক তীব্র বুলেটের মতো গিয়ে রূপার হৃদপিণ্ড ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেল!রূপার মনে হলো এক মুহূর্তে বাঁধন যেন সত্যিই তাকে হৃদয় উজার করে প্রপোজ করল! তার বুকের ভেতর হার্টবিট ড্রামের মতো অনবরত পিটাতে শুরু করল।বাঁধন রূপার দিকে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী চোখে তাকিয়ে বলল,

—-” তো মিস রূপা, তুমি কি আমার ভালোবাসা অ্যাকসেপ্ট করবে?”

উপস্থিত সবার উৎসুক দৃষ্টি গিয়ে পড়ল একা রূপার ওপর। রূপার মনের ভেতর তখন ঠিক কী ঘটে গেল, সে নিজেও জানতে পারল না। এক অজানা আকর্ষণে আর ভেতরের তীব্র অনুভূতির টানে সে কোনো কিছু না ভেবে কাঁপা কাঁপা নিজের নরম হাতটা বাঁধনের দিকে বাড়িয়ে দিল।ইশতিয়াকের সারা শরীর রাগে-অপমানে রি-রি করে জ্বলে উঠল। বাঁধন বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে রূপার হাতের পিঠে গভীর এক চুমু খেল।এবার ইশতিয়াক আর কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ক্ষিপ্ত বাঘের মতো এগিয়ে এসে সজোরে বাঁধনের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল,

—-” খানকির পোলা, কে তুই? তোর এত বড় সাহস কী করে হয় ওর হাত ধরার, ওর হাতে চুমু খাওয়ার?”

ইশতিয়াক শার্টের কলার চেপে ধরলেও বাঁধনের মুখের হাসি এক ফোঁটাও কমল না। সে অত্যন্ত শান্ত ও ঠান্ডা গলায় বলল,

—-” রিল্যাক্স ব্রো! আগে কলার থেকে হাতটা সরা। চল, কোথাও শান্ত হয়ে বসি, তারপর না হয় কথা বলি?”

ইশতিয়াক চোখ দুটো বড় বড় করে বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—-” আমি তোর কোন কালের বন্ধু লাগি যে তোর সাথে বসে কথা বলব।”

বাঁধন হাত দুটো ওপরে তুলে বেশ নরম সুরে বলল,

—-” মাথাটা একটু ঠান্ডা কর ভাই। এভাবে হুটহাট উত্তেজিত হওয়া স্বাস্থ্যের জন্য একদম ভালো না।”

ইশতিয়াক দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

—-” এখন তোর মতো একটা ছেলের কাছ থেকে আমাকে এসব জ্ঞান শিখতে হবে? সে কথা ছাড়, তার আগে বল তুই আমার রূপার হাত ধরলি কোন সাহসে?”

বাঁধনের চোখের ভেতরের শান্ত ভাবটা মুহূর্তে উধাও হয়ে এক হিংস্র রূপ নিল। ঠোঁটের বাঁকা হাসিটা আরও গাঢ় হলো। সে ধীরস্থির কণ্ঠে, অত্যন্ত ধারালো গলায় প্রশ্ন করল,

—-” আমাকে সাহসের হিসাব দেখাচ্ছিস তুই?”

ইশতিয়াক আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে রক্তচক্ষু নিয়ে চিৎকার করে বলল,

—-” হ্যাঁ, তোকে সাহসের হিসাবই দেখাচ্ছি! তুই কোন সাহসে আমার রূপার হাত ধরলি? উত্তর দে!”

“আমার রূপা, আমার রূপা”একই কথা বারবার শুনতে শুনতে বাঁধনের ধৈর্যের বাঁধ এবার একেবারে ভেঙে চুরমার হতে শুরু করল। সে এক ঝটকায় নিজের শার্টের কলার থেকে ইশতিয়াকের হাতটা ছাড়িয়ে দূরে ঠেলে দিল। তারপর গভীর একটা শ্বাস নিয়ে নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে শান্ত কন্ঠে বলল,

—” দেখ ভাই, আমি এখানে কোনো ঝামেলা বাড়াতে চাই না। সোজা কথা বলছি, মাথাটা ঠান্ডা কর তারপর আমরা শান্তভাবে বসে কথা বলি।”

ইশতিয়াক যেন একদমই নিজের হুশ-জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে অন্ধের মতো হিংস্র হয়ে আবারও বাঁধনের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠল,

—-” তুই কোন মালের কে রে যে তোর সাথে বসে আমাকে কথা বলতে হবে?”

বাঁধন এবার আর নিজের ভেতরের জমে থাকা প্রচণ্ড রাগটাকে কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারল না। সে এক ঝটকায় নিজের শার্টের কলার থেকে ইশতিয়াকের হাতটা সরিয়ে দিয়ে পর মুহূর্তেই তার বুকে সজোরে একটা ধাক্কা দিল। ইশতিয়াক সেই ধাক্কার প্রকাণ্ড বেগ সামলাতে না পেরে ধপাস করে পেছনের বালির ওপর আছড়ে পড়ে গেল।
সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাঁধন বাঘের মতো তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। এক হাতে ইশতিয়াকের গাল দুটো একদম চ্যাপ্টা করে শক্ত শক্ত আঙুলে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—-” আমি তোর আব্বা লাগি! এতক্ষণ তোকে ভালোমানুষের মতো বুঝিয়ে শান্ত মাথায় কথা বলছিলাম, তোর গায় সইছিল না, তাই না?”

নিজের শক্ত গাল থেকে বাঁধনের জোরালো হাতটা অনবরত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে ইশতিয়াক ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে বলল,

—-” তোর এত বড় সাহস তুই আমার গায়ে হাত দিস? গাল ছাড় বলছি,”

বাঁধন ইশতিয়াকের গালটা আরও বেশি শক্ত করে চেপে ধরে হিংস্র মুখে বলল,

—-” ছাড়বো না! কী করবি তুই”

ইশতিয়াক চোখ দুটো রক্তবর্ণ করে ধমকের সুর তুলে বলল,

—-” তুই জানিস না আমি কে? আর আমি কী কী করতে পারি তোর?”

বাঁধন এক মুহূর্তের জন্য ইশতিয়াকের চোখের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি দিল, তারপর থুথু ফেলার ভঙ্গিতে পরম তাচ্ছিল্যে জবাব দিল,

—-” আমার বা’ল ছিঁড়ে উল্টে দিবি তুই,”

ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো নদীর পাড়ে যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল। উপস্থিত কারো মাথায় ঢুকছে না এই মুহূর্তে তাদের ঠিক কী করা উচিত। ওদিকে ভয়ে রূপার সারা শরীর যেন এক নিমেষে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল। সে বেশ কষ্ট করে নিজের কাঁপতে থাকা শরীরটা টেনে কয়েক পা এগিয়ে আসলো। তারপর ভীষণ কাঁপা কাঁপা গলায় বাঁধনের উদ্দেশ্যে বলল,

—-” ভা… ভাইয়া… ওকে… ওকে ছেড়ে দিন, প্লিজ!”

কথাটা শুনে বাঁধন নিচু হয়ে থাকা মুখটা তুলে রূপার দিকে তাকাল।গলায় কোনো রাগের লেশমাত্র নেই, একদম স্বাভাবিক শান্ত কণ্ঠে বলল,

—-” ছেড়ে দেবো, তবে একটা শর্তে!”

রূপা ব্যাকুল হয়ে বলল,

—-” কী… কী শর্ত?”

বাঁধন রূপার ভয় পাওয়া মুখের দিকে চেয়ে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি দিল। তারপর ইশতিয়াকের গালটা আরেকটু চেপে ধরে গম্ভীর মুখে শর্ত দিল,

—-” এই মুহূর্তে আমার গালে একটা চুমু খাবি! তারপর চুমু খেয়ে মিষ্টি করে বলবি, ‘প্রিয় জামাইজান, ওকে ছেড়ে দিন’। যদি তুই এটা বলতে পারিস, তবেই এই ব্যাটাকে আমি এখন রেহাই দেবো। নাহলে পুরো সারাদিন এই বা’লটাকে এভাবেই বালিতে চেপে ধরে রাখবো!”

বাঁধনের মুখে ‘জামাইজান’ শব্দটা শুনতেই বালিতে পড়ে থাকা ইশতিয়াক ব্যথায় আর ক্ষোভে চিৎকার করে উঠল,

—-” ও কেন তোকে জামাই ডাকবে? তুই ওর কে রে?”

বাঁধন ইশতিয়াকের দিকে নিজের রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল। মুখে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল,

—-” জামাইকে ‘জামাই’ ডাকবে না তো কি ডাকবে?শাউ’য়্যা ডাকবে?”

ইশতিয়াক চরম বিস্ময়ে চোখ দুটি বড় বড় করে ধমকের সুরে বলে উঠল,

—-” জামাই মানে? কিসের জামাই, অ্যাঁ?”

বাঁধন নিচে ঝুঁকেই মুখ ফিরিয়ে আবার রূপার পানে তাকাল। রূপার দিকে হাত দিয়ে ইশতিয়াককে দেখিয়ে বেশ আয়েশি গলায় বলল,

—-” রূপা, এই বালটাকে একটু বুঝিয়ে বল তো জামাই আবার কিসের হয়? ভাইবোনদের সম্পর্কের মধ্যে জামাই আসে, না বিবাহিত সম্পর্কের মধ্যে আসে?”

রূপা তখন লজ্জায় আর সংকোচে মাথা একদম নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই লোকটা যে কি লেভেলের নির্লজ্জ, সেটার প্রমাণ সে আজ আরও একবার একদম হাতেনাতে পেয়ে গেল! এত মানুষের সামনে, বন্ধুদের সামনে এমন একটা শর্ত কেউ দিতে পারে?ইশতিয়াক ব্যথায় মুখ কুঁকড়ে রূপার দিকে আকুল দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর বিশ্বাস না হওয়া গলায় জিজ্ঞেস করল,

—-” রূপা! এই ছেলেটা কে হয় তোমার? তুমি কি ওকে চেনো?”

রূপা ধীরেসুস্থে মাথাটা একটু তুলল। তবে সে ইশতিয়াকের দিকে সরাসরি না তাকিয়ে, মাথা নিচু রেখেই খুব আস্তে কিন্তু স্পষ্ট করে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল,

—-” উ..উ….উনি আমার হাসবেন্ড।”

ইশতিয়াকের মাথায় যেন কেউ একটা আস্ত পাহাড় দিয়ে সজোরে বাড়ি মারল! তার চোখ দুটো অবিশ্বাসে একদম বড় বড় হয়ে গেল। তার মনে হচ্ছে সে হয়তো নিজের কানে ভুল শুনছে, এটা কোনোভাবেই সত্য হতে পারে না। সে চরম ব্যাকুলতায় আর থরথর করে কাঁপতে থাকা গলায় অস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করল,

—- ” তু… তোমার বিয়ে হয়ে গেছে?”

রূপা আলতো করে নিচু গলায় স্বীকার করে বলল,

—- ” হুম।”

কথাটা শোনামাত্রই নিমিষে পুরো মুখটা থমথমে কালো হয়ে এলো ইশতিয়াকের। সে ঘাড় বাকিয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সীমার দিকে এক বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকাল। সীমা তখন অপরাধীর তীব্র বোঝার ভারে মাথা নিচু করে নীরবে কেঁদে চলেছে।রূপা এবার বাঁধনের দিকে তাকিয়ে আকুল কণ্ঠে বলল,

—- ” প্লিজ, ওকে এবার ছেড়ে দিন?”

বাঁধন নিজের আগের মতো জেদি ভঙ্গিতেই ইশতিয়াককে ধরে রেখে শান্ত গলায় বলল,

—- ” আমার দেওয়া শর্ত পূরণ করলে আমি তবেই ওকে ছাড়বো, তার আগে এক চুলও নড়ছি না।”

রূপা মেজাজ সামলাতে না পেরে রাগে আর লজ্জায় বলে উঠল,

—- ” আপনি কি সাইকো?”

বাঁধন এক গালে একটু বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,

—- ” তুই যা ভাবিস আমাকে, আমি তাই! এখন আর অযথা ফালতু কথা না বাড়িয়ে শর্ত পূরণ কর। আর যদি না পারিস, তবে চুপচাপ এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে সিনেমা দেখে চল!”

রূপা সত্যি কোনো কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না যে এখন সে কী করবে! এভাবে সবার সামনে একটা ছেলেকে বালুর ওপর চেপে ধরে রেখে দাঁড়িয়ে থাকা কি কোনো মানুষের কাজ? এতক্ষণ ধরে এমন উদ্ভট কাণ্ড দেখা কতক্ষণ সম্ভব!সে খুব ভালো করেই বুঝে গেল এই লোকটা চরম ঘাড়ত্যাড়া! তার দেওয়া এই উদ্ভট শর্ত পূরণ না করলে সে আজ কিছুতেই ইশতিয়াককে ছাড়বে না।এক মুহূর্তে রূপা একটা গভীর শ্বাস নিয়ে চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে নিল। বুকের ভেতরটা ধুকধুক করে প্রচণ্ড গতিতে হাতুড়ি পিটছে। অনীহা আর প্রবল লজ্জাকে তোয়াক্কা না করে সে আস্তে আস্তে বাঁধনের দিকে ঝুঁকে নিচু হলো। তারপর টুস করে বাঁধনের গালে একটা মিষ্টি চুমু দিয়ে চোখ দুটো বুজেই এক নিঃশ্বাসে বলে উঠল,

—-” প্রিয় জামাইজান, ওকে ছেড়ে দিন!”

রূপার মুখ থেকে এই কথাটি বের হওয়ার পর মুহূর্তে বাঁধন এক ঝটকায় ইশতিয়াকের গাল ছেড়ে দিল। তারপর উঠে দাঁড়ানোর আগে ইশতিয়াকের থুতনিতে হালকা থাপড়ানি দিয়ে আলতো হেসে বলল,

—-” বাড়ি যা ভাই, নিজের জীবনের সুন্দর সময়গুলো এসবের পিছে ফালতু নষ্ট করিস না।”

কথাটা বলেই বাঁধন ইশতিয়াকের ওপর থেকে উঠে পড়ল। সে এক সেকেন্ডও দেরি না করে সোজা রূপার হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে তাকে নিয়ে হাঁটা দিল। ওদের পিছন পিছন বৃষ্টি, অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইনও চুপচাপ গটগট করে কেটে পড়ল।খানিক আগের উত্তাল নদীর পাড়টা যেন এতক্ষণে একদম নিঝুম ও শান্ত হয়ে এলো।

ইশতিয়াক বালি থেকে আস্তে করে উঠে দাঁড়াল। সে নিজের জামাকাপড় থেকে বালির ময়লাটুকুও ঝাড়ার প্রয়োজন মনে করল না। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকা সীমার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ইশতিয়াকের এই ঠান্ডা উপস্থিতিতে সীমার সারা শরীর ভয়ে আরও থরথর করে কাঁপতে লাগল।ইশতিয়াক সীমার দিকে বিষাক্ত চোখে তাকাল, তারপর এক অদ্ভুত, হিমশীতল ও ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করল,

—-” রূপার যে বিয়ে হয়ে গেছে, এই সত্যিটা কি তুমি জানতে?”

সীমা কোনো উত্তর দিতে পারল না, সে শুধু মাথা নিচু করে নীরবে অঝোরে কাঁদতে থাকল। ইশতিয়াক নিজের ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিয়ে এবার চরম ধমক দিয়ে বলে উঠল,

—-” কিছু জিজ্ঞেস করেছি তোমাকে?, উত্তর দিচ্ছ না কেন?”

সীমা এবার শিউরে উঠে চরম ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল,

—-” হ্যাঁ… জানতাম।”

কথাটা শোনামাত্রই নিমিষে নিজের সমস্ত রাগ এক জায়গায় করে সজোরে সীমার গালে একটা কষে থাপ্পড় বসাল ইশতিয়াক! থাপ্পড়ের প্রচণ্ড চোটে সীমা ভারসাম্য হারিয়ে বালিটার ওপর কিছুটা ঢলে পড়ল। ইশতিয়াক গলার রগ ফুলিয়ে চিৎকার করে উঠল,

—-” তুমি আমাকে এই সত্যিটা আগে কেন বলোনি? সবকিছু জেনে শুনেও আজ ওকে এভাবে আমার সামনে নিয়ে আসলে কোন সাহসে? তোমার একটুও লজ্জা করল না?”

সীমা নিজের গালে হাত দিয়ে ব্যথায় লাল হয়ে যাওয়া চোখে ইশতিয়াকের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধকণ্ঠে বলল,

—-” কারণ আমি চেয়েছিলাম আপনি রূপার মুখেই আসল সত্যিটা শুনুন! আমি যদি নিজে আপনাকে এসে বলতাম, আপনি হয়তো আমাকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করতেন না! ভাবতেন আমি রূপাকে নিয়ে আপনার কাছে মিথ্যা বানিয়ে বলছি! তাই আমি চেয়েছিলাম এই তেতো সত্যিটা আপনি একমাত্র রূপার মুখ থেকেই শুনুন।”

ইশতিয়াক এক চরম যন্ত্রণায় নিজের দুই হাত দিয়ে মাথার চুল শক্ত করে খামচে ধরল। তার চারপাশের দুনিয়াটা যেন মুহূর্তে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, বুকের ভেতর প্রকাণ্ড এক রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। কোনো কিছুই যেন আর তার ভালো লাগছে না। সে রক্তচক্ষু নিয়ে সীমার দিকে তাকিয়ে হিংস্র কণ্ঠে বলল,

—-” দূর হ আমার চোখের সামনে থেকে! তোর এই বিষাক্ত মুখ যেন আমি জীবনে আর দ্বিতীয়বার না দেখি!”

সীমা হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ইশতিয়াকের দুটো পা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,

—-” বিশ্বাস করুন ইশতিয়াক! আমি আপনাকে এভাবে এত বড় কষ্ট দিতে চাইনি! আমি শুধু চেয়েছিলাম আপনি রূপার মুখে সত্যিটা শুনুন কিন্তু এখানে যে হুট করে ওর স্বামী চলে আসবে, তা আমি ঘুমেও ভাবতে পারিনি!”

‘রূপার স্বামী’ এই শব্দ দুটো যেন ইশতিয়াকের বুকের কাঁচা জখমে আরও তীক্ষ্ণ এক বল্লমের মতো এসে বিঁধল! সে এক ঝটকায় সীমার হাত থেকে নিজের পা ছাড়িয়ে নিল। তারপর বালুর ওপর একটু নিচু হয়ে সীমার দুটো গাল রূঢ়ভাবে চেপে ধরে বলল,

—-” এসব কিছু তুই ইচ্ছে করে করেছিস, আমি খুব ভালো করেই জানি! আমাকে সবার সামনে এমন কুকুরের মতো অপমান করাটাই তোর আসল খেলা ছিল, তাই না? এখন তো খুব খুশি হয়েছিস? শোন তুই যদি আমার ভালো চাস তাহলে তোর এই ছাইপাশ মুখ নিয়ে কখনো আর ভুলেও আমার সামনে আসবি না!”

বলেই ইশতিয়াক সজোরে সীমার গাল থেকে হাত সরিয়ে দিয়ে বড় বড় কদম ফেলে সেখান থেকে হনহন করে চলে গেল।বালুর ওপর ধপ করে পড়ে রইল একা, নিঃসঙ্গ সীমা। সে নিজের দু হাতে বাঁধের বালি খামচে ধরে আকাশের পানে মুখ তুলে চরম আর্তনাদ করে কেঁদে উঠল,

—-” হে আল্লাহ! আমি আর এত অবহেলা সহ্য করতে পারছি না আমি ভেতর থেকে একদম তছনছ হয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছি! তুলে নাও তুমি আমাকে এবার অন্তত একটু শান্তি দাও আমাকে! যাদের কপালে সামান্য ভালোবাসা লেখো না, তাদের মনে কেন তুমি এমন ভালোবাসার কুঁড়ি সৃষ্টি করে দাও? যে জিনিস ছুঁয়ে দেখার অধিকারটুকু পর্যন্ত দাও না, সেই জিনিসটার ওপর কেন তুমি মনকে ছোঁয়ার লোভ বাড়িয়ে দাও কেন? কেন করলে এমন আমার সাথে?”


এদিকে বাঁধন, রূপা, অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইন তারা ছয়জনে ফ্ল্যাটে ফিরে আসলো। বৃষ্টি কলেজ মোড় থেকেই নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে গেছে।ড্রয়িংরুমে ঢুকেই সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসল বাঁধন। তাকে দেখে অ্যান্সিও পাশের সোফায় শরীরটা ঢেলে দিল। সারাদিনের ধকল আর এত নাটকের পর সবাই বেশ ক্লান্ত হয়ে সোফায় গা এলিয়ে বসে রইল। শুধু রূপা চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার সারা শরীর তখনও ভয়ের তীব্র আমেজে থরথর করে কেঁপে চলেছে।বাঁধন শার্টের বোতামে হাত দিল। পর পর চারটা বোতাম খুলে উন্মুক্ত করে দিল তার ঘামে ভেজা চওড়া বুকটা। ঘন ঘন লম্বা শ্বাস ফেলতে লাগল। তাকে দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এতক্ষণ ধরে কতখানি প্রচণ্ড রাগ সে নিজের মনের ভেতর চেপে রেখেছিল! বেশ কিছুক্ষণ পর নিক্সি গ্লাসে করে ঠান্ডা পানি এনে দিল। বাঁধন এক নিঃশ্বাসে তা খেয়ে নিল।মাথাটা যথাসম্ভব শান্ত ও স্বাভাবিক রেখে রূপার দিকে তাকাল। রূপা তখনও মাথা নিচু করে আসামির মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাঁধন একদম শান্ত কিন্তু থমথমে কণ্ঠে বলল,

—- ” রুমে যা।”

কথাটা শোনামাত্রই রূপা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না; কাঁপা কাঁপা পায়ে প্রায় দৌড়ানোর মতো করে নিজের রুমে চলে গেল।রূপা চলে যেতেই অ্যান্সি এসে বাঁধনের একদম পাশে বসল। তার কাঁধে শান্ত করার ভঙ্গিতে হাত রেখে বলল,

—- ” মাথা ঠান্ডা কর দোস্ত! মেয়েটা তোকে দেখে মারাত্মক ভয় পাচ্ছে কিন্তু।”

অ্যান্সির কথার কোনো উত্তর দিল না বাঁধন। সে চুপচাপ নিজের কপালটা শক্ত করে চেপে ধরে সোফায় মাথা হেলিয়ে চোখ দুটি বন্ধ করে রইল।সারাদিনে রূপা আর নিজের রুম থেকে বের হওয়ার সাহস পেল না। বাঁধনের ভয়ে সারাক্ষণ পড়ার টেবিলে বই খুলে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করল।
অবশেষে রাতের খাবারের সময় হলে বাঁধন স্টাডি রুমের দরজায় এসে দাঁড়াল। বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

—- ” রূপ, খেতে আয়।”

কথাটা বলেই বাঁধন আর অপেক্ষা না করে সোজা ডাইনিংয়ের দিকে চলে গেল। রূপা চরম অবাক হলো বাঁধনের এমন অচেনা আচরণ দেখে! আজ সারাদিন বাঁধন একবারের জন্যও তার ঘরে আসেনি। অথচ অন্যদিন সে বাড়িতে থাকলে কোনো না কোনো বাহানায় রূপাকে সারাক্ষণ জ্বালিয়ে মারত। আর আজ এত বড় একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও বাঁধন অদ্ভুত রকম শান্ত! রূপাকে একটা কড়া কথাও বলল না, ধমকও দিল না। বাঁধনের এই থমথমে ও রহস্যময় আচরণের আসল মানে সে কোনোভাবেই বুঝে উঠতে পারছে না। বাঁধন কি তার ওপর মারাত্মক রেগে আছে, নাকি ভেতরের ঝড়টাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে? মনের ভেতর অজস্র প্রশ্ন অনবরত ঘোরাপাক খেতে লাগল তার।ঠিক তখনই আবার ড্রয়িং রুম থেকে বাঁধনের গমগমে কড়া গলা ভেসে এলো,

—- ” তুই কি নিজে আসবি, নাকি আমি গিয়ে তোকে ধরে নিয়ে আসবো?”

বাঁধনের চড়া কণ্ঠ শোনামাত্রই রূপা আর দেরি করল না। সে তাড়াতাড়ি বইগুলো বন্ধ করে টেবিল ছেড়ে দ্রুত ড্রয়িং রুমে চলে আসলো।এসে দেখে, ডাইনিং টেবিলে বসে বাঁধন ক্যান্ডির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। একটু দূরে ওমর আর জেইন চুপচাপ সোফায় বসে ফোন স্ক্রোল করছে, আর অ্যান্সি ও নিক্সি ডাইনিংয়ের চেয়ারে বসে বাঁধনের সাথে হালকা গলায় নিচু স্বরে কথা বলছে।রূপা কোনো কথা না বাড়িয়ে একদম চুপচাপ এসে ডাইনিং টেবিলে এক কোণে গিয়ে বসল। এরপর ঘরের সবাই মিলে নীরব পরিবেশে রাতের খাবারটা শেষ করে নিল।খাওয়া শেষে জেইন সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে উৎসাহী গলায় বলল,

—-” দোস্ত, চল না ছাদে যাই? অনেকদিন হলো মাঝরাতে সবাই মিলে ছাদে বসে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া হয় না!”

নিক্সি সাথে সাথে জেইনের কথায় সায় দিয়ে বলে উঠল,

—-” একদম ঠিক বলেছিস! চল না দোস্ত, আজকে সবাই মিলে ছাদেই একটু আড্ডা দিই?”

বন্ধুদের এত আবদার বাঁধন আর ফেরাতে পারল না। সে হালকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, তারপর রূপার দিকে তাকিয়ে বেশ কড়া গলায় বলল,

—-” তুই গিয়ে পড়তে বস।”

কথাটা শুনেই অ্যান্সি চট করে বলে উঠল,

—-” কেন রে? ও একটু আমাদের সাথে চলুক না, সবাই মিলে একটু গল্প করবো?”

বাঁধন শান্ত কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,

—-” গল্প প্রচুর করা যাবে, বাট এখন না। ওর কালকে আবার পরীক্ষা আছে, সো পড়তে যাওয়াই বেটার।”

রূপা মনে মনে বেশ রাগ আর অভিমান করলেও মুখে কিছু বলল না। হালকা গাল ফুলিয়ে চুপচাপ নিজের স্টাডি রুমে চলে আসলো। ওদিকে বাঁধন সবাইকে নিয়ে ছাদের উদ্দেশ্যে ওপরে উঠে গেল।

রুমে এসে রূপা চেষ্টা করল সারাদিনের এতসব নাটক আর উৎকণ্ঠা ভুলে বইয়ের পাতায় ডুব দিতে। পড়ার ভেতরে নিজেকে পুরো ব্যস্ত রেখে অবশেষে রাত প্রায় দুটোর দিকে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ল। পড়ার টেবিলে একটানা বসে থেকে শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।একটু তাজা বাতাস খাওয়ার জন্য আর ক্লান্তি মেটাতে রূপা পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে ভাবল একবার ছাদে গিয়ে ঘুরে আসলে কেমন হয়? বাঁধনরা হয়তো এখনও সবাই মিলে ছাদে আড্ডা দিচ্ছে!ধীর পায়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।ছাদে পা রাখতেই রূপার পা জোড়া এক অদ্ভুত জাদুতে থমকে গেল দারুণ এক গিটারের সুরে!সে চোখের দৃষ্টি সামনে মেলতেই দেখতে পেল বাঁধন ছাদের বিপজ্জনক উঁচুতে, একেবারে রেলিংয়ের ওপর শূন্যে পা ঝুলিয়ে বসে চোখ দুটো বন্ধ করে পরম মগ্নতায় গিটার বাজাচ্ছে। তার ঠিক পাশেই রেলিং জুড়ে অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইন আরাম করে বসে আছে। ওপর থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ভয় বা শঙ্কাই যেন ওদের মধ্যে নেই; দৃশ্যটা দেখে মনে হচ্ছে গভীর রাতে এভাবে উঁচুতে বসাটা ওদের বহুদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।রূপা সম্মোহিতের মতো ধীর পায়ে ওদের দিকে এগোতে শুরু করল। কিন্তু মাত্র কয়েক পা এগোতেই এক গভীর, ধারালো আর পুরুষালি কণ্ঠের সুরে রূপার পা আবার মাঝপথেই যেন মাটির সাথে জমে গেল!

বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত ভালোবাসার তোলপাড় আর কাঁপনে কেঁপে উঠল তার। সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে নড়ার ন্যূনতম শক্তিটুকুও যেন সে হারিয়ে ফেলল। বাঁধন চোখ দুটো বন্ধ রেখেই, আঙুলের নিখুঁত ছোঁয়ায় গিটারের তারে সুর তুলে গম্ভীর ও আবেগঘন কণ্ঠে গেয়ে উঠল,

Dard Dilon Ke Kam Ho Jaate
Main Aur Tum Gar Hum Ho Jaate
Main Aur Tum Gar Hum Ho Jaate

নৈশব্দ্যে ঘেরা মাঝরাতের আকাশে বাঁধনের কণ্ঠটা যেন এক বিষাদময় সুরের ঝড় তুলে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল,

Kitne Haseen Aalam Ho Jaate
Main Aur Tum Gar Hum Ho Jaate
Main Aur Tum Gar Hum Ho Jaate

Door Wo Saare Bharam Ho Jaate
Main Aur Tum Gar Hum Ho Jaate

গানের প্রতিটা শব্দ, আর বাঁধনের এই গায়কী যেন এক অদেখা তীরের মতো সোজা গিয়ে বিধতে লাগল রূপার একদম হৃদয়পটে! রূপা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল চাঁদনি রাতে রেলিংয়ে বসা ওই মানুষটার দিকে!ধীরে ধীরে বাঁধন পুরো গানটি গাওয়া শেষ করল। আর নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে পুরো গানটা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনল রূপা।গান শেষ হতেই হঠাৎ অ্যান্সির নজর গিয়ে পড়ল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রূপার ওপর। সে হাতছানি দিয়ে ডেকে বলল,

—-” আরে রূপা! ওইদিকে অত দূরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসে আমাদের সাথে বসো!”

অ্যান্সির কথায় বাঁধন ধীরেসুস্থে চোখ দুটো খুলল। বেশ ঘুম ঘুম চোখে সে রূপার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। মেয়েটা কেমন যেন অদ্ভুত একটা অস্বস্তি আর দ্বিধা নিয়ে মুখটা একটু কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। রূপা শান্ত ও ধীর পায়ে এগিয়ে এসে অ্যান্সির পাশে গিয়ে দাঁড়াল।রূপার দৃষ্টি রেলিংয়ের দিকে দেখে অ্যান্সি হেসে বলল,

—-” তুমি নিশ্চয়ই খুব অবাক হচ্ছো যে আমরা এমন ছাদের ঝুঁকিপূর্ণ রেলিংয়ের ওপর পা ঝুলিয়ে কীভাবে বসে আছি, তাই না? আসলে ব্যাপারটা আমাদের কাছে নতুন কিছু না, একদম গা সওয়া অভ্যাস হয়ে গেছে! বিদেশে থাকার সময় মাঝরাতে এভাবে ছাদের রেলিংয়ে বসেই আমরা সবাই মিলে আড্ডা দিতাম। আর বাঁধন সুযোগ পেলেই তার সুরের মায়েস্ত্রো রূপ দেখিয়ে গান শোনাত। আজও ছাদের হাওয়ায় মেজাজটা জমে উঠতেই ওর হাতে গিটারটা ধরিয়ে দিলাম!”

রূপা হালকা করে হাসল। পাশে বসে থাকা নিক্সিও অমায়িক একটা হাসি দিয়ে রূপাকে বলল,

—-” তুমি কিন্তু সত্যি ভীষণ ভাগ্যবতী যে বাঁধনের মতো একজনকে নিজের করে পেয়েছ! আমার বন্ধুটা যে কী পরিমাণ নিখুঁত আর সুন্দর গান গায়, তা তো শুনলেই! যখনই মন খারাপ হবে বা কোনো আবদার জাগবে, ও কে শুধু স্রেফ একটা গান গাইতে বলবে,দেখবে এমন কিছু সুর তোমার কানে ঢেলে দেবে , যে তুমি ওর প্রেমে বার বার পড়তে বাধ্য হবে!”

রেলিঙে বসে থাকা ওমর অমনি বাঁকা হেসে নিক্সির মাথায় হালকা একটা চাট্টি মেরে বলে উঠল,

—-” তাই নাকি রে নিক্সি? এত গুণের খতিয়ান দিচ্ছিস যে, তার মানে কি তুইও এর মধ্যে বাঁধনের প্রেমে-ট্রেমে হাবুডুবু খেয়ে বসে আছিস নাকি?”

নিক্সি চট করে চোখ দুটো গোল গোল করে চরম ভয়ানক দৃষ্টিতে ওমরের দিকে তাকাল।ওমর তাতে দমে যাওয়া দূরে থাক, নিজের সবকটা দাঁত বের করে একটা বিটকেল হাসি ফুটাল। তারপর বেশ ভয়ের অভিনয় করে বলে উঠল,

—-” ওরে বাবা রে! ওভাবে ডাইনিদের মতো লাল লাল চোখ গোল করে তাকাস না তো বোন, আমার তো এখনই ভয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে! এমনিতেই তুই দেখতে লেডি প্রেতাত্মার মতো, তার ওপর মাঝরাতে এমন চাউনি দিলে ছাদে আত্মা কেঁপে ওঠে!”

কথাটা শোনামাত্রই নিক্সি রাগে পুরো চিৎকার করে উঠল,

—-” ওরে ওমরের বাচ্চা ওমর! আমি লেডি প্রেতাত্মা? তোর এত বড় সাহস!”

ওমর এক মুহূর্তও দেরি না করে উঁচুতে পা ঝোলানো রেলিং থেকে সটান নিচে লাফিয়ে পড়ল। তারপর ছাদ থেকে নিচে নামার সিড়ির দিকে এক হাত তুলে দৌড়াতে দৌড়াতে চেঁচাতে লাগল,

—-” ও নো নো নো! জ্যান্ত পেত্নি এবার পুরোপুরি ক্ষিপ্ত হয়ে গেছে! বাঁচার একমাত্র উপায় হলো অলিম্পিক মার্কা দৌড় দেওয়া! পালা ওমর, নয়তো আজ তোকে কাঁচাই চিবিয়ে খাবে!”

নিক্সিও নিজের স্যান্ডেল হাতে খুলে নিয়ে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ওমরের পিছু পিছু নিচে দৌড় লাগাল,

—-” দাঁড়া তুই হারামজাদা! তোকে আজ চিড়িয়াখানার বানর না বানিয়ে ছাড়লে আমার নামও নিক্সি না!”

ওদের এই কাণ্ড দেখে অ্যান্সি আর জেইন হাহা করে হেসে উঠল, এমনকি রূপার ঠোঁটের কোণেও না হেসে আর উপায় রইল না।ওমরের দৌড় আর নিক্সির স্যান্ডেল হাতে পিছু নেওয়ার দৃশ্য দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল।অ্যান্সি রূপার সেই মিষ্টি হাসির দিকে তাকিয়ে সহাস্যে বলল,

—-” এই দুটো হলো একদম পিওর কার্টুন! দেখছো তো, সারাক্ষণ কোনো কারণ ছাড়াই শুধু সুযোগ খোঁজে ঝগড়া করার জন্য!”

ঠিক তখনই জেইনের পকেটের ফোনটা ঝনঝন করে বেজে উঠল। সে পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে নামটা দেখেই বাঁধনের কাঁধে হালকা একটা থাপড়ানি দিয়ে বলল,

—-” বাঁধন, আমার মম কল দিচ্ছে। আমি নিচে যাচ্ছি রে, তোরা তাহলে আয়।”

কথাটা বলেই জেইন সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।এবার অ্যান্সি চট করে একবার বাঁধনের থমথমে মুখের দিকে আর একবার রূপার দ্বিধাগ্রস্ত মুখের দিকে তাকাল। দুজনই একদম নীরব, যেন বাতাসে এক ভারী স্তব্ধতা ঝুলছে। অ্যান্সি বেশ পাকা মাথায় বুজে নিল এই মুহূর্তে এই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কিছুটা নিভৃত সময়, একটু ‘প্রাইভেসি’ দেওয়া মারাত্মক দরকার! সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে রেলিং থেকে নেমে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে একটা লম্বা হাই তুলল। তারপর নিজের চোখ দুটো কচলাতে কচলাতে বলল,

—-” উফ দোস্ত! আমার তো একদম চোখের পাতা ঢুলে আসছে, মারাত্মক ঘুম পাচ্ছে রে! তোরা দুজন কিছুক্ষণ থেকে নিচে আয়। আমি গেলাম ডিরেক্ট ঘুমাতে গুড নাইট দোস্ত, গুড নাইট রূপা!”

কথা শেষ করেই অ্যান্সি প্রায় হাওয়া হয়ে যাওয়ার মতো দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। এক নিমেষে রমরমা ছাদটা একদম ফাঁকা হয়ে এলো, আর পুরো জায়গা জুড়ে নেমে আসলো গভীর মাঝরাতের নীরবতা!ছাদে এখন শুধু দুজন। বাঁধন আর রূপা দুজনেই চুপচাপ। মাঝরাতের শুনশান বাতাসে শুধু ভেসে আসছে দুজনের ঘন ঘন ফেলার শ্বাসের শব্দ।বেশ কিছুক্ষণ এই ভারী নীরবতা বজায় থাকার পর, রূপা আস্তে করে মাথা নিচু করে অপরাধীর সুর তুলে বলল,

—-” বা… বাঁধন ভাইয়া, আপনি কি আমার ওপর খুব রেগে আছেন?”

বাঁধন এক মুহূর্ত নীরব থেকে খুব শান্ত কিন্তু থমথমে গলায় বলল,

—-” রেগে নেই , নিজেকে খুব কষ্টে নিয়ন্ত্রণে রেখেছি যেন রাগে কোনোভাবে তোকে আঘাত না দিয়ে ফেলি।”

রূপা এবার ভীষণ অবাক হয়ে মাথা তুলে তাকাল। তার সুবিন্যস্ত ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল,

—-” মানে?”

বাঁধন এবার চোখ দুটো রূপার চোখের ওপর রেখে ধারালো গলায় বলল,

—-” মানে তুই আমার কথার অবাধ্য হস! তোর বুকের কলিজাটা যে ঠিক কতখানি বড়, আমি শুধু সেটাই ভাবছি! তোকে ভালো করে মানা করার পরও তুই কীভাবে অন্য জায়গায় চলে যাস?”

কথাটা শোনামাত্রই রূপার মাথাটা মুহূর্তে অপরাধবোধে নিচু হয়ে এলো। সে ভয় পেয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,

—-” ওই… ওই আসলে সীমা বলছিল ওর মা নাকি খুব অসুস্থ, রাস্তাঘাট চিনে না,! আর আমি শুধু ওর বিপদের কথা ভেবেই…।”

কথার বাকিটুকু শেষ করার আগেই বাঁধন রেলিং থেকে লাফিয়ে নিচে নেমে আসলো। তারপর এক ঝটকায় রূপার হাত ধরে টেনে সোজা নিজের বুকের দিকে নিয়ে এলো! রূপা আচমকা আছড়ে পড়ল বাঁধনের শক্ত চওড়া বুকে।প্রতিবারের মতো আজও তীব্র এক আবেশে রূপার সারা শরীর কেঁপে উঠল। বাঁধন নিজের দুই শক্ত হাতে রূপার সরু কোমরটা পেঁচিয়ে ধরে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের দিকে টেনে নিয়ে এলো। বাঁধনের তৃষ্ণার্ত আঙুলের তপ্ত স্পর্শ কোমরের খালি চামড়ায় লাগতেই রূপা শিউরে উঠল! অজান্তেই তার দুটো চোখ শক্ত করে বন্ধ হয়ে এলো।তার বন্ধ হয়ে যাওয়া চোখের মায়াবী পাতার পানে চেয়ে, মুখে নিজের তপ্ত গরম নিঃশ্বাস ফেলে বাঁধন ধীরকণ্ঠে শুধাল,

—-” তোর এই ফালতু দয়ামায়াকে আমি কী করব বল তো? কোনো ডাকাত যদি ভালো মানুষ সেজে এসে বলে ‘আমি খুব বিপদে পড়েছি’, তখনও কি তোর ভেতরে এসব আবর্জনা মায়া কাজ করবে? তখনও কি তুই দুনিয়ার সবকিছু ভুলে তার সাথে সোজা হেঁটে চলে যাবি?”

রূপা মুখে কিছু বলতে পারল না। ভয়ে আর অনুভূতির দোলাচলে তার গোলাপি ঠোঁট জোড়া থরথর করে কাঁপতে শুরু করল।তার কাঁপতে থাকা মিষ্টি ঠোঁটের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে স্বগতভাষণের মতো বাঁধন ফিসফিস করে বলে উঠল,

—-” ঠোঁট দুটো এভাবে কাঁপাবি না, মারাত্মক নেশা লাগে আমার!”

রূপা চোখ বন্ধ রেখেই চরম অনুভূতি আর উদ্বেগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,

—-” আ… আপনি কাছে আসলেই তো কাঁপে! আমি কি ইচ্ছে করে কাঁপাই নাকি?”

বাঁধন নিজের ঠোঁট দুটো রূপার থরথর করে কাঁপা ঠোঁটের একদম কাছাকাছি নিয়ে আসলো। তার মুখের তপ্ত গরম নিঃশ্বাস রূপার মুখে আছড়ে পড়তেই নেশালো গলায় ফিসফিস করে আওড়াল,

—-” কারণ এগুলা তখন তার আসল মালিককে ডাকে! এরা খুব ভালো করেই জানে এসবের একমাত্র মালিক শুধু আমি তাই আমাকে সামনে দেখলেই তারা এভাবে থরথর করে কেঁপে আমাকে ডাকার বায়না ধরে ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য ।”

কথাটা শোনামাত্রই রূপা চট করে চোখ দুটি খুলে ফেলল। ঘন ঘন দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বিষম খেয়ে বলে উঠল,

—-” অদ্ভূত! আমার ঠোঁট, আমার ইচ্ছে তাহলে আপনি কীভাবে এগুলোর মালিক হন।”

রূপার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাঁধন আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করল না।রূপার নরম ওষ্ঠে নিজের ওষ্ঠাজোড়া সজোরে ডুবিয়ে দিল। গভীর এক আবেশে তৃষ্ণার্তের মতো তার মিষ্টি ঠোঁট দুটো চুষে নিয়ে কিছুক্ষণ পর আলতো করে ছেড়ে দিল।
পরস্পরের দ্রুত ফেলা নিঃশ্বাসের মাঝেই বাঁধন নিচু গলায় বলল।

—-” এবার দেখলি এগুলোর আসল মালিক আমি কীভাবে হই? শুধু এই ঠোঁট দুটিই না রূপ, তোর এই সম্পূর্ণ শরীরের একমাত্র মালিক আমি!”

বাঁধনের এমন অকপট আর বেপরোয়া স্বীকারোক্তিতে রূপার দুটো গাল লজ্জায় রক্তিম লাল হয়ে উঠল। তার সারা শরীর যেন নিমিষে অবশ হয়ে আসতে লাগল, হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এলো। তার ওষ্ঠজোড়া এবার আরও তীব্রভাবে তিরতির করে কাঁপতে লাগল।রূপার এই কাঁপতে থাকা করুণ অবস্থা দেখে বাঁধন ঠোঁট দুটো তার কানের একদম কাছে নিয়ে আসলো। তারপর বেসামাল গলায় বলল,

—-” রূপ,তোকে না আমার এই মুহূর্তে ভীষণভাবে রেপ করতে ইচ্ছে করছে!”

বাঁধনের মুখ থেকে ‘রেপ’ শব্দটা শোনামাত্রই ভয়ে আর আকস্মিক ধাক্কায় চট করে রূপার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল! এই পুরুষটা বলে কী? কোনো সুস্থ মানুষ কি নিজের বিবাহিত বউকে রেপ করার কথা বলতে পারে?চরম বিস্ময় আর ভীতি নিয়ে রূপা থতমত খেয়ে বলে উঠল,

—-” আর ইউ সাইকো? কেউ নিজের বউকে রেপ করতে চায়?”

বাঁধন একগাল বাঁকা হাসি হেসে বলল,

—-” দুনিয়ার কেউ না করলেও আমি করবো! ট্রাস্ট মি রূপ, তোকে যেদিন নিজের কবজায় একদম নিজের করে পাবো সেদিন আমি হবো খাঁটি বাঘ, আর তোকে বানাবো ফার্মের মুরগি! আর বাঘ যেভাবে ক্ষিধে পেলে মুরগিকে ছিঁড়েখুঁড়ে খায়, ঠিক ওইভাবে একদম চিবিয়ে খাবো তোকে!”

এমন কাঁচা ও বেপরোয়া কথায় লজ্জায় রূপার গাল-কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হতে লাগল! সে রাগে বাঁধনের শক্ত বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল,

—-” আপনার মতো এমন নির্লজ্জ আর অসভ্য পুরুষ আমি এই জন্মে আর একটাও দেখিনি! ছাড়ুন আমাকে মুরগি তো অনেক দূরের কথা, আপনি মুরগির একটা পাখাও পাবেন না!”

রূপার ছটফটানি দেখে মুচকি হেসে তার কোমরটা আরও কিছুটা শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল বাঁধন। তারপর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,

—-” ওকে ডার্লিং সময় হলেই একদম হাতেনাতে দেখা যাবে!”

রূপা ছটফট করে বলে উঠল,

—-” ছাড়ুন আমাকে!”

বাঁধন এক চুলও নড়ল না, বাঁকা হেসে বলল,

—-” ছাড়বো না।”

রূপা মেজাজ সামলাতে না পেরে বলল,

—-” ছাড়বেন না তো কী করবেন?”

বাঁধন লাগামহীন গলায় বলল,

—-” আদর করবো।”

রূপা এবার চূড়ান্ত রেগে গিয়ে বলে উঠল,

—-” বেহায়া পুরুষ একটা! এত কিছুর পরও এখনো এসবই মুখে আসছে?”

বাঁধন হালকা হেসে জবাব দিল,

—-” তুই সামনে আসলেই অসভ্য হয়ে যাই! আর অসভ্য অসভ্য বলে চেঁচাবি না মাফিয়ার বাচ্চা, এখনো তো কিছুই করি নাই! অসভ্য সেদিনই বলবি, যেদিন তোর পেটে আমার বাচ্চা আসবে৷ কারণ সেদিন তুই না, পুরো শহর জেনে যাবে আমি তোর সাথে ইটিস বিটিস করেছি!”

রূপা আর সহ্য করতে না পেরে দুই হাতে নিজের দুটো কান চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল,

—-” ও খোদা! আমার মরণ লেখো তু… আহহহ!”

কথাটা পুরো শেষ হওয়ার আগেই বাঁধন সজোরে রূপার ধবধবে ফর্সা ঘাড়ে নিজের ধারালো দাঁত বসিয়ে দিল! রূপা ব্যথায় প্রকাণ্ড এক আর্তনাদ করে উঠতেই বাঁধন কানের কাছে মুখ রেখেই দাঁতে চেপে হিসহিস করে বলল,

—-” এসব ফালতু কথা আবার নেক্সট টাইম মুখে আনলে তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো, মাফিয়ার বাচ্চা!”

কামড়টা এতটাই জোরে ছিল যে রূপার নরম চামড়ায় খাঁজ কেটে রক্ত বেরিয়ে আসলো! রূপা যন্ত্রণায় অঝোরে কেঁদে ফেলে বলল,

—-” ব্যাড পুরুষ একটা! ভীষণ ব্যথা লেগেছে আমার!”

বাঁধন রূপার ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। মুহূর্তে তার চোখ জোড়া গাঢ় হয়ে এলো, সে সেখানে নিজের তপ্ত ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। পরম আবেশে আর আদরে তাজা রক্ত চুষে খেয়ে ফেলল বাঁধন! তারপর ক্ষতস্থানটায় পরপর অজস্র ভালোবাসার চুমু এঁকে দিল। বাঁধনের অদ্ভুত স্পর্শে শিউরে উঠে থরথর করে কাঁপতে লাগল রূপা, ব্যথায় ও অনুভূতির তীব্রতায় দু হাতে শক্ত করে খামচে ধরে রাখল বাঁধনের টি-শার্ট।বাঁধন রূপার কানের খুব কাছে ঠোঁট ছুঁইয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

—-” আমাকে অহেতুক রাগিয়ে দিলে এর থেকেও চরম ব্যথা দিবো আমি! এটা তো সামান্য নমুনা, কিছুই না! এইটুকু কষ্টই যদি তুই সহ্য করতে না পারিস, তাহলে ভবিষ্যতে আমার আসুরিক আদরের ব্যথা সহ্য করবি কীভাবে,? শরীরটাকে আরও স্ট্রং কর রূপ, এমন পুতুল শরীর নিয়ে আমার তীব্র আদর লোড করা তোর পক্ষে অসম্ভব!”

কথাটা শেষ করেই বাঁধন এক নিমেষে রূপাকে পাঁজা কোলে তুলে নিল। অভিমানী রমণী এবার চুপচাপ দু হাতে বাঁধনের শক্ত গলা জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে মুখ লুকাল। বাঁধন তাকে সাবধানে নিচে নিয়ে এসে নিজের ঘরে বিছানায় শুইয়ে দিল। মাথার নরম চুলে বিলি কেটে দিয়ে কপালে আঁকল শেষ একটা গভীর চুমু। তারপর শান্ত কঠে বলল।

—-” ঘুমা গুড নাইট।”

বলেই বাঁধন রুম থেকে বেরিয়ে গেল। বাঁধন রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই রূপা চোখ বুজে সেই স্পর্শ, গা শিউরে ওঠা কথা আর অনুভূতির কথা কল্পনা করতে লাগল। দেখতে দেখতে অনুভূতির ঘোরে ধীরেকান্থে ঘুমের দেশে পাড়ি জমাল সে। আর দীর্ঘ কল্পনার পর শেষমেশ রাতটা তলিয়ে গেল গভীর এক শান্ত ঘুমের সাগরে।


এভাবে কেটে গেল বেশ কিছুদিন। রূপার পরীক্ষাগুলো বেশ ভালোভাবেই পার হয়ে গেল। আজ তার এইচএসসি-র শেষ পরীক্ষা! শেষ পরীক্ষার আনন্দই আলাদা, তাই রূপা আর তার বান্ধবীরা আগেই প্ল্যান করে রেখেছিল যে আজকে আর কলেজের ড্রেস পরে নয়, সবাই মিলে সুন্দর সুন্দর আউট ড্রেস পরে কলেজে যাবে।রূপাও সেই ভেবেই সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে আলমারি থেকে বের করে পরে নিল একটা দারুণ সবুজ রঙের জর্জেট রাউন্ড ড্রেস। গাঢ় সবুজ জামার ছাপে ছাপে সুক্ষ্ম সাদা পাথরের কাজ করা। সাথে ম্যাচিং করা ধবধবে সাদা টাইট প্যান্ট আর সাদা দোপাট্টা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সিল্কি চুলগুলো সুন্দর করে ব্রাশ করে পিঠের ওপর খোলা ছেড়ে দিল সে। তারপর বাঁধনের দেওয়া সেই স্পেশাল মাথার ব্যান্ডটা চুলে গুঁজে নিল। বাঁ হাতে পরে নিল তার দেওয়া প্রিয় চুড়িগুলো।

পুরোপুরিভাবে রেডি হয়ে রূপা বিছানা থেকে ক্যান্ডিকে পরম আদরে কোলে তুলে নিল। মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে রুম থেকে বের হওয়ার উদ্দেশ্যে যেই না দরজার দিকে পা বাড়াবে অমনি সামনে তাকিয়ে তার পা দুটো ঠিক সেখানেই থমকে গেল!রুমের দরজায় দুই হাত বুকে ভাজ করে কাঠের ফ্রেমে হেলান দিয়ে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে বাঁধন!পরনে আকাশি রঙের শার্ট আর ধবধবে সাদা ট্রাউজার। চুলগুলো সামান্য এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর আলতো লেপ্টে আছে। রূপা বেশ অনেকদিন ধরেই মনে মনে লক্ষ্য করেছে কালো আর আকাশি রঙের শার্ট পরলে বাঁধনকে অদ্ভুত রকম মারাত্মক সুন্দর লাগে! এত সুন্দর যে, চট করে চোখ ফেরানো যায় না।হঠাৎ রূপার নজর গেল বাঁধনের জোড়া চোখের দিকে। বাঁধনের চোখ দুটি মারাত্মক তীক্ষ্ণ হয়ে আছে, আর সেই ধারালো দৃষ্টি সোজা গিয়ে স্থির হয়ে আছে রূপার খোলা চুল আর উন্মুক্ত মুখের ওপর!বাঁধনের সেই কঠিন চাউনির আসল মানে বুঝতে রূপার একদমই বেশি সময় লাগল না। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে বাঁধন তাকে কড়া ভাষায় হিজাব বাঁধতে বলেছিল, আর রূপা যে আজ সাজগোজের চক্করে হিজাব না বেঁধে চুল ছেড়ে বের হওয়ার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে তা বাঁধনের ওই চিলছ হিশ চোরের মতো চোখে এড়ায়নি।

যত সময় যাচ্ছে, বাঁধনের দৃষ্টি যেন আরও দ্বিগুণ তীক্ষ্ণ হচ্ছে। চওড়া কপাল কুঁচকে একাকার হয়ে যাচ্ছে, রাগের চোটে নাকের ডগা বারবার ফুলে উঠছে। পুরুষটা যে ভেতরে ভেতরে রাগে একদম ফুঁসছে, সেটা বুঝতে রূপার বিন্দুমাত্র বাকি রইল না!এখন কালবৈশাখী ঝড়ের হাত থেকে নিজেকে কীভাবে বাঁচাবে ভেবে না পেয়ে, রূপা ডরপুকুরের মতো বাঁধনের পানে চেয়ে দুটো গালে সুন্দর টোল ফেলে একটা চরম হাবলা মার্কা হাসি ঝুলিয়ে দিল,

—-” হি হি হি…!”

তার সেই আহাম্মকি হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাঁধনও নিজের বিষাক্ত চোখ দুটো আরও ছোট করে এক গালে নকল হাসি হেসে বলল,

—-” হা, হা, হা,থাপ্পড় চিনিস মাফিয়ার বাচ্চা?”

রূপা ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবাধ্য হাসি থামিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,

—-” ভা… ভাই… ভাইয়া…!”

বাঁধন কড়া মুখে দাঁত চেপে গজগজ করে উঠল,

—-” আমি তোর ছাইয়া!”

রূপা ঢোক গিলে মিনমিন করে বলল,

—-” আসলে… আসলে আজ বান্ধবীরা বলল তো, তাই ভাবলাম এভাবেই…।”

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাঁধন নিজের কবজির হাতঘড়িটার দিকে এক নজর তাকাল। তারপর চরম ঠান্ডা গলায় আদেশ দিল,

—-” ফালতু প্যানপ্যান করবি না। কালবৈশাখী থাপ্পড় না খেতে চাইলে সোজা গিয়ে হিজাবটা বেঁধে আয়। আমি নিচে গাড়িতে ওয়েট করছি। তোকে ডাকতে যেন দ্বিতীয়বার এই রুমে আসতে না হয়!”

কথাটা বলেই বাঁধন আর এক সেকেন্ড না দাঁড়িয়ে হনহন করে নিচে নেমে গেল। রূপা ভারী রাগ আর অভিমানে দুটো গাল লাল করে ফুলিয়ে আলমারি থেকে হিজাব বের করতে করতে মনে মনে বিড়বিড় করল,

—-” ধুর ছাই! একদম একটা হিটলারের নাতি!”

তারপর তড়িঘড়ি করে মাথায় হিজাবটা পেঁচিয়ে নিখুঁতভাবে বেঁধে নিচে নেমে আসলো। বাইরে এসে দেখে অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইন সবাই আগেভাগেই ব্যাকসিটে গিয়ে জাঁকিয়ে বসে পড়েছে। আর ড্রাইভিং সিটে চুপচাপ গম্ভীর মুখে বসে আছে বাঁধন। রূপা এসে সিটে বসতেই অ্যান্সি পেছন থেকে উঁকি মেরে প্রশংসার সুরে বলল,

—-” ওয়াও রূপা! তোমাকে ভীষণ মিষ্টি আর সুন্দর লাগছে। “

রূপা আড়চোখে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,

—-” থ্যাংক ইউ আপু!”

বাঁধন পুরোটা পথ আর একটা কথা বলল না, সোজা ও গম্ভীর মুখে গাড়ি চালিয়ে রূপাকে কলেজের গেটে নামিয়ে দিল। গাড়ি থেকে নামার সময় গলার আওয়াজ কড়া করে শুধু বড়ে গেল ছুটির পর নিতে আসবে, যেন ওখানেই দাঁড়ায়। রূপা লক্ষ্মী মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে কলেজের দিকে পা বাড়াল।বাঁধনের ডিউটি থেকে কয়েকদিনের ছুটি চলছে, তাই এই কয়দিন রূপাকে নিজেই কলেজে পৌঁছে দিচ্ছে আবার নিতেও আসছে। ফাঁকে বাকিটা সময় বন্ধুদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।গেটে ঢুকতেই রূপার সাথে বৃষ্টি দোস্তের দেখা হয়ে গেল। বৃষ্টিও আজ রূপার জামার ডিজাইনের মতোই একটা গাঢ় কালো রঙের জর্জেট গাউন পরে এসেছে। আসলে দুজন দুদিন আগেই একসাথে মার্কেটে গিয়ে একদম হুবহু ডিজাইনের একই রকম দুটো ড্রেস কিনেছিল।বৃষ্টি রূপাকে দেখেই চোখের পলক না ফেলে ধেয়ে এসে এক টানে জড়িয়ে ধরল,

—-” রূপা! বিশ্বাস কর তোকে যা গর্জাস লাগছে না আজ! একদম পরীর মতো দেখাচ্ছে!”

রূপাও বৃষ্টিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হেসে বলল,

—-” তোকেও মারাত্মক সুন্দর লাগছে!”

দুজনে হাসাহাসি আর গল্প করতে করতে ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়াল। দেখতে দেখতে সময়ের নিজস্ব গতিতে পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা বেজে উঠল। প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর সবাই যার যার মতো গভীর মনোযোগে লেখায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।পরীক্ষা চলাকালীন ক্লাসে অন্তত একবার হলেও আকাশের আগমন ঘটে। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না, সে ক্লাসের তদারকিতে আসলো। কিন্তু ক্লাসে পা রাখতেই তার চোখজোড়া থমকে গেল যেন কোনো মর্ত্যের অপ্সরাকে দেখে!

আকাশের তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি গিয়ে আটকালো মাঝখানের বেঞ্চে বসে গভীর মনোযোগে পরীক্ষার খাতায় লিখে চলা বৃষ্টির ওপর। গাঢ় কালো রঙের গাউনে মেয়েটাকে আজকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে! ওপরের ফ্যানের বাতাসে চুলগুলোর দু-একটা অবাধ্য গোছা এসে বারবার তার নরম গালে দোলা দিচ্ছে, আর তাতেই যেন মেয়েটার আকর্ষণ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
আকাশ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে ফিসফিস করে বলে উঠল,

মাঝে মাঝে খুব ভাবি, এই স্নিগ্ধ চাঁদের মালিক আমি কি কখনো হতে পারবো? নাকি অন্য কেউ আবার একে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়ে বসবে?মনে মনে এই আকুতি আওড়ে আকাশ ধীর ও নিস্তব্ধ পায়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল। বৃষ্টি টেরও পেল না যে কোনো এক পুরুষ তাকে এভাবে ব্যাকুল চোখে দেখে গেল!ধীরে ধীরে পরীক্ষার নির্ধারিত সময় শেষ হলো। বহু দিন ও রাতের পরিশ্রম শেষে অবশেষে রূপাদের এইচএসসি পরীক্ষা পুরোপুরি শেষ! পরীক্ষা শেষ হওয়ার আনন্দে রূপা, বৃষ্টিসহ তাদের পুরো বান্ধবী গ্যাং হাসতে হাসতে আমোদ করতে করতে ক্লাস থেকে বের হলো।কলেজের মাঠের দিকে আসতেই হঠাৎ রূপার চোখ পড়ল একটু দূরে একা দাঁড়িয়ে থাকা সীমার দিকে। মেয়েটা ইদানীং কেমন যেন একদম চুপচাপ আর মলিন হয়ে গেছে। আগের মতো রূপাকে দেখলে যেচে এসে আর কোনো কথাবার্তা বলে না। রূপা নিজে থেকেও যদি গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে, তবে শুধু অপরাধীর মতো নিচু গলায় সামান্য ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে এড়িয়ে যায়।রূপা বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল,

—- “তোরা একটু এখানে থাক, আমি আসছি।”

বলেই রূপা দ্রুত পায়ে হেঁটে সোজা সীমার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রূপাকে আচমকা সামনে দেখে সীমার মুখটা লজ্জায় আর অপরাধবোধে আরও নিচু হয়ে এলো।রূপা ঠোঁটে নরম হাসি ফুটিয়ে সহজ গলায় বলল,

—- “সীমা! এখানে এভাবে একা একা দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

সীমা কোনোমতে চোখ সামলে বলল,

—- “ওই… আসলে ইসরাত অফিসে স্যারের সাথে একটা কাজে গেছে। ভেতরে দমবন্ধ লাগছিল, তাই ওর জন্য এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছি।”

রূপা সীমার ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে কোমল কণ্ঠে শুধাল,

—- “ও আচ্ছা তা তোমার কী হয়েছে বল তো? তোমাকে ইদানীং সবসময় এত মনমরা দেখি কেন? আর একটা কথা জিজ্ঞেস করি, সত্যি করে বলবে? এই ইশতিয়াক আসলে তোমার কে হয়? তুমি ওকে কীভাবে চেনো?”

‘ইশতিয়াক’ নামটা শোনামাত্রই যেন তীব্র এক আতঙ্কে কেঁপে উঠল সীমা! তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে লন্ডভন্ড হয়ে গেল। সে তোতলাতে তোতলাতে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল।

— “কে,কেউ না! ইশতিয়াক আমার কেউ হয় না! চিনি না, আমি ওকে চিনিই না!”

বলেই সীমা রূপাকে আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে এক কাপড়ে সেখান থেকে দৌড়ে কলেজ গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল!সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধের মতো ফাঁকা রাস্তা ধরে দৌড়াতে লাগল। এই গত কয়েকটা দিন ইশতিয়াক তার সাথে পশুর মতো খারাপ ব্যবহার করছে। প্রতি রাতে অতিরিক্ত নেশা করে এসে সীমাকে গায়ে হাত তুলছে, যথেচ্ছ গালিগালাজ আর অপমান করছে। শুধুমাত্র ইশতিয়াকের প্রতি মনের কোণে লুকিয়ে থাকা অন্ধ ভালোবাসার জোর নিয়ে সীমা বুক বেঁধে বেঁচে আছে,হয়তো কোনো একদিন ইশতিয়াক সব বুঝবে, হয়তো একদিন তাকে ভালোবেসে আপন করে নেবে! কিন্তু সেই আলোর মুখ আর আসছে না। যত সময় যাচ্ছে, ইশতিয়াক তত বেশি কাপুরুষ আর হিংস্র হয়ে উঠছে।নিজের এই অভিশপ্ত জীবনের কথা ভাবতে ভাবতে সীমা এতটাই দিশেহারা ছিল যে সামনে কোনো গাড়ি আসছে কিনা, সেদিকে তার কোনো খেয়ালই রইল না। ঠিক তখনই বিপরীত দিক থেকে আসা একটা দ্রুতগতির প্রাইভেট কার তীব্র শব্দে ব্রেক কষে সীমার গায়ে সজোরে ধাক্কা দিল!

মুহূর্তের মধ্যে বাহনটির ধাক্কায় সীমা রাস্তার ওপর রক্তাক্ত শরীরে ছিটকে আছড়ে পড়ল! চারপাশের দুনিয়াটা ধোঁয়াসে হয়ে এলো, চোখের ভারি পাতা দুটো ধীরে ধীরে নিভে আসতে লাগল। শেষ নিঃশ্বাসটুকু ত্যাগের আগে সে রক্তে ভেজা ঠোঁটে শুধু বিড়বিড় করে বলে উঠল,

“মুক্তি দিলাম ইশতিয়াক আজ আপনাকে চিরতরে মুক্তি দিয়ে গেলাম…।”

চোখের পলকে দুর্ঘটনাস্থলে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে গেল। চারপাশ থেকে পথচারীরা চিৎকার করে ছুটে এলো এবং দ্রুত রক্তে ভেসে যাওয়া সীমাকে উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিকটস্থ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে নিয়ে গেল।

এদিকে রূপা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না সীমা হঠাৎ ইশতিয়াকের নাম শুনে এভাবে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে কেনই বা দৌড়ে চলে গেল! নিশ্চয়ই ইশতিয়াকের সাথে সীমার গূঢ় কোনো সম্পর্ক রয়েছে, নয়তো শুধু নামটা শুনলেই সীমার চোখের জল এভাবে বাঁধ ভাঙবে কেন?
তার গভীর ভাবনার মাঝেই বৃষ্টি দূর থেকে হাত নেড়ে ডেকে উঠল,

—-” কী হলো রূপা? ওখানে একা একা দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আয় এদিকে!”

রূপা বুক চিরে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বন্ধুদের কাছে ফিরে এলো। তারা আরও কিছুক্ষণ হইচই আর হাসাহাসি করে সব পরীক্ষা শেষ হওয়ার আনন্দ ভাগ করে নিল। এরপর একে একে সবাই নিজ নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে বিদায় নিল।কলেজের গেটের কাছে রূপা একাই দাঁড়িয়ে রইল। বৃষ্টি কিছুক্ষণ তার সাথে অপেক্ষা করতে চাইলেও রূপা জোর করেই তাকে গাড়িতে তুলে বিদায় জানিয়ে দিল। কিন্তু অনেকক্ষণ পার হয়ে যাওয়ার পরও বাঁধনের কোনো পাত্তা নেই! সে এখনও আসছে না কেন?
দুপুরের কড়া রোদ আর বিষণ্ণতায় রূপার মনটা ভালো লাগছিল না। সীমার কাঁদাকাটা আর উদ্ভট আচরণের দুশ্চিন্তাটাই অনবরত তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে অবচেতন মনেই উদাস ভঙ্গিতে রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল।
রাস্তাটা আজ অদ্ভুত রকম নিঝুম ও ফাঁকা। তপ্ত দুপুরের কড়া রোদ আর হালকা শুনশান পরিবেশে চারিদিক যেন কেমন ছমছম করছে। হাঁটতে হাঁটতে রূপা মেন রোড ছেড়ে সোজা এক সরু, নিরিবিলি গলির রাস্তায় এসে পড়ল। যেখানে ধারেকাছে একটাও মানুষজন চোখে পড়ছে না।

ঠিক তখনই গলির বাঁ পাশের রাস্তা থেকে কালোরঙা একটা গ্লাসঢাকা প্রাইভেট কার তীব্র গতিতে এসে ঠিক রূপার সামনে ঘ্যাঁচ্চ করে ব্রেক কষে থামল!রূপা কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ির দরজা খুলে চার-পাঁচজন কালো কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকা কিছু লোক হুরমুর করে বের হয়ে আসলো। মুহূর্তেই তারা রূপার চারপাশ ঘিরে প্রকাণ্ড দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল!মাঝদুপুরে এই নির্জন রাস্তায় এমন বিভীষিকাময় ডাকাত টাইপ লোক দেখে ভয়ে রূপার গায়ের রক্ত জল হয়ে গেল! সে তোতলাতে তোতলাতে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল,

—-” আপ আপনারা কারা? কী চান আপনারা?”

লোকগুলো কোনো কথার উত্তর দিল না। হঠাৎ পেছনের একটা লোক এসে শক্ত হাতে রূপার মুখ চেপে ধরল! রূপা আতঙ্কে হাত-পা ছুড়ে আত্মরক্ষা করার আগেই অন্য একজন তার দুটো পা খামচে ধরে শূন্যে তুলে ফেলল!ঝাঁকুনিতে রূপার হাত থেকে পরীক্ষার পিচবোর্ড আর কলমদানী সজোরে রাস্তায় পড়ে ছিটিয়ে গেল। লোকগুলো নিমিষে রূপাকে কালো গাড়ির ব্যাকসিটে ছুঁড়ে ফেলল, আর একজন তার মুখটা ওভাবে শক্ত করে চেপে রাখল যেন বিন্দুমাত্র টু শব্দও সে করতে না পারে!তারপর বিকট শব্দে গাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সেই অভিশপ্ত গাড়িটি ঝড়ের গতিতে গলির রাস্তা পেরিয়ে বহুদূরে গিয়ে হাওয়া হয়ে গেল!

চলবে…!

বড় পর্ব আসে তাই দেরিতে আসে গল্প, লিখতে প্রচুর সময় লাগে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply