#যে_পাখি_মন_বোঝে_না
#পর্ব_৩
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
___________________
ঘোর লাগা জ্বর সারিয়ে যখন আমার ঘুম ভাঙে তখন বেলা প্রায় এগারোটা বাজে। শরীর ভীষণ দুর্বল! চোখ মেলেই সবার আগে আমি হৃদিকে দেখতে পেলাম। পাশে বসে মেয়েটা পড়ছিল। আমাকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে বইটা বন্ধ করে কপালে হাত রাখল। আদুরে স্বরে বলল,
“গুড মর্নিং, আপু।”
আমি তেতো মুখে মৃদু হেসে বললাম,
“গুড মর্নিং বাচ্চা। আজ স্কুলে যাসনি?”
“উঁহু! বন্ধ ছিল আজ। তোমার শরীরটা এখন কেমন?”
“ভালো।”
“জ্বর বাঁধালে কীভাবে? বৃষ্টিতে ভিজেছিলে?”
“হু।”
“ভেরি ব্যাড! গতকাল আমাদের বাড়িতে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গেছিল। আমরা যখন আসি তখন ভাইয়াও তোমাকে নিয়ে বাসায় এসেছে।”
“বাসায় এসেছে মানে? আমি কোথায় ছিলাম?”
“ডাক্তারের কাছে। ভাইয়াই তো তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল। মনে নেই?”
“উঁহু!”
“আচ্ছা বাদ দাও। এখন উঠে ফ্রেশ হয়ে আসো। আমি আম্মুর কাছে যাচ্ছি।”
আমি মাথা নাড়িয়ে সায় দিলাম। হৃদি চলে যাওয়ার পর গতকাল রাতের কথা মনে করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু বিশেষ কিছুই মনে পড়ছে না। মনে করার চেষ্টা করে ব্রেইনের ওপর চাপও দিতে ইচ্ছে করছিল না। তাই ক্লাম্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে গেলাম ওয়াশরুমে। চোখেমুখে পানি দেওয়ার পর অনেকটাই ভালো লাগছিল।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখি চাচিমনি প্লেটে করে খাবার নিয়ে এসেছে। সাথে স্যুপও আছে। জ্বরের মুখে খাবার দেখেই শরীরটা গুলিয়ে উঠেছে সাথে সাথে। কিন্তু চাচিমনির চোখ রাঙানির ভয়ে অল্প হলেও কিছুটা খেতে হয়েছে। আমাকে খাইয়ে-দাইয়ে আবার শুইয়ে দিয়ে চাচিমনি চলে গেছে। কিন্তু এখন আর আমার শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে না। একটু হাঁটতে পারলে ভালো লাগত। ছাদেই যাব কিনা বুঝতে পারছি না। বেলা তো দুপুর এখন। রোদও থাকবে বেশ। তাই ইচ্ছেটাকে আপাতত সময়ের জন্য গিলে নিলাম।
বালিশের পাশ থেকে ফোন নিয়ে দেখি মিতা আর সায়রা অনেকগুলো কল করেছিল ফোনে। সাইলেন্ট থাকায় বুঝতে পারিনি। মেসেঞ্জার গ্রুপে ঢুকে দেখি বেশ কয়েকটা গালিও দিয়েছে আজকে ক্লাসে না যাওয়ার জন্য। আমি শুধু লিখলাম,
“আমার জ্বর। তাই যেতে পারিনি।”
এরপর কিছুক্ষণ নিউজফিড স্ক্রল করেও স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। এক কথায় আমার কোনো কিছুই ভালো লাগছিল না। হৃদি রুমে এলো তখন দুটো টি-শার্ট নিয়ে।
“আরে টি-শার্টগুলো সুন্দর তো!” বললাম আমি।
হৃদি খুশি হয়ে বলল,
“তোমার পছন্দ হয়েছে?”
“হ্যাঁ, ভালোই তো লাগছে।”
“তাহলে একটা তুমি নাও। কোনটা নেবে?”
কালো আর অ্যাশ কালারের মধ্যে আমি কালো টি-শার্ট হাতে নিলাম। বললাম,
“সাইজে তো অনেক লম্বা হবে মনে হচ্ছে রে।”
“সমস্যা নাই, ইন করে পরবা।”
আমি মাথা দুলিয়ে বললাম,
“ভালো আইডিয়া।”
আমার মন ভালো করার একটা ভালো দিক হচ্ছে কোনো নতুন জামা কিংবা সুন্দর কোনো জামা পরলে, সাজুগুজু করলে মন ভালো হয়ে যায়। যদিও ঐরকম সিরিয়াস টাইপ মন খারাপ আমার কখনোই হয়নি। আর হবেই বা কেন? আমার তো কোনো কিছুর কমতি নেই। না চাইতে আল্লাহ্ আমাকে কত কিছু দিয়েছেন। এসবের জন্য শুকরিয়া আদায় করেই তো আমি কূল পাই না। মাঝে মাঝে অবশ্য রাহাত ভাইয়ের করা খারাপ ব্যবহারে কিছুটা হলেও খারাপ লাগে, তবে গায়ে লাগে না। কারণ ছোটোবেলা থেকেই আমি তার খারাপ ও কাটখোট্টা ব্যবহারের সাথে অভ্যস্ত। কিছু ক্ষত অবশ্য রয়েও যায় তাতেই বা কী! জীবন তো আর থেমে থাকে না। তাছাড়া জীবনে কাউকে কখনো ভালোবাসিনি, ভালো লাগেনি, ছ্যাকা খাইনি তাহলে আমার কেন অমন সিরিয়াস মন খারাপ হবে কখনো?
দুর্বল মনকে ভালো করতে গোসল করে আজই টি-শার্ট টি পরে ফেললাম। প্যান্টের সাথে ইন করার পর খারাপ লাগছে না। দুপুরে খাওয়ার পর শরীরটাও ভালো লাগছিল। তাই বিকেলে নিজের প্রিয় ডায়ারি আর ফোন নিয়ে ছাদে চলে গেলাম।
ছাদে গিয়ে চেয়ারে বসতেই আকাশের নাম্বার থেকে কল এলো। ফোনে সময় দেখলাম, কলেজ ছুটি হয়ে গেছে। কল রিসিভ করে আমিই বললাম,
“হ্যাঁ, দোস্ত বল।”
“আমি জীবন।”
ফোনের অপরপ্রান্তে জীবন আছে জানার পর কিছু সময়ের জন্য হলেও থমকালাম। কান থেকে ফোন সরিয়ে সামনে এনে দেখলাম, কার নাম্বার থেকে কলটা এসেছে। ‘আকাশ’ দিয়েই তো সেইভ করা।
“শুনতে পাচ্ছ? হ্যালো?”
জীবনের কণ্ঠ শুনে বললাম,
“বলো, শুনতে পাচ্ছি। আকাশের নাম্বার থেকে যে কল দিলে? আকাশ কোথায়?”
“আমার পাশেই আছে। আমার নাম্বার থেকে কল দিলে যদি না ধরো তাই ওর ফোন থেকে দিয়েছি।”
জীবনের কথা সত্য। তবুও গলা চড়িয়ে বললাম,
“না, না তা কেন? অবশ্যই রিসিভ করতাম।”
“করতে না, প্রিয়তা। এর আগেও একদিন আমি তোমাকে পঁচিশটা কল, ছত্রিশটা মেসেজ করেছিলাম। তুমি কোনো রেসপন্স করোনি।”
চোর ধরা পড়লে যেমন হয়, আমার অবস্থা এখন তেমন। তাই দ্রুত প্রসঙ্গ বদলে বললাম,
“যাই হোক, কী অবস্থা এখন? ক্লাস শেষ?”
“হ্যাঁ। তুমি আজ আসোনি তাই আকাশকে তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলল তোমার নাকি জ্বর।”
“আর বোলো না! কাল শখ করে একটু বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম, তাই এখন শোকে ম’র’তেছি।”
“এখন কি জ্বর কমেছে?”
“হুম, আলহামদুলিল্লাহ্। আগামীকাল থেকে ক্লাসে আসব ইন-শা-আল্লাহ্।”
কথা বলতে বলতে পকেটে হাত দিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি, রাহাত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন। এভাবে তাকানোর মানেটা কী বুঝতে পারছি না। আমি জীবনের থেকে বিদায় নিয়ে কল কেটে দিলাম। রাহাত ভাই দুকদম সামনে এগিয়ে আসতে আসতে বললেন,
“জ্বর সারতে না সারতেই ডানপিটে আচরণ শুরু হয়ে গেছে?”
আমি ভ্রু কু্ঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,
“কী করেছি?”
“এই অবস্থায় ছাদে এসেছ কেন?”
“জ্বর এখন নেই।”
রাহাত ভাই দুহাত বগলাদাবা করে দাঁড়িয়ে দাঁত কিড়মিড় করছেন। আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে বললেন,
“জ্বরের কথা বলিনি। তোমার ড্রেসের কথা বলেছি। এসব কী পরে ছাদে এসেছ?”
আমি নিজেও একবার নিজেকে দেখে নিয়ে বললাম,
“কেন আপনি দেখতে পাচ্ছেন না? টি-শার্ট আর প্যান্ট।”
“দেখতে পাচ্ছি বলেই বলতেছি। কতটা বিশ্রি লাগছে জানো?”
আমি দাঁত কটমট করে বললাম,
“না, জানি না। আর জানতেও চাই না।”
“ভালো কিছু জানার আগ্রহ তো তোমার কোনো কালেই ছিল না। পায়ের সাথে প্যান্টটি টাইট ফিটিং হয়ে লেগে আছে। তারওপর আবার টি-শার্ট পরেছ ইন করে। শরীরের ভাঁজ বোঝা যাচ্ছে। পাশের ছাদ থেকে যে ছেলেগুলো হা করে তাকিয়ে আছে দেখেছ সেটা?”
আমি আড়চোখে একবার পাশের ছাদে তাকালাম। চার-পাঁচটা ছেলে প্রায়ই ঐ ছাদে আসে বিকেলে। আড্ডা দেয়, গান গায়। আমার রুমের জানালা থেকেও ওদের দেখা যায়। রাহাত ভাইয়ের দিকে তাকালাম, তিনি তখনো ক্ষিপ্ত আমার ওপর। নিজের দোষটা আংশিক হলেও বুঝতে পেরেছি বিধায় তড়িঘড়ি করে টি-শার্টের ইন খুলে বললাম,
“হয়েছে এখন? শান্তি?”
তিনি কিছু বললেন না। আমি নিজেকে দেখে বললাম,
“দেখেন টি-শার্টটা কত লম্বা! ইন করা ছাড়া কেমন আলখাল্লার মতো লাগছে।”
“নট ব্যাড! আগের থেকে বেটার লাগছে। আর আলখাল্লার মতোই লাগবে বিকজ এটা আমার টি-শার্ট, আমার সাইজের। তোমার না।”
এতক্ষণ যা হয়েছে, হয়েছে। রাগ, কথা শোনানো পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। কিন্তু শেষে এসে তো এমন ঝটকার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম না। একটু ভীরু দৃষ্টিতে রাহাত ভাইকে পরখ করে দেখলাম, তার তীর্যক দৃষ্টি আমার মুখের দিকেই নিবদ্ধ। চোরা দৃষ্টিতে আমি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি। হৃদি কত বড়ো বেঈমানিটাই না করল আমার সাথে! শেষমেশ কিনা আমি রাহাত ভাইয়ের টি-শার্ট পরে আলখাল্লা সেজে তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি!
রাহাত ভাই হয়তো এখনই কিছু কঠিন কঠিন কথা শোনাবে আমাকে। আমি যদি বলি, হৃদি টি-শার্ট এনে দিয়েছে এবং আমিও ভেবেছিলাম ওরই টি-শার্ট, তাহলেও হয়তো তিনি বিশ্বাস করবেন না। তাছাড়া হৃদি তার আপন বোন। একটা কেন দশটা টি-শার্ট নিলেও তার গায়ে লাগবে না। কিন্তু আমার বিষয়টা সম্পূর্ণই আলাদা। আমি তার আপন বোন না, কাছেরও কেউ না। তিনি আবার আমাকে সহ্যও করতে পারেন না। এখন আমি কোনো কঠিন কথা শোনার মতো অবস্থায় নেই বিধায় আগেই বললাম,
“দয়া করে এখন উলটা-পালটা কোনো কথা শুনাইয়েন না।”
তিনি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। আমি বললাম,
“জানেন তো, কথার আঘাত সবচেয়ে বড়ো আঘাত। আঘাত এক সময় সয়ে গেলেও ক্ষত কখনো মুছে যায় না। আর আপনি আমায় আঘাত দিয়ে কথা বলাতে ভীষণ দক্ষ একজন মানুষ।”
রাহাত ভাই প্রত্যুত্তরে আমার কিছুটা সামনে এগিয়ে এলেন। আমাকে ভীষণ রকম অবাক করে দিয়ে তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন। আমি থরথর করে কাঁপছি। এ যেন এক অদ্ভুত অলীক কল্পনা! বুঝ হওয়ার পর তো কখনো এতটা মমতা, মায়া, সহানুভূতি তার মধ্যে আমার জন্য দেখিনি।
মাথা থেকে হাত সরিয়ে আমার চোখের সামনে আনলেন। একটা ছোট্ট পাতা, হয়তো আমার মাথাতেই উড়ে এসে পড়েছিল। পাতাটি বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে তিনি বললেন,
“কথার ক্ষত মুছে যায় না বলেই হয়তো মানুষ কিছু মানুষকে মনে রাখে। কেউ আঘাত দিয়ে, আর কেউ নীরবে পাশে থেকে।”
চলবে..
Share On:
TAGS: মুন্নি আক্তার প্রিয়া, যে পাখি মন বোঝে না
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩৮ (অন্তিম পর্ব)
-
প্রণয়ে গুনগুন গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৮
-
যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৪
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৯
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২৬