#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
পর্ব: ৫৬
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
“অতি শীঘ্রই তোমার আর সাঁঝের বিয়ে!”
দাদাজানের মুখের এই কথাটা শেষ হতে না হতেই সাঁঝের মনে হয়েছিল তার বুকের ভেতরটা যেন এক লহমায় খালি হয়ে গেল। কিন্তু দাদাজান জহিরুল ইসলাম যে খেলাটা এভাবে ঘুরিয়ে দেবেন, তা ড্রয়িংরুমে উপস্থিত থাকা কেউ কল্পনাতো দূরে থাক, ভাবতেও পারেনি! দাদাজান তাঁর হাতের ভারী কাঠের লাঠিটা মেঝেকে দ্বিতীয়বার শক্ত শব্দে ঠুকে অত্যন্ত নিরেট, আদেশসূচক গলায় যোগ করলেন, “আগামী মাসের ৫ তারিখে সাঁঝের বিয়ে হবে ওর ফুফাতো ভাই, ইঞ্জিনিয়ার প্রান্তিক এহসানের সাথে। আর আরযানের বিয়ে ঠিক করা হয়েছে সেই নামজাদা ব্যারিস্টার মেয়েটার সাথে যাকে সেদিন ঘটক এসে দেখে গেল, অ্যাডভোকেট তানজিলা চৌধুরী। মীর বাড়ির দুই বড় নাতি-নাতনির শুভ কাজ আমরা একই দিনে সম্পূর্ণ করব!”
“কী…?!’
সাঁঝের মনে হলো কেউ যেন তার মাথার ওপর প্রকাণ্ড একখানা পাথর ফেলে দিল! সে হাঁ করে দাদাজানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ধবধবে ফ্যাকাশে মুখখানা এক লহমায় রক্তশূন্য হয়ে একদম সাদা হয়ে গেল।
ওদিকে দেওয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মীর আরযান শানের ঠোঁটের সেই হাসিটা এক সেকেন্ডের হাজার ভাগের এক ভাগে মিলিয়ে গেল! তার চশমাহীন চোখ দুটো হিংস্র বাঘের মতো ছোট হয়ে এলো। কপালে স্পষ্ট হয়ে উঠল বিরক্তির গভীর ভাঁজ। যে আরযান কয়েক সেকেন্ড আগেও ভেবেছিল সাঁঝকে সে চিরকালের জন্য নিজের অধিকারের সীমানায় বাঁধতে চলেছে সেই আরযানের মাথার ওপর দাদাজানের এই সিদ্ধান্ত যেন এক বালতি বরফপানি ঢেলে দিল! ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে নামল মীর বাড়ির বাকি তরুণেরা, আবরিন প্রাণ, সিঙ্গার রাত এবং বাকিরা! তারা ড্রয়িংরুমের গুমোট আর উত্তপ্ত বাতাসের আবহাওয়া টের পেয়েই দ্রুত ছুটে এসেছে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই প্রাণ নিজের স্পেশাল স্টাইলে ব্লেজারের পকেটে হাত দিয়ে বলল, “দাদাজান! অসময়ে এত বড় রাজদরবার বসিয়েছেন শুনলাম! ঘটনা কী? কার ফাঁসির হুকুম হলো?”
কিন্তু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা আরযানের শক্ত, রক্তচক্ষু অবয়ব আর সাঁঝের থরথর করে কাঁপা দেখে প্রাণের ঠোঁটের চটুল হাসিটা নিভে গেল। রাতও গিটার রেখে আসা হাতের ঘাম মুছতে মুছতে ভ্রূ কুঁচকে এগোলো। মেজো কর্তা আয়মান হোসেন সোফায় সোজা হয়ে বসে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তোরা সবাই এসে ভালোই করেছিস। দাদাজান চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আগামী মাসে সাঁঝ আর আরযানের বিয়ে হবে। তবে সাঁঝের পাত্র ফুফাতো ভাই প্রান্তিক, আর আরযানের পাত্রী ব্যারিস্টার তানজিলা। বিয়ের কেনাকাটা কাল থেকেই শুরু হবে।”
“হোয়াট?!” একযোগে চিৎকার করে উঠল প্রাণ আর রাত!
প্রাণ শার্টের কলারটা এক টানে ঢিলে করে ফেলে বলল, “দাদাজান! এটা কী ধরনের সিদ্ধান্ত?! সাঁঝের বিয়ে প্রান্তিক ভাইয়ের সাথে?! আর আরযান ভাই… ব্যারিস্টার তানজিলা?! আপনারা কি মাথা ঠান্ডা রেখে ভেবেছেন?”
বাড়ির বড় কর্তা আফজাল শাহরিয়ার অত্যন্ত কড়া ও গম্ভীর গলায় প্রাণকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “চুপ থাক প্রাণ! বংশের বড়দের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো তর্ক হবে না। গতকাল বিকেলের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আর বাজারে ওঠা নানা কথার পর বংশের মর্যাদা রক্ষা করার এটাই একমাত্র সম্মানজনক উপায়। সাঁঝের মতো শান্ত মেয়েকে ইঞ্জিনিয়ার প্রান্তিকের হাতে দেওয়াটাই সবচেয়ে নিরাপদ, আর আরযানের পাশে ব্যারিস্টার তানজিলাই উপযুক্ত।”
পুরো ড্রয়িংরুমে এক চরম, দমবন্ধ করা অশান্তি ভর করল। সাঁঝ সেখানে দাঁড়িয়ে থকথক করে কাঁপছে। তার চোখ চলে গেল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আরযানের দিকে। আরযান তার দিকেই তাকিয়ে আছে তার সেই গাঢ়, গভীর দৃষ্টি যেন সাঁঝের পুরো অস্তিত্বকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে! আরযানের ওই চোখের চরম আধিপত্য, ওই সিক্রেট সিসিটিভির নজরদারি, বিকেলে রেস্টুরেন্টের বাইরে তাকে সবার সামনে কোলে তুলে নেওয়ার উন্মাদনা সব কিছু সাঁঝকে চিরকাল ভয়ে কাঁপিয়েছে। কিন্তু একই সাথে, আরযানের ওই কঠিন ভালোবাসার বন্ধন সাঁঝকে এক অচেনা জালেও জড়িয়ে রেখেছিল। তবে সাঁঝ তো অত্যন্ত নরম আর সরল এক মেয়ে! সে জানে আরযান তার নিজের বড় চাচাতো ভাই। মীর বাড়ির এই কঠোর শেকল, পরিবারের নিয়ম, আর দাদাজানের হুকুম অমান্য করার ক্ষমতা তার নেই। তার চেয়েও বড় কথা আরযানের এই অনধিকার চর্চা আর ভয়ংকর ভালোবাসা সাঁঝকে মানসিকভাবে পিষে ফেলছিল! সাঁঝ গভীর এক নিঃশ্বাস নিল। ওড়নার প্রান্ত শক্ত করে চেপে ধরে, চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া একবিন্দু গোপন জল মুছে সে নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলে উঠল,
“আমি… আমি দাদাজানের এই সিদ্ধান্তে রাজি।”
মুহূর্তের মধ্যে যেন পুরো ড্রয়িংরুমের বাতাস থমকে গেল! সাঁঝের সেই নিচু, অথচ স্পষ্ট সম্মতির কথাটি আরযানের কানে গিয়ে বাজল একটা বিষাক্ত তীরের মতো! আরযান এক ঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, গলার রগগুলো ভেসে উঠল রাগে-ক্ষোভে! সে সাঁঝের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাল, যেন সাঁঝ তাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারল!
‘রাজি?! সাঁঝ প্রান্তিককে বিয়ে করতে রাজি?! যে মেয়েটা বিকেলে তার গাড়িতে বসে ভয়ে জবুথবু হয়ে ছিল, যে সাঁঝের ওপর তার ২৪ ঘণ্টার নজরদারি সেই সাঁঝ অন্য কোনো পুরুষের বউ হতে এক কথায় রাজি হয়ে গেল?!’
আরযানের ভেতরের সেই ভয়ংকর, সুপ্ত ‘হিটলার সিইও’ আর একগুঁয়ে প্রেমিক রূপটা এবার জেগে উঠল। তার ধারালো মস্তিষ্ক খুব দ্রুত হিশাব কষতে শুরু করল। ‘দাদাজানের এই সিদ্ধান্ত সরাসরি অস্বীকার করলে বাড়ির মুরুব্বিরা সাঁঝকে কালই প্রান্তিকের বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। তখন সাঁঝকে নিজের আয়ত্তে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কিন্তু যদি এই বিয়েতে আপাতত সম্মতি দেওয়া যায় তবে সাঁঝ এই মীর বাড়ির ভেতরেই থাকবে, তার চোখের সামনেই থাকবে! আর মীর আরযান হোসেনের হাতের মুঠোয় থাকা শিকারে অন্য কেউ হাত দেবে সেই সাধ্য এই দুনিয়ায় কারো নেই!’ আরযানের শীতল ঠোঁটের কোণে হঠাৎই ফুটে উঠল হাসি। সে নিজের ফরমাল শার্টের কলারটা হাত দিয়ে সোজা করল। ধীরপায়ে দাদাজানের সোফার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “দাদাজানের সিদ্ধান্ত শিরোধার্য। সাঁঝ যদি এই বিয়েতে রাজি থাকে… তবে আমারও ব্যারিস্টার তানজিলাকে বিয়ে করতে কোনো আপত্তি নেই। আমি রাজি।”
আরযানের মুখ থেকে ‘আমি রাজি’ শব্দ দুটো বের হতেই সাঁঝ বুকের ভেতর একপ্রকাণ্ড ধাক্কা খেল! সে চোখ বড় বড় করে আরযানের দিকে তাকাল। সাঁঝ ভেবেছিল, আরযান হয়তো গর্জে উঠবে, দাদাজানের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করবে, পুরো বাড়ি মাথায় তুলবে! কিন্তু আরযান এত সহজে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল?! সাঁঝের বুকের ভেতরের কোনো এক অচেনা কোণে হঠাৎ করেই যেন এক বিশাল খালি অনুভূতির সৃষ্টি হলো। এক না-বলা তীব্র কষ্ট আর অজানা অভিমান এসে তাকে গ্রাস করল, যা সে নিজে বুঝে ওঠার আগেই তার চোখ দুটোকে টলমল করে তুলল। দাদাজান জহিরুল ইসলাম মুখে এক স্বস্তির হাসি ফুটিয়ে লাঠিটা মেঝেকে ঠুকলেন, “বেশ! মীর বাড়ির বড় নাতি-নাতনি যখন বংশের মর্যাদা বুঝতে পেরেছে, তখন আর কোনো কথা নেই। কাল সকাল থেকেই বিয়ের আয়োজন শুরু হোক।”
সবাই একে একে ড্রয়িংরুম ছেড়ে নিজ নিজ ঘরের দিকে যেতে লাগল। সাঁঝও আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে ভীতি আর এক বিষণ্ণ অনুভূতি বুকে নিয়ে দ্রুত সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। সে প্রায় দৌড়ে তিনতলার দিকে উঠছিল। কিন্তু তিনতলার করিডোরের সেই আবছা অন্ধকারে পৌঁছাতেই হঠাৎ একটা শক্ত, প্রকাণ্ড হাত সাঁঝের সুকোমল কবজি চেপে ধরল!
“উফ…!” সাঁঝের ছোট আর্তনাদটা বাতাসে মেলানোর আগেই তাকে এক টানে দেয়ালের সাথে সোজা চেপে ধরা হলো!
সাঁঝ চোখ তুলে তাকাতেই ভয়ে তার নিঃশ্বাস আটকে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে মীর আরযান শান! সে চশমাটা পকেটে রেখে সাঁঝের একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। আরযানের এক হাত সাঁঝের মাথার পাশে দেওয়ালে টেকানো, আর অন্য হাতের আঙুল সাঁঝের থুতনি চেপে ধরে মুখটা ওপরে তুলে আনল। আরযানের চোখ দুটো থেকে যেন আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভা বের হচ্ছে!
“তুই… তুই প্রান্তিককে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলি, সাঁঝ?” আরযানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর নিঃশব্দে ফিসফিস করে উঠল। সাঁঝ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাত দিয়ে আরযানের ছাতি ঠেলতে চাইল, “আ-আরযান ভাইয়া… ছাড়ুন! দাদাজান তো বি-বিয়ে ঠিক করে দিয়েছেন! আপনিও তো ব্যারিস্টার মেয়েটাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছেন…!”
আরযানকুটিল হাসি হাসল। সে সাঁঝের আরও কাছাকাছি এসে তার ভেজা ঠোঁটের খুব কাছে নিজের ঠোঁট আনল, “তুই কি সত্যি ভাবছিস মীর আরযান শান বেঁচে থাকতে সাঁঝের গায়ে অন্য কোনো পুরুষের ছায়া পড়বে? তুই প্রান্তিককে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখছিস, তাই না? কিন্তু মনে রেখ সাঁঝ এই মীর বাড়িতে বিয়ের মঞ্চ তৈরি হবে ঠিকই, কিন্তু সেই মঞ্চে তোমার পাশে কে বসবে তার সিন্ধান্ত আমি নেব।”
সাঁঝের বুকটা আতঙ্কে আর আবেগে ধুকপুক করে উঠল। সে আরযানের চোখের সেই চরম উন্মাদ অধিকারবোধ দেখে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
পরদিন মীর বাড়ির বিশাল সিংহদুয়ারের সামনে যখন পরপর দুটো কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামল, তখন সকালের সোনাঝরা রোদ সবেমাত্র বাড়ির আমবাগান ছুঁয়েছে। ড্রাইভার তড়িঘড়ি করে নেমে পেছনের দরজা খুলে দিতেই সেখান থেকে বের হলেন সাঁঝের ফুফু সাজেদা বেগম, তাঁর স্বামী ফজলুল এহসান এবং তাঁদের ছোট মেয়ে আনিকা। আর সবার শেষে গাড়ি থেকে নেমে যে তরুণটি নিজের নামজাদা রোদচশমাটা শার্টের পকেটে গুঁজলো সে আর কেউ নয়, সাঁঝের ফুফাতো ভাই, লন্ডনের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার প্রান্তিক এহসান।
সামনের মাসেই বিয়ে। অথচ পরিবারের আদেশে আর দাদাজান জহিরুল ইসলামের কড়া নির্দেশে প্রান্তিক তার পুরো পরিবার নিয়ে সোজা এসে উঠেছে এই মীর বাড়িতেই যা প্রান্তিকের নিজের নানার বাড়ি। বাড়ির উঠোনে আর ড্রয়িংরুমে মেহমানদের বরণ করে নেওয়ার এক মহোৎসব শুরু হয়ে গেল। দাদাজান জহিরুল ইসলাম কাঠের লাঠিতে ভর দিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। বড় কর্তা আফজাল শাহরিয়ার এবং মেজো কর্তা আয়মান হোসেনও বোনও বোনের পরিবারকে হাসিমুখে বরণ করে নিলেন। কিন্তু পুরো ড্রয়িংরুমের এই হইচই আর আনন্দের মাঝেও দোতলার এক কোণে, রেলিংয়ের আড়ালে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল সাঁঝ। তার পরনে একদম সাদা রঙের একটা সুতি সালোয়ার-কামিজ, ওড়নাটা বুকে জড়ানো। সাঁঝের ফ্যাকাশে মুখখানায় কোনো হাসির রেখা নেই। সে পুতুলের মতো নিথর হয়ে নিচে জমে ওঠা ভিড়টার দিকে তাকিয়ে রইল। কাল রাতের সেই ভয়ংকর সিদ্ধান্ত যেখানে দাদাজান তার বিয়ে প্রান্তিকের সাথে আর আরযানের বিয়ে ব্যারিস্টার তানজিলার সাথে ঠিক করে দিয়েছেন সেই ধাক্কাটা এখনো সাঁঝের বুক থেকে নামেনি। তার মনের ভেতর এক বিশাল খালি অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে, যা তাকে পুরোপুরি নীরব ও বাক্যহীন করে ফেলেছে।
“কীরে সাঁঝ! তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস আর নিচে তোর হবু বর চলে এসেছে?!” পাশ থেকে চটুল গলায় বলে উঠল প্রাণ। তার সাথে রাতও দাঁড়িয়ে ছিল। সাঁঝ চমকে উঠে পেছনে তাকাল। প্রাণ সাঁঝের করুণ ফ্যাকাশে মুখটা দেখে একটু থেমে হালকা গলায় বলল, “তোর মুখটা এমন শুকিয়ে আছে কেন রে? বিয়ে তো সামনের মাসে! এখন থেকেই ফুফাতো ভাই তোকে নিয়ে ঘুরতে বের হবে, প্যাম্পার করবে, আর তুই এভাবে দেবদাসের মতো দাঁড়িয়ে আছিস?”
সাঁঝ কপালে আসা চুলগুলো পেছনে সরিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি ঠিক আছি, প্রাণ ভাইয়া…” ঠিক সেই মুহূর্তে নিচে এক থমথমে নীরবতা নেমে এলো। সাঁঝ চোখ ফিরিয়ে নিচে তাকাতেই তার বুকের ধুকপুকানি এক ধাক্কায় দ্বিগুণ হয়ে গেল। দেওয়ালে হেলান দিয়ে ধীরপায়ে সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছে মীর আরযান শান! আরযানের পরনে নেভি ব্লু রঙের ফর্মাল শার্ট, কলারের ওপরের বোতামটা খোলা, হাতের ঘড়িটার ওপর সকালের রোদ ঠিকরে পড়ছে। আরযানের চেহারায় এতটুকু উত্তেজনার ছাপ নেই। সে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর ভঙ্গিতে নেমে গিয়ে ফুফার সাথে করমর্দন করল, প্রান্তিকের কাঁধে হাত দিয়ে কৌশলগত কুশল বিনিময় করল। প্রান্তিক হাসিমুখে আরযানের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেমন আছো আরযান ভাই? শুনেছিলাম তুমি নাকি এই বিয়েতে রাজি হয়েছো, থ্যাংকস ম্যান! আমি তো ভেবেছিলাম হুট করে সাঁঝকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তুমি হয়তো রাগ করবে! ছোট থেকেই যা যত্ন নিতে ওর।”
আরযান কণ্ঠে বলল, “বংশের বড়দের সিদ্ধান্তই আমার কাছে শেষ কথা, প্রান্তিক। সাঁঝ আমার ছোট বোন… . তার ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব আমাদের সবার।”
দূর থেকে এই কথাটা শুনে সাঁঝের বুকের ভেতরের কোণে যেন কেউ প্রকাণ্ড একটা বিষাক্ত তীর ফুটিয়ে দিল! ‘বোন?! আরযান শান তাকে বোনের মতো দেখে?! যে লোকটা কাল রাতেও তাকে করিডোরের অন্ধকারে দেওয়ালে চেপে ধরে উন্মাদ অধিকার দেখাল, সে আজ সবার সামনে এত সহজে এসব কথা বলছে?!’ সাঁঝের চোখ দুটো না-বলা অভিমান আর তীব্র কষ্টে টলমল করে উঠল।
প্রান্তিক দূর থেকে দোতলার রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাঁঝকে দেখতে পেল। সে উজ্জ্বল হাসিতে হাত নেড়ে সাঁঝকে নিচে আসার সংকেত দিল। ফুফু সাজেদা বেগমও হেসে উঠে বললেন, “আরে সাঁঝমণি! এসো মা, নিচে এসো! দেখো প্রান্তিক লন্ডন থেকে তোমার জন্য কত কী নিয়ে এসেছে!”
সাঁঝ বাধ্য মেয়ের মতো ছোট ছোট পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল। সাঁঝ যখন আরযানের পাশ দিয়ে হেঁটে প্রান্তিকের দিকে যাচ্ছিল, সে স্পষ্ট অনুধাবন করল আরযানের প্রকাণ্ড, লম্বা অবয়বটা তার খুব কাছাকাছি হলেও আরযানের দৃষ্টি সাঁঝের ওপর স্থির হয়ে আছে। আরযানের চশমাহীন চোখ দুটো চিল পাখির মতো সাঁঝের প্রতিটা পদক্ষেপ মেপে নিচ্ছে!
ড্রয়িংরুমে সোফার চারপাশ ঘিরে সবাই বসল। প্রান্তিক তার লন্ডন থেকে আনা সুটকেস খুলে বিশাল বিশাল উপহারের প্যাকেট বের করতে শুরু করল।
“সাঁঝ, এটা তোমার জন্য।” প্রান্তিক একটা দামী পেস্ট রঙের রেশমি শাড়ি আর সাথে ম্যাচিং করা হীরের হালকা চেইন সাঁঝের কোলের ওপর এনে রাখল।
সাঁঝ ঘাবড়ে গিয়ে শাড়িটার দিকে তাকাল। প্রান্তিক বেশ উচ্ছ্বাসের সাথে বলল, “লন্ডনের এক বিখ্যাত শোরুম থেকে স্পেশালি তোমার জন্য অর্ডার দিয়ে আনিয়েছি। আমার মনে হলো তোমার এই ফর্সা গায়ের রঙে পেস্ট কালারটা দুর্দান্ত মানাবে।”
সাঁঝ জড়সড় হয়ে বলল, “এ-এত দামী জিনিস আনার দরকার ছিল না, প্রান্তিক ভাইয়া…”
“ভাইয়া বলছো কেন সাঁঝ?” ফুফু সাজেদা বেগম হেসে সাঁঝের গালে হাত দিয়ে বললেন, “এখন তো আর ও শুধু ফুফাতো ভাই নয়! আগামী মাসেই তোদের কবুল পড়া হবে। ওকে শুধু প্রান্তিক বলেই ডাকবে!”
প্রান্তিক বেশ তৃপ্তির হাসি হেসে সাঁঝের খুব কাছাকাছি ঘেঁষে বসল। সে হাত বাড়িয়ে শাড়িটার পাড় সাঁঝকে দেখাতে দেখাতে বলল, “দেখো তো সাঁঝ, কাজটা পছন্দ হয়েছে কিনা?”
ঠিক সেই মুহূর্তে, সোফার ঠিক বিপরীত প্রান্তে রাখা একক সোফায় বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল আরযান। প্রান্তিক সাঁঝের কাছাকাছি ঘেঁষে বসতেই আরযানের হাতের কফির কাপটা সামান্য কেঁপে উঠল। আরযানের ফর্সা কপালে ভেসে উঠল তিনটা গভীর রডের মতো ভাঁজ। তার চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে উঠল। আরযান অত্যন্ত ধীরগতিতে টেবিলের ওপর কফির কাপটা রাখল। চিনেমাটির কাপটা কাঁচের টেবিলের ওপর সামান্য ঠক করে শব্দ তৈরি করল। সেই সামান্য শব্দের ধাক্কায় সাঁঝ চমকে উঠে আরযানের দিকে তাকাল। আরযান কিন্তু সোফায় হেলান দিয়ে বেশ রিল্যাক্স ভঙ্গিতে বসে আছে। কিন্তু তার ডান হাতের মুঠিটা জ্যাকেটের পকেটের ভেতর এমনভাবে শক্ত হয়ে ছিল যে চামড়ার ফিতা ফেটে যাওয়ার জোগাড়! আরযানের চোখ দুটো একদম স্থির, আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত! সেই দৃষ্টির বার্তাটা একমাত্র সাঁঝই বুঝতে পারছে, “যদি তুই ওই শাড়ি স্পর্শ করিস বা প্রান্তিকের অত কাছে বসে থাকিস, তার পরিণতি ভয়াবহ হবে!’
সাঁঝ আতঙ্কে নিজের হাত দুটো গুটিয়ে কোলের ওপর রাখল। সে শাড়ি বা গয়না কোনোটাতেই হাত দিল না।
প্রান্তিক সাঁঝের এই লাজুক ও শান্ত স্বভাব দেখে মনে মনে আরও বেশি মুগ্ধ হয়ে গেল। সে বলল, “দাদাজান, আমি ভাবছিলাম আজ বিকেলে সাঁঝকে নিয়ে শহরের বাইরে একটা অভিজাত রিসোর্টে একটু ঘুরতে যাব। আমাদের মধ্যে জানাশোনাটা তো দরকার!”
দাদাজান জহিরুল ইসলাম সহাস্যে সম্মতি জানিয়ে বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, একদম ঠিক কথা! তোরা ঘুরবি না তো কারা ঘুরবে? তুই আর সাঁঝ বিকেলে গাড়িতে বেরিয়ে পড়বি।”
ঠিক তখনই আরযান সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে নিজের ফরমাল শার্টের স্লিভটা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, “দাদাজান, শহরের বাইরের রাস্তাগুলো এখন আন্ডার কনস্ট্রাকশনে আছে। প্রান্তিক দীর্ঘদিন লন্ডনে ছিল, এখানকার ট্রাফিক আর রুট ও ভালো চেনে না। সাঁঝকে নিয়ে একা যাওয়াটা নিরাপদ হবে না।”
প্রান্তিক একটু ইতস্তত করে বলল, “বাট আরযান ভাই, আমি জিপিএস দেখে চালিয়ে নেব…”
আরযান প্রান্তিককে থামিয়ে দিয়ে এক কুটিল ও রাজকীয় হাসি হাসল, “তার প্রয়োজন নেই। আমি এমনিতেও আজ বিকেলে আমার হবু স্ত্রী, ব্যারিস্টার তানজিলাকে নিয়ে ওদিককার এক বিজনেস ক্লাবে চা খেতে যাচ্ছিলাম। তোরা আমাদের সাথেই চল। আমি ড্রাইভ করব, আর তানজিলাও তোদের সঙ্গ দিতে পারবে।”
কথাটা শুনেই ড্রয়িংরুমে একমুহূর্তের নীরবতা নেমে এলো। সাঁঝের বুকের ভেতর যেন ঠাণ্ডা বরফের স্রোত বয়ে গেল! ‘ব্যারিস্টার তানজিলা?! আরযান ভাইয়া তাকে নিয়ে ঘুরতে যাবে?!’ সাঁঝের চোখ দুটো হঠাৎ করেই অসম্ভব জ্বালা করে উঠল। সে আরযানের দিকে তাকাতেই দেখল, আরযান তার রক্তচক্ষু দিয়ে সাঁঝের চোখের টলমল জল মেপে নিচ্ছে।
বিকেলের সূর্য যখন ধীরে ধীরে হেলে পড়েছে, তখন একটা কাল কুচকুচে মার্সিডিজ গাড়ি শহরের উপকণ্ঠের এক অতি অভিজাত লেকভিউ রিসোর্টের সামনে এসে থামল। গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে আছে আরযান হোসেন। তার পাশে প্যাসেঞ্জার সিটে বসে আছে রাজকীয় চেহারার নামজাদা ব্যারিস্টার তানজিলা চৌধুরী। তানজিলার পরনে দামী প্যান্ট-সু্যট, চোখে আধুনিক চশমা, গা থেকে দামী পারফিউমের তীব্র সুবাস ভেসে আসছে। আর পেছনের সিটে পাশাপাশি বসে আছে সাঁঝ আর প্রান্তিক। পুরো জার্নিজুড়ে সাঁঝ একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল সামনের লুকিং গ্লাসের দিকে! কারণ, সেই ছোট্ট আয়নাটায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল আরযানের চশমাহীন দুটো চোখ! আরযান গাড়ি ড্রাইভ করছে বটে, কিন্তু তার সমস্ত নজর লুকিং গ্লাসের মাধ্যমে আটকে আছে পেছনের সিটে বসে থাকা সাঁঝের রক্তশূন্য মুখে! রিসোর্টের খোলা লেকের পাড়ে একটা মার্বেল পাথরের তৈরি টেবিল ঘিরে চারজন বসল। প্রান্তিক বেশ উচ্ছ্বাসের সাথে সাঁঝের পছন্দ জানতে চেয়ে ওয়েটারকে ড্রিঙ্কস আর স্ন্যাকসের অর্ডার দিল। প্রান্তিক সাঁঝের হাত দুটো নিজের হাতের কাছে এনে মৃদু হেসে বলল, “সাঁঝ, লন্ডনে আমাদের একটা কটেজ আছে জানো? হ্রদের পাড়ে। বিয়ের পর আমরা যখন লন্ডনে শিফট হব, তখন তোমাকেও সেখানে নিয়ে যাব।”
সাঁঝ অস্বস্তিতে নিজের হাত দুটো টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে ফিসফিস করে বলল, “হাঁ… আচ্ছা।”
টেবিলের ঠিক বিপরীতে বসে থাকা তানজিলা তখন আরযানের কাঁধে হাত রেখে হেসে হেসে কথা বলছিল, “আরযান, আমাদের বিয়ের পর কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের সব ল’ সামিটগুলোতে তোমাকেও আমার সাথে যেতে হবে! বাবা তো বলছিলেন তোমার মতো একজন পাওয়ারফুল বিজনেস টাইকুন পাশে থাকলে আমার কেসগুলোর লিগ্যাল ব্যাকআপ আরও স্ট্রং হবে।”
আরযান শীতল মুখে এক ফোঁটা হাসি ফুটিয়ে বলল, “অবশ্যই, তানজিলা। তোমার মতো সফল নারীর পাশে দাঁড়ানো তো যেকোনো পুরুষের জন্যই গর্বের।”
‘গর্বের?!’ কথাটা সাঁঝের কানে পৌঁছাতেই সাঁঝের বুকের ভেতরে যেন দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল! সাঁঝের হাতের কাছে রাখা কাঁচের চামচটা হাত থেকে পড়ে গিয়ে প্লেটে ছনছন করে শব্দ করল। সাঁঝ আর সহ্য করতে পারল না। সে দেখল, তানজিলা কীভাবে অধিকার নিয়ে আরযানের শার্টের কলারটা একটু সোজা করে দিচ্ছে, আর আরযানও কেমন নির্বিকারভাবে বসে তানজিলার কথায় সায় দিচ্ছে!
সাঁঝের চোখ দুটো রাগে, ক্ষোভে আর তীব্র ঈর্ষায় ভিজে উঠল। যে আরযান তাকে একটু স্পর্শ করার জন্য পাগল হয়ে উঠত, সেই আরযান অন্য একটা মেয়ের এত কাছাকাছি বসে আছে কীভাবে?! ওদিকে আরযানের অবস্থাও কম খারাপ ছিল না! প্রান্তিক যখন সাঁঝের কাঁধে হাত দিতে গেল এক পেস্ট্রি এগিয়ে দেওয়ার বাহানায় আরযানের চোখের মনি দুটো হিংস্র বাঘের মতো জমে গেল। আরযান কফির মগটা এত শক্ত করে টেবিলের ওপর ছিটকে রাখল যে গরম কফি সামান্য ছিটকে তানজিলার হাতের ওপর পড়ল!
“ওহ আরযান! বি কেয়ারফুল!” তানজিলা কেঁপে উঠে টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে লাগল।
আরযান সেদিকে খেয়ালই করল না। সে টেবিল ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ৬ ফুট ২ ইঞ্চির দীর্ঘ অবয়বটা রিসোর্টের আলো-ছায়ায় এক ভয়ংকর ছায়া ফেলল। আরযান অত্যন্ত শীতল গলায় বলল, “আই নিড টু ইউজ দ্য ওয়াশরুম। এক্সকিউজ মি।”
সাঁঝের বুকটা থরথর করে কাঁপছিল। সে আর ওই বিষাক্ত বাতাসে বসে থাকতে পারছিল না। সাঁঝও দ্রুত সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল, “আ-আমিও একটু আসছি…”
প্রান্তিক বলল, “সাঁঝ, আমি সাথে আসব?”
সাঁঝ তড়িঘড়ি করে মাথা নেড়ে বলল, “না না! আমি একা যেতে পারব।”
রিসোর্টের দীর্ঘ, নিস্তব্ধ এবং আবছা আলোয় ঘেরা কোরিডোর। ওয়াশরুমের দিকে যাওয়ার এই গলিটায় তখন লোকজনের আনাগোনা একদম নেই বললেই চলে। সাঁঝ নিজের ভারী সালোয়ার-কামিজটা সামলে দ্রুত পায়ে হেঁটে ওয়াশরুমের দিকে যাচ্ছিল। তার চোখের কোণ দিয়ে তখনো অভিমানের জল গড়িয়ে পড়ছে। সে মনে মনে বলছিল, ‘আরযান ভাইয়া একটা পিশাচ! লোকটা সত্যি সত্যি তানজিলাকে বিয়ে করে নেবে! সে আমাকে শুধু ভয় দেখাত নাকি?”
হঠাৎ! অন্ধকার এক পিলারের আড়াল থেকে একটা প্রকাণ্ড, শক্ত হাত সাঁঝের সুকোমল কবজি চেপে ধরল!
“আআআহ…!” সাঁঝের মুখ দিয়ে ছোট একটা আর্তনাদ বের হওয়ার আগেই তাকে এক তীব্র টানে অন্ধকার প্যাসেজের ভেতরের ওয়ালের সাথে শক্ত করে চেপে ধরা হলো!
কঠিন ও বিশাল দুটো হাত সাঁঝের মাথার দু’পাশে দেওয়ালে আটকে গেল। সাঁঝের ওপর নেমে এলো এক সুপরিচিত, পরিচিত পুরুষালী সুবাস। সাঁঝ চোখ মেলেই ভয়ে ও আতঙ্কে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে মীর আরযান শান! আরযানের শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, কপালে স্পষ্ট বিরক্তির রগ ভেসে উঠেছে, চশমাটা সে পকেটে রেখে দিয়েছে। আরযানের সেই হিংস্র, নীলচে-কালো চোখের দৃষ্টি সোজা এসে পড়ল সাঁঝের কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপর!
“আ-আরযান ভাইয়া… ছেড়ে দিন! প্রান্তিক ভাইয়া বাইরে অপেক্ষা করছে… তানজিলা আপুও আছে!” সাঁঝ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আরযানের শক্ত বুকের ওপর হাত রেখে ঠেলার চেষ্টা করল।
কিন্তু আরযান নড়ল না। সে সাঁঝের খুব কাছাকাছি এসে নিজের ভেজা, গরম নিঃশ্বাস সাঁঝের গালের ওপর ফেলে অত্যন্ত বিষাক্ত ও ফিসফিসে কণ্ঠে বলে উঠল,
“তানজিলা আপু?! তানজিলাকে নিয়ে তোর এত চিন্তা কেন, সাঁঝ? তুই তো প্রান্তিকের সাথে বেশ হেসে হেসে লন্ডনের কটেজে শিফট হওয়ার গল্প করছিলি! শাড়ি পছন্দ করছিলি, গয়না দেখছিলি… তোর লজ্জা করল না সাঁঝ?!”
আরযানের কণ্ঠের সেই তীব্র জেলাসি আর রাগ সাঁঝকে একদম বোবা বানিয়ে দিল। সাঁঝ নিজের জমে থাকা অভিমান ধরে রাখতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“আমি কেন লজ্জা পাব?! দাদাজান আমাদের বিয়ে ঠিক করেছেন! আর আপনিও তো সোফায় বসে ব্যারিস্টার তানজিলার সাথে হেসে হেসে কথা বলছিলেন! তানজিলা আপু আপনার টাই ঠিক করে দিচ্ছিল, আপনিও তো খুব গর্ববোধ করছিলেন! আপনি তাঁর সাথেই গিয়ে সুপ্রীম কোর্টে থাকুন!”
আরযান তার বাম হাতের শক্ত আঙুলগুলো সাঁঝের সুকোমল থুতনি চেপে ধরে মুখটা এক চুল ওপরে তুলে আনল। সে সাঁঝের চোখের টলমল পানির দিকে তাকিয়ে বাঘের মতো ফিসফিস করে উঠল,
“তার মানে… আমার সাঁঝের খুব হিংসা হচ্ছিল? আমার সাঁঝ সহ্য করতে পারছিল না অন্য কোনো নারী মীর আরযান শানের গায়ে হাত দিক?!”
সাঁঝের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে চোখ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, “ন-না! আমার কোনো হিংসা হচ্ছে না! আপনি আমাকে ছাড়ুন!”
“মিথ্যা বলবি না সাঁঝ!” আরযান এক ঝটকায় সাঁঝকে দেওয়ালের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। আরযানের অন্য হাতটা সাঁঝের সরু কোমরের ওপর শক্ত বাঁধন তৈরি করল। আরযান সাঁঝের কানের লতির খুব কাছে নিজের ঠোঁট এনে চরম উন্মাদনায় ভরা গলায় গর্জে উঠল,
“মনে রাখিস সাঁঝ… তুই যদি ভাবিস ওই ইঞ্জিনিয়ার প্রান্তিক তোর শরীরে একটা আঁচড় কাটবে তবে মনে রাখিস, তার আগেই প্রান্তিককে আমি লন্ডনে পার্সেল করে দেব!”
চলবে? See less
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৭
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৮
-
প্রেমতৃষা ৪২ (প্রথম অর্ধেক)
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৩+৩৪
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৪
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩১
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৭
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১০
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ১
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৫+৩৬