. #বজ্রমেঘ .
#পর্বসংখ্যা_৪১ .
#ফাবিয়াহ্_মমো .
গালের মাংস অনেকখানি কেটেছে। বেসিনে থুথুর সঙ্গে রক্ত বেরোচ্ছে। ঠাণ্ডা পানি মুখে নিয়ে আয়নায় তাকাতেই শাওলিনের বুকটা ধক্ করে উঠল। ডানগালের ওপর পাঁচ আঙুলের টকটকে লাল দাগ। মুখের পানিটা বেসিনে ফেলে শাওলিন বাথরুম থেকে বের হলো। অমনি দেখল তাশফিয়া জুলজুল চোখে তাকিয়ে আছে। বিস্ময়ে বলে ফেলল,
– আপু, তোমার গাল…
শাওলিন গালে হাত ছুঁয়ে বলল,
– এটা কিছু না।
তাশফিয়া চোখ সরাতে পারল না,
– কে মেরেছে, আপু? এতো লাল হয়ে গেছে!
শাওলিন ইতস্তত চোখে তাকাল। তাশফিয়া যদি ভুল করে অন্যখানে বলে ফেলে তাহলেই হবে ঘোর বিপদ। নিচের ঠোঁট আলতো কামড়ে বলল,
– তাশফিয়া, একটা অনুরোধ করব? রাখবে?
তাশফিয়া অন্যরকম চোখে তাকাল। মনে মনে স্থির করে ফেলেছে কলটা কাকে করবে। কণ্ঠে বিষম রাগ নিয়ে বলল,
– এর পেছনে রেবা আপু দায়ী না? আপুই তোমাকে মেরেছে না? আমি ভাইয়াকে বলব তো, দাঁড়াও।
শাওলিন অবাক হলো,
– তুমি কীভাবে বলছ এটা?
– কারণ আমি জানি।
– দেখো তাশফিয়া, যেভাবেই জেনে থাকো এখন চুপ থাকতে হবে। আমি বাড়ি থেকে বের হব, তার আগ অবধি কিচ্ছু বলবে না।
তাশফিয়া ঢোক গিলল। দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলল,
– আপু, তুমি জানো না এই বাড়িতে তোমাকে নিয়ে কী পরিমাণ নোংরামি হয়। মা সেদিনের পর অন্য মানুষ হয়ে গেছে। সবকিছুর জন্য তোমাকেই দায়ী করছে!
শাওলিন কোনো উত্তর দিল না। বুঝতে পারল না এই বাড়ির লোকগুলো এমন নির্মম স্বার্থে ঘেরা প্রবঞ্চক কেন। তাহমিদের মৃত্যু বা আত্মহননের পেছনে ও দায়ী? দেয়াল ঘড়িটায় সময় দেখে নিয়ে বলল,
– সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আমি বেরোব। যে যা বলার বলুক, মুখে তালা দিয়ে থাকবে। আমার ব্যাপারে কোনো কথার পাল্টা উত্তর দিবে না। কী বলেছি শুনেছ? আসি।
শাওলিন তাশফিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে মুচকি হাসি দিল। কাপড়ের ছোটো ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ছিল এমন সময় তাশফিয়া বলল,
– আপু, তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি।
শাওলিন পথ থমকে দাঁড়াল। চোখে অদম্য কৌতুহল নিয়ে বলল,
– কী কথা?
তাশফিয়া একমুহুর্ত ইতস্তত করল। তারপর দৌড়ে গিয়ে দরজাটা ছিটকিনি বদ্ধ করল। ফিরে এসে নিম্ন অধরে জিভ বুলিয়ে বলল,
– আমি খুব ছোটো থাকতে একটা ঘটনা শুনেছিলাম। মা বলতো, শোয়েব ভাইয়ার জন্য…
.
শোয়েব কথা বলছে না। চোখের তারা দুটো অস্থিরতায় থমথম করছে। লাঞ্চের পর লাগাতার ফোন করতে দেখা গেল। কিন্তু অপরপাশে একবারও কল রিসিভ হলো না। দুপুর তিনটা পাঁচে শোয়েব নোটিশ জমা দিল। সাড়ে চার বছরে এই প্রথম ছুটির আবেদন করল। রাফান আর পার্থ বুঝতে পারছিল, মানুষটার ভেতর ভয়ংকর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এমন স্তব্ধ ক্রোধ তারা আগে কখনো দেখেনি। শোয়েবের কালচে সবুজ জীপটাকে গর্জন করে বেরোতে দেখে বনকর্মী ডেভিড চাকমা চমকে যায়। রাফানের দিকে কপাল কুঁচকে বলল,
– শোয়েব স্যার নাকি ছুটি নিয়েছেন! উনি কোথায় যাচ্ছেন?
রাফান কোনো কথা বলল না। মোশাররফকে কল দেবার জন্য দূরে গেল সে। পার্থ শান্ত গলায় বলল,
– উনি চলে আসবেন, ডেভিড স্যার। আপনি ব্যস্ত হবেন না। চলুন, রিপোর্টগুলো দেখি।
রাফান মোশাররফকে খবর দিয়ে ‘ব্যাক আপ’ প্রস্তুত করল। নিজের কালো গাড়িতে দশ মিনিটের ভেতর রওনা দিল রাফান। পার্থ কানের ইয়ারপিসে শুনল,
– আমি গেলাম! এদিকে মেজর সুনীল, গুলজার স্যার রইল।
পার্থ মাথা নাড়াল। অমনেই গাড়িটা ধূলো উড়িয়ে মসৃণ সড়কে বেপরোয়া গতি তুলল। শোয়েবের কালচে সবুজ জীপ যেন পাহাড়ি সড়ক চিরে এগোচ্ছে। চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে ফেলেছে সুনীল দত্ত। দূর থেকে কালো বিন্দুসম লক্ষবস্তুটা কেমন ছাড়খার গতিতে ছুটছে। একজন সৈনিক চোখ থেকে দূরবীন নামিয়ে বলল,
– শোয়েব স্যারের গাড়ি ওটা! স্পিড সুবিধার না, স্যার!
সুনীল দত্ত ঠিক সেসময়ই একটা কল পেল। ওয়ারলেস যন্ত্রটা মুখের কাছে এনে বলল,
– চেকপোস্ট থেকে সুনীল দত্ত বলছি।
জীপ থেকে উত্তর দিল শোয়েব,
– রুট ক্লিয়ারেন্স দিন, সুনীলদা।
সুনীল গতির অবস্থা দেখে তৎক্ষণাৎ ব্যারিকেড সরাতে বলল। জীপটা যেন সেকেণ্ডের ভগ্নাংশে চেকপোস্ট ক্রস করল। মুখে বাতাসের ঝাপটা খেল সুনীল। এক ঝলকের জন্য দেখল, শোয়েব শুধুমাত্র বাঁহাতে স্টিয়ারিং ধরে ডানহাতে ওয়ারলেস নিয়ে কথা বলছে। হাঁ করে গমনপথের দিকে তাকিয়ে থাকল সুনীল। শোয়েব রুদ্র ভঙ্গিতে কোথায় যাচ্ছে?
.
তাশফিয়া সবে মাত্র বলতে যাবে, অমনেই ঠক ঠক করে দরজায় আঘাত পড়ল। চমকে উঠল দুজনই। ঘরে গাঢ় আঁধার। শাওলিন দরজার দিকে বলল,
– কে বাইরে?
– খোলো।
রেবেকার গলা শুনে তাশফিয়া হিম হয়ে গেল। শাওলিনের কবজি খামচে নিচুগলায় বলল,
– আপু, সাবধান। রেবা আপুর সামনে কোনো প্রশ্ন করো না।
কথাটা বলে তাশফিয়া রুমের বাতি জ্বেলে দরজা খুলে দিল। ছিটকিনি নামাতেই রেবেকা দৃপ্তপায়ে ঘরে ঢুকল। সরাসরি শাওলিনের দিকে নজর বিদ্ধ করে বলল,
– চলো, বাসায় ফিরবে। তোমার এখানে থাকার দরকার নেই।
শাওলিন ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড অবাক হলো। কিন্তু বাইরে প্রকাশ না করে বলল,
– আমি হলে ফিরব।
– আমি রাতের ট্রেনে সিলেট ফিরব, শাওলিন। যে বাড়িতে তোমার গায়ে হাত তুলেছি, সেখানে আর আমি একমুহুর্তও থাকব না। চলো।
– আপনি কলাবাগানে ফিরবেন?
– হ্যাঁ। সঙ্গে তুমিও।
শাওলিন আড়চোখে তাশফিয়ার মুখ দেখল। চোখে প্রশ্ন মেশানো কৌতুহল। চোখ ফিরিয়ে রেবেকার দিকে বলল,
– আমি তৈরিই আছি। আপনি চলুন।
– না। তুমি নিচে নামো। গাড়িতে গিয়ে বসো। একসেকেণ্ডও এখানে থাকা যাবে না।
তাশফিয়া কপালের চামড়া কুঁচকে ফেলল। হুট করে তাকাল শাওলিনের দিকে। শাওলিনও তখন তাশফিয়ার দিকে তাকিয়েছে। রেবেকা যেন একরাশ রহস্য ছড়িয়ে এখান থেকে যাবার কথা বলছে। তাশফিয়া মনে মনে ভাবছে, রেবা আপু ভয় পেয়েছে? আপুর চোখে কেমন যেন ভয়ের ছায়া দেখলাম। সে হঠাৎ শোকের বাড়ি কেন ছাড়বে? মা আপুকে কিছু বলেছে? না। আমার মনে হচ্ছে এখানে অন্যকিছু জড়িত! শাওলিন কাঁধে টোটব্যাগ নিয়ে ডানহাতে কাপড়ের ব্যাগ নিল। তাশফিয়াকে অন্যমনষ্ক দেখে কিছু বলল না। রেবেকার পিছু পিছু অগ্রসর হলে শাওলিন প্রশ্ন করল মনে মনে, হঠাৎ কী এমন হলো মণি এক কাপড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন? কেন বাসায় ফেরার জন্য অস্থির হয়ে গেলেন?
শ্রেষ্ঠা সন্ধ্যার দিকে গোসল করেছে। চুল থেকে টুপ টুপ করে পানি ঝরছে। তোয়ালে দিয়ে চুল ঝাড়ছে আর ঘরময় ঘুরে ঘুরে মায়ের বকুনির কাণ্ড বাড়াচ্ছে। ছোটোবোন নিপা দরজায় এসে বলল,
– আপি, আম্মু তোমাকে চা নিয়ে যেতে বলেছে। তাড়াতাড়ি শাড়ি পড়ো।
নিপার দুহাতে ট্রে ভর্তি খাবার। কথাটা জানিয়ে ড্রয়িংরুমের পর্দা ঠেলে ঢুকল সে। শ্রেষ্ঠাকে দেখতে ছেলেপক্ষ এসেছে। বাবার কলিগের ছেলে। শ্রেষ্ঠা বাবাকে যেমন ভালোবাসে, তেমনি বাবাকেই বাঘের মতো ভয় পায়। বাবা রাহাতের ব্যাপারে জেনেছে। প্রথম দেখাতেই রাহাতকে ‘চলবে না’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। শ্রেষ্ঠা ওসব শাড়ি না পরে একটা সুতির সাদা জামা পরল। লাল বাটিকের ওড়না, ঢিলে লাল পাজামা পরে চুলগুলো মাঝে সিঁথি কেটে সাধারণ চেহারায় বেরুল। যে চেহারার নিখুঁত কারিগর শুধু স্রষ্টা। চার খালাদের চারজনই শ্রেষ্ঠার অবস্থা দেখে ক্রুদ্ধ হন। চোখে নেই কাজল, ঠোঁটে নেই লিপস্টিক। শ্রেষ্ঠা একটা সোফায় বসে বলল,
– আসসালামুয়ালাইকুম।
পাত্র মেয়ের উপস্থিতি দেখে নত মাথা উঁচু করল না। মেঝের দিকে চোখ রেখে মাকে ইঙ্গিত করল। মা গুরুত্ব না দিয়ে মুখে বললেন,
– ওয়াআলাইকুমসসালাম।
শ্রেষ্ঠা তখুনি কপাল কোঁচকায়। মনে মনে যেটা ভাবছে, সেটা যদি সত্যি হয় তাহলে এখানেই আল্লাহ হাফেজ। বাবা অন্যঘরে কলিজ বন্ধু সাথে ধূমপান যোগে আড্ডা দিচ্ছে। পাত্রের সঙ্গে সব মহিলা সদস্য। শরীরে গয়নার চাকচিক্য নিয়ে একজন বলল,
– মা, আমি হচ্ছি ছেলের ফুপু। আপন ফুপু হই। সম্পর্কে তোমারও ফুপু।
মহিলা শ্রেষ্ঠার গা ঘেঁষে বসেছে। বিব্রত স্পর্শে গায়ে, ঘাড়ে হাত বুলিয়ে মাথার চুল টেনে দেখছে। যেন নকল না আসল বুঝে নিল। শ্রেষ্ঠা বুঝতে পারছিল ওর সঙ্গে কী ঘটছে। কিন্তু লজ্জার বিষয় এতোগুলো মহিলার ভেতর নিজেকে অপাঙক্তেয় মনে হলো। অন্যজন উঠে বসে শ্রেষ্ঠার বাঁদিকে বসলো। চতুর ভাবে শ্রেষ্ঠার হাত, নখ, আঙুল সব খুঁটে খুঁটে দেখছিল। আপন খালাদের দিকে তাকাল শ্রেষ্ঠা। তারা গরু বাছতে দিয়ে খোশমেজাজে গল্প করছে। ফুপু মহিলাটা হাসতে হাসতে বলল,
– একটু দাঁড়াও তো, মা। ঘরের ওদিক থেকে এ পর্যন্ত ডানপা দিয়ে হেঁটে আসো।
শ্রেষ্ঠা যারপরনাই অবাক হয়ে সোফা ছাড়ল। মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। শ্রেষ্ঠার খালাদের একজন পাত্রপক্ষকে তেলমর্দন করে বলল,
– নুপূর, যাও একটু হেঁটে আসো। তোমার এই ফুপু তোমাকে দেখতে চাচ্ছেন।
শ্রেষ্ঠা এবার কাহিনি বুঝল। এরা পাত্রী দেখার ছদ্মবেশে দাসী বাছাই করছে। নখ, চুল, হাঁটা সব দেখবে। শ্রেষ্ঠাও কম যায় না। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কোমরে মডেলিংয়ের মতো হাত রেখে বলল,
– ক্যাটওয়াক দেখবেন নাকি হর্সওয়াক? জিজি হাদিদের হাঁটা চলবে? নাকি ইয়াসমিন ভিয়ানালদামের মতো শেকল নাচাতে নাচাতে দেখাব?
ঘরের ভেতর যেন শব্দহীন বোমা ফাটল। কেউ কথা বলতে পারল না। শ্রেষ্ঠার সেজো খালা কঠিন গলায় বলতে যাবেন, তার আগেই শ্রেষ্ঠা সুযোগে কোপ দিয়ে বলল,
– আমার শরীর ব্রাজিলিয়ান ফিগার না। পশ্চাৎ দেখিয়ে বশ করতে চাইলে আমার সেজো খালার মেজো মেয়েটা আছে। সুইটেব্যাল। পছন্দ হবে গ্যারান্টি দিচ্ছি।
কথাটা বলতেই সেজো খালা হিসিয়ে বললেন,
– বেয়াদব কোথাকার! বুবু, এই বুবু! এদিকে আসো!
শ্রেষ্ঠা পাত্তা না দিয়ে খাবারের ট্রে থেকে একটা নিমকি তুলে নিল। ঠিক এমন সময় হাতের ফোনটা বাজতে লাগল। স্ক্রিনে নামটা দেখে কামড় দিতে পারল না ও। তড়িঘড়ি করে নিমকি ফেলে ফোনটা রিসিভ করে বাইরে চলে গেল। থতমত কণ্ঠে বলল,
– হ্যালো,
বহুদিন পর আবারও মানুষটার ভারী কণ্ঠ শুনল,
– তুমি হলে আছ, শ্রেষ্ঠা?
– না, স্যার। আমি তো বাসায়। কিন্তু কেন?
– শাওলিন ফোন ধরছে না। ফোনটা বন্ধ কেন?
– ফোন বন্ধ? জানা তো ফোন বন্ধ রাখার লোক না।
– সেটা জানি। এখন কীভাবে রিচ করতে পারব সেটা বলো।
শ্রেষ্ঠা দুই ভ্রুঁ এক করল। চিন্তিত সুরে বলল,
– আমি দেখছি ব্যাপারটা। আপনি নিশ্চিন্ত হোন ও ঠিক আছে।
– না, ঠিক নেই। দুপুর দেড়টায় কল দিয়েছে। কলে পুরোটা সময় কেঁদেছে। কী হয়েছে আমি জানি না।
শ্রেষ্ঠা বিস্ফোরিত চোখে তাকাল। বুক অজান্তেই ধক করে উঠেছে। প্রচণ্ড উদ্বেগ নিয়ে বলল,
– কেঁদেছে? জানা ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদার মানুষই না!
– কারণ খোঁজ করো। আর ফোনটা চালু কীভাবে করানো যায় সে ব্যবস্থাও করো।
– আমি দেখছি, স্যার। আপনাকে পরে কল করছি।
– আরো একটা কথা।
– জ্বি বলুন।
– সম্পর্কের ডায়নামিক বদলেছে না? স্যার ডাকো কেন? শাওলিন তোমার ছোটো হলে আমাকে কী ডাকা উচিত?
শ্রেষ্ঠা নিচের ঠোঁট উলটো করে দাঁতের সাথে চেপে ধরল। উপরসারির দাঁত দিয়ে কামড়ে বলল,
– নাম ধরে ডাকতে পারব না। আপনি আমার অনেক বড়ো। আমি ভাইয়া ডাকব।
– ঠিক আছে। কাজ করো।
শ্রেষ্ঠা নিপার ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল। নিপা শ্রেষ্ঠার এলোমেলো ঘর গুছিয়ে দিচ্ছিল। বড়োবোনের হন্তদন্ত ভাব দেখে বলল,
– আপি, এখন কোথায় যাচ্ছ? বাসায় মেহমান।
শ্রেষ্ঠা দাঁত চিবিয়ে বলল,
– আমার বা** মেহমান! ছেলেটাকে দেখেছিস? সালামের উত্তর দিতেও মায়ের অনুমতি নেয়া লাগছে! বাবা কেন সম্বন্ধ আনে!
– এটা তো খালামণির জোরাজুরি।
– জানার কী যেন হয়েছে। ও নাকি কলের ভেতর কাঁদছিল। ওর ভাবী মারলো টারলো নাকি বুঝতে পারছি না।
নিপা চমকে চাইল। বোনের দিকে উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,
– আমি সোহা আপুদের কল করব?
– নিপা, এখন না। হলে খবর নিয়ে আসি। স্কুটিটা নিয়ে গেলাম। মাকে বলিস।
শ্রেষ্ঠা জামাকাপড় বদলে ঢোলা জিন্সের প্যান্ট, হাঁটুস্পর্শী কালো কূর্তি পরল। চুলগুলো দুহাতে ঝড়ের বেগে খোপা পাকাল। চুল ছুটে এসে গালে, কপালে দোল খাচ্ছে। একটা চেস্টব্যাগ বুকে কোনাকুনি নিয়ে বেরুল শ্রেষ্ঠা। সিঁড়িতে স্নিকারের ধপধপ আওয়াজ জানান দিল শ্রেষ্ঠা বেরিয়ে যাচ্ছে।
.
শাওলিন কাঁচের জানালা ভেদ করে বাইরে দেখছিল। রাতের শহর সৌন্দর্য নিয়ে ফুটেছে। উজ্জ্বল আলোতে জ্বলজ্বল করছে পথ ঘাট, ভবন, দালান। রেবেকা পাশে নিশ্চুপ। হাতের আঙুল ফোটানোর শব্দ পেয়ে শাওলিন ডানদিকে তাকাল। রেবেকা আড় দৃষ্টি লক্ষ করে শাওলিনের দিকে ফিরল। শাওলিন অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলল,
– আপনি ভয় পাচ্ছেন আমি উনাকে সব বলে দেব।
রেবেকা স্থির থাকল। চোখের তারা দুটো নড়ল, কিন্তু পলকহীন চাহনি। শাওলিন জিভ দিয়ে গালের কাঁটাস্থান বুলাল। জ্বলে উঠল! চোখ কোঁচকাতে গিয়ে শান্ত করল নিজেকে। রেবেকা কয়েক মুহুর্ত নীরব থেকে বলল,
– আমি সেরকম খারাপ নই শাওলিন, যতটা শোয়েব তোমাকে বুঝিয়েছে। ও একটা বাটপার, মিথ্যুক। তুমি একদিন ঠিকই বুঝবে কেন আমি বিয়েতে বাধ্য হয়ে মত দিয়েছি।
শাওলিন মনে মনে বলল, আমাকে কেউ কিছু বলেনি। আপনার মতো সবাই চুপ আছে। রেবেকা গভীরভাবে দম ফেলে বলল,
– তোমার গায়ে একটা ফুলের টোকাও পরতে দিইনি। সেই আমি ওভাবে চড়টা দিয়েছি! এই হাতটার ওপর ঘেন্না হচ্ছে। হাতটা কী কেটে ফেলব?
শাওলিন চোখ ছোটো করল। প্রশ্ন মাখানো স্বরে বলল,
– হাত কেটে ফেললে কী হবে? সমস্যা যখন আপনার মনে।
রেবেকা কথা বলতে পারল না। বড়ো বড়ো চোখদুটো অস্বাভাবিক স্থির হয়ে গেল। যেন বোঝার চেষ্টা করছে হাওয়া কোনদিকে। একটু চুপ থেকে মলিন সুরে বলল,
– তুমি রেগে থাকলে রাগো শাওলিন। কিন্তু নিষ্ঠুরের মত কথা বলো না। তোমাকে আমি স্নেহ করি, ভালোবাসি। আমার অনুভূতিটা মিথ্যা না।
জানালার বাইরে তাকাল শাওলিন। কোন রূপটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে মায়ায় ঢাকা শাওলিন বুঝতে পারছে না। গাড়িটা ওদের এলাকায় প্রবেশ করল। কাঙ্ক্ষিত ভবনের সামনে নামতেই লিফটে নবম তলায় পৌঁছুল। ফাঁকা করিডোর। সুনশান চারিদিক। ঘড়িতে নটার মতো বাজে। রেবেকা ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটছিল। শাওলিন ব্যাগ থেকে চাবি নিয়ে কি-হোলে চাবি ঘুরাল। জোহরা বাসায় নেই। গ্রামেরবাড়ি গিয়েছেন। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নাকে চিরচেনা ঘ্রাণ ধাক্কা দিল। জোরে দম টানল শাওলিন। বাতাসে কী যেন বোঝার চেষ্টা করছে। রেবেকা পেছন থেকে জুতা খুলে ভেতরে ঢুকছে, এমন সময় দরজা সংলগ্ন ছোটো আলমারির দিকে চোখ থমকাল। রেবেকা ছোটো কাঠের আলমারি খুলতেই শাওলিন তখন টোটব্যাগ রেখে ফ্ল্যাটের চারপাশ দেখছিল। হঠাৎ রেবেকা আঁতকে উঠে চেঁচাল,
– শাওলিন! শাওলিন, জলদি এসো! ভেতরে যেয়ো না!
শাওলিন পিলে চমকে তাকাল। রেবেকা এভাবে চিৎকার করছে কেন? কী হয়েছে? শাওলিন একরাশ দুশ্চিন্তা গেঁথে দ্রুত ফিরে গেল। রেবেকা দরজার কাছে হতভম্ব চেহারায় বলল,
– এগুলো কী?
রেবেকার যেন ভয়, উদ্বেগ, আশঙ্কা। হাতের ফোন থরথর করে কাঁপছে। শাওলিন মেঝের দিকে তাকাতেই কে যেন বাতাসে উত্তর পাঠাল,
– আমার জুতা, রেবা।
ঘরের ভেতর নিঃশব্দে বজ্রপাত পড়ল। শাওলিন সমস্ত গা কাঁপিয়ে শিউরে উঠেছে। এ যে বহু পরিচিত স্বর! হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহর তোলা আলোড়ন! পায়ের তলায় যেন মাটি নেই। শব্দটা যেখান থেকে এল সেদিকেই শাওলিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে। রেবেকাও দেখতে পেল ড্রয়িংরুমে শব্দ ছাড়া টিভি চলছে। টিভির পর্দায় ইউরোপীয় লীগের ফুটবল ম্যাচ। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে নেমেছে দুদল। সোফায় কেউ বসে আছে। এখান থেকে কেবল মাথাটা দেখা যাচ্ছে। শাওলিন ওই মাথাটা চেনে! ওই কালো-বাদামি ঝরঝরে চুলগুলোতে ওর আঙুল ডুবেছে! শাওলিন স্তব্ধ চোখে সুইচ টিপে দিল। সারা ঘর আলোকিত হয়ে ড্রয়িংরুমেও কিছু আলো প্রবেশ করল। রেবেকা বিমূঢ়। কাঠপুতুলের মতো স্থবির দাঁড়িয়ে আছে। টিভিটা বন্ধ করে সোফা ছেড়ে উঠল দীর্ঘদেহি ছায়াটা। নিকষ আঁধার থেকে উজ্জ্বল আলোয় এসে দাঁড়ালে রেবেকা বিস্ফোরিত চোখে তাকাল। শাওলিন ছলছল চোখে নিচের ঠোঁটে দাঁত বসালো। এতো জোরে, যেন সমস্ত ব্যথা যন্ত্রণা সেরে গেছে। কিন্তু দীর্ঘদেহি মানুষটা ওর দিকে তাকাল না। সে তাকাল রেবেকার দিকে। আগুন ঝলসানো চোখে স্থির হয়ে গেছে। রেবেকা শব্দ করে পেছাল। শাওলিন ভড়কে পিছু তাকাল। রেবেকা অদ্ভুত গলায় বলল,
– তোমার আসার কথা না! তুমি…
কথাটুকু কেড়ে বিদ্রুপ করল শোয়েব,
– টিকিট কেটে পালাবে ভেবেছ?
এবার শুধু রেবেকা নয়, শাওলিনও চমকে তাকাল। ঘণ্টাখানেক পর মণি সিলেটের উদ্দেশ্যে বের হবে, এ কথা কীভাবে জানতে পারল? শাওলিন কিছু বলবে, তার আগেই শোয়েব হাত উঁচু করল। চোখ দুটো রেবেকার ওপর স্থির করে বলল,
– প্রশ্ন ছাড়া সব জানাও।
শাওলিন বীতশ্রদ্ধ ভাবে ঢোক গিলল। রেবেকার দিকে চোখ তুলে শোয়েবের দিকে ফিরে বলল,
– ওসময় আবেগপ্রবণ…
শোয়েব হুংকার দিয়ে উঠল,
– তোমাকে বলিনি। আমি তোমাকে বলেছি।
শোয়েবের দৃষ্টি ধীরে ধীরে শাওলিনের মুখ থেকে সরে গিয়ে রেবেকার ওপর স্থির হলো। সেই দৃষ্টিতে ছিল ভয়ংকর কিছু। ঠান্ডা, ধারালো, নির্মম।রেবেকা এক পা পিছিয়ে গিয়ে দরজাটা ঠেলে বন্ধ করল। লক লাগাল না। যেন কিছুই হয়নি, এমন নির্লিপ্ত স্বরে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
– তোমার সঙ্গে কিছু হয়নি। তাই অযথা ঝগড়া করতে চাই না।
শোয়েব এক কদম এগিয়ে ডানহাতে শাওলিনের গাল ধরল। শাওলিন বুঝতে পারছিল এখনই কিছু না বোঝালে একটা অনর্থ হবে। সাহস সঞ্চয় করে বলল,
– উনি চলে যাচ্ছেন, দয়াকরে যেতে দিন। ইচ্ছে করে কিছু করেননি। শোকের বাড়িতে মাথা শান্ত রাখা যায় না।
গাল ছেড়ে দিল শোয়েব। একটা টু শব্দও করল না। শাওলিন এই ভঙ্গি দেখে আতঙ্কে জমে গেল। চোখের পলক ফেলেছে, এমন মুহুর্তে শাওলিন দেখল শোয়েব রেবেকার দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। বিস্মিত চোখে দৌড়ে গেল শাওলিন। রেবেকা থেমে নেই। মুখের শেষ বাক্যবাণ ছুঁড়ে বলল,
– জঙ্গলী কোথাকার! গাড়ি ছুটিয়ে শহরে এসেছ ঝগড়া করতে! মারামারি করতে!
শোয়েব বন্য পশুর মতো হিসহিস করছে। দমিয়ে রাখতে পারছে না শাওলিন। দুহাতে জাপটে ধরেছে শোয়েবকে। শক্ত বুকের ভেতর মাথা চেপে বলে চলেছে,
– শান্ত হোন! আপনি শান্ত হোন! এটা ফ্ল্যাটবাড়ি, এরকম করবেন না। চিৎকার চেঁচামেচি সব বাইরে শোনা যাবে।
শোয়েব কিছু শুনল না। এক ঝটকায় শাওলিনের হাত সরিয়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– সরে দাঁড়াও।
শাওলিন দুদিকে হাত মেলে দিল। মাথা নাড়িয়ে বলল,
– না।
– বলেছি সরে দাঁড়াও!
– আপনি এরকম করলে আমি কলই দেব না। বিপদের সময়েও না!
মেজাজ আরো খারাপ হলো। গর্জে উঠল শোয়েব,
– আমার রাগ বাড়ানোর চেষ্টা করো না, শাওলিন।
শাওলিন তখন পাশে ফিরে রেবেকাকে বলল,
– ভেতরে যান। রুম থেকে বেরোবেন না। ড্রাইভার চাচাকে বলুন গাড়ি বের করতে!
রেবেকা সুযোগ পেয়ে দৌড়ে রুমে ঢুকল। ধাম করে দরজা লাগাল। ভেতর থেকে উচ্চকণ্ঠে ভেসে এল,
– জানোয়ারের মতো আচরণ করছে! আমার বাসায় এসে আমাকে হুমকি! কতো বড়ো সাহস!
শাওলিন আশ্চর্য হয়ে গেল। উনি কী বুঝতে পারছে না শাওলিন উনাকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে? আগুন ঘি ঢালার মতো কথা বলছে কেন? ওই পলকা কাঠের দরজা যে এক মুহুর্তে উড়ে যাবে, এটা উনি বোঝেন না? শাওলিন সামনে ফিরে চমকে উঠল। শোয়েব হাতে ফুলদানি তুলে নিচ্ছে। রেবেকা যে আর কিছুক্ষণের ভেতরেই বেরোবে, এটা বুঝেই যেন মারণাস্ত্রটা হাতে ধরল। শাওলিন ছুটে গিয়ে কবজিটা দুহাতে আঁটকালো।
– ছাড়ুন! ছাড়ুন এটা। আপনি মারামারি করতে এসেছেন? আল্লাহ… আমি যদি জানতাম, ভুলেও কলটা দিতাম না।
শাওলিন ধস্তাধস্তি করে ফুলদানিটা মেঝেতে ফেলল। কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দে সারা ফ্ল্যাট ভীতিকর শব্দ ছড়িয়ে দিল। শাওলিন হাঁপিয়ে উঠেছে। বুকটা অসম্ভব ওঠানামা করছে। কিন্তু হাতের বাঁধন আলগা করল না। শোয়েব এখনও রাগে কাঁপছে। শরীরের প্রতিটি পেশি শক্ত হয়ে আছে। শাওলিন ক্লান্ত হয়ে মাথাটা তার শক্ত বুকে ঠেকিয়ে দিল। শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলল,
– বুঝেছি, প্রতিশোধ নিতে জানেন। কিন্তু এখন শান্ত হোন।
শাওলিন সেই সকালে কিছু খেয়েছিল। ইনকোর্স পরীক্ষা দিয়ে একমুহুর্তও স্বস্তি পায়নি। ঝড়ের পর ঝড়। শাওলিন যেন ন্যুব্জ স্বরে বলল,
– আমিও ক্লান্ত। আপনিও ক্লান্ত। উনাকে যেতে দিন।
মাথা তুলে শোয়েবের মুঠোটা দুহাতে ঢেকে নিল শাওলিন। হিংস্র পশুকে শান্ত বানাচ্ছে, এমন মৃদু গলায় বলল,
– আসুন।
শাওলিন সাবধানে কাঁচের টুকরো দেখে দেখে এগোতে লাগল। পেছন ফিরেও দেখল শোয়েব ঠিকভাবে পা ফেলল নাকি। শাওলিনের রুম ফ্ল্যাটের দক্ষিণমুখী। দরজায় ঘিয়ে রঙের চোখ জুড়ানো পর্দা, লম্বায় মেঝে ছুঁই ছুঁই করছে। ঝাপটা দিয়ে সরিয়ে ভেতরে মানুষটাকে নিয়ে এল। আঁধার ছাওয়া ঘর। শাওলিন বাতি না জ্বলে আগে দরজা আঁটকানো নিরাপদ মনে করল। বন্ধ দরজায় পিঠ দিয়ে শব্দযোগে শ্বাস ছাড়ল শাওলিন। ঘুটঘুটে আঁধারে দীর্ঘদেহি ছায়াটাকে দেখতে দেখতে বলল,
– শরীর ভরা রাগ নিয়ে খু&ন করতে এসেছেন? না থামালে কী করতেন?
উঁচু কাঁধ দুটো ঘুরে দাঁড়াল ওর দিকে। শাওলিন বুঝল, অন্ধকারে ওর দিকেই চেয়ে আছে। কেমন যেন শিরশির করল গা-টা! পরনে থাকা ধূসর স্যূটটা খুলে একপাশে রেখে সে এগোল। পেছনে দরজা, সামনে সে। শাওলিন চোখ সওয়া আঁধারে দেখতে পেল, তার একান্ত ছায়ামূর্তিটা তাকে বন্দি করে ফেলেছে। কোমরের ডানপাশ থেকে একটা হাত ধীরে ধীরে বাঁপাশে এনে জড়িয়ে ধরল। একটু পর শাওলিন টের পেল, পায়ের নিচে সত্যিই ভূমি নেই। ওকে দুহাতে বন্দি করে বুকে জাপটে ধরেছে। এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছে, যেন জীবনের শেষ অবলম্বন আঁকড়ে নিজেকে ডুবন্ত সাগর থেকে বাঁচাতে চাইছে। ভীষণ নিচু এক সুরে মানুষটা বলল,
– যেখানে ব্যথা, সেখানে যেমন হাত পড়ে। যেখানে তোমার অস্তিত্ব, সেখানে বারবার আমার আগমন হবে।
চলমান।
#নোটবার্তা — তারপর, কেমন লাগল পর্ব? কত প্রশ্ন, কত রহস্য, কত উদ্বেগ জমা এখনো। কিন্তু মানুষটা তবু ধরা দিচ্ছে না যেন। জানাবেন তো, কেমন লাগছে সবার।
অবিরাম ভালোবাসা। চট্টগ্রামবাসীর জন্য আকুল দোয়া। বন্যার দূর্যোগ আল্লাহ কাটিয়ে দিন।
. #বজ্রমেঘ .
#পর্বসংখ্যা_৪১ .
#ফাবিয়াহ্_মমো .
অংশ – ০২.
ক্রমশ ফুলে উঠছিল পেশিবহুল কাঁধ। পিঠের কম্পন বুঝিয়ে দিচ্ছিল দুর্বিনীত রাগ। শাওলিন দুহাতে জড়িয়ে রেখেছে শোয়েবকে। মেরুন শার্টের কাপড়টুকু আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে মুচড়ে নিয়ে বলল,
– শান্ত হোন। যেতে দিন। যা ইচ্ছে বলুক আপনার কান দিতে হবে না। কেউ যখন চাইছে আপনি রেগে গিয়ে ভয়ংকর কিছু করুন, তখন উচিত চুপ হয়ে যাওয়া।
শোয়েব শাওলিনের ডান কাঁধের খোপে নিজের মুখ লুকিয়ে বলল,
– ওকে চুপ করতে বলো। আমি দরজা ভেঙে মৃত্যু ডাকতে চাই না।
শাওলিন গাল ও কানে তপ্ত শ্বাস টের পাচ্ছে। শার্টের ওপর মুঠো আলগা করে তার চুলে আঙুল রাখল। শান্ত-ধীর গলায় বলল,
– এগুলো আপনার মুখের ভাষা না। আপনি বুঝতে পারছেন না উনি আপনার কোন দিকটা প্রকাশ করতে চাচ্ছে। আপনি না চাইতেও নিজের ব্যক্তিসত্তা ভুলে যাচ্ছেন।
শোয়েব হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে ভেতরে ভেতরে কিছু একটা নিয়ন্ত্রণ করল। শাওলিন হয়ত ভাবছে শোয়েব ক্রোধে এমনটা করছে। এই বাক্য, এই ব্যবহার শুধুই বিশ্রী ক্রোধের নামমাত্র বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু গভীর থেকে শোয়েব জানে, এটাই তার সর্বসত্তা। সে এটাকে শান্ত-ভদ্র-সম্ভ্রম চেহারায় মুখোশ বানিয়ে রেখেছিল। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিকের দিকে এলে এমন সময় রেবেকা বিষবাণ ছুঁড়ল,
– শাওলিন, আজ ঘরের ভেতর যাকে সামলাচ্ছ, তাকে তুমি মহৎ মানুষ ভাবছ। আমি যে ভুলটা করেছি সেটা কেন করেছি একদিন বুঝবে। শীঘ্রই জানতে পারবে ওই মানুষরূপী জানোয়ারটা কত বড়ো ধুরন্ধর। ও তোমাকে শুধুই স্বার্থের কারণে ব্যবহার করছে।
শাওলিন চোখ খুলে ফেলেছে। উনি কী নির্বোধ? কী শুরু করেছে? কীসের ক্ষোভ ঝাড়ছে? শাওলিন বুঝতে পারল বাঁধা দেয়ার শেষ সীমাটা ভেঙে পড়ল। শোয়েব হাত ঢিল করে শাওলিনকে ছেড়ে দিয়েছে। শাওলিন অস্থির সুরে বলল,
– খবরদার, বাইরে কান দিবেন না! আমার কথা শুনুন। তাকান। তাকান বলছি।
শোয়েব নিজের দুগাল থেকে শাওলিনের নরম হাতদুটি সরিয়ে দিল। শাওলিন দরজা থেকে একচুল সরলো না। ঠিক তখনই বাইরে থেকে রেবেকা গলা ভেসে এল,
– শোয়েব, তোমাকে চিনতে আমার ভুল হয়নি। তুমি এক মিথ্যাবাদী, পিশাচ। তোমার বাবা-মা বেঁচে থাকলে তোমাকে ছেলে বলতেও ঘেন্না করতেন। তুমি ওই এতিম মেয়েটাকে নিজের অসাধু ইচ্ছায় ব্যবহার করলে। তুমি কেন ঢাকায় থাকোনি সেটা প্রথম প্রথম না বুঝলেও এখন ঠিক বুঝে গেছি। আর জেনে রেখো, আমাকে খারাপ বানাতে চাইছ না? শাওলিন তোমাকে ভালো থাকতে দিবে না।
রেবেকা ধাম করে দরজা খুলল। শোয়েব খেপে ওঠা শ্বাপদের মতো ফোঁস ফোঁস করছে। হাতের মুঠো, কপালের রগ, চোখের চাহনি যেন হিম মৃত্যুর আগমন বোঝাচ্ছে। শাওলিন এতোটা আতঙ্কগ্রস্ত কখনো হয়নি। শোয়েবকে পাশবিক গলায় বলতে শুনল,
– রেবা, যদি মানুষের বাচ্চা হয়ে থাকো, পালাবে না!
শাওলিন দুহাতে দরজা আগলে দাঁড়িয়ে রইল। কথাগুলো শুনে শুধু ঢোক গিলল সে। মনে মনে যে ভয়ংকর আশঙ্কাটা করছে, সেদিকে দৃকপাত করে বলল,
– কান দিবেন না। আবারও বলছি আপনি শুধু এদিকে মনোযোগ দিন।
আর কোনো ভাষা অবশিষ্ট নেই। কথায় মানুষটাকে থামানো যাচ্ছে না। শেষ ভরসা হয়ে উঠল স্পর্শ।শাওলিন অভাবনীয় একটা ব্যাপার ঘটাল। শোয়েবের মাথাটা খামচে মিষ্টি ঠোঁটদুটো তার ঠোঁটের কাছে তুলে দিল। শোয়েব আক্রোশে শ্বাস ছাড়ছে। শাওলিনকে আগ্রাসী থাবায় ধরতে গিয়ে ওর পেছনে থাকা কাঠের দরজায় হাত ভর দিল। তুলোর মতো নরম তুলতুলে ঠোঁটদুটি কাঙালের মতো বুঝে নিল সে। অনভিজ্ঞ শাওলিনকে তার অভিজ্ঞ আদরে বিহ্বল বিবশ করে তুলল। বাইরে চাকার ঘর্ষণে পরিবেশ শব্দময়। দুজনই বুঝতে পারল রেবেকা চলে যাচ্ছে। দরজা বন্ধের শব্দ পেতেই শোয়েব পাজকোলে শাওলিনকে উঠিয়ে নিল। একমুহুর্তের জন্যও শাওলিনকে মুক্ত করেনি। ঘর আঁধারে আচ্ছন্ন। খোলা জানালাগুলো দাপুটে হাওয়ায় ঘর শীতল করেছে। রাস্তা থেকে আসা স্বল্প ঘুম ঘুম আলোয় চোখ সয়ে আসে। শাওলিন সেই আলোতে দেখল শোয়েবের উন্মত্ততা, তার ব্যাকুল মুখায়ব, তার পুরুষালী ভ্রুঁ দুটোর অভিব্যক্তি, কখনো কুঁচকাচ্ছে, কখনো মসৃণ। ডানদিকের ভ্রুঁতে পূর্বপরিচিত কাঁটা দাগ দেখতে পাচ্ছে। শাওলিন জোরপূর্বক নিজেকে মুক্ত করে ওই কাটা স্থানে আলতো আঙুল ছুঁয়ে দিল। সেখানে ঠোঁট গাঢ় চুমু এঁকে দিল শাওলিন। দুহাতের কোমল তালু ক্লিনশেভ গালদুটোকে শক্ত করে ধরল। শোয়েব নীরব। চোখদুটো বোজা। তার শ্বাসের উষ্ণতা শাওলিনের গলা ছুঁয়ে দিচ্ছে। শাওলিন মৃদু গলায় বলল,
– রাগ কমলো? নাকি আরো অবশিষ্ট আছে?
শোয়েব কথা বলল না। চোখের চাহনি ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল। হাতের মুঠো শিথিল হয়ে গেল। শাওলিন আবার শুধাল,
– আপনার বডিগার্ড দুজন এসেছে?
শোয়েব বিবশ চোখে দুবার দুদিকে মাথা নাড়াল। শাওলিন দেখল বাতাসে ঘরের সবকিছু উড়লেও মানুষটার চুল উড়ল না। ঐশ্বর্যের বলা ক্রুকাট ছাঁটের কথা মনে পড়ে যায়। হঠাৎ প্রশ্ন করল,
– গাড়ি কী নিজেই চালিয়েছেন?
এবার শোয়েব বলল। দৃঢ়, কঠোর, প্রস্তর স্বরে,
– হুম।
শাওলিন বিছানায় থাকলেও পিঠের নিচে শোয়েবের একটা হাত রাখা ছিল। হাতটাকে সরাতে বলল না। বরং পাশের বালিশটা দেখিয়ে বলল,
– মাথা রাখুন।
শোয়েব ওদিকে একঝলক তাকিয়ে ওর দিকে ফিরল। ধীরে না সুলভ মাথা নেড়ে বলল,
– ওখানে না।
শাওলিন বিভ্রান্ত চোখে তাকাল। প্রশ্নসুরে বলল,
– তাহলে কোথায়?
– এখানে। তোমার পাঁজরার কাছে।
শোয়েব বলতে বলতেই মাথা নিচু করতে যাচ্ছিল, শাওলিন আঁতকে ওঠে বলল,
– এখন না!
শোয়েব মাঝপথে থমকে তাকাল,
– তাহলে কখন?
শাওলিন কিছুসময় নিশ্চুপ থেকে বলল,
– দূর থেকে এসেছেন। সারাদিনের জার্নি। গোসল না হোক, হাতমুখ ধুয়ে কাপড় পাল্টে কিছু খেয়ে নিন। রান্না চাপাচ্ছি। যান, ফ্রেশ হয়ে নিন।
শোয়েব ঠোঁটের কোণে হাসির ভাঁজ ফেলে বলল,
– তারপর আমাকে সুযোগ দেবে?
শাওলিন লজ্জায় ডুবে গেল। কী বলবে খুঁজে পেল না। শোয়েব চোখ থেকে চশমা খুলেছে। নীল চোখগুলো দস্যুর মতো তাকিয়ে বলল,
– একাডেমিক ক্যালেণ্ডারে তো চারদিন বন্ধ। কাল থেকে ক্লাস নেই। এই চারদিন এই ঘরেই থাকো?
শাওলিন ভেতরদিকে গালের মাংস কামড়ে ধরল। এই ঠোঁটকাটা লোক একটা পাষণ্ড। ফড়ফড় করে কী বলছে, চোখের এতটুকু পর্দা নেই। হঠাৎ একটা ছুঁতো দেখিয়ে শাওলিন প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
– জোর বাতাস উঠেছে। হাত ঢিলে করুন। জানালাগুলো লাগানো দরকার। রাস্তার সব ধূলোবালি ঘরে ঢুকে যাচ্ছে!
ধাক্কা দিয়ে শোয়েবকে সরিয়ে শাওলিন উঠে গেল। বিছানা সংলগ্ন জানালায় দুহাতে থাইগ্লাস টেনে দিল। শোয়েব বাঁকা হেসে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বিছানা ছেড়ে উঠল। ড্রয়িংরুমে সোফার পাশে ডাফেল ব্যাগ রেখেছে। চেইন খুলে পোশাক বের করতেই দরজায় কলিংবেল বেজে উঠে। শাওলিনকে ব্যস্ত দেখে শোয়েব উঠে গেল দেখতে। একরাশ ভারিকণ্ঠে বলল,
– কে?
বাইরে সাড়া নেই। শোয়েব আবার বলল,
– কে বাইরে? কথা বলুন।
দ্বিতীয়বারও নিরুত্তর। কিন্তু পরক্ষণেই দেখা গের কলিংবেলে ক্রিংক্রিং বেজে উঠল। শোয়েব ভাবল দরজাটা খুলে দেখবে। রেবেকা নব টেনে বেরিয়েছে, তাই নব মোচড়ে দরজার বাইরে তাকাল সে। সাথে সাথে কপাল কুঁচকে বলল,
– জ্বি, আপনি কে মিস?
বাইরে অসম্ভব সুন্দরী এক মেয়ে। গোল মুখ, গালদুটো পাকা টমেটোর মতো লালচে, উজ্জ্বলবর্ণ গায়ের রঙ, চুলগুলো টানটান সমান। যেন সদ্য রিবণ্ডিং করা। দুহাতে প্লেটে ঢাকা খাবার। বিরিয়ানীর সুস্বাদু ঘ্রাণ ভেসে আসছে। শোয়েব মেয়েটাকে নিরুত্তর দেখে বলল,
– আপনি কী শাওলিনকে চান?
মেয়েটা যেন অচিন রাজ্য থেকে বাস্তব জগতে ফিরে এল। অপ্রস্তুত ভাবে হিমশিম খেয়ে বলল,
– জ্বি, কিন্তু… আপনি? শাওলিনের কী হন?
মেয়েটার হাবভাব প্রশ্নে শোয়েব সতর্ক হলো। একবার নিজের দিকে তাকাল সে। বুঝে গেল কাহিনি। ফিরে তাকিয়ে বলল,
– শাওলিন আমার ওয়াইফ। আপনার পরিচয়টা, মিস?
মেয়েটা বিরাট ধাক্কা খেল। ক্ষণিকের জন্য চেহারা থেকে হাসি মুছে গেল। কিন্তু দ্রুতই ঠোঁটে কৃত্রিম আভা ফুটিয়ে বলল,
– আপনি স্বামী? ওহ… আচ্ছা। আমি ভেবেছিলাম কোনো রিলেটিভ. . দেবর, ভাই। মা ওর জন্য বিরিয়ানী পাঠিয়েছে।
শোয়েব জলের মতো সব বুঝলেও বাইরে থেকে স্বাভাবিক। প্লেটটা হাতে নিতেই শাওলিন ‘ কে এসেছে? কার সঙ্গে কথা বলছেন? ‘ বলতে বলতে থমকে দাঁড়াল। দরজার বাইরে বাড়িওয়ালার মেয়েকে দেখে নির্বাক, স্তব্ধ। মেয়েটা চওড়া হাসিতে বলল,
– প্লেটটা বুয়ার হাতে পাঠিয়ে দিয়ো। আর তুমি তো সেকেণ্ড ফ্লোরে আসো-ই না। একদিন উনাকে নিয়েও তো আসতে পারো। গল্প হবে।
শাওলিন শুধু হাসি দিল। কেন যেন একটা উত্তরও জোগাল না। মেয়েটা চলে যেতেই দ্রুত দরজা লাগাল শাওলিন। প্লেটটা পাশের ছোটো আলমারির ওপর রেখে শোয়েবের দিকে বলল,
– আপনি এই অবস্থায় ওর সামনে গিয়েছেন?
শোয়েব মনে মনে শয়তানি হাসি দিচ্ছে। কিন্তু বাইরে থেকে পাথর। হিম-কঠোর চোখে তাকাল সে। তারপর পোশাক নিতে নিতে বলল,
– কেউ সিডিউস হলে দায় আমার না।
শাওলিন কখনো হিংসুটে ছিল না। কিন্তু এখন বুকে দাবানল টের পাচ্ছে। প্রচণ্ড আগুন গলায় বলল,
– আপনি শার্ট ছাড়া দরজা খুলেছেন কেন?
– কেউ ব্রেন ছাড়া তাকাবে কেন?
– নিজের দোষ স্বীকার করবেন না? কেউ এলে এভাবে দরজা খোলে? বুকের প্রত্যেকটা খাঁজ দেখিয়ে এখন ভদ্র সাজা হচ্ছে?
– আমি তো জানতাম না রাত পৌণে দশটার দিকে বাড়িওয়ালার মেয়ে আসবে। ছেলেও তো আসতে পারে।
– আপনি একটা কথাও বলবেন না। ওকে চেনেন? ভেতর থেকে যখন কে কে করেছেন, তখনই আপনার ভারি গলা শুনে চুপ হয়ে গেছে।
– আমি ধমকে বলিনি।
– আপনি সালাম দিলেও ধমকের মতো শোনায়।
শোয়েব ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। হিম চাহনি দিয়ে বলল,
– যদি আমার সালাম ধমকের মতো শোনায়, ওই মেয়ে তো আর সামনে আসবে না।
শাওলিন দীর্ঘক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল। ক্রোধে সারামুখ কঠোর করে বলল,
– মেয়েরা আপনার ধমকের কণ্ঠ ভয় পায় না।
কথাটা শুনে শোয়েব পালটা উত্তরে বলল,
– সমস্যাটা কী? তুমি কী আমার আসাটা মেনে নিচ্ছ না? বেরিয়ে যাব?
শেষ বাক্যে শাওলিন থমকাল। বুকের ভেতর যেন হৃৎপিণ্ডটাই খামচে উঠেছে। শোয়েব হাঁটু ভেঙে মেঝের ডাফেল ব্যাগ ছেড়ে তাকিয়ে আছে। শাওলিন একদৃষ্টিতে চুপচাপ দেখল শুধু। একটা কথাও বলল না। কাঁচের ভাঙা টুকরোগুলো ঝাড়ুর সাহায্যে বেলচায় তুলে নিল। প্রচণ্ড নিস্তব্ধ সুরে বলল,
– আপনি যেতে চাইলে আমি আঁটকানোর কে?
শাওলিন কাঁচ তুলে আর দাঁড়াল না। রান্নাঘরের দিকে দু এক পা যেতেই শোয়েব ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে দস্যু হাসিটা রেখে বলল,
– তুমিও যে জেলাস হও, এটা তো জানা ছিল না শাওলিন।
শাওলিন ধীরে ঘাড় পিছু করল। একপলক নিশ্চুপ থেকে বলল,
– ওই মেয়ে যদি কাল আবার না আসে, আপনি যা বলবেন তাই শুনব। কিন্তু জানি ও আসবে।
শোয়েব কোনো প্রত্যুত্তর করল না। শাওলিন একমুহুর্ত থেমে স্বর শান্ত করে বলল,
– পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রঙ বোধহয় নীল। আকাশের রঙ যত নীল হয়, ততই তাকে মন্ত্রমুগ্ধ লাগে। আমার সামনে সাক্ষাৎ ওই চোখদুটো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, আমার যা হয় তা কী অন্যদের বেলায় হয় না? আমি কী এই ভয়ে থাকব না মানুষের অন্তর নাপাক? আমি যাকে ভাগ্যে পেয়েছি, তাকে নিয়ে অন্যরা কীসব ভাবছে আমি কী ওসব বুঝি না? বরং, আপনিই আমাকে বোঝেন না!
শাওলিন সমুখে ফিরে রান্নাঘরে চলে গেল। শোয়েব সেই পথপানে তাকিয়ে রইল নিঃশব্দে। রেবেকার কথার প্রভাব ওর ওপর দেখতে পায়নি সে। একবারের জন্যও তাকে অবিশ্বাস করেনি শাওলিন। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল শোয়েবের। যেন বুঝল, ওই বুকের ভেতর পাঁজরা বন্দি ছোট্ট একটা ঘর আছে। সেই ঘরের একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দা শুধুই শোয়েব।
.
ঢাকার আরেকপ্রান্তে রাত এগারোটার সময়। মিন্টোরোড দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে যাচ্ছে নোয়াহ্ নেভি ব্লু গাড়ি। গাড়িতে একদল সাদা পোশাকধারী লোক। পরিচয় অজ্ঞাত। চালচলন, ব্যবহার সবকিছুতে এক অস্বাভাবিক তীক্ষ্মতা। ড্রাইভ করা লোকটি ঠোঁটের কাছে মাউথপিস এনে বলল,
– যেভাবেই হোক রাতের আঁধারেই এক্সিকিউট করতে হবে! এই সাসপেক্ট কানাগলি দিয়ে বেরিয়ে যায়। ডেঞ্জারাসলি চালাক। কিন্তু এবার না।
মাউথপিস থেকে খুব অস্পষ্ট গলায় কেউ বলল,
– খুব সাবধান। হাতে কোনো প্রমাণ নেই। এমনভাবেই নামচিহ্ন ঘুচিয়ে দেবে, যেন ফরেনসিক ট্রেস না থাকে।
ড্রাইভ করা লোকটি প্রচণ্ড স্নায়ুবিক চাপে আছে। কপালের ডানদিকে ঘামের চিকন রেখা কানের পাশ দিয়ে নেমে গেল। লোকটা ধীরভাবে বলল,
– এখন সাতজন আছি। একটু পর শাহবাগ পৌঁছে যাব। আমাদের ব্যাকাপ লাগবে স্যার।
উচ্চপদস্থ লোকটা ওপাশ থেকে বলল,
– ব্যাকাপ জায়গামতো রেডি থাকবে। তোমরা সেখানে পৌঁছাও।
সংযোগ কেটে গেল। ড্রাইভ করা লোকটা টিস্যু দিয়ে কপালের ঘামটুকু মুছল। গাড়ির স্পিড আরো বাড়াতেই একটা রেসিডেন্সিয়াল এলাকায় প্রবেশ করল। চারপাশ নীরব। দূর থেকে যানবাহনের কোলাহল হালকা ভাবে ভেসে আসছে। গাড়ি থেকে কেউ নামল না। একটা নবম-দশম তলার ভবনের সামনে অন্ধকার কোণে গাড়িটা থামিয়ে দিল। এই রেসিডেন্সিয়াল এলাকায় যে পাহারাদার আছে, সে দূরের বড়ো গেট থেকে এমনভাবে বিষয়টা অগ্রাহ্য করল যেন এখানে কোনো মশাও নেই। গাড়ি তো বহুদূরের কথা। লোকগুলো ঘড়িতে সময় গুণতে লাগল। পেছন থেকে পিনপতন নৈঃশব্দ্যে সামান্য শব্দ ছেড়ে বলল,
– কয়টার দিকে ঢুকতে বলেছে?
ড্রাইভার লোকের পাশের লোকটা বলল,
– মাঝরাতে। যখন কাক-পঙ্ক্ষিও জেগে থাকবে না।
উত্তরে ড্রাইভারের পেছনে বসা একজন বলল,
– এখানে কোনো গোপন আস্তানা আছে?
ড্রাইভার লোকটা বলল,
– এটা তো আবাসিক এলাকা। এদিকে অন্য কারণে আসে। কারণটা মনে হয় আন্দাজ করতে পারছি।
গাড়ির শেষদিক থেকে একটা প্রশ্ন ছুটে এল,
– কী?
– মেয়েঘটিত।
ড্রাইভারের পাশের লোকটা জবাব দিল। অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলল না। কিন্তু তারা জানতেও পারল না তাদের অগোচরে আরো একজোড়া গাড়ি জায়গামতো বসে আছে। একটা গাড়িতে আর কেউ নয়, রাফান সিদ্দিকী। অন্যটায়, সাদা ল্যাণ্ড ক্রুজার গাড়িতে মোশাররফ। রাফান স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে অন্যহাতে ফোনে কিছু টাইপ করল। লেখা শেষে পাঠাতেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা। এরপর বিপ্ বিপ্ আওয়াজ। ফোনের ব্রাইটনেস সর্বনিম্ন করে নোটিফিকেশনটা দেখল। নতুন আপকামিং ম্যাসেজে লেখা,
– “আজ রাত থাকব।”
রাফান ছোট্ট করে লিখল,
– “মোহাম্মদপুর রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ায় বসে আছে। ঠিকানা ভুল।”
– “ঠিকআছে।”
– “মনে হচ্ছে, এবার যাওয়ার সময় খেলা হবে। সবগুলো গাড়ির টায়ার যুদ্ধ করবে। আপনাকেও সাবওয়ে সার্ফাস খেলতে হবে স্যার।”
– “বাংলাদেশের রাস্তায় সাবওয়ে সার্ফাস আর ফ্রি ফায়ার – দুটোই নাহয় খেললাম।”
– “তাহলে ফুয়েল আর ইঞ্চিন দেখে দেব?”
– “মোশাররফকে বলো সিটগুলো দেখে নিতে।”
রাফান দুষ্টু হেসে লিখল,
– “আপনার মাথায় অন্য চিন্তা খাটছে নাকি?”
– “ইয়্যু শ্যূড গেট ম্যারিড, মাই বয়!”
রাফান হাসতে হাসতে লিখল,
– “আই ডু, শোয়েব স্যার। বাট দেয়ার ইজ নো ওয়ান ফর মি হু ক্যান হ্যাণ্ডেল মাই এংগার অ্যাণ্ড মাই অ্যাবসার্ড লাইফ।”
শোয়েব ফোনের স্ক্রিনে কথাগুলো পড়ল। দীর্ঘ শাওয়ার নিয়ে এখন ভেজা মাথা টাওয়েলে মুছে নিচ্ছে। নাকে রান্নার সুবাস এসে ধাক্কা মারল। শোয়েব ফোনটা রেখে নিঃশব্দ পায়ে ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে থমকে গেল শোয়েব। কড়াই থেকে উঠতে থাকা ধোঁয়ার ফাঁকে শাওলিন ডালে রসুন বাগাড় দিচ্ছে। অদ্ভুত এক শান্তি ছড়িয়ে আছে ঘরজুড়ে। কয়েক মুহুর্ত আগেই যে মেয়েটা তার ক্রোধ থামিয়েছিল, এখন সেই মেয়েটাই তার জন্য রাতের খাবার রান্না করছে।
#নোটবার্তা: পাঠকবৃন্দ, আজকের এই ছোটো পর্বটির জন্য আমি মার্জনার আর্জি জানাব। গতকাল সন্ধ্যা ছয়টা বিশে বাসায় ফেরা, পরবর্তীতে রার চারটা অবধি লেকচার মুখস্ত নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। আজ আধো ঘুম আধো মাতাল অবস্থায় ঝুঁকিটা নিয়েছি। যদি এই পর্বে অমার্জনীয় বা বেশি বৈসাদৃশ্য[বেখাপ লাগছে এমন] কিছু অনুভব করেন, নির্দ্বিধায় আমাকে জানাবেন। আমি এই পর্বটি ডিলিট দিয়ে চেষ্টা করব আপনাদের জন্য সন্তোষজনক একটি পর্ব লেখার। দেরির জন্য অসম্ভব ক্ষমাপ্রার্থী।
আমাকে অবশ্যই জানাবেন, আপনাদের সবার মতামত কী। অপেক্ষা করব। শুভরাত্রি।
Share On:
TAGS: ফাবিয়াহ্ মমো, বজ্রমেঘ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৪০(অংশসংখ্যা ০১ +০২)
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৪২
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২২
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩৫
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩৪
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৫
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৯(৯.১+৯.২)
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩৮
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৩১ [ অংশ সংখ্যা – শেষ ]
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৫