Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৬৮


#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা

[পর্ব ৬৮]

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

মস্তিষ্ক শূন্য ন্যান্সি। কথারা ফুরিয়ে এসেছে। কন্ঠনালি রুদ্ধ! চোখের কার্নিশ লাল হয়ে আসছে। কিভাবে এতটা ভুল করলো সে? কিভাবে মানুষ চিনতে ভুল করলো? ছোট্ট এই জীবন তাকে কত কিছু শেখাবে আর কত কিছু দেখাবে?

ন্যান্সি যে আর নিতে পারছে না! এই মূহুর্তের ধরনীর বুকে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে! কেউই নেই তার আশেপাশে। যাকে চেয়েছিল সেও নেই! কেন এমন হলো? কেন সবসময় তাকে ভেঙেচুরে দেওয়া হয়?

তার কি কষ্ট হয়না? হয়তো,সেও মানুষ।তারও অনুভূতি আছে। সেও বাঁচতে চায়! তাহলে কেন দুঃখের ভারটা তার ঝুলিতে বেশি করে দেওয়া হয়েছে?

“এইটা নাও!”

পৃথ্বী নিজের রুক্ষ হাতে একটি মেমোরি কার্ড এগিয়ে দিলো! এই সেই মেমোরি যেটায় সেদিন রাতের ভিডিও রয়েছে।

পৃথ্বী ইলহাম কে ভালোবাসতো,তার খোঁজ করতে গিয়েছিল তন্বীর কাছে। তন্বী আর সে দুজনেই চাইতো ইলহাম ফিরে আসুক। সেই সুবাদে সেদিন রাতে তন্বীর কাছে যাচ্ছিল আবারো পৃথ্বী, কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছাতেই কিছু লোকজন দেখলো। যারা কেরোসিন দিয়ে পুরো বাড়িতে জ্বা’লানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এত এত লোক তাদের হাতে রাইফেল ছিলো। পৃথ্বী সাহস পায়নি সামনে যাওয়ার। কিন্তু যখন ভিডিও করছিল তখন আরো একটি মুখ সামনে আসে। যাকে কল্পনাও করেনি পৃথ্বী। সে আর কেউ নয় আফরিদ এহসান। যখন মুখের মাস্কটা খুলে তখনই তাকে দেখতে পায় পৃথ্বী।

এই মূহুর্তে পৃথ্বী জানে না এই পেনড্রাইভে কি আছে? কারণ এটা আফরিদ এহসান নিয়ে নিয়েছিল, হয়তো এডিট করেছে। কিছু জানা নেই পৃথ্বীর। সে শুধু নিজের জীবন বাঁচাতে আফরিদ এহসান যা বলেছে তাই করছে।

“পৃ.. পৃথ্বী সত্যি করে বলো তো কি দেখছো তুমি?”

পৃথ্বী শুকনো ঢোক গিললো,সে চাইলেও সত্যি বলতে পারছেন না। পারছে না বলতে আফরিদ এহসান এক উন্মাদ,, বদ্ধ পাগল।যে কিনা তার জন্য যা ইচ্ছে করতে পারে। সবকিছু শেষ করে ফেলতে পারে।

“তুমি নিজেই দেখে নাও ইলহাম। প্লিজ আমাকে যেতে হবে এখুনি। আমার এখুনি যাওয়া বড্ড প্রয়োজন!”

পৃথ্বী আর এক মূহুর্ত অপেক্ষা করলো না, তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল।

ন্যান্সির আর তর সইছে না, না এই মূহুর্তে এই পেনড্রাইভ কি আছে তা জানা খুব প্রয়োজন।

______________

নীলাদ্রির বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস শব্দ যেন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা। জানে না ঠিক কী ঘটতে চলেছে তার সঙ্গে, শুধু অনুভব করছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক তাকে গিলে খেতে চাইছে। পরণে সেই সাধারণ শার্টটি ভেতরে লুকিয়ে আছে পাতলা “অ্যান্টি-স্ট্যাব সেফটি ভেস্ট”, ছু’রি ঠেকলে প্রাণটাকে সামান্য হলেও বাঁচিয়ে রাখার শেষ ঢাল।

আফরিদ দূর থেকে নয়, খুব কাছে দাঁড়িয়ে নিরলস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখদুটো এতটাই ঠান্ডা যে মুহূর্তেই লোকটার ভিতরের দানবটাকে স্পষ্ট বোঝা যায়। আশপাশে গার্ডের অভাব নেই কেউ চোখ সরিয়ে নেয় না, কেউ কথা বলে না। নিস্তব্ধতা যেন নীলাদ্রির গলা চেপে ধরছে। সে কি কখনো ভাবতে পেরেছিল তারই বড় ভাই এমনভাবে তাকে ব্যবহার করবে?

“ভাই তুমি আমাকে কেন এভাবে…

বাক্যটা শেষ করার আগেই আফরিদের কণ্ঠ বিদ্যুৎগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

“ইশশশ! কোনো কথা নয়।”

তার গলা যেন কোনো হিংস্র পশুর ঘাড় থেকে উঠে আসা গর্জন।

“চুপ করে যা বলছি তাই কর। নাহলে ভুলে যাবি তুই আমার র’ক্ত! বাঁচতে চাস না? যদি বাঁচতে চাস তাহলে আদেশ মান। আর না মানলে তোকে পিসপিস করে কাটব। রান্না করে কুকুর, আলিয়াজ, পিরানহা সবাইকে খাওয়াবো। আর তুই জানিস আফরিদ কথার খেলাপ করে না।”

ভয়াবহতার এমন বর্ণনা সহ্য করার মতো শক্তি নেই নীলাদ্রির। তার হাঁটু কাঁপছে, ঠোঁট শুকিয়ে আসছে। অফরিদের চোখে-মুখে কোনো দয়া নেই মনে হচ্ছে সত্যিই এই মানুষটি যা বলছে, তা করতেও দ্বিধা করবে না।

আতঙ্কের ঘন কুয়াশায় হারিয়ে যেতে যেতে নীলাদ্রির মনে একটাই প্রশ্ন

এ কি তার ভাই? নাকি কোনো নির্মম জানোয়ার, যার কাছে রক্তের সম্পর্কও তুচ্ছ?

“তোর উচিত হয়নি অ্যাঞ্জেলিনা কে টাচ করা। আমি মানুষ মোটেও ভালো নই,তাই যেটা বলছি সেটাই কর!”

নীলাদ্রি এই মূহুর্তে নিজের মা মাইমুনা এহসান কে মনে করছে। একমাত্র তিনিই পারবেন তাকে এই আফরিদ নামক জানোয়ারের কাছ থেকে বাঁচাতে!

🌿_________________🌿

তড়িঘড়ি করে বাড়িতে ঢুকে ন্যান্সি, তাকে রুমে যেতে হবে। পেনড্রাইভে কি আছে তা দেখতে হবে।

রুমে যাওয়ার পথে সাক্ষাৎ হলো স্মাইলির সাথে। স্মাইলি হাত টেনে ধরে ন্যান্সির।

“কোথায় ছিলে তুমি? কখন থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম!”

ন্যান্সির ভেতরে যেন অদৃশ্য এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। পা দু’টো ঠিকমতো স্থির থাকছে না, হৃদস্পন্দন বাড়ছে প্রতি মুহূর্তে। তাকে এখনই সেখানে পৌঁছাতেই হবে এক সেকেন্ড দেরি মানেই সর্বনাশ।

এদিকে স্মাইলি তার কবজি চেপে ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে, চোখে অজানা উদ্বেগ।

“তোমাকে আমার কিছু বলার আছে, ইলহাম চলো।”

ন্যান্সি হঠাৎই জোর করে একটুখানি হাসি ফুটিয়ে তুলল, যেন হাসির আড়ালে সব অস্থিরতা লুকিয়ে ফেলতে চায়।

“বলছিলাম যে স্মাইলি আমার খুব জরুরি একটা কাজ আছে। আমি এখুনি আসছি, প্লিজ!”

কথা শেষ হতে না হতেই সে দ্রুত সিঁড়ির দিকে ছুটল। তার পায়ের শব্দটুকুও যেন তাড়াহুড়োর ভাষা বলছিল। স্মাইলি স্তব্ধ হয়ে রইল ইলহামের আচরণ তাকে অস্বাভাবিক ভাবে ভাবাচ্ছে। এতটা বিচলিত ন্যান্সিকে সে কখনও দেখেনি।

দোতলার রুমে ঢুকেই ন্যান্সি দরজাটা সজোরে টেনে বন্ধ করল। কম্বিনেশন পাসওয়ার্ড টিপে তালা কষে লাগিয়ে দিল। চারদিক নিঃশব্দ। তার নিঃশ্বাসও যেন ঘরের ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

টেবিলের ওপর রাখা মেমোরি কার্ডটা তুলে নিল। কাঁপা হাতে সেটাকে পেনড্রাইভে ঢুকিয়ে ল্যাপটপে সংযুক্ত করল।

স্ক্রিন জ্ব’লে উঠল অন্ধকার ঘরে হালকা নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল।

এই পেনড্রাইভে আছে মাত্র একটি ফাইল আর একটি ভিডিও।

ভিডিও টা চালো করলো ন্যান্সি, সম্পূর্ণ ভিডিও টা চোখের সামনে। কিভাবে কে’রোসিন দিয়ে তার বাড়ি জ্বা’লানো হচ্ছে। আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা আরো একজন,যখন মুখের মাস্ক সরালো থমকে গেল ন্যান্সির হৃৎপিণ্ড;

এ আর কেউ নয় নীলাদ্রি এহসান! কিন্তু কিভাবে সম্ভব? এতক্ষণ ধরে তো ন্যান্সি ভাবছিল এসবকিছু আফরিদ এহসান করেছে!

“এটা? এটা কিভাবে সম্ভব? নীলাদ্রি এহসান আমার পরিবার কে মে’রেছে? কেন মেরেছে? এতদিন ধরে ভালো মানুষের মুখোশ পড়ে ছিলো?”

ন্যান্সি নিজের চুল খামচে ধরলো।

“কেন কেন কেন? নীলাদ্রি এহসান কেন করলেন আপনি এটা? আমার পরিবার? ওদের কেন এভাবে…

হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো ন্যান্সি। নীলাদ্রি তার চোখের সামনে ছিলো অথচ সে চিনতে পারেনি।

“আমি ছাড়বো না আপনাকে নীলাদ্রি এহসান! আপনাকে জবাব দিতে হবে কেন করলেন এমন? কেন কেন কেন?”

_________________

“নীলাদ্রি এহসান কোথায় আপু?”

ন্যান্সির এমন আচরণে কল্পনা একদম হতভম্ব। চোখ দু’টো বিস্ফারিত, কণ্ঠে তীব্র বিস্ময় মিশে।

“তুমি নাম ধরে ডাকছো কেন, ইলহাম? ভুলে যাচ্ছো সে তোমার বড়?”

কিন্তু ন্যান্সির ভেতরের আ’গুন ইতিমধ্যেই জ্বলে উঠেছে। আগের মতোই কঠোর, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সে বলে উঠল,

“আমি জানতে চাই সে কোথায়?”

কল্পনা বিরক্তির সুরে মুখ বাঁকালো।

“নিশ্চয়ই ফ্যাক্টরিতে আছে!”

কিন্তু ন্যান্সির মেয়েলি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তীব্রভাবে সতর্ক সংকেত দিচ্ছে না নীলাদ্রি ফ্যাক্টরিতে নয়। এই মুহূর্তে সে নিশ্চিত সে গোডাউনে।

বুকের ভেতর অসম্ভব রকম চাপা একটা টান অনুভব হচ্ছে, যেন কেউ অদৃশ্য হাত দিয়ে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেদিকেই।

এক মুহূর্তও দেরি করল না ন্যান্সি।

ধুমধাম শব্দে পা ফেলতে ফেলতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো। তার ভঙ্গিটাই বলে দিচ্ছিল, আজ যাই ঘটুক, সত্যটা সে খুঁজে বের করবেই।

_______________

“এসে গেছো? জানতাম তুমি আসবেই। নিশ্চয়ই এতক্ষণে সত্যের আবরণ উন্মোচিত হয়েছে তোমার কাছে?”

বিস্তীর্ণ গোডাউনের অন্তঃস্থলে নীলাদ্রি ব্যতীত আর কেউ উপস্থিত নেই। ন্যান্সির আঁখিপুট রক্তিম আভায় দীপ্ত, ক্রোধে তার চোয়াল প্রস্তরখণ্ডের ন্যায় শক্ত হয়ে রয়েছে। নীলাদ্রির মুখাবয়বে অনুতাপের লেশমাত্রও অনুপস্থিত দেখে তার অন্তর্গত ক্ষোভ বহুগুণে প্রজ্বলিত হয়ে উঠল।

“কেন করেছিলেন আপনি এসব? কী অপরাধ ছিল তাদের?”

নীলাদ্রি তাচ্ছিল্যভরা হাসি হেসে বলল,

“আমি তোমাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলাম। আর তোমাকে ধ্বংস করার সর্বোত্তম উপায় ছিল তোমার পরিবার। তুমি যেদিন থেকে আফরিদের জীবনে প্রবেশ করেছ, সেদিন থেকেই সে আমাকে অবজ্ঞা করতে শুরু করেছে। প্রতিটি বিষয়ে তোমাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। আমি নারীদের ঘৃণা করি, বিশেষত সেই নারীদের, যারা নিজেদের গুরুত্ব অধিক মনে করে।”

বজ্রবেগে এগিয়ে এসে ন্যান্সি নীলাদ্রির কলার মুষ্টিবদ্ধ করল।

“পিশাচ! কেন করেছিলি এসব? তুই-ই সেই ব্যক্তি, তাই না? এতদিন আগুন্তকের ছদ্মবেশে আমাকে বিভ্রান্ত করে গিয়েছিস? কেন হ’,ত্যা করলি আমার পরিবারকে? আমি তোকে ছাড়ব না। কখনোই না। ওদের অপরাধটা কী ছিল? তোকে আমি নিজ হাতে শেষ করব!”

নীলাদ্রি প্রবল ধাক্কায় তাকে দূরে নিক্ষেপ করল।

“কি করবি তুই? তোর মতো একটা মেয়ে আমার কীই-বা করতে পারবে? যা, গিয়ে আফরিদকে বল। তোর কি ধারণা, আফরিদ এহসান এতটাই নির্বোধ যে তোর কথা বিশ্বাস করবে?”

ন্যান্সি নীরবে উঠে দাঁড়াল। নীলাদ্রি পুনরায় উচ্চারণ করল,

“সময় থাকতে এখান থেকে বেরিয়ে যা । অন্যথায় পরবর্তীবার তোকে আ’গুনে ভস্মীভূত করব। মনে আছে তো, তোর পরিবারের আর্তচিৎকার? এখনই বের হয়ে যা!”

কথাগুলো বলে নীলাদ্রি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল।ন্যান্সির বক্ষ দ্রুত ওঠানামা করছে। দীর্ঘ, দহনময় নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসছে তার ফুসফুস থেকে। এই নরপিশাচকে সে কোনোদিন ক্ষমা করবে না। এমন অমানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। উন্মাদের ন্যায় চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে অবশেষে মেঝেতে অবহেলায় পড়ে থাকা একটি লৌহদণ্ড তুলে নিল সে। ক্রোধে তার সমগ্র শরীর কম্পমান। দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,

“এবার দেখ, তোর ধারণার চেয়েও বেশি কিছু করতে পারে এই মেয়ে।”

বাক্যশেষে প্রচণ্ড শক্তিতে লৌহদণ্ডের আঘাত নেমে এলো নীলাদ্রির মস্তকে।

ব্যথায় বিকট চিৎকার করে উঠল সে। মাথার পশ্চাৎভাগ চিরে রক্তধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল, মেঝের উপর সৃষ্টি করল রক্তিম অন্ধকারের আরেকটি স্তর।‌ন্যান্সির গাল বেয়ে নিরবচ্ছিন্ন অশ্রুধারা ঝরছে। শ্বাসপ্রশ্বাস প্রলয়ের পূর্বাভাসের মতো দপদপ করছে। আজ এই নরাধমের অবসান ঘটাতেই হবে।

এক আ’ঘাত,দুই আ’ঘাত তারপর একের পর এক নির্মম আ’ঘাত।

লৌহদণ্ডের অভিঘাতে গোডাউন কেঁপে উঠছে।

“আমি তোকে ছাড়ব না। আজই শেষ করে দেব!”

হঠাৎ তার হাত থেকে লৌহদণ্ডটি খসে পড়ল।‌দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো কিছুটা দূরে রাখা কেরোসিনভর্তি বোতলের উপর। মুহূর্তেই স্মৃতিতে ভেসে উঠল সেই বিভীষিকা যেভাবে এই জানোয়ার তার পরিবারকে আগুনে সমর্পণ করেছিল।

চোখের মণিতে অদ্ভুত এক দাহন জ্বলে উঠল।

উন্মত্তের ন্যায় সমগ্র গোডাউনজুড়ে কেরোসিন ছিটিয়ে দিল সে। এদিকে নীলাদ্রি প্রায় নিশ্চল। মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। কেবল যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ন্যান্সি বাইরে এসে থমকে দাঁড়াল।

আ’গুন প্রয়োজন। কিন্তু তার কাছে আ’গুন জ্বালানোর কোনো উপায় নেই।

পরক্ষণেই মনে পড়ল এই মানুষটি সিগারেট ব্যতীত একটি মুহূর্তও অতিবাহিত করতে পারে না।

সে পুনরায় দৌড়ে ভেতরে প্রবেশ করল। নীলাদ্রির পকেট তন্নতন্ন করে খুঁজে অবশেষে একটি দেশলাই উদ্ধার করল।

কম্পমান আঙুলে একটি কাঠি জ্বালাল।‌তারপর সেই ক্ষুদ্র শিখাটি ছুঁইয়ে দিল কেরোসিনসিক্ত গোডাউনের বুকে।

মুহূর্তের মধ্যেই অগ্নিশিখা দাবানলের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ল।

দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করল চারদিক।

অগ্নির লেলিহান জিহ্বা গ্রাস করতে লাগল কাঠ, লোহা, দেয়াল, অস্তিত্ব‌ সবকিছু। ন্যান্সি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার সম্মুখে জ্বলছে প্রতিশোধের অগ্নিকুণ্ড। তার আঁখিতে উদ্ভাসিত হলো এক অদ্ভুত তৃপ্তির দীপ্তি।

গোডাউনের অন্তঃস্থল থেকে ভেসে আসছে নীলাদ্রির হৃদয়বিদারক আর্তনাদ,

“বাঁচাও… বাঁচাও…”

আগুন ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে তার দেহ, চর্ম, অহংকার এবং সমগ্র সত্তাকে। কিন্তু পরিহাস এই যে, আফরিদ এহসান তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি; তাকে রক্ষা করতে আসেনি। তবে ন্যান্সির কর্ণে আর কোনো শব্দ পৌঁছাচ্ছে না। আজ প্রতিশোধের অনল তার শ্রবণ, অনুভূতি, বিবেক সবকিছুকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। শুধুই জ্বলছে এক দহনময় তৃপ্তি, বহুদিনের জমাটবাঁধা যন্ত্রণার নিষ্ঠুর

_____________

আকাশমণ্ডলের বক্ষ বিদীর্ণ করে অবিরাম বর্ষাধারা নেমে আসছে ধরিত্রীজুড়ে। প্রবল বৃষ্টিপাতে কিছুক্ষণ পূর্বের দাউদাউ জ্বলা অগ্নিশিখাও নিঃশেষে নির্বাপিত হয়েছে। ন্যান্সি সম্পূর্ণ সিক্ত, বৃষ্টিধারায় তার অবয়ব একাকার। আঁখি হতে গড়িয়ে পড়া অশ্রুকণাগুলোও মিশে যাচ্ছে আকাশের অশ্রুর সঙ্গে।

ঝাপসাচ্ছন্ন দৃষ্টি ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হতেই সে উপলব্ধি করল তার থেকে প্রায় দশ হাত দূরে একটি অবয়ব নিশ্চল দাঁড়িয়ে রয়েছে।

দূর আকাশে হঠাৎ বজ্রবিদ্যুৎ চমকে উঠল।সেই ক্ষণস্থায়ী আলোকচ্ছটায় দৃশ্যমান হলো মুখশ্রীটি।

আফরিদ এহসান। তার পরিহিত শুভ্র পাঞ্জাবিটি বর্ষাজলে ভিজে সুঠাম দেহাবয়বের সঙ্গে লেপ্টে রয়েছে।

আফরিদকে দেখামাত্র ন্যান্সির অন্তর্গত দৃঢ়তার প্রাচীর মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। শিশুর ন্যায় অধর ফুলিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে। অতঃপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল কর্দমাক্ত ভূমিতে। বর্ষাধারা তখনো অবিরাম ঝরে পড়ছে।

আফরিদ ধীর, স্থির পদক্ষেপে তার দিকে অগ্রসর হতে লাগল। ন্যান্সির কণ্ঠ বিদীর্ণ হয়ে বেরিয়ে এলো,

“আমি তাকে মেরে ফেলেছি, আমি খু’ন করেছি।আমিও খু’নি হয়ে গেছি। এই দেখুন এই হাত ,এই হাত দিয়েই আমি তাকে হত্যা করেছি। আমি আর পবিত্র নই। আমি গুনাহগার হয়ে গেছি।আমি তাকে মে’রে ফেলেছি…”

কথাগুলোর শেষাংশ আর স্পষ্ট হলো না। সে চোখ বুজে সমগ্র দেহ কাঁপিয়ে ক্রন্দনে ভেঙে পড়ল। আফরিদ স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার সেই নিষ্কলুষ প্রাণের দিকে যে প্রাণকে সে পৃথিবীর সকল কলুষতার ঊর্ধ্বে মনে করে।

ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে ন্যান্সির সম্মুখে। দু’হাত বাড়িয়ে তুলে নিল অশ্রুসিক্ত মুখখানি।

গভীর, স্থির কণ্ঠে বলল,

“তুই আমার সবচেয়ে পবিত্র পরাণ।”

ন্যান্সির ফোঁপানি আরও তীব্র হয়ে উঠল।আফরিদ তাকে শক্ত করে নিজের বক্ষে আবদ্ধ করল।

বৃষ্টির তীব্রতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।ন্যান্সিও দু’হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরল।

“আমি ইচ্ছে করে করিনি ওরা আমার পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে… আমি… আমি কি…”

“হুশ… আর একটি কথাও নয়।”

মৃদু স্বরে থামিয়ে দিল আফরিদ।পরক্ষণেই সে তুলোর ন্যায় কোমল দেহখানিকে কোলে তুলে নিল। গাড়ির দিকে অগ্রসর হতে উদ্যত হলেও ন্যান্সির আকুল আলিঙ্গন তাকে থামিয়ে দিল। গোডাউনের পাশে থাকা ছোট্ট ঘরে এগিয়ে গেল আফরিদ।এই ঘরটা গোডাউন পাহারা দেওয়া লোকগুলোর জন্য ছিলো। এখন আর এই গোডাউনে কাজ হয়না,আগে হতো। এই গোডাউন পরিত্যক্ত হয়ে আছে।

বাইরে বৃষ্টির মাত্রা প্রবল বেগে বেড়ে চলেছে।

ভাঙ্গা চৌকিতে পিঠ ঠেকলো ন্যান্সির। বৃষ্টি থেমে থেমে জানালার কাচে আঘাত করছে, আর ঘরের ভেতরে দু’জন মানুষের নিঃশ্বাসে যেন উষ্ণ হয়ে উঠছিল। অন্ধকারে তাদের মুখাবয়ব স্পষ্ট দেখা না গেলেও একটি স্পর্শ, একটি শ্বাস, একটি আকুলতা সবকিছুই বলে দিচ্ছিল তারা কতটা কাছাকাছি।

আফরিদ ন্যান্সির মুখের উপর মুখ নামাতেই তার হৃদস্পন্দন যেন হঠাৎই দ্রুত হয়ে উঠল। ন্যান্সির কাঁপা ওষ্ঠ দু’টি আফরিদের স্পর্শে।

মনে হলো এক অজানা আবেগের আলোকছটা জ্বলে উঠেছে ভেতরে। ন্যান্সি আধো অন্ধকারে দু’হাতে তাকে আঁকড়ে ধরল তার আঙুলের ডগা কেঁপে উঠছিল,

মনে হচ্ছিল সে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে আফরিদের বুকের কাছে।

বাইরের বৃষ্টি যেমন মাটিকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল,তেমনি ভেতরের প্রতিটি অনুভূতি ভিজে উঠছিল অব্যক্ত আকর্ষণ আর দহনময় উষ্ণতায়।আফরিদ তার গলদেশের কাছে মুখ আনতেই ন্যান্সির শরীর হালকা কেঁপে উঠল। তার দীর্ঘ নিঃশ্বাস আফরিদের কানে এসে আরও গভীর অস্থিরতা ছড়িয়ে দিল। আফরিদের অবাধ্য হাত জোড়া ন্যান্সির নারী সত্তা ছুঁয়ে দিতে বড্ড ব্যস্ত।

ন্যান্সির ভেজা পাপড়ি কাঁপছে। হঠাৎই ন্যান্সির গলা কেঁপে উঠল, ফিসফিস করে বলল।

“আমি,,,,,,আমি ভুল করে ফেললাম।”

আফরিদ তার মুখ ছুঁয়ে খুব নিচু স্বরে, খুবই আপনভাবে বলল।

“উঁহু। তুই কোনো ভুল করিসনি, পরাণ।”

এ কথা শোনামাত্র ন্যান্সির বুকের ভেতর গোপন যন্ত্রণা গলে গলে বেরিয়ে এলো। ফোঁপাতে থাকা কণ্ঠে সে বলল।

“আমি,,,, আমি আপনার মতো হয়ে গেছি। অপবিত্র হয়েছি।”

আফরিদ মৃদু হেসে তার চোখ গভীরভাবে দেখে ফিসফিস করে বলল।

“তুই আমার সর্বশুদ্ধ, সবচেয়ে পবিত্র পরাণ।”

তাদের দু’জনের শ্বাস, দু’জনের অস্থিরতা, দু’জনের টান একসময় যেন একই স্রোতে মিশে গেল।

ন্যান্সি তার দু’হাতে আফরিদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, আর বৃষ্টিভেজা সেই রাত নিঃশব্দে সাক্ষী হয়ে রইল দু’টি হৃদয়ের মিলনের।

আফরিদের স্পর্শে, তার একমুখী আকুলতায়

ন্যান্সির ভেতরটা যেন আরও জটিল হয়ে উঠছে। তার দিক বিদিক খেয়াল নেই।সে ন্যান্সির আদুরে স্পর্শে মগ্ন।তার অঙ্গে ক্ষত বিক্ষত করতে উতলা।

সেই মুহূর্তেই ন্যান্সির চোখ হঠাৎ আটকে গেল ডান পাশে। মাটিতে পড়ে থাকা ভাঙা আয়নার কাঁচের টুকরোতে।

নীরব, শীতল, ধারালো। অদৃশ্য এক সত্যের মতো তাকিয়ে আছে তার দিকে।

এক অদ্ভুত আবেশে, বেদনার ভারে ন্যান্সি ধীরে ধীরে হাত বাড়াল। আঙুলে ঠেকতেই কাঁচটি ঠাণ্ডা শিহরণ পাঠাল তার কবজিতে।

আফরিদ তখনো সম্পূর্ণ বুঁদ নিজের উন্মাদ আশক্তিতে

ন্যান্সির ভেতরকার যুদ্ধ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

ন্যান্সি চোখ বুজল। দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস বুকের ভেতর দাহের মতো নেমে এলো।

তার হাত আফরিদের কোঁকড়ানো চুলের ভেতর ঢুকে গেল। আদুরে ভঙ্গিতে খামচে ধরে।

ধীরে ধীরে মুখটা তুলল সে, ঠিক আফরিদের কানের কাছে এনে এক ফিসফিসে, থরথর কণ্ঠে বলল।

“সরি আফরিদ এহসান।”

নামটা শুনেই মুহূর্তটি বদলে গেল। সবকিছু থমকে দাঁড়াল। ঘরটি যেনো স্তব্ধ হয়ে গেল।

এবং পরের মুহূর্তে তার কাঁপা হাতের ভেতর ধরা সেই আয়নার কাঁচ বজ্রের মতো নিস্তব্ধতা ভেঙে ঢুকে গেল আফরিদের দেহে।

একটি দমবন্ধ অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল আফরিদের মুখ থেকে বেদনা, বিস্ময় আর বিশ্বাসঘাতকতার মিশ্র সঞ্চার।

ন্যান্সি অনূভুতি শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে।

চলবে……….✨🌿

(📌আজকের পর্ব পড়ে কি হতে চলেছে বুঝলেন? অবশ্যই গঠনমূলক মন্তব্য করবেন।)

(📌 সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করবেন, যতদিন ফ্রি ছিলাম দ্রুত গল্প দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এখন থেকে আবারো পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হচ্ছি।তবুও চেষ্টা করব দ্রুত দেওয়ার।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply