Golpo romantic golpo নবরূপা

নবরূপা পর্ব ৩২ ( সমাপ্তি পর্ব)


নবরূপা

পর্ব_৩২ ( সমাপ্তি পর্ব)

কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা

ইয়াহিয়া কবির স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি নিজের ছেলে বউকে আগামী সাতদিন এ বাড়ির চৌকাঠের আশেপাশেও দেখতে চান না। সহমত হয়েছেন আয়েশা বেগমও। এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে কারনটা হলো ইরফান যেন বউ বাচ্চা নিয়ে হানিমুনের পর্বটা খতম করে আসে। কথাটা শুনে নীহারিকা অস্বস্তিতে পড়েছে। সে তো আয়েশা বেগমের কাছ থেকে কথাটা সেদিন শুনে বুঝেছে ইরফানের বোধহয় ইচ্ছে নেই। তাই নীহারিকা ইরফানকে বলল,
—” আমি কোথাও ঘুরতে যেতে চাইনা। আপনার উপর কোনো জোর নেই।”

কিন্তু ইরফান উল্টো ধমক দিয়েছে নীহারিকা কে। ইনায়া ও নীহারিকাকে নিয়ে কখনোই একটু ঘোরাঘুরি করা হয়নি। কয়েকদিনের জন্য বাড়ির বাইরে থেকে একটু আনন্দ করলে সমস্যা টা কোথায়। তাই ইরফানও সম্মতি দিয়েছে এবং সাফসাফ নীহারিকা কে জানিয়ে আগামীকাল দুপুরেই তারা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবে। প্রথমে এখান থেকে গাড়িতে করে তারা যাবে রাশেদের বাড়িতে। তারপর সেখান থেকে যাত্রা শুরু করবে। হুট করে নীহারিকার উপর চাপ আসায় রীতিমতো কোঁমর বেঁধে ব্যাগ গোছানো শুরু করেছে সে। ইনায়াও গুটিগুটি পায়ে নীহারিকার পিছু পিছু ঘুরছে এবং আধো আধো স্বরে কথা বলছে। ইরফান কলেজ থেকে সাতদিনের ছুটি নিয়েছে ইতোমধ্যে।

বিকেলের দিকে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরল ইরফান। নীহারিকা প্রায় সব কিছু গোছগাছ করে ফেলেছে। রাতে বাকিটুকু করে তারা কালই বেরোতে পারবে। ইনায়াকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানোর পরপরই হুট করে নীহারিকার মাথা ঘুরতে শুরু করল। কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে শুরু করলো। বিশ্রাম নিতে সে নিজেও ইনায়ার সাথে বিছানায় শুয়ে পড়ল। একসাথে দুজনই ঘুমিয়ে পড়ল। ইরফান কলেজ থেকে ফিরে ঘরে এসে এ দৃশ্য দেখে মুচকি হাসলো। ফ্রেশ হয়ে এসে ছবি তুলে নিল মিষ্টি মুহুর্ত টার। এরপর ইনায়াকে আদর করে দিয়ে নিজেও তাদের পাশে শুয়ে পড়ল। নীহারিকার ঘুম হালকা ছিল। পাশে কেও শুয়েছে অনুভব করতেই চট করে চোখ খুলে পাশ ফিরে তাকালো। ইরফানকে দেখে তড়িঘড়ি করে বলল,
—” আপনি এসে গেছেন? সরি আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চোখ লেগে এসেছিল।”

ইরফান মাথা নেড়ে বলল,
—” সমস্যা নেই। ঘুমোও। আমিও ঘুমোবো।”

নীহারিকা মুচকি হেসে আবারো ইনায়ার দিকে ফিরল। বলল,
—” খেয়েছেন? “
—” হুম।”

ইরফান এগিয়ে এসে শোয়া অবস্থাতেই পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল নীহারিকা কে। চোখ থেকে ঘুম উড়ে গেলো নীহারিকার। ইনায়ার পিঠে বুলানো হাতটাও থমকে গেলো। কোনোমতে সে ইরফানের দিকে মুখ করে বলল,
—” কী হয়েছে?”
ইরফান ভ্রু কুঁচকালো,
—’ কিছু না তো।”
—” তো জড়িয়ে ধরেছেন কেনো?”
—” ঘুমোনোর জন্য। চুপচাপ থাকো। নড়ানড়ি করলে মা’র খাবে।”

নীহারিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—” চট্টগ্রামে আগে কখনো গিয়েছিলেন?”
—” হুম। কলেজ থেকেই একবার ট্যুরে গিয়েছিলাম।”
—” ওও।”
—” তুমি এত কাঁপছো কেনো?”

নীহারিকা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে সন্দিহান কন্ঠে বলল,
—” আসলেই কাঁপছি?”
—” তা-ই তো দেখছি।”
—” এত গরমে হুট করে ঠান্ডা লাগছে কেনো বুঝতে পারছিনা। মাথাটাও ঘুরছে। এজন্য বোধহয়।”

ইরফান দীর্ঘ দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
—” জ্বর তো আসেনি। ঘুমিয়ে পড়ো। ঠিক হয়ে যাবে।”

নীহারিকারও মনে হয়েছিল ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু রাতে আবারো খারাপ লাগতে শুরু করলো তার। শরীর দুর্বল হয়ে এলো। মাথা ঘুরতে থাকলো এবং মুখটাও ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। হুট করে এমন হওয়ার কোনো কারন বুঝতে পারলো না ইরফানও। কোনোমতে রাতের খাবারটা শেষ করার পর নীহারিকার মাথায় হুট করে ভাবনার উদ্রেক হলো। সে ঠোঁট কাঁমড়ে কিছুক্ষণ ভেবে ওয়াশরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। খুব সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে নিজেকে পরখ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবং মুখ ধুয়ে নিল ঠান্ডা পানিতে। সেই রাতটা বেশ অদ্ভুত ভাবেই কাটলো তার।


সকাল থেকেই আয়েশা বেগম তোরজোর শুরু করেছেন। ছেলে বউ বাইরে ঘুরতে যাচ্ছে, সেই কারনে তিনি বিভিন্ন তরিতরকারি তৈরী করে বাটিতে ভরছেন, যেন তারা খেতে পারে। এছাড়াও ড্রাই ফুডস এবং বিভিন্ন লাড্ডু, হালুয়াও বক্সে ভরে দিচ্ছেন ভদ্রমহিলা। নীহারিকার দেখে মনে হলো তারা কোনো মিশনে যাচ্ছে। ইরফানও সকাল সকাল প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা করতে বেরিয়ে পড়েছে। এদিকে নীহারিকার মাথায় অন্য এক চিন্তা ঘুরঘুর করছে। সে কোনোমতে ইনায়াকে খাইয়ে দাইয়ে গোসল করিয়ে দিল। দুপুরের মধ্যে সমস্ত কাজ শেষ করে বাকি গোছগাছও সেড়ে ফেলল। ইয়াহিয়া কবির ছেলেকে নির্দেশ দিলেন ঠিকমত দেখেশুনে গাড়ি চালাতে।

ইনায়া নীহারিকার গলা ধরে ঝুলে আছে সেই সকাল থেকে। আয়েশা বেগম দেখছেন আর অবাক হচ্ছেন। বাচ্চারা বুঝি আদর ভালোবাসা পেলে এভাবেই গলে যায়। কয়েকদিনের মধ্যেই কেমন করে যেন ইনায়া নীহারিকার জন্য পাগল হয়ে উঠলো। এমন এক অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়ে যে তাকে ছাড়া এক মুহুর্তও থাকতে পারেনা। অবশ্য মা বলে কথা! কোনো সন্তানই বাচ্চাকালে তার মা কে ছাড়া থাকতে চায়না।

দুপুরের খাবার খেয়েই ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লো ইরফান, নীহারিকা ও ইনায়া। ইনায়াকে ভীষণ মিষ্টি করে সাজিয়ে দিয়েছে নীহারিকা। সেও আজ ভীষণ খুশি। গাড়িতে উঠেই স্টিয়ারিং ধরে খেলতে শুরু করল ইনায়া। ব্যাকসিটে সমস্যা ব্যাগ লাগেজ উঠিয়ে ইরফানও ড্রাইভিং সিটে বসে পড়লো। আয়েশা বেগম ও ইয়াহিয়া কবিরকে বিদায় জানিয়ে তারা বিদায় নিল কবির মহল থেকে।

গাড়িটা ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো কবির মহলের গেট পেরিয়ে। দুপুরের রোদটা নরম হয়ে এসেছে, আকাশে হালকা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। সড়কের দুই পাশে মাঝে মাঝে সবুজের বিস্তার। গাছের সারি, মাঝে মাঝে ছোট ছোট বাজার, দোকান। গাড়ির ভেতরটাও অদ্ভুত এক শান্তিতে ভরে আছে। স্টিয়ারিং ধরে বসে আছে ইরফান। তার দৃষ্টি সামনে, কিন্তু মাঝে মাঝেই সেই দৃষ্টি চলে যাচ্ছে পাশে বসে থাকা তার পুরো পৃথিবীর দিকে। ইনায়া হাসতে হাসতে জানালার বাইরে হাত নেড়ে দিচ্ছে, আর তাকে কোলে নিয়ে বসে নীহারিকা তার চুল ঠিক করে দিচ্ছে। একটা ছোট্ট সংসার, চলন্ত, জীবন্ত। হালকা হেসে ইরফান বলল,
—” আমার মামনি কোথায়? “

ইনায়া খিলখিল করে হেসে উঠল। নীহারিকা চোখ রাঙিয়ে বলল,
—” খবরদার ওকে কোলে নেয়ার চিন্তা করবেন না। আমাদের ডিস্টার্ব করবেন না। চুপচাপ গাড়ি চালান।”

—” চালাচ্ছি তো। কিন্তু আমার কো-পাইলট তো ব্যস্ত।”

নীহারিকা একটু লজ্জা পেল।
—” আমি ব্যস্ত না।”

—” তাহলে একটু এদিকেও তাকাও।”

নীহারিকা ফিক করে হাসলো। গাড়ির ভেতরের বাতাসটা যেন একটু বদলে গেল। কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। শুধু গাড়ির শব্দ, আর দূরে বয়ে যাওয়া রাস্তা। ইরফান ধীরে বলল,
—” নীহা এখন ঠিক আছো? মেডিসিন টা নিয়েছো?”

—” হ্যাঁ নিয়েছি। এখন ঠিক আছি। সমস্যা নেই।”

ইরফান স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল,
—’ জানো, আমি কখনো ভাবিনি এমন একটা দিন আসবে।”

নীহারিকা তাকাল,
—” কেমন দিন?”

—” এই যে আমরা তিনজন একসাথে কোথাও যাচ্ছি। কোনো ভয় নেই, কোনো অস্বস্তি নেই, কোনো পিছুটান নেই। আছে শুধু শান্তি।”

নীহারিকার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
—” আমিও ভাবিনি।”
একটু থামল সে।
—” আমি তো ভেবেছিলাম এই সংসারে আমি শুধু দায়িত্ব পালন করব।”

ইরফান এক ঝলক তাকাল তার দিকে। বলল,
—” আর এখন?”

নীহারিকা জানালার বাইরে তাকালো। বাতাসে তার চুল উড়ছে হালকা।
—” এখন মনে হয় এই সংসারটাই আমার। পুরোপুরি।”
কথাটা বলার সময় তার গলায় একটা নরম কম্পন ছিল। ইরফানের হাত স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হলো একটু।
—” আমারও তাই মনে হয়। আগে মনে হতো আমি শুধু একটা দায়িত্ব পালন করছি, একজন বাবার দায়িত্ব। কিন্তু এখন, আমি বেঁচে আছি…বাঁচার মত বাঁচছি।”

নীহারিকা তাকালো এবার। ইরফান খুব শান্ত গলায় বলল,
—” তুমি আসার পর থেকেই… সবকিছু বদলে গেছে।”

নীহারিকার চোখে পানি চিকচিক করল।
—” আপনি আগে বলেননি কেনো?”

ইরফান হালকা হেসে বলল,
—” বলতে শিখিনি।”
—” আর এখন?”
—” এখন শিখছি।”
একটু থেমে, খুব আস্তে বলল,
—” তোমার কাছ থেকেই শিখছি।”

নীহারিকা হাসলো। ইনায়া জানালা দিয়ে বড় গাছগুলো দেখে আঙুল তাক করে আধো স্বরে বলল,
—” আম্মু! গাছ!”

নীহারিকা হাসল,
—” হ্যাঁ মা, গাছ!”

ইরফান হাসলো। কি আশ্চর্য! ইনায়া এখন বাবার থেকে আম্মু বেশি ডাকছে। বাবার ভালোবাসা কি কম পড়ে গেলো? ইরফান বলল,
—” জানো নীহা, আমি ভয় পাই এখন।”
—” কীসের ভয়?”
—” তোমাদের হারানোর।”
নীহারিকা চমকে তাকালো। ইরফান এবার পুরোপুরি সত্যিটা বলল,
—” আগে কখনো এমন ভয় পাইনি। কিন্তু এখন, মনে হয় তোমরা না থাকলে আমি কিছুই না।”

নীহারিকার চোখ ভিজে উঠল। সে ধীরে বলল,
—” তাহলে ধরে রাখুন।”
—” কীভাবে?”
নীহারিকা একটু হেসে বলল,
—” ভালোবেসে।”
একটা দীর্ঘ নীরবতা। ইরফান খুব আস্তে, খুব ধীরে বলল,
—” বাসি তো।”

আরো কিছুক্ষণ নীরবতা। মিনিট দশেক পর মহাসড়কে উঠে বামে একটা নির্জন জায়গায় ইরফান গাড়ি থামালো। নীহারিকা অবাক হলো
—” এখানে থামলেন কেনো?”

—” ওদিকে এটিএম আছে। আমি টাকা তুলে আনছি। তোমরা থাকো। ডোর লক করে যাচ্ছি।”

নীহারিকা হেসে মাথা নাড়লো,
—” আচ্ছা। “

ইরফান রাস্তা পার হয়ে অপর পাশে গেলে নীহারিকা ইনায়াকে নিয়ে খেলা করতে থাকলো। হুট করেই নীহারিকার কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে শুরু করলো। ঠিক কাল রাতের মতই, কিন্তু আরো গভীর। আরো কষ্টকর। বারবার জোরে শ্বাস নিতে থাকলো মেয়েটা। হঠাৎ তার চোখ চলে গেলো জানালা দিয়ে বামে। যেখানে রাস্তা নিচু হয়ে গিয়ে ধানের ক্ষেত ছাড়া আর কিছুই নেই। দুপুরের রোদে সব জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু কিছু একটা! কিছু একটা নীহারিকার চোখে পড়ছে না। অজান্তেই অনেকটা সময় ধরে রাস্তার পাশে থাকা ভাঙা পুরোনো চায়ের দোকানটার দিকে তাকিয়ে রইলো নীহারিকা। দৃষ্টি আটকে রইলো তার। দুপুরের তীব্র রোদে চারপাশ ঝলমল করছে, ধানের ক্ষেতগুলো যেন সোনালি আলোয় ভেসে উঠেছে। অথচ ওই জায়গাটা অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ। যেন আলো সেখানে গিয়ে থমকে গেছে।

ধীরে ধীরে ভাঙা চায়ের দোকানটার পেছন থেকে কিছু একটা নড়ে উঠলো। নীহারিকার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। তারপর সেটাকে দেখা গেল স্পষ্টভাবে। বেরিয়ে এলো সাদা পোশাকে মোড়ানো লম্বা। অস্বাভাবিক লম্বা একটা অবয়ব। মানুষাকৃতির! সাত ফুট? তারও বেশি। নীহারিকা ভয় পেলো না, কিন্তু হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো তার। চুপচাপ তাকিয়ে রইলো সে। সেই বিশাল আকৃতির মানুষের মত প্রাণীটা থেকে চোখও সরাতে পারলো না। মাথাটা নিচু, যেন ঘাড় ভেঙে সামনে ঝুলে আছে। হাত দুটো শরীরের পাশে ঝুলে আছে অস্বাভাবিক ভাবে, আঙুলগুলো লম্বা, কেমন বাঁকা। হাওয়া নেই। তবুও কাপড়টা কাঁপছে। নীহারিকার গলা শুকিয়ে গেল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও চোখ সরাতে পারছে না সে। ওটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। না, মাথা তোলা না। মনে হলো যেন পুরো মুখটাই কাপড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কাপড়টা ভিজে, কালচে দাগ লেগে আছে জায়গায় জায়গায়। যেন পুরোনো কোনো লাশ।
হঠাৎই, ওটার মাথা ঘুরে গেল সরাসরি নীহারিকার দিকে। একদম সোজা। চোখ নেই, তবুও মনে হলো তাকিয়ে আছে। দেখছে। শুধু তাকিয়ে না, চিনছে। নীহারিকার বুক ধক করে উঠল। তার হাত নিজের অজান্তেই শক্ত হয়ে গেল ইনায়ার গায়ের ওপর। ইনায়া তখনও নিষ্পাপ হাসিতে খেলছে, কিছুই টের পাচ্ছে না। এটা… কী…? মনে মনে বলতে চাইল নীহারিকা, কিন্তু শব্দ বের হলো না। হঠাৎ, ওই সাদা অবয়বটা এক পা এগোল। কোনো শব্দ নেই। মাটি ছুঁয়েও যেন হাঁটছে না। আর ঠিক তখনই, নীহারিকার মাথার ভেতর ঝলক দিয়ে উঠল একটা স্মৃতি।

সেই দিন তামান্নার আস্তানায় যাওয়ার আগে দুটো তাবিজ আসার কথা ছিল হুজুরের কাছ থেকে। কিন্তু ভুলে ইরফানকে হুজুর একটা তাবিজ দিয়েছিল। নীহারিকা জানতো তাবিজ তাদের দুজনেরই দরকার। কিন্তু ইরফানের ক্ষতির ঝুঁকি না নিতে সে ইরফানকেই তাবিজ পড়িয়েছিল। নিজে পড়েনি। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তাবিজ না পরেই চলে গিয়েছিল সেই অভিশপ্ত জায়গায়। তামান্নার সামনে দাঁড়িয়েছিল। কালো জাদুর ঠিক মাঝখানে। নীহারিকার চোখ বড় হয়ে গেল। উপলব্ধি করতে পারলো যেই ভয়টা সে এতদিন পাচ্ছিল, সেটাই গ্রাস করছে। তার বুকের ভেতর ঠান্ডা ভয় জমে উঠল। তাহলে, এটা কি সেই হিসেব? যা নেওয়ার ছিল, এখন তা নিতে এসেছে? হঠাৎ সেই অবয়বটা আরেকটু এগিয়ে এলো। এবার স্পষ্ট দেখা গেল, কাপড়ের ভেতর থেকে কিছু একটা নড়ছে। যেন ভেতরে কেউ শ্বাস নিচ্ছে, কিংবা নড়ছে। নীহারিকার চোখে পানি চলে এলো। ভয় না, একটা অদ্ভুত উপলব্ধিতে। “সব শেষ হয়ে যায়নি!”- মনে মনে বলল সে। কিছু একটা বাকি আছে! তার আঙুল কাঁপতে কাঁপতে ইনায়ার মাথায় বুলিয়ে দিল। বুকের ভেতর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে।

ঠিক তখনই ইরফানের ডাকে চমকে উঠলো নীহারিকা,
—” নীহা?”
এক ঝটকায় যেন সবকিছু কেঁপে উঠল। নীহারিকা তাকালো আবার সেই জায়গাটার দিকে। কিছুই নেই। ভাঙা চায়ের দোকানটা আগের মতই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। ধানের ক্ষেতগুলো বাতাসে দুলছে। যেন কিছুই ঘটেনি।
ইরফান দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল, অবাক হয়ে তাকালো নীহারিকার দিকে।
—”কি হয়েছে? এত ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে কেনো?”

নীহারিকা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
তারপর খুব আস্তে, খুব গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল। ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটলো, কিন্তু চোখে রয়ে গেল অদ্ভুত এক ছায়া।
—”কিছু না। চলুন।”
ইরফান কিছু বুঝল না। গাড়ি স্টার্ট করল। গাড়িটা আবার মহাসড়কে উঠে ছুটতে শুরু করল, তাদের নতুন জীবনের দিকে। আর পেছনে পড়ে রইলো সেই নির্জন জায়গা, যেখানে হয়তো এখনো দাঁড়িয়ে আছে কিছু একটা, অপেক্ষায়। কারণ, সব যুদ্ধ শেষ হলেই গল্প শেষ হয় না। কিছু গল্প, আবার শুরু হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে।

নীহারিকা ধীর চোখে গাড়ির আয়নার দিকে তাকালো। যেখানে সে দেখতে পেলো সেই অবয়ব টা না দেখা গেলেও রক্তাক্ত সাদা কাপড় টা উড়ে উড়ে তাদের গাড়ির পেছনেই ছুটছে, যা শুধু নীহারিকাই দেখতে পাচ্ছে।

🔥 —- সমাপ্ত —- 🔥

অপ্রত্যাশিত সমাপ্তি, তাইনা? কিছু কিছু গল্প এমনই সমাপ্তি ডিজার্ভ করে। এতদিন ইরফান কবির ও নীহারিকা কে ভালোবেসে যারা পড়েছেন, ভালোবেসেছেন, সবাইকে আমার তরফ থেকে ভালোবাসা রইলো। সবাই ভালো থাকবেন। তাদের যাত্রা এ পর্যন্তই।
বিদায় 🦋✨ আবারো কোনো নতুন গল্প নিয়ে হাজির হবো আপনাদের মাঝে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply