#বাঁধন_রূপের_অধিকারী
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী
#পর্ব ৯
“বস এখন আমরা কোনো মেয়ে ধরতে পারছি না। শহরে পুলিশের নজর অনেক বেড়ে গেছে। চারদিকে শুধু পুলিশ আর পুলিশ। ইদানীং বেশ কয়েকটা মেয়ে ধরা পড়ায় ওরা একদম হন্যে হয়ে আছে। তার ওপর ময়মনসিংহ শহরে এক নতুন এসপি অফিসার এসেছেন যিনি পুরো ফোর্সকে কড়া অ্যাকশন নেওয়ার অর্ডার দিচ্ছেন।”
কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে থামল রবিন। টেবিলের ওপর পা তুলে আয়েশ করে বসে থাকা কেভিনের ঠোঁটে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। কেভিন নামটা শুনতে যতটা সাধারণ মানুষটা ঠিক ততটাই ভয়ানক। নারী পাচার থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা সব অন্ধকার জগতের নাটের গুরু এই লোকটা। কেভিন দামি সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে এক দলা ধোঁয়া ছেড়ে রবিনের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল।
“নতুন এসপি। বাহ। লেটেস্ট আপডেট। তা শুনি নাম কী ওনার?”
“বস জাওয়াদ অধীর বাঁধন।”
কেভিন ধোঁয়ার কুণ্ডলীর আড়ালে নিজের কুৎসিত হাসিটা লুকিয়ে বিড়বিড় করল।
“জাওয়াদ অধীর বাঁধন।”
পরক্ষণেই তার চোখের দৃষ্টি হিমশীতল হয়ে এল। সে রবিনের দিকে সরাসরি তাকিয়ে জানতে চাইল।
“যাই হোক আসল কথায় আয়। কয়টা মেয়ে ধরেছিস?”
রবিন ভয়ে মাথা নিচু করে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল।
“বস একটাও না। চারদিকে পুলিশের সংখ্যা এতটাই বেশি যে জালের বাইরে বেরোনোর সুযোগ পাচ্ছি না।”
মুহূর্তের মধ্যে কেভিনের শান্ত রূপ উধাও হয়ে গেল। সে পাগলের মতো গর্জে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনের ভারি টেবিলে সজোরে এক লাথি মেরে সে চি-ৎ-কা-র করে উঠল।
“একটাও ধরতে পারিসনি মানে।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ বস। আসলে স্যার।”
পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই কেভিন বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে এসে রবিনের মুখের ভেতর রিভলবারের ঠান্ডা নলটা ঢুকিয়ে দিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিষাক্ত গলায় বলল।
“আগামী দুদিনের মধ্যে আমার দুটো মেয়ে চাই। কালো হোক কি সুন্দর হোক হলেই চলবে। কিন্তু কোত্থেকে আর কীভাবে নিয়ে আসবি সেটা তুই ভালো জানিস। আর যদি না পারিস তবে ওপরে যাওয়ার জন্য রেডি থাকিস।”
_________________
রাত প্রায় বারোটার দিকে বাড়ি ফিরল বাঁধন। শরীরের ওপর দিয়ে আজ ধকল কম যায়নি। সরাসরি রুমে এসে ইউনিফর্মের প্রতিটি বোতাম খুলে সে সেগুলো ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে দিল। এরপর কোমরে একটা সাদা রঙের তোয়ালে জড়িয়ে শাওয়ার রুমে ঢুকল। টানা বিশ মিনিট পর শাওয়ার নিয়ে যখন বেরোলো তখন তার শরীর থেকে সাবানের মৃদু সুবাস আসছে।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটা হ্যান্ড ড্রায়ার দিয়ে নিজের চুলগুলো নিখুঁতভাবে শুকিয়ে নিল সে।ড্রেসিং টেবিল থেকে একটা অ্যাশ রঙের ফিটিং টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার পরে নিতেই তার ক্লান্তি যেন অর্ধেক উধাও হয়ে গেল। প্রতিদিনের মতো আজকেও বাড়ির কাজের লোক বাঁধনের ঘরে রাতের খাবার দিয়ে গেল। গত কয়েকদিন ধরে সে সবার সাথে ডাইনিংয়ে না বসে নিজের ঘরেই একা ডিনার সারে। বাঁধন শান্তভাবে টেবিলে বসে খেতে শুরু করল। ঠিক তখনই কোনো অনুমতি না নিয়েই ঘরে ঢুকল আকাশ। সে সরাসরি গিয়ে বাঁধনের নরম বিছানায় আয়েশ করে শুয়ে পড়ল।
“তোর জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম। তা আজ মার্ডার কেসের নতুন কোনো আপডেট পেলি?”
বাঁধন আকাশের দিকে একবারও না তাকিয়ে খুব মন দিয়ে খেতে খেতে বলল।
“এখন খাচ্ছি। খাওয়ার সময় কোনো প্রফেশনাল কথা বলতে চাচ্ছি না।”
আকাশ বিছানায় এক হাত মাথার নিচে দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে বাঁধনের নির্লিপ্ততার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল।
“শা’লা একদম ছোটবেলার মতোই রয়ে গেলি। তোর সেই একগুঁয়েমি আর জেদ তো তিল পরিমাণ কমেনি। খাওয়ার সময় কথা বললে কি ভাত হজম হবে না?”
বাঁধন চামচ দিয়ে ভাতের নলা মুখে পুরে খুব নিচু স্বরে বলল।
“জানি না।”
আকাশ আর কিছু না বলে চুপচাপ শুয়ে রইল। বাঁধন খাওয়া শেষ করে এক পাশে বিছানায় ল্যাপটপ নিয়ে বসল। ল্যাপটপটা ওপেন করতে করতে সে আকাশের উদ্দেশ্যে বলল।
“তোর খবর কী? কিছু করবি নাকি সারাজীবন এইভাবেই থাকবি?”
আকাশ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল।
“দেখছি কী করা যায়। সারাজীবন তো আর এইভাবে বেকার থাকা যাবে না। ভাবছি কলেজে প্রফেসর হিসেবে জয়েন করব।”
বাঁধন কিবোর্ড থেকে হাত থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে শুধাল।
“কোন কলেজ?”
“আনন্দ মোহন। রূপাদের কলেজে।”
রূপা নামটা শোনামাত্র বাঁধনের চোয়াল আবার শক্ত হয়ে এল। তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে হিমশীতল হয়ে উঠল। আকাশ বুঝতে পারল ভুল সময়ে ভুল কথা বলে ফেলেছে। সে পরিস্থিতি সামলাতে কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু তার আগেই বাঁধন গম্ভীর কণ্ঠে বলল।
“রুমে যা। আমি ঘুমাবো।”
আকাশ আর কথা না বাড়িয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাঁধন ল্যাপটপটা পাশে রেখে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। এক কাপ কফি খেতে ইচ্ছে করছে ভীষণ। সে ঘর থেকে বেরিয়ে সরাসরি নিচে নেমে রান্নাঘরে চলে এল। কাজের লোক ঘুমিয়ে পড়েছে তাই সে নিজেই ব্ল্যাক কফি বানিয়ে নিল। মগ ভর্তি ধোঁয়া ওঠা কফি নিয়ে সে ধীর পায়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল।বাঁ হাতটা ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে ডান হাতে কফির মগটা শক্ত করে ধরে সামনের অন্ধকার বাগানটার দিকে তাকিয়ে রইল সে। কফিতে একটা লম্বা চুমুক দিতেই গরম তরলটা গলা দিয়ে নামার সময় এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিয়ে গেল। রাতের নিস্তব্ধতায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।
সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ বাঁধনের কানে এক চিকন মেয়েলি অথচ ভারী সুরেলা আর মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে এল। বাঁধন কফির মগ হাতে থমকে দাঁড়িয়ে সেই সুরের উৎস খোঁজার চেষ্টা করল। সে উৎসুক হয়ে পাশের ব্যালকনিটার দিকে তাকিয়ে দেখল সেই পরিচিত দৃশ্য। ব্যালকনির গ্রিলের ওপর দুই পা তুলে ওয়ালের কার্নিশে রেখে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে উল্টো হয়ে বসে আছে একটা মেয়ে। তার লম্বা খোলা চুলগুলো রাতের মৃদু বাতাসে হালকা উড়ছে। মেয়েটা উল্টো দিকে ঘুরে কিছু একটা করছে। তার হাতের কনুই দুটো বারবার নড়ছে।বাঁধন কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল। তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে আবার দ্বিগুণ বেগে ধক করে উঠল। এই সেই ব্যালকনি যেখানে সে কয়েক রাত আগে রূপাকে দেখেছিল। তবে কি এটা রূপাই। বাঁধনের সেই গভীর ভাবনার মাঝেই রাতের নির্জনতা চিরে সেই মায়াবী সুর আবার তার কানে আছড়ে পড়ল। রূপা আপনমনে গেয়ে উঠল।
~যেমন করে ঝিনুক মাঝে লুকিয়ে থাকে মুক্ত~
~তেমনি করে আমার হৃদয় তোমার সাথে যুক্ত~
রূপার সেই মায়াবী সুর বাঁধনের হৃদপিণ্ডের স্পন্দন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত তোলপাড় শুরু হয়েছে যা বাঁধন নিজেও ব্যাখ্যা করতে পারছে না। কেন এই মেয়েকে দেখলে তার ভেতরটা এভাবে দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। কেন এই কণ্ঠস্বর তার এতটা চেনা মনে হচ্ছে। তার মনে হলো এই সুর সে আগে কোথাও শুনেছে কোনো এক শান্ত দুপুরে কিংবা কোনো এক পথে।
এদিকে ব্যালকনির টিমটিমে আলোয় রূপা তখন ড্রয়িং প্যাডে আনমনে আঁকিবুঁকি কাটছিল। মনটা ভীষণ খারাপ থাকলে রাতের এই নিস্তব্ধতায় ব্যালকনিতে একা বসে সাদা খাতায় পাখি, ছিমছাম বাড়ি, অচেনা মানুষ কিংবা রঙিন ফুলের ছবি আঁকা তার পুরনো অভ্যাস। এভাবে নিরলস চর্চা করতে করতে অবহেলায় আঁকা সেই ছবিগুলোতেও এখন যেন চ্যাম্পিয়ন আর্টিস্টের ছোঁয়া লেগে গেছে। কিন্তু আজ পেন্সিল হাতে নিতেই রূপার মনটা কেমন যেন অচেনা এক ভাবনায় হারিয়ে গেল। সে বাড়ি, ফুল বা কোনো চেনা অবয়ব আঁকল না। নিজের অজান্তেই, গভীর ভাবনায় ডুবে থেকে সে প্যাডের পাতায় এক জোড়া পুরুষের চোখ ফুটিয়ে তুলল। আঁকা শেষ হতেই যখন সে ড্রয়িং প্যাডটা নিজের সামনে ধরল, মুহূর্তেই চমকে উঠল। আবছা, ঝাপসা আলোতেও সাদা প্যাডের ওপর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দুই জোড়া তীব্র, তীক্ষ্ণ চোখ যে চোখদুটো সে নিজের অজান্তেই ভাবতে ভাবতে এঁকে ফেলেছে। রূপা স্তব্ধ হয়ে রইল। পেন্সিল ধরা হাতটা অবশ হয়ে এল। সে নিজের আঁকা ছবিটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল। এ কার চোখ আঁকল সে।
হঠাৎ রূপা চমকে খেয়াল করল, ড্রয়িং প্যাডের আঁকা ওই তীক্ষ্ণ চোখ জোড়ার বাঁ চোখের ভ্রুতে সে একটা সুক্ষ্ম স্লিন করা কাটার দাগও এঁকে ফেলেছে। ওই সামান্য দাগটা দেখামাত্রই তার বুকের ভেতরটা যেন অজানা ভয়ে ‘ধক’ করে উঠল। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল। সাথে সাথে তার বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠল আজকের ব্যস্ত রাস্তায় দেখা সেই ভয়ংকর সুন্দর পুলিশ ছেলেটার চোখ। ঠিক তারপরই ভেসে উঠল সেই বৃষ্টির দিনের রহস্যময় অবয়ব, যার চোখ দুটো হুবহু এক। রূপার সারা শরীর শিউরে উঠল। তার মানে কি সে নিজের অজান্তেই ওই অচেনা পুরুষের চোখ আঁকল। কিন্তু কেন। কেন এই তীব্র চাহনি আর ওই স্লিট করা ভ্রু তাকে এতটা আচ্ছন্ন করে রাখল। আর এই পুরুষটার চোখের দিকে তাকালে এত কেন নেশা লাগছে।
রানিং..
Share On:
TAGS: বাঁধন রূপের অধিকারী, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩২
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৮ (সারপ্রাইজ শুভ নববর্ষ)
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২২
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ১৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮০
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৪