Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৫১


#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#পর্ব_৫১

ইশরাত_জাহান_জেরিন

ড্রয়িংরুমের থমথমে আর গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশটা এক মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল, যখন চিকুর পেছনে উড়ে আসা সেই ধূসর রঙের প্রকাণ্ড শালিক পাখিটা ড্রয়িংরুমের বিশাল ঝাড়বাতির ওপর গিয়ে বসল। ঝাড়বাতিটা হালকা দুলতে লাগল, আর তার ওপর দাঁড়িয়ে শালিক পাখিটা বেশ কায়দা করে চারপাশের এতগুলো মানুষকে তদারকি করতে শুরু করল। আব্রাজ ততক্ষণে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তার চোখেমুখে বিস্ময় আর উৎসাহ। সে ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা একটা টিস্যু বক্স কুড়িয়ে এনে পকেট থেকে ছোট কাঁচি বের করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে টিস্যু বক্সের কাঁচ কেটে, একটা লাল রঙের সুন্দর ছোট্ট একটা ‘হিজাব’ বানিয়ে ফেলল। তারপর টেবিল থেকে কাগজ ছিঁড়ে চিকুর গলার মাপে বানিয়ে ফেলল একখানা পুঁচকে কালো টাই।
“থামেন সবাই! নীরবতা পালন করুন!” আব্রাজ হাত তুলে পুরো ড্রয়িংরুমকে শান্ত করার ভঙ্গিতে বলল, “আমাদের মীর পরিবারের সবচেয়ে কনিষ্ঠ, তবে সবচেয়ে বড় গ্যাংস্টার সদস্য চিকু আজ তার সহধর্মিণীকে নিয়ে ঘরে ফিরেছে। ভাবীকে যথাযথ সম্মান না দিলে চিকু ভাই কিন্তু কাল থেকে আমাদের ওপর কেমিক্যাল অ্যাটাক চালাবে!”
সাঁঝ আর রোদ ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে স্টিলের বাটিতে চালের গুঁড়ো আর সামান্য পানি মেখে ‘বউভাত’-এর প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। সাঁঝ বাটিটা বারান্দার টি-টেবিলে রেখে হাততালি দিয়ে বলে উঠল, “আসুন চিকা ভাবি! আপনার নতুন সংসারে স্বাগতম! এই বাড়িতে থাকতে হলে দুটো নিয়ম মানতে হবে এক, আরযান ভাইয়ার সামনে বেশি চেঁচানো যাবে না, আর দুই, আব্রাজ ব্রোর কথায় কান দেওয়া যাবে না!”
কিন্তু চিকা পাখিটা মোটেও সাধারণ কোনো পাখি ছিল না। সাঁঝের কথা শেষ হতে না হতেই সে ঝাড়বাতি থেকে এক ডানার ঝাপটায় উড়াল দিল। সোজা গিয়ে নামল মীর পরিবারের সর্বেসর্বা, বুড়ো দাদাজান জহিরুল ইসলামের মাথায়! দাদাজানের মাথায় চুল বলতে অবশিষ্ট ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। চিকা পাখিটি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে নিজের ধারালো ঠোঁট দিয়ে দাদাজানের সেই অবশিষ্ট চুলে আলতো করে ঠোকর দিতে শুরু করল, যেন সে সেখানে নতুন কোনো বাসা বাঁধার উপাদানের সন্ধান পেয়েছে! বুড়ো দাদাজান চোখ বড় বড় করে স্থির হয়ে বসে রইলেন। তিনি নড়তেও পারছেন না, কাশতেও পারছেন না!
আব্রাজ পেট চেপে ধরে সোফায় গড়িয়ে পড়ল, “ওরে বাবারে! দাদাজান! নতুন ভাবীর সাহস দেখেছ? প্রথম দিনেই একদম মীর পরিবারের সুপ্রিম কোর্টের ওপর কবজা করে ফেলেছে! দাদাজান, একটুও নড়বেন না, ভাবী কিন্তু আপনার মাথায় নতুন কেমিস্ট্রি ল্যাব বানাচ্ছে!”
চিকু তখন নিচে লাফাতে লাফাতে নিজের বুক ফুলিয়ে চিৎকার করছে, “চিকুর বউ চিকা! বিয়া করছি! বিয়া করছি! দাদাজান গাধা! দাদাজান গাধা!”
ছোট আম্মা সাইরা শেখ আর মেজো আম্মা ইলমা হোসাইন হাসতে হাসতে শাড়ির আঁচল মুখে চেপে ধরলেন। নাজিরা ওয়ালেদ হেসে কেটে পড়ে বললেন, “হায়রে আমার কপাল! বড় ছেলের বিয়ে দেওয়ার বয়স পার হয়ে যাচ্ছে, আর পাখির বিয়ে দেখে আমাদের আনন্দ করতে হচ্ছে!”
তাজ আর তেজ দুজনেই ল্যাপটপ বন্ধ করে দিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে এই কাণ্ড দেখছিল। রাত মুচকি হেসে রাজের কাঁধে চাপড়ে বলল, “আমাদের পরিবারের ধারাবাহিকতা অন্তত চিকু বজায় রাখল। আমরা তো এখনো ‘সিঙ্গেল ও অসহায়’ ক্লাবের সদস্য!” অবশেষে বুড়ো দাদাজান লাঠিটা আস্তে করে মেঝেকে ঠুকে হালকা করে মাথা নাড়ালেন। চিকা পাখিটা উড়ে গিয়ে চিকুর পাশে ফুলদানিতে বসল। দাদাজান গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করেও পারলেন না, তার কুঁচকে যাওয়া ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে মিটিমিটি হাসি ফুটে উঠল। তবে তিনি পর মুহূর্তেই নিজের গাম্ভীর্য ফিরিয়ে এনে লাঠি দিয়ে প্রাণের দিকে ইশারা করলেন।
“অনেক হয়েছে হাসিতামাশা!” বুড়ো দাদাজানের বাজখাঁই গলা পুরো ড্রয়িংরুমে প্রতিধ্বনি তৈরি করল, “পাখি বউ নিয়ে এসেছে ভালো কথা। কিন্তু আমার বড় নাতি আরযান আবার স্টাডি রুমে বইয়ের ভেতরে মুখ গুঁজে বসে আছে! ওর ছোট ভাই প্রাণ বিয়ে করে শাশুড়ির হাত থেকে বিরিয়ানি খেয়ে চলে এলো, আর ও এখনো বিয়ে করার নাম নিচ্ছে না!”
প্রাণ তখনো ধবধবে নতুন একখানা ঢিলেঢালা পাঞ্জাবি পরে সোফায় রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে ছিল। সে প্রত্যাশার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসল। প্রত্যাশা তার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে থাকলেও প্রাণের মুখে বিজয়ের স্পষ্ট আমেজ। প্রাণ গলার স্বর একটু নাটকীয় করে বুড়ো দাদাজানকে বলল, “দাদাজান, আপনি একদম ঠিক বলেছেন! আমার তো শাশুড়ি মার অশেষ কৃপায় বিরিয়ানি, বোরহানি আর কাপড় কাচা সাবানের ফেনায় ভিজে শুভ পরিণয় ঘটেই গেল! কিন্তু বড় ভাইয়ার যে অবস্থা, উনি তো মেয়েদের দেখলে কেমিস্ট্রির বিক্রিয়া আর বায়োলজির ডিসেকশন ছাড়া কিছু বোঝেন না! তাকে বিয়ে দিতে হলে আগে কাজী সাহেবের সাথে একজন কেমিস্ট্রির প্রফেসরও রাখতে হবে!”
আব্রাজ সাথে সাথে সায় দিয়ে বলল, “একদম খাঁটি কথা! আরযান ভাইয়া যদি বাসর ঘরে গিয়ে বউকে বলে ‘আজ রাতে আমরা বেনজিন রিংয়ের গঠনপ্রণালী নিয়ে আলোচনা করব’, তবে পরদিন সকালেই ভাবী বাপের বাড়ি পালিয়ে যাবে!” সবাই আবার হেসে উঠল। তবে বুড়ো দাদাজানের মেজাজ এখন অন্যরকম। তিনি পকেট থেকে বোতাম টিপে ফোন বের করে সোজা মীর বাড়ির চিরচেনা ঘটক জসিমকে কল দিলেন। “হ্যালো, জসিম? হ্যাঁ, আমি মীর জহিরুল বলছি। শোনো, আধঘণ্টার মধ্যে আমার বাড়িতে চলে এসো। শহরের সবচেয়ে সুন্দরী, শিক্ষিত আর শান্ত স্বভাবের যত মেয়ের বায়োডাটা আর ছবি তোমার কাছে আছে, সব নিয়ে এসো। আজ রাতেই আমি আমার বড় নাতি আরযানের বিয়ের কথা পাকা করব!”
দাদাজানের এই হুকুম শোনামাত্রই ড্রয়িংরুমের বাতাসের মোড় যেন বদলে গেল। সাঁঝ, যে এতক্ষণ চিকার ‘বউভাত’ নিয়ে লাফালাফি করছিল, সে হঠাৎ একদম স্থির হয়ে গেল। তার হাতের চালের গুঁড়োর বাটিটা সামান্য কেঁপে উঠল। সে অবিশ্বাস্য চোখে বুড়ো দাদাজানের দিকে তাকাল। সত্যি সত্যি ঘটক আসছে? আরযান ভাইয়ার জন্য মেয়ে দেখা হবে?
ঠিক সেই মুহূর্তে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে ধীর, গম্ভীর পায়ে নেমে এলো মীর আরযান শান। পরনে তার নেভি ব্লু শার্ট, হাত দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো, চশমার কাঁচের ওপাশে তার চোখ দুটো বরফের মতো শীতল আর শান্ত। দাদাজান আরযানকে দেখে লাঠি উঁচিয়ে বললেন, “কী রে মজনু? শুনেছিস কথা? তোর জন্য জসিম ঘটক আসছে। আজ তোকে যেকোনো একটা ছবি পছন্দ করতেই হবে!”
আরযান কোনো তাড়া দেখাল না। সে অত্যন্ত স্বাভাবিক পায়ে হেঁটে এসে বড় আম্মার পাশের খালি সোফায় বসল। চশমাটা নাক থেকে একটু নিচে নামিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে, দাদাজান। আপনি যখন বলছেন, তখন ঘটক আসুক। ছবিগুলো আমিও দেখতে চাই।”
আরযানের এই শান্ত ও সম্মতিসূচক উত্তর শুনে পুরো ড্রয়িংরুম যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল! তাজ আর তেজ একে অপরের দিকে তাকাল। প্রাণের মুখের জয়ের হাসিটা একটু মিলিয়ে গিয়ে সেখানে বিস্ময় ফুটে উঠল। আর সাঁঝ? সে শুধু এক নজর আরযানের নিষ্পাপ ও গম্ভীর মুখের দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতর যেন এক বিশাল পাথর হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। আরযান ভাইয়া রাজি হয়ে গেল? এত সহজে?
আধঘণ্টাও পূর্ণ হলো না, ঘটক জসিম এক প্রকাণ্ড ফাইল আর সুটকেস ভর্তি ছবি নিয়ে মীর বাড়িতে হাজির হলো। ড্রয়িংরুমের বিশাল মার্বেলের সেন্ট্রাল টেবিলের ওপর সার সার ছবি সাজিয়ে রাখা হলো।
তাজ, তেজ, রাজ আর আব্রাজ টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে গেল। আব্রাজ এক একটা ছবি হাতে নিয়ে বিশেষজ্ঞের মতো মন্তব্য করতে শুরু করল, “হুম… এই মেয়েটির ভ্রু একটু বেশি বাঁকা, আরযান ভাইয়াকে দেখলে আবার নতুন কোনো ইকুয়েশন বানিয়ে ফেলবে! আর এই মেয়েটি? বাহ্! ডাক্তার! কিন্তু সমস্যা হলো আরযান ভাইয়া আর ডাক্তার ভাবী মিলে আমাদের বাড়িটাকে অ্যাপোলো হাসপাতাল বানিয়ে ফেলবে!”
ঘটক জসিম রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল, “আহা আব্রাজ বাবা, সব ছবিতে খুঁত ধরলে চলে? এই যে দেখুন, এই মেয়েটি লন্ডন থেকে ব্যারিষ্টারি পড়ে এসেছে। দেখতে যেমন অপ্সরী, তেমনি আচার-ব্যবহার!”
বুড়ো দাদাজান চশমাটা নাকের ওপর ভালো করে বসিয়ে ছবিটার দিকে তাকালেন, “হুম… বেশ মিষ্টি চেহারা। আরযান, তুই একটু সামনে এসে দেখ তো!”
আরযান বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। সে ছবিটা হাতে নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখার ভঙ্গি করল। সাঁঝ দূর থেকে এই পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, অথচ মাথার রগগুলো রাগে রি রি করছে। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জমা হতে থাকা অচেনা ভয়টা এখন দাবানলের মতো হিংসায় রূপ নিয়েছে। আরযান ভাইয়া অন্য একটা মেয়ের ছবি এত মনোযোগ দিয়ে দেখছে? যে মানুষটা কাল রাতেও তাকে স্টাডি রুমে আটকে রেখে কড়া শাসনে শাসাচ্ছিল, সেই মানুষটা আজ অন্য কারো ছবি দেখে মাথা নাড়ছে?
সাঁঝ আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াতে পারল না। সে গটগট করে পা ফেলে তিনতলার স্টাডি রুমের দিকে হেঁটে গেল। তার মনে হচ্ছিল, ড্রয়িংরুমের ওই বাতাস তাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলবে। স্টাডি রুমে ঢুকে সে সোজা আরযানের রিডিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। টেবিলের ওপর সুন্দর করে সাজানো অর্গানিক কেমিস্ট্রির মোটা মোটা বই, নোটখাতা আর কলমদানি। সাঁঝের রাগে অন্ধ হয়ে যাওয়া চোখ দুটো শুধু সেই বইগুলোর ওপর পড়ল।
“হিটলার! এক নম্বর ভণ্ড!” সাঁঝ দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল।
সে টেবিলের ওপর থাকা একগুচ্ছ রঙিন হাইলাইটার আর কলম হাতে নিয়ে খাতার পাতায় হিজিবিজি কাটতে শুরু করল। রাগের মাথায় সে খেয়ালই করেনি যে সে আরযানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার নোটখাতার ওপর বিশাল করে একটা বিশ্রী ‘ব্যাঙ’-এর ছবি এঁকে ফেলেছে! “নিন! আপনার চশমা পরা লন্ডনের ব্যারিস্টার বউকে গিয়ে এই ব্যাঙের ছবি দেখান!” সে টেবিলের ওপর কষে একটা থাপ্পড় মারল। ঠিক তখনই দরজার ফাঁক দিয়ে শীতল একখানা বাতাস ভেতরে ঢুকে এলো। সাঁঝ চমকে উঠে পেছনে তাকাল। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরযান। তার হাতে এখনো ঘটকের দেওয়া সেই লন্ডনের ব্যারিস্টার পাত্রীর ছবিটা ধরা
আরযান ধীর পায়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে এলো। তার চশমার কাঁচের ওপাশ থেকে চোখ দুটো অতিরিক্ত মাত্রায় শান্ত দেখাচ্ছে, আর এই অতিরিক্ত শান্ত ভাবটাই সাঁঝের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক বিপদ সংকেত! আরযান হাতের পাত্রীর ছবিটা টেবিলের ওপর একদম সাঁঝের ব্যাঙ আঁকা নোটখাতাটার পাশে রাখল। “তোর পড়াশোনা শেষ হয়েছে, সাঁঝ?” আরযানের নিচু, শান্ত কণ্ঠস্বর।
সাঁঝ বুক ফুলিয়ে সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করল। দু’হাত কোমরে দিয়ে রানি ভিক্টোরিয়ার মতো মুখ করে বলল, “আমার পড়াশোনা শেষ হোক আর না হোক, তাতে আপনার কী? নিচে তো ব্যারিস্টার পাত্রী আপনার অপেক্ষা করছে! আপনি এখানে কী করছেন? যান না, গিয়ে দাদাজানকে বলুন যে আপনার ছবি পছন্দ হয়ে গেছে! কালই বিয়ে করে নিয়ে আসুন!”
আরযান এক পা এগিয়ে এলো। সাঁঝ অজান্তেই এক পা পেছাল। “তুই কি আমার বিয়ের জন্য খুব বেশি উৎসুক হয়ে পড়েছিস?” আরযান আবার শুধাল, তার গলার স্বর আরো নিচু হলো।
“উৎসুক কেন হতে যাব?” সাঁঝ মুখ বাঁকাল, “আমি তো বেঁচে যাব! আপনি বিয়ে করে বউকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন, আমাকে আর প্রতিদিন রাত আড়াইটায় ফায়ার অ্যালার্ম বাজানোর জন্য বকা খেতে হবে না! আর ওই কেমিস্ট্রির বিক্রিয়া মুখস্থ করার যন্ত্রণা থেকেও মুক্তি পাব!”
আরযান আর কোনো কথা বলল না। পর মুহূর্তেই ঘটে গেল সেই চরম রোমাঞ্চকর ঘটনাটি! আরযান এক ঝটকায় সাঁঝের ডান হাত ধরে টেনে নিজের দিকে নিয়ে এলো। সাঁঝ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরযান তাকে ঘুরিয়ে স্টাডি টেবিলের কিনারায় একদম চেপে ধরল! সাঁঝের পিঠ ঠেকে গেল কাঠের ভারী টেবিলের সাথে, আর আরযান তার দুই হাত টেবিলের ওপর দু’পাশে রেখে সাঁঝকে সম্পূর্ণ নিজের দেহের খাঁচায় বন্দি করে ফেলল! দুজনের মাঝে এখন এক সুতো পরিমাণ দূরত্বও অবশিষ্ট নেই। সাঁঝের বুকের দ্রুত স্পন্দন আরযানের চওড়া বুকের সাথে স্পষ্ট অনুধাবন করা যাচ্ছে। সাঁঝের মুখের সব তেজ এক মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে গেল। সে চোখ বড় বড় করে আরযানের দিকে তাকাল। আরযানের গায়ের সেই চেনা, মোহিত করা পারফিউমের গন্ধ আর তীব্র উত্তাপ সাঁঝের পুরো মগজকে এক নিমেষে অসাড় করে দিল। “আ-আরযান ভাইয়া…” সাঁঝের গলা দিয়ে কেবল একখণ্ড ফিসফিসানি বের হলো।
আরযান তার মুখের খুব কাছে মুখ নামিয়ে আনল। এত কাছে যে আরযানের উষ্ণ নিঃশ্বাস সাঁঝের ঠোঁটের ওপর এসে আছড়ে পড়ছিল। আরযানের সেই তীক্ষ্ণ, সম্মোহনী চোখ দুটো সোজা সাঁঝের চোখের তারায় আটকে আছে। “তুই ভেবেছিস আমি অন্ধ?” আরযান গম্ভীর, গভীর আর কড়া স্বরে বলল, “তুই ভেবেছিস তোর এই হিংসায় জ্বলে যাওয়া মুখটা আমি চিনতে পারি না?”
সাঁঝ তোতলে উঠে বলল, “আমি… আমি কেন হিংসা করব…?”
“কারণ তুই ভালো করেই জানিস,” আরযান তার ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে সাঁঝের নিচের ঠোঁটটা আলতো করে স্পর্শ করল। সেই স্পর্শে সাঁঝের পুরো শরীরে যেন এক হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল!
আরযান নিচু স্বরে বলল, “তুই ভালো করেই জানিস, সাঁঝ এই মীর বাড়িতে, এই স্টাডি রুমে, আর এই আরযান হোসেনের জীবনে অন্য কোনো মেয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। কখনো ছিল না, কখনো হবেও না।”
সাঁঝের চোখের কোণ দিয়ে হঠাৎ এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। ভয় নয়, এক তীব্র, দমবন্ধ করা অনুভূতির চোটে সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। আরযান নিজের ঠোঁট দুটো সাঁঝের কানের লতির খুব কাছে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “যদি আর একবার ওই ঘটকের আনা কোনো পাত্রীর কথা তোর মুখ দিয়ে বের হয়, তবে আমি দাদাজানকে নিচে ডেকে এনে পুরো পরিবারের সামনে তোকে কোলে তুলে নিয়ে বলব ‘আমার বউ নির্বাচন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে!’ কথা কি মাথায় ঢুকেছে?”
“মানে?” সাঁঝ দ্রুত মাথা নাড়ল। সে এখন পুরোপুরি কাবু।
আরযান শান্তভাবে সাঁঝের গালের সেই চোখের জলটুকু ঠোঁট দিয়ে মুছে দিল। স্পর্শটা এত গভীর ছিল যে সাঁঝের চোখ আর খুলতেই ইচ্ছে করছিল না।
“কিছু না। এখন সোজা নিজের ঘরে যা,” আরযান তাকে একটু আলগা করে ছেড়ে দিল, “আর কাল বিকেলে যখন পাত্রীপক্ষ আসবে, তখন চুপচাপ ভালো মেয়ের মতো ট্রে হাতে নাস্তা নিয়ে আসবি। বাকি নাটক কীভাবে শেষ করতে হয়, সেটা আমার ওপর ছেড়ে দে।” সাঁঝ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে প্রায় ছুটেই স্টাডি রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। বুকের ভেতর তখন কেমিস্ট্রির সমস্ত পরমাণু একসাথে বিস্ফোরিত হচ্ছে!
চলবে? See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply