রাগে_অনুরাগে
পর্ব_২১
সুহাসিনি__ফাতেহা
স্বামীর ফোন বেজে উঠতেই ফারিন বেগম ব্যস্ত হয়ে বললেন, “কে ফোন করেছে? একটু তাড়াতাড়ি দেখেন তো।”
আফজাল খান পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে তাকালেন। ভাই আমরুল খানের নামটা ভেসে উঠছে। অয়নও কৌতূহলী চোখে চেয়ে আছে। ছেলেটার প্রথম ভালোলাগা শুরু হয়েছিলো চঞ্চল তিতলিকে ঘিরে। কিন্তু মুখ ফুটে বলার সাহস কোনোদিন হয় নি। সে চাই তুষারের সাথে ওর বন্ধুত্বটা সবসময় অটুট থাকুক। আর তিতলি? ওকে দেখে তো মনেই হয়না যে তাকে অন্য নজরে দেখে। সবসময় দেখা হলেই ভাইয়া.ও..ভাইয়া বলেই কান পচিয়ে ফেলে। সেখানে ওসব বলার মুখও হয়নি অয়নের।
আফজাল খান ফোন রিসিভ করে কানে ধরে বললেন,
“হ্যালো!”
আমরুল খান অপর পাশ থেকে চিন্তিত গলায় বললেন,
“অয়ন কি আপনাদের বাড়ি গেছে ভাই?”
আফজাল খান অয়নের দিকে তাকিয়ে থেকেই বললেন,
“আসছে তো, আমার সামনেই বসে আছে।”
“আয়েশাকে আনতে যাওয়ার কথা ছিল । ওখানে গিয়ে বসে আছে? একটু পাঠায় দেন। ওর মোবাইলে কল ঢুকছে না কেন বলেন।”
আফজাল খান ভ্রু কুঁচকে অয়নকে বললেন,
“কিরে তোর মোবাইলে কি হয়ছে তোর বাপে ফোন দিছে মোবাইল কই রাখিস?”
অয়ন পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখে আসলে বাবা অনেক গুলো ফোন করেছে। কিন্তু মোবাইল সাইলেন্ট থাকায় আওয়াজ হয়নি।
তাই বলল,
“আসলে চাচ্চু ফোন তো সাইলেন্ট করা তাই শুনি নাই। তাহলে আমি যায়।”
ফারিন বেগম বললেন,
“নাস্তা তো ধরেই দেখিস নি।”
“অন্য একদিন আসবো চাচিমনি। বলে অয়ন চলে গেলো।
অয়ন চলে যেতেই ফারিন বেগম স্বামীকে বললেন,
“ আমি ভাবছিলাম তৌসিফ শেখ ফোন দিয়েছেন। ছেলেটার মত ঘুরে যাওয়ার আগেই আমাদের সব কথা পাকা করতে হবে। আপনি আরেকবার ফোন করে দেখেন না।”
“কয়বার ফোন দিবো ফারিন। সকাল থেকে দশবার দেওয়া হয়ে গেছে। এতবার ফোন দেওয়া কেমন যেন দেখাচ্ছে। বিয়ে না দিলে নেই আমরা অন্য মেয়ে দেখি। আর আমাদের ঝিলিকের কথা ও তো ভেবে দেখা যায়।”
“আরেকবার কথা বলে দেখেন না। এবার না বললে তাহলে আমরা ঝিলিকের কথা ভেবে দেখবো।”
আফজাল খান শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর কথায় সায় জানালেন।
.
.
ঘড়ির কাঁটায় রাত সাত টা বাজে। তৌসিফ শেখ আর তুষার সহ আফজাল খানের সাথে সরাসরি কথা বলে এসেছেন। ড্রয়িংরুমে আলেয়া শেখ শাশুড়ির সাথে বসে বসে গরম গরম চা খাচ্ছেন আর কথা বলছেন। স্বামীকে আসতে দেখেই উঠে দাড়িয়ে বললেন,
“তুষার কই?”
“তুষার বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। ফিরতে রাত হবে বলছে।”
আলেয়া শেখ স্বামীর কথা শুনে বললেন,
“ওনাদের হ্যাঁ বলে দিয়েছেন? নাকি এখনো দুশ্চিন্তায় ভুগছেন?”
“অনেক খোঁজ খবর নিয়েছি আলেয়া। ছেলে ভালো পরিবার ও ভালো। না করার মানেই দেখলাম না।”
ফরিদা বানু হেসে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ্! ভালা করছিস বাপ। পোলার গো রে আমগো বাড়িত আই মাইয়ারে দেইখা যাইতি কস নাই?”
“বলছি আম্মা। তারা তিতলিকে আগে দেখছে। এখন শুধু তিনদিনের ভেতরে বিয়েটা হয়ে যাক এটাই চাইতেছে। আর আমাদের তিতলি রাজি আছে কিনা সেটা ও তো দেখতে হবে।”
ফরিদা বানু ছেলেকে বললেন,
“তিতলি রাজি থাকন আর নো থাকন দি কি অইবো। আমরা রাজি থাকলেই অইবো।”
তৌসিফ শেখ ভেবেচিন্তে কিছুক্ষণ পর বললেন,
“আমার একটা মেয়ে ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান করে সবাইরে দাওয়াত দিবো আম্মা। কিন্তু তিতলির ও তো মতামতের দরকার আছে।”
আলেয়া শেখ স্বামীর কথায় বড় গলায় বললেন,
“তিতলির মতামতের দরকার নাই। তিতলিকে আমি বুঝাবো। আপনাকে চিন্তা করতে হবে না ওই বিষয়ে।”
তৌসিফ শেখ স্ত্রীর কথার উত্তর না দিয়ে রুমে চলে গেলেন।
.
রুমে বসে নিজের পার্সোনাল ডায়েরীতে আঁকাআঁকি করছে তিতলি। এক পেইজে দুটো ছেলেমেয়ে এঁকেছে৷ মেয়েটাকে শাড়ি পড়িয়েছে, ছেলেটাকে পাঞ্জাবি। উপরে সুন্দর ভাবে লিখেছে, জামাই-বউ। ছেলেটার মাথার উপর লিখেছে ফারাজ আর মেয়েটির মাথার উপরে লিখেছে তিতলি। তারপর মোবাইলে কয়েকটা পিক তুলে নিধিকে পাঠিয়ে বলল,
“আমাদের অনেক মানিয়েছে তাই না বল?”
লিখে সেন্ড করে দিলো। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার বানানো গম্ভীর ফারাজের পানে। পরিক্ষা সহ বনভোজনের পর থেকে কলেজ এক সাপ্তাহর জন্য বন্ধ। আজকে কয়দিন তার ভাল্লুক টাকে দেখে না। কখন কলেজ খুলবে আর সে গম্ভীর হওয়ার ভান করে ফারাজের সামনে নিজেকে উপস্থিত করবে। ভ্রু কুঁচকে রাখবে,কপাল কুঁচকে রাখবে। এসব চিন্তায় মেয়েটার রীতিমত
চিন্তা-ভাবনার শেষ নেই।
সহসা তিতলির ফোন বেজে উঠলো। মেয়েটা নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে সিয়াম ফোন করেছে। তিতলি এখন কারো ফোন ধরবে না। তাই রেখে দিলো। আবার ও বেজে উঠলো এবার তিতলি বিরক্ত হয়ে রিসিভ করলো। সে কিছু বলার আগেই সিয়াম বলল,
“এতবার ফোন দিচ্ছি ধরিস না কেন? তোর জন্য একটা সুখবর আছে রে পাঙ্গাশ মাছ।”
তিতলি রেগে গিয়ে বলল,
“পাঙ্গাশ মাছ কাকে বলিস সিয়ামের বা*চ্চা। তোর সব চুল ছি’ড়ে আমি যদি তোকে যদি টাক না বানায় তাহলে আমি সত্যি মেনে নিবো আমি পাঙ্গাশ মাছ দেখে নিস।।”
“আরে থাম। এত রেগে যাইস না পরে কাঁদবি। সুখবর টা তো আগে শোন।”
তিতলি সিরিয়াস হওয়ার ভান করে বললো,
“কি সুখবর?”
ওপাশ থেকে সিয়াম বেশ সময় নিয়ে একনাগাড়ে বলল,
“ফারাজ স্যারের নাকি বিয়ে ঠিক হয়ছে। তোর কি হবে রে এখন ? আগেই বলেছিলাম স্যারের পেছন হাঁটা বাদ দে। এখন কি পাইলি স্যার তো বিয়ে করে পেলতেছে।”
তিতলি বিশ্বাস করে না এই সিয়ামের কথা। তার ফারাজ শুধু তার। আর কারো না। তাও সপ্তদশীর মনটায় কু ডাকছে। সে বিশ্বাস না করে বললো,
“মিথ্যা কথা কেন বলিস।”
সিয়াম এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
“একটা ও মিথ্যা কথা বলছি না বিশ্বাস কর। আজ ফারাজ স্যারের ভাই ফরহাদ আছে না? ফারাজ স্যারের বাপেরে ও দেখছি দোকানে বাপ ছেলে স্যারের বিয়ে নিয়ে কথা বলছে। মেয়েরা রাজী হয়ছে এসব ও বলছে। বিয়ের কথা নাকি পাকা হয়ে গেছে।”
সিয়ামের কথা তিতলি বিশ্বাস হবে হবে করেও হলোনা। সে ফারাজের মুখে শুনা ছাড়া বিশ্বাস করবে না এ কথা। একদম বিশ্বাস করবে না। মেয়েটা ফুঁপানোর জন্য কথা বলতে পারছে না। বিশ্বাস করবে না তাও আঁখিযুগল বারবার ভিজে উঠছে। নাক টানতে টানতে ফোন কেটে দিলো।
.
তুষার অয়নের সাথে বাজারের দোকানের পেছনে বসে আড্ডা দিচ্ছে। অয়ন সিগারেট টানছে। তুষার অনেকক্ষণ অয়নের হাবভাব খেয়াল করছে।
এবার সন্দেহের গলায় বলল,
“কিরে শালা আজ এত সিগারেট টানছিস কেন?”
অয়ন সিগারেটে শেষের টান দিয়ে পেলে দিয়ে তুষারের দিকে তাকালো। আজ চাচার থেকেও আবার শুনেছে বিয়ে নাকি পাকাপোক্ত হয়েছে। সে খুশি এ বিয়েতে। তার ফারাজ ভাই বিয়ে করবে আর সেটা যদি তিতলি হয় তাহলে সেটাই বেস্ট। শুধু ফারাজ ভাই বিয়েটা করলেই হলো। অয়ন নিজের অযাচিত ভাবনা একপাশে রেখে বলল,
“এমনি খেতে ইচ্ছে করলো। তোর মন চাইলে তুইও খা।”
তুষার কখনো সিগারেট খায় না। তবে আজ প্রাণের বন্ধুকে খেতে দেখে কৌতূহল হলো। তাই বলল,
“একটা দে খেয়ে দেখি।”
অয়ন সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা নিয়ে আগুন ধরিয়ে তুষারেকে দিলো। তুষার দু টান দিতেই কেশে উঠলো। চেঁচিয়ে বলল,
“এসব ছাঁইপোড়া মুরুব্বি মানুষ খায় কিভাবে?সেদিন মতিন চাচারে দেখি দোকানে বসে সিগারেট খাচ্ছে। আমি বললাম এই এ বয়সে সিগারেট খান কেন চাচা?” ব্যাটা হেসে হেসে বলল, সিগারেট খেলে নাকি মন মেজাজ ভালে থাকে। সবসময় খায় না। তোর চাচির লগে ঝগড়া হলে তখন খায়। শুনে আমিতো কয়েক সেকেন্ড হা করে ছিলাম। বুড়া বয়সে ব্যাটা চাচির লগে ঝগড়া করে।”
তুষার কথা ঘুরিয়ে আবার ফারাজের প্রসঙ্গ টেনে বলল
ফারাজ ভাইর সাথে তিতলির বিয়ের কথা চলছে শুনিস নি?
অয়ন ছোট করে বলল,
হুমম!
তুই খুশি না?
অয়ন হেসে বলল, “খুশি হবো না কেন? শুনে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম।”
তুষার সহসা কপাল কুঁচকে বলল,
আচ্ছা ফারাজ ভাই কি বিয়েতে রাজি মানে তিতলিকে কি পছন্দ করে এমন টাইপ কিছু?
অয়নের মনে পড়লো ফারাজ ভাই তাকে নিজের মুখে হুমম বলেছে তার মানে সত্যি পছন্দ করে। তাই বলল,
ফারাজ ভাই নিজেই তিতলিকে পছন্দ করছে।
তুষার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
তোর ফুপাতো বোন একটা আছে না ঝিলিক নাকি মিলিক নাম তার কি খবর রে?
ভালো। হঠাৎ ওর কথা জিজ্ঞেস করলি কেন?
তুষারের মুখে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন দেখা গেলো না। বরং মুখটা আরো গম্ভীর করে বলল,
এমনি। আচ্ছা বাড়ি চলে যা আজ। কাল দেখা হবে। আব্বু বলছে তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে।
আচ্ছা।
তুষার অয়নকে বিদায় দিয়ে বাড়ির পথে চলে গেলো।
.
ডিনার করে এসে তিতলি রুমে এপাশ -ওপাশ পায়চারি শুরু করল। সত্যি কি ভাল্লুকটা তাকে রেখে বিয়ে করে নিচ্ছে? কি হবে এখন? কী করবে সে? না কোনো বুদ্ধিই মাথায় আসছে না।
মেয়েটা হতাশ ভঙ্গিতে দুহাত মেলে শুয়ে পড়ল বিছানায়। বালিশে মুখ গুঁজে কিছুক্ষণ কাঁদলো। বাড়ির সবাইকে কেমন রহস্যময় লাগছে। আড়ালে আবড়ালে ফিসফিসস করছে তাকে দেখলেই চুপ হয়ে যায়।
না জীবনে এত অশান্তি আর নেওয়া যায় না।
ঘুম ও আসছে না অভিমানী মেয়েটা ফারাজের কণ্ঠে একবার শুনতে চাই। না হলে আজ রাতে ঘুম হবে না। সিয়ামের কথা গুলো যাচাই করতে হলেও ওই লোকের সাথে কথা বলার দরকার আছে।
তিতলি আর দেরি না করে ফোন হাতে নিল। মেসেন্জারে ঢুকে সব ইগনোর ভুলে ফারাজকে সরাসরি রিয়েল আইডি মেসেজ দিলো,
আপনি নাকি বিয়ে করে নিবেন স্যার?
মেসেজটা দিয়ে ভাবলো হয়তো কোনো রিপ্লাই আসবে না। তাই পাশে রেখে চোখের পানি নাকের পানি এক করলো।
.
.
ফারাজ খান রাতের খাবার খেয়ে সবে রুমে এসেছেন। পরনের টাশার্ট টা খুলে উন্মুক্ত শরীর নিয়ে বিছানায় বসেছেন। ইতিমধ্যে জেনেছেন পাত্রী স্বয়ং তার চেনাজানা বেয়াদব মেয়েটা। প্রথমে না না বলে দিবে ভেবেও পরে কিছু একটা ভেবে চুপচাপ শুনে এসেছেন। কিন্তু মোবাইল হাতে নিতেই এমন মেসেজ দেখে যুবক কপাল কুঁচকে ভাবলো,তবে কি ওই মেয়ে জানে না। না জানলে না জানুক।
যুবক নিজ অজান্তেই তার বাদামী ঠোঁট দুটো কেমন আনমনে বিড়বিড় করে বলল,
“আপনার এই অধৈর্যহীন বেয়াদবি কমানোর জন্য হলেও আপনাকে বিয়ে করার প্রয়োজন আছে বেয়াদব মেয়ে।”
অতপঃর ভাবলেন এখন জ্বালাতে পারলে খারাপ না। তাই হুমম লিখে যুবক মোবাইলটা রেখে দিলেন।”
.
তিতলি এখনো মেসেঞ্জারে ফারাজের আইডিতে ঢুকে আছে। মেয়েটার ভাবনা এই যে একটা কিছু জানাক। সে সত্যি টা জানতে চাই।
কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে পরপরই টুংটাং মেসেজের আওয়াজ আসলো,
হুমম!
ফারাজের সরল তম জবাবে তিতলি বাকরুদ্ধ হয়ে গেল৷ চোখজোড়া লাল হয়ে পিটপিট করছে তার,কাঁপা হাতে লিখলো,
কাকে… কাকে বিয়ে করবেন ?
সিন হলো তবে উত্তর আসলো না। আবার লিখল,
কিছু. বলছেন না কেন?
তিতলির নাক ফুলে উঠছে। চোখের কোণ ভিজে গাল বেয়ে পানি পড়ছে। এবার আর বিশ্বাস না করে উপায় নেই। তার এত আশা ভালোবাসা সব বিফলে গেলো। কান্নায় চোখে দেখে না এমন ভাবে লিখলো,
- আপনি..
সম্পুর্ন বাক্য লিখতে পারলো না,কাঁদতে কাঁদতে মোবাইল ছু’ড়ে মারলো। সে এই বিয়ে হতে দিবে না। বিয়ের দিন ওই বাড়ি গিয়ে বিয়ে ভেঙে দিয়ে আসবে একদম হতে দিবে না। তারপর দেখবে ওই লোক কিভাবে বিয়ে করে।
চলবে।
{পাখিরা ভালোবেসে কেমন হয়ছে জানাও। আর সত্যি কি ওদের বিয়ে হতে যাচ্ছে?}
রাগে_অনুরাগে
বোনাস_পর্ব
সুহাসিনি__ফাতেহা
সেই রাতটা তিতলির একদম ভালো কাটেনি। ফারাজের বলা “হুমম” শব্দটা সপ্তদশীর রাতের ঘুম ঝলসে দিয়েছে। ছটফট করতে ফজরের সময় চোখ লেগে গেলো। উঠলোও বেলা করে। তখন প্রায় দশটা বাজে ঘড়িতে। আলেয়া শেখ কয়েকবার মেয়েকে ডেকে গেছেন। কিন্তু জেদি মেয়েটা চুপচাপ দরজা লাগিয়ে বসে আছে। কোনো সাড়াশব্দ করছে না। আর বললেও জোর দিয়ে বলছে, “ঘুমাচ্ছি আমি।”
তার চোখ-মুখ ফুলে কলাগাছ হয়ে আছে। এই চেহারা নিয়ে নিচে যাওয়াও সম্ভব নয়। সারারাত কেঁদে এখন আর কাঁদতেও পারছে না। কাঁদলেই শান্তি নাই। চোখের পানি, নাকের পানি এক হয়ে যায়। তারপর আর নিশ্বাস নেওয়া যায় না।
না, এভাবে আর ওই পাষাণ লোকের জন্য কেঁদে নিজেকে কষ্ট দেওয়া যায় না। ওই লোক তাকে কখনো বুঝেনি। ভালোবাসেনি। আর সে কতকিছু ভেবে এসেছে এতদিন। ফারাজ যখন তাকে জোর করে বলতো,
“আমার দিকে তাকাও বলছি? আমি ডাকছি শুনছো না কেন?” —- শাসনের মতো কথাগুলো শুনলে তুলতুলে ভালোলাগায় ভরে যেত বুকটা। কিন্তু ওগুলো সব মিথ্যা ছিলো, সব অভিনয়। নিজের মনকে বুঝাতে শুকনো ঠোঁটজোড়া আনমনেই বিড়বিড় করলো,
“ করুক বিয়ে! একটা বিয়ে করুক নাহলে দশটা। আমার কি? তাতে আমার কিছুই আসবে যাবে না। তার সাথে বউ থাকুক! বাচ্চা থাকুক! ইট ডাজেন্ট ম্যাটার।” কিন্তু মনের কোণে এটা আসলেই ম্যাটার করে। তিতলির বুক চুরমার করে কান্না পাচ্ছে। কেন ওই পাষণ্ড মানুষটার প্রেমে পড়তে গেলো।
আচমকা দরজায় টোকা দিলো কেউ। গলা ছেড়ে দিয়ে উঁচু আওয়াজে ডাকলো,
“তিতলি, রুম থেকে বের হচ্ছিস না কেন?”
ভাইয়ের কণ্ঠ পেয়ে মেয়েটা তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে বসলো। ভাবনায় এলো এতক্ষণ দরজা বন্ধ করে বসে থাকলে নিশ্চিত বাড়িতে বড় কোনো কাণ্ড ঘটবে তাকে নিয়ে। মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এমন কষ্ট এই সতেরো বছরের জীবনে কখনো পায়নি। গলা পরিষ্কার করে জোড়ালো গলায় ভাইকে বলল,
“তুমি যাও আমি আসছি ভাইয়া।”
অধৈর্য তুষার বোনের কথা শুনে দরজা ধাক্কা দিয়ে স্রেফ বলল,
“তোর কি হয়ছে বলতো?”
“কিছু না। ঘুম ভাঙছিল না ভাইয়া।”
“আচ্ছা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আয়।”
আর আওয়াজ আসলো না। ভাই চলে গেছে মনে হয়। তিতলি তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশ হয়ে এলো। সিল্কি লম্বা চুল গুলোর ঝাঁটার মতো দশা। রাতে নিজে ইচ্ছে করেই চুল খুলে দিয়ে সামনে পেছনে ছড়িয়ে ভূতের মতো হয়ে কেঁদেছে। ওই লোককে সে কখনো ক্ষমা করবে না। নিজের মনকে বুঝিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো তারপর।
.
.
তিতলি সিঁড়ির সামনে এসে থেমে গেলো। আলেয়া শেখ আর ফরিদা বানু নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন, “বিয়ে পরশুদিন।”
তিতলি আবার দাদুর কথা শুনতে পেলো,
“কালকে তেলের রাত হবে।”
আলেয়া শেখ ভাবুক হয়ে বললেন,
“সবকিছু খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে না, আম্মা? ছেলেপক্ষ আরেকটু সময় দিলে ভালো হতো।”
“বেশি বুইঝো না বৌমা। বিয়ার মত ফরজ কামে দেরি কইরতে নাই। যত তাড়াতাড়ি দন যাইবো ততই মঙ্গল।”
“তিতলিরেও তো বলা হয় নাই আম্মা। মেয়েটার কি হয়ছে কে জানে। সকাল থেকে ডাকি শুধু বলতেছে ঘুম যায়। আরেকবার ডেকে আসি।”
ইতিমধ্যেই তিতলি হেঁটে একদম মায়ের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। ভ্রুযুগল কুঁচকে রেখে অভিমানী গলায় বলল,
“আমি এসেছি ডাকা লাগবে না।”
আলেয়া শেখ মেয়ের মুখশ্রী দেখে দাড়িয়ে ঘুরেফিরে দেখতে থাকলেন। ভাবলেন, মেয়ের মতিগতি তো ঠিক লাগছে না। চোখ লাল হয়ে আছে। একবার দেখে আবার সতর্ক চোখে চাইলেন তিনি।
“কী রে, তোর চোখদুইটা ওমন লাল হয়ে আছে কেন?”
“ধরা পড়ে যাওয়ার মতো কথা শুনে তিতলি
আমতা-আমতা করল,
“কই, না তো?”
আলেয়া শেখ মেয়েকে চেনেন। নিশ্চিত তার কাছে কোনো কিছু লুকাচ্ছে। তিনি সন্দেহের চোখে এগাতে নিতেই, ত্রস্ত একপা পিছনে সরল তিতলি। বলল,
“চোখে কি যেন পড়েছে আম্মু। তাই লাল হয়ে গেছে।”
আলেয়া শেখ মেয়ের কথা বিশ্বাস করলেন না। কারণ মেয়ে কিছুক্ষণ পরপর বড়বড় নিশ্বাস পেলছে। ফুঁপানোর মতো করে উঠছে।
মিথ্যা বলছিস কেন?
তিতলি কিছু বলল না।
আলেয়া শেখ ওতকিছু না ভেবে সোজা বললেন,
“নাস্তা করতে বোস।”
তিতলি বাধ্য মেয়ের মতো নাস্তা করতে বসে গেলো। খাবার গলা দিয়ে নামছে না। চোখের সামনে শুধু ফারাজের গম্ভীর চেহারা ভেসে উঠছে। এই গম্ভীর চেহারা, অ্যাটিটিউড, হাঁটাচলা, কথা বলার ভাবভঙ্গিমা দেখেই তো সে ওই লোকের প্রতি শতবার ঘায়েল হয়েছে।
“নাস্তা না করে বসে আছিস কেন?”
তিতলি কোনোমতে ভাবনা থেকে বেরিয়ে একটা ব্রেড খেলো। আর খেতে পারবে না। মূলত সে খাবে না। খিদে পেয়েছে প্রচুর। তাও খাবে না।
তিতলি কিছুক্ষণ সোফায় এসে চুপচাপ বসে থাকলো দাদির পাশে। ফরিদা বানু নাতিনের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“তোর বিয়া ঠিক হয়ছে ছেমরি। মনমরা করে বয় রইছিস ক্যান?”
তিতলির ধ্যান ফিরলো কথাটায়। মেয়েটা তটস্থ ভঙ্গিতে দাদুর কথা বুঝার চেষ্টায় নিমগ্ন। তার বিয়ে? সিরিয়াসলি? কই কেউ তো তাকে বলে নি? গোল মুখশ্রী তে হাজারো প্রশ্ন খেলা করছে। সেদিন ও দাদু বলেছে তোর মনে হয় বিয়ার রঙ লাইগবো ছেমরি। মেয়েটা অবুঝ ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আমার বিয়ে মানে কি দাদু? কি বলছো এসব?”
“ঠিকই কইতাছি। তোর তেলের রাত অইবো কাল। পরেরদিন বিয়া।”
তিতলি বসা থেকে উঠে দাঁড়লো সহসা। গলা ছেড়ে বাবাকে ডাকলো,
“আব্বু! আব্বু! আব্বু!”
আলেয়া শেখ কিচেন থেকে দৌড়ে এসে বললেন,
“তোর আব্বু অফিসে জরুরী মিটিং এ গেছে। চিল্লাচ্ছিস কেন?”
মেয়েটার চেহারা কাঁদোকাঁদো ভাব। কেঁদে দিবে ওমন ভাব নিয়ে বলল,
“আম্মু দাদু এসব কি বলছে? আমার বিয়ে মানে কি?”
আলেয়া শেখ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম সুরে বললেন,
“তোর দাদু সত্যিটাই বলতেছে। কাল হলুদ হবে পরশু বিয়ে। রাতে আমরা ছেলেপক্ষ সহ শপিং এ যাবো। তুই কি খুশি না?”
তিতলির কান্না আরো বেড়ে গেলো। এসব কি শুনছে সে? তার বিয়ে? এক জ্বালাতে বাঁচে না।আরেক জ্বালা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। তার তো মনে হয় আর বেঁচে থাকা হবে না।
আলেয়া শেখ মেয়েকে শান্ত করতে বলল,
“কাঁদিস না মা। মেয়েদের একদিন না একদিন তো বিয়ে দিতেই হয়। আর ছেলে খুব ভালো। তুই ভালো থাকবি। পড়াশোনাও করতে পারবি।”
তিতলি নাক টানছে। কথা গলা দিয়ে বের হচ্ছে না। আটকে যাচ্ছে তাও বলতে চাইলো,
“আমি…আমি বিয়ে করবো না আম্মু।”
“তা বললে কি আর হবে। বিয়ের সব কথা পাকাপোক্ত হয়ে গেছে।”
এইমুহূর্তে এসে ফারাজের “হুমম” বলা শব্দটা মনে এলো মেয়েটার। সহসা মেয়েটা নিজেকে শক্ত করে নিলো। ভীষণ শক্ত! আলেয়া শেখ মেয়ের চোখের পানি মুছে দিলেন শাড়ির আঁচল দিয়ে। তিতলির কান্না কিছুটা থামলো। সে রাজি বিয়েতে। ওই লোক বিয়ে করতে পারলে সেও পারবে। তাকে দেখানোর জন্য হলেও সে বিয়ে করবে পরে না হয় ডিভোর্স দিয়ে দিবে। আগে ওই লোককে দেখিয়ে দিবে শুধু তুই বিয়ে করতে পারিস না দেখ আমিও বিয়ে করছি আর তোর থেকেও হ্যান্ডসাম বর পেয়েছি।
তুষারও নিচে নেমে এলো বোনের আব্বু আব্বু ডাক শুনে। সে আপাতত কার্ড নিয়ে সবাইকে ইনভাইটেশন করতে যাবে। হাতে ব্যাগ নিয়ে নেমেছে। সব দ্রুত হওয়ায় রাতের মধ্যে কার্ড বানিয়ে এনেছে। তিতলির চাচা ফুপু খালা নিকটাত্মীয় দের বাড়ি অনেক দূরে দূরে হওয়ায় ফোন করে বলা হবে। এখন শুধু আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশীদের কার্ড বিতরন করে দিবে। কিন্তু বোনের চিৎকার পেয়ে নেমে এসেই বলল,
কি হয়ছে তোর? এমন করছিস কেন?
তিতলি ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলল না। মন মেজাজ খারাপ কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না।
ফরিদা বানু হেসে বললেন,
নাতিন আমার সরম পাইতেছে। তাই কিছু কইতেছেনা।
আলেয়া শেখ ও মেনে নিলেন নীরাবতা সম্মতির লক্ষণ। তিনি ও একটু শাশুড়ির মতো স্বভাব চরিত্র। মেয়েকে ভালোবাসেন, আদর করেন ঠিকই। কিন্তু জন্ম, মৃত্যু,বিয়ে সব তো আল্লাহর হাতে তিনি যার সাথে মেয়ের জোড়া করে রেখেছেন হাজার বিধি-নিয়ম ভেঙে হলেও তার সাথেই বিয়ে হবে।
তুষার বোনের যাওয়ার দিকে চেয়ে থেকে পরক্ষণেই মাকে বলল,
তিতলি কিছু না বলে চলে গেল কেন? আব্বুকে ডাকছে কেন?
আলেয়া শেখ তুষার কে বললেন,
এমনি দেখে নাই যে ডাকছে।
তিতলির কোনোভাবে এই বিয়েতে অমত নেই তো? না হলে সকাল থেকে এমন অদ্ভুত ব্যাবহার করছে কেন?
ফরিদা বানু নাতিকে ধমক দিয়ে বললেন,
ওর অমত, মত দিয়া কি অইবো। সক্কাল থেইকা মন খারাপ কইরা আছে ক্যান জানিস? বিয়া হইবো যে আমাগো ছেড়ে যাইতে অইবো যে তাই।
তুষার কিছু না বলে সদর দরজা দিয়ে বের হওয়ার আগে মাকে বলল,
আমি আমার বন্ধুবান্ধব আশেপাশের আত্মীয় স্বজনদের কার্ড দিতে যায় আম্মু।
আলেয়া শেখ ছেলেকে সাবধানতার হুকুম দিলেন,
আচ্ছা। বাইক সাবধানে চালাবি।
তুষার মায়ের কথা শুনে মাথা দুলিয়ে বাইক নিয়ে চলে গেলো।
.
.
বিকেল তিনটা।
খান বাড়িতে তখন আনন্দে মুখরিত পরিবেশ। চাচাতো, ফুপাতো,মামাতো,খালাতো সহ বড়রা সবাই খুশি হয়েছেন ফারাজের বিয়ের কথা শুনে। ফারাজ খান মনে মনে ভাবে, যার বিয়ে তার খবর নাই পরিবারের আনন্দের শেষ নাই। ইতিমধ্যেই হলুদের একদিন আগেই চাচাতো ভাই বোনেরা এসে হাজির। মনে হয় বিয়ে তার না বরং বাড়ির সবার। বেশ সবাই আনন্দ করুক বরং সে আনন্দ করার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে যার সাথে তার বিয়ে হতে যাচ্ছে তার আগামী দিনগুলো ধূলিসাৎ হতে যাচ্ছে এটা শিওর। বেয়াদব মেয়েটা তাকে চলে কৌশলে অনেক কিছু বুঝাতে চাই। পিচ্চি মেয়েটা ভাবে সে কিছু বুঝে না। এবার সে বুঝাবে তাকে কি বুঝাতে চাই সেটা এক দুই তিন চার করে বুঝাবে।
ফারাজের ভাবনার ভেতরেই ফারাজ খানের চাচাতো ভাই আলভী ফারাজের রুমে আসলো। সেদিন আয়েশার বিয়ের সময় কম কথা শুনাই নাই তাকে। আজ সেও শুনাতে এসেছে। এসেই খোঁচা মেরে বলল,
অবশেষে তাহলে বিয়েটা করতে যাচ্ছিস?
ফারাজ খান নিজের ম্যাকবুকটা বন্ধ করলো। এতক্ষণ একটা জরুরী কাজ করছিলো ম্যাকবুকে।
কাজও শেষ! ঘুরে বসে আলভীর দিকে ফিরলো যুবক। কেমন বাঁকা হেসে ছোট করে বলল,
“হুমম!”
মুখে এটা বলেও যুবক বিড়বিড় করে থামল, “তোর পিচ্চি হবু ভাবির মন ভাঙাতে বিয়ে করছি দেখি আর কত উড়ে, কমতো জ্বালালো না।”
চলবে।
[এটা বোনাস, ২২ পর্ব বড় করে হলুদ, বিয়ে, বাসর পর্ব দিবো।]
Share On:
TAGS: রাগে অনুরাগে, সুহাসিনি ফাতেহা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ১৫(প্রথমঅংশ+দ্বিতীয় অংশ)
-
রাগে অনুরাগে গল্পের লিংক
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৪
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৬(প্রথমঅংশ+শেষাংশ)
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৭(প্রথমঅংশ+শেষাংশ)
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩১ (প্রথম অংশ+শেষাংশ)
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ১৬
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৩
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৯
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩