Golpo romantic golpo রাগে অনুরাগে

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৬(প্রথমঅংশ+শেষাংশ)


রাগে_অনুরাগে

পর্ব২৬ (প্রথমঅংশ)

সুহাসিনি__ফাতেহা

অয়নের কণ্ঠ শুনে তুষার পেছন ফিরে তাকায়। ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসি খেলা করছে। তুষার একবার ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। অয়নকে সোজা বলল, ” হুমম চলছে তো! তোর ফুপাতো বোনকে বউ বানাবো ঠিক করেছি। প্রেমে টাইম নষ্ট করবো না।”
ঝিলিক লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছে। কানের পিঠে চুল গুঁজল লাজুক ভঙ্গিতে। মনে মনে ভাবল, কি বেহায়া লোক! সে তো তুষার ভাইকে খুব ভদ্র ভেবেছিল। উঁহু, মোটেও তা নয়। ভীষণ অভদ্র উনি!
তুষার অয়নকে কথাটা বলে আচমকা ঝিলিকের দিকে সামান্য ঝুঁকে গিয়ে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে একবাক্যে বলল,
“কি মিস বউ হবেন আমার? এই নিরামিষ পুরুষটার আমিষ বউ?”
সহসা ঝিলিকের বুকের ভেতরে ধুকপুক করে উঠল। এমন কথা সে মোটেও আশা করেনি। বিড়বিড় করে, অসভ্য লোক! বলে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেলো।
অয়ন তুষারের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওর তো বিয়ে দিয়ে দিবে। সময় থাকতে তুই পাত্র হয়ে চলে আয়, নাহলে পরে হারাবি।” অয়নের বুকের ভেতরে ধক করে উঠল। সে একজনকে হারিয়েছে। তাই বোঝে হারানোর যন্ত্রনা।
তুষার অয়নের কাঁধে ভর দিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল,
“তোর ফুপিকে বলিস অয়ন। পরেরবার মেয়ের জন্য ছেলে দেখলে যেন আমার কাছেই আসে। তার মেয়েকে আমার পছন্দ হয়েছে। ঠকবে না!”
.
.
বিকেল চারটা ত্রিশ মিনিট । এখনো বৌভাতের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে খান বাড়িতে। শেখ বাড়ির মানুষজন এসেছে প্রায় তিন ঘন্টা। ইতিমধ্যেই সকল মানুষদের সব রকম মেহমানদারি করা শেষ। তিতলি মা বাবা সবাইকে দেখে অনেক খুশি। বাবার পাশ থেকে উঠছেই না।
ফারাজ শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সাথে দেখা করে উপরে গিয়েছে। শ্বশুর থাকায় তিতলিকে ডাকতে পারছে না তাই অয়নকে পাঠিয়েছে তিতলিকে গিয়ে বলতে, তোর ভাবিকে গিয়ে বল এক্ষুনি যেন রুমে আসে।
কিন্তু তিতলি জেদ ধরে গেলো না। মা বাবা সবাইকে পেয়ে ফারাজ কে পাত্তা দিচ্ছে না।
বেয়াদব বউ কথা শুনছে না দেখে ফারাজের মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে। সকাল থেকে একবারও হাতের কাছে পাচ্ছে না। শুধু পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কত পালাবে সেও দেখবে। রাতে যখন রুমে আসবে তখন সব সুদে আসলে উসুল করবে। ভেবে শক্ত মেজাজে ফারাজ আবার রুম থেকে বেরিয়ে এলো। বেয়াদব বউকে কয়টা কড়া কথা না শুনালেই নয়।
খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে দুই পরিবার ড্রয়িংরুমে খোশগল্পে মেতে উঠেছেন।
তিতলি বাবার পাশে বসে আছে। তৌসিফ শেখ মেয়ের মাথায় পরম স্নেহে হাত রেখে কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“শ্বশুর বাড়ি কেমন আম্মু?”
তিতলি মুচকি হেসে উত্তর দেয়, “অনেক ভালো আব্বু!”
তৌসিফ শেখ খুশি হলেন মেয়েকে খুশি দেখে। মেয়ের খুশিতেই তিনি খুশি।
আফজাল খান পাশ থেকে বললেন,
“ভালো না হয়ে উপায় আছে বেয়াই? আপনার মেয়ে তো এখন আমারও মেয়ে। আর মেয়ে কি বাবার কাছে ভালো না থেকে পারে।”
তৌসিফ শেখ ভাবলেন, মেয়েকে ভালো ঘরেই বিয়ে দিতে পেরেছেন। একমাত্র মেয়ে সবসময় চাইতেন এমন এক পরিবারে বিয়ে দিবেন মেয়ের কোনো কষ্টে থাকবে না। নিজের কাছে যেমন ছিলো ঠিক তেমনই থাকবে। কিন্তু তিনি চান মেয়েকে আজকে সাথে করে নিয়ে যেতে। তাই তৌসিফ বললেন,
“বেয়াই মেয়েকে এক রাতের জন্য নিয়ে যাবো ভাবছি। আপনাদের কোনো আপত্তি নেই তো?”
সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতেই কথাটা কানে এলো ফারাজের। চিবুক শক্ত তখনি। কিন্তু মুখ দেখে সে রেগে আছে নাকি তা বুঝা দায়। তিতলির দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের। তিতলি চোখ নামিয়ে নিলো। ভাবখানা এমন সে ফারাজকে দেখেনি। এমনিতে রেগে আছে এবার ফারাজের রাগ আকাশসম হলো। সোজা এসে শ্বশুরের পাশে বসল। তিতলি কেঁপে উঠল ফারাজের উপস্থিতিতে।
আফজাল খান ছেলেকে বসতে দেখে কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। ছেলের শক্ত মুখ দেখে বুঝে গেলেন কিছু। কিন্তু তাও বেয়াইকে বললেন,
“কোনো আপত্তি নেই বেয়াই। আপনার মেয়ে আপনি যখন ইচ্ছে নিয়ে যেতে পারবেন।”
তৌসিফ শেখ খুশি হয়ে বললেন,
“তাহলে তো কোনো কথায় নেই।” পাশ ফিরে ফারাজের উদ্দেশ্যে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন,
” জামাই তোমার কোনো আপত্তি নেই তো? তিতলিকে নিয়ে যাওয়াতে?”
ফারাজ খানের খুব আপত্তি! বিয়ে করার আগে তো ভেবেছে শাস্তি হিসাবে কখনো বাবার বাড়ি যেতেই দিবে না। কিন্তু শ্বশুরকে ভদ্রতা দেখিয়ে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
“আমার কোনো আপত্তি নেই! নিয়ে যেতে পারেন।”
তিতলি এটা শুনে মনে মনে বলে, আপত্তি থাকবে না তো আমি চলে গেলে তো আরো খুশি হুহ!
ফারাজ শ্বশুরের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে চলে গেল। কোনদিকে গেল তিতলি দেখলোই না। সবাই রাজি তিতলিকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিতলি রাজি নেই। তার ফারাজকে ছেড়ে একমুহূর্ত ও থাকতে ইচ্ছে করবে না। তার সারাক্ষণ ভাল্লুকের কাছে থেকে জ্বালাতে ভালো লাগে। দূরে যেতে একদমই ইচ্ছে করে না। তিতলি সহসা বাবার হাত চেপে ধরে বলে উঠল,
“আমি যাবো না আব্বু!”
তৌসিফ শেখ থতমত খেয়ে গেলেন।
আফজাল খান শুনে ফেললেন সে কথা। বেয়াইও পুত্রবধুর উদ্দেশ্য একসাথে বললেন,
“দেখলেন বেয়াই মেয়ে আমাদের কতটা ভালোবেসে ফেলছে। আমাদের ছেড়ে যেতেই চাচ্ছে না কি বলো আম্মু কথাট সত্যি বললাম না?”
তিতলি লজ্জায় হাঁসফাঁস করছে। জিভ কাটছে বারবার। এ কথা বলায় নিশ্চয় তার মনের কথা আন্দাজ করছেন সবাই। ছিঃ এটা কি বললি? বলে তিতলি নিজেই সেখান থেকে উঠে চলে এলো।
.
.
বৌভাত শেষ হতেই প্রায় অনেকে বাড়ি চলে গেছেন। তিতলির বাড়ির সবাই চলে গেছে এক ঘন্টা হলো। এখন সন্ধ্যা সাতটা। তিতলি দীর্ঘক্ষণ পর রুমে এসে দরজা লাগিয়ে এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিলো। এত্ত গরম আর শাড়িটা? এটা পরে থাকা যায় না। শাড়ির থেকে পিন খুলে বুক থেকে শাড়ি পেলে দিলো। সহসা কুচির থেকে পিন খুলে ড্রেসিন টেবিলের উপর রাখতেই আয়নায় ফারাজ কে দেখে চিল্লিয়ে উঠে,
“ভূততততততততত!”
ফারাজের রুমের বেলকনিতে একটা টেবিল আছে। সেখানে সে প্রায় বসে বসে ম্যাকবুক চালায়। রুমে আওয়াজ পেয়ে ম্যাকবুক বন্ধ করে ভেতরে আসতেই বেয়াদব বউকে এভাবে চিল্লাতে দেখে আচমকা দু কদম এগিয়ে এসে তিতলির মুখ চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
“চুপ! একদম চুপ।”
মুখ চেপে ধরায় তিতলি ঠিকমতে কথা বলতে পারছে না।
“ভূভূ!”
“এভাবে ষাঁড়ের মতো চিল্লাচ্ছো কেন বেয়াদব!”
বলে ফারাজ তিতলির মুখ থেকে হাত সরাল।
ছাড়া পেয়ে তিতলি বড় বড় নিশ্বাস ছাড়ল। লজ্জায় খাটের নিচে দ্বিতীয় বারের মতো ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে।
“আ…আপনি…আপনি রুমে ছিলেন?”
“নাহ! মহাকাশে ছিলাম আমি।”
“ক…কই ছিলেন!”
ফারাজ কপাল কুঁচকাল! এমনিতে অনেক রেগে আছে বেয়াদব বউয়ের উপর । তিনবার ডেকেছে রুমে এসো, একবারও শুনে নি। এখন কি সে ছেড়ে দিবে? শক্ত মেজাজে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“একটু ছাড় দিয়েছি বলে অনেক সাহস বেড়ে গিয়েছে না ! আমি এতবার রুমে ডেকেছি আসলে না কেন?”
পরমুহূর্তেই আয়নায় চোখ পড়তেই তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে আটকালো অর্ধ উম্মুক্ত নারী কায়া’র পানে। সঙ্গে সঙ্গে কপাল গোছালো ফারাজ খান! তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একরাশ পরিবর্তন ঢেলে, সেথায় এবার ভর করল এক আকাশসম বিরক্তির ঝাঁঝ! সে কেমন বিরক্ততায় চোখদুটো খিঁচে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল অন্যত্র। মেয়েটার এহেন বোকামিতে অসন্তুষ্ট হয়ে মুহুর্তেই দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“শাড়ি খুলে আমাকে দেখানোর ইচ্ছে হলে আগেই বলতে পারতে, এভাবে খুলে দেখানোর প্রয়োজন ছিলো না বেয়াদব!”

চলবে।

[২৬ এর প্রথম অংশ পাখিরা। তোমরা শুধু প্রতিদিন পর্ব চাও তাই ছোট । আর হ্যাঁ কাল যেহেতু দেই নি, তাই রাতে ২৬ এর দ্বিতীয় অংশ রাতে আসবে। মানে দুই পর্ব পাবেন আজকে]

রাগে_অনুরাগে

পর্ব_২৬ (শেষাংশ )

সুহাসিনি__ফাতেহা

ফারাজের মুখে এমন কথা শুনে বোকার ন্যায় হতবিহ্বল ভাব ধরল তিতলি। একবার ঘাড় নামিয়ে তাকাল নিজের পানে। আর ওমনি একদফা ঝটকা খেল বেচারি ! খুব লজ্জা লাগছে তার। তক্ষুনি দু’হাতে টাইলেসে পড়ে থাকা শাড়ির আঁচল টেনে বুকে তুলল। এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে চলেছে সমস্ত দেহে। দুরুদুরু কাঁপতে থাকা বুকের গতিও নিয়ন্ত্রণে নেই। তার সব দেখে নিলো মনে হয়। খুব লজ্জা লাগছে তার। নত হয়ে শুষ্ক ঢোক গিলছে তিতলি ! প্রাণ উড়ে যাবার যোগাড় বেচারির। পেছন থেকে উপলদ্ধি করল ফারাজ এখনো একই ভাবে পেছনে দাঁড়িয়ে। নড়ছে না। কেন? তিতলিও দাঁড়িয়ে রইলো কাঠকাঠ হয়ে। মনে হলো ফারাজের নেওয়া ঘনঘন নিশ্বাস পড়ছে তার ঘাড়ে। সহসা কোমরে শক্ত ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেলো। তিতলি নড়েচড়ে উঠলো। সুরসুর করে উঠলো সমস্ত কাঁপা দেহ।
তিতলির কাঁপাকাঁপির মাঝেই তৎক্ষণাৎ ফারাজ গভীর কণ্ঠে বললো,
“আমাকে দেখিয়ে নিজের প্রতি আকর্ষন বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করছো হুমম? এখন আমি কিছু করলে বিষয়টা কিন্তু অন্যদিকে মোড় নিবে।”
তিতলি এবার দাঁড়াতে পারল না লজ্জায়। চোখমুখ খিঁচে এলোমেলো শাড়ি নিয়ে ত্রস্ত পায়ে দৌড় লাগাল ওয়াশরুমের পানে, আর ওমনি পথিমধ্যে শাড়ির বাঁজে পা বাঁধল মেয়েটার! ঘটনাপ্রবাহে আচানক মেঝেতে উল্টে পড়তেই ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে গেল তার। তড়িঘড়ি করে দু’হাতে ভর দিয়ে উঠবার প্রয়াস চালায় বোকা মানবী। কনুইতে এত ব্যাথা পেয়েছে। হাত দিয়ে আহত স্থান ডলতে ডলতে উঠতে চাইল। ঠিক তখনি একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে আচমকা টেনে ধরে মেয়েটার ডান হাত। তার পাতলা ঠোঁট জোড়া কাঁপছে ধমক দেবার জন্য। গলায় ধমক আটকে রেখে
শাসানো সুরে বললো,
“সমস্যা কি তোমার? আমি দুইটা কথা বলছি বলে গাঁদার মতো দৌড় দিতে হবে? হাতপা ভেঙে পঙ্গু হওয়ার ইচ্ছে থাকলে আমাকে বলতে পারতে।”
মেয়েটা লজ্জায় লাল, নীল, গোলাপী হচ্ছে। মাথা নত করল সে। এই ধারালো নেত্রদ্বয়ে চোখ মিলাতে তার হৃদয় কাঁপে। হাঁসফাঁস করে বলল,
“আপনার কাছে এটা সা..সামান্য মনে হয়?”
“নয়তো কি?”
তিতলি লজ্জায় খাটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। আর এই লোকের কাছে এটা সামান্য মনে হয়। লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে বলল,
“আমার লজ্জ..লজ্জা লাগে আপনার সামনে দাঁড়াতে।”
ফারাজের কপালের ভাঁজ শিথিল হলো এবার। বিদ্বিষ্ট চাউনী গভীরতা পেল। কণ্ঠসুরও কেমন তীক্ষ্ণ শুনালো,
“তো? এখনো আমার সামনে আছো কিভাবে?”
“আপ..আপনি তো বলছেন আমি দেখাচ্ছি তাই চলে যাচ্ছিলাম।”
“আমার বউ আমি যখন যা ইচ্ছে বলবো তোমাকে।ফারদার, আমি যতক্ষণ কথা বলবো তোমাকে চুপচাপ সব কথা শুনতে হবে। তার আগে এক পা ও যদি এদিক ওদিক যায়। ফল কিন্তু ভালো হবে না। আন্ডারস্ট্যান্ড!”
তর্জনে গর্জনে সপ্তদশীর কিচ্ছু যায় এলো না।
বরং ফারাজের মুখে বউ শব্দটা শুনে তুলতুলে ভালো লাগায় ভরে গেল বুকটা। বারবার শুনতে ইচ্ছে হয়। কতটা গভীর শুনালো ওই বউ ডাক! এত ভালো লাগে কেন? মনের মধ্যে রাজ্যের সব প্রশান্তি ভীর করে যেন। সে চাই ফারাজ তাকে আদর করে বউ বলে ডাকুক। যেমন, আমার টুনাটুনিদের মা আমার সুন্দরী বউ তুমি কোথায় এভাবে ডাকুক।
একটু যাচাই করতে বলল,
“বউ..বউ মানেন?”
“বউ মানি আর না মানি কাগজে কলমে তুমি আমার বউ আর এটাই তো মানতে হবে তাইনা?”
“আমি জানি আপনি আমাকে ভালোবাসেন।”
“নাথিং!”
তিতলি মুখ ভেঙচি কাটলো। ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“হ্যাঁ বললে কি হয়?”
ফারাজ সে কথার জবাব দিলো না। বেয়াদব বউকে সে শাস্তি দিতে বিয়ে করেছে। প্রেমপ্রেম খেলা খেলতে নয়। ভালোবাসা এখন তার সাথে যায় না। ভাবনা বাদ দিয়ে যুবক হুকুম ছেড়ে বলল,
“নেক্সট টাইম থেকে আমি ডাকার সাথে সাথে যেন সামনে হাজির দেখি। দ্বিতীয়বার ডাকতে হলে বিষয়টা কিন্তু শুধু ডাকাতে শেষ হবে না।”
তিতলির নিষ্পাপ জবাব,
“না আসলে কি হবে?”
ফারাজের সোজাসাপটা উত্তর,
“এইমুহূর্তে যা করিনি ত হবে।”
তিতলি ঢোক গিলল।
ফারাজ কপাল কুচকে রেখে স্রেফ বললো,
“তখন তোমার আব্বু যাওয়ার কথা বলায় আমি তো অনুমুতি দিয়েছিলাম যাও নি কেন?”
তিতলি ভাবনায় পড়ল এবাবরের মতো। সে তো ভাল্লুকের জন্য যায় নি। তার আশেপাশে থাকতে খুব ইচ্ছে করে। একটুও দূরে যেতে নয়। লোকটা কি সেটা বুঝে না? আসলে তাকে বুঝে না। থাক! যেহেতু বুঝে না তাই সেও বুঝতে দিবে না। ত্যাড়া কণ্ঠে নাক ফুলিয়ে জবাব দিলো,
“অয়ন ভাইয়ার জন্য যায় নি।”
ফারাজের মেজাজ খরাপ হলো এমন উত্তরে। চি*বুক শক্ত হলো তখনি। চাপা রাগে যেন ঘি পড়ল। বেয়াদব বউকে এখন দুইটা কড়া কথা শুনাতে মন চাইছে। এমনি এমনি তো আর কথা শুনায় না।
শক্ত মুখবয়বে চিবিয়র চিবিয়ে বলল,
“রাগাচ্ছো কেন আমায়?”
তিতলি এবারও ত্যাড়া উত্তর দিলো,
“আপনি বলছেন যায় নি কেন তাই উত্তর দিছি।”
ফারাজ এবার পূর্বে কোনো অনুমূতি ছাড়ায় তিতলির নরম কব্জি শক্ত করে বন্দি করল নিজের খসখসে হাতে মুঠোয়। রুঢ় মানব কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
“তুমি আসলে ভালো কথা পাওয়ার যোগ্য না। এক্ষুনি আমার সামনে থেকে যাও নয়তো…”
তিতলি কেড়ে নিলো সেটুকু কথা,
“নয়তো…নয়তো কি করবেন আমায়?”
এক অজানা কারণেই যুবকের মাথার তালু গরম হচ্ছে রাগে। অবাধ্য বেয়াদব বউর কতবড় স্পর্ধা। তার সামনে দাঁড়িয়ে পরপুরুষের নাম মুখে নিয়ে আবার মুখে মুখে তর্ক করে। দাঁতে দাঁত চাপল নিজেকে শান্ত করার প্রচেষ্টায়। হিসহিসিয়ে বলল,
“কি করবো সেটা রাত হলেই বুঝাবো এখন ছেড়ে দিয়েছি বলে ভেবো না বেঁচে গেছো।”
বলে যুবক তিতলির হাতটা ছাড়ল না যেন ছুড়ল। আর একমুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। আকাশসম রাগ নিয়ে তখনি রুম থেকে বের হয়ে গেলো।
তিতলি হতভম্বের ন্যায় ফারাজের যাওয়ার দেখলো। রেগে গেল নাকি? রেগে যাক তাকে বুঝেনা যেহেতু রেগে যাওয়ায় ভালো। তারও ভালো লাগছে রাগিয়ে দিতে পেরে।

..
আজকে রবিবার। এর ভেতরে কেটে গেছে আরো দশটা দিন। ফারাজ তিতলিকে পড়া নিয়ে একবিন্দু ও ছাড় দেয় না। দুদিন আগে থেকে রাতে সময় নিয়ে পড়ানোর শুরু করেছে। কিছু না পারলেই ধমক সাথে খোঁটা লাগানো কথা তো আছেই। আবার বুঝিয়ে দেয় শাসন করে। দুষ্টমিষ্টি খুনসুটি, রাগে অনুরাগে অভিমানে তাদের সুন্দর বিবাহিত জীবন চলছে শ্রাবণধারার মতো।
বৌভাতের পর সবাই চলে গেলেও ফারাজের খালা নাছিমা বেগম মেয়েকে নিয়ে এখনো রয়ে গেছেন। সাথে নানা হুশিয়ার সাহেব আর নানি ছকিনা খাতুন তো আছেনই।
.
.
সকাল ১০ টা।
তিতলির রুমে বসে আছে। ফারাজ কলেজে গেছে। কিন্তু তিতলি যায় নি। আজকে বিকেলে বাবার বাড়ি যাবে। কিন্তু ফারাজ যেতে দিচ্ছে না। এ নিয়ে বসেবসে দুঃখ করছে সে। কয়দিন বাবা মাকে দেখে না। তুষার এর ভেতরে তিনদিন এসে দেখে গেছে বোনকে। তাও তিতলির মা বাবা দাদুকে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছে। তখনি ফোন বেজে উঠলো। নিধি কল করেছে। তিতলি ফোন রিসিভ করল,
“হ্যালো।”
নিধি: “কেমন আছিস বেইবি তোকে খুব মিস করি রে। কলেজে আসবি কখন?”
তিতলি: “ভালো নাই। ভাল্লুক আমাকে কোথায়ও যেতে দেয় না।”
নিধি: “আহারে কেন? আমার বেস্টু টা মন খারাপ বুঝি?”
তিতলি মন খারাপের ভান ধরে বলল,
“হুম রে বসে বসে পিঁয়াজ কেটে কান্না করি। দুঃখে কান্না আসেনা! আমি আব্বুর কাছে যেতে চাই এটা ওই লোক বুঝে না। আমিও বুঝবো না তাকে। “
নিধি: “আচ্ছা বাদ দে হানিমুনের কি খবর? বিয়ের আগে তো হানিমুন হানিমুন বলে মাথা খেয়ে পেলতি।”
তিতলি: “আমার আবার হানিমুন! হানিমুন আমার কপালে নেই রে। আমার কপালে শুধু পড়ালেখা।”
নিধি: “তো পড়বি এটা তো আরো ভালো টাকা ছাড়া বিনা বেতনে প্রাইভেট পড়িস!”
তিতলি: আচ্ছা রাখ! একটু কান্না করি!
বাড়িতে আসলে আমাকে বলিস দেখতে আসবো তোকে।
আচ্ছা জানু! বলে তিতলি ফোন কেটে দিলো।
.
.
তিতলি নাছিমা বেগমের সাথে ড্রয়িংরুমে বসে আছে। রুমে মন টিকছে না। ফারিন বেগম কিচেনে। ফারাজের খালা নাছিমা বেগম এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন,
“ফারাজ তো তোমাকে ভালোবাসে না। ও তোমাকে কয়দিন পর ডিভোর্স দিয়ে দিবে।”
তিতলি পাশ ফিরে হিংস্র চোখে তাকালো। এই মহিলা খুব খারাপ। তাকে শুধু কুবুদ্ধি দেয়। তিতলি বিশ্বাস করে না। তার ফারাজ শুধু তার। সে ডিভোর্স দিতে দিবে না মেরে ফেলবে একদম। নতুন বউ হওয়ায় কিছু বলতেও পারছেনা। কারণ তার দাদু বলছে শ্বশুর বাড়ির কেউ কিছু বললে চুপচাপ শুনতে। কিন্তু সে এবার চুপ থাকবে না। কেঁদে দিবে এমন ভাব নিয়ে জবাব দিলো,

“উনি আমাকে ভালোবাসেন।” বলে সেখান থেকে উঠে রুমের দিকে দৌড় দিলো।

আজকে রবিবার। তুষার বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝিলিকের ভার্সিটির সামনে। অফিস ফেলে মেয়েটাকে এক নজর দেখার জন্য চলে এসেছে। তিতলির বৌভাতের পর থেকে আর দেখা হয়নি। তুষার একবার নিজ হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো। ১:০০ বাজে ঘড়িতে। মনে হয় বৃষ্টি আসবে। আকাশে গর্জন দিয়ে বুঝাচ্ছে বৃষ্টি আসার পূর্বাভাস। এর মধ্যে ভার্সিটির ছুটি হলো। শতশত ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে আসছে ভেতর থেকে। তুষারের চোখ শুধু চেনা মুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে। প্রায় সবাই চলে যেতেই সহসা চোখ পড়ল কয়েকটা মেয়ের সাথে হেসে হেসে কথা বলতে বলতে বের হয়ে আসছে ঝিলিক। পরনে সাদা ইউনির্ফম। মাথায় হিজাব নেই। তুষারের রাগ হলো। চোখ ছোট করে তাকিয়ে মেয়েটার পথযাত্রা দেখল।
ঝিলিক বান্ধুবির সাথে কথা বলার সময় আচমকা চোখ পড়ল তুষারের উপর। মেয়েটা চোখ নামিয়ে নিলো। বকবক করা মুখটা বন্ধ হয়ে গেলো। পাশ থেকে ওর বান্ধুবি সিয়া বলল,
কিরে চুপ হয়ে গেলি কেন? তারপর কি হলো বল?
কিছুনা!
বলে ঝিলিক শুকনো অধরযুগল ভিজিয়ে তাকাতে চাইলো তুষারের দিকে। সেদিনের পর থেকে মেয়েটার লজ্জায় রাতের ঘুম হারাম। আগে তো এমন অনুভূতি হতো না। তুষার ভাইকে দেখলেই এগিয়ে সালাম দিতো। এখন এক অদ্ভুত জড়তা তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে। পাশে সিয়াকে বললো,
তুই চলে যা এখন। আমি অটো নিয়ে চলে যাবো।
সিয়া বুঝলো ঘটনটা। তাই মুচকি হেসে চলে গেলো।
ঝিলিক সিয়াকে এটা বললেও নিজেই তুষারকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। কিন্তু তুষার ডাকলো,
“হুমম বান্ধুবিকে চলে যেতে বলে এখন আমাকে না দেখার ভান করছো?”
ঝিলিক জিভ কাটলো। পাশ ফিরে এখন দেখেছে এমন ভাব নিয়ে বলল,
“তুষার ভাই আপনি এখানে?”
“হুমম আমি!”

চলবে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply