Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৯


#বাঁধন_রূপের_অধিকারী

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী (২৯)

[••• কোঠরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ•••]

থানার ভেতরে যেন একটা জীবন্ত বোমা ব্লাস্ট হলো। উপস্থিত সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে একদম কপালে উঠে যায়। গোটা জেলার প্রতাপশালী এসপি কিনা এই অদ্ভুত, কাদা মাখা সাধারণ ডেলিভারি গার্লকে বিয়ে করবে। রূপার বুকের ভেতর হূৎস্পন্দন এত দ্রুত আছাড় খাচ্ছে যে মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা এখনি পাঁজরের হাড় ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে। বাঁধন এসব কী আবলতাবল বলছে। এই লোকের মাথাটা কি পুরোই গেছে নাকি। অখিল নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে চোখ গোল গোল করে বলে,

—- “বাঁধন, তুই এসব কী বলছিস? মজা করছিস তাই না?”

বাঁধন রূপার ছটফট করতে থাকা হাতটা আরও শক্ত করে নিজের মুঠোয় চেপে ধরে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে অখিলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,

—- “আই’ম নট জোকিং, অখিল। আই’ম ড্যাম সিরিয়াস।”

ঠিক সেই মুহূর্তে থপ করে একটা ভারী কিছু মেঝেতে পড়ার শব্দ হয়। সবাই চমকে তাকিয়ে দেখে, অখিল সটান ফ্লোরে পড়ে আছে। পড়ে আছে বললে ভুল হবে সে আসলে শক সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। বাঁধনের আর বুঝতে বাকি থাকে না যে এই শালা তার কথা বিশ্বাস করতে না পেরেই সোজা বেহুঁশ হয়ে গেছে। এদিকে রূপার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। যা করার তাকে এখনি করতে হবে, এই পাগলের হাত থেকে এই মুহূর্তেই পালাতে না পারলে আজই তার জীবনের এপিটাফ লেখা হয়ে যাবে। হঠাৎ করেই চরম বিপদে তার মাথায় এক দুর্দান্ত বুদ্ধি খেলে যায়। কোনো কিছু না ভেবে, সে মুহূর্তের মধ্যে বাঁধনের শক্ত হাতের ওপর নিজের পুরো শক্তি দিয়ে সজোরে কামড় বসিয়ে দেয়।

—- “আহহ্।”

তীব্র ব্যথায় এক ঝটকায় চিৎকার দিয়ে রূপার হাতটা ছেড়ে দেয় বাঁধন। আর সেই সুযোগটা লুফে নিয়ে রূপা এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে বাইরের দিকে দিল এক দৌড়। ডেলিভারি গার্লকে এভাবে পালাতে দেখে কয়েকজন পুলিশ সদস্য যেই না তার পেছন পেছন তাকে ধরতে যাবে, অমনি বাঁধন নিজের হাতটা চেপে ধরে কড়া গলায় তাদের থামিয়ে দিয়ে বলে,

—- “থামো। ওকে যেতে দাও।”

বাঁধনের সরাসরি আদেশে পুলিশগুলো আর এক কদমও না বাড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ওদিকে কয়েকজন মিলে অখিলকে ধরাধরি করে চেয়ারে বসিয়ে মুখে-চোখে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাঁধন ধীর পায়ে নিজের ক্ষতবিশ্লিষ্ট হাতটার দিকে তাকায়। কাদার ছাপের মাঝেই সেখানে গুনে গুনে তিন-চারটে দাঁত বসে গেছে, চামড়া কেটে টকটকে লাল রক্তের রেখা দেখা দিচ্ছে। নিজের হাতের সেই কামড়ের দাগটার দিকে تাকাতেই হুট করে বাঁধনের মনের ভেতর সেই গভীর জঙ্গলের স্মৃতিটা ভেসে ওঠে। সেদিনও ঠিক এই একইভাবে রূপা তার ঘাড়ে কামড় দিয়ে পালিয়েছিল। ক্ষতস্থানটা বুড়ো আঙুল দিয়ে চেপে ধরে বাঁধন নিজের হাতটা শক্ত করে মুঠো করে। তারপর বাইরে রূপার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলে,

—- “স্টুপিড একটা। তোকে তো আমি দেখে ছাড়ব।”

______________

অন্য দিকে আরেক জ্বালা শুরু হয়েছে বৃষ্টির। রাস্তায় ফুল বিক্রি করেও সে শান্তিতে নেই। প্রতিদিন যখনই সে সাকিন ভাইয়ের দোকানের সামনে আসে, এই আকাশ নামের লোকটা ঠিক বাইক নিয়ে হাজির হয়। তারপর বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে এক অদ্ভুত, গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে যেন বৃষ্টিকে খুব কড়া পাহারায় রেখেছে সে। আকাশের এই রহস্যময় আচরণ বৃষ্টি কিছুতেই মাথায় ঢুকিয়ে উঠতে পারছে না। লোকটা এভাবে কেন সারাক্ষণ তাকে নজরে নজরে রাখে। কোনোভাবে কি সে তাকে চিনে ফেলেছে। কিন্তু চিনবেই বা কীভাবে, চেনার মতো কোনো অবস্থাই তো বৃষ্টি রাখেনি। সে সবসময় মুখে মাস্ক পরে একদম নিখুঁত মেকাপে ঢাকা থাকে, তাই চেনার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আর যদি চিনেও থাকে, তবে এভাবে স্রেফ দাঁড়িয়ে থাকে কেন। কে হয় সে যে তাকে এভাবে পাহারা দেবে। ভেবে কোনো কূল-কিনারা পায় না বৃষ্টি। শেষমেশ সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, আজ লোকটা আসলে নিজেই জিজ্ঞেস করে বসবে যে আসল সমস্যাটা কী। এই ভেবে সে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে কাস্টমারদের সাথে কথা বলতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর, প্রতিদিনের অভ্যাসমতো আজও আকাশ বাইক নিয়ে এসে থামে। কিন্তু আজ সে একা নয়, সাথে একটা মেয়ে তার বাইকের পেছনে বসে আছে। হুট করে আকাশকে অন্য একটা মেয়ের সাথে এভাবে দেখে বৃষ্টির কলিজাটা যেন আচমকা এক মোচড় দিয়ে ওঠে। বুকের ঠিক ভেতরটায় একটা হালকা চিনচিন করা তীব্র ব্যথা অনুভব করে সে। কিন্তু এমন কেন হচ্ছে, তার নিজের কাছেই সেই উত্তর নেই। তার এই এলোমেলো ভাবনার মাঝেই আকাশ আর ওই মেয়েটা একদম ফুলের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়। মেয়েটা খিলখিল করে হেসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,

—- “আকাশ, কোন ফুলটা নেব বলো না?”

আকাশ আলতো করে নিজের নজরটা ঘোরায়। সে সোজা তাকায় মাস্ক পরা বৃষ্টির চোখের দিকে। বৃষ্টিও ঠিক ওই মুহূর্তে তাকায় আকাশের দিকে। দুজনের চোখাচোখি হতেই বৃষ্টি এক তীব্র অস্বস্তিতে দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয়। আকাশ নিজের দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে মেয়েটার দিকে চেয়ে শান্ত গলায় বলে,

—- “নাও, তোমার যেটা ভালো লাগে।”

মেয়েটা অদ্ভুতভাবে গাল ফুলিয়ে বেশ আদুরে গলায় আবদার করে,

—- “তুমি একটু পছন্দ করে দাও না, প্লিজ প্লিজ।”

আকাশ আর কথা না বাড়িয়ে ধীর চোখে দোকানের ফুলগুলোর ওপর দৃষ্টি বুলায়। বৃষ্টি তখন নিজের ভেতরের অস্থিরতা লুকাতে একটা বড় সূর্যমুখী ফুল বালতি থেকে তুলে গুছিয়ে রাখছিল। ঠিক তখনই আকাশ কিছুটা ঝুঁকে, এক ঝটকায় ছোঁ মেরে বৃষ্টির হাতের সেই সূর্যমুখী ফুলটা কেড়ে নেয়। তারপর বৃষ্টির চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলে,

—- “ফুলটা কেমন হবে, আপু?”

বুকের ভেতরটা কেমন যেন ছটফট করতে থাকে বৃষ্টির। আকাশকে অন্য কারও এত কাছাকাছি দেখে তার এক অদ্ভুত, অবাধ্য কষ্ট হচ্ছে। তবুও সবটা কষ্ট নিজের ভেতরে চেপে নিয়ে, নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে একটা হালকা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলে,

—- “জ্বি স্যার, অনেক সুন্দর। ম্যামকে দিতে পারেন এটা।”

আকাশ কোনো দ্বিধা না করে সূর্যমুখী ফুলটা সোজা মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

—- “নাও।”

মেয়েটা খুশিতে একদম আত্মহারা হয়ে যায়। ফুলটা হাতে নিয়েই সে বৃষ্টিকে অবাক করে দিয়ে রাস্তার মধ্যেই সটান আকাশকে জড়িয়ে ধরে। জড়িয়ে ধরেই আহ্লাদী গলায় বলে,

—- “থ্যাংক ইউ। থ্যাংক ইউ সো মাচ।”

ওদের এই দৃশ্য দেখে মুহূর্তের মধ্যে বৃষ্টির দুই হাত শক্ত মুষ্টি হয়ে আসে। তীব্র এক হিংসায় যেন তার সারা শরীর জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যেতে থাকে। বাবার একমাত্র আদুরে মেয়ে সে, এত বড় জ্বলন্ত কষ্ট সহ্য করার মতো কোনো ক্ষমতা বৃষ্টির নেই। নিজের ভেতরের সেই অবাধ্য ক্ষোভ আর হিংসা কিছুতেই সামলাতে না পেরে, সে সজোরে সামনে থাকা একটা সূর্যমুখী ফুলের বালতিতে লাথি বসিয়ে দেয়। লাথি লাগার সাথে সাথে বড় বালতিটা নড়েচড়ে উঠে ঠাসস করে মাঝরাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়ে। নিমেষের মধ্যে বালতিতে থাকা সুন্দর সুন্দর সব সূর্যমুখী ফুল ধুলোবালির রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। হঠাৎ এই বিকট শব্দে মেয়েটা তড়িৎ গতিতে আকাশকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আকাশও চমকে উঠে রাস্তায় পড়ে থাকা বালতি আর ফুলগুলোর দিকে এক পলক তাকায়। সহসা নিজের তীক্ষ্ণ নজরটা বৃষ্টির দিকে ঘুরিয়ে বেশ অবাক হওয়ার ভান করে জিজ্ঞেস করে,

—- “কী হয়েছে আপু? আপনি এভাবে বালতিতে লাথি দিলেন কেন?”

আকাশের মুখে এই নির্লজ্জ প্রশ্ন শুনে বৃষ্টি রাগে নিজের জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থায় চলে গেছে। সব ভয়ডর ভুলে সে সোজা আকাশের চোখের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,

—- “বালতিতে লাথি না দিয়ে আপনার বুকে লাথি দেওয়া উচিত ছিল। চিটার একটা। ফ্লার্টবাজ একটা।”

বলেই বৃষ্টি আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ায় না। হনহন করে দোকানের ভেতরের দিকে এসে নিজের ব্যাগটা তুলে নেয় এবং সাকিনের উদ্দেশ্যে বলে,

—- “ভাইয়া, আমি বাসায় যাচ্ছি। শরীরটা বড্ড খারাপ লাগছে আমার।”

সাকিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই বৃষ্টি দোকান থেকে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে পড়ে। মনের ভেতরের ক্ষোভে মেশিনের মতো পা চালিয়ে সে দ্রুত রাস্তার মোড়ে চলে আসে এবং একটা ফাঁকা রিকশা ডেকে ঝটপট উঠে পড়ে। রিকশা চলতে শুরু করতেই এতক্ষণের চেপে রাখা বাঁধভাঙা চোখের পানি টপটপ করে গাল বেয়ে ঝরতে থাকে। বৃষ্টি নিজের ওড়না দিয়ে মুখটা আড়াল করে ফুঁপিয়ে ওঠে। কেন হচ্ছে তার সাথে এমন। সে নিজেও তো এই ধাঁধার কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। ওই হিটলার আকাশটাকে অন্য কোনো মেয়ের পাশে দেখে তার বুকের ভেতরটা এভাবে দুমড়ে-মুচড়ে উঠছে কেন। কেন এত রাগ হচ্ছে তার। সে নিজেই নিজের মনের এই অদ্ভুত চঞ্চলতা কিছুতেই ভেবে পায় না।

_____________

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই দোকান থেকেই কোনোমতে ভালো করে গোসল করে, একদম পরিষ্কার হয়ে বাড়ি ফেরে রূপা। কাদার সেই ভূতুরে রূপ ধুয়েমুছে সে এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই রূপা দেখে আহসান রহমান, আতিক রহমান আর হাজি রহমান একসাথে সোফায় বসে বেশ গম্ভীর মুখে কিছু একটা নিয়ে আলোচনা করছেন। আহসান রহমানকে সচরাচর এত তাড়াতাড়ি বাড়িতে দেখা যায় না; আজ তাকে অসময়ে ড্রয়িংরুমে বসে থাকতে দেখে রূপা বেশ অবাক হয়। সে পা টিপে টিপে চুপচাপ তাদের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। আহসান রহমান রূপাকে ভেতরে ঢুকতে দেখেই মুখ তুলে চাইলেন এবং স্নেহভরে বললেন,

—- “এসেছ মা? যাও, জলদি গিয়ে একটু রেডি হয়ে নাও। বৃষ্টি হয়তো এতক্ষণে রেডি হয়েই গেছে।”

রূপা নিজের বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করে,

—- “কেন বাবা? কোথাও যাচ্ছি আমরা?”

আহসান রহমান বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে শুধু বললেন,

—- “হ্যাঁ মা, এখন আর কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট কোরো না, যাও।”

রূপা আর কোনো প্রশ্ন না করে মাথা নাড়িয়ে চুপচাপ নিজের ঘরের দিকে চলে আসে। রুমে ঢুকতেই সে দেখে, বৃষ্টি আসলেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে রেডি হচ্ছে। আয়নার প্রতিবিম্বে রূপাকে ঘরে ঢুকতে দেখে বৃষ্টি মুখ না ঘুরিয়েই বলে ওঠে,

—- “এসেছিস? জলদি রেডি হয়ে নে।”

রূপা টেবিল থেকে ক্যান্ডিকে কোলে তুলে নেয়। তারপর বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,

—- “হঠাৎ এভাবে রেডি হতে বলছিস কেন? কোথায় যাচ্ছি আমরা?”

বৃষ্টি চোখের কোণে আলতো করে কাজল পরতে পরতে जवाब দেয়,

—- “আমি নিজেও জানি না রে। আঙ্কেল হুট করে বাইরে থেকে এসেই বললেন ঝটপট রেডি হতে। তোর কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, তাই আমি বানিয়ে বললাম তুই এখনো কলেজেই আছিস। আর আমার শরীরটা খারাপ লাগছিল বলে আমি একটু আগেই চলে এসেছি।”

বৃষ্টির কথা শুনে রূপার ঠোঁটের কোণে একটা চতুর হাসি ফুটে ওঠে। সে ক্যান্ডির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,

—- “ওহ, এই জন্যেই তোকে আজকে আমি আসার সময় রাস্তার মোড়ে দেখতে পাইনি।”

বৃষ্টি কাজলের দানিটা টেবিলে নামিয়ে রেখে রূপার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাড়া দেয়,

—- “এখন আর এসব ফালতু কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করিস না তো, জলদি রেডি হ।”

রূপা আর কথা না বাড়িয়ে ওয়ার্ডরোব থেকে তার খুব পছন্দের একটা শারারা স্যুট জামা বের করে নিয়ে দ্রুত পরে নেয়। জামাটি এক অদ্ভুত সুন্দর ম্যাজেন্টা পিঙ্ক বা মিষ্টি গোলাপি রঙের। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা এই কুর্তাটির গলা থেকে শুরু করে সারা বুকে রূপালী সুতো, জরি আর সিকুইনের নিখুঁত কারুকাজ করা, যা কৃত্রিম আলোয় হালকা ঝিলমিল করে উঠছে। কুর্তার হাতা এবং নিচের চওড়া বর্ডারেও রয়েছে একই রকম ভারী কাজের চওড়া লেস। এই কুর্তার নিচে সে পরেছে ঘেরওয়ালা চমৎকার এক শারারা প্লাজো। ধবধবে অফ-হোয়াইট রঙের এই শারারাটি নিচে নামার সাথে সাথে স্কার্টের মতো চওড়া হয়ে নিচে নেমে গেছে, যার একদম শেষপ্রান্ত জুড়ে কুর্তার সাথে ম্যাচিং করা গোলাপি রঙের সূক্ষ্ম সুতোর পাড় বসানো। কাঁধের একপাশ দিয়ে রূপা ওড়নাটি ঝুলিয়ে নিয়েছে, সেটিও অফ-হোয়াইট রঙের একদম পাতলা নেটের, যার চারদিকের বর্ডারে গোলাপি রঙের পটি দেওয়া। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পায়ে গলিয়ে নিল এক জোড়া ধবধবে সাদা রঙের আরামদায়ক ও ট্রেন্ডি স্ট্র্যাপ হিল জুতো, যা তার এই ট্র্যাডিশনাল লুকের সাথে একদম পারফেক্টলি মানিয়ে গেছে। মুখে হালকা মেকআপ করে নেয়, ঠোঁটে হালকা খয়েরী রঙের লিপস্টিক দেয়। তারপর সে ড্রেসিং টেবিল থেকে কানের দুল বের করতে গেল, ঠিক তখনই তার সাজিয়ে রাখা ডজন ডজন চুড়ির মাঝে তার চোখ গেল। সবুজ, কালো, হলুদ চুড়ির মাঝখানে চিকচিক করছে এক ডজন সাদা পাথরের চুড়ি। চুড়িগুলো দেখেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে রূপার। এই চুড়িগুলোই বাঁধন তাকে দিয়েছিল, যা কখনো পরা হয়নি। কী মনে করে একটু হেসে রূপা চুড়িগুলো বের করে ফেলে, সাথে বাঁধনের দেওয়া পাথরের সেই ব্যান্ডটাও বের করে নেয়। এক জোড়া সাদা ঝুমকো কানের দুল বের করে দ্রুত সেগুলো শরীরে জড়িয়ে নেয়। সব শেষে চুলগুলো ছেড়ে ব্রাশ করে দেয় উন্মুক্ত চুলগুলো একদম হাঁটুতে গিয়ে ঠেকে। বৃষ্টি এতক্ষণ বসে চুপচাপ ফোন স্ক্রল করছিল, হঠাৎ সামনে চোখ যেতেই রূপাকে দেখে সে এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়ে,

—- “রূপাহহহহহহহ।”

রূপা চমকে পেছনে তাকায়। সে অবাক হয়ে বলে,

—- “কী হয়েছে, এভাবে চিৎকার দিলি কেন?”

বৃষ্টি রূপার কাছে এসে তার পুরো ড্রেসটা খুঁটিয়ে দেখে উচ্ছ্বসিত গলায় বলে,

—- “ওয়াও। বিশ্বাস করবি না, জাস্ট অসাধারণ লাগছে তোকে।”

রূপা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলে,

—- “তোকেও খুব সুন্দর লাগছে।”

—- “চল, একটা সেলফি হয়ে যাক।”

দুজনে মিলে অনেক রকম স্টাইল করে বেশ কিছু ছবি তুলে নেয়। সব শেষে সাজগোজের পর্ব চুকিয়ে বৃষ্টি আর রূপা ঘর থেকে বের হয়। ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখে, শান্তা অলরেডি রেডি হয়ে বেশ ভাব নিয়ে নিজের ছবি তুলছে। হুট করে শান্তার চোখ পড়ে রূপার দিকে। এক পলক রূপার ওই অনিন্দ্য সুন্দর রূপের দিকে তাকিয়েই সে কেমন যেন হিংসায় মুখটা মচকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলে। শান্তার এই অদ্ভুত কাণ্ড রূপার চোখ এড়ায় না। আজ বেশ কয়েকদিন ধরেই সে লক্ষ্য করছে শান্তা তার সাথে ঠিকঠাক কথা বলছে না, কেমন যেন একটা খিটખીটে ব্যবহার করছে। রূপা কিছুতেই মাথা মুণ্ডু বুঝতে পারছে না যে শান্তা হঠাৎ কেন তার সাথে এমন আচরণ করছে। ওদিকে শান্তা নিজের তোলা ভালো ভালো ছবিগুলো বেছে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাঁধনের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেয়। সাথে সাথেই বেশ আহ্লাট করে মেসেজ লিখে পাঠায়,

—- “কেমন্ লাগছে আমাকে ভাইয়া?”

ওপাশ থেকে কোনো রিপ্লাই নেই। শান্তা এর আগেও অনেকগুলো মেসেজ দিয়েছে বাঁধনের হোয়াটসঅ্যাপে, কিন্তু বাঁধন একটা টেক্সটেরও জবাব দেয়নি। মেসেজগুলো ওভাবেই পড়ে থাকতে দেখে শান্তার মনে মনে ভীষণ রাগ হলো। মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল একটু দেখলে বা একটা রিপ্লাই দিলে এমন কী ক্ষতি হয়। রূপা কিছুটা এগিয়ে আসলো শান্তার কাছে। শান্তার দিকে তাকিয়ে খুব মিষ্টি করে বলে,

—- “আপু, তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে।”

শান্তা প্রচণ্ড বিরক্তিতে রূপার দিকে এক পলক তাকিয়ে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলে,

—- “থ্যাঙ্ক ইউ।”

বলেই শান্তা আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে বাইরের উদ্দেশ্যে চলে যায়। রূপা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এরপর আহসান রহমান রূপা, শান্তা আর বৃষ্টিকে সাথে নিয়ে গাড়িতে করে বেরিয়ে পড়েন।

____________

রাত নয়টার দিকে বাঁধন বাড়ি ফেরে। শরীরটা তার ভীষণ ক্লান্ত। থানায় একজন পুলিশ সদস্যের বার্থডে ছিল, সেই বার্থডের চেঁচামেচি আর হট্টগোলে মাথাটা একদম ধরে গেছে তার। সে আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি এসে পনেরো মিনিট শাওয়ার নিয়ে একটা নেভি ব্লু রঙের টি-শার্ট আর সাদা ট্রাউজার পরে নেয়। তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে সে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। হঠাৎ করেই সে অনুভব করে, পুরো বাড়িটা কেমন জানি অতিরিক্ত নীরব লাগছে। সে কী ভেবে জানি চুল মুছতে মুছতেই ধীর পায়ে রূপার রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। হালকা করে দরজায় নক করতেই লক না থাকায় দরজাটা একটুখানি খুলে যায়। সে ভেতরে তাকিয়ে দেখে পুরো রুম ফাঁকা। রুমের ভেতরে পা রেখে চারদিকে তাকাতে তাকাতে ডাকতে শুরু করে বাঁধন,

—- “রূপ,রূপ,রূপ।”

পরপর তিনটা ডাক দেয় সে, কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে সে নিচে নেমে আসে। ড্রয়িংরুমে এসে দেখে সোফায় বসে শিল্পী রহমান মন দিয়ে টিভি দেখছেন। বাঁধন শিল্পী রহমানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,

—- “কাকিয়া, রূপ কোথায়?”

শিল্পী রহমান টিভির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বলেন,

—- “তোর বাবা আর কাকা মিলে রূপা, শান্তা আর বৃষ্টিকে নিয়ে ওদের এক অফিস ক্লায়েন্টের মেয়ের বার্থডে পার্টিতে গিয়েছে। তুই বস, কফি বানাব তোর জন্য?”

বাঁধন কফির কথা কানে না তুলে গম্ভীর মুখে বলে,

—- “কখন গিয়েছে?”

শিল্পী রহমান বলেন,

—- “সন্ধ্যায় গিয়েছে। চলে আসবে হয়তো এখনই।”

—- “ওহ।”

সংক্ষিপ্ত বাক্যটুকু উচ্চারণ করেই বাঁধন হনহন করে নিজের রুমে চলে আসে। কোনো কিছুই ভালো লাগছে না তার। তার রূপ বার্থডে পার্টিতে গিয়েছে। কেমন সেজেগুজে গিয়েছে তাও সে জানে না, এমনকি তাকে একটা বার বলেও যায়নি। এত বড় সাহস হয়ে গেছে মেয়েটার। রাগে আর অস্থিরতায় সে নিজের ঘরের দেওয়ালে সজোরে একটা ঘুষি মেরে বিড়বিড় করে বলে,

—- “বাড়ি আয় খালি, তারপর দেখাচ্ছি।”

_______________

রাত দশটার দিকে আহসান রহমান তার মেয়েদের নিয়ে বাড়ি ফেরেন। জার্নি আর পার্টির ধকল শেষে সবাই তখন খুব ক্লান্ত। বাড়ি ফিরেই বৃষ্টি সোজা এসে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। ওদিকে রূপার মনটা কেমন যেন অস্থির লাগছিল, কোনো কিছুই ভালো লাগছিল না তার। তাই জামাকাপড় চেঞ্জ না করেই সে আদরের খরগোশ ক্যান্ডিকে কোলে তুলে নিয়ে একাকী ছাদে চলে আসে। কিছুক্ষণ ছাদের হালকা ঠান্ডা বাতাস গায়ে মেখে মনটা কিছুটা হালকা করার চেষ্টা করে সে। তারপর ধীর পায়ে নিচে নামার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সিঁড়ির কয়েক ধাপ নামতেই রূপার চোখ চলে যায় নিচের করিডোরের দিকে। বাঁধন ফোনে কথা বলতে বলতে সেই করিডোর দিয়ে এগিয়ে আসছে। রূপা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাঁধনের চোখ পড়ে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা রূপার ওপর। মুহূর্তেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে যায়। রূপাকে এই রূপে দেখে বাঁধনের বুকের বাম পাশটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য ধক করে ওঠে, নিজের অজান্তেই হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে শুরু করে। ম্যাজেন্টা পিঙ্ক আর হালকা মিষ্টি রঙের চমৎকার শারারা স্যুট, তার ওপর লম্বা কালো চুলগুলো বাতাসে কিছুটা এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে রূপার গায়ে। আর সবচেয়ে বড় কথা, রূপার মাথায় জ্বলজ্বল করছে তার নিজের দেওয়া পাথরের ব্যান্ডটি। ফোনের ওপাশে অখিল অনবরত ‘হ্যালো হ্যালো’ করে চিৎকার করে যাচ্ছে, কিন্তু সেই চেনা কণ্ঠের একটা কথাও এখন আর বাঁধনের কানে ঢুকছে না। সে তীব্র এক ঘোরের মধ্যে শুধু রূপার দিকেই তাকিয়ে আছে। ওদিকে হুট করে বাঁধনকে এভাবে সামনে দেখে রূপার সারা শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়, ভয়ে হাত-পা একদম ঠান্ডা হয়ে আসে তার। মনের ভেতর একটাই তীব্র আতঙ্ক আজ থানায় সেই কাদা মাখা মেয়েটার রূপে বাঁধন তাকে চিনে ফেলেনি তো। সে স্পষ্ট খেয়াল করে, বাঁধন একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কিন্তু এভাবে তাকিয়ে থাকার কারণ কী। হঠাৎ করেই রূপার মনে পড়ে যায়, সে আজ বাঁধনের দেওয়া জিনিসগুলোই পরে আছে। মাথায় সেই ব্যান্ড আর হাতে এক ডজন সাদা পাথরের চুড়ি। টের পাওয়ার সাথে সাথে সে চরম আতঙ্কে নিজের বাম হাতটা ঝটপট পিঠের পেছনে লুকিয়ে ফেলে। আর ডান হাত দিয়ে কাঁধের কাছে ক্যান্ডিকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে কাঁপতে কাঁপতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। করিডোরে পা রাখতেই সে একদম বাঁধনের মুখোমুখি হয়ে যায়। রূপা একদম সামনে আসতেই বাঁধনের ঘোর কাটে। সে ফোনের ওপাশে থাকা অখিলকে দ্রুত বলে,

—- “অখিল, আমি একটু পরে কল করছি।”

বলেই সে ফোনটা কেটে পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। তারপর দুই হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে বেশ গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। রূপা ভয়ে নিজের মাথাটা একদম নিচু করে ফেলে। বাঁধন তীক্ষ্ণ নজরে রূপার দিকে তাকিয়ে থমথমে গলায় বলে,

—- “আমি তোকে নিষেধ করেছিলাম না হিজাব ছাড়া বাইরে বের হতে?”

কথাটা শুনে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো শিউরে ওঠে রূপা। কী উত্তর দেবে সে, মাথা যেন কিচ্ছু কাজ করছে না। বাঁধন তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর আরও শক্ত করে আবার বলে,

—- “আমি এক কথা দুবার বলতে পছন্দ করি না রূপ।”

বাঁধনের সেই ধারালো কণ্ঠ শুনে রূপার বুকটা ভয়ে দুরুদুরু কাঁপতে থাকে। এখন কী বলবে সে। কেন সে এত সেজেগুজে হিজাব ছাড়া বাইরে গিয়েছিল। নিজের ভেতরের চরম ভয়টা চেপে কোনো রকমে কাঁপতে কাঁপতে রূপা বলে,

—- “আসলে, আসলে, ওই ওই ভাইয়া, আমি আমি।”

রূপার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাঁধন প্রচণ্ড রেগে একদম চেঁচিয়ে ওঠে,

—- “তোতলাচ্ছিস কেন? ভালো করে বলতে পারিস না।”

বাঁধনের এই হুঙ্কারে রূপা ভয়ে নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে। আর কোনো উপায় না পেয়ে এবার এক নিঃশ্বাসে সত্যিটা বলেই দেয়,

—- “সাজতে খুব ভালো লাগে, তাই সেজে গিয়েছি।”

কথাটা রূপার মুখ থেকে বের হওয়া মাত্রই মুহূর্তের মধ্যে বাঁধন তীব্র ক্ষোভে ‘ঠাসস’ করে একটা প্রচণ্ড চড় বসিয়ে দেয় রূপার ফর্সা গালে। থাপ্পড়ের সেই বিকট শব্দে পুরো করিডোর যেন এক লোমহর্ষক আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। রূপার কোল থেকে ক্যান্ডিটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে যায়। গালে হাত দিয়ে রূপা অনেক কষ্টে নিজের চোখের জল আর কান্না আটকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। চড়ের চোটে তার ফর্সা গালটা মুহূর্তেই একদম লাল হয়ে ওঠে। বাঁধন রাগে কাঁপতে কাঁপতে তেজি গলায় বলে,

—- “সেজে কী দেখাতে চাস? বাহিরের ছেলেদের নিজের রূপ দেখাতে চাস। তোর সাহস কী করে হয় আমার নিষেধের পরও হিজাব ছাড়া বাইরে যাওয়ার।”

রূপা আর নিজেকে সামলাতে পারে না, তার শরীর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। সে মাথা নিচু করেই আকুল গলায় কাঁদতে কাঁদতে বলে,

—- “সরি বাঁধন ভাইয়া, আর হবে না আমি কথা দিচ্ছি আর কখনো আপনার কথা অমান্য করব না। আজকের মতো মাফ করে দিন, প্লিজ।”

চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে নিজের তপ্ত ওষ্ঠ জোড়া কামড়ে ধরে বাঁধন। এই মেয়েটা কাঁদলে তার বুকের গভীর কোনো এক কোণে অদ্ভুত, এক আদিম নেশা চড়ে বসে। রূপার কান্নার এই ব্যাকুলতা সে সহ্য করতে না পারে না, মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চরম দুর্বল হয়ে পড়ে সে। বাঁধনকে চোখ বন্ধ করে থাকতে দেখে রূপা কাঁপতে কাঁপতে নিচু হয়ে মেঝে থেকে ছটফটে ক্যান্ডিকে কুড়িয়ে নিজের বুকের কাছে তুলে নেয়। ঠিক তখনই ঝট করে চোখ খোলে বাঁধন। তার তীক্ষ্ণ শিকারী নজর এড়ায় না যে রূপা অতি সাবধানে তার বাম হাতটা নিজের পিঠের পেছনে লুকিয়ে রেখেছে। এক জোড়া ঘন ভ্রু কুঁচকে, সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে বাঁধন,

—- “হাতটা ওইভাবে পিছনে রেখেছিস কেন?”

রূপা তখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ভেজা চোখে, ভাঙা গলায় বলে,

—- “কিছু না এমনি ভাইয়া।”

বাঁধন এক কদম এগিয়ে আসে। তার চওড়া বুকের পুরুষালি সুবাস আর গায়ের তাপে করিডোরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সে গম্ভীর, থমথমে গলায় বলে,

—- “কিছু না তো ওইভাবে লুকিয়ে রেখেছিস কেন? দ্বিতীয়বার থাপ্পড় খেতে না চাইলে ভালোই ভালোই হাতটা সামনে বের কর। কী লুকিয়ে রেখেছিস আমার থেকে।”

আবারও চড় খাওয়ার ভয়ে পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে রূপার। আর কোনো উপায় না পেয়ে সে নিজের বাম হাতটা ধীর পায়ে সামনে নিয়ে এসে বাঁধনের দিকে বাড়িয়ে দেয়। ডান হাতে ক্যান্ডিকে নিজের বুকের নরম ভাঁজে শক্ত করে চেপে ধরে ভয়ে মাথা নিচু রেখেই কোনোমতে বলে,

—- “আপনার দেওয়া চুড়িগুলোই পরেছি যদি দেখে বকা দেন, তাই লুকিয়ে রেখেছিলাম।”

নিজের শক্ত ঘাড়টা কিছুটা নিচু করে রূপার ফর্সা, মসৃণ হাতের কবজির দিকে তাকায় বাঁধন। করিডোরের মৃদু আলোয় রূপার দুধে-আলতা ত্বকের ওপর সাদা পাথরের চুড়িগুলো ঠিক যেন খাঁটি মুক্তোর মতো চিকচিক করছে। রূপার ফর্সা ত্বকের ছোঁয়া পেয়ে চুড়িগুলোর সৌন্দর্য যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির, অতি সূক্ষ্ম বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে বাঁধনের। কিন্তু পরপরই রূপার ফুঁপিয়ে কাঁদার সেই চাতক সুর তার কানে এসে ধাক্কা দেয়। সে ফের তার গভীর, নেশাতুর চোখ জোড়া তুলে তাকায় রূপার মুখের দিকে। কাঁদতে কাঁদতে নিজের গাল দুটোকে একদম রক্তিম লাল করে ফেলেছে মেয়েটা। বাঁধন বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করেছে এই মেয়েটা একটু কাঁদলেই, বা তার গায়ের চামড়ায় সামান্য আঘাত লাগলেই অল্পতেই গাল দুটো এমন টকটকে লাল হয়ে যায়। চোখের জলে ভেজা সেই লালচে গাল আর কাঁপতে থাকা ওষ্ঠাধর দেখে বাঁধনের বুকের ভেতর এক তীব্র ঝড় বয়ে যায়। কী অনিন্দ্য সুন্দর, কী মারাত্মক মাদকতা এই রূপের মাঝে। দুই হাত পকেট থেকে বেরিয়ে আসে বাঁধনের। তার প্রতিটি শিরা-উপশিরায় এক অবাধ্য আদিম ইচ্ছে চাড়া দিয়ে উঠছে। রূপার এই অবাধ্য কান্না, তার ফর্সা শরীরের কাঁপুনি আর ঠোঁটের কোণের রক্তাভ আভা দেখে বাঁধনের অবদমিত পুরুষালি মন তীব্রভাবে ব্যাকুল হয়ে ওঠে অন্য কিছু করতে, রূপাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিতে। নিজেকে আর কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারে না বাঁধন। এক তীব্র, হিংস্র ঝটকায় রূপার নরম হাতটা ধরে নিজের দিকে টেনে আনে। আকস্মিক টানে শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে সোজা পাথরের মতো শক্ত, চওড়া বুকে আছড়ে পড়ে রূপা। বাঁধনের বলিষ্ঠ স্পর্শে রেশমি শরীরে বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো এক তীব্র কাঁপন ঝিলিক দিয়ে ওঠে। পুরুষটির গায়ের কড়া সুবাস, তামাক আর ঘামের এক অদ্ভুত মাদকতা নাসিকারন্ধ্র দিয়ে মগজে পৌঁছানো মাত্রই নিস্তেজ হতে শুরু করে পুরো শরীর। পায়ের তলার মাটি হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়, অবশ হয়ে আসা শরীরটা আর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না রূপার; সে আরও জবুথবু হয়ে চওড়া বক্ষে লেপ্টে যায়। হাত-পা নিস্প্রাণ হয়ে আসে এক অদ্ভুত সম্মোহনে। অত্যন্ত যত্ন করে, নিজের খসখসে বুড়ো আঙুল দিয়ে রূপার চোখের নোনা জলটুকু মুছে দেয় বাঁধন। শক্ত আঙুলের ছোঁয়া গালে লেপ্টে থাকা কান্নাকে আরও গাঢ় করে তোলে। ঠিক কানের কাছে নিজের তপ্ত ঠোঁট জোড়া ঠেকিয়ে বেশ নিচু, ভারী, পাথরের মতো শক্ত গলায় বলে বাঁধন,

—- “আই ডো’ন্ট ওয়ান্ট টু হার্ট ইউ রূপ। তোকে আঘাত করার কোনো ইচ্ছে আমার থাকে না। কিন্তু তুই প্রতিবার তোর এই অবাধ্যতা দিয়ে আমাকে বাধ্য করিস। যার জন্য নিজের অজান্তেই তোকে এভাবে হার্ট করে ফেলি।”

তেজি পুরুষটির গূঢ় কথার অন্তর্নিহিত মানে কিছুই বুঝতে পারে না রূপা। ডরভরা, মায়াবী বাদামি চোখ জোড়া মেলে নিষ্পাপ, তীব্র আতঙ্কে তাকিয়ে থাকে। নিজের শক্ত বাম হাত দিয়ে রূপার সরু, মেদহীন কোমরটা খামচে ধরে আরও ওপরে তুলে নিজের পেশিবহুল শরীরের সাথে লেপ্টে নেয় বাঁধন। রূপার বুকের দ্রুত ওঠানামা আর শরীরের প্রতিটি ভাঁজ চওড়া বক্ষপটের সাথে পিষে যাচ্ছে। নিজের হাড়-মাংসের সাথে মেয়েটিকে যেন পিষে মিশিয়ে ফেলতে চায়। কাঁপতে থাকা রক্তাভ ঠোঁটের ঠিক এক ইঞ্চি দূরত্বে নিজের ওষ্ঠাধর রেখে, চোখে তীব্র জেদ আর আদিম অধিকারবোধ ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলে বাঁধন,

—- “লিসেন টু মি ভেরি কেয়ারফুলি বেবি। যে রূপের আগুনে আমি দিনরাত পুড়ছি, অন্য কোনো ব্লাডি পারসনকে সেখানে চোখও সেঁকতে দেবো না আমি। দিস বিউটি ইজ মাইন, ওনলি মাইন। এই রূপের প্রতিটা কোনা, প্রতিটা ভাঁজের একান্ত মালিক শুধু আমি। আমার আখি নয়ন ছাড়া অন্য কেউ তোকে এই নজরে দেখার সাহসও করবে না। প্রাণ খুলে তোর ফর্সা শরীরের প্রশংসা করার অধিকারটা শুধু আমার। আমার জিনিস অন্য কেউ ছুঁয়ে দেখা তো দূরের কথা, যে এই রূপের দিকে চোখ তুলে তাকাবে, আই সোয়্যার’ নিজের এই হাত দিয়ে তার চোখ দুটো আমি টেনে তুলে ফেলব।”

ওষ্ঠ জোড়া হা হয়ে আসে রমণীর। বড় বড় হয়ে যায় ডরভরা চোখ জোড়া। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না এই পুরুষের তীব্র আচরণ। এমন থমথমে পরিস্থিতির মাঝেই কোল থেকে ছটফট করে লাফিয়ে মেঝেতে নেমে পড়ে ক্যান্ডি, তারপর দূরে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। পুরুষটি আদিম চোখ জোড়া স্থির করে তাকিয়ে থাকে রমণীর হা হয়ে থাকা ওষ্ঠ জোড়ার দিকে। ভয়ে আর আবেশে তিরতির করে কাঁপছে ওষ্ঠাধর। পুরুষের ভেতরে তীব্র, ইচ্ছে চাড়া দিয়ে উঠে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠ জোড়া নিজের সম্পূর্ণ আয়ত্তে নিয়ে পিষে ফেলতে। নিজেকে সামলানো বড্ড কঠিন হয়ে পড়েছে তার পক্ষে। এই রমণী যেন কড়া টাকিলা নেশার থেকেও হাজার গুণ ভয়ঙ্কর কোনো ডার্ক নেশা, যা শিরায় শিরায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়। চোখ জোড়া আরও স্থির করে, রমণীর গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে চরম নেশালো কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে পুরুষটি,

—- “তুই এত সুন্দর কেন রূপ। দেখলেই নিজেকে হারিয়ে ফেলছি তোর মাঝে। ইউ আর ড্রাইভিন মি ক্রেজি, এখন যদি একটু ছুঁয়ে দিই, রাগ করবি?”

উত্তরের আশা করে না পুরুষটি। নিজের আয়ত্তে ঝড়ের গতিতে নিতে যায় রমণীর ওষ্ঠ জোড়া। ঠোঁটে ঠোঁট লাগার মুহূর্তে চোখ বন্ধ হয়ে আসে রমণীর, একদম নিস্তেজ হয়ে নিজের শরীরের পুরো ভার ছেড়ে দেয়। ঠিক তখনই থমকে যায় বাঁধন। তাকিয়ে দেখে চোখ বন্ধ করে একদম নিথর হয়ে আছে রূপা, শরীরে কোনো নাড়াচড়া নেই। বুঝতে বাকি থাকে না মেয়েটা যে তীব্র আতঙ্কে আর অবশে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। এক চরম বিরক্তিতে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে ধরে ঝটকায় রূপাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় বাঁধন। কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা পা বাড়ায় বেডরুমের দিকে। আর তাদের পেছন পেছন গুটিগুটি পায়ে ফলো করতে থাকে ক্যান্ডি। রূপাকে তার রুমে নিয়ে এসে অত্যন্ত আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দেয় বাঁধন। বৃষ্টি এতক্ষণ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল। সে রুমে এসে হঠাৎ বাঁধনকে দেখে থমকে যায়। চোখ চলে যায় সোজা বিছানার দিকে। সেখানে রূপা চোখ বন্ধ করে অসাড় হয়ে শুয়ে আছে। বৃষ্টি কিছু বলতে যাবে কিন্তু ঠোঁট নড়ার আগেই হঠাৎ নিচ তলা থেকে এক বুকফাটা কান্নার শব্দ ভেসে আসে। তীব্র সেই কান্নার আওয়াজে বৃষ্টি আর বাঁধন দুজনেই প্রচণ্ড অবাক হয়ে যায়। এই অসময়ে কিসের কান্না। চরম বিস্ময় নিয়ে একে অপরের দিকে তাকায় তারা। এক মুহূর্ত চুপ থেকে বেশ গম্ভীর গলায় বাঁধন বলে,

—- “বৃষ্টি শুনছো? মনে হচ্ছে কেউ কাঁদছে।”

বৃষ্টি খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে সায় দিয়ে বলে,

—- “হ্যাঁ ভাইয়া আমিও শুনছি, মনে হচ্ছে কোনো মহিলার কান্না।”

কান্নার বেগ বাড়তেই আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না বাঁধন। ঝড়ের গতিতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। তার পিছে পিছে দ্রুত পায়ে নেমে আসে বৃষ্টি। ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই তারা দেখে সেখানে বসে অঝোরে কাঁদছেন শিল্পী রহমান। পাশে বসে রজনী রহমান তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। বাঁধন দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে বেশ উদ্বিগ্ন গলায় বলে,

—- “কী হয়েছে কাকিয়া? কাঁদছো কেন?”

শিল্পী রহমানের কান্নায় ভেঙে পড়া মুখের দিকে তাকিয়ে রজনী রহমান অত্যন্ত শোকার্ত গলায় বলেন,

—- “আকাশ বাইক এক্সিডেন্ট করেছে। হসপিটালে নেওয়া হয়েছে ওকে। তোমার দাদু বাবা আর কাকা শুনেই দৌড়ে গেল।”

চলবে…!

বড় পর্ব হয়েছে আশা করি 5K রিয়েক্ট ওঠবে। 5K রিয়েক্ট ওঠলে প্রতিদিন গল্প আসবে যদি এক দিনে ওঠে৷ 🙂

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply